📄 কলম-চাঁছা দিয়ে শেষ গোসলের পানি গরম
الكنى والألقاب নামক গ্রন্থে উল্লেখ করা হয়েছে, ইবনুল জাওযী র. যে সকল কলম দিয়ে শুধু হাদীছে রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) লিপিবদ্ধ করতেন সেগুলোর (মাথার দিকের) কর্তিত অংশগুলোকে জমিয়ে রাখা হত। প্রায় এক বোঝা হয়ে গিয়েছিল সেগুলো। মৃত্যুপূর্বে তিনি অসিয়ত করে গিয়েছেন, তাঁর শেষ গোসলের পানি যেন এগুলো দিয়ে গরম করা হয়। ঠিক তাই করা হল। সেগুলো পরিমাণে এত অধিক ছিল যে, অতিদ্রুত ভস্মীভূত হওয়া সত্ত্বেও গোসলের সম্পূর্ণ পানি গরম করার পরও অনেকখানিই অবশিষ্ট রয়ে গিয়েছিল।"৩১
আল্লাহু আকবার! কী পরিমাণ কলমী খেদমত তাঁরা করে গেছেন!
টিকাঃ
৩১ আগে লোকেরা বাঁশ বা কাঠের কলম বানাত এবং সেগুলো কালিতে চুবিয়ে চুবিয়ে লিখত। যখন মাথা ভোঁতা হয়ে যেত- খুব পাতলা করে পেন্সিল চাঁছার মত করে- চেঁছে দেয়া হত।
📄 প্রাকৃতিক প্রয়োজনের সময়টুকুও যেন অনর্থক না কাটে
বিস্ময়করভাবে যাঁরা সময়ের হেফাযত করতেন, কল্পনাতীত পন্থায় যাঁরা সময়কে কাজে লাগিয়ে যেতেন তাঁদের অন্যতম হলেন ইমাম ইবন তাইমিয়্যা র.। তার পুরো নাম হল- 'মাজদুদ্দীন আবুল বারাকাত আবদুস সালাম বিন আবদুল্লাহ বিন তাইমিয়্যা' জন্ম ৫৯০ হিজরীর শেষ দিকে এবং মৃত্যু- ৬৫৩ হিজরীতে।
হাফেয ইবন রজব (ذيل طبقات الحنابلة) গ্রন্থে তাঁর জীবনীতে লিখেন, "তিনি ছিলেন একাধারে ফকীহ, ক্বারী, মুহাদ্দিছ, মুফাসসির এবং নাহ্ববিদ। ও নীতি শাস্ত্রবিদ। তাঁকে শায়খুল ইসলাম ও ফকীহুয যামান (যামানার সেরা ফকীহ) বলা হতো।
আমাদের শায়খ আবু আবদুল্লাহ ইবনুল কাইয়্যিম বলেন- "ইবন তাইমিয়্যা র. এর পৌত্র বর্ণনা করেন, "আমার দাদা-মজদুদ্দীন আবুল বারাকাত- যখন প্রাকৃতিক প্রয়োজনে যেতেন তখন আমাকে বলতেন, এই কিতাবটি পড় এবং এতটা জোরে পড় যেন আমি শুনতে পাই। এতে সময়টুকু আমার অনর্থক কাটবে না।"
ইবন রজব বলেন, "ইলমের প্রতি আগ্রহের এবং সময়ের ব্যাপারে সচেতনতার এরচে' বড় দৃষ্টান্ত আর কী হতে পারে!"
সারারাত তিনি ইলম চর্চায় নিবিষ্ট থাকতেন
ইমাম নববী র. (بستان العارفين) গ্রন্থের শেষ দিকে (باب في حكايات مستطرفة) শিরোনামে যুগশ্রেষ্ঠ ও অনন্য সাধারণ কতক আলেমের কিছু কীর্তি উল্লেখ করেছেন। সেখানে তিনি হাফেয আবদুল আযীয আল-মুনযীরী র. (৫৮১-৬৫৬) এর একটি সুকীর্তির কথা উল্লেখ করে বলেন, "আমি আমার শায়খ যিয়াউদ্দিন আবু ইসহাক ইবরাহীম বিন ঈসা কে (৬৫৮ হিজরীর ৬ শাওয়াল রোজ বুধবার দামেস্কের এক মাদরাসায়) একথা বলতে শুনেছি যে, শায়খ আবদুল আযীয র. বলেছেন, "নিজ হাতে আমি নব্বই মুজাল্লাদ (বা খণ্ড) কিতাব এবং সাতশ' জুয (তথা, প্রায় ২১০০০ পৃষ্ঠা) লিখেছি।"
এর সবগুলোই উলূমুল হাদীছ সম্পর্কিত অন্যদের রচনা। আর এসব ছাড়াও তাঁর নিজের লেখা, নিজের রচনাও অনেক। তিনি আরও বলেন, ইলম চর্চায় তাঁর মত এত বেশী শ্রম-সাধনা করতে, এত বেশী মগ্ন থাকতে আমি আর কাউকে দেখিনি।
কায়রোর এক মাদরাসায় আমি তাঁর প্রতিবেশী ছিলাম প্রায় বার বছর। এই দীর্ঘ সময়ের মাঝে এমন কোন রাত এবং রাতের এমন কোন মুহূর্ত কাটেনি, যখন আমি জাগ্রত হয়েছি, আর দেখেছি তাঁর ঘরের বাতি নিভানো। বরং সারারাত তাঁর ঘরে বাতি জ্বলতো আর তিনি ইলম চর্চায় নিবিষ্ট থাকতেন। এমন কি খাওয়ার সময়টুকুতেও দেখতাম তাঁর পাশে কিতাব, আর তিনি তাতে মগ্ন। তাঁর ইলমী তাহকীক ও বিশ্লেষণ, অনুসন্ধান ও গবেষণা এমন ছিল, যা ভাষায় প্রকাশ প্রায় অসম্ভব। তবে এতটুকু বলা যায়, তিনি কোন উৎসবে, অনুষ্ঠানে বা ছুটিতে মাদরাসা থেকে বের হতেন না। শুধু জুম'আর জন্যই বের হতেন। এছাড়া সব সময়ই তিনি ইলমের মাঝে মগ্ন ও নিমগ্ন থাকতেন। আল্লাহ তাঁর প্রতি রহম করুন। আমীন।
📄 সন্তানের মৃত্যুতেও মাদরাসা থেকে বের হননি যিনি
ইমাম তাজউদ্দিন সুবকী طبقات الشافعية الكبرى গ্রন্থে হাফেয মুনযিরী র. এর জীবনীতে লিখেন, "শেষ জীবনে তিনি উচ্চতর বিভাগে হাদীছের দরস দিতেন। শুধু জুম'আর নামায ছাড়া কখনো তিনি মাদরাসা থেকে বের হতেন না। রশিদ উদ্দিন আবু বকর মুহাম্মাদ নামে তাঁর এক ছেলে ছিল। তিনিও ছিলেন উচ্চস্তরের মুহাদ্দিছ এবং অত্যন্ত মেধাবী ও প্রতিভাবান আলিম। পিতার জীবদ্দশাতেই আল্লাহ এই ছেলেকে নিয়ে গেলেন। (হয়ত তাঁর এই বান্দাকে পরীক্ষা করার জন্য এবং বহুগুণ মর্যাদা ও মর্তবা বৃদ্ধির জন্য কিংবা হয়ত অন্য কিছুর জন্য! আল্লাহর হেকমত বোঝার সাধ্য কার আছে, তিনি যাকে বোঝান সে ছাড়া!) ৬৪৩ হিজরীতে তিনি (রশীদ উদ্দীন) ইন্তেকাল করলেন। শায়খ মুনযীরী মাদরাসার ভিতরেই তাঁর জানাযা পড়লেন। এরপর দরজা পর্যন্ত, শুধু মাদরাসার দরজা পর্যন্ত এগিয়েই তাকে বিদায়, চির-বিদায় জানালেন। অশ্রুসিক্ত নয়নে শুধু বললেন- "আল্লাহর হাতে তোমাকে সঁপে দিলাম।" এটুকু বলেই তিনি চলে এলেন; মাদরাসার সীমানা থেকে বের হননি।
মৃত্যুর দিনও কবিতা পঙ্ক্তি মুখস্থকরণ
বিশিষ্ট ইমামদের মধ্যে যারা জীবনের প্রতিটি মুহূর্তকে মূল্যায়ন করেছেন, এমনকি জীবনের অন্তিম মুহূর্তে ও মৃত্যুর দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়েও যারা ইলম অন্বেষণে ব্যস্ত থেকেছেন, তাদের একজন হলেন আরবী ব্যাকরণের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কিতাব الألفية এর লেখক, ইমাম ইবন মালেক মুহাম্মাদ ইবন আবদুল্লাহ (৬০০-৬৭২ হিজরী)।
نفح الطيب গ্রন্থে তাঁর জীবনী সংকলক উল্লেখ করেন- "তিনি অত্যধিক মুতালা'আ করতেন এবং যে কোন কিছু লেখার আগে বারবার পুনপঠন ও পুননিরীক্ষণ করতেন। অতি নির্ভরযোগ্য হাদীছ বর্ণনাকারীদের মত যেকোন বিষয় মূল থেকে যাচাই না করে সে বিষয়ে কলম ধরতেন না। সারাদিন সময়কে তিনি এতটাই হেফাযত করতেন যে, যখনই তাঁকে দেখা হত, হয়ত তিনি নামায পড়ছেন বা তেলাওয়াত করছেন কিংবা কিছু লিখছেন বা পড়ছেন।
একবার তিনি তাঁর কতক শাগরিদসহ দামেস্ক সফরে গেলেন। দীর্ঘপথ পাড়ি দিয়ে যখন তারা গন্তব্যে পৌঁছলেন, তখন সাথীরা আপন আপন কাজে ব্যস্ত হয়ে গেলেন। ফলে কিছুক্ষণের জন্য তারা তাঁর কথা ভুলে গেলেন। পরে যখন তারা তাঁকে খুঁজলেন, পেলেন না। দীর্ঘ খোঁজাখুঁজির পর তাঁকে পাওয়া গেল এবং দেখা গেল, কয়েকটি পৃষ্ঠার দিকে তিনি ঝুঁকে আছেন। নিবিষ্টচিত্তে মুতালা'আ করছেন।
আমি সবচে' আশ্চর্য হই, ইলমের প্রতি তাঁর গুরুত্বারোপ ও মনোযোগের এই ঘটনা থেকে যে, মৃত্যুর দিনও তিনি কতগুলো পঙ্ক্তি মুখস্থ করছিলেন। অসুস্থতার কারণে উঠতে পারছিলেন না। তাঁর ছেলে সেগুলো তাঁকে বলে দিচ্ছিলেন আর তিনি মুখস্থ করছিলেন। কারো কারো মতে তিনি সেদিন আটটি পঙ্ক্তি মুখস্থ করেছিলেন। এ যেন এই (আরবী) প্রবাদের বাস্তব নমুনা-
بقدر ما تتعنى تنال ما تتمنى -
অর্থ: যতটুকু কষ্ট সইবে, (আকাঙ্ক্ষালাভে) ততটুকুই সফলতা পাবে।
তিনি ৬৭২ হিজরীতে দামেস্কে ইন্তেকাল করেন, কাসিয়ূন পাহাড়ের পাদদেশে তাঁকে দাফন করা হয়। এখনো তাঁর কবর সেখানে চিহ্নিত আছে।” আল্লাহ তাঁকে উত্তম বিনিময় দান করুন (আমীন)।
📄 প্রায় দু’বছর যাঁর পিঠ যমিনের স্পর্শ পায়নি
হাফেয যাহাবী تذكرة الحفاظ গ্রন্থে ইমাম নববী র. এর জীবনীতে লিখেন, "তাঁর নাম ইয়াহইয়া ইবন শারাফ ইবন মুররি। উপনাম মুহয়দ্দিন আবু যাকারিয়া। তিনি শায়খুল ইসলাম ও 'আলামুল আওলিয়া (ওলীগণের ঝাণ্ডা) উপাধিতে ভূষিত ছিলেন। বহু বিষয়ে বহু গ্রন্থ তিনি রচনা করেছেন। তাঁর জন্ম ৬৩১ হিজরীতে হাওরান এলাকার নাওয়া নামক জনপদে। ১৮ বছর বয়সে ৬৪৯ হিজরীতে তিনি দামেস্কে আগমন করেন এবং 'মাদরাসায়ে রাওয়াহিয়্যা'য় অবস্থান গ্রহণ করেন। সুদীর্ঘকাল যাবৎ মাদরাসা-প্রদত্ত রুটিই ছিল তাঁর একমাত্র আহার।
তিনি (ইমাম নববী র.) বলেন, "প্রায় দু'বছর আমার এভাবে কেটেছে যে, আমার পিঠ যমিনের (বিছানার/শয্যার) স্পর্শ পায়নি।"
এই সময়ে তিনি সাড়ে চার মাসে التنبيه মুখস্থ করেছেন আর বাকী সময়ে المهذب গ্রন্থের এক চতুর্থাংশ তাঁর শায়খ ইসহাক বিন আহমদ র. এর কাছে পড়েছেন এবং মুখস্থ করেছেন।
ইমাম নববীর শাগরেদ, আমাদের শায়খ আবুল হাসান বিন আত্তার র. বলেছেন, "শায়খ মুহয়দ্দিন প্রতিদিন তাঁর উস্তাযগণের কাছে প্রয়োজনীয় ব্যাখ্যা-বিশ্লেষণসহ বারটি দরস গ্রহণ করতেন। উলূমুল ফিকহে الوسيط গ্রন্থ থেকে দু'দরস, ফিকহে المهذب থেকে এক দরস, সহীহায়ন থেকে উলূমুল হাদীছ বিষয়ে এক দরস, এছাড়া সহীহ মুসলিম থেকে, আরবী ব্যাকরণ শাস্ত্রে ইবনে জিন্নি'র للمع গ্রন্থ থেকে, ভাষা শাস্ত্রে إصلاح المنطق থেকে, ছরফ শাস্ত্র থেকে, উসূলে ফিকহ থেকে, কখনো আবু ইসহাক এর اللمع গ্রন্থ থেকে, আবার কখনো ফখরুদ্দীন রাযী এর المنتخب থেকে এবং আসমাউর রিযাল থেকে উসূলে দ্বীন থেকে, এবং নাহবশাস্ত্র থেকে স্বতন্ত্র একটি করে দরস।
তিনি (ইমাম নববী র.) বলেন, "আমার এ সকল দরসের সাথে সম্পৃক্ত যত ব্যাখ্যা বিশ্লেষণ ও আলোচনা-পর্যালোচনা থাকত সব আমি নোট করে রাখতাম"।
দিনে-রাতে শুধু একবেলা খাবার গ্রহণ
আবুল হাসান ইবনুল আত্তার আরও বলেন, শায়খ (ইমাম নববী) আমার কাছে বর্ণনা করেছেন যে, তিনি এক মুহূর্ত সময়ও নষ্ট করতেন না। দিনে বল বা রাতে, সব সময় তিনি পড়ালেখায় مগ্ন থাকতেন। এমনকি পথ চলার সময়ও তিনি হয় একাকী অধ্যয়ন করতেন অথবা কারও সাথে ইলমী আলোচনা করতেন। এটাকে তিনি প্রায় অভ্যাস বানিয়ে নিয়েছিলেন। এ অবস্থায় কাটল প্রায় ছ'বছর। এরপর তিনি কিতাব রচনা, অধ্যাপনা ও ওয়াজ-নসিহতের পথে অগ্রসর হলেন। তখনও তিনি এমনভাবে সময়ের সদ্ব্যবহার করতেন যে, দিন-রাত চব্বিশ ঘণ্টায় শুধু ইশার পর এক বেলা খাবার গ্রহণ করতেন এবং সেহরীর সময় তরল কিছু পান করে নিতেন। আড়ম্বরপূর্ণ খাবার কিংবা ফলমূল তিনি খেতেন না। বলতেন, এতে দেহে অলসতা ঠাঁই পাবে এবং ঘুম বেশী হবে। এমনকি সময়ের হেফাযতের জন্য তিনি বিবাহ থেকেও বিরত থেকেছেন।
তিনি অত্যন্ত সাদাসিধে জীবন যাপন করতেন। পানাহারে, পোশাক-পরিচ্ছদে, এক কথায় জীবনের সকল ক্ষেত্রে তিনি নিজের প্রতি- বলতে হয়- কঠোরতা করতেন। নিয়মিত ইলমী ব্যস্ততা, তাদরীস, তাছনীফ, ইবাদত-বন্দেগী ও ওযীফা আদায় এবং লাগাতার রোযা রাখা সত্ত্বেও তার খাবার-দাবার ছিল অতি সাধারণ। পোশাক ছিল সস্তা ও সাধারণ কাপড়ের, আর পাগড়ী ছিল (সহজলভ্য) ছাগলের পাকা চামড়া।
তিনি ৬৭৬ হিজরীতে মাত্র পঁয়তাল্লিশ বছর বয়সে ইন্তেকাল করেন। এই স্বল্প হায়াত সত্ত্বেও তিনি স্বরচিত বিশাল গ্রন্থভাণ্ডার রেখে যান। পরবর্তীতে তাঁর রচিত কিতাবের পাতা ও জীবনের 'খাতা' হিসাব করে দেখা যায় গড়ে তিনি প্রতিদিন চল্লিশ থেকে পঞ্চাশ পাতা লিখেছেন।