📘 সময়ের মূল্য বুঝতেন যারা > 📄 প্রায় দু’হাজার গ্রন্থ রচনা করেছেন যিনি

📄 প্রায় দু’হাজার গ্রন্থ রচনা করেছেন যিনি


ذیل طبقات الحنابلة গ্রন্থে تذكرة الحفاظ রজব উল্লেখ করেন, আল্লামা ইবনুল জাওযীর দৌহিত্র আবুল মুজাফফার বলেন- "নানাজানকে আমি শেষ বয়সে মিম্বরের উপর বলতে শুনেছি, "আমি এই দুই আঙ্গুলে (প্রায়) দু'হাজার খণ্ড গ্রন্থ রচনা করেছি।"
ইবনুল ওয়ারদি র. তাঁর تتمة المختصر في أخبار البشر গ্রন্থে লিখেন "কথিত রয়েছে যে, তিনি (আবুল মুজাফফার) আবুল ফারাজ ইবনুল জাওযীর লিখিত সবগুলো পুস্তিকা একত্রিত করে তারপর তাঁর জীবনের দিনগুলো হিসাব করে দেখেন যে, গড়ে প্রতিদিন নয়টি পুস্তিকা (প্রায় ৯০ পাতা) লেখা হয়েছে।

📘 সময়ের মূল্য বুঝতেন যারা > 📄 কলম-চাঁছা দিয়ে শেষ গোসলের পানি গরম

📄 কলম-চাঁছা দিয়ে শেষ গোসলের পানি গরম


الكنى والألقاب নামক গ্রন্থে উল্লেখ করা হয়েছে, ইবনুল জাওযী র. যে সকল কলম দিয়ে শুধু হাদীছে রাসূল (সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম) লিপিবদ্ধ করতেন সেগুলোর (মাথার দিকের) কর্তিত অংশগুলোকে জমিয়ে রাখা হত। প্রায় এক বোঝা হয়ে গিয়েছিল সেগুলো। মৃত্যুপূর্বে তিনি অসিয়ত করে গিয়েছেন, তাঁর শেষ গোসলের পানি যেন এগুলো দিয়ে গরম করা হয়। ঠিক তাই করা হল। সেগুলো পরিমাণে এত অধিক ছিল যে, অতিদ্রুত ভস্মীভূত হওয়া সত্ত্বেও গোসলের সম্পূর্ণ পানি গরম করার পরও অনেকখানিই অবশিষ্ট রয়ে গিয়েছিল।"৩১
আল্লাহু আকবার! কী পরিমাণ কলমী খেদমত তাঁরা করে গেছেন!

টিকাঃ
৩১ আগে লোকেরা বাঁশ বা কাঠের কলম বানাত এবং সেগুলো কালিতে চুবিয়ে চুবিয়ে লিখত। যখন মাথা ভোঁতা হয়ে যেত- খুব পাতলা করে পেন্সিল চাঁছার মত করে- চেঁছে দেয়া হত।

📘 সময়ের মূল্য বুঝতেন যারা > 📄 প্রাকৃতিক প্রয়োজনের সময়টুকুও যেন অনর্থক না কাটে

📄 প্রাকৃতিক প্রয়োজনের সময়টুকুও যেন অনর্থক না কাটে


বিস্ময়করভাবে যাঁরা সময়ের হেফাযত করতেন, কল্পনাতীত পন্থায় যাঁরা সময়কে কাজে লাগিয়ে যেতেন তাঁদের অন্যতম হলেন ইমাম ইবন তাইমিয়্যা র.। তার পুরো নাম হল- 'মাজদুদ্দীন আবুল বারাকাত আবদুস সালাম বিন আবদুল্লাহ বিন তাইমিয়্যা' জন্ম ৫৯০ হিজরীর শেষ দিকে এবং মৃত্যু- ৬৫৩ হিজরীতে।
হাফেয ইবন রজব (ذيل طبقات الحنابلة) গ্রন্থে তাঁর জীবনীতে লিখেন, "তিনি ছিলেন একাধারে ফকীহ, ক্বারী, মুহাদ্দিছ, মুফাসসির এবং নাহ্ববিদ। ও নীতি শাস্ত্রবিদ। তাঁকে শায়খুল ইসলাম ও ফকীহুয যামান (যামানার সেরা ফকীহ) বলা হতো।
আমাদের শায়খ আবু আবদুল্লাহ ইবনুল কাইয়্যিম বলেন- "ইবন তাইমিয়্যা র. এর পৌত্র বর্ণনা করেন, "আমার দাদা-মজদুদ্দীন আবুল বারাকাত- যখন প্রাকৃতিক প্রয়োজনে যেতেন তখন আমাকে বলতেন, এই কিতাবটি পড় এবং এতটা জোরে পড় যেন আমি শুনতে পাই। এতে সময়টুকু আমার অনর্থক কাটবে না।"
ইবন রজব বলেন, "ইলমের প্রতি আগ্রহের এবং সময়ের ব্যাপারে সচেতনতার এরচে' বড় দৃষ্টান্ত আর কী হতে পারে!"
সারারাত তিনি ইলম চর্চায় নিবিষ্ট থাকতেন
ইমাম নববী র. (بستان العارفين) গ্রন্থের শেষ দিকে (باب في حكايات مستطرفة) শিরোনামে যুগশ্রেষ্ঠ ও অনন্য সাধারণ কতক আলেমের কিছু কীর্তি উল্লেখ করেছেন। সেখানে তিনি হাফেয আবদুল আযীয আল-মুনযীরী র. (৫৮১-৬৫৬) এর একটি সুকীর্তির কথা উল্লেখ করে বলেন, "আমি আমার শায়খ যিয়াউদ্দিন আবু ইসহাক ইবরাহীম বিন ঈসা কে (৬৫৮ হিজরীর ৬ শাওয়াল রোজ বুধবার দামেস্কের এক মাদরাসায়) একথা বলতে শুনেছি যে, শায়খ আবদুল আযীয র. বলেছেন, "নিজ হাতে আমি নব্বই মুজাল্লাদ (বা খণ্ড) কিতাব এবং সাতশ' জুয (তথা, প্রায় ২১০০০ পৃষ্ঠা) লিখেছি।"
এর সবগুলোই উলূমুল হাদীছ সম্পর্কিত অন্যদের রচনা। আর এসব ছাড়াও তাঁর নিজের লেখা, নিজের রচনাও অনেক। তিনি আরও বলেন, ইলম চর্চায় তাঁর মত এত বেশী শ্রম-সাধনা করতে, এত বেশী মগ্ন থাকতে আমি আর কাউকে দেখিনি।
কায়রোর এক মাদরাসায় আমি তাঁর প্রতিবেশী ছিলাম প্রায় বার বছর। এই দীর্ঘ সময়ের মাঝে এমন কোন রাত এবং রাতের এমন কোন মুহূর্ত কাটেনি, যখন আমি জাগ্রত হয়েছি, আর দেখেছি তাঁর ঘরের বাতি নিভানো। বরং সারারাত তাঁর ঘরে বাতি জ্বলতো আর তিনি ইলম চর্চায় নিবিষ্ট থাকতেন। এমন কি খাওয়ার সময়টুকুতেও দেখতাম তাঁর পাশে কিতাব, আর তিনি তাতে মগ্ন। তাঁর ইলমী তাহকীক ও বিশ্লেষণ, অনুসন্ধান ও গবেষণা এমন ছিল, যা ভাষায় প্রকাশ প্রায় অসম্ভব। তবে এতটুকু বলা যায়, তিনি কোন উৎসবে, অনুষ্ঠানে বা ছুটিতে মাদরাসা থেকে বের হতেন না। শুধু জুম'আর জন্যই বের হতেন। এছাড়া সব সময়ই তিনি ইলমের মাঝে মগ্ন ও নিমগ্ন থাকতেন। আল্লাহ তাঁর প্রতি রহম করুন। আমীন।

📘 সময়ের মূল্য বুঝতেন যারা > 📄 সন্তানের মৃত্যুতেও মাদরাসা থেকে বের হননি যিনি

📄 সন্তানের মৃত্যুতেও মাদরাসা থেকে বের হননি যিনি


ইমাম তাজউদ্দিন সুবকী طبقات الشافعية الكبرى গ্রন্থে হাফেয মুনযিরী র. এর জীবনীতে লিখেন, "শেষ জীবনে তিনি উচ্চতর বিভাগে হাদীছের দরস দিতেন। শুধু জুম'আর নামায ছাড়া কখনো তিনি মাদরাসা থেকে বের হতেন না। রশিদ উদ্দিন আবু বকর মুহাম্মাদ নামে তাঁর এক ছেলে ছিল। তিনিও ছিলেন উচ্চস্তরের মুহাদ্দিছ এবং অত্যন্ত মেধাবী ও প্রতিভাবান আলিম। পিতার জীবদ্দশাতেই আল্লাহ এই ছেলেকে নিয়ে গেলেন। (হয়ত তাঁর এই বান্দাকে পরীক্ষা করার জন্য এবং বহুগুণ মর্যাদা ও মর্তবা বৃদ্ধির জন্য কিংবা হয়ত অন্য কিছুর জন্য! আল্লাহর হেকমত বোঝার সাধ্য কার আছে, তিনি যাকে বোঝান সে ছাড়া!) ৬৪৩ হিজরীতে তিনি (রশীদ উদ্দীন) ইন্তেকাল করলেন। শায়খ মুনযীরী মাদরাসার ভিতরেই তাঁর জানাযা পড়লেন। এরপর দরজা পর্যন্ত, শুধু মাদরাসার দরজা পর্যন্ত এগিয়েই তাকে বিদায়, চির-বিদায় জানালেন। অশ্রুসিক্ত নয়নে শুধু বললেন- "আল্লাহর হাতে তোমাকে সঁপে দিলাম।" এটুকু বলেই তিনি চলে এলেন; মাদরাসার সীমানা থেকে বের হননি।
মৃত্যুর দিনও কবিতা পঙ্ক্তি মুখস্থকরণ
বিশিষ্ট ইমামদের মধ্যে যারা জীবনের প্রতিটি মুহূর্তকে মূল্যায়ন করেছেন, এমনকি জীবনের অন্তিম মুহূর্তে ও মৃত্যুর দ্বারপ্রান্তে দাঁড়িয়েও যারা ইলম অন্বেষণে ব্যস্ত থেকেছেন, তাদের একজন হলেন আরবী ব্যাকরণের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কিতাব الألفية এর লেখক, ইমাম ইবন মালেক মুহাম্মাদ ইবন আবদুল্লাহ (৬০০-৬৭২ হিজরী)।
نفح الطيب গ্রন্থে তাঁর জীবনী সংকলক উল্লেখ করেন- "তিনি অত্যধিক মুতালা'আ করতেন এবং যে কোন কিছু লেখার আগে বারবার পুনপঠন ও পুননিরীক্ষণ করতেন। অতি নির্ভরযোগ্য হাদীছ বর্ণনাকারীদের মত যেকোন বিষয় মূল থেকে যাচাই না করে সে বিষয়ে কলম ধরতেন না। সারাদিন সময়কে তিনি এতটাই হেফাযত করতেন যে, যখনই তাঁকে দেখা হত, হয়ত তিনি নামায পড়ছেন বা তেলাওয়াত করছেন কিংবা কিছু লিখছেন বা পড়ছেন।
একবার তিনি তাঁর কতক শাগরিদসহ দামেস্ক সফরে গেলেন। দীর্ঘপথ পাড়ি দিয়ে যখন তারা গন্তব্যে পৌঁছলেন, তখন সাথীরা আপন আপন কাজে ব্যস্ত হয়ে গেলেন। ফলে কিছুক্ষণের জন্য তারা তাঁর কথা ভুলে গেলেন। পরে যখন তারা তাঁকে খুঁজলেন, পেলেন না। দীর্ঘ খোঁজাখুঁজির পর তাঁকে পাওয়া গেল এবং দেখা গেল, কয়েকটি পৃষ্ঠার দিকে তিনি ঝুঁকে আছেন। নিবিষ্টচিত্তে মুতালা'আ করছেন।
আমি সবচে' আশ্চর্য হই, ইলমের প্রতি তাঁর গুরুত্বারোপ ও মনোযোগের এই ঘটনা থেকে যে, মৃত্যুর দিনও তিনি কতগুলো পঙ্ক্তি মুখস্থ করছিলেন। অসুস্থতার কারণে উঠতে পারছিলেন না। তাঁর ছেলে সেগুলো তাঁকে বলে দিচ্ছিলেন আর তিনি মুখস্থ করছিলেন। কারো কারো মতে তিনি সেদিন আটটি পঙ্ক্তি মুখস্থ করেছিলেন। এ যেন এই (আরবী) প্রবাদের বাস্তব নমুনা-
بقدر ما تتعنى تنال ما تتمنى -
অর্থ: যতটুকু কষ্ট সইবে, (আকাঙ্ক্ষালাভে) ততটুকুই সফলতা পাবে।
তিনি ৬৭২ হিজরীতে দামেস্কে ইন্তেকাল করেন, কাসিয়ূন পাহাড়ের পাদদেশে তাঁকে দাফন করা হয়। এখনো তাঁর কবর সেখানে চিহ্নিত আছে।” আল্লাহ তাঁকে উত্তম বিনিময় দান করুন (আমীন)।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00