📄 ‘সাতশ’ দিরহামের কালি
সুপ্রসিদ্ধ মুহাদ্দিছ ইবন শাহীনের (২৯৭-৩৮৫ হিজরী) জীবনী আলোচনা করতে গিয়ে হাফেয যাহাবী র. বলেন,२० "...... তাঁর পুরা নাম হল, আবু হাফস উমর ইবন আহমদ ইবন উসমান বাগদাদী। তাকে محدث العراق (তথা ইরাকের মুহাদ্দিছ) বলা হত। তবে তিনি 'ইবন শাহীন' নামেই অধিক পরিচিত ছিলেন। প্রায় লক্ষাধিক হাদীছ তাঁর মুখস্থ ছিল২১ এবং নির্ভরযোগ্য সূত্রে সেগুলো রিওয়ায়েতও করেন। তাছাড়া রচনা সংকলনের জগতেও তিনি বিশাল খেদমত আঞ্জাম দেন। তাঁর এক শাগরেদ- আবুল হুসাইন বিন মুহতাদী বিল্লাহ বলেন, ইবন শাহীন আমাদেরকে বলেছেন, আমি প্রায় ৩৩০টি গ্রন্থ রচনা করেছি। তার মাঝে রয়েছে التفسير الكبير যার কলেবর প্রায় ত্রিশ হাজার পৃষ্ঠা। المسند প্রায় চল্লিশ হাজার পৃষ্ঠা। التاريخ প্রায় সাড়ে চার হাজার পৃষ্ঠা এবং الزهد প্রায় তিন হাজার পৃষ্ঠা'।
মুহাম্মাদ বিন উমর দাউদী বলেন, আমি ইবন শাহীনকে বলতে শুনেছি, 'আমি এ পর্যন্ত যে পরিমাণ কলমের কালি ব্যয় করেছি, হিসাব করে দেখলাম তার মূল্য প্রায় সাতশ' দিরহাম।'
তাইতো তাঁর সম্পর্কে ইবন আবিল ফাওয়ারিছ র. বলেন, আল্লামা ইবন শাহীন যে পরিমাণ কিতাব রচনা করেছেন আর কেউ তা করতে পারেনি।
টিকাঃ
২০ تذكرة الحفاظ হাফেয যাহাবী, খঃ ৩, পৃ: ৯৮৭
২১ হাদীছ শাস্ত্রের হাফেয বলা হয় যার লক্ষাধিক হাদীছ মুখস্থ আছে তাকে।
📄 হাদীছ শ্রবণ হত যাঁর আত্মা ও দেহের খোরাক
আল্লামা মুনযির মারওয়ানী র. এর উপাধি হয়ে গিয়েছিল المذاكرة (অর্থাৎ, পর্যালোচনা)। কারণ যখনই কোন আলেমের সাথে তাঁর সাক্ষাত হত তখনই তিনি তার সাথে আরবী ভাষা ও ব্যাকরণ নিয়ে খুঁটিনাটি আলোচনা-পর্যালোচনা শুরু করে দিতেন।
এ ব্যাপারে হাফেয ইবন হাজার র. তাঁর نزهة الألباب في الألقاب গ্রন্থে উল্লেখ করেন, "মুনযির বিন আবদুর রহমান বিন মুআবিয়া র. এর উপাধি ছিল المذاكرة। তিনি ছিলেন আন্দালুসের অধিবাসী এবং ইলমে নাহু ও ইলমুল লুগাত তথা আরবী ব্যাকরণ শাস্ত্র ও ভাষাতত্ত্বের একজন ইমাম ও পথিকৃত। যখনই কোন বন্ধু বা কোন আলেমের সাথে তাঁর দেখা হত তিনি তাকে বলতেন, 'আপনার কি সুযোগ আছে, আমি আপনার সাথে ভাষাতত্ত্বের এই বিষয়টি বা এই অধ্যায়টি নিয়ে মুযাকারা করতে চাই।' এভাবে কিছুদিন যেতে না যেতেই তার উপাধিই হয়ে যায়, 'মুযাকারা", তাঁর মৃত্যু হয় ৩৯৩ হিজরীতে।
হাফেয আহমদ ইবন আবদুল্লাহ, যার উপনাম ছিল আবু নু'আইম ইস্পাহানী। একই সাথে তিনি ছিলেন, হাদীছ বিশারদ, ইতিহাসবেত্তা ও সুফী সাধক। তাঁর জন্ম ৩৩৬ ও মৃত্যু ৪৩০ হিজরীতে। হাফেয যাহাবী২২ تذكرة الحفاظ গ্রন্থে তাঁর জীবনী আলোচনা করতে গিয়ে লিখেন, "আহমদ ইবন মারদাওয়ায়হি বলেন, আবু নু'আয়মের যুগে লোকজন হাদীছ সংগ্রহের উদ্দেশ্যে বিশ্বের বিভিন্ন প্রান্ত থেকে তাঁর কাছে সফর করে আসত।
সে কালে তিনি ছিলেন হাদীছ শাস্ত্রের সর্বাধিক নির্ভরযোগ্য হাদীছ বর্ণনাকারী এবং সবচে' বড় হাফেযে হাদীছ। তাই তাঁর দরবারে মুহাদ্দিছদের ভিড় লেগে থাকত। প্রতিদিন তাদের একজনের পালা থাকত; ফযরের পর তিনি তার থেকে হাদীছ শুনতেন এবং নতুন কিছু শিখাতেন ও লেখাতেন। এভাবে চলত যোহর পর্যন্ত। তারপর দারসি মজলিস ত্যাগ করে নিজ ঘরের দিকে পা বাড়াতেন। কখনও কখনও সময় স্বল্পতার কারণে চলার পথেও তাঁকে হাদীছ শুনানো হত। কিন্তু এতে তিনি একটুও বিরক্তিবোধ করতেন না। এ দীর্ঘ সময় পর্যন্ত তাঁর কোন খাবার গ্রহণের সুযোগ হত না। হাদীছ শ্রবণ ও সংকলনই হত তখন তাঁর আত্মা ও দেহের খোরাক।
টিকাঃ
২২ খ: ৩, পৃঃ ১০৯৪
📄 মুহূর্তকাল সময়ও কর্মশূন্য থাকা অবৈধ
সময়ের প্রকৃত মূল্যের বোধ ও উপলব্ধি এবং তা থেকে সর্বোচ্চ উপকার গ্রহণের আগ্রহ ও আসক্তি আর জীবনের প্রতিটি মুহূর্তকে উপযুক্ত কাজে কর্মময় ও সাধনাসমৃদ্ধ করার ক্ষেত্রে হাম্বলী ফকীহগণের মাঝে, বরং বলা যায় বড় বড় ইমামগণের মাঝে যারা শ্রেষ্ঠত্বের সর্বোচ্চ শিখরে আরোহণ করেছিলেন তাদের অন্যতম হলেন দু'ব্যক্তি। এক. ইমাম আবুল ওফা ইবন আকিল হাম্বলী র.। যিনি ছিলেন খতীব বাগদাদীর অন্যতম শাগরেদ। দুই. ইমাম আবুল ফারাজ ইবনুল জাওযী র.। যিনি ইবন আকীল র. এর শাগরেদের শাগরেদ।
আবুল ওফা ইবন আকীল র. তাঁর জন্ম ৪৩১ হিজরী এবং মৃত্যু ৫১৩ হিজরীতে। তিনি ছিলেন তাঁর যুগের অন্যতম শ্রেষ্ঠ আলিম, প্রখর ধী-শক্তির অধিকারী ও বহুশাস্ত্রে পারদর্শী এক অনন্য ব্যক্তিত্ব।
তিনি বলতেন, জীবনের একটি মুহূর্তও নষ্ট করা বা কর্মশূন্য রাখা আমার কাছে বৈধ মনে হয় না। কখনো এমন হয়নি যে, ইচ্ছাকৃতভাবে একটি মুহূর্ত আমি নষ্ট করেছি। এমনকি আমার জিহ্বা যখন কোন ইলমি আলোচনা ও পর্যালোচনা আর চোখ মুতালা'আ ও অধ্যয়ন থেকে ফারেগ থাকে- অর্থাৎ আমি যখন শুয়ে থকি বা বিশ্রাম নিই- তখনও আমি একেবারে কর্মশূন্য থাকতে পারি না; মন ও মস্তিষ্ককে ব্যস্ত রাখি, ইলমি চিন্তায় বা কোন বিষয়-ভাবনায় মশগুল থাকি। ফলে যখনই বিশ্রাম শেষ হয়, ঘুম ভাঙে তখনই লেখায় মগ্ন হতে পারি। বিষয়-ভাবনায় আর বাড়তি সময় ব্যয় করতে হয় না।
আমার তো মনে হয় বিশ বছর বয়সে ইলমের প্রতি আমার যে আগ্রহ ও আসক্তি ছিল- আজ আশি বছর বয়সে তা বহুগুণ বৃদ্ধি পেয়েছে, এটাই আমার উপলব্ধি।
তিনি আরও বলেন, অতি প্রয়োজনীয় কাজগুলোর ক্ষেত্রেও আমি সময় বাঁচানোর যথাসাধ্য চেষ্টা করি। এমনকি খাদ্য গ্রহণের ক্ষেত্রেও এর ব্যত্যয় ঘটে না। শক্ত রুটি না খেয়ে আমি কেক জাতীয় নরম কিছু ভিজিয়ে খেয়ে নিই। ফলে খাবার চিবানোর সময়টুকু বেঁচে যায়। আর তা আমি কোন বিষয় অধ্যয়নে বা উপকারী কিছুর লিখনে ব্যয় করতে পারি।
আর এমনটা তো করতেই হবে। হেফাযত করার মত এরচে' দামী সম্পদ আর কী হতে পারে? দায়িত্ব ও কর্তব্য তো আমাদের বেশুমার, অথচ সময় তো অল্প, অতি অল্প।
শায়খ ইবনুল জাওযী বলেন, ইবন আকীল সব সময়ই ইলম অন্বেষণ ও অনুশীলনে মশগুল থাকতেন। যে কোন শাস্ত্রের সূক্ষ্ম থেকে সূক্ষ্মতর বিষয় উদঘাটন আর অস্পষ্ট থেকে অস্পষ্টতর বিষয় স্পষ্টকরণই ছিল তাঁর কাজ। তাছাড়াও তিনি ছিলেন চমৎকার চিন্তা-ভাবনার অধিকারী।
বিভিন্ন বিষয়ে তিনি বেশ কিছু গ্রন্থ রচনা করেন। কারো কারো মতে প্রায় বিশটির মত বৃহৎগ্রন্থ রয়েছে তাঁর। তার মধ্যে সবচে' বড় হল الفنون নামক গ্রন্থটি, এটাকে গ্রন্থ না বলে বিশ্বকোষ বলাই শ্রেয় বলে মনে হয়। কারণ এতে লেখক গুরুত্বপূর্ণ প্রায় সকল বিষয়ই সন্নিবেশিত করেছেন। যথা: ওয়াজ-নসিহত, তাফসীর-ফিকহ, উসূলে-দ্বীন, নাহব-ছরফ, ভাষাতত্ত্ব ও কবিতা এবং ইতিহাস ও গল্প-কাহিনী। এছাড়াও আছে তাঁর বিভিন্ন শিক্ষা- মজলিস ও আলোচনা-পর্যালোচনা, মুনাযারা ও চিন্তা-ভাবনা।
হাফেয যাহাবী র. তো এ কিতাব সম্পর্কে এতটুকু বলেছেন যে, এখন পর্যন্ত দুনিয়াতে এরচে' বৃহৎ কলেবরের কোন গ্রন্থ রচিত হয়নি। এই কিতাবটির চার'শ খণ্ডের পরের কোন একটি খণ্ড দেখেছেন এমন এক ব্যক্তি আমাকে বর্ণনা করেছেন যে, ইবন রজব সহ অনেকেই বলেছেন এটি আট'শ খণ্ডের এক মহাগ্রন্থ।
📄 সময় বাঁচাতে রুটির পরিবর্তে ছাতু
দাউদ আত্মায়ী র. সময় বাঁচাতে ছাতু গুলিয়ে তা পান করতেন। তিনি নিজেই তার কারণ বর্ণনা করে বলেন, 'ছাতু গিলে খাওয়া আর রুটি চিবিয়ে খাওয়ার মধ্যে যে সময়ের ব্যবধান সে সময়ে প্রায় পঞ্চাশ আয়াত তেলাওয়াত করা যায়।'
খাওয়ার সময়টুকুও যাঁর কাছে কষ্টকর
উসমান বাকিল্লাভী র. অনেক বড় আবিদ ছিলেন। তিনি (একেবারে শাব্দিক অর্থেই) সবসময় আল্লাহর যিকিরে মশগুল থাকতেন। তিনি বলতেন, খাওয়া দাওয়া ও ইফতারের সময়টুকু যিকির থেকে বিরত থাকার কারণে কষ্টে যেন আমার প্রাণ বের হয়ে যায়। তাই যথা সম্ভব দ্রুত আমি তা থেকে ফারেগ হয়ে আল্লাহর যিকিরে মশগুল হই।