📄 প্রতিদিন ১৪ পাঠা রচনা
ইবন জারীর তাবারী ছিলেন বিপুল জ্ঞানের অধিকারী বিদগ্ধ গবেষক এবং বরেণ্য আলিম। খ্যাতনামা সব মুহাদ্দিছ, মুফাসসির এবং ঐতিহাসিকদের উস্তায ও শায়খ। সময়ের সদ্ব্যবহার ও সংরক্ষণে তিনি ছিলেন অনুকরণীয় ব্যক্তিত্ব। নিজের প্রতিটি মুহূর্তের তিনি পূর্ণ সদ্ব্যবহার করতেন এবং সর্বদা শিক্ষণ ও গ্রন্থ সংকলনের কাজে নিমগ্ন থাকতেন। ফলে তাঁর লিখিত ও সংকলিত গ্রন্থপঞ্জি বিশাল ভাণ্ডারে পরিণত হয়। যার ব্যাপ্তি ও আয়তন সত্যিই বিস্ময় উদ্রেককারী।
টিকাঃ
১৩ الحث على طلب العلم والإجتهاد في جمعه আবু হেলাল আসকারী, পৃ: ৭৭।
১৪ وفيات الأعيان ইবন খাল্লিকান, খ: ১ পৃ: ১০৪।
📄 মৃত্যুর দুয়ারে ইলম তলব
আল্লামা ইয়াকুত হামাবী র. তাঁর معجم الأدباء গ্রন্থে সংক্ষেপিতভাবে প্রায় ছাপ্পান্ন পৃষ্ঠাব্যাপী ইবন জারীর তাবারীর কর্মমুখর জীবনী আলোচনা করেছেন।১৫
আর হাফেয বাগদাদী তাঁর تاريخ بغداد গ্রন্থেও তাঁর জীবনের উল্লেখযোগ্য দিকগুলো সম্পর্কে আলোকপাত করেছেন।১৬
উভয়ের লেখার অংশ বিশেষের সারনির্যাস সংক্ষিপ্তাকারে এখানে তুলে ধরার চেষ্টা করছি। "..... একবার আল্লামা তাবারী তাঁর শিষ্যদেরকে একত্র করে বললেন, তোমরা কি একটি তাফসীর গ্রন্থ লিখতে আগ্রহী? তারা বলল- হযরত, এর কলেবর কেমন হবে? তিনি বললেন, আমার তো ইচ্ছা ত্রিশ পারার জন্য ত্রিশ হাজার পৃষ্ঠা। তারা বলল, হযরত, তা রচনায় তো কয়েক জীবন পেরিয়ে যাবে! একটু সংক্ষেপে চিন্তা করলে তো আমরা সাহস করতে পারতাম।
তখন তাদের অনুরোধে তিনি তা কমিয়ে ন্যূনতম তিন হাজার পৃষ্ঠা করতে বলেন। এবং ২৮৩ হিজরী থেকে ২৯০ হিজরী পর্যন্ত দীর্ঘ সাত বছরে তাদেরকে দিয়ে তা লিখিয়ে শেষ করেন।
এই বিরাট খিদমত আঞ্জাম দেয়ার পর তিনি আবার শাগরেদগণকে বললেন, তোমরা কি একটি ইতিহাস গ্রন্থ লিখতে প্রস্তুত আছ, যা আদি পিতা হযরত আদম আ. থেকে নিয়ে আজ পর্যন্ত ইতিহাসকে অন্তর্ভুক্ত করবে?
তখন তারা গ্রন্থের আকৃতি সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি তফসিরের ক্ষেত্রে যেমন বলেছিলেন তেমনই বললেন। শাগরেদগণও একই উক্তির পুনরাবৃত্তি করল। তখন তিনি আফসোস করে বললেন, 'ইন্নালিল্লাহ! আগ্রহ ও আত্মবিশ্বাস দেখছি আজকাল হারিয়েই গেছে।' তারপর তিনি সংক্ষিপ্তাকারে তা তিন হাজার পৃষ্ঠায় লেখার কথা বলেন এবং ৩০২ হিজরীর শেষ দিকে তাদেরকে দিয়ে লেখানোর কাজ শেষ করেন। আর ৩০৩ হিজরীর রবিউছ ছানীতে তা পুনরায় তাদের থেকে শুনে শেষ করেন।
খতিব বাগদাদী র. লিখেন, আমি 'সিমসিম'কে বলতে শুনেছি যে, ইবন জারীর র. তাঁর জীবনে এমন চল্লিশটি বছর কাটিয়েছেন, যাতে তিনি শিক্ষণ-অধ্যয়ন ও সাংসারিক কাজ-কর্ম সত্ত্বেও প্রতিদিন চল্লিশ পাতা লিখেছেন।
শাগরেদগণ তাঁর বয়ঃপ্রাপ্ত হওয়ার পর থেকে মৃত্যু পর্যন্ত দিন ও তাঁর হাতে লিখিত পাতার হিসাব করে দেখেছেন যে, গড়ে প্রতি দিন ১৪ পাতা করে লিখা হয়েছে।
সম্মানিত পাঠক, এ থেকে আমরা সহজেই তাঁর রচনার ব্যাপ্তি ও কলেবর আন্দায করতে পারি।
তাঁর জন্ম ২২৪ হিরজীতে এবং মৃত্যু ৩১০ হিজরীতে। জীবনকাল ৮৬ বছর। প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পূর্বকাল তথা প্রায় ১৪ বছর বাদ দেয়া হলে বাকী থাকছে ৭২ বছর। এর প্রতিদিন ১৪ পাতা লেখা হলে তার মোট লেখার পরিমাণ হয় ৭২ × ৩৬০ × ১৪ = ৩,৬২,৮৮০ পাতা।
তাঁর ইলমের ব্যাপ্তি ও গভীরতা বিবেচনা করলে মনে হবে, তা যেন বহু শাস্ত্র ও বিষয় সম্বলিত এক বিশ্বকোষ। আর তাঁর রচনা সম্ভার দেখলে মনে হয় যেন তা কোন বিশাল প্রকাশনালয়ের কীর্তি। অথচ তা এক ব্যক্তির মস্তিষ্কপ্রসূত। আর (ইতিহাস ও তাফসীর সংকলনের ৬/৭ হাজার পৃষ্ঠা ছাড়া বাকীটুকু) এক ব্যক্তির কলম নিঃসৃত।
কিন্তু পাঠক! এমন কীর্তির সৃষ্টি কি সম্ভব হতো, আর এমন কৃতিত্বের প্রকাশও কি ঘটত, যদি সময়ের যথাযথ ব্যবহার না হত! সর্বদা সময়কে কাজ দিয়ে পূর্ণ করে রাখা না হত!!
তাঁর দৈনন্দিন কর্মসূচী সম্পর্কে তাঁর এক শাগরেদ কাজী আবু বকর বিন কামেল র. বলেন, তিনি সকালের খাবার খেয়ে ছোট হাতার একটি চটের জামা গায়ে ঘুমিয়ে যেতেন। ঘুম থেকে উঠে ঘরেই যোহরের নামায আদায় করে কলম ধরতেন এবং আছর পর্যন্ত কিতাব সংকলনের কাজে মশগুল থাকতেন। তারপর মসজিদে আসরের নামায পড়ে মাগরিব পর্যন্ত হাদীছের দরস দিতেন। এরপর থেকে এশা পর্যন্ত ফিকহের দরস চলত। এশার নামায আদায় করে তিনি ঘরে ফিরে যেতেন।
দিন-রাতে সবসময় তিনি নিজের, অন্যের কিংবা দ্বীনের কোন না কোন কল্যাণ কর্মে অবশ্যই মশগুল থাকতেন।
উস্তায মুহাম্মাদ কুরূদ আলী ইবন জারীর তাবারী র. এর জীবনী আলোচনা করতে গিয়ে লিখেন১৭- 'তিনি জীবনের একটি মিনিট সময় নষ্ট করেছেন কিংবা ইফাদা ও ইস্তেফাদা তথা শিক্ষাপ্রদান বা শিক্ষাগ্রহণ ব্যতীত কাটিয়েছেন এমন কোন প্রমাণ নেই।
সে যুগের জনৈক আলিম বর্ণনা করেন যে, ইবন জারীর তাবারীর মৃত্যুর পূর্বক্ষণে তিনি তাঁর কাছে ছিলেন, তখন কোন একজন জাফর ইবন মুহাম্মাদ থেকে বর্ণিত একটি দু'আ উল্লেখ করলে তিনি কাগজ-কলম আনতে বলেন এবং উঠে লেখার চেষ্টা করেন, তখন তাঁকে বলা হয়, হযরত এ মুহূর্তে ...........? তিনি বললেন, 'প্রতিটি মানুষের উচিৎ মৃত্যু পর্যন্ত ইলম অর্জনে মগ্ন থাকা, সামান্যতম সুযোগ পেলেও তা হাতছাড়া না করা।
এর ঘণ্টাখানেক কিংবা আরও কম সময় পরই তিনি ইন্তেকাল করেন। আল্লাহ তা'আলা তাঁকে দ্বীন ও ইলমে দ্বীন এবং প্রত্যেক মুসলমানের পক্ষ থেকে উত্তম প্রতিদান দান করুন। আমীন।
টিকাঃ
১৫ খ: ১৮ পৃষ্ঠা: ৪০-৯৬।
১৬ খ: ২ পৃষ্ঠা: ১৬২-১৬৯।
১৭ كنوز الأجداد মুহাম্মাদ কুরদ আলী পৃ: ১২৩
📄 চলার পথেও পড়তেন যিনি
আবু বকর ইবনুল খাইয়্যাত র. ছিলেন আরবী ব্যাকরণ শাস্ত্রের ইমাম (মৃত্যু ৩২০ হিজরী)। তাঁর অধ্যয়ন আসক্তি এত প্রবল ছিল যে, এক মুহূর্তও মুতালা'আ ছাড়া তিনি থাকতে পারতেন না। এমনকি পথ চলার সময়ও তিনি পড়তে থাকতেন। অনেক সময়ই এমন হয়েছে যে, তিনি এ কারণে পথের গর্তে হোঁচট খেয়ে পড়ে গেছেন। আবার কখনও বা কোন বাহন জন্তুর সাথে ধাক্কা খেয়ে আহত হয়েছেন।১৮
একাধারে মন্ত্রী, বিচারক, লেখক ও শিক্ষক
আবুল ফযল মুহাম্মাদ বিন মুহাম্মাদ বিন আহমদ মারওয়াযী র. ছিলেন একাধারে মন্ত্রী ও বিচারক এবং তৎকালীন হানাফী মাযহাবের ইমাম। ৩৩৪ হিজরীতে তিনি শাহাদাত বরণ করেন। এরপর থেকেই তিনি 'শহীদ শাসক' হিসেবে পরিচিত।
তাঁর সম্পর্কে "আল আনসাব" (الأنساب) প্রণেতা উল্লেখ করেন,১৯ 'তাঁর পুত্র আবু আবদুল্লাহ বলেন, আমি আমার পিতাকে দেখেছি, তিনি প্রতি সোম ও বুধবারে রোযা রাখতেন, আর সফরে থাকুন কিংবা নিজ গৃহে, কখনোই তাহাজ্জুদ তরক করতেন না। তাঁর সামনে সবসময় কিতাব ও খাতা-কলম প্রস্তুত থাকত। রাজকার্জ ও বিচার কার্জ নির্দিষ্ট সময়ে শেষ করেই তিনি তাছনীফের কাজে লেগে যেতেন।
যারা বাদশাহের সাক্ষাতের অনুমতি পেত না; আবেদন-নিবেদন জানানোর সুযোগ পেত না, তারা সবাই তাঁর কাছে আসতো। নিজেদের আবেদন ও অভিযোগ পেশ করত। এই কাজ নির্দিষ্ট সময়ে শেষ করেই তিনি লেখার কাজে ব্যস্ত হয়ে পড়তেন। তখন সাক্ষাতপ্রার্থীরা প্রস্থান করতো।
একবার আবুল আব্বাস বিন হামাভী তাঁর ব্যাপারে অভিযোগ করে বলেন, আমরা তাঁর সাথে সাক্ষাতের জন্য গেলাম অথচ তিনি আমাদের সাথে কথাই বললেন না; হাতে কলম ধরে রাখলেন এবং সব মনোযোগ তাতেই নিবিষ্ট রাখলেন, আমাদের দিকে চোখ তুলেও তাকালেন না।
"মুসতাদরাক" প্রণেতা হাকিম আবু আবদুল্লাহ বলেন, আমি একবার শুক্রবার রাতে হাকিম আবুল ফযলের 'ইমলা'র মজলিসে উপস্থিত ছিলাম। তখন প্রাদেশিক প্রশাসক আবু আলী বিন আবু বকর এলেন এবং হাকিম সাহেবের সাক্ষাতপ্রার্থী হয়ে দীর্ঘক্ষণ দাঁড়িয়ে রইলেন। অথচ তিনি স্বস্থান থেকে একটুও নড়লেন না। দীর্ঘক্ষণ পর তাকে বললেন, আমীর সাহেব! আজ ফিরে যান; আপনার সাথে সময় দেয়ার মত আজ আমার সুযোগ নেই। এই বলে ছাপড়া ঘরের দরজা থেকেই সেই প্রশাসককে ফিরিয়ে দেন।
টিকাঃ
১৮ আবু হেলাল আসকারী, পৃঃ ৭৭।
* الحث على طلب العلم والاجتهاد في جمعه সাম'আনী, খ: ৭ পৃ: ৪২৫ (দামেস্কী ছাপায়) খ: ৮, পৃঃ ১৮৯ (ভারতীয় ছাপায়) الأنساب
📄 ‘সাতশ’ দিরহামের কালি
সুপ্রসিদ্ধ মুহাদ্দিছ ইবন শাহীনের (২৯৭-৩৮৫ হিজরী) জীবনী আলোচনা করতে গিয়ে হাফেয যাহাবী র. বলেন,२० "...... তাঁর পুরা নাম হল, আবু হাফস উমর ইবন আহমদ ইবন উসমান বাগদাদী। তাকে محدث العراق (তথা ইরাকের মুহাদ্দিছ) বলা হত। তবে তিনি 'ইবন শাহীন' নামেই অধিক পরিচিত ছিলেন। প্রায় লক্ষাধিক হাদীছ তাঁর মুখস্থ ছিল২১ এবং নির্ভরযোগ্য সূত্রে সেগুলো রিওয়ায়েতও করেন। তাছাড়া রচনা সংকলনের জগতেও তিনি বিশাল খেদমত আঞ্জাম দেন। তাঁর এক শাগরেদ- আবুল হুসাইন বিন মুহতাদী বিল্লাহ বলেন, ইবন শাহীন আমাদেরকে বলেছেন, আমি প্রায় ৩৩০টি গ্রন্থ রচনা করেছি। তার মাঝে রয়েছে التفسير الكبير যার কলেবর প্রায় ত্রিশ হাজার পৃষ্ঠা। المسند প্রায় চল্লিশ হাজার পৃষ্ঠা। التاريخ প্রায় সাড়ে চার হাজার পৃষ্ঠা এবং الزهد প্রায় তিন হাজার পৃষ্ঠা'।
মুহাম্মাদ বিন উমর দাউদী বলেন, আমি ইবন শাহীনকে বলতে শুনেছি, 'আমি এ পর্যন্ত যে পরিমাণ কলমের কালি ব্যয় করেছি, হিসাব করে দেখলাম তার মূল্য প্রায় সাতশ' দিরহাম।'
তাইতো তাঁর সম্পর্কে ইবন আবিল ফাওয়ারিছ র. বলেন, আল্লামা ইবন শাহীন যে পরিমাণ কিতাব রচনা করেছেন আর কেউ তা করতে পারেনি।
টিকাঃ
২০ تذكرة الحفاظ হাফেয যাহাবী, খঃ ৩, পৃ: ৯৮৭
২১ হাদীছ শাস্ত্রের হাফেয বলা হয় যার লক্ষাধিক হাদীছ মুখস্থ আছে তাকে।