📘 সময়ের মূল্য বুঝতেন যারা > 📄 ৩০ বছর অন্যের হাতে খাদ্য গ্রহণ

📄 ৩০ বছর অন্যের হাতে খাদ্য গ্রহণ


ইছাম ইবন ইউসুফ রহ. (মৃত্যু ২১৫ হিজরী) ছিলেন শীর্ষস্থানীয় হানাফী ফকীহ এবং বল্থ শহরের প্রসিদ্ধ মুহাদ্দিছ। ইলমের সকল মূল্যবান রত্ন তাৎক্ষণিকভাবে সংরক্ষণের জন্য (সে যুগে) তিনি এক দীনার (বা স্বর্ণমুদ্রা) দিয়ে একটি কলম ক্রয় করেছিলেন।
আল্লামা তাসকুবরী র. তাঁর "মাফাতিহুস্ সা'আদাহ” গ্রন্থে এই ঘটনা উল্লেখের পর লিখেন- 'জীবন তো খুবই সীমিত ও সংক্ষিপ্ত। অথচ ইলমের পরিধি হল অসীম ও অপরিমিত, তার অবগতিও তো মানুষের সাধ্যাতীত। তাই প্রত্যেক তালিবে ইলমের উচিৎ জীবনের প্রতিটি মুহূর্তের সদ্ব্যবহার করা। একটি মুহূর্তকেও নষ্ট না করা। রাত ও রাতের নির্জনতাকে এবং একাকিত্বের সময়গুলোকে গণীমত মনে করা। জ্ঞানী-গুণী ও বিজ্ঞজনদের সান্নিধ্য এবং তাদের থেকে জ্ঞান-রত্ন আহরণের সুযোগকে নিজেদের প্রতি আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহ জ্ঞান করা, আর এগুলোকে যথাযথ মূল্যায়ন করা। কারণ, সুযোগ বারবার আসে না, যা কিছু হাতছাড়া হয়ে যায় তার সব ফিরে পাওয়া যায় না। কবি খুব সুন্দর বলেছেন-
ولست بمدرك ما فات منى بلهف ولا بليت ولا لو أني
যতই হোক আফসোস-দীর্ঘশ্বাস, কিংবা হোক যত হা হুতাশ, একবার যদি হয় হাতছাড়া, তবে তার ফিরে আসার নেই কোন আশ্বাস।
হাফেয যাহাবী রহ. তাঁর গ্রন্থ 'সিয়ারু আ'লামিন নুবালা'য় হাদীছ শাস্ত্রের জগদ্বিখ্যাত দুই ইমাম, বুখারী ও মুসলিমের উস্তায প্রখ্যাত হাদীছ বিশারদ উবাইদ বিন ইয়াঈশের র. (মৃত্যু: ২২৯ হিজরীর রমযান মাসে) জীবনী উল্লেখ করতে গিয়ে লিখেন, হাদীছ শাস্ত্রের পরিভাষায় তিনি ছিলেন হাফেয ও হুজ্জাত। সময়ের সদ্ব্যবহারের প্রতি নিজের অসাধারণ সচেতনতার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, আমার জীবনে একাধারে ত্রিশ বছর অতিবাহিত হয়েছে যখন নিজ হাতে রাতের খাবার খাওয়ার সুযোগ হয় নি। এ সময় আমি হাদীছ লিখে যেতাম আর আমার বোন আমার মুখে খাবার তুলে দিতেন।

📘 সময়ের মূল্য বুঝতেন যারা > 📄 যাঁরাহুরে প্রাপ্ত দশ লাখ দেরহাম ইলম অর্জনে ব্যয়

📄 যাঁরাহুরে প্রাপ্ত দশ লাখ দেরহাম ইলম অর্জনে ব্যয়


ইয়াহইয়া ইবন মাঈন র. ছিলেন শীর্ষস্থানীয় বিদগ্ধ মুহাদ্দিছ। হাদীছ শাস্ত্রের বিশিষ্ট ইমাম ও পথিকৃতগণ তাঁর থেকে হাদীছ বর্ণনা করেছেন। তাকে شیخ المحدثين উপাধিতে ভূষিত করা হয়। তিনি ১৫৮ হিজরীতে বাগদাদে জন্মগ্রহণ করেন এবং সেখানেই লালিত- পালিত হন। তাঁর পিতা মাঈন ছিলেন খলীফার অন্যতম রেজিস্ট্রি অফিসার। পুত্রের জন্য তিনি দশ লাখ দিরহাম রেখে যান। ইয়াহইয়া এর সবটুকুই ইলম অর্জনের পথে ব্যয় করেন। শেষ পর্যায়ে এমন অবস্থা হল যে, পরার মত জুতা তার অবশিষ্ট ছিল না।
তিনি যখন দশ বছরের ছোট বালক, তখন থেকেই হাদীছ লিখতে শুরু করেন। আলী ইবনুল মাদীনী রহ. বলেন, 'আজ মানুষের মাঝে যে হাদীছ চর্চা দেখতে পাওয়া যায় তার কৃতিত্ব ইয়াহইয়া বিন মাঈনের।
আব্দুল্লাহ ইবন রূমীর সামনে একথা বলা হল যে, কোন কোন মুহাদ্দিছকে ইবন মাঈন থেকে হাদীছ বর্ণনা কালে বলতে শোনা যায়, حدثنى من لم تطلع الشمس على أكبر منه (এমন ব্যক্তি আমাকে হাদীছ বর্ণনা করেছেন যার চেয়ে বড় কোন হাদীছ বিশারদের উপর সূর্য উদিত হয়নি।) তখন তিনি বলেন, এতে আর আশ্চর্যের কী হল? আমি তো ইবনুল মাদীনীকে বলতে শুনেছি, 'তাঁর মত বড় মানুষ আমি আর দেখিনি। তাঁর দৃষ্টান্ত খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। তিনি যত হাদীছ লিখেছেন আদম সন্তানদের কেউ এত হাদীছ লিখেছেন বলে আমার জানা নেই।' ইবন মাঈন নিজেই বলেছেন, এই হাতে আমি প্রায় দশ লক্ষ হাদীছ লিপিবদ্ধ করেছি।
ইমাম যাহাবী র. একথা ব্যাখ্যা করে বলেন: এই সংখ্যাটি হাদীছের তাকরার ও পুনরুক্তি বিবেচনায়। কেননা অন্যত্র তিনি বলেছেন, একটি হাদীছকে যদি আমি ভিন্ন ভিন্ন সূত্রে কমপক্ষে পঞ্চাশ বার না শুনি এবং না লিখি তবে হাদীছরূপে আমার সাথে তার পরিচিতিই ঘটে না।
আহমদ ইবন হাম্বল র. বলেন, ইয়াহইয়া ইবন মাঈন যা হাদীছ বলে জানেন না বা স্বীকৃতি দেন না তা হাদীছই নয়। মিথ্যাবাদীদের মিথ্যা, পঙ্কিলতা ও বিকৃতি থেকে হাদীছ শাস্ত্রকে রক্ষার জন্যই আল্লাহ তাঁকে সৃষ্টি করেছেন। হাদীছ শাস্ত্রবিদগণের জন্য ইয়াহইয়া বিন মাঈন এমন এক রীতি নির্ধারণ করে দেন, যুগে যুগে যার অনুসরণের মাধ্যমে মুহাদ্দিছগণ হাদীছ ভাণ্ডারকে সংরক্ষণ করেছেন।
তিনি বলেন- إذا كتبت فقمش وإذا حدثت ففتش -
যখন তুমি হাদীছ লিখবে তখন (যা কিছু শোন) সবই লিখবে, কিন্তু যখন হাদীছ বর্ণনা করবে তখন গভীরভাবে তা যাচাই বাছাই করবে।
তাঁর সম্পর্কে বর্ণিত আছে, মৃত্যুর পূর্বে তিনি একশ' চৌদ্দটি তাক ও চারটি বড় মটকা¹⁰ বোঝাই কিতাব রেখে যান।

টিকাঃ
১০ সে যুগে মানুষ তাক বা বড় মটকাতে কিতাব/পাণ্ডুলিপি সংরক্ষণ করতো।

📘 সময়ের মূল্য বুঝতেন যারা > 📄 প্রতিদিন ১৪ পাঠা রচনা

📄 প্রতিদিন ১৪ পাঠা রচনা


ইবন জারীর তাবারী ছিলেন বিপুল জ্ঞানের অধিকারী বিদগ্ধ গবেষক এবং বরেণ্য আলিম। খ্যাতনামা সব মুহাদ্দিছ, মুফাসসির এবং ঐতিহাসিকদের উস্তায ও শায়খ। সময়ের সদ্ব্যবহার ও সংরক্ষণে তিনি ছিলেন অনুকরণীয় ব্যক্তিত্ব। নিজের প্রতিটি মুহূর্তের তিনি পূর্ণ সদ্ব্যবহার করতেন এবং সর্বদা শিক্ষণ ও গ্রন্থ সংকলনের কাজে নিমগ্ন থাকতেন। ফলে তাঁর লিখিত ও সংকলিত গ্রন্থপঞ্জি বিশাল ভাণ্ডারে পরিণত হয়। যার ব্যাপ্তি ও আয়তন সত্যিই বিস্ময় উদ্রেককারী।

টিকাঃ
১৩ الحث على طلب العلم والإجتهاد في جمعه আবু হেলাল আসকারী, পৃ: ৭৭।
১৪ وفيات الأعيان ইবন খাল্লিকান, খ: ১ পৃ: ১০৪।

📘 সময়ের মূল্য বুঝতেন যারা > 📄 মৃত্যুর দুয়ারে ইলম তলব

📄 মৃত্যুর দুয়ারে ইলম তলব


আল্লামা ইয়াকুত হামাবী র. তাঁর معجم الأدباء গ্রন্থে সংক্ষেপিতভাবে প্রায় ছাপ্পান্ন পৃষ্ঠাব্যাপী ইবন জারীর তাবারীর কর্মমুখর জীবনী আলোচনা করেছেন।১৫
আর হাফেয বাগদাদী তাঁর تاريخ بغداد গ্রন্থেও তাঁর জীবনের উল্লেখযোগ্য দিকগুলো সম্পর্কে আলোকপাত করেছেন।১৬
উভয়ের লেখার অংশ বিশেষের সারনির্যাস সংক্ষিপ্তাকারে এখানে তুলে ধরার চেষ্টা করছি। "..... একবার আল্লামা তাবারী তাঁর শিষ্যদেরকে একত্র করে বললেন, তোমরা কি একটি তাফসীর গ্রন্থ লিখতে আগ্রহী? তারা বলল- হযরত, এর কলেবর কেমন হবে? তিনি বললেন, আমার তো ইচ্ছা ত্রিশ পারার জন্য ত্রিশ হাজার পৃষ্ঠা। তারা বলল, হযরত, তা রচনায় তো কয়েক জীবন পেরিয়ে যাবে! একটু সংক্ষেপে চিন্তা করলে তো আমরা সাহস করতে পারতাম।
তখন তাদের অনুরোধে তিনি তা কমিয়ে ন্যূনতম তিন হাজার পৃষ্ঠা করতে বলেন। এবং ২৮৩ হিজরী থেকে ২৯০ হিজরী পর্যন্ত দীর্ঘ সাত বছরে তাদেরকে দিয়ে তা লিখিয়ে শেষ করেন।
এই বিরাট খিদমত আঞ্জাম দেয়ার পর তিনি আবার শাগরেদগণকে বললেন, তোমরা কি একটি ইতিহাস গ্রন্থ লিখতে প্রস্তুত আছ, যা আদি পিতা হযরত আদম আ. থেকে নিয়ে আজ পর্যন্ত ইতিহাসকে অন্তর্ভুক্ত করবে?
তখন তারা গ্রন্থের আকৃতি সম্পর্কে জানতে চাইলে তিনি তফসিরের ক্ষেত্রে যেমন বলেছিলেন তেমনই বললেন। শাগরেদগণও একই উক্তির পুনরাবৃত্তি করল। তখন তিনি আফসোস করে বললেন, 'ইন্নালিল্লাহ! আগ্রহ ও আত্মবিশ্বাস দেখছি আজকাল হারিয়েই গেছে।' তারপর তিনি সংক্ষিপ্তাকারে তা তিন হাজার পৃষ্ঠায় লেখার কথা বলেন এবং ৩০২ হিজরীর শেষ দিকে তাদেরকে দিয়ে লেখানোর কাজ শেষ করেন। আর ৩০৩ হিজরীর রবিউছ ছানীতে তা পুনরায় তাদের থেকে শুনে শেষ করেন।
খতিব বাগদাদী র. লিখেন, আমি 'সিমসিম'কে বলতে শুনেছি যে, ইবন জারীর র. তাঁর জীবনে এমন চল্লিশটি বছর কাটিয়েছেন, যাতে তিনি শিক্ষণ-অধ্যয়ন ও সাংসারিক কাজ-কর্ম সত্ত্বেও প্রতিদিন চল্লিশ পাতা লিখেছেন।
শাগরেদগণ তাঁর বয়ঃপ্রাপ্ত হওয়ার পর থেকে মৃত্যু পর্যন্ত দিন ও তাঁর হাতে লিখিত পাতার হিসাব করে দেখেছেন যে, গড়ে প্রতি দিন ১৪ পাতা করে লিখা হয়েছে।
সম্মানিত পাঠক, এ থেকে আমরা সহজেই তাঁর রচনার ব্যাপ্তি ও কলেবর আন্দায করতে পারি।
তাঁর জন্ম ২২৪ হিরজীতে এবং মৃত্যু ৩১০ হিজরীতে। জীবনকাল ৮৬ বছর। প্রাপ্তবয়স্ক হওয়ার পূর্বকাল তথা প্রায় ১৪ বছর বাদ দেয়া হলে বাকী থাকছে ৭২ বছর। এর প্রতিদিন ১৪ পাতা লেখা হলে তার মোট লেখার পরিমাণ হয় ৭২ × ৩৬০ × ১৪ = ৩,৬২,৮৮০ পাতা।
তাঁর ইলমের ব্যাপ্তি ও গভীরতা বিবেচনা করলে মনে হবে, তা যেন বহু শাস্ত্র ও বিষয় সম্বলিত এক বিশ্বকোষ। আর তাঁর রচনা সম্ভার দেখলে মনে হয় যেন তা কোন বিশাল প্রকাশনালয়ের কীর্তি। অথচ তা এক ব্যক্তির মস্তিষ্কপ্রসূত। আর (ইতিহাস ও তাফসীর সংকলনের ৬/৭ হাজার পৃষ্ঠা ছাড়া বাকীটুকু) এক ব্যক্তির কলম নিঃসৃত।
কিন্তু পাঠক! এমন কীর্তির সৃষ্টি কি সম্ভব হতো, আর এমন কৃতিত্বের প্রকাশও কি ঘটত, যদি সময়ের যথাযথ ব্যবহার না হত! সর্বদা সময়কে কাজ দিয়ে পূর্ণ করে রাখা না হত!!
তাঁর দৈনন্দিন কর্মসূচী সম্পর্কে তাঁর এক শাগরেদ কাজী আবু বকর বিন কামেল র. বলেন, তিনি সকালের খাবার খেয়ে ছোট হাতার একটি চটের জামা গায়ে ঘুমিয়ে যেতেন। ঘুম থেকে উঠে ঘরেই যোহরের নামায আদায় করে কলম ধরতেন এবং আছর পর্যন্ত কিতাব সংকলনের কাজে মশগুল থাকতেন। তারপর মসজিদে আসরের নামায পড়ে মাগরিব পর্যন্ত হাদীছের দরস দিতেন। এরপর থেকে এশা পর্যন্ত ফিকহের দরস চলত। এশার নামায আদায় করে তিনি ঘরে ফিরে যেতেন।
দিন-রাতে সবসময় তিনি নিজের, অন্যের কিংবা দ্বীনের কোন না কোন কল্যাণ কর্মে অবশ্যই মশগুল থাকতেন।
উস্তায মুহাম্মাদ কুরূদ আলী ইবন জারীর তাবারী র. এর জীবনী আলোচনা করতে গিয়ে লিখেন১৭- 'তিনি জীবনের একটি মিনিট সময় নষ্ট করেছেন কিংবা ইফাদা ও ইস্তেফাদা তথা শিক্ষাপ্রদান বা শিক্ষাগ্রহণ ব্যতীত কাটিয়েছেন এমন কোন প্রমাণ নেই।
সে যুগের জনৈক আলিম বর্ণনা করেন যে, ইবন জারীর তাবারীর মৃত্যুর পূর্বক্ষণে তিনি তাঁর কাছে ছিলেন, তখন কোন একজন জাফর ইবন মুহাম্মাদ থেকে বর্ণিত একটি দু'আ উল্লেখ করলে তিনি কাগজ-কলম আনতে বলেন এবং উঠে লেখার চেষ্টা করেন, তখন তাঁকে বলা হয়, হযরত এ মুহূর্তে ...........? তিনি বললেন, 'প্রতিটি মানুষের উচিৎ মৃত্যু পর্যন্ত ইলম অর্জনে মগ্ন থাকা, সামান্যতম সুযোগ পেলেও তা হাতছাড়া না করা।
এর ঘণ্টাখানেক কিংবা আরও কম সময় পরই তিনি ইন্তেকাল করেন। আল্লাহ তা'আলা তাঁকে দ্বীন ও ইলমে দ্বীন এবং প্রত্যেক মুসলমানের পক্ষ থেকে উত্তম প্রতিদান দান করুন। আমীন।

টিকাঃ
১৫ খ: ১৮ পৃষ্ঠা: ৪০-৯৬।
১৬ খ: ২ পৃষ্ঠা: ১৬২-১৬৯।
১৭ كنوز الأجداد মুহাম্মাদ কুরদ আলী পৃ: ১২৩

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00