📄 চোখে পানি ছিটিয়ে ঘুম দূর করতেন যিনি
ইমাম মুহাম্মদ ইবন হাছান শায়বানী র., যিনি ছিলেন ইমাম আবু হানীফা র. এর অন্যতম প্রসিদ্ধ শাগরেদ এবং তাঁর মাযহাবের প্রথম রচয়িতা। তিনি ১৩২ হিজরীতে জন্ম গ্রহণ করেন এবং ১৮৯ হিজরীতে মৃত্যুবরণ করেন। ইলম অন্বেষণের তাগাদায় তিনি রাতে খুবই অল্প ঘুমাতেন। সব সময় বিভিন্ন কিতাব কাছে রাখতেন। যখন একটি পড়তে পড়তে একঘেয়েমি বোধ করতেন তখন অন্যটি শুরু করতেন। আর তিনি চোখে পানি ছিটিয়ে ঘুম দূর করতেন এবং বলতেন- 'ঘুম তো উষ্ণতা থেকেই আসে। তাই শীতলতার মাধ্যমেই তাকে প্রতিহত করতে হয়।'
📄 ৩০ বছর অন্যের হাতে খাদ্য গ্রহণ
ইছাম ইবন ইউসুফ রহ. (মৃত্যু ২১৫ হিজরী) ছিলেন শীর্ষস্থানীয় হানাফী ফকীহ এবং বল্থ শহরের প্রসিদ্ধ মুহাদ্দিছ। ইলমের সকল মূল্যবান রত্ন তাৎক্ষণিকভাবে সংরক্ষণের জন্য (সে যুগে) তিনি এক দীনার (বা স্বর্ণমুদ্রা) দিয়ে একটি কলম ক্রয় করেছিলেন।
আল্লামা তাসকুবরী র. তাঁর "মাফাতিহুস্ সা'আদাহ” গ্রন্থে এই ঘটনা উল্লেখের পর লিখেন- 'জীবন তো খুবই সীমিত ও সংক্ষিপ্ত। অথচ ইলমের পরিধি হল অসীম ও অপরিমিত, তার অবগতিও তো মানুষের সাধ্যাতীত। তাই প্রত্যেক তালিবে ইলমের উচিৎ জীবনের প্রতিটি মুহূর্তের সদ্ব্যবহার করা। একটি মুহূর্তকেও নষ্ট না করা। রাত ও রাতের নির্জনতাকে এবং একাকিত্বের সময়গুলোকে গণীমত মনে করা। জ্ঞানী-গুণী ও বিজ্ঞজনদের সান্নিধ্য এবং তাদের থেকে জ্ঞান-রত্ন আহরণের সুযোগকে নিজেদের প্রতি আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহ জ্ঞান করা, আর এগুলোকে যথাযথ মূল্যায়ন করা। কারণ, সুযোগ বারবার আসে না, যা কিছু হাতছাড়া হয়ে যায় তার সব ফিরে পাওয়া যায় না। কবি খুব সুন্দর বলেছেন-
ولست بمدرك ما فات منى بلهف ولا بليت ولا لو أني
যতই হোক আফসোস-দীর্ঘশ্বাস, কিংবা হোক যত হা হুতাশ, একবার যদি হয় হাতছাড়া, তবে তার ফিরে আসার নেই কোন আশ্বাস।
হাফেয যাহাবী রহ. তাঁর গ্রন্থ 'সিয়ারু আ'লামিন নুবালা'য় হাদীছ শাস্ত্রের জগদ্বিখ্যাত দুই ইমাম, বুখারী ও মুসলিমের উস্তায প্রখ্যাত হাদীছ বিশারদ উবাইদ বিন ইয়াঈশের র. (মৃত্যু: ২২৯ হিজরীর রমযান মাসে) জীবনী উল্লেখ করতে গিয়ে লিখেন, হাদীছ শাস্ত্রের পরিভাষায় তিনি ছিলেন হাফেয ও হুজ্জাত। সময়ের সদ্ব্যবহারের প্রতি নিজের অসাধারণ সচেতনতার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, আমার জীবনে একাধারে ত্রিশ বছর অতিবাহিত হয়েছে যখন নিজ হাতে রাতের খাবার খাওয়ার সুযোগ হয় নি। এ সময় আমি হাদীছ লিখে যেতাম আর আমার বোন আমার মুখে খাবার তুলে দিতেন।
📄 যাঁরাহুরে প্রাপ্ত দশ লাখ দেরহাম ইলম অর্জনে ব্যয়
ইয়াহইয়া ইবন মাঈন র. ছিলেন শীর্ষস্থানীয় বিদগ্ধ মুহাদ্দিছ। হাদীছ শাস্ত্রের বিশিষ্ট ইমাম ও পথিকৃতগণ তাঁর থেকে হাদীছ বর্ণনা করেছেন। তাকে شیخ المحدثين উপাধিতে ভূষিত করা হয়। তিনি ১৫৮ হিজরীতে বাগদাদে জন্মগ্রহণ করেন এবং সেখানেই লালিত- পালিত হন। তাঁর পিতা মাঈন ছিলেন খলীফার অন্যতম রেজিস্ট্রি অফিসার। পুত্রের জন্য তিনি দশ লাখ দিরহাম রেখে যান। ইয়াহইয়া এর সবটুকুই ইলম অর্জনের পথে ব্যয় করেন। শেষ পর্যায়ে এমন অবস্থা হল যে, পরার মত জুতা তার অবশিষ্ট ছিল না।
তিনি যখন দশ বছরের ছোট বালক, তখন থেকেই হাদীছ লিখতে শুরু করেন। আলী ইবনুল মাদীনী রহ. বলেন, 'আজ মানুষের মাঝে যে হাদীছ চর্চা দেখতে পাওয়া যায় তার কৃতিত্ব ইয়াহইয়া বিন মাঈনের।
আব্দুল্লাহ ইবন রূমীর সামনে একথা বলা হল যে, কোন কোন মুহাদ্দিছকে ইবন মাঈন থেকে হাদীছ বর্ণনা কালে বলতে শোনা যায়, حدثنى من لم تطلع الشمس على أكبر منه (এমন ব্যক্তি আমাকে হাদীছ বর্ণনা করেছেন যার চেয়ে বড় কোন হাদীছ বিশারদের উপর সূর্য উদিত হয়নি।) তখন তিনি বলেন, এতে আর আশ্চর্যের কী হল? আমি তো ইবনুল মাদীনীকে বলতে শুনেছি, 'তাঁর মত বড় মানুষ আমি আর দেখিনি। তাঁর দৃষ্টান্ত খুঁজে পাওয়া দুষ্কর। তিনি যত হাদীছ লিখেছেন আদম সন্তানদের কেউ এত হাদীছ লিখেছেন বলে আমার জানা নেই।' ইবন মাঈন নিজেই বলেছেন, এই হাতে আমি প্রায় দশ লক্ষ হাদীছ লিপিবদ্ধ করেছি।
ইমাম যাহাবী র. একথা ব্যাখ্যা করে বলেন: এই সংখ্যাটি হাদীছের তাকরার ও পুনরুক্তি বিবেচনায়। কেননা অন্যত্র তিনি বলেছেন, একটি হাদীছকে যদি আমি ভিন্ন ভিন্ন সূত্রে কমপক্ষে পঞ্চাশ বার না শুনি এবং না লিখি তবে হাদীছরূপে আমার সাথে তার পরিচিতিই ঘটে না।
আহমদ ইবন হাম্বল র. বলেন, ইয়াহইয়া ইবন মাঈন যা হাদীছ বলে জানেন না বা স্বীকৃতি দেন না তা হাদীছই নয়। মিথ্যাবাদীদের মিথ্যা, পঙ্কিলতা ও বিকৃতি থেকে হাদীছ শাস্ত্রকে রক্ষার জন্যই আল্লাহ তাঁকে সৃষ্টি করেছেন। হাদীছ শাস্ত্রবিদগণের জন্য ইয়াহইয়া বিন মাঈন এমন এক রীতি নির্ধারণ করে দেন, যুগে যুগে যার অনুসরণের মাধ্যমে মুহাদ্দিছগণ হাদীছ ভাণ্ডারকে সংরক্ষণ করেছেন।
তিনি বলেন- إذا كتبت فقمش وإذا حدثت ففتش -
যখন তুমি হাদীছ লিখবে তখন (যা কিছু শোন) সবই লিখবে, কিন্তু যখন হাদীছ বর্ণনা করবে তখন গভীরভাবে তা যাচাই বাছাই করবে।
তাঁর সম্পর্কে বর্ণিত আছে, মৃত্যুর পূর্বে তিনি একশ' চৌদ্দটি তাক ও চারটি বড় মটকা¹⁰ বোঝাই কিতাব রেখে যান।
টিকাঃ
১০ সে যুগে মানুষ তাক বা বড় মটকাতে কিতাব/পাণ্ডুলিপি সংরক্ষণ করতো।
📄 প্রতিদিন ১৪ পাঠা রচনা
ইবন জারীর তাবারী ছিলেন বিপুল জ্ঞানের অধিকারী বিদগ্ধ গবেষক এবং বরেণ্য আলিম। খ্যাতনামা সব মুহাদ্দিছ, মুফাসসির এবং ঐতিহাসিকদের উস্তায ও শায়খ। সময়ের সদ্ব্যবহার ও সংরক্ষণে তিনি ছিলেন অনুকরণীয় ব্যক্তিত্ব। নিজের প্রতিটি মুহূর্তের তিনি পূর্ণ সদ্ব্যবহার করতেন এবং সর্বদা শিক্ষণ ও গ্রন্থ সংকলনের কাজে নিমগ্ন থাকতেন। ফলে তাঁর লিখিত ও সংকলিত গ্রন্থপঞ্জি বিশাল ভাণ্ডারে পরিণত হয়। যার ব্যাপ্তি ও আয়তন সত্যিই বিস্ময় উদ্রেককারী।
টিকাঃ
১৩ الحث على طلب العلم والإجتهاد في جمعه আবু হেলাল আসকারী, পৃ: ৭৭।
১৪ وفيات الأعيان ইবন খাল্লিকান, খ: ১ পৃ: ১০৪।