📄 জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে ইলমী আলোচনা
ইমাম আবু ইউসুফ র., যিনি ছিলেন ইমাম আযম আবু হানীফা র. এর বিশিষ্টতম শাগরেদ এবং তাঁর জ্ঞান ও প্রজ্ঞা এবং মতাদর্শ ও মাযহাবের প্রচার-প্রসারকারী। সাথে সাথে তিনি ছিলেন আব্বাসীয় খলীফা মাহদী, হাদী, ও রশীদ এই তিনজনের আমলে প্রধান বিচারপতি। তিনিই সর্ব প্রথম قاضی القضاة (প্রধান বিচারপতি) উপাধিতে ভূষিত হন। তাকে قاضی القضاة الدنيا (আন্তর্জাতিক প্রধান বিচারপতি)ও বলা হয়। তাঁর জন্ম ১১৩ হিজরীতে এবং মৃত্যু ১৮২ হিজরীতে।
তিনি যখন মৃত্যু শয্যায় শায়িত, জীবনের অন্তিম মুহূর্তে উপনীত তখনও তিনি তাঁর কয়েকজন সাক্ষাৎপ্রার্থী ও শুশ্রূষাকারীর সাথে ফিকহী মাসআলা আলোচনায় মগ্ন ছিলেন। সুতরাং একথা বলা অত্যুক্তি হবে না, জীবনের অন্তিম মুহূর্ত পর্যন্ত তিনি ইলম চর্চা এবং এর মাধ্যমে মানুষের উপকার চিন্তায় মশগুল ছিলেন।
তাঁর শাগরেদ ইবরাহীম বিন জাররাহ কুফী- তিনিও বিচারক ছিলেন- তিনি বলেন, আমার উস্তায আবু ইউসুফ র. যখন অসুস্থ হয়ে পড়লেন তখন আমি তাকে দেখতে গেলাম। রোগের তীব্রতায় তিনি অজ্ঞান অবস্থায় ছিলেন। যখন তাঁর জ্ঞান ফিরে এলো, তিনি আমাকে দেখে বললেন, ইবরাহীম! এই মাসআলার ব্যাপারে তোমার কী মতামত?
আমি বললাম, হযরত, এই অবস্থায় ........!
তখন তিনি বললেন, কোন অসুবিধা নেই, আমরা আলোচনা করে যাই, আমাদের উত্তরসূরী যারা জাহান্নাম থেকে বাঁচতে চায় তাদের জন্য যেন তা সহজ হয়। এরপর তিনি বললেন, হজ্বে কীভাবে রা'মী (শয়তানের উদ্দেশ্যে পাথর নিক্ষেপ) করা উত্তম; পায়ে হেঁটে না কি আরোহণ করে? -আরোহী অবস্থায়........! -তুমি ঠিক বলনি।
-তবে কি হেঁটে? -না, ঠিক হয় নি। -তাহলে আপনিই বলুন। -যেখানে দু'আর জন্য দাঁড়াবে সেখানে হেঁটে রা'মী করা উত্তম। আর যেখানে দু'আ করবে না সেখানে আরোহী অবস্থায় উত্তম।
এতটুকু কথার পর আমি তাঁর কাছ থেকে উঠে গেলাম। কারণ, আমার আশংকা হচ্ছিল, আমি যতক্ষণ থাকব তিনি আলোচনা করতেই থাকবেন। আর এতে তাঁর কষ্ট বাড়তেই থাকবে। এরপর আমি তাঁর থেকে বিদায় নিয়ে তাঁর গৃহদ্বার অতিক্রম করতে না করতেই তিনি আমাদের সবাইকে চিরবিদায় জানালেন।
টিকাঃ
৮ এ যেন ( طلب العلم من المهد ألى اللحد )জ্ঞান অন্বেষণ তো দোলনা থেকে কবর পর্যন্ত( একথার বাস্তব চিত্র। (জেনে রাখা ভাল, এ উক্তিটি হাদীছ নয়।)
📄 সন্তানের কাফন-দাফনের দায়িত্বভার অন্যের হাতে অর্পণ
ইমাম আবু ইউসুফ র. সতের বছর, (মতান্তরে ঊনত্রিশ বছর) ইমাম আবু হানীফার সাহচর্যে ধন্য হয়েছেন। এই সুদীর্ঘ সময়ে তিনি কখনও তাঁর সঙ্গ ছাড়া ফজর নামায আদায় করেছেন, এমনটি হয়নি। ঈদুল ফিতর বল বা ঈদুল আযহা, সব সময় তাঁর একই অবস্থা। অসুস্থতা ছাড়া আর কোন কিছুকে তিনি উস্তায থেকে দূরে থাকার ব্যাপারে ওযর মনে করেননি। এছাড়া কখনো তাঁর সান্নিধ্য থেকে দূরে থাকেননি।
ইলমের প্রতি নিরবচ্ছিন্ন মগ্নতার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, "(একবার) আমার এক সন্তান মৃত্যুবরণ করল। কিন্তু ইমাম আবু হানীফা র. এর কোন দরস কিংবা কোন আলোচনা থেকে আমি বঞ্চিত হব, আর সেজন্য আজীবন আমি অনুতাপ ও অনুশোচনাদগ্ধ হব এই আশংকায় আমি সন্তানের দাফন- কাফনে শরীক হইনি। বরং এর দায়-দায়িত্ব নিজের আত্মীয়-স্বজন ও প্রতিবেশীদের হাতে ন্যস্ত করেছি।"
📄 চোখে পানি ছিটিয়ে ঘুম দূর করতেন যিনি
ইমাম মুহাম্মদ ইবন হাছান শায়বানী র., যিনি ছিলেন ইমাম আবু হানীফা র. এর অন্যতম প্রসিদ্ধ শাগরেদ এবং তাঁর মাযহাবের প্রথম রচয়িতা। তিনি ১৩২ হিজরীতে জন্ম গ্রহণ করেন এবং ১৮৯ হিজরীতে মৃত্যুবরণ করেন। ইলম অন্বেষণের তাগাদায় তিনি রাতে খুবই অল্প ঘুমাতেন। সব সময় বিভিন্ন কিতাব কাছে রাখতেন। যখন একটি পড়তে পড়তে একঘেয়েমি বোধ করতেন তখন অন্যটি শুরু করতেন। আর তিনি চোখে পানি ছিটিয়ে ঘুম দূর করতেন এবং বলতেন- 'ঘুম তো উষ্ণতা থেকেই আসে। তাই শীতলতার মাধ্যমেই তাকে প্রতিহত করতে হয়।'
📄 ৩০ বছর অন্যের হাতে খাদ্য গ্রহণ
ইছাম ইবন ইউসুফ রহ. (মৃত্যু ২১৫ হিজরী) ছিলেন শীর্ষস্থানীয় হানাফী ফকীহ এবং বল্থ শহরের প্রসিদ্ধ মুহাদ্দিছ। ইলমের সকল মূল্যবান রত্ন তাৎক্ষণিকভাবে সংরক্ষণের জন্য (সে যুগে) তিনি এক দীনার (বা স্বর্ণমুদ্রা) দিয়ে একটি কলম ক্রয় করেছিলেন।
আল্লামা তাসকুবরী র. তাঁর "মাফাতিহুস্ সা'আদাহ” গ্রন্থে এই ঘটনা উল্লেখের পর লিখেন- 'জীবন তো খুবই সীমিত ও সংক্ষিপ্ত। অথচ ইলমের পরিধি হল অসীম ও অপরিমিত, তার অবগতিও তো মানুষের সাধ্যাতীত। তাই প্রত্যেক তালিবে ইলমের উচিৎ জীবনের প্রতিটি মুহূর্তের সদ্ব্যবহার করা। একটি মুহূর্তকেও নষ্ট না করা। রাত ও রাতের নির্জনতাকে এবং একাকিত্বের সময়গুলোকে গণীমত মনে করা। জ্ঞানী-গুণী ও বিজ্ঞজনদের সান্নিধ্য এবং তাদের থেকে জ্ঞান-রত্ন আহরণের সুযোগকে নিজেদের প্রতি আল্লাহর বিশেষ অনুগ্রহ জ্ঞান করা, আর এগুলোকে যথাযথ মূল্যায়ন করা। কারণ, সুযোগ বারবার আসে না, যা কিছু হাতছাড়া হয়ে যায় তার সব ফিরে পাওয়া যায় না। কবি খুব সুন্দর বলেছেন-
ولست بمدرك ما فات منى بلهف ولا بليت ولا لو أني
যতই হোক আফসোস-দীর্ঘশ্বাস, কিংবা হোক যত হা হুতাশ, একবার যদি হয় হাতছাড়া, তবে তার ফিরে আসার নেই কোন আশ্বাস।
হাফেয যাহাবী রহ. তাঁর গ্রন্থ 'সিয়ারু আ'লামিন নুবালা'য় হাদীছ শাস্ত্রের জগদ্বিখ্যাত দুই ইমাম, বুখারী ও মুসলিমের উস্তায প্রখ্যাত হাদীছ বিশারদ উবাইদ বিন ইয়াঈশের র. (মৃত্যু: ২২৯ হিজরীর রমযান মাসে) জীবনী উল্লেখ করতে গিয়ে লিখেন, হাদীছ শাস্ত্রের পরিভাষায় তিনি ছিলেন হাফেয ও হুজ্জাত। সময়ের সদ্ব্যবহারের প্রতি নিজের অসাধারণ সচেতনতার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, আমার জীবনে একাধারে ত্রিশ বছর অতিবাহিত হয়েছে যখন নিজ হাতে রাতের খাবার খাওয়ার সুযোগ হয় নি। এ সময় আমি হাদীছ লিখে যেতাম আর আমার বোন আমার মুখে খাবার তুলে দিতেন।