📄 মৃত্যু সংবাদেও যাঁর অবস্থা অপরিবর্তিত
বিদগ্ধ মুহাদ্দিছ ও ইতিহাসবিদ হাফেয যাহাবী তাঁর تذكرة الحفاظ (তাযকিরাতুল হুফফায) গ্রন্থে হাম্মাদ ইবন সালামার৭ জীবনী আলোচনা করতে গিয়ে উল্লেখ করেন, তাঁর শাগরেদ আবদুর রহমান ইবন মাহদী বলেন, 'হাম্মাদ ইবন সালামাকে যদি জানিয়ে দেয়া হয় আপনি তো আগামীকাল মৃত্যু বরণ করবেন, তবুও তার আমলে কোন পরিবর্তন আসবে না, তাতে হ্রাস-বৃদ্ধি হবে না। কারণ তিনি সর্বদা এতটাই আমলে মশগুল থাকেন যে, অত্যাসন্ন মৃত্যুর কথায় প্রভাবিত হয়েও এরচে' বেশী আমল করা সম্ভব ছিল না।'
মূসা ইবন ইসমাঈল নামক জনৈক মনীষী বলেন, যদি বলি- হাম্মাদকে আমি কখনো হাসতে দেখিনি, তবে তা অত্যুক্তি হবে না। তিনি সর্বদাই হাদীছ বর্ণনা বা অধ্যয়নে কিংবা তাসবীহ পাঠ বা নামায আদায়ে ব্যস্ত থাকতেন। তাঁর দিন-রাত এসব কাজেই ভাগ করা ছিল।
ইউনুস আল মুআদ্দিব বলেন, হাম্মাদ ইবন সালামা নামায পড়তে পড়তে (অর্থাৎ নামাযরত অবস্থায়) ইন্তেকাল করেন।
টিকাঃ
৭ তাঁর জন্ম (বসরা নগরীতে) ৯১ হিজরীতে আর মৃত্যু ১৬৭ হিজরীতে।
📄 সবচে’ অসহনীয় সময় হল খাওয়ার সময়
খলীল ইবন আহমদ আল ফারাহীদী ছিলেন বিদগ্ধ ভাষাবিদ। তিনি ১০০ হিজরীতে বসরা নগরীতে জন্ম গ্রহণ করেন, আর ইন্তেকাল করেন ১৭০ হিজরীতে। তাঁর সম্পর্কে আবু হেলাল আসকারী র. এক গ্রন্থে লিখেন যে, খলীল ইবন আহমদ র. বলতেন-
أثقل الساعات على ساعة آكل فيها -
আমার কাছে সবচে' অসহনীয় সময় হল আমার খাওয়ার সময়।
অর্থাৎ, আহার গ্রহণের সময় বাধ্য হয়েই আমাকে জ্ঞানের চর্চা ও গবেষণা থেকে বিচ্ছিন্ন হতে হয়। যদি এর (পানাহারের) আবশ্যকতা না থাকত তবে এক মুহূর্তের জন্যও আমি এই ইলম চর্চা-যা আমার দেহের ও মনের খোরাক যোগায় এবং হৃদয়ে শান্তির পরশ বুলিয়ে দেয়- তা থেকে বিমুখ হতাম না।
আল্লাহু আকবার! ইলমের জন্য জীবন উৎসর্গের এমন দৃষ্টান্ত খুঁজে পাওয়া যাবে কি! সময়ের সদ্ব্যবহারের এমন চিত্র কেউ আরেকটি দেখাতে পারবে কি!
📄 জীবন-মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে ইলমী আলোচনা
ইমাম আবু ইউসুফ র., যিনি ছিলেন ইমাম আযম আবু হানীফা র. এর বিশিষ্টতম শাগরেদ এবং তাঁর জ্ঞান ও প্রজ্ঞা এবং মতাদর্শ ও মাযহাবের প্রচার-প্রসারকারী। সাথে সাথে তিনি ছিলেন আব্বাসীয় খলীফা মাহদী, হাদী, ও রশীদ এই তিনজনের আমলে প্রধান বিচারপতি। তিনিই সর্ব প্রথম قاضی القضاة (প্রধান বিচারপতি) উপাধিতে ভূষিত হন। তাকে قاضی القضاة الدنيا (আন্তর্জাতিক প্রধান বিচারপতি)ও বলা হয়। তাঁর জন্ম ১১৩ হিজরীতে এবং মৃত্যু ১৮২ হিজরীতে।
তিনি যখন মৃত্যু শয্যায় শায়িত, জীবনের অন্তিম মুহূর্তে উপনীত তখনও তিনি তাঁর কয়েকজন সাক্ষাৎপ্রার্থী ও শুশ্রূষাকারীর সাথে ফিকহী মাসআলা আলোচনায় মগ্ন ছিলেন। সুতরাং একথা বলা অত্যুক্তি হবে না, জীবনের অন্তিম মুহূর্ত পর্যন্ত তিনি ইলম চর্চা এবং এর মাধ্যমে মানুষের উপকার চিন্তায় মশগুল ছিলেন।
তাঁর শাগরেদ ইবরাহীম বিন জাররাহ কুফী- তিনিও বিচারক ছিলেন- তিনি বলেন, আমার উস্তায আবু ইউসুফ র. যখন অসুস্থ হয়ে পড়লেন তখন আমি তাকে দেখতে গেলাম। রোগের তীব্রতায় তিনি অজ্ঞান অবস্থায় ছিলেন। যখন তাঁর জ্ঞান ফিরে এলো, তিনি আমাকে দেখে বললেন, ইবরাহীম! এই মাসআলার ব্যাপারে তোমার কী মতামত?
আমি বললাম, হযরত, এই অবস্থায় ........!
তখন তিনি বললেন, কোন অসুবিধা নেই, আমরা আলোচনা করে যাই, আমাদের উত্তরসূরী যারা জাহান্নাম থেকে বাঁচতে চায় তাদের জন্য যেন তা সহজ হয়। এরপর তিনি বললেন, হজ্বে কীভাবে রা'মী (শয়তানের উদ্দেশ্যে পাথর নিক্ষেপ) করা উত্তম; পায়ে হেঁটে না কি আরোহণ করে? -আরোহী অবস্থায়........! -তুমি ঠিক বলনি।
-তবে কি হেঁটে? -না, ঠিক হয় নি। -তাহলে আপনিই বলুন। -যেখানে দু'আর জন্য দাঁড়াবে সেখানে হেঁটে রা'মী করা উত্তম। আর যেখানে দু'আ করবে না সেখানে আরোহী অবস্থায় উত্তম।
এতটুকু কথার পর আমি তাঁর কাছ থেকে উঠে গেলাম। কারণ, আমার আশংকা হচ্ছিল, আমি যতক্ষণ থাকব তিনি আলোচনা করতেই থাকবেন। আর এতে তাঁর কষ্ট বাড়তেই থাকবে। এরপর আমি তাঁর থেকে বিদায় নিয়ে তাঁর গৃহদ্বার অতিক্রম করতে না করতেই তিনি আমাদের সবাইকে চিরবিদায় জানালেন।
টিকাঃ
৮ এ যেন ( طلب العلم من المهد ألى اللحد )জ্ঞান অন্বেষণ তো দোলনা থেকে কবর পর্যন্ত( একথার বাস্তব চিত্র। (জেনে রাখা ভাল, এ উক্তিটি হাদীছ নয়।)
📄 সন্তানের কাফন-দাফনের দায়িত্বভার অন্যের হাতে অর্পণ
ইমাম আবু ইউসুফ র. সতের বছর, (মতান্তরে ঊনত্রিশ বছর) ইমাম আবু হানীফার সাহচর্যে ধন্য হয়েছেন। এই সুদীর্ঘ সময়ে তিনি কখনও তাঁর সঙ্গ ছাড়া ফজর নামায আদায় করেছেন, এমনটি হয়নি। ঈদুল ফিতর বল বা ঈদুল আযহা, সব সময় তাঁর একই অবস্থা। অসুস্থতা ছাড়া আর কোন কিছুকে তিনি উস্তায থেকে দূরে থাকার ব্যাপারে ওযর মনে করেননি। এছাড়া কখনো তাঁর সান্নিধ্য থেকে দূরে থাকেননি।
ইলমের প্রতি নিরবচ্ছিন্ন মগ্নতার কথা উল্লেখ করে তিনি বলেন, "(একবার) আমার এক সন্তান মৃত্যুবরণ করল। কিন্তু ইমাম আবু হানীফা র. এর কোন দরস কিংবা কোন আলোচনা থেকে আমি বঞ্চিত হব, আর সেজন্য আজীবন আমি অনুতাপ ও অনুশোচনাদগ্ধ হব এই আশংকায় আমি সন্তানের দাফন- কাফনে শরীক হইনি। বরং এর দায়-দায়িত্ব নিজের আত্মীয়-স্বজন ও প্রতিবেশীদের হাতে ন্যস্ত করেছি।"