📄 সময়ের ব্যাপারে আত্মমর্যাদাবোধ তো জীবনব্যাপী
ইমাম ইবনুল কায়্যিম র. তার مدارج السالكين নামক গ্রন্থে গায়রত তথা আত্মমর্যাদাবোধের পরিচয় ও ব্যাপ্তি সম্পর্কে আলোচনা প্রসঙ্গে এক পর্যায়ে সময়ের ব্যাপারে গায়রত সম্পর্কে বলেন, 'হাতছাড়া হয়ে যাওয়া সময়ের ব্যাপারে যে গায়রত বা মর্যাদাবোধ তা হল বিনাশী। কেননা সময় দ্রুত বহমান, আপোষহীনভাবে অগ্রসরমান。
'আবিদের কাছে সময় ইবাদত-বন্দেগী ও ওয়াযীফা আদায়ের জন্য, মুরীদের কাছে সময় আল্লাহমুখিতা এবং তাতে সর্বান্তঃকরণে আত্মসমাহিত হওয়ার জন্য। সুতরাং সময় তার কাছে মহামূল্যবান বস্তু। উল্লিখিত আমল ব্যতীত সময় হাতছাড়া হওয়া তার আত্মমর্যাদাকে আঘাত করে। কেননা যদি একবার তা হাতছাড়া হয়ে যায়। তাহলে তার ক্ষতিপূরণ কখনোই সম্ভব নয়। কেননা পরবর্তী সময় তো তার বিশেষ কর্তব্যকর্মের জন্য নির্ধারিত।
সুতরাং কোন সময় যখন তার হাতছাড়া হয়ে যাবে তখন আর কিছুতেই তার নাগাল পাওয়ার কোন উপায় থাকে না। তখন ছুটে যাওয়া আমলের 'কাযা' আদায়ের চেয়ে ঐ সময়ে নির্ধারিত কাজটুকু করাইতো বাঞ্ছনীয়। এজন্যইতো হাতছাড়া হওয়া সময়ের জন্য যে গায়রত, তাকে বিনাশী বলা হয়েছে। কারণ, তার প্রভাব-প্রতিক্রিয়া জীবননাশের সদৃশ। কেননা, হাতছাড়া হওয়ার আক্ষেপ-অনুশোচনা আত্মঘাতী ও বিনাশী। বিশেষতঃ আক্ষেপকারী যখন বুঝতে পারে যে, ক্ষতিপূরণের বা ক্ষতি পুষিয়ে নেয়ার কোন পথ নেই। কেননা কোন কিছু হাতছাড়া হয়ে যাওয়ার জন্য আত্মশ্লাঘাবোধ অন্য কিছু হাতছাড়া করার সমতুল্য। যেমন বলা হয়, الاشتغال بالندم على الوقت الفائت تضييع للوقت الحاضر .
অর্থ: হাতছাড়া হয়ে যাওয়া সময়ের জন্য অনুতাপ-অনুশোচনায় লিপ্ত হওয়াও তো বর্তমান সময়কে নষ্ট করা।
📄 সময় সদ্ব্যবহার
الوقت كالسيف إن لم تقطعه قطعك .⁶
অর্থ: সময় হল তরবারির মত, তুমি যদি তাকে না কাট, তবে সে তোমাকে কেটে ফেলবে।
সময় (সত্তাগতভাবেই) সদা বহমান ও অপসৃয়মান। আর তার প্রতিটি মুহূর্ত বিদ্যুৎ চমকের মত; বর্তমানের আকাশে এই জ্বলে ওঠে, তারপর নিভে যায়; হারিয়ে যায় অতীতের অজানা ঠিকানায়। সুতরাং যদি কেউ সময়ের ব্যাপারে (অন্যভাষায়, তার নিজের ব্যাপারে) গাফেল থাকে তবে সময় তো আর তার জন্য থেমে থাকবে না, তা তো আপন গতিতে- নদী তরঙ্গের মত চলতেই থাকবে, ফলে তার লোকসান ও না পাওয়ার ফিরিস্তি দীর্ঘ থেকে দীর্ঘতর হয়ে চলবে এবং দুঃখ-বেদনা ও আফসোস-অনুশোচনা তীব্র থেকে তীব্রতর হতে থাকবে।
একটু ভেবে দেখ, যখন জীবনের প্রতিটি মুহূর্তের হিসাব নেয়া হবে আর এসব লোকসান ও না পাওয়ার পরিধি ও পরিমাণ সম্পর্কে সে অবগত হবে তখন তার কী অবস্থা হবে! সে তখন লোকসান পুষিয়ে নিতে চাইবে, আবার ফিরে আসার আবেদন জানাবে। কিন্তু সেখান থেকে ফিরে আসার বা অতীত লোকসান পুষিয়ে নেয়ার কোন উপায় থাকবে না। অতীতে ফিরে আসার কোন আবেদন-নিবেদনই তার গৃহীত হবে না।
আর এটাইতো স্বাভাবিক; গতকালটাকে কি তুমি আজকের নতুন দিনে ফিরে পাবে! বা ফিরে পাওয়ার আশা করতে পার!! আল্লাহ তা'আলার বাণী তো এরই প্রমাণ বহন করে:
وَقَالُوا آمَنَّا بِهِ وَأَنَّى لَهُمُ التَّنَاوُشُ مِنْ مَكَانٍ بَعِيدٍ
অর্থ: এবং তারা বলবে, আমরা তাতে ঈমান আনলাম। কিন্তু এত দূরবর্তী স্থান থেকে তারা এর নাগাল পাবে কীভাবে? (সূরা সা'বা: ৫২)
এই আয়াতে মূলত কাফেরদের পরকালীন অবস্থা সম্পর্কে আলোচনা করা হয়েছে যে, দুনিয়াতে তারা ঈমানের নাগাল পায়নি। কুফুরী থেকে তওবার সুযোগও তাদের হয়নি। অথচ দুনিয়াই হল এ দু'য়ের প্রকৃত স্থান। কিন্তু তারা এই সুযোগকে হাতছাড়া করেছে। দুনিয়ার হায়াতকে বেঈমানীতে খুইয়ে বসেছে। তবে আজ তারা দুনিয়া থেকে এত দূরের স্থানে, হাশরের ময়দানে-কীভাবে এর নাগাল পাবে?
ঠিক তেমনি যারা আজকের কাজে উদাসীন থেকে দিনটাকে খোয়াবে আগামীতে কিংবা কাল হাশরে কখনোই এ সময় তাদের কাছে ফিরে আসবে না, এর দেখা আর তারা পাবে না। কবি তো তা-ই বলেছেন ছন্দের মালা গেঁথে-
فيا حسرات ! ما إلى رد مثلها سبيل ، ولو رُدَّت لهان الخسر
অর্থ: হায় আফসোস! তার অনুরূপ তো আর ফিরিয়ে আনা যাবে না, যদি তার প্রত্যাবর্তন সম্ভব হতো, দুঃখ-যাতনা কিছুটা হলেও লাঘব হতো।
প্রতিটি মুহূর্ত খুব দ্রুত অতিবাহিত হয়; মেঘমালার চেয়েও দ্রুত। সে চলে যায়, ফিরে আসে না, কখনও আর তার দেখা মেলে না। যখন সে চলে যায় তার মধ্যকার সবকিছুকে নিয়েই যায়। কিন্তু ফিরে আসে শুধু এর পরিণাম ও পরিণতি।
সুতরাং হে বন্ধু! এবার তুমিই নির্ধারণ করে নাও, এই সময় থেকে তুমি কী পরিণাম চাও। আর এটা নির্ধারণ করে নিতে হবে সময় উপস্থিত থাকতেই। তার মূল্যায়নে যেমন সুফল আসবে তেমনি অবমূল্যায়নে আসবে কুফল। পরিণাম-ভাল কি মন্দ- ফিরে তা আসবেই, তা রোধের কোন ব্যবস্থা নেই। দেখ আল্লাহ কত সুন্দরভাবে এই বাস্তবতার চিত্র দু'টি আয়াতে তুলে ধরেছেন।
জান্নাতবাসী সৌভাগ্যবানদের বলা হবে-
كُلُوا وَاشْرَبُوا هَنِيئًا بِمَا أَسْلَفْتُمْ فِي الْأَيَّامِ الْخَالِيَةِ )
অর্থ: (তাদেরকে বলা হবে,) 'পানাহার কর তৃপ্তি সহকারে, তোমরা অতীতে যা করেছিলে তার বিনিময়ে।' (সূরা: হা'ক্বাহ: ২৪)
টিকাঃ
৬ ব্যাখ্যা: ইবন আবী জামরাহ র. তার 'বাহজাতুন নুফুস' নামক গ্রন্থে বলেন, একথার অর্থ হল, তুমি সময়কে কাজ দ্বারা কর্তন (অতিবাহিত) কর, যেন সে তোমাকে কাজের আশ্বাস দিয়ে নিষ্কর্মা ও নিঃশেষ করে দিতে না পারে। এছাড়া এ বাক্যের এ অর্থও করা যায়, যদি তুমি সময়কে কাজে লাগানো এবং সময় থেকে উপকৃত হওয়ার ব্যাপারে সজাগ না হও তাহলে তুমি হবে তরবারির আঘাতের সম্মুখীন ব্যক্তির ন্যায়। কেননা সে যদি তা থেকে আত্মরক্ষা এবং তা প্রতিহত করার জন্য সজাগ না হয় তাহলে তরবারির আঘাত তাকে শেষ করে দেবে। এ কারনেই জনৈক আরব কবি বলেন-
وكن صارماً كالوقت فالمقت في عسى . وخل لعل فهي أكبر علة
সময়ের ন্যায় অপ্রতিহত হও, আর আশ্বাস তো অপ্রিয় বিষয়, তাই করব করছি থেকে বেঁচে থাক, কেননা তা সবচেয়ে ভয়ানক ব্যাধি।
📄 সময় তরবারির ন্যায়
আর জাহান্নামী দুর্ভাগাদের বলা হবে,
ذَلِكُم بِمَا كُنتُمْ تَفْرَحُونَ فِي الْأَرْضِ بِغَيْرِ الْحَقِّ وَبِمَا كُنْتُمْ تَمْرَحُوْنَ )
অর্থ: এটা এ কারণে যে, তোমরা পৃথিবীতে অযথা উল্লাস করতে এবং এজন্য যে, তোমরা দম্ভ করতে। (সূরা গাফির: ৭৫)
আল্লামা ইবনুল কাইয়্যিম আরও বলেন, "সবচে' মূল্যবান ও কল্যাণকর ভাবনা হল আল্লাহ ও আখেরাতের ভাবনা। আল্লাহর জন্য ভাবনা অনেক প্রকার হতে পারে, যেমন ............ পঞ্চম প্রকার, প্রতিটি মুহূর্তে মানুষ নিজের দায়িত্ব ও কর্তব্য সম্পর্কে চিন্তা করা এবং তা পালনে মনোবল ও দৃঢ় ইচ্ছার সমন্বয় করা।
'আরেফ' তথা দূরদর্শী তো সেই যে তার সময়ের যথাযথ মূল্যায়ন করে। আর সময়কে নষ্ট করা মানে তো হল তার মধ্যকার সকল কল্যাণ হাতছাড়া করা। ছন্দের ভাষায়-
'ভাল ও কল্যাণ যত, সময় থেকেই সৃষ্ট। পায় না দেখা কভু তার, যে করে তা নষ্ট।'
ইমাম শাফেয়ী র. বলেন, দীর্ঘদিন আমি সুফি-সাধকদের সংস্পর্শে থেকেছি। এ সময়ে তাদের থেকে শুধু দু'টি বিষয়ই অর্জন করতে পেরেছি।
الوقت سيف فإن لم تقطعه قطعك .
অর্থ: সময় হল তরবারি; তুমি যদি তাকে না কাট, সে তোমাকে কেটে ফেলবে।
نفسك إن شغلتها بالحق وإلا شغلتك بالباطل .
অর্থ: তুমি যদি নিজেকে সত্য ও ন্যায় কর্মে ব্যস্ত না রাখ তাহলে সে তোমাকে অসৎ ও অন্যায় কাজে লিপ্ত করবে।
📄 সূর্যকে ধরে রাখ, আমি তোমার সাথে কথা বলি
যুহৃদ ও দুনিয়াবিমুখতায় প্রসিদ্ধ তাবেয়ী, আমের ইবন আবদে কায়ছ র.। একবার এক ব্যক্তি এসে তাঁকে বলল, আমাকে একটু সময় দিন; আমি কিছু কথা বলব। তিনি বললেন, তাহলে তুমি সূর্যকে থামিয়ে রাখ।'
তাঁর কথার মর্ম হল, তুমি যদি সূর্যের গতিকে রোধ করতে পার, সময়ের প্রবাহকে থামিয়ে দিতে পার তবেই আমি তোমার সাথে কথা বলব।