📄 দু’টি নি’আমাতের ক্ষেত্রে মানুষ প্রতারিত হয়
এতক্ষণ কোরআনের আলোকে সময় সম্পদের মূল্য ও গুরুত্ব নিয়ে আলোচনা করা হল এবং একথা বর্ণনা করা হল যে, সময় হল অন্যতম মৌলিক ও গুরুত্বপূর্ণ নিঅ'মাত। তবে হাদীছে এর বর্ণনা আরও স্পষ্ট, আরও উজ্জ্বল। যেমন, বুখারী, তিরমিযী ও ইবন মাজায় ইবন আব্বাস রা. থেকে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
نعمتان مغبون فيهما كثير من الناس : الصحة والفراغ -
দু'টি নিআ'মাতের ব্যাপারে বহু মানুষ প্রতারিত হয়, (সে দু'টি হল) সুস্থতা ও অবসর।
এর ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, হাদীছে غين শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে, যার অর্থ হল- ঠকা, প্রতারিত হওয়া। ক্রয়-বিক্রয়ের ক্ষেত্রে কোন জিনিস অধিক বা দ্বিগুণ দামে কিনলে অথবা ন্যায্য মূল্যের কমে বিক্রি করে ঠকলে এই শব্দটি ব্যবহার করা হয়। হাদীছে এই শব্দটি উপমারূপে ব্যবহৃত হয়েছে। অর্থাৎ, যে শারীরিকভাবে সুস্থ এবং বিশেষ কোন কর্মব্যস্ততা থেকে মুক্ত হওয়া সত্ত্বেও পরকালীন কল্যাণে তেমন কিছু করল না, বা করতে পারল না সেও ঠিক বেচা-কেনায় প্রতারিত ব্যক্তির মতই প্রতারিত হল। (ব্যাখ্যায় আরও বলা হয়েছে) বেশীরভাগ মানুষই (ব্যাধিমুক্ত ও কর্মশূন্য) সময়ের সদ্ব্যবহার করতে ও তা থেকে উপকৃত হতে পারে না; বরং তা অপাত্রে ব্যয় করে। ফলে তা শুভ না হয়ে অশুভ হয়ে যায়, নিঅ'মাত না হয়ে আপদ হয়ে দাঁড়ায়।
পক্ষান্তরে যারা এই সুযোগ ও নিঅ'মাতগুলোকে কাজে লাগাতে এবং সেগুলো নিংড়ে তার নির্যাস আস্বাদন করতে পারে তাদের জন্য তা মঙ্গলজনক ও কল্যাণকর হয়ে যায়।
ইবনুল জাওযী র. বলেন, কখনো মানুষ সুস্থ থাকে, কিন্তু অবসর থাকে না; জীবিকা নির্বাহে থাকে ব্যস্ত। আবার কখনো সে অবসর থাকে, কিন্তু সুস্থ থাকে না; অসুস্থতায় হয়ে পড়ে শয্যাশ্রিত। যদি কখনো তার মাঝে উভয়টি একত্র হয়, কিন্তু আল্লাহর আনুগত্যের ব্যাপারে অলসতা তার উপর প্রবল হয় তাহলে তাকে প্রতারিত ও প্রবঞ্চিত ছাড়া আর কী-ই-বা বলা হবে!
মোটকথা, দুনিয়া হল আখেরাতের শস্যক্ষেত্র ও ব্যবসাকেন্দ্র। এখানে যা আবাদ করা হবে তার ফসল আখেরাতে পাওয়া যাবে। এখানে যে ব্যবসা করা হবে তার লাভ অবশ্যই পরকালে ভোগ করা যাবে। সুতরাং যে সুস্থতা ও অবসরকে আল্লাহর আনুগত্য ও ইবাদত-বন্দেগীতে ব্যবহার করবে সে হবে ঈর্ষার পাত্র। আর যে ব্যক্তি তা ব্যবহার করবে আল্লাহর নাফরমানিতে সেই হল প্রতারিত। কেননা অবসরের পর ব্যস্ততা এবং সুস্থতার পর অসুস্থতা আসে। আর যদি অন্য কোন অসুস্থতা নাও দেখা দেয়, তবুও অবশেষে মৃত্যুসংবাদবাহী বার্ধক্য তো দেখা দেবেই। সুতরাং সময় থাকতেই সতর্ক হও- বন্ধু!
📄 শুধু আল্লাহর জন্য ব্যয়িত সময়টুকুই প্রকৃত জীবন
প্রকৃতপক্ষে জীবন তো খণ্ড খণ্ড সময়ের সমষ্টি বৈ কিছু নয়। সংক্ষেপে বলতে গেলে, 'সময়ই জীবন'। আর পরকালীন চিরস্থায়ী জীবনের মূলও এই সময়ই। হোক তা সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের জান্নাতী জীবন কিংবা দুঃখ-যাতনার জাহান্নামী জীবন।
সময়ের মূল্যায়ন করে ও আল্লাহর রাহে ব্যয় করে যেমন জান্নাত লাভের আশা করা যায়, তেমনি এর অবমূল্যায়ন ও অপাত্রে ব্যয়ের কারণে- আল্লাহ মাফ করুন- জাহান্নামের ফয়সালার আশঙ্কাও রয়ে যায়।
আর আল্লাহ তা'আলা তো মানুষকে সৃষ্টিই করেছেন তাঁর ইবাদাতের জন্য।
সুতরাং বলা যায়, যে সময়টুকু মানুষ আল্লাহর জন্য- তাঁর আদেশ পালনে ও নিষেধ থেকে নিজেকে দমনে ব্যয় করে তাই তার জীবন, তথা মানব জীবন বলে গণ্য হবে। আর বাকী সময়টা, যতই দীর্ঘ জীবন সে লাভ করুক না কেন- সেটা পশুত্বের জীবন। যদি কেউ তার সময় ও জীবনকে উদাসীনতা, প্রবৃত্তি পূজা ও কামনা-বাসনা চরিতার্থ করে কাটায় তবে বলা যায়- তার জীবনের ঐ সময়টুকুই সবচে' ভাল কাটল, যেটুকু সে ঘুমে ও কর্মহীনতায় কাটাল। এ ধরনের মানুষের জন্য জীবনের চেয়ে মৃত্যুই শ্রেয়।
বিষয়াট বোঝার স্বাথে একাট উদাহরণ পেশ করা যায়, যখন কোন বান্দা নামাযে দাঁড়ায় তখন নামাযের ঐ অংশটুকুই তার উপকারে আসে যেটুকু সে সজ্ঞানে আদায় করে। আর সেটুকুই নামায বলে বিবেচিত হয়।
তবে কি আমরা নির্দ্বিধায় বলতে পারি না, যে সময়টা মানুষ আল্লাহর রাহে, তাঁর ইবাদত-বন্দেগীতে ও তাঁর সন্তুষ্টি অর্জনে অতিবাহিত করে সে অংশটুকুই প্রকৃত জীবন; সেটাই তার যথার্থ আয়ুষ্কাল!
তাই আমাদের পূর্বসূরীগণ এবং তাদের সার্থক উত্তরসূরীগণ সময় সংরক্ষণ এবং পুণ্য ও ভাল কাজে তা আতিবাহিত করণে অত্যন্ত আগ্রহী; বরং বলা ভাল, মরণপণ চেষ্টায় রত ছিলেন। এক্ষেত্রে আলেম ও আবেদের মাঝে কোন পার্থক্য ছিল না। প্রতিটি ঘণ্টা ও মিনিট সংরক্ষণে তাঁরা প্রতিযোগিতামূলকভাবে কাজ করে যেতেন। প্রতিটি মুহূর্তকে কাজে লাগাতে তারা যেন ছুটে চলতেন। জীবনের প্রতি মমতা ও সময়ের ব্যাপারে 'কৃপণতার' কারণে সর্বদা তারা সজাগ-সতর্ক থাকতেন, যেন একটি মুহূর্তও অনর্থক হাতছাড়া না হয়ে যায়।