📄 জীবনকাল বরবাদ করার কারণে কাফিরদের আল্লাহকর্তৃক ভর্ৎসনা
কুফুরিতে লিপ্ত হয়ে কাফেররা যখন নিজেদের জীবনকালকে বরবাদ করলো, আল্লাহ প্রদত্ত সময়-সম্পদকে আল্লাহর নাফরমানিতে নষ্ট করল, দীর্ঘ জীবন পাওয়া সত্ত্বেও কুফর ত্যাগ করে ঈমান গ্রহণ করলো না, তখন আল্লাহ তাদেরকে তিরস্কারমূলক সম্বোধন করে বলেন:
أَوَلَمْ نُعَمِّرْكُمْ مَّا يَتَذَكَّرُ فِيْهِ مَنْ تَذَكَّرَ وَجَاءَكُمُ النَّذِيرُ ، فَذُوقُوا فَمَا لِلظَّالِمِينَ مِنْ نَصِيرٍ
আমি কি তোমাদেরকে এতটা দীর্ঘ জীবন দান করিনি যে, তখন কেউ সতর্ক হতে চাইলে সতর্ক হতে পারত? আর তোমাদের কাছে তো সতর্ককারী এসেছিল। সুতরাং শাস্তির স্বাদ গ্রহণ কর; আর যালিমদের কোন সাহায্যকারী নেই। -(সূরা ফাতির: ৩৭)
চিন্তা-ভাবনা করা, উপদেশ গ্রহণ করা, ঈমান আনা ও সতর্ক হওয়ার জন্য 'তা'মীর' তথা দীর্ঘজীবন দানের কথাই আল্লাহ তা'আলা উল্লেখ করেছেন। আর মানুষের বয়স তথা জীবন-কালকে মানুষের বিরুদ্ধে প্রমাণস্বরূপ উপস্থাপন করেছেন। যেমনিভাবে নবী ও সতর্ককারীগণের আগমনকে প্রমাণস্বরূপ পেশ করেছেন।
কাতাদাহ র. বলেন: اعلموا أن طول العمر حُجَّة، فنعوذ بالله أن نُعَيَّرَ بطول العمر জেনে রাখ, দীর্ঘ জীবন কিন্তু (আমাদের বিরুদ্ধে) প্রমাণ। সুতরাং এমন দীর্ঘ জীবন থেকে আমরা আল্লাহর আশ্রয় গ্রহণ করছি, যার কারণে আমাদেরকে লাঞ্ছিত হতে হয়। তাইতো রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, (হযরত আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত)
(1) أعذر الله عز وجل إلى امرء أخر عمرة حتى بلغه ستين سنة -
(২) مَنْ عمره الله ستين سنة فقد أعذر إليه في عمره -
(১) যার জীবনকালকে আল্লাহ ষাট বছর দীর্ঘায়িত করেছেন তার জন্য তিনি অজুহাত পেশ করার পথ রুদ্ধ করে দিয়েছেন। (অর্থাৎ তাকে পূর্ণ হিসাব-নিকাশের সম্মুখীন হতে হবে।)
(২) যাকে আল্লাহ ষাট বছরের দীর্ঘ জীবন দান করেছেন, জীবনকাল ব্যাপ্তির ক্ষেত্রে তার অজুহাত পেশ করার পথ রুদ্ধ করে দিয়েছেন।
টিকাঃ
* সহীহ বুখারী: ১১: ২৩৮
* মুসনাদে আহমদ: ২: ৪১৭।
📄 আল্লাহ কর্তৃক সময়ের বিভিন্ন স্তরের শপথ
পূর্বোল্লিখিত আয়াতগুলো ছাড়াও কুরআনে বিরাট এই নি'মাত সম্পর্কে আরও বহু আয়াত রয়েছে। এমনকি আল্লাহ তা'আলা সময়ের গুরুত্ব ও তাৎপর্য বুঝাতে গিয়ে বহু সংখ্যক আয়াতে সময়ের বিভিন্ন স্তরের শপথ করেছেন। রাত-দিন, পূর্বাহ্ন-অপরাহ্ন, প্রভাত ও গোধুলিকালের শপথ কোরআনের বিভিন্ন জায়গায় এসেছে। যথা:
وَاللَّيْلِ إِذَا يَغْشَى وَالنَّهَارِ إِذَا تَجَلَّى
শপথ রাতের, যখন তা আচ্ছন্ন করে। শপথ দিনের, যখন তা উদ্ভাসিত হয়। (সূরা লাইল: ১,২)
وَاللَّيْلِ إِذْ أَدْبَر 3 وَالصُّبْحِ إِذَا أَسْفَرَه
শপথ রাতের, যখন তার অবসান হয়। শপথ দিনের যখন তা আলোকোজ্জ্বল হয়। (সূরা মুদ্দাছছির ৩৩, ৩৪)
فَلَا أُقْسِمُ بِالشَّفَقِ ، وَاللَّيْلِ وَمَا وَسَقَ )
আমি শপথ করি অস্তরাগের ও রাতের এবং তাতে যার সমাবেশ ঘটে তার। (সূরা ইনশিকাক: ১৬, ১৭)
وَالْفَجْرِ وَلَيَالٍ عَشْرٍ .
শপথ ঊষার। শপথ দশ রাতের। (সূরা ফাজর: ১,২)
وَالضُّحى ، وَاللَّيْلِ إِذَا سَجُى .
শপথ পূর্বাহ্নের। শপথ রাতের, যখন তা হয় নিঝুম। (সূরা দুহা: ১,২)
وَالْعَصْرِ إِنَّ الْإِنْسَانَ لَفِي خُسْرٍ
মহাকালের শপথ, মানুষ অবশ্যই ক্ষতিগ্রস্ত। (সূরা আসর: ১-২)
বিশিষ্ট তাফসীরবিদ ইমাম ফখরুদ্দীন রাযী র. তাঁর তাফসীর গ্রন্থে সূরা আসর এর ব্যাখ্যায় যা লিখেছেন, তার সারসংক্ষেপ নিম্নরূপ: "আল্লাহ তা'আলা সময়ের শপথ করেছেন, কারণ সময়ের মাঝেই আবর্তিত হয় ও অস্তিত্ব লাভ করে সকল বিস্ময়কর বিষয়। কেননা দুনিয়ার সবকিছু এবং সকল বিষয় এই সময়ের পরিধিতেই পরিবেষ্টিত। মানুষের সুখ-স্বাচ্ছন্দ্য, দুঃখ-দুর্দশা, সুস্থতা-অসুস্থতা, ধন-ঐশ্বর্য ও অভাব-দারিদ্র সবকিছুর প্রকাশ তো এই সময়ের মাঝেই হয়। তাছাড়া পৃথিবীর কোন কিছুই সময়ের মত মূল্যবান নয়।
ভেবে দেখ, যদি তুমি হাজার বছরও অনর্থক কাজে নষ্ট করে থাক আর জীবনের শেষ মুহূর্তে তাওবা করে বাকী সময় তাতে অবিচল থাকতে পার, তবে অনন্তকালের জন্য তুমি জান্নাতের বাসিন্দা হয়ে গেলে। তাহলে তো তুমি বুঝতে পারলে, ঐ সময়টুকুর জীবনকালই তোমার জীবনে সবচে' মূল্যবান।
বস্তুত সময় হল আল্লাহপ্রদত্ত অন্যতম মৌলিক নিঅ'মাত। তাইতো আল্লাহ তা'আলা সময়ের শপথ করেছেন এবং এ বিষয়ে সতর্ক করেছেন যে, দিন এবং রাত হল মূল্যবান সুযোগ, বুঝে ও না-বুঝে মানুষ যা বরবাদ করে। তাছাড়া সার্বিক বিবেচনায় সময় তো স্থানের চেয়ে মর্যাদাসম্পন্ন, তাই তিনি সময়ের শপথ করেছেন। কেননা সময় হল খাঁটি নিঅ'মাত, যাতে কোন খুঁত বা ত্রুটি নেই। ক্ষতিগ্রস্ত ও ত্রুটিযুক্ত হল মানুষ।"
টিকাঃ
* কোন কোন মতে وَالْعَصْرِ অর্থ আসর নামাযের সময়ের শপথ।
📄 দু’টি নি’আমাতের ক্ষেত্রে মানুষ প্রতারিত হয়
এতক্ষণ কোরআনের আলোকে সময় সম্পদের মূল্য ও গুরুত্ব নিয়ে আলোচনা করা হল এবং একথা বর্ণনা করা হল যে, সময় হল অন্যতম মৌলিক ও গুরুত্বপূর্ণ নিঅ'মাত। তবে হাদীছে এর বর্ণনা আরও স্পষ্ট, আরও উজ্জ্বল। যেমন, বুখারী, তিরমিযী ও ইবন মাজায় ইবন আব্বাস রা. থেকে বর্ণিত আছে যে, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেন,
نعمتان مغبون فيهما كثير من الناس : الصحة والفراغ -
দু'টি নিআ'মাতের ব্যাপারে বহু মানুষ প্রতারিত হয়, (সে দু'টি হল) সুস্থতা ও অবসর।
এর ব্যাখ্যায় বলা হয়েছে, হাদীছে غين শব্দটি ব্যবহার করা হয়েছে, যার অর্থ হল- ঠকা, প্রতারিত হওয়া। ক্রয়-বিক্রয়ের ক্ষেত্রে কোন জিনিস অধিক বা দ্বিগুণ দামে কিনলে অথবা ন্যায্য মূল্যের কমে বিক্রি করে ঠকলে এই শব্দটি ব্যবহার করা হয়। হাদীছে এই শব্দটি উপমারূপে ব্যবহৃত হয়েছে। অর্থাৎ, যে শারীরিকভাবে সুস্থ এবং বিশেষ কোন কর্মব্যস্ততা থেকে মুক্ত হওয়া সত্ত্বেও পরকালীন কল্যাণে তেমন কিছু করল না, বা করতে পারল না সেও ঠিক বেচা-কেনায় প্রতারিত ব্যক্তির মতই প্রতারিত হল। (ব্যাখ্যায় আরও বলা হয়েছে) বেশীরভাগ মানুষই (ব্যাধিমুক্ত ও কর্মশূন্য) সময়ের সদ্ব্যবহার করতে ও তা থেকে উপকৃত হতে পারে না; বরং তা অপাত্রে ব্যয় করে। ফলে তা শুভ না হয়ে অশুভ হয়ে যায়, নিঅ'মাত না হয়ে আপদ হয়ে দাঁড়ায়।
পক্ষান্তরে যারা এই সুযোগ ও নিঅ'মাতগুলোকে কাজে লাগাতে এবং সেগুলো নিংড়ে তার নির্যাস আস্বাদন করতে পারে তাদের জন্য তা মঙ্গলজনক ও কল্যাণকর হয়ে যায়।
ইবনুল জাওযী র. বলেন, কখনো মানুষ সুস্থ থাকে, কিন্তু অবসর থাকে না; জীবিকা নির্বাহে থাকে ব্যস্ত। আবার কখনো সে অবসর থাকে, কিন্তু সুস্থ থাকে না; অসুস্থতায় হয়ে পড়ে শয্যাশ্রিত। যদি কখনো তার মাঝে উভয়টি একত্র হয়, কিন্তু আল্লাহর আনুগত্যের ব্যাপারে অলসতা তার উপর প্রবল হয় তাহলে তাকে প্রতারিত ও প্রবঞ্চিত ছাড়া আর কী-ই-বা বলা হবে!
মোটকথা, দুনিয়া হল আখেরাতের শস্যক্ষেত্র ও ব্যবসাকেন্দ্র। এখানে যা আবাদ করা হবে তার ফসল আখেরাতে পাওয়া যাবে। এখানে যে ব্যবসা করা হবে তার লাভ অবশ্যই পরকালে ভোগ করা যাবে। সুতরাং যে সুস্থতা ও অবসরকে আল্লাহর আনুগত্য ও ইবাদত-বন্দেগীতে ব্যবহার করবে সে হবে ঈর্ষার পাত্র। আর যে ব্যক্তি তা ব্যবহার করবে আল্লাহর নাফরমানিতে সেই হল প্রতারিত। কেননা অবসরের পর ব্যস্ততা এবং সুস্থতার পর অসুস্থতা আসে। আর যদি অন্য কোন অসুস্থতা নাও দেখা দেয়, তবুও অবশেষে মৃত্যুসংবাদবাহী বার্ধক্য তো দেখা দেবেই। সুতরাং সময় থাকতেই সতর্ক হও- বন্ধু!
📄 শুধু আল্লাহর জন্য ব্যয়িত সময়টুকুই প্রকৃত জীবন
প্রকৃতপক্ষে জীবন তো খণ্ড খণ্ড সময়ের সমষ্টি বৈ কিছু নয়। সংক্ষেপে বলতে গেলে, 'সময়ই জীবন'। আর পরকালীন চিরস্থায়ী জীবনের মূলও এই সময়ই। হোক তা সুখ-স্বাচ্ছন্দ্যের জান্নাতী জীবন কিংবা দুঃখ-যাতনার জাহান্নামী জীবন।
সময়ের মূল্যায়ন করে ও আল্লাহর রাহে ব্যয় করে যেমন জান্নাত লাভের আশা করা যায়, তেমনি এর অবমূল্যায়ন ও অপাত্রে ব্যয়ের কারণে- আল্লাহ মাফ করুন- জাহান্নামের ফয়সালার আশঙ্কাও রয়ে যায়।
আর আল্লাহ তা'আলা তো মানুষকে সৃষ্টিই করেছেন তাঁর ইবাদাতের জন্য।
সুতরাং বলা যায়, যে সময়টুকু মানুষ আল্লাহর জন্য- তাঁর আদেশ পালনে ও নিষেধ থেকে নিজেকে দমনে ব্যয় করে তাই তার জীবন, তথা মানব জীবন বলে গণ্য হবে। আর বাকী সময়টা, যতই দীর্ঘ জীবন সে লাভ করুক না কেন- সেটা পশুত্বের জীবন। যদি কেউ তার সময় ও জীবনকে উদাসীনতা, প্রবৃত্তি পূজা ও কামনা-বাসনা চরিতার্থ করে কাটায় তবে বলা যায়- তার জীবনের ঐ সময়টুকুই সবচে' ভাল কাটল, যেটুকু সে ঘুমে ও কর্মহীনতায় কাটাল। এ ধরনের মানুষের জন্য জীবনের চেয়ে মৃত্যুই শ্রেয়।
বিষয়াট বোঝার স্বাথে একাট উদাহরণ পেশ করা যায়, যখন কোন বান্দা নামাযে দাঁড়ায় তখন নামাযের ঐ অংশটুকুই তার উপকারে আসে যেটুকু সে সজ্ঞানে আদায় করে। আর সেটুকুই নামায বলে বিবেচিত হয়।
তবে কি আমরা নির্দ্বিধায় বলতে পারি না, যে সময়টা মানুষ আল্লাহর রাহে, তাঁর ইবাদত-বন্দেগীতে ও তাঁর সন্তুষ্টি অর্জনে অতিবাহিত করে সে অংশটুকুই প্রকৃত জীবন; সেটাই তার যথার্থ আয়ুষ্কাল!
তাই আমাদের পূর্বসূরীগণ এবং তাদের সার্থক উত্তরসূরীগণ সময় সংরক্ষণ এবং পুণ্য ও ভাল কাজে তা আতিবাহিত করণে অত্যন্ত আগ্রহী; বরং বলা ভাল, মরণপণ চেষ্টায় রত ছিলেন। এক্ষেত্রে আলেম ও আবেদের মাঝে কোন পার্থক্য ছিল না। প্রতিটি ঘণ্টা ও মিনিট সংরক্ষণে তাঁরা প্রতিযোগিতামূলকভাবে কাজ করে যেতেন। প্রতিটি মুহূর্তকে কাজে লাগাতে তারা যেন ছুটে চলতেন। জীবনের প্রতি মমতা ও সময়ের ব্যাপারে 'কৃপণতার' কারণে সর্বদা তারা সজাগ-সতর্ক থাকতেন, যেন একটি মুহূর্তও অনর্থক হাতছাড়া না হয়ে যায়।