📘 সময়ের মূল্য বুঝতেন যারা > 📄 সময়ের মূল্য

📄 সময়ের মূল্য


'সময়ের মূল্য' দু'টিমাত্র শব্দের ছোট্ট এই শিরোনাম। কিন্তু তাতে রয়েছে যেমন অর্থবহতা তেমনি বহুমাত্রিকতা। ফলে এ সম্পর্কিত আলোচনাতেও রয়েছে নানা বৈচিত্র ও বহুমুখিতা।
একজন দার্শনিকের কাছে সময়ের মূল্য যেরূপ একজন ব্যবসায়ীর কাছে তা সেরূপ নয়। একইভাবে একজন কৃষক, একজন কারিগর, একজন সৈনিক, একজন রাজনীতিবিদ, একজন যুবক, একজন বৃদ্ধ প্রত্যেকের কাছেই সময়ের মূল্য এবং প্রকৃতি ভিন্ন। তদ্রূপ একজন তালিবে ইলম ও আলিমের কাছে এর প্রকৃতি আরও ভিন্ন ও স্বতন্ত্র।
এই গ্রন্থে আমি শুধু আলিম ও তালিবে ইলমের কাছে 'সময়ের মূল্য' সম্পর্কে আলোচনা করেছি। আর আমি তা করেছি এই প্রত্যাশায় যে, এই গ্রন্থখানি আমাদের তরুণ প্রত্যয়ী তালিবে ইলমদের মনোবল উজ্জীবিত করবে। কেননা আজকাল তালিবে ইলমদের মনোবল নিস্তেজ হয়ে পড়েছে এবং অধ্যবসায়ীদের কাঙ্ক্ষিত লক্ষস্থল সুদূর পরাহত হয়ে পড়েছে। আর প্রকৃত জ্ঞানপিপাসু শিক্ষার্থীদের অস্তিত্ব বিরল হয়ে পড়েছে। ফলে মেধা ও প্রতিভার অপমৃত্যু ঘটেছে, অলসতা ও নিষ্প্রভতার প্রসার ঘটেছে। যার দরুন আহলে ইলমের কর্মকাণ্ডে দুর্বলতা ও পশ্চাদমুখিতা প্রকাশ পেতে শুরু করেছে।
সুতরাং আমি বলব, বান্দার প্রতি আল্লাহ তা'আলার নি'আমাত অগণিত, অফুরন্ত। তার আধিক্যের যথার্থ অনুভব ও সঠিক উপলব্ধি মানুষের সাধ্যাতীত বিষয়। তার কারণ হল, এসকল নি'আমতের আধিক্য, অব্যাহততা, সহজলভ্যতা এবং মহান আল্লাহ কর্তৃক বান্দার প্রতি অনুগ্রহের নিরবচ্ছিন্নতা এবং সে বিষয়ে মানুষের উপলব্ধির তারতম্য। আর মহান আল্লাহ যথার্থই বলেছেন-
وَإِنْ تَعُدُّوا نِعْمَتَ اللَّهِ لَا تُحْصُوهَا إِنَّ الْإِنْسَانَ لَظَلُومٌ كَفَّارُ
তোমরা আল্লাহর অনুগ্রহ গণনা করলে তার সংখ্যা নির্ণয় করতে পারবে না। মানুষ অবশ্যই অতিমাত্রায় যালিম, অকৃতজ্ঞ। (সূরা ইবরাহীম: ৩৪)

📘 সময়ের মূল্য বুঝতেন যারা > 📄 নিম্ন’মাতের প্রকারভেদ

📄 নিম্ন’মাতের প্রকারভেদ


আল্লাহ প্রদত্ত নিআ'মাত (প্রধানত) দু'ভাগে বিভক্ত। (১) মূল, (২) শাখাগত। শাখা নিআ'মাতের দৃষ্টান্ত হল- জ্ঞান, দেহকাঠামো এবং অর্থসম্পদে ব্যাপ্তি ও সমৃদ্ধি। আর সুন্নত ও নফল ইবাদতসমূহের পাবন্দি। যেমন তাহাজ্জুদ, তিলাওয়াত, যিকির। আর দেহের বিভিন্ন অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে ফিতরাতের সুন্নত এবং বিভিন্ন আমলী সুন্নত, যেমন পুরুষদের জন্য সুগন্ধি ব্যবহার, সাক্ষাতকালে মুসাফাহা-করমর্দন, ডানপায়ে মসজিদে প্রবেশ করা, বামপায়ে বের হওয়া, চলার পথ থেকে কষ্টদায়ক বস্তু অপসারণ এবং এ জাতীয় বিভিন্ন সুন্নত, মুসতাহাব ও কতক ওয়াজিব বিষয়ের পাবন্দি। কেননা এসবই হল নিঅ'মাতের শাখা-প্রশাখা। আর নিঃসন্দেহে সেগুলি গুরুত্বপূর্ণ শাখা-প্রশাখা।
আর মৌলিক নিঅ'মাতও অগণিত ও অসীম। সেগুলোর প্রধানতম হল, আল্লাহর প্রতি ও তাঁর পক্ষ থেকে আগত সবকিছুর প্রতি ঈমান এবং এসবের চাহিদানুযায়ী তিনি যা-যা নির্দেশ দিয়েছেন সেসবের উপর আমলের তাওফীক প্রাপ্তি।
তদ্রূপ সুস্থতা, রোগমুক্তি ও সুস্বাস্থ্যও অন্যতম মৌলিক নিঅ'মাত, যার কল্যাণে দৃষ্টিশক্তি, শ্রবণশক্তি, হৃদযন্ত্র এবং যাবতীয় অঙ্গ-প্রত্যঙ্গ নিরাপদ ও কর্মক্ষম থাকে। আর তা (সুস্থতা ও সুস্বাস্থ্য) তো মানুষের সক্রিয়তা ও কর্মক্ষমতার অক্ষকেন্দ্র এবং নিজ অস্তিত্ব থেকে উপকৃত হওয়ার ভিত্তি-দণ্ড।
তদ্রূপ ইলমের নিআ'মাতও অন্যতম মৌলিক নিঅ'মাত। কেননা তার উপর নির্ভরশীল মানবতার উন্নতি এবং তার দুনিয়া-আখিরাতের সুখ-সমৃদ্ধি।
যে কোন বিবেচনায় ইলম নিঃসন্দেহে বিরাট নিঅ'মাত। তা অর্জন করা যেমন নিঅ'মাত, তেমনি তা দ্বারা নিজে উপকৃত হওয়া এবং অন্যের উপকার করাও নিঅ'মাত। ভবিষ্যৎ প্রজন্মের কাছে ইলম পৌঁছে দেয়া এবং মানুষের মাঝে তার প্রসার ঘটানোও নি'মাত।
এ ছাড়াও মৌলিক নিঅ'মাতের অনেক উদাহরণ রয়েছে। সময়ের মূল্যের প্রতি লক্ষ করে আমি তার আলোচনা প্রলম্বিত করছি না।

📘 সময়ের মূল্য বুঝতেন যারা > 📄 অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মৌলিক নিম্ন’মাত

📄 অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মৌলিক নিম্ন’মাত


মানব জীবনে অন্যতম, মৌলিক ও গুরুত্বপূর্ণ নিঅ'মাত হল সময়ের নিঅ'মাত। এমনকি তার সকল কর্মকাণ্ডের কেন্দ্রবিন্দু হল এই সময়; যার মূল্য সম্পর্কে আলোচনার জন্য আমি গ্রন্থটি সংকলন করেছি। বিশেষতঃ আলিম ও তালিবে ইলমদের উদ্দেশ্যে।
সময় হল মানব অস্তিত্বের ক্ষেত্র ও জীবনের মূলধন। সময় হল মানুষের অস্তিত্ব ও জীবন ধারণ এবং উপকার প্রদান ও উপকার গ্রহণের প্রাঙ্গণ।
কুরআন করীম এই মৌলিক নিঅ'মাতের বিরাটত্বের প্রতি ইঙ্গিত করেছে এবং অন্যান্য নিঅ'মাতের উপর তার শ্রেষ্ঠত্বের প্রতিও দৃষ্টি আকর্ষণ করেছে। ফলে কুরআনের বহুসংখ্যক আয়াত এসেছে সময়ের মূল্য এবং তার সমুন্নত মর্যাদা ও বিরাট প্রভাবের প্রতি নির্দেশনা প্রদান করে। বান্দাদের প্রতি এই বিরাট নিঅ'মাতের কথা উল্লেখ করে আল্লাহ তা'আলা বলেন,
اللَّهُ الَّذِي خَلَقَ السَّمُوتِ وَالأَرْضَ وَأَنْزَلَ مِنَ السَّمَاءِ مَاءً فَأَخْرَجَ بِهِ مِنَ الثَّمَرَاتِ رِزْقًا لَكُمْ وَسَخَّرَ لَكُمُ الْفُلْكَ لِتَجْرِيَ فِي الْبَحْرِ بِأَمْرِهِ وَسَخَّرَ لَكُمُ الْأَنْهَارَ وَسَخَّرَ لَكُمُ الشَّمْسَ وَالْقَمَرَ دَائِبَيْنِ وَسَخَّرَ لَكُمُ اللَّيْلَ وَالنَّهَارَ وَآتَاكُمْ مِّنْ كُلِّ مَا سَأَلْتُمُوهُ وَإِنْ تَعُدُّوا نِعْمَتَ اللَّهِ لَا تُحْصُوهَا إِنَّ الْإِنْسَانَ لَظَلُومٌ كَفَّارُ
তিনিই আল্লাহ, যিনি আকাশসমূহ ও পৃথিবী সৃষ্টি করেছেন। যিনি আকাশ হতে পানি বর্ষণ করে তা দ্বারা তোমাদের জীবিকার জন্য ফলমূল উৎপাদন করেছেন। যিনি নৌযানকে তোমাদের অধীন করে দিয়েছেন যাতে তাঁর নির্দেশে তা সমুদ্রে বিচরণ করে এবং যিনি তোমাদের কল্যাণে নিয়োজিত করেছেন নদীসমূহকে। তিনি তোমাদের কল্যাণে নিয়োজিত করেছেন সূর্য ও চন্দ্রকে, যারা অবিরাম একই নিয়মের অনুবর্তী এবং তোমাদের কল্যাণে নিয়োজিত করেছেন রাত ও দিনকে। এবং তিনি তোমাদেরকে দিয়েছেন তোমরা তাঁর কাছে যা কিছু চেয়েছ তা থেকে। তোমরা আল্লাহর অনুগ্রহ গণনা করলে তার সংখ্যা নির্ণয় করতে পারবে না। মানুষ অবশ্যই অতিমাত্রায় যালিম, অকৃতজ্ঞ। -সূরা ইবরাহীম: ৩২-৩৪
দেখ, আল্লাহ তা'আলা তাঁর বড় বড় নিঅ'মাতের সাথে রাত-দিনের কথা উল্লেখ করেছেন। আর সে দু'টিতো সময়ই-যার মূল্য সম্পর্কে এই কিতাবে আলোচনা চলছে। এই বিশ্বজগত- তার সূচনার শুরু থেকে সমাপ্তির শেষ পর্যন্ত- যাকে সঙ্গী করে চলছে ও চলবে।
তেমনিভাবে আল্লাহ তা'আলা এই মহা অনুগ্রহ 'সময়-সম্পদের' মূল্য বুঝাতে গিয়ে বহু আয়াতে এর উল্লেখ করেছেন। যেমন:
وَسَخَّرَ لَكُمُ اللَّيْلَ وَالنَّهَارَ وَالشَّمْسَ وَالْقَمَرَ وَالنُّجُومُ مُسَخَّرَاتٌ بِأَمْرِهِ إِنَّ فِي ذَلِكَ لَآيَاتٍ لِقَوْمٍ يَعْقِلُونَ
তিনিই তোমাদের কল্যাণে নিয়োজিত করেছেন রাত, দিন, সূর্য এবং চন্দ্রকে; আর নক্ষত্ররাজিও অধীন হয়েছে তাঁরই নির্দেশে। অবশ্যই এতে বোধশক্তি সম্পন্ন সম্প্রদায়ের জন্য রয়েছে নিশ্চিত নিদর্শন। -সূরা নাহল: ১২
وَجَعَلْنَا اللَّيْلَ وَالنَّهَارَ آيَتَيْنِ فَمَحَوْنَا آيَةَ اللَّيْلِ وَجَعَلْنَا آيَةَ النَّهَارِ مُبْصِرَةً لِتَبْتَغُوا فَضْلاً مِّنْ رَّبِّكُمْ وَلِتَعْلَمُوا عَدَدَ السِّنِينَ وَالْحِسَابَ وَكُلَّ شَيْءٍ فَصَّلْنَاهُ تَفْصِيلاً .
আমি রাত ও দিনকে করেছি দু'টো নিদর্শন। আর রাতের নিদর্শনকে অপসারিত করেছি এবং দিনের নিদর্শনকে আলোকপ্রদ করেছি, যাতে তোমরা তোমাদের প্রতিপালকের অনুগ্রহ সন্ধান করতে পার এবং যাতে তোমরা বর্ষ-সংখ্যা ও হিসাব জানতে পার; আর আমি সবকিছু বিশদভাবে বর্ণনা করেছি। -সূরা বানী ইসরাঈল: ১২
وَمِنْ آيَاتِهِ اللَّيْلُ وَالنَّهَارُ وَالشَّمْسَ وَالْقَمَرُ لَا تَسْجُدُوا لِلشَّمْسِ وَلَا لِلْقَمَرِ وَاسْجُدُوا لِلَّهِ الَّذِي خَلَقَهُنَّ إِنْ كُنْتُمْ إِيَّاهُ تَعْبُدُونَ
তার নিদর্শনসমূহের মধ্যে রয়েছে দিন-রাত ও চন্দ্র-সূর্য। তোমরা সূর্যকে সেজদা করো না, চন্দ্রকেও না, সেজদা কর আল্লাহকে, যিনি এগুলো সৃষ্টি করেছেন, যদি তোমরা (প্রকৃতই নিষ্ঠার সাথে) শুধু তাঁরই ইবাদত কর। -সূরা হা-মীম সেজদা: ৩৭

📘 সময়ের মূল্য বুঝতেন যারা > 📄 জীবনকাল বরবাদ করার কারণে কাফিরদের আল্লাহকর্তৃক ভর্ৎসনা

📄 জীবনকাল বরবাদ করার কারণে কাফিরদের আল্লাহকর্তৃক ভর্ৎসনা


কুফুরিতে লিপ্ত হয়ে কাফেররা যখন নিজেদের জীবনকালকে বরবাদ করলো, আল্লাহ প্রদত্ত সময়-সম্পদকে আল্লাহর নাফরমানিতে নষ্ট করল, দীর্ঘ জীবন পাওয়া সত্ত্বেও কুফর ত্যাগ করে ঈমান গ্রহণ করলো না, তখন আল্লাহ তাদেরকে তিরস্কারমূলক সম্বোধন করে বলেন:
أَوَلَمْ نُعَمِّرْكُمْ مَّا يَتَذَكَّرُ فِيْهِ مَنْ تَذَكَّرَ وَجَاءَكُمُ النَّذِيرُ ، فَذُوقُوا فَمَا لِلظَّالِمِينَ مِنْ نَصِيرٍ
আমি কি তোমাদেরকে এতটা দীর্ঘ জীবন দান করিনি যে, তখন কেউ সতর্ক হতে চাইলে সতর্ক হতে পারত? আর তোমাদের কাছে তো সতর্ককারী এসেছিল। সুতরাং শাস্তির স্বাদ গ্রহণ কর; আর যালিমদের কোন সাহায্যকারী নেই। -(সূরা ফাতির: ৩৭)
চিন্তা-ভাবনা করা, উপদেশ গ্রহণ করা, ঈমান আনা ও সতর্ক হওয়ার জন্য 'তা'মীর' তথা দীর্ঘজীবন দানের কথাই আল্লাহ তা'আলা উল্লেখ করেছেন। আর মানুষের বয়স তথা জীবন-কালকে মানুষের বিরুদ্ধে প্রমাণস্বরূপ উপস্থাপন করেছেন। যেমনিভাবে নবী ও সতর্ককারীগণের আগমনকে প্রমাণস্বরূপ পেশ করেছেন।
কাতাদাহ র. বলেন: اعلموا أن طول العمر حُجَّة، فنعوذ بالله أن نُعَيَّرَ بطول العمر জেনে রাখ, দীর্ঘ জীবন কিন্তু (আমাদের বিরুদ্ধে) প্রমাণ। সুতরাং এমন দীর্ঘ জীবন থেকে আমরা আল্লাহর আশ্রয় গ্রহণ করছি, যার কারণে আমাদেরকে লাঞ্ছিত হতে হয়। তাইতো রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বলেছেন, (হযরত আবু হুরায়রা রা. থেকে বর্ণিত)
(1) أعذر الله عز وجل إلى امرء أخر عمرة حتى بلغه ستين سنة -
(২) مَنْ عمره الله ستين سنة فقد أعذر إليه في عمره -
(১) যার জীবনকালকে আল্লাহ ষাট বছর দীর্ঘায়িত করেছেন তার জন্য তিনি অজুহাত পেশ করার পথ রুদ্ধ করে দিয়েছেন। (অর্থাৎ তাকে পূর্ণ হিসাব-নিকাশের সম্মুখীন হতে হবে।)
(২) যাকে আল্লাহ ষাট বছরের দীর্ঘ জীবন দান করেছেন, জীবনকাল ব্যাপ্তির ক্ষেত্রে তার অজুহাত পেশ করার পথ রুদ্ধ করে দিয়েছেন।

টিকাঃ
* সহীহ বুখারী: ১১: ২৩৮
* মুসনাদে আহমদ: ২: ৪১৭।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00