📘 সময় কখনো ফিরে আসে না > 📄 সময় কখনো ফিরে আসে না, সময়ের কোনো বিনিময় হয় না

📄 সময় কখনো ফিরে আসে না, সময়ের কোনো বিনিময় হয় না


প্রতিটি মুহূর্ত চলে যায়। চলে যায় প্রতিটি ঘণ্টা। চলে যায় প্রতিটি দিন। একবার চলে গেলে আমরা কেউ-ই কি সময়কে ফেরাতে পারি? না। সময় একবার চলে গেলে আর ফিরে আসে না। একইভাবে সময়ের কোনো বিনিময়ও হয় না। কোনো কিছু দিয়েই সময়কে কেনা যায় না কখনো।

📘 সময় কখনো ফিরে আসে না > 📄 সময় মানুষের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ

📄 সময় মানুষের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ


সময় দ্রুত চলে যায়। যে সময় একবার চলে যায়, তা আর কখনো ফিরে আসে না। সময় মানুষের সবচেয়ে মূল্যবান সম্পদ। তাই কোনো কিছুই সময়ের সমান নয়। ফলে কোনো কিছুর বিনিময়ে সময় কেনা যায় না। অন্যদিকে সময়ই হচ্ছে, মানুষের কর্ম ও কর্মফলের আধার। মানুষের ব্যষ্টিক ও সামাজিক দৃষ্টিকোণ থেকে সময়ই প্রকৃত পুঁজি।

প্রবাদে বলা হয়, 'সময় স্বর্ণের মতো মূল্যবান'। এ প্রবাদটিতে সময়কে স্বর্ণের সাথে তুলনা দেওয়া হয়েছে। কিন্তু প্রকৃতপক্ষে সময় এর চেয়েও মূল্যবান। সময় স্বর্ণ, মণি-মুক্তা, হিরা-জহরত প্রভৃতি বহুমূল্য রত্ন ও বহুমূল্য পাথর থেকেও অধিক মূল্যবান।

আমাদের জীবনের অনেকটা সময়ই চলে গেছে। সময়ের মূল্যবান হওয়া সময়ের গুরুত্ব বুঝিয়ে দেয় আমাদের। সে হিসেবে আমাদের উচিত পেছনের জীবনের আত্মসমালোচনা করা, নিজেরা নিজেদের সমালোচনা করে সতর্ক হওয়া। অতীত জীবন থেকে শিক্ষা নিয়ে সামনের জীবন আলোকিত করা।

হাজ্জাজ বিন আবু উয়াইনা বলেন:

'জাবির বিন জাইদ নামাজ আদায় করতেন আমাদের সাথে। একদিন তিনি এলেন এক জোড়া জীর্ণ জুতো পরে। বললেন, “আমার জীবনের ৬০ বছর কেটে গেছে। জীবনটা আমার গুনাহের মাঝেই কেটে গেছে। এ দুটি জীর্ণ জুতোই আমার কাছে অতীত জীবনের চেয়ে অধিক প্রিয়। তবে যে নেক আমল অগ্রে প্রেরণ করেছি, সেগুলো ব্যতীত।"'

يا نفس كفي عن العصيان واكتسبي فعلاً جميلاً لعل الله يرحمني

'হে আমার আত্মা। তুমি নাফরমানি থেকে বিরত হও। নেক আমলে সময় দাও। আল্লাহর নিকট আশাবাদী, তিনি আমাকে ক্ষমা করবেন।'

প্রিয় ভাই,

'আমরা আল্লাহর সৃষ্টি। ডুবে আছি আল্লাহর অসংখ্য নিয়ামতের মাঝে। সকল নিয়ামতের মাঝে অন্যতম নিয়ামত হচ্ছে, আমাদের এ শরীর, শরীরের বিভিন্ন অঙ্গপ্রত্যঙ্গ। এগুলোর মাধ্যমে আমরা বিভিন্নভাবে উপকৃত হই, বিভিন্ন বস্তু উপভোগ করি।

যদি আমাদের শরীর আল্লাহর আদেশ অনুযায়ী চলে এবং আল্লাহর নিষেধকৃত কর্ম ও বস্তু থেকে বিরত থাকে, তবে আল্লাহর নিয়ামতের কৃতজ্ঞতা আদায় হলো। এভাবে আমাদের শরীর ও শরীরের অঙ্গপ্রত্যঙ্গ সর্বদা আমাদের জন্য উপকারী থাকবে। অন্যদিকে, আমরা যদি আল্লাহর আদেশ-নিষেধের তোয়াক্কা না করি, তবে এসব অঙ্গপ্রত্যঙ্গই আমাদের সবচেয়ে বড় কষ্ট ও ক্ষতির কারণ হবে।

সব সময়ই ইবাদত করার মতো কিছু না কিছু মাধ্যম থাকেই। আল্লাহর নৈকট্য লাভের কোনো না কোনো পথ থাকেই। যদি মানুষ নিজের সময়কে আল্লাহর ইবাদতে ব্যয় করে, তবে সে রবের নিকটবর্তী হতে পারে। আর যদি সময়কে প্রবৃত্তির কামনা, আরাম-আয়েশ ও কর্মহীনতায় শেষ করে ফেলে, তবে রবের কাছ থেকে সে দূরে সরতে থাকে। বান্দা সব সময় হয় রবের নিকটবর্তী হতে থাকে বা দূরে সরতে থাকে। এক অবস্থানে কখনো থাকে না।

আল্লাহ তাআলা বলেন: لِمَن شَاءَ مِنكُمْ أَن يَتَقَدَّمَ أَوْ يَتَأَخَّرَ

'তোমাদের মধ্যে যে অগ্রসর হতে চায় কিংবা যে পিছিয়ে পড়ে, তার জন্য।'

আব্দুল্লাহ বিন ওয়াহাব নিজের পুরো জীবনটাকে তিনটি ভাগে ভাগ করে নিলেন। একটি অংশ শত্রুদের বিরুদ্ধে ইসলামি ভূমির প্রতিরক্ষায়। দ্বিতীয় একটি অংশ মানুষকে ইলম শেখানোর মাঝে। তৃতীয় একটি অংশ হজের ইবাদতে।'

হাম্মাদ বিন মাসলামা সালাফের সময়-সংরক্ষণ ও সময়ের সদ্ব্যবহারের একটি চিত্র আমাদের সামনে তুলে ধরছেন এভাবে-

'ইবাদতের সময়ে আমরা যখনই সুলাইমান আত-তাইমির নিকট আসতাম, তখনই তাকে দেখতাম তিনি ইবাদতরত।...যদি সে সময়টা নামাজের হতো, দেখতাম-তিনি নামাজে মগ্ন। আর যদি সে সময়টা নামাজের না হতো, তবে দেখতাম-হয় তিনি অজু করছেন বা কোনো রোগীর সেবা করছেন কিংবা কোনো জানাজায় অংশ নিয়েছেন অথবা মসজিদে বসে আছেন। আমরা দেখলাম, আল্লাহর অবাধ্য হওয়া তার কাছে মোটেও শোভনীয় নয়।'

প্রিয় ভাই আমার,

'সময় বিনষ্ট করা মৃত্যুর চেয়েও ভয়াবহ। কারণ মৃত্যু তোমাকে দুনিয়া ও দুনিয়াতে থাকা তোমার প্রিয়জনদের থেকে বিচ্ছিন্ন করবে। কিন্তু সময়ের অপচয় তোমাকে আখিরাতের উত্তম আবাস ও মহান আল্লাহ থেকে বিচ্ছিন্ন করে দেবে।'

'এ জন্য প্রত্যেক মুসলিমের কর্তব্য হচ্ছে, প্রতিটি মুহূর্তে, প্রতিটি মিনিটে আত্ম-সমালোচনা করা। এ ক্ষেত্রে মাসরুক-এর কথাটি উপকারী হবে। তিনি বলেন, "প্রতিটি ব্যক্তির উচিত, দিনে কয়েকবার একাকী নির্জনে বসা। নিজের গুনাহের ফিরিস্তি স্মরণ করা। সেগুলো থেকে ক্ষমা প্রার্থনা করা।"'

আমাদের অবস্থা সে লোকের মতো, যে লোকটি নিজের অবস্থার অভিযোগ করেছিল হাসান বসরি -এর কাছে। লোকটি বলেছিল, 'আমার গোত্র তো বিদ্যুৎগতির ঘোড়ায় চড়ে আগে চলে গেছে। আর আমরা আহত উটে সওয়ার হয়ে চলছি ধীরগতিতে।' হাসান উত্তর দিলেন, 'যদি তুমি পথ চলতে থাকো, অতি দ্রুতই তাদের সাথে মিলিত হবে।'

এখানে দ্রুতগতির ঘোড়ার সওয়ার হচ্ছে সময়। আর আমরা হচ্ছি, আহত উটের সওয়ার। সালাফে সালিহিন নিজেদের এমন অবস্থার সাথে তুলনা করতেন। কিন্তু আমরা বর্তমান সময়ের মানুষেরা তো তাঁদের ধারে-কাছেও নই। তাহলে আমাদের অবস্থাটা কেমন?

আল্লাহ তাআলা বলেন: أَوَلَمْ نُعَمِّرْكُم مَّا يَتَذَكَّرُ فِيهِ مَن تَذَكَّرَ وَجَاءَكُمُ النَّذِيرُ

'আমি কি তোমাদের এতটা দীর্ঘ জীবন দান করিনি যে, কেউ সতর্ক হতে চাইলে অনায়াসে সতর্ক হতে পারত? তোমাদের নিকট তো সতর্ককারীরাও এসেছিল। '

যেদিন আল্লাহ আমাদের এ প্রশ্নটি করবেন, তখন জবাব দেওয়ার মতো আমাদের কাছে কোনো উত্তর কি থাকবে?

আল্লাহ তাআলা প্রতিটি অজুহাতের সমাধান আমাদের দিয়ে দিয়েছেন। তাই অজুহাত দেখানোর কোনো সুযোগ নেই। তিনি প্রতিটি মানুষকে যথেষ্ট সময় দিয়েছেন তার কর্তব্য পালনের জন্য। যখন কোনো মানুষ অসতর্ক হয়ে যায়, উদাসীন হয়ে যায়, তখন তার জন্য সতর্ককারী পাঠিয়েছেন। বিশেষ করে যারা দীর্ঘ একটি জীবন পেয়েছে, তাদের এ দীর্ঘ জীবনের পরিসরই তাদের উদাসীনতা থেকে বিরত রাখার জন্য যথেষ্ট। যথেষ্ট প্রতিটি বিভ্রান্ত ব্যক্তির সঠিক পথে আসার জন্য। যথেষ্ট প্রতিটি গুনাহগারের তাওবার জন্য।...

দুনিয়ার এ জীবন ঘুমের মাঝে আসা স্বপ্নের মতোই ছোট ও দ্রুত। যেমন কোনো ব্যক্তি ঘুমের মাঝে স্বপ্ন দেখল, কী থেকে কী হলো বোঝার আগেই তার চোখ ছুটে গেল, আর সে জেগে গেল। দেখল, যে জীবন মরীচিকা ছিল, সে তা পার করে সত্যিকার জীবনে পদার্পণ করেছে।

জীবনের দিনগুলো কষ্ট নিয়ে আসে, আবার কষ্ট নিয়ে চলেও যায়। আশা দেখিয়ে যায়, আবার আশাগুলো ভুলিয়ে যায়। স্বপ্ন দেখায় আবার সে স্বপ্ন মলিন করে যায়। জীবনের কাঠিন্যই এর কারণ। কিন্তু কষ্ট, আশা, স্বপ্ন ও কাঠিন্যের পর কিন্তু জবাবদিহিতা ঠিকই বাকি থেকে যায়।

বিলাল বিন সাদ বলেন: জনৈক ব্যক্তিকে বলা হলো, তুমি কি মরতে চাও? - না। - তবে আমল করে জীবন শুধরিয়ে নাও। - হ্যাঁ। অচিরেই আমি আমল করব।

এ লোক মরতে চায় না। কিন্তু মৃত্যু তো অনিবার্য। প্রয়োজন কেবল মৃত্যু- পরবর্তী জীবনের জন্য আমল করার। কিন্তু সে আমল করতেও উৎসাহী নয়। সে আল্লাহর জন্য করা হয়—এমন আমলকে পিছিয়ে রাখে। আর দুনিয়ার জন্য মনেপ্রাণে কাজ করার প্রতি আগ্রহী থাকে।

প্রিয় ভাই, এ আহ্বান তোমার প্রতি। আহ্বান সঠিক পথে ফিরে আসার। আহ্বান নিজেকে তাওবা করে জীবন শুধরে নেওয়ার। জীবন একটা সুবর্ণ সুযোগ। এ সুযোগ হাত থেকে যেতে দেওয়া বড়ই বোকামি। কিন্তু আমাদের অতীত জীবনের গুনাহের কারণে এ সুযোগকে আমরা মলিন করে ফেলেছি।

আহমাদ বিন আসিম আল-আনতাকি বলেন:

'জীবনের বাকি সময়টা নিষ্প্রভ সুযোগের মতো। এ সময়টা বিগত জীবনের গুনাহের ক্ষমা চাওয়ার জন্যই অধিক উপযুক্ত।'

আমার মুসলিম ভাই,

দুনিয়ার এ কয়েকটা মুহূর্ত, এ কয়েকটা দিনই তোমার পুঁজি। দুনিয়াতে তুমি অর্থ-সম্পদে কতটা উন্নতি করলে, তা দেখার বিষয় নয়। দেখার বিষয় হচ্ছে, এ সময়টাতে ভবিষ্যৎ জীবনের জন্য কতটা পাথেয় জোগাড় করলে তুমি। দেখার বিষয় হচ্ছে, তোমার আমলনামায় কোন জিনিসটি লেখা হচ্ছে। আজ তুমি যেভাবে তোমার দিন কাটাচ্ছ, এমন পাপপূর্ণ আমলনামা কি তুমি কিয়ামতের দিন দেখতে চাও? সেটা কি তোমার জন্য কষ্টকর হবে না দুঃখজনক হবে? কিয়ামতের দিন তুমি তোমার আমলনামা যেমন দেখতে চাও, তেমনই আমল করতে থাকো, তেমন কাজেই তোমার জীবনটা কাটিয়ে দাও।

দুনিয়ার কোনো আশা-ই যেন তোমাকে রুখে দিতে না পারে। কারণ সময় কিছু মুহূর্তের নাম, যা কখনো ফিরে আসে না।

আল্লাহর কাছে প্রার্থনা, তিনি আমার ও তোমাদের জীবন দীর্ঘ করুন উত্তম আমলে। তিনি আমাদের জন্য কঠিন এক প্রশ্ন ঠিক করে রেখেছেন। যার জবাব দেওয়াও কঠিন। তিনি আমাদের সে জবাবদিহির প্রস্তুতি নেওয়ার তাওফিক দিন। পরিশেষে আমাদের এমন কয়েক জান্নাতের অধিবাসী বানিয়ে দিন, যার প্রতিটি জান্নাতের পরিমাপ হবে জমিন ও আসমানসমূহের সমান। আমাদের তিনি তাদের মধ্যে অন্তর্ভুক্ত করুন, সেদিন যাদের ডেকে বলা হবে-

ادْخُلُوا الْجَنَّةَ لَا خَوْفٌ عَلَيْكُمْ وَلَا أَنتُمْ تَحْزَنُونَ

'তোমরা জান্নাতে প্রবেশ করো, তোমাদের কোনো ভয় নেই এবং তোমরা চিন্তিত ও দুঃখিত হবে না।'

টিকাঃ
১৩০. হিলইয়াতুল আওলিয়া: ৩০/৮৮
১৩১. মাওয়ারিদুজ জামআন: ৩/৪৯৩
১৩২. সুরা আল-মুদ্দাসসির: ৩৭
১৩৩. আল-ফাওয়ায়িদ: ২৪৯
১৩৪. তাজকিরাতুল হুফফাজ: ১/৩০৫
১৩৫. সিফাতুস সাফওয়া: ৩/২৯৭
১৩৬. আল-ফাওয়ায়িদ: ৪৫
১৩৭. ইমাম আহমাদ রহ. রচিত আজ-জুহদ: ৪৮৫
১৩৮. আল-ফাওয়ায়িদ: ৫৭
১৩৯. সুরা ফাতির : ৩৭
১৪০. আল-আকিবাহ: ৯১
১৪১. ইমাম বাইহাকি রহ. রচিত আজ-জুহদ: ১৯৯
১৪২. সুরা আল-আরাফ: ৪৯

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00