📘 সময় কখনো ফিরে আসে না > 📄 মানুষের দুটি অবস্থান

📄 মানুষের দুটি অবস্থান


পার্থিব এ জীবনই আমল চাষের সময়। আর আখিরাত হচ্ছে সাওয়াবের ফসল তোলার মৌসুম। তাই কোনো মুমিনের জন্য সময় নষ্ট করা ও সময়ের মতো অমূল্য পুঁজিকে অনর্থক খরচ করা মোটেই শোভনীয় নয়।

আজ যারা সময়ের মূল্য সম্পর্কে অজ্ঞাত—অচিরেই একদিন আসবে, যেদিন তারা সময়ের মূল্য ও শ্রেষ্ঠত্বের কথা জানতে পারবে। জানতে পারবে সঠিক সময়ে কাজ করার বহুমূল্যত৷ সম্পর্কে। মানুষ সময়ের মূল্য ঠিকই বুঝতে পারবে, তবে সেটা সময় চলে যাওয়ার পর। এ বিষয়েই কুরআন দুটি অবস্থানের কথা বর্ণনা করেছে, যে স্থানে এসে মানুষ লজ্জিত হবে। লজ্জিত হবে সময় নষ্ট করা ও অনর্থক কাজে সময় ব্যয় করার জন্য।

সময়ের অপচয়ের কারণে দুটি সময়ে মানুষ ভীষণ লজ্জিত হবে—

১. জীবনের অন্তিম মুহূর্তে
যখন মানুষ পেছনে রেখে যাবে দুনিয়ার এ জীবনকে। এগিয়ে যাবে আখিরাত পানে। তখন সে আক্ষেপ করবে, যদি তাকে একটুখানি সময় দেওয়া হতো! যদি একটু সুযোগ দেওয়া হতো! তবে সে তার বিনষ্ট অবস্থা ঠিক করে নিত—সংশোধন করে নিত ছুটে যাওয়া আমলগুলো。

২. আখিরাতের ভীষণ মুহূর্তে
আখিরাত। এটি সে সময়ের নাম, যখন প্রতিটি প্রাণকে তার কৃতকর্মের পুরোপুরি ফল দেওয়া হবে। আখিরাত সে সময়টির নাম, যখন প্রতিটি মানুষকে তার কর্মের প্রতিদান দেওয়া হবে। হয়তো সে জান্নাতবাসী হবে, অথবা হবে জাহান্নামের অধিবাসী। তখন জাহান্নামিরা আফসোস করবে, যদি তাদের আরেকটি বার দুনিয়ার এ জীবনে ফিরিয়ে দেওয়া হতো! তাহলে অবশ্যই তারা নতুন করে সৎ আমল করে নিজেদের শুধরে নিত।

কিন্তু এ কেবলই দুরাশা! তাদের এ আবেদন ব্যর্থ। কারণ সময় কখনো ফিরে আসে না। আমলের সময় তো শেষ হয়ে গেছে। এখন হচ্ছে প্রতিদানের সময়।
আমাদের এ সময়ে চোখ বুলিয়ে দেখি। সময়ের অবমূল্যায়ন ও সময়মতো কাজ করার প্রতি মানুষের শিথিলতা আজ কোন পর্যায়ে গিয়ে পৌঁছেছে! এ সময়টা ঘাটতিতে পরিপূর্ণ। সময় এখন আরাম-আয়েশ ও অলসতায় পর্যবসিত। মানুষের দৃঢ়তা তলানিতে এসে ঠেকেছে! উচ্চ মনোবল আজ যেন মৃতপ্রায়!

ঘণ্টার পর ঘণ্টা চলে যায়, দিনের পর দিন শেষ হয়ে যায়; অথচ এসবের কোনো হিসেবই করি না আমরা। এতটা সময় নষ্ট হচ্ছে, অথচ কারও মাঝে নেই এতটুকু অস্থিরতাও। যেন কিছুই হয়নি!

এ বেহালদশা কেবল এতটুকুতেই সীমাবদ্ধ নয়। কোথায় নেক আমল করার মাধ্যমে সময়ের মূল্য দেওয়া হবে, সে জায়গায় একজন অপরজনকে ডেকে বলে-
চল্ একটু ঘুরে আসি! একটু আড্ডা না হলে জীবনটা চলে নাকি! ভাই আমার, মুমিনের কি কোনো অবসর সময় থাকে? মহান প্রভুর এ বাণীটি শুনুন-

فَإِذَا فَرَغْتَ فَانصَبْ - وَإِلَى رَبِّكَ فَارْغَب 'কাজেই তুমি যখনই অবসর পাবে, ইবাদতে কঠোর শ্রমে লেগে যাবে। এবং তোমার রবের প্রতি গভীরভাবে মনোনিবেশ করবে।'

আপনি হয়তো মানুষের মাঝে ঘেরা থাকেন। ব্যস্ত থাকেন তাদের নিয়ে। ব্যস্ততা আপনাকে ঘিরে থাকে জীবনের প্রতিটি পদে পদে।...

'তবুও যখন এসব থেকে অবসর পান, যিনি আমাদের সাধনা ও পরিশ্রমের ইবাদত পাওয়ার উপযুক্ত, কষ্ট করে ও ক্লান্ত হয়ে করা ইবাদতের যিনি হকদার; একাকী-নিভৃতে মনোযোগ ও মনোনিবেশের সবটুকু পাওয়া যার অধিকার-অবসর সময়ে পুরোপুরি তাঁর দিকেই মনোনিবেশ করুন।'

একজন মুসলিম আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য দুনিয়ার কোনো কাজ করলে ও সাওয়াবের প্রত্যাশা করলে, সে কাজটি ইবাদতে পরিণত হয়।

এ বিষয়টিই কুরআনের অনেক আয়াতে অতি সুন্দররূপে ফুটে উঠেছে—
وَمَا خَلَقْتُ الْجِنَّ وَالْإِنْسَ إِلَّا لِيَعْبُدُونِ 'আমি জিন ও মানবকে কেবল এ উদ্দেশ্যেই সৃষ্টি করেছি, তারা আমারই ইবাদত করবে।'
أَفَحَسِبْتُمْ أَنَّمَا خَلَقْنَاكُمْ عَبَثًا وَأَنَّكُمْ إِلَيْنَا لَا تُرْجَعُونَ 'তোমরা কি ধারণা করেছিলে, আমি তোমাদের অনর্থক সৃষ্টি করেছি এবং তোমরা আমার নিকট প্রত্যাবর্তিত হবে না?'

ভাই আমার,

কিছু সময়ের জন্য আমরা ফিরে যাব সুদূর অতীতে। দেখে আসব অতীতের পাতাগুলো। শুনে আসব সালাফে সালিহিনের সত্য-সুন্দর কথাগুলো। জানব, সময় নিয়ে তাদের মূল্যায়ন। জানব, কীভাবে তারা ব্যবহার করেছেন নিজেদের সময়কে। সময় থেকে তারা কীভাবে উপকৃত হয়েছেন—জানব সে কথাও।

আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ বলেন: 'সেদিন আমি অত্যন্ত লজ্জিত হয়েছি, যেদিনের সূর্য ডুবে গেছে। আমার আয়ু কিছুটা হলেও ফুরিয়ে গেছে; অথচ আমার আমলের উন্নতি হয়নি।'

সময় চলে যায়। উদ্ভাসিত হয় দিনের আলো। ঘনিয়ে আসে রাতের অন্ধকার। দিন যায়। রাত হয়। কেটে যায় রাত-দিনের শত-সহস্র মুহূর্ত। সময় বিরতিহীন চলমান। দ্রুত অগ্রসরমান। কিন্তু এক সময় সময়ের এ সফর থেমে যায়। সফরের এ সময় মানুষ বাহনে থাকে। সফর শেষে বাহন থেকে অবতরণ করে।

'যেদিন মানুষের সৃষ্টি, সেদিন থেকেই মানুষ মুসাফির। জান্নাত বা জাহান্নামই তাদের সফরের শেষ মনজিল। দুটোর একটিতেই হয় তার অবতরণ। জ্ঞানী মাত্রই জানেন, সফর কষ্ট, ক্লান্তি ও বিপদে ভরা। সফরে কোনো ভোগ, উপভোগ, আরাম-আয়েশের খোঁজ করা বোকামি, এগুলো পাওয়াও সাধারণত অসম্ভব। এগুলোর নাগাল তখনই পাওয়া যাবে, যখন এ দীর্ঘ সফর শেষ হবে। সফরের সময়ের কোনো পদক্ষেপ, কোনো মুহূর্তই স্থির নয়। সফরকারীও স্থির নয়। সদা চলমান একজন মুসাফির সে। যে পাথেয় তাকে উদ্দিষ্ট মনজিলে পৌঁছে দেবে, তাকে সে পাথেয় প্রস্তুত করতে হবে। যখন মুসাফির অবতরণ করে বা ঘুমিয়ে পড়ে কিংবা আরাম করে, এর পরেই তাকে পায়ে হেঁটে চলার জন্য প্রস্তুত হতে হয়।'

টিকাঃ
১৭. সুরা আল-ইনশিরাহ : ৭-৮
১৮. ফি জিলালিল কুরআন : ৬/৩৯৩
১৯. সুরা আজ-জারিয়াত: ৫৬
২০. সুরা আল-মুমিনুন: ১১৫

📘 সময় কখনো ফিরে আসে না > 📄 সময়ের তিন ভাগ

📄 সময়ের তিন ভাগ


'সময় তিন ভাগে বিভক্ত।

এক. যে সময় অতীত হয়ে গেছে।

দুই. যে সময় সামনে আসছে। এ সময়কে ভবিষ্যৎ বলে। বান্দা জানে না, সে সময়ে সে জীবিত থাকবে, কি থাকবে না। সে জানে না, সে সময়ে তার জন্য আল্লাহ কী ফয়সালা করে রেখেছেন।

তিন. যে সময় এখন কাটছে। একে বর্তমান বলে। একজন বান্দার উচিত, এ সময়ে নিজের নফসের বিরুদ্ধে সাধনা করে যাওয়া। তার রব যে তাকে সর্বদা দেখছেন, সে কথা মনে রাখা।

যদি দ্বিতীয় কালটি না আসে, তবে সে যেন না আসার কারণে হতাশ না হয়। যদি দ্বিতীয় কালটি আসে, তবে এর অধিকার পূর্ণরূপে আদায় করে।

বান্দার আশা যদি থাকে পঞ্চাশ বছর বাঁচার, তবে যেন সে দীর্ঘ সময়ে রবের পর্যবেক্ষণে থাকার অনুভূতির ওপর দৃঢ় হয়। যেন সে সময়ের সদ্ব্যবহার করে পূর্ণরূপে। সে সব সময় এমনটাই মনে করবে যে, এখনই তার শেষ সময়। হতে পারে এটিই তার অন্তিম মুহূর্ত। তাই সে কিছুতেই এমন কর্মে নিজেকে লিপ্ত করতে পারে না, যে কর্মে লিপ্ত অবস্থায় মৃত্যু তাকে পাকড়াও করুক— সে এমনটা চাইবে না। বরং তার পুরো সময়টা সেই তিনটি অবস্থাতেই সীমাবদ্ধ থাকবে, যার ব্যাপারে রাসুল -এর নির্দেশনা এসেছে। আবু জার বর্ণনা করেন, রাসুল বলেন:

“মুমিনকে তিনটি অবস্থাতেই দেখা যায়। হয়তো সে আখিরাতের পাথেয় সংগ্রহ করছে, নয়তো সে জীবিকার জন্য কাজ করছে, নতুবা সে হালাল কোনো নিয়ামত উপভোগ করছে।””

ভাই আমার,

সুস্থতা, অবসর ও সম্পদ—এ তিনটিই একেকটি দরজা। এগুলো দিয়ে কামনা প্রবেশ করে শক্ত হয়ে গেড়ে বসে মনের ভেতরে। আর প্রবৃত্তি তার প্রাঙ্গণে চারজানু হয়ে বসে। এভাবেই এগুলো চড়াও হয় একজন মুমিনের ওপর। তখন এ প্রবাদটি সত্যই প্রমাণিত হয়ে যায়, ‘অলস মস্তিষ্ক শয়তানের কারখানা।’

মুমিন এমন হয় না। এসব থেকে মুমিন মুক্ত থাকে। মুমিনের স্বরূপ কাতাদা বিন খুলাইদ-এর কথায় ফুটে ওঠে। তিনি বলেন, 'তুমি মুমিনকে তিনটি কাজের মধ্যে দেখবে। হয় সে মসজিদ আবাদ করে বা সে ঘরে থাকে, যে ঘর তাকে ঢেকে রাখে, অথবা দুনিয়ার দোষমুক্ত কোনো প্রয়োজন পূরণে লিপ্ত থাকে।'

জ্ঞানবান ও বুদ্ধিমান তো সে মুমিন, যে মুমিন সময়ের গুরুত্ব বোঝে। নিজের জীবনকে কাজে লাগায়। কোনো উপকারী ইলম মুখস্থ করে। নিজের অনিষ্টতা থেকে ও শত্রুদের অনিষ্টতা থেকে উম্মাহকে সুরক্ষিত রাখে। এভাবে মুসলিম উম্মাহকে শাসনকারী একটি উম্মাহতে রূপ দেয়। যারা পরাজিত নয়; বরং যারা বিজয়ী হয়। সে মুমিন বরকতময় জিহাদে অংশগ্রহণ করে। মুখ, কলম ও অস্ত্রের মাধ্যমে শত্রুর প্রতিরোধে জিহাদে অংশগ্রহণ করে। সৎ কাজের আদেশ করে। অসৎ ও মন্দ থেকে নিষেধ করে। মানুষকে দ্বীন শিখিয়ে, তাদের অন্তর দ্বীনের প্রতি আকৃষ্ট করে, তাদের দ্বীনি অনুভূতি জাগরূক করে তাদের উপকার করে। দ্বীনের আদলে মানুষের মন, মানসিকতা ও অনভূতি গড়ে তোলে। ফলে পৃথিবীতে দ্বীনি পরিবেশ গড়ে ওঠে। আল্লাহর নির্দেশে প্রতিটি সময়ই এ মেহনতগুলোর ফল বয়ে আনে।

যদি কোনো মুমিনের কোনো একটি দিনও এমন কেটে যায় যে, সে তার দায়িত্ব ও কর্তব্য আদায় করেনি বা তার ওপর ফরজ হয়ে আছে—এমন কোনো কাজও সে আদায় করেনি, কিংবা কোনো মর্যাদা ও প্রশংসা অর্জন করেনি, অথবা কোনো ভালো কাজের গোড়াপত্তন করেনি, কিংবা কোনো ইলম অর্জন করেনি, তবে তার দিনটা বৃtha গেল এবং সে নিজের ওপর জুলুম করল।

মানুষ এসব ঠিকই বোঝে। অথচ এসব তাদের মাঝে প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করে না। কিন্তু যখন মানুষের অন্তিম মুহূর্ত উপস্থিত হবে, মানুষ যখন মৃত্যুমুখে পতিত হবে, তখনই তার এ উপলব্ধি ও অনুভূতি প্রবল হয়ে উঠবে। যখন মানুষ দেখবে, তার ধ্বংস ত্বরান্বিত হচ্ছে, তখন সে আল্লাহর কাছে বৃথা আশা করবে। সে বৃথা আবেদন করবে, যেন আল্লাহ তাকে একটু সময় দেন। যেন সে শুধরে নিতে পারে নিজের বিকৃত অবস্থাকে। সংশোধন করে নিতে পারে ছুটে যাওয়া আমলগুলোকে। কিন্তু সে আশায় গুড়ে বালি। কিছুতেই আরেকটু সময়ও পাবে না সে, এ তো নিশ্চিত কথা। তার নির্ধারিত সময় এসে গেছে। মৃত্যু তার সঠিক সময়েই এসে গেছে তার কাছে।

يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا لَا تُلْهِكُمْ أَمْوَالُكُمْ وَلَا أَوْلَادُكُمْ عَنْ ذِكْرِ اللَّهِ وَمَنْ يَفْعَلْ ذَلِكَ فَأُولَئِكَ هُمُ الْخَاسِرُونَ وَأَنْفِقُوا مِنْ مَا رَزَقْنَاكُمْ مِنْ قَبْلِ أَنْ يَأْتِيَ أَحَدَكُمُ الْمَوْتُ فَيَقُولَ رَبِّ لَوْلَا أَخَّرْتَنِي إِلَى أَجَلٍ قَرِيبٍ فَأَصَّدَّقَ وَأَكُنْ مِنَ الصَّالِحِينَ ١٠ وَلَنْ يُؤَخِّرَ اللَّهُ نَفْسًا إِذَا جَاءَ أَجَلُهَا وَاللَّهُ خَبِيرٌ بِمَا تَعْمَلُونَ ١١

'হে মুমিনগণ, তোমাদের ধন-সম্পদ আর তোমাদের সন্তানাদি তোমাদের যেন আল্লাহর স্মরণ হতে উদাসীন করে না দেয়। যারা উদাসীন হবে, তারাই তো ক্ষতিগ্রস্ত। আমি তোমাদের যা দিয়েছি, তা থেকে মৃত্যু আসার আগেই দান করো। অন্যথায় (মৃত্যু এসে গেলে) সে বলবে, “হে আমার পালনকর্তা, আমাকে আরও কিছুকাল অবকাশ দিলে না কেন? তাহলে আমি সদাকা করতাম এবং সৎকর্মশীলদের অন্তর্ভুক্ত হতাম।” কিন্তু নির্ধারিত কাল যখন উপস্থিত হবে, আল্লাহ তখন কাউকেই অবকাশ দেবেন না। তোমরা যা করো, আল্লাহ সে সম্বন্ধে সবিশেষ অবহিত।

এ জন্য আল্লাহ যাদের তাওফিক দিয়েছেন, তারা তাদের সময়ের প্রতিটি মিনিট, প্রতিটি সেকেন্ড নেক আমলে ব্যয় করে। তারা নিজেদের সময়কে গনিমত মনে করে। তাদের কাছে সময় পাওয়া মানেই হলো, একটি অমূল্য সুযোগ পাওয়া। তারা ঠিকই উপলব্ধি করে যে, অনর্থক সময় পার করার অর্থ নিজের ক্ষতি নিজেই ডেকে আনা।

উমর বিন জার বলেন:

'আমি সাইদ বিন জুবাইর-এর কিতাবটি পড়লাম। সেখানে পেলাম, মানুষের জন্য জীবনের প্রতিটি দিনই এক একটি সুবর্ণ সুযোগ।

আর এ সুযোগ কাজে লাগাতে হয় নেক আমল করে। ভবিষ্যৎ জীবনে যা তার একমাত্র পাথেয় হবে। নামাজ, রোজা, তাসবিহ এবং অন্যান্য ইবাদত করে এ সুযোগ কাজে লাগাতে হবে।

আমাদের এ ছোট জীবনের অপর নাম সময়। জীবনের পরিসীমার নামই সময়। সময় নির্দিষ্ট ও নির্ধারিত। যেমনই সময় সম্পর্কে তাইফুর আল- বাসтами বলেন :

'দিন-রাত। এই তো মুমিনের পুঁজি। মুমিনের মূলধন। এ মূলধন সঠিকভাবে বিনিয়োগে জান্নাত লাভ হবে। আর যদি তা হেলায়-খেলায় ও মন্দ কাজে বিনিয়োগ করা হয়, তবে তা জাহান্নাম নামের ক্ষতিগ্রস্ততাকেই ত্বরান্বিত করবে।

সময়ের বিভিন্ন সমষ্টির বিভিন্ন নাম। সেকেন্ড, মিনিট, ঘণ্টা, দিন, সপ্তাহ, মাস, বছর, যুগ, শতাব্দী। 'একটি বছরকে আমরা তুলনা করতে পারি একটি গাছের সাথে। বছরের মাসগুলো সে গাছের শাখা-প্রশাখা। প্রতিটি দিন গাছের একেকটি ডাল। প্রত্যেকটি ঘণ্টা গাছের একেকটি পাতা। আর প্রতিটি মুহূর্ত গাছের ফল। যার মুহূর্তগুলো ইবাদত ও আনুগত্যে কাটবে, তার ফল হবে সুমিষ্ট। সে গাছটি পরিণত হবে একটি পবিত্র বৃক্ষে। আর যার মুহূর্তগুলো কাটবে পাপ-পঙ্কিলতায়, তার ফল হবে অখাদ্য। আর সে গাছটিও হবে অপবিত্র। '

আমরা যারা সময়ের মূল্য জানি না; বুঝি না যে, সময় কত মূল্যবান—তারাই প্রতিদিনের ডুবন্ত সূর্য দেখে দুঃখ ভারাক্রান্ত হই না। আমাদের জীবন থেকে একটি দিন চলে গেল, আমাদের অস্তিত্বের একটি অংশ চলে গেল, অথচ আমাদের মাঝে দেখা যায় না কোনো ধরনের অস্থিরতা! একটি দিন চলে যাওয়ার কী অর্থ? একটি দিন চলে যাওয়া মানে—এ দিনের হিসেব সংরক্ষিত হয়ে যাওয়া, এ দিনের আমলের গুনতি হয়ে যাওয়া, এ দিনের মুহূর্তগুলো কালের গর্ভে বিলীন হয়ে যাওয়া।

إنا لنفرح بالأيام نقطعها وكل يوم مضى يدني من الأجل

'দিনগুলো কাটিয়ে আমরা কেমন যেন আনন্দিত হই! অথচ প্রতিটি দিনই আমাদের মৃত্যুর সময় এগিয়ে দিচ্ছে।'

হাসান বসরি বলেন:

'বান্দা থেকে আল্লাহর মুখ ফিরিয়ে নেওয়ার আলামত হচ্ছে, বান্দাকে অনর্থক কোনো কাজে ব্যস্ত করে রাখা। এমনটি মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে বান্দার জন্য অপমানস্বরূপ। '

'দিন-রাত সময়ের একেকটি স্তর। মানুষ সময়ের একেকটি স্তর পার হয়ে সামনে এগিয়ে চলে। এভাবে এক সময় তাদের সফরের অবসান ঘটে। যদি কোনো মানুষ প্রতিটি স্তরে, প্রতিটি দিনেই সামনের জীবনের পাথেয় জোগাড় করতে পারে—তবে সে যেন তা-ই করে।

যদি এ জীবন-সফর খুব দ্রুতই শেষ হয়ে যায়! এমনটা কী হতে পারে না?! হ্যাঁ, বিষয়টা যে এর চেয়ে দ্রুতও ঘটতে পারে। আমরা জানি না, কত দ্রুত আমাদের জীবন-সফর ফুরিয়ে যাবে। তাই নিজের এ সফরে পাথেয় জুগিয়ে নাও। যে কাজটি তোমার করা কর্তব্য তা করতে থাকো। হয়তো যেকোনো সময়েই হঠাৎ করে অবসান হবে এ জীবন-সফরের!'

إِنَّمَا الدُّنْيَا إِلَى الْجَنَّةِ وَالنَّارِ طَرِيقٌ وَاللَّيَالِي مُتَجَرُ الْإِنْسَانِ وَالْأَيَّامُ سُوقٌ

'এ দুনিয়া জান্নাত ও জাহান্নামের যাত্রাপথ মাত্র, রাতের প্রহরগুলো মানুষের জন্য ব্যবসার মুহূর্ত, আর দিনের বেলাগুলো বাজারের মতো।'

টিকাঃ
২১. আল-ফাওয়ায়িদ: ২৪৫
২২. আল-ইহইয়া: ৪/৪২৭
২৩. সিফাতুস সাফওয়া: ৩/২৩১
২৪. সুরা আল-মুনাফিকুন: ৮-১০
২৫. সাওয়ানিহ ওয়া তাআম্মুলাত: ২২
২৬. আল-ইহইয়া: ৪/২৭৬
২৭. বাইহাকি রহ. রচিত আজ-জুহদ: ২৯৭
২৮. ইবনুল কাইয়িম রহ. রচিত আল-ফাওয়ায়িদ: ২১৪
২৯. সিফাতুস সাফওয়া: ৩/৩৯০
৩০. জামিউল উলুম ওয়াল হিকাম: ১৩৯
৩১. জামিউল উলুম ওয়াল হিকাম: ৪৬৩
৩২. ইমাম বাইহাকি রহ. রচিত আজ-জুহদ: ২৯৮

📘 সময় কখনো ফিরে আসে না > 📄 মানুষের দুটি শ্রেণি

📄 মানুষের দুটি শ্রেণি


শুমাইত বিন আজলান বলেন:

'মানুষ দুটি শ্রেণিতে বিভক্ত। এক শ্রেণির মানুষ দুনিয়াতে থেকে আখিরাতের পাথেয় জোগাড় করে। আরেক শ্রেণির মানুষ দুনিয়ার ভোগ-বিলাসে মত্ত থাকে। লক্ষ করে দেখো, তুমি কোন শ্রেণিতে পড়ছ?

আমি তো দেখছি, তুমি দুনিয়ার স্থায়ী জীবনটাই ভালোবাসছ! কেন তুমি দুনিয়াকে এত ভালোবাসো? তুমি কি আল্লাহর আনুগত্য করো? সুন্দর করে তাঁর ইবাদত করো? সৎ আমলের মধ্য দিয়ে তাঁর নিকটবর্তী হওয়ার আশা পোষণ করো? যদি এমন হয়ে থাকে, তবে সুসংবাদ তোমার জন্য।

নাকি দুনিয়ার খাবার-দাবার খাওয়ার জন্য, পান করার জন্য, বিনোদনে মত্ত থাকার জন্য, ধন-সম্পদের স্তূপ গড়ে তোলার জন্য, স্ত্রী-সন্তানদের সাথে আরাম-আয়েশের জীবন কাটানোর জন্যই তুমি দুনিয়াতে স্থায়ী জীবন কামনা করছ? হায়, তুমি যে বস্তুর স্থায়িত্ব কামনা করছ, সেটা কতই না নিকৃষ্ট!'

এমন একটা সময় আসবে, যখন আমল করার কোনো সুযোগ থাকবে না। আমল ও ব্যক্তির মাঝে কোনো বাধা দাঁড়িয়ে যাবে। হয়তো সে কোনো রোগে আক্রান্ত হবে অথবা তার মৃত্যু এসে যাবে কিংবা বিপদ-আপদের মতো কোনো প্রতিবন্ধকতা বাধা হয়ে দাঁড়াবে। তাই মুমিনের কর্তব্য হচ্ছে, সে সময়টি আসার আগেই নেক আমলে অগ্রসর হওয়া।

আবু হাজিম বলেন:

'আখিরাতের বাজারে মন্দা চলছে। তুমি সে বাজারে বিনিয়োগ করার ইচ্ছে করছ। কিন্তু তোমার সে বিনিয়োগ কম-বেশ কিছুই হচ্ছে না। কিন্তু যখন মানুষ ও আমলের মাঝে প্রতিবন্ধকতা দাঁড়িয়ে যাবে, দুঃখ ও পরিতাপ করা ছাড়া কোনো পথই বাকি থাকবে না, তখন মানুষ বৃথা আশা করবে, যদি তাকে ফিরিয়ে দেওয়া হতো সে সময়টা! তবে সে আমল করে আসত। কিন্তু সে সময় এমন দুরাশা কোনো কাজেই আসবে না।'

দেখুন, ইমাম শাফিয়ি কীভাবে নিজের সময়কে যথাযথভাবে কাজে লাগিয়েছেন? তিনি রাতকে তিন ভাগ করলেন। রাতের প্রথম অংশ লেখার জন্য। দ্বিতীয় অংশ নামাজের জন্য। তৃতীয় অংশ ঘুমানোর জন্য।

হাসান বসরি বলতেন- 'প্রতিটি দিনই আদম-সন্তানকে ডেকে বলে যায়—আদম-সন্তান, আমি নতুন একটি দিন। আমার মাঝে মানুষ যে কাজ করে, আমি তার সাক্ষী হয়ে থাকি। যদি আমি চলে যাই, তবে পেছনে আর কখনো ফিরে আসি না। তাই তোমার যা ইচ্ছে, তা সামনে পাঠাও। ভবিষ্যৎ জীবনে তুমি তারই প্রতিদান পাবে। আর যা পেছানোর ইচ্ছে করো, তা পিছিয়ে রাখো। মনে রেখো, সময় কখনো ফিরে আসবে না।'

تؤمل في الدنيا طويلاً ولا تدري إذا جن ليل هل تعيش إلى الفجر فكم من صحيح مات من غير علة وكم من مريض عاش دهرًا إلى دهر

'দুনিয়া নিয়েই তোমার যত চিন্তা-ভাবনা, অথচ রাত হলে ফজরের দেখা পাবে কি না, তুমি তো সেটাও জানো না।

কত সুস্থ-স্বাভাবিক মানুষ কোনো কারণ ছাড়াই মারা গেছে, আর কত অসুস্থ মানুষ যুগের পর যুগ গেলেও এখনো বেঁচে আছে!'

অনেক মানুষ সুস্থ-স্বাভাবিক ছিলেন গত রাতেও। কিন্তু ফজরের আলো দেখার সুযোগ হয়নি তাদের। কত মানুষ দিনের প্রথম আলো দেখে। কিন্তু শেষ আলো দেখার সুযোগ আর পায় না! এভাবে মানুষ সহসা এ দুনিয়া ছেড়ে চলে যায়। কিন্তু তারা কি প্রস্তুত থাকে মৃত্যুর জন্য! কোন দিক থেকে মৃত্যু আসে, তার খেয়াল কি তারা রাখতে পারে!

যদি দিনের কোনো এক সময়ে তার দম ফুরিয়ে যায়, তবে রাতের প্রহর দেখার সুযোগ হয় না তার। যদি সে রাতের বেলায় দুনিয়া থেকে বিদায় হয়ে যায়, তবে সকাল হতে না হতে সে কবরে চলে যায়।

মানুষ সময়কে অবহেলা করে। অথচ মানুষের সময় সংক্ষিপ্ত। মানুষের জীবন হাতে গোনা কিছু মুহূর্তের সমষ্টি ছাড়া কিছুই নয়। প্রতিটি ক্ষণই জীবনের একেকটি অংশ। এগুলোর সমষ্টিই জীবন। এ ছাড়া জীবনের তো আর কোনো অস্তিত্বই নেই। অথচ মানুষ কেমন অবহেলা ভরে সময় নষ্ট করে!

সময় মেঘের মতো বিরতিহীন চলছে। পেছনে কখনো ফিরে আসেনি আর কখনো আসবেও না। যে সময়কে সঠিকরূপে কাজে লাগাল, সৎ আমলে সময়ের প্রতিটি অংশকে পূর্ণ করল, আখিরাতের জীবনের জন্য পাথেয় প্রস্তুত করল, সে-ই হচ্ছে প্রকৃত সৌভাগ্যবান, সুসংবাদ তার জন্য।

আবু মুসলিম আল-খাওলানি বলতেন: 'যদি আমি স্বচক্ষে জান্নাত দেখতাম, তবে দুনিয়াতে বেশি কিছু আর চাওয়ার থাকত না। যদি স্বচক্ষে জাহান্নাম দেখতাম, তবে দুনিয়াতে আর বেশি কিছু চাইতাম না।'

সময়-সংরক্ষণ মহৎ প্রাণের চিহ্ন। শক্ত ইচ্ছাশক্তির প্রকাশ ঘটে এতে।

আবু নসর আবাজি বলেন: 'সময়ের রক্ষণাবেক্ষণ করা বিচক্ষণ ব্যক্তির চিহ্নস্বরূপ। '

যে ব্যক্তি অযথা সময় নষ্ট করে, মুওয়াররিক আল-ইজলি তার অবস্থা তুলে ধরে বলেন:

'হে আদম-সন্তان, তোমার প্রতিটি দিনের রিজিক বণ্টিত। তোমার রিজিক তুমি পাবে—এটা তো নিশ্চিত। অথচ তুমি তা নিয়েই চিন্তায় আছ। অন্যদিকে তোমার জীবন ক্ষয়ে আসছে। অথচ তোমার মাঝে চিন্তার লেশমাত্র নেই! যে জিনিস তোমাকে রবের অবাধ্য বানায়, তুমি সেটারই তালাশে আছ! অথচ তোমার কাছে প্রয়োজনীয় সবই আছে।

وللمرء يوم ينقضي فيه عمره *** وموت وقبر ضيق يُولج

'প্রতিটি মানুষের একদিন এমন আসবে, যেদিন তার সময় ফুরিয়ে যাবে।

তার মৃত্যু হবে, তাকে প্রবেশ করানো হবে কবর নামের সংকীর্ণ একটি গর্তে।'

হাসান বসরি বলেন:

'দিন ও রাত দ্রুত গতিতে চলে যাচ্ছে। কমে যাচ্ছে মানুষের আয়ু। মানুষকে নিয়ে যাচ্ছে তাদের শেষ সময়ে। হায় দুরাশা! এ দিন-রাত এক সময় নুহ -এর সঙ্গী ছিল। এরপর আদ, সামুদ, কারুনের পরেও অনেক মানুষেরই সঙ্গী ছিল। তারা নিজেদের রবের কাছে চলে গেছে। তাদের সামনে উপস্থাপন করা হয়েছে তাদের আমলনামা। আর দিন-রাত আগেরই মতো রয়েছে নতুন ও তরতাজা। এ দুটির মাঝে দ্বন্দ্ব-সংর্ঘষ ইত্যাদি অনেক কিছু হলেও, এ দুটি এতটুকুও জীর্ণ হয়নি। পূর্ববর্তীদের সঙ্গে যেমন ঘটেছে, এখনো যারা বেঁচে আছে, তাদের একই অবস্থায় আপতিত করার জন্য সময় প্রস্তুত হয়ে আছে।'..."

দীর্ঘ একটি দিন। এ দীর্ঘ সময়ে সালাফ কী কী আমল করতেন? কীভাবেই-বা তারা এ সময়কে কাজে লাগাতেন?

হাম্মাদ বিন সালামাহ ؒ এ সম্পর্কে বলেন:

'আমরা যখনই সুলাইমান আত-তায়মীর নিকট আসতাম, তখন যদি ইবাদতের সময় হতো, দেখতাম, তিনি ইবাদতরত। ...যদি সে সময়টা নামাযের হতো, দেখতাম, তিনি নামায পড়ছেন। আর যদি সে সময় নামাযের না হতো, তবে দেখতাম, হয় তিনি অজু করছেন বা কোনো রোগীর সেবা করছেন কিংবা কোনো জানাযায় অংশ নিয়েছেন অথবা তিনি মসজিদে বসে আছেন। আমরা দেখলাম, আল্লাহর অবাধ্য হওয়া তার কাছে মোটেও শোভনীয় নয়।'

ভাই আমার, একজন মুমিনের উচিত, দিন-রাতের অভিভ্রান্ত হওয়া থেকে শিক্ষা গ্রহণ করা। দিন-রাত প্রতিটি নতুন জিনিসকে পুরোনো বানিয়ে দেয়। যে জিনিস আজ নতুন, একদিন তা পুরোনো হয়ে যায়। দিন ও রাত প্রতিটি দূরের জিনিসকে কাছে আনে, মানুষের আয়ু নিঃশেষ করে, ছোট শিশুকে এক সময় মৃত্যু ডেকে আনে বৃদ্ধের।

সময় গড়িয়ে যাবে। দিন গিয়ে রাত হবে। রাত শেষে আবার দিন হবে। কিন্তু মুমিন সময়ের এ পরিবর্তন থেকে শিক্ষা না নিয়ে অন্যমনস্ক থাকবে—এমনটা তার জন্য জায়েজ নেই। মুমিনকে সময়ের এ পরিবর্তন নিয়ে ভাবতে হবে। প্রতিটি দিনেই সময় চলে যায় নিজের গতিতে। প্রতিটি ঘন্টা, প্রতিটি মিনিট, প্রতিটি মুহূর্ত চলে যায়। আর রেখে যায় শিক্ষা। এ বিশ্বব্রহ্মাণ্ডে, মানুষের জীবনে কত শত প্রকারের ঘটনা ঘটছে, ঘটবে, ঘটবে—তার কি কোনো হিসেব আছে? কিছু আমরা দেখব, আরও অনেক কিছুই রয়ে যাবে আমাদের অগোচরে। কিছু আমাদের জানা হবে, আরও অনেক কিছুই রয়ে যাবে অজ্ঞাত।

সময়ে অবস্থার পরিবর্তন হয়। একটি অবস্থা রূপান্তরিত হয় আরেকটিতে। উদাহরণত, উর্বর জমিন। এ জমিনে শস্যকণা থেকে উদ্ভিদ গজায়। গাছে কলি ফোটে। কলি থেকে ফুল হয়। ফুল ঝরে ফল ধরে। ফসল হয়। একসময় ফসল কাটাও হয়। এ ফল-ফসল কোনোটা শুষ্ক চূর্ণ হয়ে হাওয়ায় মিলিয়ে যায়। কোনোটা বীজে পরিণত হয়।

শিশুর জন্ম হয়। শৈশব থেকে কৈশোরে পদার্পণ করে সে। একসময় যুবক হয়। যুবকও একসময় প্রৌঢ় হয়, পরিণত বয়সে পৌঁছায়। তারপর একসময় বুড়ো হয়ে যায়। বুড়ো একসময় দুনিয়াকে বিদায় জানিয়ে মৃত্যুকোলে ঢলে পড়ে।...

দাউদ আত-তায়ি -এর নিকট এক লোক এলেন। বললেন, 'আপনার বাড়ির ছাদে একটি ভাঙা ডাল পড়ে আছে।' দাউদ আত-তায়ি বললেন, 'শোনো, ভাতিজা। গত বিশ বছরে আমার বাড়ির ছাদের দিকে আমি তাকিয়ে দেখিনি।'
দাউদ -এর ওপর আল্লাহ রহম করুন।

আজ যদি কোনো মানুষের সাথে এমনটা ঘটত, তবে তাদের অবস্থা কেমন হতো? বিনা প্রয়োজনে দীর্ঘ সময় ধরে চলত আলোচনা। অনর্থক প্রশ্ন জিজ্ঞেস করতে করতে সময় নষ্ট হতো তাদের। কখন ভাঙল ডালটি? কখন পড়ল? কখন এটি সরানো হবে? ইত্যাদি ইত্যাদি। এরপর লম্বা এক আলোচনা! যে আলোচনার কোনোই অর্থ হয় না। না শ্রোতা সে কথোপকথনে উপকৃত হয়, আর না বক্তা।

এসব থেকে বাঁচা যায়, যদি আমরা আমাদের কথাগুলো প্রয়োজনের মাত্রাতেই সীমাবদ্ধ করি। নিজেদের মুখের ওপর লাগাম পরিয়ে রাখি। বিরত থাকি অনর্থক ঘণ্টার পর ঘণ্টা আলোচনা করা থেকে।

আবারো বলছি। আপনি কি একাধারে ৫ ঘণ্টা একটি তাসবিহ পড়ে যেতে পারবেন?!

আপনি সময় নষ্ট করে নিজেকে প্রতারিত করা, নিজের পুঁজি অনর্থক নষ্ট করাকে কোন দৃষ্টিতে দেখেন?!

যখন গিবত ও নামিমার আড্ডা লম্বা সময় নেয়, তখন যেন আপনার কিছুই যায় আসে না। অথচ সে আড্ডার আসর সবচেয়ে মন্দ আসর। সে সঙ্গ সবচেয়ে নিকৃষ্ট সঙ্গ।...একদিকে আমরা নিজেদের সময়কে নষ্ট করছি, নিজেদের জীবনকে অনর্থক নষ্ট করছি। অন্যদিকে আমরা দেখি, কীভাবে সালাফ নিজেদের সময়কে মূল্যায়ন করেছেন। প্রতিটি মুহূর্ত কাজে লাগিয়েছেন।

সময়ের প্রতিটি অংশ থেকেই উপকৃত হয়েছেন। আসলে তাঁরাই হচ্ছেন প্রকৃত ইবাদত ও আনুগত্যকারী।

দাউদ আত-তায়ি-কে একবার দায়াহ বলেন, 'হে আবু সুলাইমান, আপনার কি রুটি পছন্দ নয়?'

দাউদ বললেন, 'দায়াহ, রুটি চিবিয়ে আর ছাতু পান করে ক্ষুধা নিবারণের মধ্যে পার্থক্য হলো, ছাতু পান করলে যে সময় বাঁচে, সে সময়ের ভেতরে ৫০ আয়াত তিলাওয়াত করা যায় অনায়াসে। কিন্তু রুটি চিবিয়ে খেতে খেতে আমার সে সময়টি নষ্ট হয়ে যায়। '

ইবনে মাহদি বলেন :

'আমরা তখন মক্কায়। সুফইয়ান সাওরি-এর সাথে বসে আছি। হঠাৎ সাওরি লাফ দিয়ে উঠে দাঁড়ালেন। বললেন, "দিনের কাজ দিনেই করতে হবে। দিনের আমল দিনেই আদায় করতে হবে।"'

প্রিয় ভাই, সালাফের পথ ছেড়ে আজ কোথায় আমরা?

এই যে দিনের আলো। এ তো তোমাকে তিরস্কার করছে। এই যে রাতের আঁধার। সেও তো তোমাকে ভর্ৎসনা করছে। কিন্তু যদি তোমার এতটুকু বোধোদয় হতো!

আলি প্রায় সময় বলতেন-

'দুনিয়া পশ্চাদমুখী হয়ে পেছনে চলে যাচ্ছে। আর আখিরাত আমাদের সম্মুখে এগিয়ে আসছে। মানুষের মাঝে দুই শ্রেণি। এক শ্রেণি দুনিয়াদার। অন্য শ্রেণি আখিরাতের অধিকারী। তোমরা আখিরাতের অধিকারী হও। দুনিয়াদার হোয়ো না। আজ আমলের দিন। কাল কিয়ামত হিসাবের দিন। আজ আমলের সুযোগ রয়েছে। কিন্তু কাল আর এ সুযোগ বাকি থাকবে না।'

আজ সময় নিয়ে মানুষের বেহাল দশা। এমন বেহাল দশায় বিস্মিত হয়ে প্রাজ্ঞজন বলেন:

'লোকদের দেখে আমি বিস্মিত হয়েছি। দুনিয়া তাদের ছেড়ে পেছনে চলে যাচ্ছে। অথচ তারা পিছিয়ে যাওয়া অতীত নিয়েই ব্যস্ত হয়ে আছে! অন্যদিকে আখিরাত তাদের দিকে এগিয়ে আসছে। তাদের ভবিষ্যৎ জীবন আখিরাতের সময়টা এই তো একটু সামনেই। অথচ তারা ভবিষ্যৎ জীবনের ব্যাপারে উদাসীন হয়ে আছে!'

প্রিয় ভাই,

কত চিন্তা মনের মাঝে ঘুরপাক খায়। কত প্রশ্ন মাথায় এসে জমা হয়। কিন্তু... কখনো কি চিন্তা করেছ? কখনো কি ভেবে দেখেছ? তোমার জীবনের উদ্দেশ্য কী? তোমার জীবনের লক্ষ্য কী?

এ প্রশ্নের জবাবটা জরুরি। এ প্রশ্নের উত্তরই তোমার নির্ধারিত লক্ষ্য। এ উত্তর নির্ধারণ করবে তোমার উদ্দেশ্য। স্পষ্ট করে দেবে তোমার চলার পথ। উদ্দিষ্ট গন্তব্যে পৌঁছা সহজ ও অনায়াস করে দেবে।

এ প্রশ্নের জবাবটা আমরা আবু দারদা (রাঃ)-এর মুখে শুনি। তিনি বলেন : 'যদি পৃথিবীতে তিনটি জিনিস না থাকত, তবে এখানে একদিনের জন্য থাকাও আমার পছন্দ হতো না। এক. রোজা রেখে দুপুর বেলার পিপাসার্ত অবস্থা। দুই. রাতের মধ্যভাগে আল্লাহর সামনে সিজদা করা। তিন. উত্তম লোকদের আসরে বসার সুযোগ থাকা, যারা বেছে বেছে উত্তম কথাগুলোই বলেন; যেমন খেজুর খাওয়ার সময় উত্তমগুলোই বেছে নেওয়া হয়।'

এ দুনিয়ার স্বরূপ কী? এ দুনিয়ার প্রকৃত অবস্থার বর্ণনা দিয়েছেন উমর বিন আব্দুল আজিজ (রহঃ) তাঁর একটি কথায়। তিনি বলেন :

'দুনিয়া চিরকালের আবাস নয়। আল্লাহ দুনিয়ার ভাগ্যে নিঃশেষ হওয়াই লিখে রেখেছেন। আর দুনিয়াবাসীদের কপালে লিখে রেখেছেন দুনিয়া ছেড়ে চলে যাওয়া।'

কত সুদৃঢ় বসতি অল্প সময় পরেই ধ্বংস হয়ে গেছে, তার কোনো ইয়ত্তা নেই। দুনিয়া নিয়ে সন্তুষ্ট কত ব্যক্তি কিছু কাল দুনিয়ায় থেকে দুনিয়া ছেড়ে চলে গেছে, তার কোনো হিসেব নেই। কেউ দুনিয়ায় চিরকাল থাকতে পারবে না। দুনিয়া থেকে আমাদের প্রত্যেকেরই সফর হবে আখিরাত পানে। তাই সৎকর্ম করো। দুনিয়া ছেড়ে চলে যাওয়ার সফরের উত্তম প্রস্তুতি নাও। তোমরা পাথেয় সংগ্রহ করো। আর সবচেয়ে উত্তম পাথেয় হচ্ছে তাকওয়া।

যেহেতু দুনিয়া মুমিনের চিরস্থায়ী আবাস নয়। দুনিয়া মুমিনের স্বদেশ নয়। তাই উচিত হবে, মুমিনের সার্বিক অবস্থা দুটির একটি হওয়া।

এক. হয় মুমিন হবে বিদেশির মতো, যেন কোনো অপরিচিত দেশে অবস্থান করছে সে—যার একটি চিন্তা ও লক্ষ্য নিজ দেশে ফেরার জন্য পাথেয় জোগাড় করা।

দুই. অথবা মুমিন হবে মুসাফিরের মতো। মুসাফির কোনো জায়গাতে স্থিরভাবে বসবাস করে না। বরং সে দিন-রাত সব সময় আপন দেশের উদ্দেশে সফর করতে থাকে।'

দুনিয়া চিরকালের আবাস নয়। দুনিয়ার জীবন একটি সফর মাত্র। যে মুমিন এ বিষয়টি নিশ্চিত বিশ্বাস করে, যে মুমিন দুনিয়ার এ সময়গুলো নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করে দেখে—তার অবস্থা আব্দুর রহমান বিন আবু নুউম-এর চেয়ে ভিন্ন হওয়ার প্রশ্নই ওঠে না। বুকাইর বিন আব্দুল্লাহ বলেন:

'যদি আব্দুর রহমানকে বলা হতো, মৃত্যুদূত আপনার দিকেই এগিয়ে আসছে। তবুও তার আমল বৃদ্ধি করার কোনো উপায় থাকত না। কারণ আমলের মাঝেই পরিব্যাপ্ত ছিল তার পুরো সময়টা।'

হাসান বসরি বলেন:

'আদম-সন্তান, একদিন ভালো-মন্দ আমলের পরিমাপ করা হবে। সেদিন তুমি স্বচক্ষে নিজের ভালো-মন্দ আমলের পরিমাপ দেখতে পাবে। ভালো আমলের মাধ্যমে সেদিন তোমার মর্যাদা উচ্চ হবে। এ দেখে তুমি সেদিন আনন্দে বিহ্বল হবে। তাই যেকোনো ভালো আমল—চাই তা যত ছোটই হোক না—কখনো তাকে অবহেলা করে ছেড়ে দিয়ো না।'

অন্যদিকে মন্দ আমল তোমার মর্যাদায় আঘাত হানবে, তোমাকে লাঞ্ছিত করবে। তাই মন্দ আমল—চাই তা যত তুচ্ছই হোক না কেন—কখনো তা তুচ্ছ ভেবে করে বোসো না।

মহান আল্লাহ সে ব্যক্তির প্রতি দয়া করুন, যে ব্যক্তি হালাল উপার্জন করে, দান করে মধ্যপন্থায়, নেক আমলের তীব্র অভাব ও প্রয়োজনের দিন—কিয়ামতের ভয়ংকর দিনের জন্য বেশি বেশি নেক আমল করে।

হায়, দুর্ভাগ্য তার জন্য। হায়, হতভাগা তো সে, দুনিয়া যাকে ছেড়ে চলে যাবে, রেখে যাবে তাকে আপন অবস্থায়। আর কৃতকর্ম তার কাঁধে চেপে বসবে।

আদম-সন্তান, তোমরা মানুষদের তাড়িয়ে নিয়ে চলো। আর সময় তোমাদের খেদিয়ে নিয়ে চলে। সময় তোমাদের কল্যাণ নিয়ে দ্রুত চলে যাচ্ছে। তবে তোমরা কীসের অপেক্ষায় রয়েছ?

سبيلك في الدنيا سبيل مسافر ** ولا بد من زاد لكل مسافر ولا بد للإنسان من حمل عدة ** ولا سيما إن خاف صولة قامر

'দুনিয়ার এ জীবন তোমার মুসাফিরের জীবন। প্রতিটি মুসাফিরকেই পাথেয় সংগ্রহ করতে হয়।

প্রতিটি মানুষকেই সফরে সতর্ক থাকতে হয়। বিশেষ করে যদি পথে কোনো ডাকাত আক্রমণের সম্ভাবনা থাকে।'

ভাই আমার,

সময় চলছে আপন গতিতে। দিন গড়িয়ে রাত হচ্ছে। দিনের পর দিন আসছে। আমাদের নিয়ে চলছে একটি মহাকালের সকাশে।

কিন্তু সে কঠিন দিনের জন্য কোথায় তোমার পাথেয়। সে মহাকালের জন্য কোথায় তোমার প্রস্তুতি? সেদিন স্তন্যপানকারিণী মা-ও তার সন্তানকে ভুলে যাবে! অন্য কোনো কিছু নয়, কেবল তোমার নেক-আমলের পাথেয়ই তোমার কাজে আসবে।

'বান্দার একজন রব আছেন। অচিরেই বান্দা ও রবের সাক্ষাৎ হবে। শীঘ্রই বান্দা ফিরে যাবে আপন দেশে। বাস করবে নিজের ঘরে। তাই তার উচিত সাক্ষাৎ হওয়ার আগেই আপন রবকে সন্তুষ্ট করা, চিরস্থায়ী বসবাসের ঘরে স্থানান্তরিত হওয়ার আগেই ঘরকে সুন্দর করে নির্মাণ করা। ...

আর সময়ের সদ্ব্যবহারেই রবের সন্তুষ্টি অর্জিত হবে। চিরস্থায়ী বরবাসের সে ঘরটিও নির্মিত হবে সুন্দর করে।

মানুষের স্বরূপ বর্ণনায় আহমাদ বিন মাসরুক বলেন :

'যেদিন তুমি মায়ের পেট থেকে বের হলে, সেদিন থেকে তুমি নিজের আয়ু নিঃশেষ করে চলেছ একে একে। '

মানুষ দুনিয়াতে থাকার জন্য আলিশান বাড়ি করে। তাদের বাড়ি বানানোর বিষয়টা একটু পর্যবেক্ষণ করে দেখি। কত সময় তারা বাড়ি বানানোর পেছনে খরচ করে? আরও কত সময় তারা বাড়ির রক্ষণাবেক্ষণে লাগিয়ে দেয়। এরপর কতটা সময় ধরে তারা এখানে অবস্থান করবে?...মানুষ এ দুনিয়ার জীবন, এ দুনিয়ার বাড়ি-ঘর নিয়েই ব্যস্ত। অথচ তাদের দ্বিতীয় একটি জীবন রয়েছে।... মানুষ দুনিয়ার জীবনকেই সাজানোর জন্য দিন-রাত লেগে আছে। অথচ সে জানে, এ জীবন প্রকৃত জীবন নয়। এ জীবন ছেড়ে তাকে চলে যেতে হবে অচিরেই। এসবই ক্ষণস্থায়ী।

ইয়াহইয়া বিন মুআজ বলেন:

'রাত দীর্ঘ হয়। ঘুমিয়ে রাতকে তুমি ছোট করে ফেলো না। দিন হয় স্বচ্ছ ও নির্মল। তাই তোমার পাপ দিয়ে দিনকে পঙ্কিল কোরো না।'

'সময় অনেক মূল্যবান। সময়ের মর্যাদা এতটাই উন্নত যে, এক মুহূর্ত সময়ও নষ্ট হতে পারে, এমনটা চিন্তারও বাইরে। কেননা, হাদিস শরিফে এসেছে, রাসুলুল্লাহ ﷺ বলেন:

مَنْ قَالَ: سُبْحَانَ اللَّهِ العَظِيمِ وَبِحَمْدِهِ، غُرِسَتْ لَهُ نَخْلَةٌ فِي الجَنَّةِ

“যে ব্যক্তি سُبْحَانَ اللهِ الْعَظِيمِ وَبِحْمَدِهِ) পড়বে, তার জন্য জান্নাতে একটি খেজুর গাছ রোপণ করা হবে।”

একজন মানুষ কত সময় নষ্ট করে কত বড় বড় সাওয়াবের অধিকারী হওয়া থেকে নিজেকে বঞ্চিত করছে, তার কোনো হিসেব নেই। জীবনের প্রতিটি দিন শস্যখেতের মতো। মানুষকে যেন ডেকে বলা হয়, যখনই তুমি একটি বীজ বপন করবে, আমি আল্লাহ তোমার জন্য একটি উদ্ভিদ থেকেই হাজারটা মুকুল বের করব। তাহলে কোনো বুদ্ধিমানের জন্য এটা কি জায়িজ হবে, সে আমলের বীজ বপন না করেই অবেহলায় সময় নষ্ট করবে?'

হাসান বসরি বলেন-

'আদম-সন্তান, তোমার জীবনের প্রতিটি দিন তোমার মেহমানের মতো। যথাযথভাবে এ মেহমানের আপ্যায়ন করো। যদি তার যথার্থ আপ্যায়ন করতে পারো, তবে সে তোমার জন্য প্রশংসা করতে করতে যাবে। আর যদি মন্দ আচরণ করো, তবে সে তোমার নিন্দা করতে করতে বিদায় নেবে। একইভাবে প্রতিটি রাতও তোমার মেহমান।'

ওহায়িব ইবনুল ওয়ারদ বলেন:

'যদি এমনটা করতে সমর্থ হও যে, তোমাকে আল্লাহর স্মরণ থেকে কেউ অমনোযোগী করতে পারবে না, তবে তুমি এমনটাই কোরো।'

কারণ সময়ের চলে যাওয়ার বিষয়টিতে মানুষ একরকম উদাসীন। বিষয়টি হাসান বসরি-এর একটি উক্তিতে ফুটে উঠেছে আরও সুন্দরভাবে। তিনি বলেন :

'আদম-সন্তান, তোমার অবস্থা হচ্ছে, দুটি বাহক-উটের মাঝে এক বেচারার মতো। একটি উট তোমাকে এ দিকে তাড়িয়ে নেয় তো আরেকটি ওদিক থেকে তাড়িয়ে এদিকে আনে। রাত তোমাকে দিনের দিকে তাড়িয়ে নেয়। আর দিন তোমাকে রাতের দিকে তাড়িয়ে নেয়। রাত ও দিনের মাঝে এভাবেই তুমি থাকবে, যতক্ষণ না এ দুটো তোমাকে আখিরাতের নিকট সমর্পণ করে। তাহলে বলো, হে আদম-সন্তান, তোমার চেয়ে অধিক বিপদাপন্ন আর কে আছে?'

রাবিয়া আল-আদাবিয়া সুফইয়ান-এর উদ্দেশে বলেন :

'সুফইয়ান, আপনি কেবল কিছু দিনের সমষ্টি। যখন একটি দিন যায়, তখন মূলত আপনার খানিকটা অংশ চলে যায়। যে জিনিস একটু একটু করে ক্ষয়ে যায়, সে জিনিসটা একদিন বিলীন হয়ে যায়। আপনি তো এসব জানেন।... তাই আমল করুন।'

'তুমি কি দেখো না, সময় কত দ্রুত ফুরিয়ে যায়?

এই তো সেদিন তুমি কিশোর ছিলে, আজ তো টগবগে যুবক হয়েছ।' যুবক ভাই,

যৌবনের সময়টা সুস্থতা ও শক্তিমত্তার সময়। এ সময় কাজে থাকে দ্রুত গতি, শক্তিশালী চলনবলন, শরীরের যাবতীয় ইন্দ্রিয় থাকে সতেজ-সবল। এ সময়ই আমল ও ইবাদতের উত্তম সময়। তোমার নিকট আমার একটি প্রশ্ন, আখিরাতের পাথেয় কী পরিমাণ জোগাড় করেছ তুমি?!

যৌবনের এ সুস্থতা যৌবন চলে যাওয়ার পর আর নাগাল পাবে না। এমন কর্মোদ্যম তোমার আর থাকবে না। যৌবন চলে গেলে তোমার সতেজতা- সবলতা সবই উবে যাবে এক এক করে।

সাফিয়া বিনতে সিরিন ˜ অসিয়ত করে বলতেন—

‘হে যুবকদল, তোমরা নিজেদের সময়কে কাজে লাগাও। নিজের জীবনকে মূল্য দাও। তোমরা যুবক। আর আমার মতে, যৌবনই আমলের মোক্ষম সময়। '

إن الشباب حُجَّةُ التصابي ** روائح الجنة في الشباب

'যুবকদের মাঝেই দেখা যায় ধোঁকায় পড়ে থাকার প্রমাণ। আবার তাদের মাঝেই পাওয়া যায় জান্নাতের ঘ্রাণ। '

একজন যুবক দেখে তার অনেক অবসর। তার হাতে অনেক সময়। এত অবসর-সময় তার কোনো প্রয়োজনই নেই। তাই সময়ের প্রতি তার ভ্রুক্ষেপও নেই এতটুকুও। তাদের মন যা চায়, তারা কোনো বিবেচনা না করেই তা-ই করে বেড়ায়। অথচ...

'কোনো এক ইদের দিন। কাজি শুরাইহ ﷴ হেঁটে যাচ্ছিলেন। পথিমধ্যে তিনি একদল যুবকের পাশ দিয়ে গেলেন। দেখলেন, যুবকরা খেলায় লিপ্ত। শুরাইহ তাদের বললেন, “তোমরা কেন খেলাধুলায় লিপ্ত আছ?” যুবকরা উত্তর দিল, “আমরা অবসর, তাই খেলছি।” শুরাইহ বললেন, “অবসর সময়ে কি তোমাদের এমনটা করার আদেশ দেওয়া হয়েছে?” এ বলে তিনি তিলাওয়াত করলেন-

فَإِذَا فَرَغْتَ فَانصَبْ - وَإِلَى رَبِّكَ فَارْغَب

"কাজেই তুমি যখনই অবসর পাবে, তখনই ইবাদতে কঠোর শ্রমে লেগে যাবে। এবং তোমার রবের প্রতি গভীরভাবে মনোনিবেশ করবে."

অবসর সময়টাও যে একটা সময়। এ সময়ও যে চলে যায়। এগুলো কি আমরা খেয়াল রাখি। অবসর হওয়ার মানে তো এটা নয় যে, সে সময়গুলো নষ্ট করার বৈধতা পাওয়া যায়!

ইবনুল আকিল। তিনি নিজের ব্যাপারে ফতওয়া দিয়ে বলছেন, 'আমি নিজের জন্য আমার জীবনের একটি মুহূর্তও নষ্ট করা হালাল মনে করি না। যখন ইলমের আলোচনা ও তর্ক-বিতর্ক করতে আমার জিহ্বা অক্ষম হয়ে যায়, এমনকি আমার চোখ মুতালাআ করতেও অসমর্থ হয়ে যায়, তখন আমি আরাম করি। আর আরামের সময়ও নিজের চিন্তাশক্তিকে কাজ দিয়ে রাখি।'

ফুজাইল বিন ইয়াজ এক ব্যক্তিকে জিজ্ঞেস করলেন, 'কত দিন হলো আপনার সাথে আমি প্রমাণভিত্তিক বিতর্ক করে যাচ্ছি?'

- ৬০ বছর।

- ৬০ বছর সময় যদি আপনি রবের পানে সফর করতেন, তবে এখন তাঁর নিকটবর্তী হয়ে যেতেন প্রায়।

লোকটি বলল : إِنَّا لِلَّهِ وَإِنَّا إِلَيْهِ رَاجِعُونَ (ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাহি রাজিউন।)

ফুজাইল বললেন, 'আপনি কি এর অর্থ জানেন? যে ব্যক্তি জানে যে, সে আল্লাহর বান্দা। আল্লাহর কাছেই সে ফিরে যাবে। তাহলে সে অবশ্যই জেনে থাকবে, রবের সামনে তাকে দাঁড়াতে হবে। যে ব্যক্তি জানে যে, তাকে আপন রবের সামনে দাঁড়াতে হবে। সে এটাও অবশ্যই জানে, সে জিজ্ঞাসিত হবে। যে ব্যক্তি জানে যে, তার কৃতকর্ম সম্পর্কে সে জিজ্ঞাসিত হবে, তবে সে যেন জবাবদিহির প্রস্তুতি নিয়ে রাখে।'

এবার লোকটি বলল, 'তাহলে উপায় কী?'

ফুজাইল বললেন, 'খুব সোজা।'

লোকটি বলল, 'সেটা কী?'

ফুজাইল বললেন, 'বাকি জীবন সৎ আমল করুন। আগের জীবনের গুনাহগুলো মাফ করে দেওয়া হবে। আর যদি বাকি জীবনটাও মন্দকর্মে লিপ্ত থাকেন, তবে আগের ও পরের সব গুনাহ সম্পর্কে আপনাকে জবাবদিহি করতে হবে।'

প্রিয় ভাই,

সময় খুব দ্রুতই চলে যায়। চোখের পলকেই হাওয়া হয়ে যায় যেন বছরের পর বছর। অনেক বছর পেরিয়ে গেল। অথচ মনে হয়, তা কেবল যেন কোনো এলোমেলো স্বপ্নই ছিল।... সময়ের নির্গমনে আমরা আমাদের জীবনের পরিসমাপ্তিতে পৌঁছে যাচ্ছি।... প্রতিটি মুহূর্তই মৃত্যুর প্রতি আমাদের একেকটি পদক্ষেপে অগ্রসর হওয়া।

সময় আমাদের নিয়ে অগ্রসর হচ্ছে। যেন কোনো মেঘ বাতাসের ঝোঁকে এগিয়ে চলছে।... আপনার চোখদুটি কিছু সময়ের জন্য বন্ধ করুন। হাত বাড়িয়ে দেখুন। কি কিছু ধরতে পেরেছেন? মেঘ কি আপনার হাতের নাগালে এসেছে?...না, কখনো আপনি এ মেঘকে ধরতে পারবেন না।... সময়কে অল্পজনই ধরতে পেরেছে। আল্লাহ তাআলা যাদের সাহায্য করেছেন, যাদের তিনি তাওফিক দিয়েছেন, তারাই এমনটা পেরেছেন। আমাদের সালাফে সালিহিন সময়ের সদ্ব্যবহারের প্রতি, অধ্যবসায়ের সাথে আমল করার প্রতি উৎসাহী ছিলেন।... বিনা আমলে একটি মুহূর্তও কাটবে—এমনটা তারা হতে দিতেন না।

এমনই একজন সালাফের কথা আমাদের শুনাচ্ছেন মুসা বিন ইসমাইল ৯। তিনি বলেন:

'যদি বলি, হাম্মাদ বিন মাসলামাকে কখনো আমি হাসতে দেখিনি, তবে আমি সত্যই বলেছি। হাম্মাদ হয় হাদিসের দরস দিতেন বা তাসবিহ আদায় করতেন অথবা কুরআন তিলাওয়াত করতেন কিংবা নামাজ পড়তে থাকতেন। দিনের সময়কে তিনি এভাবেই ভাগ করে নিয়েছিলেন।

আল-মুআফা বিন ইমরান -কে যখন জিজ্ঞেস করা হলো, 'সে লোকের ব্যাপারে আপনার মতামত কী, যে কবিতা রচনা করে আর তা বলে বেড়ায়?'

মুআফা বললেন, 'তোমার জীবন তোমার সময়। তুমি যেভাবে চাও সেভাবে সময়টা ধ্বংস করতে পারো।'

মুহাম্মাদ বিন ওয়াসি -কে বলা হলো, 'আপনার সকাল কেমন হলো?'

তিনি উত্তর দিলেন, 'এমন একজন ব্যক্তি সম্পর্কে তোমার ধারণা কী, সে কেমন আছে, যে প্রতিদিনই সময়ের একেকটি স্তর পার করে আখিরাতের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে?'

যদি আমরা এ কথা নিয়ে চিন্তা করি, তবে জীবনের প্রতি আমাদের দৃষ্টিভঙ্গি ঈসা ইবনুল হুজাইলের মতো হতে বাধ্য। তিনি বলেন:

'আদম-সন্তান, আমাদের জীবনের বাকি যে সময়টা আছে, তার মূল্য কত? না, আমার প্রিয় ভাই, সময়ের কোনোই মূল্য হয় না। সময় যে অমূল্য। আমরা যদি আবু ইউসুফ ইয়াকুব আল-আনসারির জীবনের অন্তিম সময়ে ঘটিত ঘটনার কথা স্মরণ করি, তবে সময় যে অমূল্য—এ কথাটি কিছুটা হলেও বুঝতে পারব। ইবরাহিম ইবনুল জাররাহ আল-কুফি যেমন বর্ণনা করেছেন, তেমনই বলছি—

আবু ইউসুফ অসুস্থ হয়ে পড়লেন। তিনি মুমূর্ষু অবস্থায়। আমি তাকে দেখতে এলাম। এসে দেখলাম, তিনি অচেতন হয়ে আছেন। যখন তার চেতনা ফিরে এল, আমাকে তিনি বললেন:

“হে ইবরাহিম। এ মাসআলার ব্যাপারে তোমার অভিমত কী?”

আমি বললাম, “এ অবস্থায় এ নিয়ে আলোচনা?!”

তিনি বললেন, "কোনো সমস্যা নেই এতে। আমরা আলোচনা করব, হতে পারে এর সমাধান হলে এমন সমস্যায় পতিত কেউ সহজে উতরে যেতে পারবে।"

এরপর তিনি বললেন, "হে ইবরাহিম। হজ পালনের সময় পাথর নিক্ষেপের কোন পদ্ধতিটি উত্তম? হেঁটে হেঁটে পাথর নিক্ষেপ করা উত্তম নাকি আরোহী অবস্থায়?” আমি বললাম, “আরোহী অবস্থায়।”

তিনি বললেন, “ভুল বললে তুমি।”

আমি বললাম, “তবে হাঁটা অবস্থায়।”

তিনি বললেন, “ভুল বললে তুমি।"

আমি বললাম, “আপনিই বলে দিন। আল্লাহ আপনার প্রতি সন্তুষ্ট হোন।”

তিনি বললেন, “যেখানে দুআর জন্য দাঁড়াতে হবে, সেখানে হেঁটে হেঁটে পাথর নিক্ষেপ করা উত্তম। আর যেখানে দাঁড়াতে হবে না, সেখানে আরোহী অবস্থায় পাথর নিক্ষেপ করা উত্তম।"

এরপর আমি তাঁর কাছ থেকে উঠে এলাম। যখন আমি দরজার কাছে, তখন চিৎকারের শব্দ শুনলাম। বুঝলাম, আবু ইউসুফ মৃত্যুবরণ করেছেন। আল্লাহ তার ওপর রহম করুন। '

আল্লাহ তাদের দিনগুলোতে, তাদের সময় ও আমলে বরকত দান করেছেন। কারণ তারা নিজেদের দিনগুলোকে খুবই গুরুত্বপূর্ণ মনে করতেন। যেমন কবি বলেন:

إِذَا مَرَّ بِي يَوْمٌ وَلَمْ أَقْتَبِسْ هُدَى وَلَمْ أَسْتَفِدْ عِلْمًا فَمَا ذَاكَ مِنْ عُمُرِي

'যখন আমলহীন, ইলমহীন একটি দিনও কেটে যায়, তখন আমি নিজেকে বলি, এমন জীবন আমার নয়।'

লক্ষ করুন ভাই। আপনার আজকের দিনটি নিয়ে একটু ভাবুন। আজ আপনি কতটুকু আমল করেছেন? অথচ আপনি জানেন, দুনিয়া কেবল তিনটি দিনের সমষ্টি। যে সম্পর্কে হাসান বসরি বলেন:

‘এ দুনিয়া তিন দিনের। গতকাল, আজ, আগামীকাল। গতকাল তো যা হওয়ার তা হয়ে গেছে। আর আগামীকাল তুমি পাবে কি পাবে না, তার কোনো ঠিক-ঠিকানা নেই। তবে আজকের দিনটিই তোমার সুযোগ। তাই আমল করে নাও আজকের দিনেই।'

দাউদ আত-তায়ি বলেন:

'আদম-সন্তান, তুমি তোমার আশার জিনিস পেয়েছ ঠিকই। কিন্তু তোমার আয়ু থেকে কিছু অংশ খুইয়ে তবেই তা পেয়েছ। আমলের ব্যাপারে তুমি গড়িমসি করেছ। যেন আমল করলে অন্য কারও উপকার হবে, তোমার নয়!'

প্রিয় ভাই,

ফরজ-ওয়াজিব আদায় করতে গেলে আমরা কত দ্রুত গতির হয়ে যাই! কতটুকু সময় নিয়ে এ গুরুত্বপূর্ণ আমল আদায় করলাম, তার প্রতি সামান্য ভ্রুক্ষেপও নেই আমাদের! যেভাবেই হোক হলেই হয়, কোনো রকম করলেই হয়—এমন নিচু মানসিকতা নিয়ে আমরা চলি। সামান্য কয়েক মিনিট ফরজ-ওয়াজিব আদায়ের জন্য। এরপর সে-ই আমরাই ঘণ্টার পর ঘণ্টা অনর্থক কাজে, আড্ডার আসরে নষ্ট করে ফেলি অবহেলায়, অনাদরে। আল্লাহ আমাদের রক্ষা করুন।

إنا لنفرح بالأيام نقطعها ** وكل يوم مضى يدني من الأجل فاعمل لنفسك قبل الموت مجتهدا ** فإنما الربح والخسران في العمل

‘দিনগুলো কাটিয়ে আমরা কেমন যেন আনন্দিত হই! অথচ প্রতিটি দিনই আমাদের মৃত্যুর সময় এগিয়ে দিচ্ছে।

তাই মৃত্যুর আগেই কঠোর সাধনায় নিমগ্ন হও। কারণ আমলের সফলতা প্রকৃত সফলতা, আমলের বিফলতাই প্রকৃত বিফলতা।’

আমাদের জীবনের দিনগুলো তার আলো নিয়ে চলে যায়। আমলের সুযোগ নিয়ে কালের গর্ভে হয়ে যায় বিলীন। যদি আমরা এ দিনগুলোতে সঠিকভাবে আমল করে থাকি, তবে একটি সুবর্ণ সুযোগ কাজে লাগালাম। জীবনের এমন উপলব্ধিই সালাফে সালিহিন থেকে পেয়েছি আমরা। সাঈদ বিন জুবাইর বলেন :

‘মুমিনের প্রতিটি দিন একেকটি সুবর্ণ সুযোগ। ফরজ আদায়, নামাজ পড়া, আল্লাহ-প্রদত্ত তাওফিকে জিকির করার মতো একেকটি সুবর্ণ সুযোগ নিয়ে আসে একেকটি দিন।’

সময়-সংরক্ষণের সুফল আমরা দুনিয়াতেই দেখতে শুরু করি। আখিরাত পর্যন্ত অপেক্ষার প্রয়োজন পড়ে না তেমন। তা ছাড়া একজন উদাসীন মুমিন কি একজন ইবাদতকারী মুমিনের সমান হতে পারে?!... একজন পাপী কি একজন অনুগত বান্দার সমান হতে পারে!

ইবরাহিম বিন শাইবান বলেন :

‘সময়-সংরক্ষণের অর্থ নিজের জীবনের সংরক্ষণ করা। যে ব্যক্তি আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে আমল করে সময় কাজে লাগায়, সময়কে নষ্ট হতে দেয় না—আল্লাহ তার দ্বীন ও দুনিয়া দুটোই সংরক্ষণ করেন।’

দিন ও রাত সময়ের একেকটি মনজিল। বিষয়টি দাউদ আত-তায়ি-এর ভাষায় চমৎকারভাবে উঠে এসেছে। তিনি বলেন:

'দিন-রাত সময়ের একেকটি স্তর। মানুষ একেকটি স্তর পার হয়ে সামনে এগিয়ে চলে। এভাবে এক সময় অবসান ঘটে তাদের জীবন-সফরের। যদি কেউ সময়ের প্রতিটি স্তরে, প্রতিটি দিনেই জোগাড় করতে পারে সামনের জীবনের পাথেয়, তবে সে যেন এমনটাই করে।

যদি এ জীবন-সফর খুব দ্রুতই শেষ হয়ে যায়! এমনটা কি হতে পারে না?! হ্যাঁ, বিষয়টা যে এর চেয়ে দ্রুতও ঘটতে পারে। আমরা জানি না, কত দ্রুত আমাদের জীবন-সফর শেষ হয়ে যায়। তাই নিজের এ সফরের পাথেয় জুগিয়ে নিন। যে কাজটি আপনার করা কর্তব্য, তা করতে থাকুন। হয়তো যেকোনো সময়েই সহসা অবসান হবে এ জীবন-সফরের!'

হে ভাই, আপনার মনে হতে পারে, এ দুনিয়াতে আপনি স্থায়ীভাবে থাকবেন। কিন্তু এমনটা ভুল, এমন চিন্তা ভ্রান্ত চিন্তা। আপনি তো সফরে আছেন। সময় আপনাকে তাড়িয়ে চলেছে দ্রুত গতিতে। মৃত্যু আপনার অভিমুখে অবিরত যাত্রায় রয়েছে। আর পেছনে আপনার দুনিয়া গুটিয়ে আসছে। আপনার জীবন থেকে যে সময় গেছে, সে সময় আর ফিরে আসবে না।

কীভাবে দুনিয়া নিয়ে আনন্দে থাকা যায়! এখানে দিনগুলো মাসকে শেষ করে দেয়। মাস শেষ করে বছরকে। বছর শেষ করে এ জীবনকে। জীবন এগিয়ে যায় মৃত্যুপথে। তাহলে যার জীবন তাকে মৃত্যুকোলে নিয়ে যাচ্ছে, সে কীভাবে আনন্দিত হতে পারে?! দুনিয়ার এ জীবন একটি অবিরত সফর। আর এ দুনিয়া একটি ধূসর মরীচিকা।

আবু জমিরা সাফওয়ান বিন সালিম -এর স্মৃতিচারণ করতে গিয়ে বলেন: 'আমি তাকে দেখেছি। যদি তাকে বলাও হতো, "আগামীকাল কিয়ামত।” তবুও আরও বেশি আমল করার সুযোগ তার ছিল না। কারণ তিনি তার পুরো সময়টা আমলের মাঝেই কাটাতেন। '

প্রিয় ভাই,

সালাফে সালিহিন সময়ের প্রতি কত গুরুত্ব দিতেন! কত বড় বড় নেক আমল তারা করতেন! তাদের সেসব আমলের সামনে আমরা কিছুই নই। আর আমরা আমলে কত ঘাটতি করি, তার কোনো ইয়ত্তা নেই। তাদের আমল দেখে আমরা লজ্জায় চুপসে যাই। আমলের প্রতি তাদের আগ্রহ-উদ্দীপনা দেখে আমরা জানতে পারি, কীভাবে তারা এমন মর্যাদাবান হয়েছেন। সময়ের সঠিক মূল্যায়নের কারণেই বড় হয়েছেন তারা। আর আমরা সময় নষ্ট করি, অপচয় করি-যা কেবল বৃদ্ধি করে আমাদের হতাশা ও নিরাশা। কত সময় আমরা নষ্ট করেছি! কত সুযোগ আমরা অবহেলায় হারিয়ে ফেলেছি!

আবু সুলাইমান আদ-দারানি -এর নিকট সময়ের স্বরূপ সম্পর্কে কিছুটা জেনে নিই। তার কথায় সময় যেমন-

'যার অতীত জীবন আনুগত্যহীন, ইবাদতহীন কেটেছে। কোনো বুদ্ধিমান এতটা সময় অনর্থক ব্যয় করেও যদি তা তার কাঁদার কারণ না হয়, তবে সময়ের গুরুত্ব না বোঝার কারণটাই মৃত্যু পর্যন্ত বাকি জীবন কাঁদার জন্য যথোপযুক্ত একটি কারণ। কিন্তু যে ব্যক্তি এখনো সময়ের মূল্য বোঝেনি। নিজের জীবনকে আগের মতোই মূর্খতার জীবনের মতো কাটিয়ে দিচ্ছে, তার ব্যাপারটা কেমন ভয়ংকর হতে পারে!'

মালিক বিন দিনার। দুনিয়াবিমুখতা, দ্বীনদারি, ইবাদতের জন্য যিনি প্রসিদ্ধ ছিলেন জগত্ময়। তার স্মৃতিচারণে সালাম বিন মুতি বলেন:

'এক রাতের কথা। আমি মালিক বিন দিনারের কাছে গেলাম। তিনি বাড়িতেই ছিলেন। কিন্তু গিয়ে দেখলাম, বাতি ছাড়াই তিনি বসে আছেন। আর তার হাতে কিছু রুটির টুকরো। হাতে রুটি রেখে দাঁত দিয়ে কামড়ে খাচ্ছেন। আমি তাকে বললাম, “আবু ইয়াহইয়া, ঘরে কি বাতি নেই? রুটি রাখার মতো ঘরে কি এমন কোনো পাত্র নেই?” তিনি উত্তর দিলেন, "আমাকে আমার মতো থাকতে দাও। আল্লাহর কসম, অতীত জীবন নিয়ে আমি বড়ই লজ্জিত।”””

সময়-সংরক্ষণের ব্যাপারে আমরা কত উপদেশই তো শুনি। কত ঘটনা আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে সময়ের গুরুত্ব বুঝিয়ে যায়। বইয়ের পাতায়, লেখার হরফে সময়ের গুরুত্ব বিষয়ে কত লেখাই তো পড়ি। কিন্তু তবুও যদি আমাদের হুঁশ ফিরত! হতে পারে উমর বিন কাইস আল-মালায়ি -এর উক্তি শুনে যদি আমরা বিষয়টা আমলে নিই। তিনি বলেন:

'যখন কোনো কল্যাণময় কাজের কথা তোমার কাছে পৌঁছে, তবে তা করে ফেলো। একবার হলেও তো তুমি একটি কল্যাণময় কাজ করলে। কল্যাণের অধিকারী হলে। কিন্তু সময় গেলে তার আর কি সুযোগ হবে?'

'যখন কোনো মুমিন সংকল্প করে রব ও রবের সন্তুষ্টি পাওয়ার সফর শুরু করার, তখন বিভিন্ন ধরনের ধোঁকা ও প্রতিবন্ধকতা সামনে এসে দাঁড়ায়। প্রবৃত্তির কামনা-বাসনা, নেতৃত্বের অভিলাষ, দুনিয়ার ভোগ-উপভোগ ও চাকচিক্য ইত্যাদি নানান জিনিস নানারূপে মুমিনকে বশ করে নেয়। যদি সে এসবের মোহে আকৃষ্ট হয়ে যায়, তবে রবের পথে তার সফর এখানেই শেষ হয়ে যায়।

কিন্তু যদি মুমিন এসব বাধা মাড়িয়ে সামনে এগিয়ে যায়, সঠিক প্রমাণ করে নিজের সংকল্পকে—তবে বিভিন্ন রকম পিছুটান, লোকদের হাতচুম্বন, মজলিসে হওয়া তার জন্য প্রশস্ততা, তার কল্যাণের আশায় তার দিকে ইশারা করে দুআ করা প্রভৃতি পরীক্ষায় মুমিন পরীক্ষিত হয়।

যদি মুমিন এখানে এসে থেমে যায়, তবে রবের পথের সফর থেকে সে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে। সে তা-ই পায়, যা সে নিজের করে নিয়েছে পথের মাঝে এসে। কিন্তু যদি সে এ বাধা ডিঙিয়ে এগিয়ে যায়, তবে সামনে সে বিভিন্ন কারামাতের মাধ্যমে পরীক্ষিত হয়। যদি সে এখানে এসে থেমে যায়, তবে সে কপর্দকশূন্য হয়ে পড়ে। রবের সাথে তার সম্পর্ক জুড়ে না। বরং মানুষের ভিড়ে, মানুষের দেওয়া সম্মানে, দুনিয়ার অবসরের মাঝে সে হারিয়ে যায়। যদি সে এখানে এসে থেমে যায়, তবে উদ্দিষ্ট গন্তব্য থেকে সে বিচ্ছিন্ন হয়ে পড়ে।

কিন্তু যদি এখানে এসে সে না থামে; বরং আল্লাহর উদ্দেশ্য পূরণে, আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য সামনে তাকিয়ে লক্ষ্যপানে এগিয়ে যায়—চাই তা যেখানেই হোক যেভাবেই হোক, চাই সে ক্লান্ত হোক বা এ সফর তার জন্য আরামদায়ক হোক, তার চলার পথ স্বাচ্ছন্দ্যময় হোক বা কষ্টদায়ক হোক—এ সফর তাকে মানুষের সঙ্গযাপনে নিয়ে আসুক বা তাদের থেকে পৃথক করুক; সে মুমিন নিজের জন্য তা-ই বেছে নেয়, যা তার মনিব তার প্রতিপালক মহামহিম আল্লাহ বেছে নিয়েছেন। রবের আদেশের ওপর অটল থাকে সে। রবের আদেশ বাস্তবায়ন করে যায়, যতটুক তার পক্ষে সম্ভব হয়। আর নিজের প্রবৃত্তি তার নিকট অতি তুচ্ছ হয়ে থাকে। নিজের আরাম-উপভোগ নিজ রবের আদেশ ও সন্তুষ্টির জন্য সে ত্যাগ করে। এ ব্যক্তিই সে মুমিন, যে সফরের আসল গন্তব্যে পৌঁছবে। যার সংকল্প বাস্তয়িত হবে। আপন রবের সাথে যার সম্পর্ক বিচ্ছিন্ন হবে না মোটেই। '

সময় সংরক্ষণ করতে পারা একটি নিয়ামত। সময় কাজে লাগানোর যোগ্যতা একটি নিয়ামত। আল্লাহ যাদের এ নিয়ামত দান করেছেন, তারাই রবের ইবাদতে নিজেদের প্রতিষ্ঠিত রাখতে সক্ষম হন। সুফইয়ান -এর মুখেই শুনুন এমন একটি দৃষ্টান্ত। আমর বিন কাইস -এর ঘটনা বর্ণনা করে তিনি বলেন:

'আমর বিন কাইস হলেন সে ব্যক্তি, যিনি আমাকে শিষ্টাচার শিখিয়েছেন। তার কাছেই আমি কুরআন পাঠ শিখেছি। তিনিই আমাকে ফরজগুলো শিখিয়েছেন।

সে সময়টাতে আমি প্রথমে গিয়ে তাকে তার দোকানে খুঁজতাম। সেখানে না পেলে বাড়িতে তাকে পেয়ে যেতাম। দেখতাম, হয়তো তিনি নামাজ পড়ছেন বা কুরআন তিলাওয়াতে মগ্ন আছেন। তার অবস্থা এমন ছিল, যেন সুযোগ হারিয়ে ফেলার ভয়ে তিনি সময়ের সাথে প্রতিযোগিতা করে চলছেন অবিরত। কিন্তু যখন তাকে বাড়িতে না পেতাম, তখন খুঁজতে খুঁজতে কুফার কোনো এক মসজিদে তো পেয়েই যেতাম। দেখতাম, মসজিদের কোনো এক কোনে তিনি। যেন কোনো চোর নিজ অপরাধে বসে বসে কেঁদে চলেছে। কিন্তু যদি তাকে কোনো মসজিদে না পেতাম, তবে দেখতাম, কোনো এক মাকবারায় তিনি বসে আছেন। নিজের কথা চিন্তা করে কেঁদে চলেছেন।... '

وَلا أُوخِرُ شُغْلَ الْيَوْمِ عَنْ كَسَلٍ ** إِلَى غَدٍ إِنَّ يَوْمَ الْعَاجِزِيْنَ غَدُ

'অলসতাবশত আজকের কাজ কালকের জন্য রেখে দেবো না। কেননা অলসদের আজ হয় আগামীকাল।'

আমর বিন দিনার তার পুরো রাত ভাগ করে নিতেন তিনটি ভাগে। ঘুমের জন্য একটি অংশ। হাদিস অধ্যয়নের জন্য একটি অংশ। রাতের আরেকটি অংশ রাখতেন নামাজের জন্য。

বর্তমান যুগের মন্দ প্রভাবে মানুষ বদলে গেছে। সঠিকতা থেকে দূরে সরে গেছে অনেকখানি।...আজও মানুষের মাঝে দৃঢ় সংকল্প আছে। আছে উচ্চ মনোবল। তবে তা কেবল দুনিয়ার পেছনেই।... দুনিয়ার কিছু ছুটে যায় কি না, কোনো কিছু না পাই কি না—এমন চিন্তা ও উদ্বেগ কাজ করে আমাদের মাঝে। দুনিয়ার তুচ্ছ থেকে তুচ্ছ বস্তু পাওয়াই যেন আমাদের আসল ব্রত।... আখিরাতের প্রতি ভ্রুক্ষেপই নেই!... আখিরাতের জীবনের জন্য সামান্য চেষ্টাও নেই! আমাদের এমন বেহাল দশা মুহাম্মাদ ইবনুল মুবারক যেন আঁচ করতে পেরেছিলেন। তিনি বলেন :

'তোমার ধারণা, মুদির দোকানের পণ্য শেষ হয়ে যাবে। তাড়াতাড়ি না গেলে সব মানুষে নিয়ে যাবে! তাই তো সকাল সকাল গিয়ে সেখানে ধরনা দাও। কিন্তু আল্লাহর উত্তম নিয়ামতগুলো যে তুমি হারাতে বসেছ, সেটা তোমাকে ভীত করে না! কোন সৌভাগ্য তুমি হারাতে বসেছ, সেটা তোমাকে চিন্তিত করে না! যে কাজে তোমার দৌড়ে আসার কথা, সে কাজ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিজেকে ব্যস্ত রাখার ভান করছ!'

এক লোককে উপদেশ দিতে গিয়ে জুনাইদ বলেন : 'তিন কথায় সকল কল্যাণ বয়ান করা যায়।

এক. যদি তোমার দিন তোমার কোনো উপকারে ব্যয়িত না হয়, তবে তা তোমার অপকারে ব্যয় কোরো না।

দুই. যদি তুমি উত্তম মানুষদের সঙ্গী না হতে পারো, তবে অন্তত খারাপ লোকদের নিজের সঙ্গী বানিও না।

তিন. যদি তুমি আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে সম্পদ ব্যয় না করো, তবে আল্লাহর ক্রোধ ডেকে আনে, এমন পথে তা খরচ কোরো না।'

এ তো গেল সর্বনিম্ন পর্যায়ের কথা। অন্যথায় আমলের পথ তো খোলা। আর আখিরাত-প্রত্যাশী তো কম আমলে সন্তুষ্ট হবেই না। ওয়াকি ইবনুল জাররাহ প্রতিদিন কুরআনের এক-তৃতীয়াংশ তিলাওয়াত করা ব্যতীত ঘুমাতে যেতেন না। এরপর ঘুম থেকে উঠতেন শেষ রাতে। কুরআনের মুফাসসাল সুরাগুলো পড়তেন। এরপর ইসতিগফার করতে থাকতেন ফজর পর্যন্ত। ফজরের সময় হয়ে গেলে দুই রাকআত সুন্নাত পড়তেন।

আমল নিয়ে সব সময় তাদের মনে ভয় থাকত। আমলগুলো কবুল হবে তো?-এমন একটা শঙ্কা কাজ করত। দাহহাক বিন মুজাহিম -এর কথা বলি। সন্ধ্যা নেমে এলে তিনি কাঁদতে থাকতেন। কাঁদার কারণ জানতে চাইলে তিনি বলতেন, 'জানি না, আজ আমার আমল ওপরে গিয়েছে কি না!'

আমার প্রিয় ভাই, আপনাকে বলছি। আপনার উদ্দেশে একটি সত্য উপদেশ। মূল্যবান একটি নাসিহা। নাসিহাটি আমার নয়। এটি ফুজাইল বিন ইয়াজ -এর—

'তোমরা চিন্তা করো। লজ্জিত হওয়ার আগেই আমল করো। দুনিয়ার ধোঁকায় পড়ো না। দুনিয়ার যা কিছু সুস্থ মনে হয়, মূলত তার সবই রুগ্ন। দুনিয়ার নতুন যা কিছু আছে, তা মূলত জীর্ণ। দুনিয়ার যত সুখ ও ভোগ আছে সবই নশ্বর। সবই একদিন নিঃশেষ হবে। দুনিয়ার মিছে যৌবনও জরাগ্রস্ত, বার্ধক্যের দোষে দুষ্ট।

সময় সংরক্ষণের ব্যাপারে তারা ছিলেন প্রচণ্ড যত্নশীল। তারা উপকার গ্রহণ করতেন সময়ের প্রতিটি কণা থেকে। আমরা যখন কোথাও যাই, তখন কিছুটা সময় তো পথে নষ্ট হয়ে যায়। এতে আমরা নির্বিকার থাকি। কিন্তু সালাফ এমন ছিলেন না। তারা নিজের সাথিদের প্রতি নির্দেশনাও দিতেন, যেন এতটুকু সময়ও অপচয় না হয়। জনৈক সালাফ তার ছাত্রদের বলেন:

'আমার কাছ থেকে বেরোবার পর তোমরা প্রত্যেকে আলাদা হয়ে যাবে, তাহলে পথে কুরআন তিলাওয়াত করে নিতে পারবে। অন্যথায় একত্রে গেলে তোমরা কথায় লিপ্ত হয়ে পড়বে।'

আশ্চর্য! বর্তমানে আপনি এমন অনেক যুবককে পাবেন, যারা সুন্নাত নামাজগুলো ঠিকমতো আদায় করে না! বরং তারা অনবরত কথা বলতে থাকে। আবার তাদের আড্ডার কারণে ফরজও ছুটে যায় অনেক সময়। আড্ডার জন্য তারা ফরজে অবহেলা করে। অথচ তারা মুসলিম। ফরজ ছুটে যাবে, সুন্নাত আদায় করবে না-এমনটা তো কল্পনারও বাইরে।

أيام عمرك تذهب ** وجميع سعيك يكتب ثم الشهيد عليك ** منك فأين المهرب؟

'তোমার জীবনের দিনগুলো একে একে গত হয়ে যাচ্ছে। তোমার সকল প্রয়াস লিপিবদ্ধ হচ্ছে।

এগুলোই একদিন তোমার বিরুদ্ধে সাক্ষ্য হবে। তখন তোমার পালাবার জায়গা কোথায়?'

আমাদের অনেকেরই খণ্ড-সময় কাজে লাগে না। অথচ এ সময়ে ছোট-খাটো কোনো কাজ সমাধা করে ফেলা যায়। কিন্তু অনেক সময় এমন অবস্থা হয় যে, এ সময়গুলো অপচয় হয়ে যাওয়া নিশ্চিত হয়ে যায়। ঠেকাবার কোনো উপায় থাকে না। এ ক্ষেত্রে সালাফ কী করতেন? উত্তরটা সহজ। তারা এ সময়টাও কাজে লাগাতেন। যে সময়গুলো অপচয় হওয়ার সম্ভাবনা শতভাগ, সে সময়গুলো থেকেও তারা ভরপুর ফায়দা নিতেন!

ইবনুল জাওজি বর্ণনা করছেন এমনই একটি অবস্থার কথা। কীভাবে নিষ্কর্ম লোকদের উপস্থিতিতেও সময় কাজে লাগাতে হয়, সে পাঠ আজ আমরা তার কাছ থেকে শিখছি। তিনি বলেন:

'আমি দেখলাম সময় অত্যন্ত মূল্যবান। তাই কল্যাণকর কাজেই সময় ব্যয় করা ওয়াজিব। সময় অপচয় করা আমার অপছন্দনীয়। কিন্তু কখনো অকর্মণ্য লোকদের দ্বারা বাধা-প্রাপ্ত হলে দুটি অবস্থা হয় তখন। এক. আমি তাদের প্রতি রূঢ় হলাম। তবে প্রিয় মানুষদের বিচ্ছেদে আমাকে একাকী জীবন কাটাতে হবে। দুই. যদি আমি তাদের সাথে সাক্ষাৎ করি, তবে সময় নষ্ট হবে।

তাই আমি যথাসাধ্য পরিমাণে সাক্ষাৎ না করার চেষ্টা করি। এরপর যদি আমি হেরে যাই। যদি দেখা করতেই হয়, তবে সাক্ষাৎ করি। তখন কথা সংক্ষিপ্ত করি। যাতে তাড়াতাড়িই আবার কাজে মগ্ন হতে পারি। সাথে সাথে দ্বিতীয় একটি পদক্ষেপও নিই। এমন কিছু কাজ আগে থেকেই প্রস্তুত রাখি, যেগুলো কথা বলার সময় বাধা হয়ে দাঁড়ায় না। কোনোভাবেই যেন সময় খালি না যায়, সে চেষ্টাই থাকে আমার।...সে জন্য আমি সেসব মানুষের সাক্ষাতের সময় আগে থেকেই প্রস্তুত থাকি। কখনো কাগজ কাটা। কখনো কলমের নিব সরু করা। কখনো-বা খাতাগুলো বাঁধাই করা। এসব কাজ তো সব সময় করা যায়। আবার এগুলো করার সময় আলাদা চিন্তা করারও প্রয়োজন পড়ে না। মনোযোগ দিয়েও করতে হয় না। তাই সাক্ষাতের আগে এগুলো তৈরি রাখি। যাতে একটু সময়ও নষ্ট না হয়।'

তাকিউদ্দিন আল-মাকদিসি। একটু সময়ও নষ্ট করতেন না তিনি। তার একটি রুটিন ছিল। ফজর পড়তেন। এরপর কুরআনের কিছু অংশ মুখস্থ করতেন। কখনো মুখস্থ করতেন হাদিসের কিছু অংশ। এরপর অজু করতেন। তারপর ৩০০ রাকআত নামাজ পড়তেন জোহরের কিছুটা আগ পর্যন্ত। এরপর ঘুমিয়ে পড়তেন। ঘুম থেকে উঠে জোহর পড়তেন। আবার আসর পর্যন্ত একটু ঘুমোতেন। মাগরিবের আগ পর্যন্ত ছাত্রদের পড়া শুনতেন বা লেখা প্রতিলিপি করতেন। মাগরিবের সময় হলে রোজা রাখলে ইফতার করতেন। মাগরিব নামাজ শেষে ইশা পর্যন্ত নামাজ পড়তে থাকতেন। এরপর রাতের অর্ধেক বা অর্ধেকের কিছু বেশি সময় ঘুমিয়ে নিতেন। ঘুম থেকে উঠে অজু করে নামাজে দাঁড়িয়ে যেতেন। ফজর পর্যন্ত নামাজেই কাটাতেন। এ সময়টাতে কখনো তিনি সাত বার বা তারও বেশি অজু করতেন। এ ব্যাপারে তিনি বলেন, 'যতক্ষণ পর্যন্ত আমার অঙ্গগুলো ভেজা থাকে, ততক্ষণ নামাজ হয় হৃদয় প্রশান্তকারী।' ফজরের কিছু আগ পর্যন্ত অল্প সময় তিনি ঘুমিয়ে নিতেন। এটাই ছিল তার দৈনন্দিন রুটিন।

মুসা বিন ইসমাইল বলেন :

'যদি তোমাদের বলি, হাম্মাদ বিন মাসলামাকে কখনো আমি হাসতে দেখিনি, তবে আমি সত্যই বলেছি। হাম্মাদ হয় হাদিসের দরসে ব্যস্ত থাকতেন বা কুরআন তিলাওয়াত করতেন বা তাসবিহ আদায় করতেন অথবা নামাজ পড়তে থাকতেন। দিনের সময়কে তিনি এভাবেই ভাগ করে নিয়েছিলেন। '

প্রিয় ভাই, সালাফের পথ ছেড়ে আজ কোথায় আমরা?!

আল্লাহ মানুষকে একটি উদ্দেশ্যে সৃষ্টি করেছেন। যখনই মানুষ সে উদ্দেশ্য অনুযায়ী চলে, তখনই তারা সময়ের যথাযথ ও সর্বোত্তম ব্যবহার করে।... একজন মানুষের প্রতিদান, তার জীবনের ফলাফল তার সময়ের ব্যবহারের অনুযায়ী হবে। মানুষের ডান হাতে বা বাম হাতে আমলনামা আসবে-সে আমলনামা তার সময়ের ব্যবহারের অনুযায়ী হবে। যে যেভাবে তার সময়কে কাজে ব্যয় করবে, তার আমলনামা তেমনই হবে।

أؤمل أن أحيا وفي كل ساعة ** تمر بي الموتى يهز نعوشها وهي أنا إلا مثلهم غير أن لي ** بقايا ليال في الزمان أعيشها

'আমার আশা আরও কিছু সময় বেঁচে থাকি, অথচ সর্বদা আমাকে অতিক্রম করে যায় বহু লাশ।

আমাকে শিখিয়ে যায়, আমিও তাদের মতো একজন। ব্যবধান শুধু এই—আমি বেঁচে আছি আর কিছু প্রহর।

ইমাম শাফিয়ি রা. রাতকে তিন ভাগ করতেন। রাতের প্রথম অংশ লেখার জন্য, দ্বিতীয় অংশ নামাজের জন্য, তৃতীয় অংশ ঘুমানোর জন্য নির্ধারণ করতেন।

প্রিয় ভাই,

‘আসুন, আমরা আল্লাহর নৈকট্যলাভের দিকে যাই। আল্লাহর প্রতিবেশিত্বে জান্নাতের শান্তিময় পরিবেশে প্রবেশ করি। যেখানে কোনো ক্লান্তি নেই, কোনো কষ্ট নেই, নেই কোনো প্রকারের পরিশ্রম।

সকলেই আমরা জান্নাতের কামনা রাখি। কিন্তু জান্নাত লাভের উপায়ই-বা কী? সে শান্তির নিবাস পাওয়ার একটি সহজ ও সুন্দর পথ রয়েছে। সেটা হচ্ছে, তুমি সময়ের একটি স্তরে আছ, যে স্তরটি সময়ের অন্য দুটি স্তরের মধ্যখানে অবস্থিত। সময়ের এ স্তরটিই মূলত তোমার জীবন। যাকে আমরা বলি বর্তমান। যা অতীত ও ভবিষ্যতের মাঝে অবস্থিত।

এখন তোমার করণীয় কী, তা-ই বলছি। তোমার অতীত সময়কে তাওবা, ইসতিগফার দিয়ে ঠিক করে নাও। পাপের প্রতি তুমি যে লজ্জিত, তা দিয়ে অতীত সময়কে সংশোধন করে নাও। এটা শক্ত কোনো কাজ নয়। কষ্ট বা বেশ পরিশ্রমের কোনো কাজও নয়। এটা কেবলই অন্তরের একটি কাজ। অন্তরের একটি আমল। এ কাজটিই তোমাকে ভবিষ্যতে পাপ থেকে বিরত রাখবে। এ কাজটি হাত-পা ইত্যাদি অঙ্গ দিয়ে করতে হবে না যে, তোমার বেশ পরিশ্রম হবে। বরং এ কেবলই দৃঢ় সংকল্প ও শক্ত নিয়তের সমষ্টি—যা তোমার শরীর ও মনে অতুলনীয় এক সমীরণ বয়ে দেবে। আর তোমাকে করবে আনন্দিত।

তোমার করণীয় কেবল একটি। জীবনটা সংশোধন করে নেওয়া। অতীত সময়টা আর ফিরে আসবে না। অতীত জীবনটা সংশোধন করে নাও তাওবা দিয়ে। আর ভবিষ্যৎ সময়টা এখনো আসেনি। সে সময়টা সংশোধন করে নাও দৃঢ় সংকল্প ও শক্ত নিয়তের মাধ্যমে। এ দুটি কাজে তোমার তেমন কোনো কষ্ট ও ক্লান্তি হবে না।

কিন্তু আসল কাজটি হচ্ছে তোমার বর্তমান সময়টা নিয়ে। এ সময়টাই দুই স্তরের সময়ের মধ্যকার স্তর। যদি তুমি এ সময়টা অপচয় করো, তবে তোমার মুক্তি ও সৌভাগ্যের পথই তুমি রুদ্ধ করে দিলে। কিন্তু যদি তুমি সময়ের দুটি স্তরের সাথে সাথে এ স্তরের সময়কেও যথাযথভাবে সংরক্ষণ করো, তবে তা-ই তোমার জন্য যথেষ্ট। এটাই তোমার মুক্তির জন্য যথেষ্ট। যথেষ্ট তোমার সফলতার জন্য। তোমার জান্নাতের নিবাস পাওয়ার সৌভাগ্যের জন্য এটাই যথেষ্ট। যথেষ্ট তোমার আরাম, আয়েশ ও বিবিধ নিয়ামত পাওয়ার ক্ষেত্রেও।

তবে এ সময়টা সংশোধন করা পূর্বে বর্ণিত দুটি স্তরের চেয়ে একটু কঠিন। এ সময়টা সংরক্ষণের জন্য তোমাকে সর্বদা সর্বোত্তম কাজটি করে যেতে হবে। অধিক উপকারী কাজটি করতে হবে। যাতে তুমি সবচেয়ে বড় সৌভাগ্যের অধিকারী হতে পারো।

কিন্তু এখানে এসেই মানুষের মাঝে হয়ে যায় একটি বড় রকমের পার্থক্য। আল্লাহর কসম! তোমার অবশিষ্ট সময়গুলো তো এগুলোই। সময়ের এ স্তরটিতেই তোমাকে তোমার প্রত্যাবর্তনস্থলের জন্য পাথেয় জোগাড় করতে হবে। এ সময়ে কৃতকর্মের ফলে হয়তো তোমার প্রত্যাবর্তনের জায়গাটি হবে জান্নাত নয়তো জাহান্নাম।

যদি তুমি রবের কাছে যাওয়ার পথটি গ্রহণ করো, তবে তুমি সবচেয়ে বড় সফলতা ও সৌভাগ্যকে নিজের করে নিলে। এ তো কেবল অল্প কিছু সময়ই। অনন্তকাল পর্যন্ত তো আর নয়। কিন্তু যদি তুমি প্রবৃত্তি, আরাম-আয়েশ, খেলাধুলাকে প্রাধান্য দাও, তবে এত দিন হারাম থেকে বেঁচে থেকে যে সবর করলে, ইবাদত ও আনুগত্যে অটল থেকে যে সবর করলে, নিজের প্রবৃত্তিকে দমন করে যে সবর করলে—সবই খুব দ্রুত মিটে যাবে।

আহমাদ বিন মাসলামা নিসাপুরি বলেন:

'হান্নাদ বিন সারি বেশি বেশি কাঁদতেন।... একদিন আমাদের পড়িয়ে তিনি অবসর হলেন। অজু করে মসজিদে চলে এলেন। আমিও তখন মসজিদেই ছিলাম। এরপর তিনি সূর্য ঢলে যাওয়া পর্যন্ত নামাজ পড়তে থাকলেন। নামাজ শেষে বাড়িতে ফিরে গেলেন। অজু করলেন। আবার এসে আমাদের নিয়ে জোহর আদায় করলেন। এরপর আগের মতোই আসর পর্যন্ত নামাজ পড়তে লাগলেন দুপায়ে দাঁড়িয়ে। এ সময় তিনি আওয়াজ করে কুরআন পড়ছিলেন। অধিক মাত্রায় কাঁদলেন। এরপর আমাদের নিয়ে আসর আদায় করলেন। এবার তিনি মাগরিব পর্যন্ত মাসহাফ থেকে তিলাওয়াত করতে থাকলেন। তখন আমি তার কোনো এক প্রতিবেশীকে বললাম, “ইবাদতে তার কতই না ধৈর্য!” প্রত্যুত্তরে প্রতিবেশী লোকটি আমাকে বলল, “সত্তর বছর থেকে এমনই চলছে। এটা তার দিনের ইবাদত। তুমি যদি তার রাতের ইবাদত দেখতে, তবে তখন কী বলতে!””

প্রিয় ভাই,

সময়ের ব্যাপারে একজন মুসলিমের প্রথম কর্তব্য হচ্ছে, সময়ের যথাযথ সংরক্ষণ করা। যেভাবে কেউ সম্পদের রক্ষণাবেক্ষণ করে, ঠিক একইভাবে সময়েরও রক্ষণাবেক্ষণ করবে। বরং এর চেয়েও বেশি গুরুত্ব দিয়ে সময়ের হিফাজত করবে। সময়ের প্রতি দ্বিতীয় কর্তব্য হচ্ছে, নিজের পুরো সময়কে যথাযথরূপে ব্যবহার করা। দ্বীনি ও দুনিয়াবি উপকারে সময় ব্যয় করা। উম্মাহর কল্যাণ সাধন, উম্মাহর সুখ-সমৃদ্ধি, আত্মিক ও বাস্তবিক উন্নতি ফিরিয়ে আনে—এমন কল্যাণকর কাজে নিজের সময় ব্যয় করবে। সালাফে সালিহিন সময়ের সদ্ব্যবহারের প্রতি ছিলেন সবচেয়ে বেশি আগ্রহী। কারণ তাঁরা সময়ের মূল্য সবচেয়ে বেশি বুঝতেন।

সারিয়ি বিন মুফলিস বলেন :

'সম্পদ হারিয়ে ফেলার ভয়ে যদি তুমি সম্পদকে যথার্থরূপে কাজে লাগানোর প্রতি আগ্রহী হও, তবে তোমার যে আয়ু কমে যায়, সেজন্য তুমি ক্রন্দন করো।'

হাসান বসরি সালাফের অবস্থা বর্ণনা করেন এভাবে-

'আমি এমন অনেককে পেয়েছি, তারা অর্থের তুলনায় নিজেদের সময়ের ক্ষেত্রে বেশি ব্যয়কুণ্ঠ ছিলেন।...যখন নাফি-কে প্রশ্ন করা হলো, "ইবনে উমর বাড়িতে কী করতেন?" তিনি বললেন, "নামাজ ও কুরআন তিলাওয়াতের জন্য অজু করতেন তিনি। তাঁর সকল কাজকর্ম থাকত এ দুটো জড়িয়ে।"

উত্তম মানুষদের সাহচর্য, নেককারদের সান্নিধ্য, তাদের ঘটনাগুলো শোনা-এসবই অন্তরে কল্যাণকর কাজের প্রতি ভালোবাসা জন্মায়। জন্মায় তাদের অনুসরণের আগ্রহ। ইবাদত ও আনুগত্যের যে উন্নত স্তরে তাঁরা পৌঁছেছেন, সে স্তরে পৌঁছানোর প্রতি অন্তরে আগ্রহ জন্মায়।

মানব আত্মা দুর্বল। অল্পতেই ভুলে যায়। তাই মনে করিয়ে দিতে হয় তাকে। স্মরণ করে দিতে হয়। বিশেষ করে বর্তমান সময়টা তো আরও গুরুতর। বর্তমান সময়ে মানুষ দুনিয়া নিয়ে লম্বা আশার পেছনে পড়ে থাকে। দুনিয়া নিয়ে তারা এতটাই পাগল হয়ে পড়ে যেন কোনো তৃষ্ণার্ত কুকুর জিভ বের করে হাঁপাচ্ছে।... মারুফ আল-কারখি -এর ঘটনাটি আমাদের জন্য বড়ই শিক্ষণীয়। তাঁর ঘটনা নিয়ে চিন্তা করা ও তা থেকে শেখার আছে অনেক কিছু।

নামাজের একামাত হলো একদিন। মারুফ এক ব্যক্তিকে বললেন, 'এগিয়ে আসুন। নামাজে ইমামতি করুন।' লোকটি বলল, 'যদিও এ ওয়াক্তের নামাজ আপনাদের সাথে পড়ছি, পরের ওয়াক্ত আপনাদের সাথে পড়তে পারব না কিন্তু।

মারুফ তাকে বললেন, 'আপনি কি মনে করছেন, অন্য ওয়াক্ত নামাজ পড়ার সমপরিমাণ সময় আপনি বেঁচে থাকবেন? আমরা আল্লাহর কাছে দীর্ঘ আশা থেকে আশ্রয় কামনা করছি। কারণ দীর্ঘ আশা উত্তম আমলে বাধা হয়ে দাঁড়ায়।'

প্রিয় ভাই,

সালাফের পথ ছেড়ে আজ কোথায় আমরা?

জীবন নিয়ে দীর্ঘ আশা করা আমাদের দীর্ঘসূত্রতার রোগে আক্রান্ত করে। দীর্ঘ আশা করলে নেক আমলে দেরি হয়ে যায়। দীর্ঘ আশা অনেক সময় নষ্ট করে ফেলে।

সন্তানের উত্তম পরিচর্যার একটি অংশ হচ্ছে, তাদের সময় জ্ঞান সমৃদ্ধ করা। সময়ের সদ্ব্যবহারে তাদের অভ্যস্ত করে তোলা। যাতে এটি তাদের অন্যান্য অভ্যাসের মতো একটি অভ্যাসে পরিণত হয়। ছোটবেলা থেকেই সন্তানকে এ অভ্যাস গড়ে দিতে হবে। আব্দুল্লাহ বিন আব্দুল মালিক বলেন:

'যখন আমরা বাবার সাথে পথ চলতাম। তিনি আমাদের বলতেন, "ওই গাছটি পর্যন্ত সুবহানাল্লাহ পড়তে থাকো।" আমরা সুবহানাল্লাহ পড়তে থাকতাম সে গাছটি পর্যন্ত। এরপর যখন দৃষ্টিসীমায় আরেকটি গাছ পড়ত। তিনি আগের মতো বলতেন, “ওই গাছটি আসা পর্যন্ত আল্লাহু আকবার পড়ো।” চলার সময় এমনটাই করতে থাকতেন তিনি।...'

যুবকদের কাছে উম্মাহ কী আশা করে। হাসান একদিন তার মজলিসের সাথিদের জিজ্ঞেস করলেন, 'হে বৃদ্ধগণ, যখন ফসল পাকে, তখন কীসের আশা করা হয়?' তারা উত্তর দিলেন, 'ফসল কাটার।'

হাসান বললেন, 'হে যুবকদল, অনেক ফসলের খেত তো পোকামাকড়ে আক্রান্ত হয় পাকার আগেই।'

মৃত্যুর আগে আবু মুসা আশআরি আমলে বেশ সাধনা করলেন। তাঁকে বলা হলো, 'একটু থামুন।' নিজের ওপর একটু দয়া করুন। তিনি বললেন, 'ঘোড়া ছেড়ে দেওয়া হলে ঘোড়া পানির নালায় নিজের মাথাটাকে নিকটবর্তী করে। নালা থেকে সকল পানি সাবাড় করে নেয় এক নিমিষে। আর আমার তো তার চেয়েও কম আয়ু বাকি আছে!'

আনাস বিন ইয়াজ বলেন:

'আমি সাফওয়ান বিন সুলাইমকে দেখেছি। আল্লাহর একজন ইবাদতগুজার বান্দা ছিলেন তিনি। যদি তাকে বলা হতো, "আগামীকাল কিয়ামত।" তবুও তার ইবাদত বাড়ানোর কোনো সময়-সুযোগ থাকত না।'

হামিদ লাফফাফ-কে বলা হলো, 'আজকের সকাল কেমন হলো?' তিনি বললেন, 'রাত পর্যন্ত পুরো দিনের সুস্থতা কামনায় আমার সকাল হয়েছে। বলা হলো, 'আপনি তো প্রতিদিনই সুস্থতার সাথে আছেন?' তিনি উত্তর দিলেন, 'সুস্থতার সাথে দিন কাটানোর অর্থ, আমি যেন এ দিনে আল্লাহর অবাধ্য না হই।'

প্রিয় ভাই,

'সময়ই জীবন। মানুষ যতটুকু সময় পায় এ দুনিয়ায়, সেটাই তার জীবন। চিরস্থায়ী একটি জীবন রয়েছে দুনিয়ার এ জীবনের পর। সে জীবনের চিরস্থায়ী নিয়ামত অর্জনের উৎস এ দুনিয়ার জীবন। কিন্তু সে চিরস্থায়ী জীবন কষ্টদায়ক আজাবের সংকীর্ণ জীবন হবে অনেকের জন্য।

জীবনের সময়গুলো মেঘের মতো বয়ে যায়। এ জীবনের যে সময়টুকু আল্লাহর জন্য, যতটুকু সময় ব্যয় হবে আল্লাহর কাজে—সেটাই প্রকৃত জীবন, সেটাই মানুষের প্রকৃত আয়ু। অন্য সময়গুলো জীবনের আওতাতে পরিগণিত হয় না। যদি কোনো মানুষের জীবন হয় পশুর জীবনের মতো, তবে তা মানুষের জীবন নয়। যদি কোনো মানুষের সময় কাটে উদাসীনতায়, ভুল ও মিথ্যা আশার মাঝে, তবে তা জীবন বলে স্বীকৃতি পায় না। এমন মানুষের সময়টা যখন ঘুম ও কর্মহীনতায় কাটে, সেটাই তার জন্য ভালো হয়। এমন জীবনের চেয়ে মৃত্যুই শ্রেয়। '

দাউদ আত-তায়ি। তাঁর এক সাথি বললেন, 'আবু সুলাইমান, আমাদের মাঝে তো হৃদ্যতার সম্পর্ক। আমাকে কিছু উপদেশ দিন।' এ কথা শুনে কেঁদে দিলেন দাউদ। অশ্রু প্রবাহিত করল তাঁর দুচোখ। অশ্রু সংবরণ করে তিনি বললেন:

'আমার ভাই। শোনো, দিন-রাত সময়ের একেকটি স্তর। মানুষ একেকটি স্তর পার হয়ে সামনে এগিয়ে চলে। এভাবে এক সময় তাদের সফরের অবসান ঘটে। যদি তুমি সময়ের প্রতিটি স্তরে, প্রতিটি দিনেই সামনের জীবনের পাথেয় জোগাড় করতে পারো-তবে এমনটাই করো।

যদি এ জীবন-সফর খুব দ্রুতই শেষ হয়ে যায়! এমনটা কি হতে পারে না?! হ্যাঁ, বিষয়টা যে এর চেয়ে দ্রুতও ঘটতে পারে। আমরা জানি না, কত দ্রুত আমাদের জীবন-সফর শেষ হয়ে যায়। তাই নিজের এ সফরে পাথেয় জুগিয়ে নাও। যে কাজটি তোমার করা কর্তব্য তা করতে থাকো। হয়তো যেকোনো সময়েই সহসা অবসান হবে এ জীবন-সফর!' এরপর দাউদ বললেন, 'দেখো দেখি, আমি তোমাকে সময়ের গুরুত্ব বোঝাতে চলেছি। অথচ আমার চেয়ে সময় বেশি নষ্ট করে-এমন কাউকে জানি না আমি।' এ বলে তিনি উঠে চলে গেলেন。

ইয়াহইয়া বিন মুআজ বলেন:

'আমার মরণ এসে যাক। এতে আমার কোনো দুঃখ নেই। দুঃখ হচ্ছে, যদি আমি আমলের সুযোগ পেয়েও তা হারিয়ে ফেলি।'

মৃত্যুকে তো আমরা বেশ ভয় করি। কিন্তু মৃত্যুর পরে যে একটা জীবন আছে, সে জীবনের সুখ-শান্তি যে সকল কাজে, সে সকল কাজ থেকে আমরা পেছনে পড়ে আছি। সে সকল কাজ করার সুযোগ পেয়েও অবহেলায় হারিয়ে ফেলছি।

বিলাল বিন সাদ বলেন:

'আল্লাহর বান্দাগণ। জেনে রাখো, তোমাদের জীবন-সফর ক্ষুদ্র এক সময় থেকে দীর্ঘ একটি যুগের দিকে। ক্ষণস্থায়ী দুনিয়া থেকে চিরস্থায়ী আখিরাতে।

ক্রান্তি ও উদ্বেগের আবাস থেকে সুখ ও চিরকালের আবাসে। তাই তোমরা আমল করো। আমলেই তোমাদের সৌভাগ্য নিহিত।'

لعمرك ما الأيام إلا معارة ** فما استطعت من معروفها فتزود 'জীবনের এ কয়টি দিন, প্রভু থেকে ধার পাওয়া।

যদি তুমি এর সদ্ব্যবহার করতে পারো, তবে তাই করে পাথেয় জোগাড় করো। '

দুনিয়ার এ জীবন পাথেয় জোগাড়ের ক্ষুদ্র কিছু সময়। দুনিয়ার এ সফর অতি সংক্ষিপ্ত। যার সময় অনর্থক কেটে যায়, সে-ই প্রতারিত। যার জীবন ক্ষতির কাজেই শেষ হয়ে যায়, সে-ই প্রবঞ্চিত।

যেমনটি আবু সুলাইমান দারানি বলেন:

'যার আজকের দিন গতকালের চেয়ে ভালো হলো না, সে ক্ষতিগ্রস্ত।'
কারণ প্রতিটি দিনই আমাদের মৃত্যুর নিকটবর্তী করে দিচ্ছে।...তাই প্রতিটি মুসলিমের কর্তব্য হচ্ছে, তার সময়ের সদ্ব্যবহারের প্রতি আগ্রহী হওয়া। জীবনের বাকি সময়টাতে আগের চেয়ে বেশি করে নেককাজ করে যাওয়া।

হে ভাই, আমরা জীবনের কত গুরুত্বপূর্ণ সময় হারিয়ে ফেলেছি, তার কি কোনো হিসেব আছে?... জীবনের এতটি বছর অবহেলায় কেটেছে।...এতটা সময় আমরা পার করেছি, কিন্তু কতটুকু জোগাড় হয়েছে আমাদের আখিরাতের পাথেয়?... জীবন চলছে আপন গতিতে। সময় বয়ে যায় মেঘের মতো।...একদিন এ জীবন ছেড়ে চলে যাওয়ার সময় হবে। এ জীবনের সফর শেষে নতুন জীবনের সফর শুরু হবে।... প্রশ্নটা বাকি থেকে গেল। আখিরাতের জীবনের জন্য কতটুকু পাথেয় আমরা জোগাড় করেছি? নিজেদের দিনগুলোর কতটুকু সদ্ব্যবহার করেছি? আমরা তিনটি দিনই পাই এ দুনিয়ায়। যে সম্পর্কে সারিয়ি বিন মুফলিস বলেন:

'গতকাল স্থগিত। আজ কাজের দিন। কালকের দিনটি আশা; আসতেও পারে, নাও আসতে পারে।'

যার জীবন তিন দিনের। আজ, গতকাল ও আগামীকাল। গতকালের ব্যাপারে সে জানে না। তার আমল কি আসমানে পৌঁছেছে নাকি পৌঁছায়নি! তার আমল কবুল হয়েছে কি হয়নি, তাও জানা নেই।... আজকের ব্যাপারে জানা নেই, আজকের দিনের পুরো সময়টা কি সে পাবে? নাকি দিন পুরোবার আগেই তাকে শায়িত হতে হবে কবরে।..আর আগামীকাল। সেটা আশা- নিরাশার দোলাচলে। হয়তো আগামীকালের সূর্যের কিরণ দেখা নাও হতে পারে। আগামী দিনের সময়টা হয়তো নাও পাওয়া যেতে পারে।...

ইয়াজিদ রকাশিয়ি নিজের আত্মাকে উদ্দেশ্য করে বলতেন, 'ধ্বংস হোক তোমার, ইয়াজিদ। তোমার মরার পর তোমার পক্ষ হয়ে কে নামাজ পড়বে? তোমার মরার পর তোমার পক্ষ হয়ে কে রোজা রাখবে? তোমার মরার পর তোমার প্রভুকে কে সন্তুষ্ট করবে?' তারপর তিনি বলেন, 'মানবজাতি, তোমাদের বাকি জীবনটা কি তোমরা কেঁদে কাটাবে না? হে মানব, যার মৃত্যু তার শেষ সময়। কবর যার বাড়ি। মাটি যার বিছানা। পোকামাকড় যার সঙ্গী হবে। অথচ এত কিছুর পরও সে বিরাট এক ভীতির অপেক্ষায় থাকবে। তার কেমন অবস্থা হবে?'

ভাই আমার,

ترحل من الدنيا بزاد من التقى ** فعمرك أيام وهنَّ قلائل

'দুনিয়া ছেড়ে যাবে চলে একদিন তুমি। নিতে পারবে কেবল তাকওয়ার পাথেয়টা। তোমার জীবন কেবল কয়টি দিনের সমষ্টি। আর তোমার পাথেয় জোগাড়ের সুযোগ খুব কমই।'

আমির বিন আব্দু কাইস-এর অবস্থাটা দেখুন। তিনি মানুষকে ডাক দিয়ে বলতেন, 'কে আমার তিলাওয়াত শুনবে?' তার আহ্বানে তখন মানুষজন তার কাছে আসত। তিনি তিলাওয়াত করে শোনাতেন তাদের। এভাবে মাগরিব পর্যন্ত তিনি তিলাওয়াত শোনাতে থাকতেন। মাগরিব থেকে ইশা কাটাতেন নামাজে। ইশা পড়ে বাড়িতে চলে আসতেন। খেতেন রুটির সামান্য কিছু টুকরো। ঘুমিয়ে নিতেন কিছুটা সময়। তারপর উঠে পড়তেন নামাজের জন্য। নামাজ পড়তে থাকতেন। সাহারির সময় রুটির কিছু টুকরো দিয়েই সাহারি খেতেন। এরপর বেরিয়ে পড়তেন। আমল করতে থাকতেন আগের দিনেরই মতো।...

সালাফে সালিহিন সময়কে কাজে লাগাতেন। প্রতিটি মুহূর্ত থেকে তাঁরা নিতেন ভরপুর ফায়দা। আর আমরা! আমাদের পুরো সময়টাই কাটে অনর্থক। নষ্ট হয় কত সময়। দিনগুলো কেটে যায় লক্ষ্য-উদ্দেশ্যহীন।...

আমাদের অভ্যাস হলো, নেক আমলে শিথিলতা করা। সময়ের সদ্ব্যবহারে গড়িমসি করা।... সময়ের এমন অপচয় সত্ত্বেও কখনো আমরা সময় বিনষ্ট হওয়ার কারণে আফসোসও করি না। কত সময় চলে যায় অনর্থক, কিন্তু আমাদের এতটুকুও দুঃখবোধ হয় না!

বরং কখনো কখনো এমনও হয় যে, সময় কেটে যাওয়ার ফলে আমরা আনন্দিত হই। সময় কাটানোর জন্য বিভিন্ন মাধ্যম খুঁজে নিই। মনভোলানো বিভিন্ন কাজে আমাদের সময়গুলো বিনষ্ট করি। আমাদের অবস্থা তাদের মতো, যারা না জানে সময়ের মূল্য, না বোঝে সময়ের উপযোগিতা। অথচ আমাদের সালাফ সকল কাজ করতেন সময় ধরে। প্রস্তুতি নিতেন অন্তিম যাত্রার।

ইবরাহিম বিন আদহাম-এর সঙ্গে কাটিয়ে আসি কিছুটা সময়। তিনি আমাদের বলছেন তারই এক ভাই সম্পর্কে। তার এ ভাইটি মুমূর্ষু অবস্থায়। তিনি গেলেন তাকে দেখে আসবেন বলে।... কিন্তু রুগ্‌ণ সে মানুষটি দীর্ঘ নিশ্বাস ফেলছেন, অনবরত আফসোস করছেন। ইবরাহিম তাকে বললেন, 'আপনার এ দীর্ঘ নিশ্বাস ও আফসোসের কারণই-বা কী?' সে মানুষটি বললেন,

'এ আফসোস দুনিয়াতে আরও কিছু দিন থাকতে না পারার আক্ষেপে নয়; বরং আমার আফসোস হচ্ছে, সময়ের সদ্ব্যবহার না করতে পারার কারণে। কত রাত কেটেছে, অথচ আমি ঘুমিয়েছি বেঘোরে। কত দিন বিনষ্ট করেছি শিথিলতায়। কত সময় যে আল্লাহর জিকির থেকে অন্যমনস্ক হয়েছিলাম, তার কি কোনো ইয়ত্তা আছে!'

আবু মুসলিম খাওলানি বুড়িয়ে গেলেন। দুর্বল হয়ে পড়লেন। তাকে বলা হলো, 'এবার যদি কিছু আমল সংক্ষিপ্ত করতেন!' এ শুনে তিনি বললেন, 'তোমরা কি কখনো ঘোড়দৌড় দেখেছ? তোমরা তো তেমনই এক প্রতিযোগিতায় লিপ্ত ঘোড়সওয়ারকে বলছ, ঘোড়াটাকে একটু আরাম দাও, একটু স্নেহ করো। প্রতিযোগিতার শেষ সীমা কাছে দেখেই তোমরা ঘোড়সওয়ারকে এমনটা বলবে? শেষ সীমা দেখলে তো ঘোড়সওয়ার ঘোড়াকে আরও বেগবান করবে। আমার প্রতিটি সময়ের সীমাই এখন মৃত্যু। আমার প্রতিযোগিতা চলবে জীবন শেষ হওয়া পর্যন্ত। '

সময় নিয়ে আক্ষেপ করা সালাফের চিহ্নস্বরূপ। এ আক্ষেপ আসত তাঁদের হৃদয়ের গভীর থেকে। আশার ঘড়ি শেষ হওয়া পর্যন্ত, মৃত্যুর আগ পর্যন্ত তাঁদের এ আক্ষেপ একই ধারায় চলত।

যারা পারে না, তারাই আগামী দিনের অজুহাত দেখায়। যারা সক্ষম তারা আজকের আমল আজকেই করে নেয়। সাহসী যারা, তাদের অভিধানে আগামীকাল বলে কোনো শব্দ নেই। কারণ প্রতিটি কাজই, প্রতিটি আমলই সময়ের সাথে সংযুক্ত। সময়মতো করতে হয় প্রতিটি আমল ও কাজ। জীবনে আমরা সময় পাই খুব কমই। কিন্তু আমাদের করণীয় থাকে অনেক। তাই বলা যায়, জীবন ছোট, কিন্তু কাজের পরিধি ব্যাপক ও বিস্তৃত। আর সময়ের সদ্ব্যবহারের আক্ষেপ আমল ও কাজগুলো যথাসময়ে করতে সাহায্য করে। করণীয় কাজটি যেন কোনোমতেই ছুটে না যায়, সেটিই আমাদের স্মরণ করিয়ে দেয়। অন্যদিকে দীর্ঘ দিন বাঁচার আশা, কাজের দীর্ঘসূত্রতা সময়মতো করণীয় কাজটিকে বিলম্বিত করে দেয়। সময়ের কাজটি সময়ে হয় না। আবার কখনো কাজটি হয় না বললেই চলে।

‘কারও দুজন ভাই আছে। পরস্পর তাদের সাক্ষাৎ হয় না অনেক দিন হলো। প্রথম ভাইয়ের সাথে সাক্ষাৎ হবে আগামীকাল। আর দ্বিতীয় ভাইটি এক মাস কি এক বছর পরে আসবে। এখন প্রশ্ন হচ্ছে, এ লোকটি কোন ভাইয়ের আগমনের জন্য প্রস্তুতি নেবে? সহজ প্রশ্ন এটি। উত্তরও সহজ। আগামীকাল যে ভাইটি আসবে তার সাথে সাক্ষাতের জন্যই তো এ লোকটি প্রস্তুতি নেবে। যার ক্ষেত্রে অপেক্ষার প্রহর নিকটবর্তী, তার সাথে সাক্ষাতের জন্যই তো সে নিজেকে প্রস্তুত করবে।

এভাবেই আমরা এ দুই ভাইয়ের সাথে মৃত্যুর তুলনা করি। মনে করি কারও মৃত্যু এক বছর পরে হবে। তাহলে কি সে মৃত্যুর জন্য প্রস্তুতি নেবে? না, নেবে না। সে বরং এক বছর সময়ের ব্যাপ্তি নিয়ে ব্যতিব্যস্ত হয়ে পড়বে। এক বছর পর যে তার অন্তিমকাল আসছে, সেটা নিয়ে ভাববার ফুরসত পাবে না সে। বছর পার হওয়া পর্যন্ত সে অপেক্ষা করতে থাকবে। করণীয় বা প্রস্তুতির ধারে-কাছেও তাকে পাওয়া যাবে না। যদি আমরা মনে করি, আমাদের মরণ এখন হবে না—আরও কিছুদিন পরে হবে, তবে এমন দীর্ঘ আশা-ই দ্রুত আমল শুরু করার পথে বাধা হয়ে দাঁড়াবে। কারণ যে লোকটি এক বছর পর তার ভাইয়ের আগমনের অপেক্ষা করছে, সে তো তৎক্ষণাৎ প্রস্তুতি নেবে না। তেমনই যে মানুষটি মনে করে, তার হাতে এখনও ব্যাপক সময় আছে, সে তো আর এখনই আমল করতে তৎপর হবে না। এভাবেই আমল ও করণীয় কর্তব্যগুলো পিছিয়ে নেয় প্রতিটি মানুষ。

আমরা যদি কোনো ভালো কাজের নিয়ত করি বা কোনো ভালো কাজের দাওয়াত পাই, কিন্তু পরে করব বলে কালক্ষেপণ করতে থাকি, তবে এটা আমাদের দুর্ভাগ্যের কথা-ই প্রকাশ করে। কারণ কখন কার মরণ এসে যায়, তা তো আমরা কেউ-ই জানি না।

প্রিয় ভাই, একটি করুণ কণ্ঠ তোমাকে ডেকে যায়। বলে, সময়ের গুরুত্ব অপরিসীম। সে দরদভরা কণ্ঠের প্রতি সাড়া দাও তুমি।

আবু কারিমা আল-আবদি বলেন:

'আদম-সন্তান, তোমার জীবনে আর কিছু দিন অবশিষ্ট আছে। এ দিনগুলোর প্রতি গুরুত্ব দাও। জেনে রাখো, সময়ের কোনো মূল্য হয় না।'

কত সুন্দর বলেছেন আবু কারিমা। হ্যাঁ, মানুষের সময়ের কোনো মূল্য হয় না। টাকা-পয়সা বা স্বর্ণ-গয়না দিয়ে সময় কেনা যায় না। সময় অমূল্য। যদি কেউ পৃথিবীর সব সম্পদ নিয়েও এসে একটুখানি সময় কেনার প্রয়াস করে, তবুও তার প্রস্তাবে কেউ সাড়া দেবে না।

এ বিষয়টি আরেকটু স্পষ্ট হতে পারি সাররি সাকতি-এর একটি অমর উক্তির মাধ্যমে। তিনি বলেন:

'কখনো যদি আমার অজিফার কিছুটা ছুটে যায়, তবে তার ক্ষতিপূরণ করতে কখনো আমি সক্ষম নই। '

সময় নষ্ট করা সম্পর্কে ইমাম ইবনুল জাওজি-এর এ উক্তিটি আমাদের জীবনের বিরাট পুঁজি হবে আশা করি। তিনি বলেন:

'আমি দেখলাম, অধিকাংশ মানুষ আশ্চর্যভাবে নিজেদের সময় খরচ করে।... যদি লম্বা রাতের অবসর থাকে তাদের কাছে, তবে উপকারহীন বেদরকারি কথায় তারা রাতটা কাটিয়ে দেয়। অথবা রাতটা শেষ করে ফেলে কোনো বীরগাথা বা গল্পের বই পড়ে। একইভাবে দিন যদি লম্বা হয়, তবে ঘুমিয়ে দিনটা শেষ করে ফেলে। দিনের বিভিন্ন সময়ে দজলা নদীর পাড়ে বা বাজারে বাজারে ঘোরাঘুরি করে।...

আমি এদের তুলনা করি একটি নৌকাতে বসা কিছু আলাপকারীর সাথে। নৌকাটি তাদের নিয়ে চলে। কিন্তু তাদের কাছে নৌকার বাইরের কোনো জ্ঞান থাকে না। কারণ তারা যে নৌকারই অধিবাসী। তারা মূলত কুয়োর ব্যাঙের মতো। কুয়োর ব্যাঙ কুয়োকেই সব ভেবে বসে থাকে। মনে করে এর বাইরে কিছুই নেই।

অন্যদিকে অল্প কিছু লোককে দেখি। তারা নিজেদের অস্তিত্বের অর্থ বোঝে। তাই তো তারা পাথেয় জোগাড়ে নিজেদের সময় বিনিয়োগ করে। শেষ বিদায়ের প্রস্তুতিতেই কাটে তাদের সারা সময়।...

তবে এদের মধ্যেও রয়েছে কয়েকটি শ্রেণি। তাদের মধ্যে পার্থক্যের কারণ হচ্ছে, জ্ঞানের কমতি। জ্ঞানের কমতির কারনেই তারা সব সময় সঠিক স্থানে সঠিক কাজটি করতে পারে না—যে কাজের ফল তারা চিরস্থায়ী জীবনে পাবে।

আর যারা সদা সতর্ক, তারা উপকারী জ্ঞান প্রচারে উদ্যমী থাকে। ফলে তাদের খাতায় লাভের পরিমাণ বেড়ে যায় অনেকগুণে। অন্যদিকে যারা অসতর্ক, তারা যতটুকু পেয়ে থাকে, ততটুকুই তাদের জন্য সই। আবার অনেকে দুনিয়া থেকে বিদায় নেয় শূন্য হাতেই! এমন কত লোক আছে, যাদের জীবন-সফর শেষ হয়ে গেছে, আর তারা রয়ে গেছে কপর্দকহীন!

নিজের জীবনের ব্যাপারে আল্লাহকে ভয় করো! সময় ফুরিয়ে যাওয়ার আগেই তাড়াতাড়ি পাথেয় জোগাড় করো। ইলমের যথাযথ প্রয়োগ করো। প্রজ্ঞা ব্যবহার করো যথার্থরূপে। সময়ের সাথে প্রতিযোগিতা করো। নিজের প্রবৃত্তির বিরুদ্ধে লড়াই করে চলো। পাথেয় জোগাড় করে বিজয়ীর বেশে আপন আবাসে ফেরার প্রস্তুতি নাও। সময়ের সদ্ব্যবহারের এ প্রস্তুতি সে উট চালকের মতো হয়ে যায়, যে উট চালায় আর গান গায়, ফলে শোনা যায় না তার নীরব অশ্রুপাতের শব্দ。

আমরা যেন সময়ের সদ্ব্যবহার করি। যেন কাজই হয় আমাদের নিদর্শন। আর দীর্ঘসূত্রতা হয় আমাদের শত্রু। আমরা যেন এ কথকের কথার মতো হই—

জীবনের বাকি যে সময় আছে, তার কি কোনো সঠিক মূল্য আছে? সে সময় তো অমূল্য সম্পদ আমার। কাল বলে সময়ের হিসেবে কোনো কিছু নেই। সময় আছে তো প্রতিটি কর্ম শুধরানোর সুযোগ আছে। প্রতিটি মন্দ মুছে ভালো কিছু করার সুযোগ আছে।

আমরা গাফিলতির চাদর মুড়ে আছি। দীর্ঘসূত্রতার আবরণে নিজেদের আবৃত করে রেখেছি। গাফিলতি ও দীর্ঘসূত্রতা আমাদের কাছে সুখকর মনে হলেও— প্রকৃতপক্ষে কখনো তা আমাদের জন্য কল্যাণকর নয়। গাফিলতির ঘুম ছেড়ে আমরা যেন জেগে উঠি। এমন ঘুম থেকে যেন জেগে উঠি, যে ঘুম আমাদের চিরসুখ থেকে বঞ্চিত করে।

মুহাম্মদ বিন ইউসুফ -এর এ নির্দেশনাটি শুনি। তদনুযায়ী কাজে নেমে পড়ি। তিনি আমাদের উপদেশ দিয়ে বলছেন:

'যদি তুমি সক্ষম হও, তবে সময়ের মূল্যায়ন করো। সময়কে কাজের মাঝে বিলীন করে দাও।'

প্রিয় ভাই আমার,

'যৌবনের এ সুস্থতা, গায়ের শক্তিমত্তা তোমাকে যেন ধোঁকায় না ফেলে। জীবন তো সময়ের অপর নাম। এ সময় মূল্যবান। তাই সময়কে হেলায়- খেলায় নষ্ট কোরো না। একদিন যে মৃত্যু হবে, সে কথা ভুলে যেও না। সেদিনটি হয়তো আজই। কত সুস্থ-সবল মানুষের মৃত্যুর সংবাদ আমরা শুনেছি! আবার কত দুরারোগ্য ব্যক্তিকে বছরের পর বছর জীবিত দেখেছি। কত শিশু ও যুবককে দেখেছি কবরে শায়িত হতে! তাই বলি, মনে করো না তোমার হাতে অফুরন্ত সময় আছে। না, এমন ধোঁকায় পড়ো না কখনো।

দুনিয়ার এ জীবন মুসাফিরের জীবন—এ পরম সত্য কি আমরা ভুলে বসেছি? ভুলে গিয়েছি কি দুনিয়া চিরস্থায়ী নয়? এ দুনিয়া ছেড়ে আমাদের চলে যেতে হবে, ভুলে গেছি কি?

এক সালাফের ঘরে কিছু মানুষ এল। তারা নজর বুলিয়ে নিল পুরো ঘরটাতে। তার উদ্দেশে বলল, 'আমরা দেখছি, আপনার এ বাড়িটিতে আপনি থাকছেন না। কোথাও যাওয়ার প্রস্তুত হচ্ছেন বুঝি?' তিনি উত্তর দিলেন, 'আমি কোথাও সফর করব—এমনটা বলা যায় না। কারণ এ দুনিয়া থেকে সফর হয় না। বরং তাকে বিতাড়ন বলাই ভালো।'

এক ব্যক্তি আবু জার -এর বাড়িতে এলেন। তাঁকে বললেন, 'আবু জার, আপনার ঘরের সামগ্রীগুলো কোথায়?' আবু জার বললেন, 'আমাদের আরেকটি বাড়ি আছে। আমরা সে বাড়িরই অভিমুখী। তাই সব সামান সেখানে রাখাই যৌক্তিক মনে করেছি।' আবু জার আখিরাতের বাড়ির কথা বলছিলেন। কিন্তু লোকটি না বুঝে আবার বলল, 'যতদিন এ বাড়িতে আছেন, ততদিন তো এখানে কিছু সামগ্রী থাকবে!' আবু জার বললেন, 'বাড়ির মালিক (আল্লাহ) আমাদের সে ফুরসত তো দেননি।'

আজ সময়টা বস্তুবাদের। সকল কিছু আপন জায়গা থেকে হটে অন্য জায়গাতে। মানুষের বিলাসিতার পরিসীমা বৃদ্ধি পেয়েছে। সময়ের অপচয় হয়েছে অবাধ। মানুষ ইবাদত-আনুগত্য থেকে বহুদূরে ছিটকে পড়েছে। বিবিধ সীমালঙ্ঘনে জড়িয়ে গেছে তারা। অথচ তাদের হাতে আখের গোছানোর সময় খুবই স্বল্প।

'প্রতিটি মানুষই জীবনের সময় কাটিয়ে চূড়ান্ত গন্তব্যপানে চলমান। একদিন তার মৃত্যু আসবে। তার আমলনামা গুটিয়ে নেওয়া হবে। তাই নিজের প্রাণ বাঁচানোর প্রস্তুতি নাও আগ থেকেই। আজকের দিনটি গতকালের ওপর বিচার করো। গতকালের তুলনায় আজকের দিনটি উত্তম হয়-এটি মনের ভেতরে গেঁথে নাও। গুনাহ করা থামিয়ে দাও। নেকের কাজ বাড়িয়ে দাও। শেষ সময় আসার আগেই সাবধান হও। আমলে কমতি হওয়ার আগেই সতর্ক হও।'

সুফইয়ান সাওরি। দুনিয়বিরাগী সাধক পুরুষ। আমাদের সালাফের অন্যতম তিনি। তিনি নিজেই ইবাদত-আনুগত্যে ছিলেন অতুলনীয়। কিন্তু তার মুখেই শুনি আরেক সালাফের ধার্মিকতা ও সময়জ্ঞানের কথা-

'একবার কুফার মসজিদে দেখলাম, এক বুড়ো মানুষকে। তিনি বলছিলেন, "এ মসজিদে আমি ত্রিশ বছর যাবৎ আছি। মৃত্যুর প্রতীক্ষায় দিন গুনছি। যদি মৃত্যু আসে, তবে আমি তাকে কোনো আদেশ-নিষেধ কিছুই করব না। কারও কাছে আমার কোনো পাওনা নেই। কেউও আমার কাছে কিছু পাবে না। তারপর বৃদ্ধটি আবৃত্তি করলেন-

إِذَا كُنْتُ أَعْلَمُ عِلْماً يَقِينًا ** بِأَنَّ جَمِيعَ حَيَاتِي كَسَاعَةِ فَلِمَ لَا أَكُونُ ضَنِينًا بِهَا ** وَأَجْعَلُهَا فِي صَلَاحٍ وَطَاعَةِ

“আমি তো নিশ্চিত জানি, আমার সারাটা জীবন এক মুহূর্তের ন্যায়। তবে কেন আমি জেনে-বুঝে সময়ের ব্যাপারে ব্যয়কুণ্ঠ হবো না? কেন আমি ইবাদত ও আনুগত্যে সময়ের সদ্ব্যবহার করব না?”

এক লোক হাতিম আল-আসাম-এর উদ্দেশে বলল, 'আপনার চাওয়া কী?' তিনি উত্তর দিলেন, 'আমি এ দিনটি সুস্থতার সাথে কাটাতে চাই।' বলা হলো, 'আপনি তো সুস্থই আছেন।' তিনি বললেন, 'আল্লাহর অবাধ্যতায় লিপ্ত না হওয়াই আমার সুস্থতা।'

সালাফে সালিহীন যেমন অতুলনীয়, তেমনই তাঁদের ঘটনাগুলোও অনুপম হৃদয়ছোঁয়া। তাঁরা সত্যিকার অর্থেই আল্লাহকে চিনেছেন। আর যে আল্লাহকে চিনতে পারে, সে-ই তো নিরাপদে আল্লাহর কাছে পৌঁছতে পারে। তাঁরা নিজ জীবনকে সঠিক কাজে ব্যয় করার কারণে সফল। কিন্তু সকল ধ্বংস ও অসফলতা তো তাদের জন্যই নির্ধারিত, যারা নিজের জীবনকে বিনষ্ট করে অনর্থক কাজে।

প্রিয় ভাই আমার, সালাফের পথ ছেড়ে আজ কোথায় আমরা?

কিছু সময়ের জন্য একটু থামি। গতকালের পৃষ্ঠাটি উল্টে দেখি।...কী কাজে কেটেছে আমার কালকের দিনটি? কোন কোন আমলে কেটেছে?

জীবনের প্রতিটি পাতাই তো আমাদের প্রত্যেকের কাছে স্পষ্ট। এ-ই আমাদের জীবন। এই তো জীবনের পাতা। সবই স্পষ্ট, পরিষ্কার।

যদি তোমার সময়গুলো বিনষ্ট হয়, তোমার আত্মা দুর্বলতায় ভোগে, তবে তোমাকে মন্দ থেকে ফেরার আহ্বান জানাব—তোমাকে আহ্বান করব সময়ের সদ্ব্যবহারের প্রতি।

আর যদি তুমি তোমার সময়কে যথাযথ মর্যাদা দিয়ে থাকো, ইবাদত-আনুগত্য ও আমলসমূহ দ্বারা নিজের সময়কে সুশোভিত করে থাকো, তবে সুসংবাদ তো তোমার জন্যই। তোমার জন্য সুসংবাদের পর সুসংবাদ। আল্লাহর কাছে দোয়া করি, তিনি যেন আমাদেরও এমন হওয়ার তাওফিক দান করেন। তাঁর ইবাদত ও আনুগত্য করার ক্ষেত্রে তিনি যেন আমাদের সহায় হোন।

ইবনে মাসউদ বলতেন—

‘তোমরা দিন ও রাতের গমনাগমনের মাঝে রয়েছ। তোমাদের সময় খুবই সংক্ষিপ্ত। আর আমলের সুযোগ পরিমিত। মৃত্যু হঠাৎ করেই আবির্ভূত হবে তোমাদের সামনে। কৃষক জমিনে যা চাষ করে, তার ফসলই পায়। তাই যে ব্যক্তি আমলের ময়দানে ভালো কিছুর চাষাবাদ করে, সে ভালো ফসল পেতে পারে। কিন্তু যে মন্দের চাষ করে, সে লজ্জা পাওয়ারই নিকটবর্তী। '

প্রিয় ভাই আমার,

আজকের দিনে আমলের ময়দানে তুমি কীসের চাষ করলে? নাকি তেমন কিছুই বলার মতো নেই তোমার? আমলহীন সময় কাটাবার ভুল যেন আমাদের না হয়। কারণ আজ যে বীজ তুমি রোপণ করবে, কাল আখিরাতে তারই ফল তুমি পাবে।

একবার হাসান বসরি -কে এক লোক সম্পর্কে বলা হলো, 'এমন একজন লোক আছে, যাকে আমরা কারও মজলিসে বসতে দেখিনি। সে সর্বদা দলের পেছনেই একাকী থাকে।' হাসান বললেন, 'আচ্ছা। তোমরা যখন তাকে দেখবে, আমাকে খবর দেবে।'

হাসান -কে যারা অজ্ঞাত সে লোকটি সম্পর্কে বলেছিলেন, একদিন তিনি তাদেরই সাথে ছিলেন। আর সে লোকটিও তখন পাশ দিয়ে যাচ্ছিল। তারা হাসান -কে লোকটিকে দেখিয়ে দিল। বলল, 'এ-ই সে লোক।' হাসান তার সাথিদের বললেন, 'তোমরা যাও। আমি তার কাছে যাচ্ছি।'

হাসান সে লোকটির কাছে এসে বললেন, 'আল্লাহর বান্দা। আমি দেখছি, তুমি একাকী থাকতে ভালোবাসো! মানুষের সাথে মিশতে তোমার বাধা কোথায়?'

লোকটি বলল, 'তুমি কি জানতে চাইছ, কোন জিনিসটি আমাকে মানুষদের থেকে অমনোযোগী করে রেখেছে?'

হাসান বললেন, 'দেখো না, এই যে কিছু মানুষ হাসানের কাছে যায়। তার মজলিসে বসে। ইলম শেখে।'

লোকটি এবার বলল, 'তুমি জানতে চাইছ, কোন জিনিসটি আমাকে হাসান ও মানুষদের থেকে পৃথক করে রেখেছে?'

হাসান বললেন, 'হ্যাঁ, কোন জিনিসটি তোমাকে মানুষদের থেকে ও হাসান থেকে পৃথক করে রেখেছে?'

উত্তরে লোকটি বলল, 'আমার সন্ধ্যা ও সকাল দুটোই পাপাসক্ত অবস্থায় কাটে। কাটে নিয়ামতে ডুবন্ত অবস্থায়। আমি এর সমাধান দেখলাম, মানুষদের থেকে পৃথক থেকে গুনাহ হতে ইসতিগফার করার মাঝে আর নিয়ামতের ওপর আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করার মাঝে।'

হাসান তাকে বললেন, 'আল্লাহর বান্দা, আমার কাছে প্রতিভাত হচ্ছে, তুমিই হাসানের চেয়ে অধিক জ্ঞানবান। তুমি যে আমলের ওপর আছ, আমিও এমনটাই করব।'

ইয়াহইয়া বিন মুআজ লজ্জিত হয়ে বলতেন—

'আমার মৃত্যু হবে, এ কারণে আমি কাঁদি না; বরং আমার প্রয়োজন পূরণের সুযোগ হারিয়ে যাবে, তাই আমি কাঁদি।'

কী ছিল তার প্রয়োজন? উত্তরটা সহজ। ইবাদত ও আনুগত্য। ইবাদত ও আনুগত্যের সুযোগ হারানোর ভয়ে তিনি কাঁদতেন। অথচ আমরা কীসের জন্য কাঁদি? সকাল থেকে সন্ধ্যা পর্যন্ত আমাদের যত কান্না নিজেদের প্রবৃত্তির চাহিদা মেটানোর জন্যই!

কত সময় চলে যায়। অথচ আমরা একটি বারও আল্লাহর জিকির করি না! একটি বারও সুবহানাল্লাহ বলি না! আল্লাহু আকবার বলে রবের বড়ত্ব ঘোষণা করি না! করি না ইসতিগফার! প্রার্থনা করি না গুনাহের ক্ষমা! প্রখ্যাত আবিদ মারুফ আল-কারখি ২-এর দিকে একটু তাকিয়ে দেখি, হয়তো কিছুটা শিক্ষা আমাদের কপালেও জুটবে।

এক লোক মারুফ -এর গোঁফ কাটার জন্য এল। কিন্তু তিনি জিকির করে চলেছেন তখনো। জিকির করা অবস্থায় গোঁফ কাটা কষ্টসাধ্য। তাই লোকটি মারুফ -কে বলল, 'কেমন করে আমি গোঁফটা কাটব আপনার ঠোঁট যে নড়ছেই অনবরত?' মারুফ বললেন, 'তুমি তোমার কাজ করো। আর আমি আমার কাজ করছি। '

মাত্র কিছু সময়ের জন্যও তিনি ইবাদত থেকে সরে আসতে চাইলেন না। এই তো ছিল সালাফের কাছে সময়ের মূল্য।

'অবসর ও কর্মহীনতা মানুষের জন্য বড়ই ক্ষতিকর। মূলত মানুষের কোনো অবসর সময়ই আসে না। কারণ মানুষের নফস কোনো সময়ই বসে থাকে না। যদি কেউ কোনো উপকারী কাজ না করে বসে থাকে, তবে নফস তাকে অপকারী কাজে অবশ্যই লাগিয়ে ছাড়ে।'

আবু বকর আল-কাত্তানি বলেন:

'এক লোক সব সময় নিজের আত্মসমালোচনা করত। একদিন সে তার পুরো জীবনের সময়কাল হিসেব করল। হিসেবে তার জীবন ৬০ বছরের। এরপর হিসেব করল, কত দিন সে বেঁচে আছে। মোট ২১ হাজার ৫ শ দিন। হিসেব করে সাথে সাথে সে চিৎকার দিয়ে অজ্ঞান হয়ে পড়ে গেল। যখন তার জ্ঞান ফিরে এল, সে বলল, 'হায়, হায়, আমি আমার রবের কাছে ২১ হাজার ৫ শ গুনাহ নিয়ে যাচ্ছি!'

লোকটি এমনটা বলল, 'প্রতিদিন একটি করে গুনাহ হলে হিসেবটা এমন। কিন্তু যদি প্রতিদিনের গুনাহ অনেক হয়, তাহলে তো মোট গুনাহ অগণিত।'

এরপর সে বলল, আহ! আমার জন্য আফসোস! আমি আমার দুনিয়ার জীবন আবাদ করলাম! আর আমার আখিরাত ধ্বংস করলাম! আমার প্রভুর অবাধ্য হলাম! এবার তো আর আমি এ বর্তমান আবাস থেকে আমার ধ্বংসস্থলে স্থানান্তরিত হওয়ার কামনা করতে পারি না। কীভাবে আমি হিসাব-কিতাবের, শাস্তি ও আজাবের সে দেশে পাড়ি দেবো আমল ও সাওয়াব ছাড়া?!

এরপর উচ্চ এক আওয়াজ দিয়ে সে মাটিতে লুটিয়ে পড়ল। তাকে নাড়া দিয়ে দেখা হলো। কিন্তু ততক্ষণে সে মৃত!

ভাই আমার, সালাফের পথ ছেড়ে কোথায় চলেছি আমরা?!..

ইবনে সাম্মাক বলেন:

'আমার ভাই দাউদ আত-তায়ি আমাকে একটি অসিয়ত করলেন। তিনি বলেছিলেন, “দেখো, তোমাকে যেন আল্লাহ নিষেধকৃত কোনো কর্মে না দেখেন। আর আদেশকৃত কোনো কাজে যেন অনুপস্থিত না দেখেন। আল্লাহ আমাদের অতি নিকটে। তাঁর শক্তি অপরিসীম। তুমি আল্লাহর নৈকট্য ও শক্তিমত্তার কথা চিন্তা করে লজ্জিত হও."'

টিকাঃ
৩৩. সিফাতুস সাফওয়া: ৩/৩৪৩
৩৪. জামিউল উলুম ওয়াল হিকাম: ৪৬৮
৩৫. সিফাতুস সাফওয়া: ২/২৫৫
৩৬. আল-হাসানুল বসরি: ১৪০
৩৭. মাওয়ারিদুজ জামআন: ২/২৪৫
৩৮. সিফাতুস সাফওয়া: ৪/২১৩, আস-সিয়ার: ৪/৯
৩৯. ইমাম বাইহাকি রহ. কৃত আজ-জুহদ: ১৯৭
৪০. ইরশাদুল ইবাদ: ৪৮
৪১. জামিউল উলুম ওয়াল হিকাম: ৪৬৪
৪২. হিলইয়াতুল আওলিয়া : ২/৮২
৪৩. আল-ইহইয়া: ৪/৪৩৪
৪৪. সিফাতুস সাফওয়া: ৩/১৪০, ইমাম বাইহাকি রহ. রচিত আজ-জুহদ: ১৯৯
৪৫. আস-সিয়ার: ৭/২৪৩
৪৬. মাওয়ারিদুজ জামআন: ২/৩৯
৪৭. জামিউল উলুম ওয়াল হিকাম: ৪৬০
৪৮. জামিউল উলুম ওয়াল হিকাম: ৪৬০
৪৯. জামিউল উলুম ওয়াল হিকাম: ৪৬০
৫০. আস-সিয়ার: ৫/৬২
৫১. সিফাতুস সাফওয়া: ৩/২৩৫
৫২. জামিউল উলুম ওয়াল হিকাম: ৪৬৩
৫৩. আল-ফাওয়ায়িদ: ৪৫
৫৪. সিফাতুস সাফওয়া: ৪/১২৯
৫৫. সিফাতুস সাফওয়া: ৪/৯৪
৫৬. সুনানুত তিরমিজি: ৩৪৬৪
৫৭. সাইদুল খাতির: ৬২০
৫৮. হাসান বসরি রহ. কৃত আজ-জুহদ: ১৪০
৫৯. হিলইয়াতুল আওলিয়া: ৮/১৪০
৬০. ইমাম বাইহাকি রহ. কৃত আজ-জুহদ: ২০৪
৬১. সিফাতুস সাফওয়া: ৪/২৯
৬২. সিফাতুস সাফওয়া: ৪/২৪
৬৩. দিওয়ানু আবিল আতাহিয়া: ৪৯৫
৬৪. সুরা আল-ইনশিরাহ: ৭-৮
৬৫. হিলইয়াতুল আওলিয়া: ৪/১৩৪
৬৬. জাইলু তাবাকাতিল হানাবিলাহ: ১/১৪৬
৬৭. শাজারাতুজ জাহাব : ১/২৬২
৬৮. সিফাতুস সাফওয়া : ৪/১৮০
৬৯. জামিউল উলুম ওয়াল হিকাম : ৪৬২
৭০. সাওয়ানিহ ওয়া তাআম্মুলাত, আবু মুহাম্মাদ আল-কুরাশি রহ. কৃত আল-জাওয়াহিরুল মাদিআহ।
৭১. ইরশাদুল ইবাদ: ৩৭
৭২. ইমাম বাইহাকি রহ. কত আজ-জুহদ: ১৯৬
৭৩. সিফাতুস সাফওয়া: ৩/১৪০
৭৪. সুয়ুতি রহ. কৃত শারহুস সুদুর: ০৭
৭৫. ইমাম বাইহাকি রহ. কৃত আজ-জুহদ: ২৯৮
৭৬. জামিউল উলুম ওয়াল হিকাম: ৪৬৩
৭৭. তাজকিরাতুল হুফফাজ: ১/১৩৫
৭৮. সিফাতুস সাফওয়া: ৪/২০৯
৭৯. সিফাতুস সাফওয়া: ২/৩৭৬
৮০. সিফাতুস সাফওয়া: ৩/১২৪
৮১. ইবনুল কাইয়িম রহ. রচিত আল-ফাওয়ায়িদ: ২২৩
৮২. সিফাতুস সাফওয়া: ৩/১২৫
৮৩. আস-সিয়ার : ৫/৩০২
৮৪. হিলইয়াতুল আওলিয়া : ৯/২৯৮
৮৫. ইমাম বাইহাকি রহ. রচিত আজ-জুহদ: ২৯০
৮৬. তারিখু বাগদাদ: ১৩/৫০১
৮৭. আস-সিয়ার: ৪/৬০০
৮৮. ইমাম বাইহাকি রহ. রচিত আজ-জুহদ: ১৯৭
৮৯. সাইদুল খাতির: ৬২০
৯০. আস-সিয়ার: ১৮/১১৬
৯১. সাইদুল খাতির: ৩০৬
৯২. তাজকিরাতুল হুফফাজ : ৪/১৩৭৬
৯৩. সিফাতুস সাফওয়া : ৩/৩৬২, হিলইয়াতুল আওলিয়া : ৬/২৫০
৯৪. আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া: ১১/৩৫৫
৯৫. আস-সিয়ার: ১০/৩৫
৯৬. আল-ফাওয়ায়িদ: ১৫১
৯৭. তাজকিরাতুল হুফফাজ: ২/৫০৮
৯৮. সিফাতুস সাফওয়া : ২/৩৭৬
৯৯. জামিউল উলুম ওয়াল হিকাম : ২৪৬, হিলইয়াতুল আওলিয়া : ৮/৩৬২
১০০. ইমাম বাইহাকি রহ. রচিত আজ-জুহদ: ২০১
১০১. আস-সিয়ার: ৫/৩৬৬
১০২. আল-ইহইয়া: ২/২৫১
১০৩. আল-জাওয়াবুল কাফি: ১৮৪
১০৪. হিলইয়াতুল আওলিয়া: ৭/৩৪৫, সিফাতুস সাফওয়া: ৩/১৩৮
১০৫. আস-সিয়ার: ১৩/১৫
১০৬. সিফাতুস সাফওয়া: ৪/২১৯
১০৭. ইবনু আবিদ দুনিয়া রহ. রচিত মাকারিমুল আখলাক: ১১
১০৮. সিফাতুস সাফওয়া: ৪/২৩০
১০৯. সিফাতুস সাফওয়া: ২/৩৮৩
১১০. আল-আকিবাহ: ৪০
১১১. জামিউল উলুম ওয়াল হিকাম: ৪৬৪
১১২. আস-সিয়ার : ৪/১৫
১১৩. সিফাতুস সাফওয়া: ৪/২০৯
১১৪. সাওয়ানিহ ওয়া তাআম্মুলাত: ৪৬
১১৫. সিফাতুস সাফওয়া: ৪/২৩৫
১১৬. সিফাতুস সাফওয়া: ২/৩৭৮
১১৭. সাইদুল খাতির: ১৯৮
১১৮. জামিউল উলুম ওয়াল হিকাম: ৪৬০
১১৯. জামিউল উলুম ওয়াল হিকাম : ৪৬০
১২০. আদাবুদ দুনিয়া ওয়াদ দ্বীন : ১২৩
১২১. আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া : ১১/১৩২
১২২. সিফাতুস সাফওয়া : ৪/১৬২
১২৩. সিফাতুস সাফওয়া: ১/৪০৯, আল-ফাওয়ায়িদ: ৪০৯
১২৪. সিফাতুস সাফওয়া: ৪/১৪
১২৫. আস-সিয়ার: ১৩/১৫
১২৬. আস-সিয়ার: ৯/১৪১
১২৭. তারিকুল হিজরাতাইন: ২৭০
১২৮. আল-আকিবাতু ফি জিকরিল মাওত: ৩১
১২৯. সিফাতুস সাফওয়া: ৩/১৪২

📘 সময় কখনো ফিরে আসে না > 📄 সহায়ক গ্রন্থাবলি

📄 সহায়ক গ্রন্থাবলি


১. ইহইয়া উলুমিদ দ্বীন। লেখক: আবু হামিদ গাজালি। প্রকাশন: দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যাহ। প্রথম প্রকাশকাল: ১৪০৬ হিজরি।
২. আদাবুদ দুনিয়া ওয়াদ দ্বীন। লেখক : মাওয়ারদি । প্রকাশন : দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যাহ।
৩. ইরশাদুল ইবাদ লিল ইসতিদাদি লি ইয়াওমিল মাআদ। লেখক : আব্দুল আজিজ আস-সামান। প্রথম প্রকাশ: ১৪০৬ হিজরি।
৪. আল-বিদায়া ওয়ান নিহায়া। লেখক : ইবনু কাসির।
৫. তারিখু বাগদাদ। লেখক: খতিব বাগদাদি। প্রকাশন : দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যাহ।
৬. তাজকিরাতুল হুফফাজ। লেখক: ইমাম জাহাবি। প্রকাশন: দারু ইহইয়ায়িত তুরাস।
৭. জামিউল উলুম ওয়াল হিকাম। লেখক: ইবনু রজব আল-হাম্বলি। ৫ম প্রকাশকাল: ১৪০০ হিজরি।
৮. আল-জাওয়াবুল কাফি। লেখক : ইবনু কায়্যিমিল জাওজিয়্যাহ । তাহকিক : আবু হুজাইফা। প্রকাশন: দারুল কিতাবিল আরাবি। প্রকাশকাল: ১৪০৭ হিজরি।
৯. হাশিয়াতু সালাসাতিল উসুল। লেখক : শাইখ আব্দুর রহমান বিন মুহাম্মদ বিন কাসিম।
১০. হিলইয়াতুল আওলিয়া ওয়া তাবাকাতুল আসফিয়া। লেখক : হাফিজ আবু নুআইম। প্রকাশন: দারুল কিতাবিল আরাবি।
১১. দিওয়ানুল ইমাম আলি। সংকলন ও ব্যাখ্যা: নাইম জারজুর। প্রকাশন: দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যাহ। প্রকাশকাল: ১৪০৫ হিজরি।
১২. দিওয়ানু আবিল আতাহিয়া। প্রকাশন: দারু সাদির, বৈরুত। প্রকাশকাল : ১৪০০ হিজরি।
১৩. দিওয়ানুশ শাফিয়ি। সংকলন ও টীকা: মুহাম্মাদ আফিফ আজ-জাগনি। প্রকাশন: দারুল জিল, বৈরুত। দ্বিতীয় প্রকাশকাল: ১৩৯২ হিজরি।
১৪. কিতাবুজ জুহদ আল-কাবির। লেখক: আহমাদ ইবনু হুসাইন বাইহাকি । তাহকিক : ড. তাকিউদ্দিন আন-নদবি। প্রকাশন: দারুল কলম। দ্বিতীয় প্রকাশকাল: ১৪০৩ হিজরি।
১৫. আজ-জুহদ। লেখক: হাসান বসরি। তাহকিক : ড. মুহাম্মাদ আব্দুর Rahim মুহাম্মাদ। প্রকাশন: দারুল হাদিস।
১৬. কিতাবুজ জুহদ। লেখক: ইমাম আহমাদ বিন হাম্বল। পুনঃপাঠ ও তাহকিক : মুহাম্মাদ আস-সাইদ বাসিউনি। প্রকাশন: দারুল কুতুবিল আরাবি। প্রথম প্রকাশকাল: ১৪০৬ হিজরি।
১৭. সাওয়ানিহু ওয়াত তাআম্মুলাতু ফি কিমাতিজ জামানি। লেখক: খালদুন আল-আহদাব। প্রকাশন: দারুল ওয়াফা। তৃতীয় প্রকাশকাল : ১৪১০ হিজরি।
১৮. সিয়ারু আ'লামিন নুবালা। লেখক: ইমাম জাহাবি। তাহকিক : শুআইব আরনাউত ও হুসাইন আল-আসাদ। প্রকাশন: মুআসসাসাতুর রিসালাহ। প্রকাশকাল: ১৪০১ হিজরি।
১৯. শাজারাতুজ জাহাব ফি আখবারি মান জাহাব। লেখক: ইবনুল ইমাদ আল-হাম্বলি। প্রকাশন : দারু ইহইয়ায়িত তুরাস আল-আরাবি।
২০. শারহুস সুদুর বি শারহি হালিল মাওতা ওয়াল কুবুর। লেখক : হাফিজ জালালুদ্দিন সুয়ুতি। প্রকাশন: দারুল কুতুবিল ইলমিয়্যাহ, প্রথম প্রকাশকাল: ১৪০৪ হিজরি।
২১. সিফাতুস সাফওয়া। লেখক: ইবনুল জাওজি। তাহকিক: মাহমুদ ফাখুরি এবং মুহাম্মাদ রোওয়াস, দারুল মারিফাহ। প্রকাশকাল: ১৪০৫ হিজরি।
২২. সাইদুল খাতির। লেখক: ইবনুল জাওজি। প্রকাশন: দারুল কুতুবিল আরাবি। দ্বিতীয় প্রকাশকাল : ১৪০৭ হিজরি।
২৩. তাবাকাতুল হানাবিলাহ। লেখক : কাজি আবু ইয়ালা। প্রকাশন : মাতবাআতুস সুন্নাহ আল-মুহাম্মাদিয়া এবং দারুল মারিফাহ, বৈরুত।
২৪. তারিকুল হিজরাতাইন ওয়া বাবুস সাদাতাইন। লেখক : ইমাম মুহাম্মাদ বিন আবু বকর বিন আইয়ুব। প্রকাশন: দারুল কিতাবিল আরাবি।
২৫. আল-আকিবাহ ফি জিকরিল মাওতি ওয়াল আখিরাহ। লেখক : ইমাম আবু মুহাম্মাদ আব্দুল হক আল-ইশবিলি। তাহকিক : খাদির মুহাম্মাদ খাদির। প্রকাশন: মাকতাবাতু দারিল আকসা। প্রথম প্রকাশকাল : ১৪০৬ হিজরি।
২৬. আল-ফাওয়ায়িদ। লেখক : ইবনু কায়্যিমিল জাওজিয়্যাহ। প্রকাশন : দারুন নাফায়িস।
২৭. ফি জিলালিল কুরআন। লেখক : সাইয়িদ কুতুব । প্রকাশন : দারুশ শুরুক। প্রকাশকাল : ১৪০০ হিজরি।
২৮. মাকারিমুল আখলাক। লেখক : ইবনু আবিদ দুনিয়া । তাহকিক ও প্রকাশক: জামিরা বালমি। প্রকাশন: মাকাতাবাতু ইবনি তাইমিয়া।
২৯. মুকাশাফাতুল কুলুব। লেখক: আবু হামিদ গাজালি। প্রকাশন: দারু ইহইয়াইল উলুম। প্রথম প্রকাশকাল: ১৪০৩ হিজরি।
৩০. মাওয়ারিদু জামআন লি দুরুসিজ জামান। লেখক: আব্দুল আজিজ আস- সালমান। একত্রিশতম প্রকাশকাল: ১৪০৩ হিজরি।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00