📄 মহাপ্রতিদানের সুসংবাদ গ্রহণ করো
যারা বিপদ-মুসিবতে ও দুঃখ-কষ্টে নিপতিত হয়, তাদের জন্য আল্লাহ তাআলা সাওয়াব, প্রতিদান, উঁচু মর্যাদা ও পাপমোচন লিখে রেখেছেন। আল্লাহ তাআলা বলেন-
إِنَّمَا يُوَفَّى الصَّابِرُونَ أَجْرَهُمْ بِغَيْرِ حِسَابٍ
“যারা ধৈর্যধারণকারী, তাদেরকে তাদের পুরস্কার দেওয়া হবে অপরিমিত। "৪২
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন-
مَا يُصِيبُ الْمُؤْمِنَ مِنْ وَصَبٍ، وَلَا نَصَبٍ، وَلَا سَقَمٍ، وَلَا حَزَنٍ حَتَّى الْهَمَّ يُهَمُّهُ، إِلَّا كُفَرَ بِهِ مِنْ سَيِّئَاتِهِ
“মুমিন বান্দার যখন কোনো রোগব্যাধি, কষ্ট-মুসিবত, চিন্তা-পেরেশানি এবং তার কোনো ক্ষতিসাধন হয়; এমনকি তার যদি কোনো কাঁটাও বিঁধে, আল্লাহ তাআলা এর বিনিময়ে তার ত্রুটি-বিচ্যুতি ক্ষমা করে দেন। "৪৩
যখন ইবরাহিমের ইবাদতগুজার মায়ের পা পশুর পায়ের আঘাতে ভেঙে গেল, অতঃপর লোকেরা তাকে সান্ত্বনা দেওয়ার জন্য আসলো, তখন তিনি বললেন, দুনিয়ার মুসিবত না আসলে আমরা তো নিঃস্ব হয়ে আখিরাতে পুনরুত্থিত হবো।
উমর রা.-এর জুতার ফিতা ছিঁড়ে গেলে তিনি ইন্নালিল্লাহ পড়ে বললেন, 'কোনোভাবে তোমার কষ্ট হলে সেটাই তোমার জন্য মুসিবত।'
ইবনে আবিদ্দুনিয়া রহ. বলেন, 'তাঁরা (সালাফে সালেহিন) রাতের জ্বর কামনা করতেন, যাতে এর মাধ্যমে তাদের পূর্বের গুনাহ মাফ হয়ে যায়।'
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন- مَا مِنْ مُسْلِمٍ يُشَاكُ شَوْكَةً، فَمَا فَوْقَهَا إِلَّا كُتِبَتْ لَهُ بِهَا دَرَجَةٌ، وَمُحِيَتْ عَنْهُ بِهَا خَطِيئَةٌ “কোনো মুমিন বান্দা যদি কাঁটা বিদ্ধ হয় বা অন্য কিছুর দ্বারা কষ্ট পায়, এর বিনিময়ে তার জন্য একটি মর্যাদা লিখে দেওয়া হয় এবং তার একটি ভুল মার্জনা করা হয়।"৪৪
ইমাম নববি রহ. এ হাদিসের ব্যখ্যায় বলেন, 'এই হাদিসে মুসলমানদের জন্য এক মহাসুসংবাদ রয়েছে। কারণ, মানুষ খুব কম সময়ই এ সকল পরিস্থিতি থেকে মুক্ত থাকতে পারে। আর এতে তার রোগব্যাধি ও দুনিয়াবি কষ্ট-মুসিবতের মাধ্যমে তার গুনাহ ও ভুল-ত্রুটিগুলোরও কাফফারা হয়ে যাচ্ছে।'
টিকাঃ
৪২. সুরা জুমার: ১০
৪৩. সহিহ মুসলিম: ২৫৭৩
৪৪. সহিহ মুসলিম: ২৫৭২
📄 মনে রাখবে এটাই সবচেয়ে বড় বিপদ নয়
বিপদাপদ বিভিন্ন ধরনের হয়ে থাকে। কোনোটি বড়, কোনোটি ছোট। কিন্তু প্রতিটিরই একটা নির্ধারিত পরিমাণ আছে। আর বিপদাপদের মধ্যে সবচেয়ে বড় বিপদ হলো, দ্বীনের ক্ষেত্রে বিপদ। দ্বীনের ক্ষেত্রে ক্ষতি হলো, দুনিয়া ও আখিরাতের মধ্যে সবচেয়ে বড় ক্ষতি। এটি এমন ক্ষতি, যার পর আর কোনো ক্ষতি নেই। এটি এমন বঞ্চনা, যার পরে আর কোনো আশা নেই। কিন্তু আমরা এটাকে কোনো ক্ষতিই মনে করি না। তুমি আশ্চর্য হয়ে লক্ষ করবে যে, কোনো মহিলার স্বামী যদি দ্বিতীয় বিয়ে করে, তাহলে সে অনেক চিন্তিত হয়ে পড়ে; কিন্তু তার দ্বীনের বিষয় নিয়ে সে এতটা পেরেশান নয়। অথচ তার স্বামীর দ্বিতীয় বিয়েটা একটা অনুমোদিত বিষয়।
📄 আল্লাহ তাআলার নিয়ামতরাজির প্রতি লক্ষ্য করা এবং তা নিয়ে চিন্তা-ফিকির করা
মানুষের কাছে বিপদ-মুসিবত ও কষ্ট-ক্লেশ সবচেয়ে বেশি হালকা ও সহজ মনে হবে, যদি তার ওপর আল্লাহ তাআলার দয়া, অনুগ্রহ ও নিয়ামতরাজির কথা স্মরণ করা হয়। যেমন সে নামাজ আদায় করতে পারছে, ইসতিগফার করতে পারছে এবং রোজা রাখতে পারছে, কিন্তু অনেকেই তা পারছে না। সে দুই পায়ের ওপর ভর করে হাঁটতে পারছে, কিন্তু অনেকেই তা পারছে না। এই তো তার দুটি হাত আছে, দুটি চোখ আছে, কিন্তু অন্য আরেকজনের হাত নেই, চোখ নেই। এরকম বিভিন্ন নিয়ামত নিয়ে চিন্তা করা ও আল্লাহর শুকরিয়া আদায় করা।
সালাফে সালেহিনের কেউ একজন বলেছেন, 'নিয়ামতের স্মরণ আল্লাহর ভালোবাসা সৃষ্টি করে।' এক লোক মুহাম্মাদ বিন ওয়াসি' রহ. এর হাতে ফোড়া দেখে ঘাবড়ে গেল। তখন তিনি তাকে বললেন, 'আলহামদুলিল্লাহ, এটা তো আমার জিহ্বায় বা আমার চোখের কোনায় হয়নি।'
এক লোক ইউনুস বিন উবাইদের নিকট এসে তার দুরবস্থা ও জীবনযাপনের সংকীর্ণতার অভিযোগ করল এবং সে এ নিয়ে খুবই দুশ্চিন্তার বিষয়টি তার কাছে বলল। তখন তিনি তাকে বললেন, তুমি কি এতে খুশি হবে যে, তোমার চোখে হাজারো সমস্যা সৃষ্টি হোক? সে বলল, না। তিনি বললেন, তোমার কানে? সে বলল, না। তিনি বললেন, তোমার জিহ্বায়? সে বলল, না। তিনি বললেন, তোমার বিবেকে? সে বলল, না। এভাবে তিনি তাকে তার ওপর আল্লাহ তাআলার নিয়ামতগুলো স্মরণ করিয়ে দিলেন। অতঃপর বললেন, আমি তো তোমাকে হাজারো দিক দিয়ে ভালো দেখতে পাচ্ছি, অথচ তুমি তোমার কষ্টের অভিযোগ করছ?
মানুষ যখন বিপদ-মুসিবত ও কষ্ট-ক্লেশের সময় তার ওপর আল্লাহর নিয়ামতরাজির কথা স্মরণ করবে, তখন বিষয়টি তার কাছে একেবারে হালকা মনে হবে। এটা তাকে আল্লাহর নিয়ামতের ব্যাপারে শুকরিয়া আদায়ের দিকে নিয়ে যাবে এবং বিপদ-মুসিবতকে হালকা করে তোলবে।
📄 ভালোভাবে হিসাব-নিকাশ করে কোনো সিদ্ধান্ত নেওয়া
কোনো বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়ার পূর্বে ভালোভাবে হিসাব-নিকাশ করবে যে, এর ভালোর দিকটা বেশি নাকি খারাপের দিকটা বেশি? অর্থাৎ বিষয়টিকে একটা পৃষ্ঠায় লিখবে এবং তার ইতিবাচক দিকটির একটা ঘর এবং নেতিবাচক দিকটির একটা ঘর রাখবে। অতঃপর বিভিন্নভাবে তার সমাধান নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করবে এবং সমাধানের প্রতিটি দিকের জন্য একশ করে নম্বর নির্ধারণ করবে। প্রত্যেক সমাধানের ক্ষেত্রেই ইতিবাচক ও নেতিবাচক দিকের মধ্যে একশ নাম্বার ভাগ করে দেবে। তবে একটি বিষয় ভালোভাবে খেয়াল রাখবে যে, ইতিবাচক দিকটিকেই একটু বেশি নম্বর দেওয়ার চেষ্টা করবে। কারণ, নেতিবাচক দিকটির ফলাফল অজানা, যা ভবিষ্যতে প্রকাশ পাবে। আর তা ভালোও হতে পারে, আবার খারাপও হতে পারে।
উদাহরণস্বরূপ, এক পরিবারে এক স্ত্রীর তার স্বামীর সাথে জটিলতা সৃষ্টি হয়েছে, তখন সে কয়েকটি সিদ্ধান্ত স্থির করবে। যেমন:
| সমাধান | ইতিবাচক দিক | নেতিবাচক দিক |
| :--- | :--- | :--- |
| ১. সে তার বাড়ি থেকে বের হয়ে নিজ পরিবারের নিকট চলে যাবে। | ১০% | ৩০% |
| ২. তার চাচা অথবা মসজিদের ইমামকে বিষয়টি জানাবে। | ৫০% | ৫০% |
| ৩. ধৈর্যধারণ করবে এবং সমস্যা সমাধানের অন্য কোনো পদ্ধতি গ্রহণ করবে। | ৮০% | ২০% |
এই পর্যবেক্ষণের পর দেখা যাবে যে, তৃতীয় সমাধানটি সবচেয়ে কম ক্ষতিকর। সুতরাং সে সেটাকে গ্রহণ করবে।