📄 মানুষের কষ্ট প্রদান ও ক্ষতির প্রতি ভ্রুক্ষেপ না করা
প্রতিটি মুসলমানেরই এ কথা জানা উচিত যে, মানুষের কষ্টপ্রদান বিশেষ করে খারাপ কথা ও অন্যায় অপবাদের মাধ্যমে কষ্টপ্রদান তার বিশেষ কোনো ক্ষতি করবে না; বরং এটা উল্টো ওদেরই ক্ষতির কারণ হবে। তুমি ইমাম শাফেয়ি রহ.-এর এই সুন্দর ও অতি মূল্যবান কথাটা মনে রেখো। তিনি বলেন, “যে ব্যক্তি মানুষের কথা শোনা থেকে মুক্ত থাকতে চায়, সে পাগল। তারা তো আল্লাহ তাআলার ব্যাপারে বলে যে, তিনি তিনজনের একজন। নবি মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে বলে জাদুকর, পাগল। তাহলে তোমার কি মনে হয় যে, যারা তাঁদের চেয়ে নিম্নমানের, তারা নিরাপদ থাকবে?”
মিথ্যা অপবাদ থেকে রবের মর্যাদা নিরাপদ নয়, নবুওয়াতের অবস্থান নিরাপদ নয়, আর তুমি মানুষের কথা শোনা থেকে নিরাপদ থাকবে? তুমি সর্বদা এই দুআ করবে, হে আল্লাহ, আমার জন্য আপনিই যথেষ্ট হয়ে যান।
যে ব্যক্তি তার জবানকে হিফাজত করবে, আল্লাহ তাআলা তাকে সম্মানিত করবেন। তাকে পুরস্কার ও প্রতিদান দেবেন; বিশেষ করে, মানুষের ঠাট্টা-উপহাস ও অন্যায়-অপবাদ শোনার পরও যে নিজ জবানকে হিফাজত করে। তুমি এমন প্রতিদানের সুসংবাদ গ্রহণ করো, যা তোমাকে দেওয়া হবে; অথচ তুমি তার সম্পর্কে কিছুই জান না। তবে কিয়ামতের দিন যখন আমলনামা খোলা হবে, তখন তা দেখতে পাবে। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন-
أَمْسِكُ عَلَيْكَ لِسَانَكَ، وَلْيَسَعْكَ بَيْتُكَ وَابْكِ عَلَى خَطِيئَتِكَ
"তুমি তোমার জবানকে হিফাজত করো এবং নিজ ঘরকে প্রশস্ত করো এবং নিজ ভুলের কারণে ক্রন্দন করো।"৩৯
টিকাঃ
৩৯. শুআবুল ইমান: ৭৮৪
📄 বিপদ-আপদ এলে নামাজে দাঁড়িয়ে যাও
নামাজের মধ্যে রয়েছে হৃদয়ের প্রশান্তি, অন্তরের নিশ্চিন্ততা। নামাজের মাধ্যমে দুনিয়ার দুঃখ-কষ্ট ও বিপদ-মুসিবতে সাহায্য চাইলে আল্লাহ তাআলা সাহায্য করেন। আল্লাহ তআলা বলেন-
وَاسْتَعِينُوا بِالصَّبْرِ وَالصَّلَاةِ وَإِنَّهَا لَكَبِيرَةُ إِلَّا عَلَى الْخَاشِعِينَ.
“তোমরা ধৈর্য ও নামাজের মাধ্যমে সাহায্য প্রার্থনা করো। অবশ্য এটা অনেক কঠিন, তবে বিনয়ী লোকদের পক্ষেই তা সম্ভব।”৪০
রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলতেন-
يَا بِلَالُ، أَرِحْنَا بِالصَّلَاةِ.
“হে বিলাল, নামাজের মাধ্যমে আমাদের শান্তি দাও।"৪১
[নোট. এখানে নামাজের মাধ্যমে শান্তি দেওয়ার অর্থ হলো, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বিলাল রা.-কে ইকামতের আদেশ দিতেন। অর্থাৎ ইকামতের মাধ্যমে নামাজ শুরু হলে রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম মানসিকভাবে প্রশান্তি লাভ করতেন। এ কথাটিই এভাবে ব্যক্ত করা হয়েছে যে, “হে বিলাল, নামাজের মাধ্যমে আমাদের শান্তি দাও।” সুনানে আবু দাউদের বর্ণনা থেকে এর ব্যাখ্যা স্পষ্টভাবে বুঝা যায়। দেখুন- সুনানে আবু দাউদ : ৪/২৯৬, হা. নং ৪৯৮৫ (প্র. আল মাকতাবাতুল আসরিয়্যা, বৈরূত) - সম্পাদক]
আমরা নামাজের মধ্যে রুকু-সিজদাতে আমাদের নিচুতা-হীনতা ও তুচ্ছতা প্রকাশ করে আল্লাহ রাব্বুল আলামিনের নিকট আমাদের দুঃখ-কষ্ট ও বিপদ-মুসিবতের কথা প্রকাশ করব। আল্লাহর শপথ করে বলছি, এটা অনেক বড় একটা ব্যাপার যে, তুমি তোমার বিপদ-মুসিবতের সময় একান্তে আল্লাহ তাআলার নিকট নিজের বিপদ ও সমস্যার কথা প্রকাশ করবে এবং মুনাজাত করে তাঁর সাথে কথা বলে নিজের দুঃখ-কষ্ট ভুলবে। আর প্রশান্ত করবে নিজের মনকে।
টিকাঃ
৪০. সুরা বাকারা: ৪৫
৪১. মুসনাদে আহমাদ: ২৩০৮৮
📄 মহাপ্রতিদানের সুসংবাদ গ্রহণ করো
যারা বিপদ-মুসিবতে ও দুঃখ-কষ্টে নিপতিত হয়, তাদের জন্য আল্লাহ তাআলা সাওয়াব, প্রতিদান, উঁচু মর্যাদা ও পাপমোচন লিখে রেখেছেন। আল্লাহ তাআলা বলেন-
إِنَّمَا يُوَفَّى الصَّابِرُونَ أَجْرَهُمْ بِغَيْرِ حِسَابٍ
“যারা ধৈর্যধারণকারী, তাদেরকে তাদের পুরস্কার দেওয়া হবে অপরিমিত। "৪২
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন-
مَا يُصِيبُ الْمُؤْمِنَ مِنْ وَصَبٍ، وَلَا نَصَبٍ، وَلَا سَقَمٍ، وَلَا حَزَنٍ حَتَّى الْهَمَّ يُهَمُّهُ، إِلَّا كُفَرَ بِهِ مِنْ سَيِّئَاتِهِ
“মুমিন বান্দার যখন কোনো রোগব্যাধি, কষ্ট-মুসিবত, চিন্তা-পেরেশানি এবং তার কোনো ক্ষতিসাধন হয়; এমনকি তার যদি কোনো কাঁটাও বিঁধে, আল্লাহ তাআলা এর বিনিময়ে তার ত্রুটি-বিচ্যুতি ক্ষমা করে দেন। "৪৩
যখন ইবরাহিমের ইবাদতগুজার মায়ের পা পশুর পায়ের আঘাতে ভেঙে গেল, অতঃপর লোকেরা তাকে সান্ত্বনা দেওয়ার জন্য আসলো, তখন তিনি বললেন, দুনিয়ার মুসিবত না আসলে আমরা তো নিঃস্ব হয়ে আখিরাতে পুনরুত্থিত হবো।
উমর রা.-এর জুতার ফিতা ছিঁড়ে গেলে তিনি ইন্নালিল্লাহ পড়ে বললেন, 'কোনোভাবে তোমার কষ্ট হলে সেটাই তোমার জন্য মুসিবত।'
ইবনে আবিদ্দুনিয়া রহ. বলেন, 'তাঁরা (সালাফে সালেহিন) রাতের জ্বর কামনা করতেন, যাতে এর মাধ্যমে তাদের পূর্বের গুনাহ মাফ হয়ে যায়।'
রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন- مَا مِنْ مُسْلِمٍ يُشَاكُ شَوْكَةً، فَمَا فَوْقَهَا إِلَّا كُتِبَتْ لَهُ بِهَا دَرَجَةٌ، وَمُحِيَتْ عَنْهُ بِهَا خَطِيئَةٌ “কোনো মুমিন বান্দা যদি কাঁটা বিদ্ধ হয় বা অন্য কিছুর দ্বারা কষ্ট পায়, এর বিনিময়ে তার জন্য একটি মর্যাদা লিখে দেওয়া হয় এবং তার একটি ভুল মার্জনা করা হয়।"৪৪
ইমাম নববি রহ. এ হাদিসের ব্যখ্যায় বলেন, 'এই হাদিসে মুসলমানদের জন্য এক মহাসুসংবাদ রয়েছে। কারণ, মানুষ খুব কম সময়ই এ সকল পরিস্থিতি থেকে মুক্ত থাকতে পারে। আর এতে তার রোগব্যাধি ও দুনিয়াবি কষ্ট-মুসিবতের মাধ্যমে তার গুনাহ ও ভুল-ত্রুটিগুলোরও কাফফারা হয়ে যাচ্ছে।'
টিকাঃ
৪২. সুরা জুমার: ১০
৪৩. সহিহ মুসলিম: ২৫৭৩
৪৪. সহিহ মুসলিম: ২৫৭২
📄 মনে রাখবে এটাই সবচেয়ে বড় বিপদ নয়
বিপদাপদ বিভিন্ন ধরনের হয়ে থাকে। কোনোটি বড়, কোনোটি ছোট। কিন্তু প্রতিটিরই একটা নির্ধারিত পরিমাণ আছে। আর বিপদাপদের মধ্যে সবচেয়ে বড় বিপদ হলো, দ্বীনের ক্ষেত্রে বিপদ। দ্বীনের ক্ষেত্রে ক্ষতি হলো, দুনিয়া ও আখিরাতের মধ্যে সবচেয়ে বড় ক্ষতি। এটি এমন ক্ষতি, যার পর আর কোনো ক্ষতি নেই। এটি এমন বঞ্চনা, যার পরে আর কোনো আশা নেই। কিন্তু আমরা এটাকে কোনো ক্ষতিই মনে করি না। তুমি আশ্চর্য হয়ে লক্ষ করবে যে, কোনো মহিলার স্বামী যদি দ্বিতীয় বিয়ে করে, তাহলে সে অনেক চিন্তিত হয়ে পড়ে; কিন্তু তার দ্বীনের বিষয় নিয়ে সে এতটা পেরেশান নয়। অথচ তার স্বামীর দ্বিতীয় বিয়েটা একটা অনুমোদিত বিষয়।