📄 সুন্দর কথা ও উত্তম আচরণ করা
সুন্দর কথা ও উত্তম আচরণের মাধ্যমে বেশির ভাগ সমস্যাই সমাধান হয়ে যায়। উভয় দিকের লোককেই বাস্তবতার প্রতি লক্ষ করে উত্তম আচরণ প্রকাশ করতে হবে এবং পরিহার করতে হবে নেতিবাচক বিষয়গুলো।
এ বিষয়টি স্বামী-স্ত্রী উভয়ের ক্ষেত্রেই কাম্য। অনুরূপভাবে নিকটাত্মীয়, পরিচিতজন এবং প্রতিবেশীদের ক্ষেত্রেও একই কথা। কারণ, এ সকল সম্পর্ক অনেক দীর্ঘ; বরং বলা যায় চিরজীবনের। সুতরাং সামান্য খারাপ আচরণ ও আঘাত দিয়ে কথা বলার মাধ্যমে সম্পর্ক নষ্ট করা ঠিক নয়। এ সম্পর্ক টিকিয়ে রাখা উচিত। তুমি আল্লাহ তাআলার এই কালাম নিয়ে একটু ভেবে দেখো। আল্লাহ তাআলা বলেন-
الَّذِينَ يُنفِقُونَ فِي السَّرَّاءِ وَالضَّرَّاءِ وَالْكَاظِمِينَ الْغَيْظَ وَالْعَافِينَ عَنِ النَّاسِ وَاللَّهُ يُحِبُّ الْمُحْسِنِينَ ﴾
"যারা সচ্ছলতা ও অভাবের সময় ব্যয় করে, যারা নিজেদের রাগ সংবরণ করে আর মানুষের প্রতি ক্ষমা প্রদর্শন করে। বস্তুত আল্লাহ সৎকর্মশীলদের ভালোবাসেন।”৩৬
রাগ সংবরণ ক্রমান্বয়ে ক্ষমা প্রদর্শনের দিকে নিয়ে যায়; বরং বলা যায়, ধীরে ধীরে দয়া ও ইহসানের পথে ধাবিত করে। কেউ যদি এ উত্তম আচরণগুলোর একটি আচরণও প্রয়োগ করে, তাহলে এর প্রভাব অনেক গভীরে গিয়ে পড়ে। আর যদি সব উত্তম আচরণই গ্রহণ করে, তাহলে এর প্রভাব কতটা হবে, একবার ভেবে দেখো!
টিকাঃ
৩৬. সুরা আলে ইমরান: ১৩৪
📄 সমস্যা সমাধানের পদ্ধতিগুলো ভালোভাবে জানা
প্রবাদ আছে, মাথায় কুড়ালের আঘাত লাগলে প্রথমে জেনে নাও, আঘাতটা কতটা গভীর; এরপর সঠিক চিকিৎসা গ্রহণ করো। সুতরাং সমস্যা ও সমস্যা সমাধানের পদ্ধতি জানা থাকলে সমাধান সহজ হবে। ইলম ও তদনুযায়ী আমল বৃদ্ধির জন্য সর্বোত্তম হলো, কুরআন-সুন্নাহ এবং বিভিন্ন ইসলামি বই পড়া। এ ছাড়াও উপকারী ইসলামি আলোচনা ও বয়ান শোনার মাঝেও আল্লাহর ইচ্ছায় অনেক সমস্যার সমাধান পাওয়া যাবে। আলহামদুলিল্লাহ, বিভিন্ন ক্যাসেটের দোকানে এবং ইসলামি লাইব্রেরিগুলোতে বিভিন্ন নামে এ সংক্রান্ত প্রচুর বই রয়েছে। বৈবাহিক জীবনের আচার-আচরণ, শিশু লালনপালনের পদ্ধতি, প্রতিবেশীর সাথে সুন্দর আচরণ ইত্যাদি।
📄 অধিক পরিমাণে দুআ ও কাকুতিমিনতি করা
আমাদের যত চিন্তা-পেরেশানি ও দুঃখ-কষ্ট, তার সবই আমাদের পাপ ও অপরাধের কারণেই এসে থাকে। আল্লাহ তাআলা বলেন-
فَكُلًّا أَخَذْنَا بِذَنْبِهِ فَمِنْهُمْ مَنْ أَرْسَلْنَا عَلَيْهِ حَاصِبًا وَمِنْهُمْ مَنْ أَخَذَتْهُ الصَّيْحَةُ وَمِنْهُمْ مَنْ خَسَفْنَا بِهِ الْأَرْضَ وَمِنْهُمْ مَنْ أَغْرَقْنَا وَمَا كَانَ اللَّهُ لِيَظْلِمَهُمْ وَلَكِنْ كَانُوا أَنْفُسَهُمْ يَظْلِمُونَ ﴾
“আমি প্রত্যেককেই তার অপরাধের কারণে পাকড়াও করেছি। তাদের কারও প্রতি প্রেরণ করেছি প্রস্তরসহ প্রচণ্ড বাতাস, কাউকে আঘাত করেছে বজ্রপাত, কাউকে আমি বিলীন করেছি ভূগর্ভে এবং কাউকে করেছি নিমজ্জিত। বস্তুত আল্লাহ এমন নন যে, তাদের প্রতি জুলুম করবেন; বরং তারা নিজেরাই নিজেদের প্রতি জুলুম করেছিল।”৩৭
অপর আয়াতে আল্লাহ তাআলা বলেন-
وَمَا أَصَابَكُمْ مِنْ مُصِيبَةٍ فَبِمَا كَسَبَتْ أَيْدِيكُمْ وَيَعْفُو عَنْ كَثِير
“তোমাদের ওপর যেসব বিপদাপদ আপতিত হয়, তা তোমাদের কর্মেরই ফল এবং তিনি তোমাদের অনেক অপরাধ মার্জনা করে দেন।”৩৮
মুহাম্মাদ বিন সিরিন রহ. যখন ঋণে জর্জরিত হয়ে পেরেশান হলেন, তখন তিনি বললেন, 'অবশ্যই আমি জানি, এই পেরেশানি আমার গুনাহের কারণেই এসেছে—যা আমি চল্লিশ বছর ধরে করেছি।'
আমরা আল্লাহ তাআলার ব্যাপারে কত যে সীমালঙ্ঘন করেছি এবং কত গুনাহ ও অপরাধ যে করেছি, তার কোনো হিসেব নেই! কিন্তু আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা আমাদের সকল গুনাহ ক্ষমা করে দেন। তাই আমাদের দুঃখ-মুসিবত ও বিপদের সময় যেন আমরা আল্লাহ তাআলার দিকে প্রত্যাবর্তন করি এবং তাঁর নিকট তাওবা করি। আল্লাহ আমাদের সকল অপরাধ ক্ষমা করবেন এবং আমাদের ভুলত্রুটিগুলো মার্জনা করবেন। পরিশেষে আমি আবারও বলছি, গুনাহের কারণেই বিপদাপদ নেমে আসে, আবার তাওবার কারণে তা উঠে যায়।
টিকাঃ
৩৭. সুরা আনকাবুত: ৪০
৩৮. সুরা শুরা: ৩০
📄 মানুষের কষ্ট প্রদান ও ক্ষতির প্রতি ভ্রুক্ষেপ না করা
প্রতিটি মুসলমানেরই এ কথা জানা উচিত যে, মানুষের কষ্টপ্রদান বিশেষ করে খারাপ কথা ও অন্যায় অপবাদের মাধ্যমে কষ্টপ্রদান তার বিশেষ কোনো ক্ষতি করবে না; বরং এটা উল্টো ওদেরই ক্ষতির কারণ হবে। তুমি ইমাম শাফেয়ি রহ.-এর এই সুন্দর ও অতি মূল্যবান কথাটা মনে রেখো। তিনি বলেন, “যে ব্যক্তি মানুষের কথা শোনা থেকে মুক্ত থাকতে চায়, সে পাগল। তারা তো আল্লাহ তাআলার ব্যাপারে বলে যে, তিনি তিনজনের একজন। নবি মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে বলে জাদুকর, পাগল। তাহলে তোমার কি মনে হয় যে, যারা তাঁদের চেয়ে নিম্নমানের, তারা নিরাপদ থাকবে?”
মিথ্যা অপবাদ থেকে রবের মর্যাদা নিরাপদ নয়, নবুওয়াতের অবস্থান নিরাপদ নয়, আর তুমি মানুষের কথা শোনা থেকে নিরাপদ থাকবে? তুমি সর্বদা এই দুআ করবে, হে আল্লাহ, আমার জন্য আপনিই যথেষ্ট হয়ে যান।
যে ব্যক্তি তার জবানকে হিফাজত করবে, আল্লাহ তাআলা তাকে সম্মানিত করবেন। তাকে পুরস্কার ও প্রতিদান দেবেন; বিশেষ করে, মানুষের ঠাট্টা-উপহাস ও অন্যায়-অপবাদ শোনার পরও যে নিজ জবানকে হিফাজত করে। তুমি এমন প্রতিদানের সুসংবাদ গ্রহণ করো, যা তোমাকে দেওয়া হবে; অথচ তুমি তার সম্পর্কে কিছুই জান না। তবে কিয়ামতের দিন যখন আমলনামা খোলা হবে, তখন তা দেখতে পাবে। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন-
أَمْسِكُ عَلَيْكَ لِسَانَكَ، وَلْيَسَعْكَ بَيْتُكَ وَابْكِ عَلَى خَطِيئَتِكَ
"তুমি তোমার জবানকে হিফাজত করো এবং নিজ ঘরকে প্রশস্ত করো এবং নিজ ভুলের কারণে ক্রন্দন করো।"৩৯
টিকাঃ
৩৯. শুআবুল ইমান: ৭৮৪