📄 আল্লাহ তাআলার ওপর তাওয়াক্কুল করা
বিপদ-মুসিবতে (কেউ) আল্লাহ তাআলার ওপর তাওয়াক্কুল করতে পারাটা (তার জন্য এটা) আল্লাহ তাআলার অনেক বড় একটি নিয়ামত। দুঃখ- কষ্ট ও বিপদ-মুসিবতের সময় আল্লাহ তাআলার ওপর ভরসা করে তাঁর ইবাদত-বন্দেগিতে মশগুল থেকে বিষয়গুলোর সহজতার জন্য দুআ করার মধ্যে রয়েছে অন্তরের প্রশান্তি। ইবাদত ও নৈকট্যের মধ্যে মর্যাদার দিক থেকে সবচেয়ে বড় মর্যাদা হলো, আল্লাহ তাআলার ওপর ভরসা করা এবং সকল বিষয় তাঁর ওপর ন্যস্ত করা।
তাওয়াক্কুলের মধ্যে মনের স্থিরতা, দিলের প্রশান্তি ও অন্তরের নিশ্চিন্ততা রয়েছে। যারা এই মহান গুণের অধিকারী, আল্লাহ তাআলা তাদের ভালোবাসেন। আল্লাহ তাআলা বলেন-
إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ الْمُتَوَكِّلِينَ ﴾
“নিশ্চয় আল্লাহ তাওয়াক্কুল অবলম্বনকারীদের ভালোবাসেন।”২৭
কেউ কি তার প্রেমাষ্পদকে কষ্ট দেয়? তাকে দূরে সরিয়ে রাখে? তার থেকে আড়ালে থাকে?
অপর আয়াতে আল্লাহ তাআলা বলেন-
وَمَنْ يَتَوَكَّلْ عَلَى اللَّهِ فَهُوَ حَسْبُهُ ﴾
“আর যে ব্যক্তি আল্লাহর ওপর ভরসা করে, তিনিই তার জন্য যথেষ্ট।”২৮
তাওয়াক্কুলের ফজিলত অনেক। এর প্রমাণ এই আয়াত। আর এটা উপকার অর্জন এবং অপকার দূর করার সবচেয়ে বড় মাধ্যম।
আল্লাহ তাআলা যেভাবে ইচ্ছা সেভাবেই সকল বিষয় পরিচালনা করেন। সকল বিষয়ের নিয়ন্ত্রণ একমাত্র তাঁরই হাতে।
আল্লাহ তাআলা ইরশাদ করেন-
يُدَبِّرُ الْأَمْرَ مَا مِنْ شَفِيعٍ إِلَّا مِنْ بَعْدِ إِذْنِهِ ﴾
"তিনিই সকল বিষয় পরিচালনা করেন। তাঁর অনুমতি ব্যতীত কোনো শাফাআতকারী নেই।"২৯
প্রত্যেকেরই এই বিশ্বাস রাখতে হবে, সমস্যা সমাধানে যে চেষ্টা-মুজাহাদা ও কষ্ট-ক্লেশ সে করে, এগুলো আসবাব গ্রহণ ও মাধ্যম অবলম্বন ব্যতীত আর কিছুই নয়। সমস্যার সমাধান ও সবকিছুর পরিচালনা তো একমাত্র আল্লাহ তাআলা-ই করে থাকেন। তিনি যা চান, তা-ই হয়। এবং যা চান না, তা হয় না। তুমি রাসুলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর এ হাদিস নিয়ে একটু চিন্তা করো। তিনি বলেন-
وَاعْلَمْ أَنَّ الأُمَّةَ لَوْ اجْتَمَعَتْ عَلَى أَنْ يَنْفَعُوكَ بِشَيْءٍ لَمْ يَنْفَعُوكَ إِلَّا بِشَيْءٍ قَدْ كَتَبَهُ اللهُ لَكَ، وَلَوْ اجْتَمَعُوا عَلَى أَنْ يَضُرُّوكَ بِشَيْءٍ لَمْ يَضُرُّوكَ إِلَّا بِشَيْءٍ قَدْ كَتَبَهُ اللَّهُ عَلَيْكَ، رُفِعَتِ الْأَقْلَامُ وَجَفَّتْ الصحف.
“আর জেনে রাখো, যদি সমগ্র জাতি তোমার কোনো উপকার করার জন্য ঐক্যবদ্ধ হয়, তাহলে তারা তোমার ততটুকু উপকারই করতে পারবে, যতটুকু আল্লাহ তাআলা তোমার জন্য লিখে রেখেছেন। আর যদি তারা সবাই তোমার কোনো ক্ষতি করার জন্য একতাবদ্ধ হয়, তাহলে তারা তোমার ততটুকু ক্ষতিই করতে পারবে, যতটুকু আল্লাহ তাআলা তোমার তাকদিরে লিখে রেখেছেন। কলমসমূহ তুলে নেওয়া হয়েছে এবং লিখিত কাগজসমূহও শুকিয়ে গেছে।”৩০
টিকাঃ
২৭. সুরা আলে ইমরান: ১৫৯
২৮. সুরা তালাক: ৩
২৯. সুরা ইউনুস: ৩
৩০. সুনানে তিরমিজি: ২৫১৬
📄 সৃষ্টিজীবের প্রতি অনুগ্রহ করা
যে সকল মাধ্যমে চিন্তা-পেরেশানি ও অস্থিরতা দূর হয়, তার একটি হলো 'সৃষ্টিজীবের প্রতি অনুগ্রহ করা'।
আল্লাহ তাআলা বলেন- لَا خَيْرَ فِي كَثِيرٍ مِنْ نَجْوَاهُمْ إِلَّا مَنْ أَمَرَ بِصَدَقَةٍ أَوْ مَعْرُوفٍ أَوْ إِصْلَاحٍ بَيْنَ النَّاسِ وَمَنْ يَفْعَلْ ذَلِكَ ابْتِغَاءَ مَرْضَاتِ اللَّهِ فَسَوْفَ نُؤْتِيهِ أَجْرًا عَظِيمًا ﴾
“তাদের অধিকাংশ সলা-পরামর্শ ভালো নয়; কিন্তু যে সলা- পরামর্শ দান খয়রাত করতে কিংবা সৎকাজ করতে কিংবা মানুষের মধ্যে সন্ধি-স্থাপনকল্পে করত, তা স্বতন্ত্র। যে আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য এ কাজ করে, আমি তাকে বড় প্রতিদান দেবো।”৩১
শাইখ আব্দুর রহমান সাদি রহ. বলেন, 'আল্লাহ তাআলা এই আয়াতে মানুষের প্রতি এই বার্তা দিয়েছেন যে, এই সবগুলো কাজই কল্যাণকর। এগুলো যার থেকেই প্রকাশ পাবে, তার জন্য তা কল্যাণকরই হবে। আর কল্যাণের মাধ্যমে কল্যাণ অর্জন হয় এবং অকল্যাণ দূর হয়। প্রতিদানের আশাবাদী মুমিনকে আল্লাহ তাআলা মহাপ্রতিদান দান করে থাকেন। আর সবচেয়ে বড় প্রতিদান হলো, চিন্তা-পেরেশানি ও দুঃখ-কষ্ট দূর হওয়া।'
শাইখ রহ. বলেন, 'বান্দার সফলতা হলো ইখলাসের সাথে তার মাবুদের ইবাদত করা এবং সৃষ্টিজীবের কল্যাণ সাধন করা।'
টিকাঃ
৩১. সূরা নিসা : ১১৪
📄 বেশি বেশি আল্লাহর জিকির করা
আল্লাহর জিকিরের মাধ্যমে বক্ষ প্রশস্ত হয়, হৃদয়ের দ্বার খুলে যায়, দূর হয় সব ধরনের দুশ্চিন্তা ও পেরেশানি। বিশেষ করে, দুঃখ-মুসিবতের সময় বেশি বেশি আল্লাহর জিকির করলে অন্তর প্রশান্ত হয়। কেননা, অন্তর নিশ্চিন্ততা ও চিন্তামুক্ত থাকার ক্ষেত্রে জিকিরের অনেক প্রভাব রয়েছে। আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা বলেন- أَلا بِذِكْرِ اللَّهِ تَطْمَئِنُّ الْقُلُوبُ ﴾
"জেনে রেখো, আল্লাহর জিকিরের মাধ্যমে অন্তরসমূহ প্রশান্তি লাভ করে।"৩২
জিকির, যেমন : حَسْبُنَا اللهُ وَنِعْمَ الْوَكِيلُ )“আমাদের জন্য আল্লাহই যথেষ্ট এবং তিনি কতই না উত্তম কর্মবিধায়ক!") দুআটি বলা।
সহিহ বুখারির বর্ণনায় এসেছে-
عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ، حَسْبُنَا اللهُ وَنِعْمَ الوَكِيلُ، قَالَهَا إِبْرَاهِيمُ عَلَيْهِ السَّلَامُ حِينَ أُلْقِيَ فِي النَّارِ، وَقَالَهَا مُحَمَّدُ صَلَّى اللَّهُ عَلَيْهِ وَسَلَّمَ حِينَ قَالُوا: {إِنَّ النَّاسَ قَدْ جَمَعُوا لَكُمْ فَاخْشَوْهُمْ فَزَادَهُمْ إِيمَانًا، وَقَالُوا: حَسْبُنَا اللَّهُ وَنِعْمَ الوَكِيلُ}
“ইবনে আব্বাস রা. থেকে বর্ণিত, حَسْبُنَا اللَّهُ وَنِعْمَ الْوَكِيلُ ইবরাহিম আ.-কে যখন আগুনে নিক্ষেপ করা হয়েছিল, তখন তিনি এ দুআটি বলেছিলেন। অনুরূপ দুআটি মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-ও বলেছিলেন, যখন তারা (মুনাফিকরা) তাঁকে বলেছিল (কুরআনের ভাষায়(- إِنَّ النَّاسَ قَدْ جَمَعُوا لَكُمْ فَاخْشَوْهُمْ فَزَادَهُمْ إِيمَانًا وَقَالُوا حَسْبُنَا اللَّهُ وَنِعْمَ الْوَكِيلُ তোমাদের বিরুদ্ধে একত্র হয়েছে। অতএব তাদের ভয় করো। আর এটা তাঁদের ইমানই কেবল বৃদ্ধি করল। আর তাঁরা (মুমিনরা) বলল, আল্লাহ তাআলা-ই আমাদের জন্য যথেষ্ট এবং তিনিই উত্তম দায়িত্বগ্রহণকারী।]"
এভাবে لَا حَوْلَ وَلَا قُوَّةَ إِلَّا بِاللَّهِ “আল্লাহর সাহায্য ছাড়া (পাপ কাজ থেকে দূরে থাকার) কোনো উপায় এবং (সৎকাজ করার) কোনো শক্তি নেই।"] দুআটি পড়া।
টিকাঃ
৩২. সুরা রা'দ: ২৮
৩৩. সহিহ বুখারি: ৪৫৬৩
📄 হারাম মাধ্যম গ্রহণ না করা
মানুষ বিপদে পতিত হলে বুঝতে পারে, সে বিপদে পতিত হয়েছে। পাশাপাশি সে এটাও জানতে পারে যে, তার বিপদে পতিত হওয়ার মূল কারণটা আসলে কী? হোক সেটা তালাক, বিচ্ছেদ বা অন্য কোনো সমস্যা। সুতরাং প্রত্যেক বিপদগ্রস্তকে এই নতুন বিষয় নিয়ে চিন্তা-ভাবনা করে সমাধানের একটা সহজ ও সঠিক পথ বের করতে হবে।
কখনো কখনো সমস্যার সমাধানটা তার কাছে অনেক কঠিন মনে হবে। মনে হবে তার সামনে সমাধানের সকল পথ বন্ধ। সাথে ভয় ও দুর্বলতা তো আছেই। তখন কেউ কেউ এসে তাকে নাজায়েজ পন্থা অবলম্বনের জন্য পীড়াপীড়ি করবে। যেমন: জাদুকার, গণক, জ্যোতিষীদের কাছে যেতে বলবে। তখন কেউ কেউ প্রতিশোধের নেশায় এবং প্রতিপক্ষের ক্ষতির মধ্যে সান্ত্বনা খুঁজে পাওয়ার চেষ্টায় তাবিজ-কবজ ও জাদু-টোনার মাধ্যমে তার জীবন অতিষ্ঠ করে তোলবে। এমনটি করা উচিত নয়। এটা নাজায়েজ।
হে বিপদগ্রস্ত (ভাই/বোন), তুমি ধৈর্যধারণ করো। তাহলে আল্লাহ তাআলার নিকট প্রতিদান পাবে। তুমি জাদু-টোনা করে কাউকে কষ্ট দিয়ে আল্লাহর অবাধ্য হয়ে নিজের জীবনকে শেষ করে দিয়ো না।