📘 সমস্যা নিরসনের ৪০টি উপায় > 📄 সুধারণা পোষণ

📄 সুধারণা পোষণ


আল্লাহ তাআলার প্রতি এ ধারণা পোষণ করা আবশ্যক যে, (তাঁর পক্ষ থেকে) স্বস্তি ও মুক্তি নিকটে। আর কাঠিন্যের সাথেই রয়েছে সহজতা।

অনুরূপভাবে বিপক্ষ বা সমস্যায় আক্রান্ত লোকটার ব্যাপারে এ ধারণা পোষণ করতে হবে যে, হয়তো আমার সম্পর্কে তার কাছে নির্দিষ্ট কোনো চিন্তা আছে। আমার ব্যাপারে সে ভুল বুঝেছে অথবা তার কাছে কোনো অবাস্তব সংবাদ পৌঁছেছে। আর কোনো মুসলিমের প্রতি এরূপ সুধারণা পোষণ আত্মাকে অবশ্যই প্রশান্তি দেবে এবং এমন কিছু ওজর-অজুহাত অনুভূত হবে, যা বিপদকে করে তোলবে তুচ্ছ এবং সুন্দর বুদ্ধি ও বিচক্ষণতার সঙ্গে সমস্যা নিরসনে সাহায্য করবে। কিছু সমস্যা তো হয় কুধারণার ওপর ভিত্তি করে। আর কিছু সমস্যা হয় অমূলক কল্পনা ও অসম্পূর্ণ চিন্তাকে কেন্দ্র করে।

এখন আমি একজন লোকের কথা বলছি, যার অপর এক ব্যক্তির সঙ্গে সমস্যা ছিল। সে ওই ব্যক্তির স্ত্রী-সন্তানদের কড়াকড়া কথা বলল এবং তাদের হুমকি-ধমকি দিল। কিন্তু তখন সেই ব্যক্তি ছিল সফরে। আর সফরে যাওয়ার পূর্বে তার কাছে সে একটি পত্র লিখেছিল, যেখানে সে ওজর পেশ করে ক্ষমা চেয়েছিল এবং নিজের অধিকার থেকে দাবি প্রত্যাহার করার কথা উল্লেখ করেছিল। কিন্তু পত্রবাহক তা পৌঁছাতে বিলম্ব করেছিল। ফলে তার থেকে যা হবার তা হয়ে গেছে। কিন্তু লক্ষ করুন, এই ব্যক্তি যে তার সাথির ব্যাপারে যেসব উচ্চবাক্য ও অন্যায় কথাবার্তা বলেছে, এর কারণে কি তাদের পূর্বের সম্পর্ক আবার ফিরে আসবে?

অপর একটি ঘটনার প্রতি লক্ষ করুন। উমর রা.-এর কন্যা হাফসা রা. যখন বিধবা হলেন, তখন উমর রা. আবু বকর রা.-এর নিকট তাঁকে বিবাহ দেওয়ার প্রস্তাব পেশ করলেন। কিন্তু তিনি তাঁকে কোনো উত্তরই দিলেন না। এরপর তিনি উসমান রা.-এর নিকট প্রস্তাব পেশ করলে উসমান রা. বললেন, আমার এখন বিবাহ করার ইচ্ছা নেই। উমর রা. তাঁদের দুজনের জবাবে কষ্ট পেলেন এবং চিন্তিত হয়ে পড়লেন। তিনি তাঁর এ অবস্থার কথা রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে জানালেন। তখন রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বললেন-

يَتَزَوَّجُ حَفْصَةَ مَنْ هُوَ خَيْرٌ مِنْ عُثْمَانَ؛ وَيَتَزَوَّجُ عُثْمَانُ مَنْ هِيَ خَيْرٌ مِنْ حَفْصَةَ

"উসমানের চেয়েও উত্তম ব্যক্তি হাফসাকে বিবাহ করবে। আর উসমান হাফসা থেকেও উত্তম মেয়ে বিবাহ করবে।”১২

এরপর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হাফসা রা.-কে নিজে বিবাহের প্রস্তাব দিয়ে বিবাহ করেন। আর উসমান রা.-এর সঙ্গে স্বীয় কন্যা রুকাইয়া রা.-এর বিবাহ দেন।

রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সঙ্গে হাফসা রা.-এর বিবাহের পর আবু বকর রা. উমর রা.-এর সাথে দেখা করলেন এবং অজুহাত পেশ করে বললেন, মনে কষ্ট রাখবেন না। কারণ, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম (বিবাহের ইচ্ছায়) হাফসার কথা আলোচনা করেছিলেন। আর আমি তাঁর গোপন কথা প্রকাশ করতে পারি না। তিনি যদি তাঁর ইচ্ছা ত্যাগ করতেন, তাহলে আমি তাকে অবশ্যই বিবাহ করতাম।১৩

টিকাঃ
১২. এরপর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম হাফসা রা.-কে নিজে বিবাহের প্রস্তাব দিয়ে বিবাহ করেন। আর উসমান রা.-এর সঙ্গে স্বীয় কন্যা রুকাইয়া রা.-এর বিবাহ দেন।
১৩. সহিহ বুখারি: ৫১২২

📘 সমস্যা নিরসনের ৪০টি উপায় > 📄 সমস্যার বিষয়টা প্রকাশ না করে গোপন রাখা

📄 সমস্যার বিষয়টা প্রকাশ না করে গোপন রাখা


নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর একটি নির্দেশনা হলো- مِنْ كُنُوزِ الْبِرِّ كِتْمَانُ الْمَصَائِبِ، وَالْأَمْرَاضِ، وَالصَّدَقَةُ “বিপদ-মুসিবত ও অসুখ-বিসুখের কথা গোপন রাখা এবং সদাকা করা পুণ্যের কাজসমূহের অন্যতম।”১৪

মুসিবতের বিষয়টি যদি গোপন রাখা সম্ভব হয়, তাহলে তা গোপন রাখা আল্লাহ তাআলার একটি বড় নিয়ামত। এটা আল্লাহর ফয়সালায় অসন্তুষ্টি-অস্থিরতা প্রকাশ না করে অটল থাকার গোপন রহস্য।

আহনাফ রহ. বলেন, চল্লিশ বছর হলো আমি আমার চোখের দৃষ্টি হারিয়েছি, কিন্তু আমি এটা নিয়ে কারও সাথে কথা বলিনি।

আতা রহ.-এর এক চোখ দিয়ে বিশ বছর পানি পড়েছে, কিন্তু তাঁর পরিবারের কেউ এটা জানতেও পারেনি।

শাকিক বালখি রহ. বলেন, যে ব্যক্তি অন্যের কাছে তার মুসিবতে পতিত হওয়ার অভিযোগ করে, তার অন্তর ইবাদতের স্বাদ অনুভব করতে পারে না।

মন্তব্য: মানুষের বিপদাপদ কেটে গেলে অন্যকে তার বিপদ ও গোপন বিষয়টি জানানোর কারণে সে মনে মনে লজ্জাবোধ করে। বিষয়টি যেহেতু এমনই, সুতরাং মানুষের বিপদাপদের বিষয়টা প্রকাশ না করে গোপন রাখা উচিত। আর পারিবারিক সমস্যার কথা প্রকাশ করা তো আরও খারাপ, আরও বেশি জঘন্য। তুমি লক্ষ করলে দেখতে পাবে, স্বামী-স্ত্রীর মাঝে সংঘটিত সমস্যার ব্যাপারে স্ত্রী যখন তার পরিবার-পরিজনের নিকট অভিযোগ করে, তখন এই সমস্যার সাথে সম্পৃক্ত নয়-এমন বিষয়েও স্বামীর বদনাম করতে থাকে এবং তার নতুন-পুরাতন দোষগুলো বলতে থাকে। একপর্যায়ে তার পরিবার-পরিজন তার এই স্বামীকে অপছন্দ করতে শুরু করে এবং তাকে ঘৃণা করে। আর তখনই ছিড়ে যায় সম্পর্কের রশি। আবার যদি কখনো তাদের সমস্যার সমাধান হয়েও যায়, তবুও তাদের মনে তার প্রতি এক ধরনের ঘৃণা ও অবজ্ঞা থেকে যায়। এ ছাড়াও মনের মধ্যে এই কথাগুলোর একটা প্রভাব থেকে যায়, যা ভবিষ্যতে স্বামীর সাথে সম্পর্কের ক্ষেত্রে এক ধরনের খারাপ প্রভাব ফেলে।

টিকাঃ
১৪. শুআবুল ইমান: ৯৫৭৪

📘 সমস্যা নিরসনের ৪০টি উপায় > 📄 বিপদকে তার পরিমাণের চেয়ে বড় মনে না করা

📄 বিপদকে তার পরিমাণের চেয়ে বড় মনে না করা


কিছু মানুষ আছে, যারা সমস্যায় পড়লে কিংবা তাদের কোনো বিপদ হলে এমন করে যেন তারা পারলে আসমান-জমিন এক করে ফেলবে। মনে হয় তাদের সামনে দুনিয়াটা অন্ধকার হয়ে আসে। এবং তারা ভাবে এটাই তাদের দুনিয়ার শেষ। অথচ মানুষ একটা বিষয়কে অপছন্দ করে, কিন্তু আল্লাহ এর মধ্যেই তার জন্য কল্যাণ রেখেছেন। আল্লাহ তাআলা বলেন-

﴿ وَعَسَى أَنْ تَكْرَهُوا شَيْئًا وَهُوَ خَيْرٌ لَكُمْ ﴾

“হয়তো তোমরা কোনো বিষয়কে অপছন্দ করো; অথচ তা তোমাদের জন্য কল্যাণকর।"১৫

আমি এখানে এক মিশরীয় যুবকের কথা বলছি, যার সাথে আমার সরাসরি কথা হয়েছে। সে আমাকে বলেছে, একবার তাদের গ্রামে অনেক ফিতনা শুরু হলো। চারদিকে গুম, খুন আর অস্থিরতার পরিবেশ। আল্লাহ তাআলা তখন আমার ওপর রহম করলেন। আমি এই পরিস্থিতি সৃষ্টি হওয়ার কয়েক দিন পূর্বে গ্রেপ্তার হয়ে জেলে বন্দী হলাম এবং পরিস্থিতি শান্ত হওয়ার এক সপ্তাহ পর ছাড়া পেলাম। আমি বাইরে এসে চারদিকের অবস্থা দেখে অবাক হয়ে গেলাম। আর বন্ধুবান্ধবদের অবস্থা দেখে তো একেবারে স্তদ্ধ হয়ে গেলাম। তাদের কেউ নিহত হয়েছে, কেউ দীর্ঘ মেয়াদে কারাবন্দী হয়েছে, আবার কেউ কেউ তাদের হাত-পা হারিয়েছে। তখন আমি আল্লাহ তাআলার শুকরিয়া আদায় করলাম এবং এ ব্যাপারে আমার কোনো সন্দেহ রইল না যে, এই জেলে যাওয়ার বিষয়টা আমার জন্য রহমত হয়েই এসেছিল।

শুরাইহ রহ. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি যখন কোনো মুসিবতে আক্রান্ত হই, তখন চারবার শুকরিয়া আদায় করি। প্রথমত, আমার ওপর এর চেয়ে বড় বিপদ আসেনি। দ্বিতীয়ত, আল্লাহ তাআলা আমাকে এর ওপর ধৈর্যধারণ করার তাওফিক দিয়েছেন। তৃতীয়ত, এর জন্য আমি সাওয়াব ও প্রতিদান পেয়েছি। চতুর্থত, বিপদটা আমার দ্বীনি বিষয়ে আসেনি।

টিকাঃ
১৫. সুরা বাকারা: ২১৬

📘 সমস্যা নিরসনের ৪০টি উপায় > 📄 সমস্যা সমাধানে উত্তম পদ্ধতি প্রয়োগ করা

📄 সমস্যা সমাধানে উত্তম পদ্ধতি প্রয়োগ করা


এক লোক নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নিকট এসে বলল, আমাকে নসিহত করুন। তিনি বললেন- لَا تَغْضَبْ فَرَدَّدَ مِرَارًا، قَالَ: لَا تَغْضَبْ “তুমি রাগ কোরো না। লোকটি কয়েকবার তা বলল; তিনি প্রত্যেকবারই বললেন, তুমি রাগ কোরো না। "১৬

এরপর তিনি বললেন- لَيْسَ الشَّدِيدُ بِالصُّرَعَةِ، إِنَّمَا الشَّدِيدُ الَّذِي يَمْلِكُ نَفْسَهُ عِنْدَ الغَضَبِ “প্রকৃত বীর সে নয়, যে কাউকে কুস্তিতে হারিয়ে দেয়। বরং সেই হলো আসল বীর, যে রাগের সময় নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে।"১৭

রাগ সঠিক ও সুস্থ চিন্তার জন্য অন্তরায়। রাগ মানুষকে বিক্ষিপ্ত ও অস্থির চিন্তার দিকে ঠেলে দেয়। আর তখন মানুষ আবেগী হয়ে যায়। আবেগের বসে সে অনাকাঙ্ক্ষিত কিছু করে ফেলে। সুতরাং প্রথমে ভালোভাবে স্থির ও শান্ত হতে হবে। এরপর উত্তম পদ্ধতিতে সমস্যার মোকাবিলা করতে হবে। অনেক জ্ঞানী মহিলা তাদের রাগী ও কর্কশ স্বামীর সাথে দয়া ও নম্রতার আচরণ করে। ফলে কিছু সময় পরেই আবার তার স্বামী তার কাছে ফিরে আসে।

এ ক্ষেত্রে মানুষের অভিজ্ঞতা প্রচুর। আর এ কারণেই আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা তাঁর নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-কে এর আদেশ দিয়েছেন। তিনি বলেন-

﴿وَلَا تَسْتَوِي الْحَسَنَةُ وَلَا السَّيِّئَةُ ادْفَعْ بِالَّتِي هِيَ أَحْسَنُ فَإِذَا الَّذِي بَيْنَكَ وَبَيْنَهُ عَدَاوَةٌ كَأَنَّهُ وَلِيٌّ حَمِيمٌ ﴾

"ভালো ও মন্দ সমান নয়। (তাদের কথার) জবাবে তা-ই বলুন যা উৎকৃষ্ট। তখন দেখবেন, আপনার সাথে যে ব্যক্তির শত্রুতা রয়েছে, সে যেন অন্তরঙ্গ বন্ধু।”১৮

কিছু মানুষ আছে, যারা স্বভাবগতভাবেই রাগী। কথায় কথায় রেগে যায়। বন্ধুবান্ধবরা তাকে নিয়ে সর্বদা একটা আতঙ্কের মধ্যে থাকে। তার সাথে কথা বলতে ভয় পায়। এমন বন্ধুর ক্ষতি থেকে বাঁচার জন্য এবং তাকে স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরিয়ে আনার জন্য তার সাথে কোমল ভাষায় কথা বলবে এবং মাঝে মাঝে তাকে হাদিয়া দেবে।

টিকাঃ
১৬. সহিহ বুখারি: ৬১১৬
১৭. সহিহ বুখারি: ৬১১৪
১৮. সুরা হা-মীম সাজদা: ৩৪

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00