📄 যুদ্ধের ময়দান পর্যবেক্ষণ ও সামরিক দপ্তর স্থাপন
বাহিনীর নিরাপত্তা ও ঝুঁকি থেকে মুক্তির জন্য সম্ভাব্য সতর্কতামূলক ব্যবস্থা নিলেন। পাহাড়ের চূড়ায় ছোট ঘর তৈরি করা হলো নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম- যাতে গোটা যুদ্ধ ময়দান স্পষ্টভাবে পর্যবেক্ষণ করতে পারেন এবং অধিনায়কগণকে প্রয়োজনীয় নির্দেশনা দিতে পারেন। সেজন্য প্রয়োজনীয় পদক্ষেপ নেয়া হলো। বস্তুত পক্ষে এ কুড়ো ঘরটি ছিল মুসলিম বাহিনীর প্রধান সামরিক দপ্তর। প্রধান সেনাপতির দায়িত্ব তিনি এখান থেকেই পালন করেন। যেটি ছিল শত্রু সেনাদের দৃষ্টির বাইরে এবং মক্কী বাহিনীর তীরন্দাজদের তীরও এ ঘরে আঘাত হানতে পারতো না। দ্রুতগামী দু'টি মাদী উটকে সদর দপ্তরের পাশে বেধে রাখা হলো। এটা করা হলো দুর্যোগ মুহুর্তে ব্যবস্থা গ্রহণের সুবিধার্থে।
📄 মুক্তিপণ ধার্য ও বন্দি বিনিময়
মুসলিম বাহিনী আল্লাহ পাকের সন্তুষ্টি কামনায় বীর বিক্রমে যুদ্ধ করল এবং সংখ্যা স্বল্পতা নিয়েও বিশাল বাহিনীকে পরাভূত করল। শত্রুপক্ষের ক্ষয়ক্ষতি হলো বিপুল পরিমাণে, যুদ্ধক্ষেত্রে ৭০জন নিহত হলো, আহত হলো অসংখ্যজন। শত্রু সেনাদের দুর্বল করণের জন্য মুক্তিপণ পরিশোধের ব্যবস্থা করা হল। যাতে মুসলিমদের আর্থিক ভিত্তি মজবুত হয়।
যাদের মুক্তিপণের ক্ষমতা নাই, লেখাপড়াও জানা নেই তারা আর কখনো মুসলিমদের বিরুদ্ধে তলোয়ার ধরবে না এ শর্তে মুক্ত করে দেয়া হল।
পুতুল তথা মুর্তিপূজারী বন্দীর বিনিময়ে মুসলিম যুদ্ধবন্দীকে ছাড়িয়ে আনার ও সিদ্ধান্ত নেয়া হয়।
📄 ওহুদ যুদ্ধ ও পরবর্তী কৌশল
ওহুদ যুদ্ধে সাতশ'র চেয়ে ক্ষুদ্র মুসলিম বাহিনী তিন হাজার সৈন্যের বিশাল মুশরিক বাহিনীর মুখোমুখি হল। ওহুদ পাহাড়টি ছিল দু'টি বৃত্ত বিশিষ্ট একটি ধনুকের মত। অভ্যন্তর ভাগের বৃত্তে প্রবেশের পথটি খুবই সংকীর্ণ। মুসলিম বাহিনী এখানেই শিবির স্থাপন করে। সামরিক দৃষ্টিতে এ স্থানটি ছিল খুবই গুরুত্বপূর্ণ। কারণ এ পথ দিয়েই শত্রুসেনাদের পক্ষে মুসলিম বাহিনীর পশ্চাৎভাগে আক্রমণ করার সম্ভাবনা ছিল এবং শত্রুসেনার আক্রমণ প্রতিহত করার জন্য এ স্থানটি নিয়ন্ত্রণে রাখা ছিল জরুরী। এ স্থানটি প্রহরার জন্য ৫০ জন তীরন্দাজকে নিয়োগ করা হলো। নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম স্পষ্ট ভাষায় নির্দেশ প্রদান করেন যে, যদি তোমরা প্রত্যক্ষ কর যে শকুনরা মুসলিমদের মৃতদেহ ক্ষত বিক্ষত করছে তবু তোমরা স্থানচ্যুত হবে না।
পরবর্তীতে যখন ঐ টিলাটি মুসলিম প্রহরা শূন্য হয় তখনই মুশরিক বাহিনী তাদের আক্রমণ দ্বারা মুসলিমদের প্রতিহত করে এবং মুসলিমদের প্রচুর ক্ষতি সাধন হয়। এ যুদ্ধে বর্মধারী সৈন্য ছিল ১০০ জন।
যুদ্ধ শেষে কাফিরদের গতিবিধি সম্পর্কে খোঁজ নেওয়ার জন্য তিনি কয়েকজন সৈন্য পাঠালেন। বলে দিলেন যদি তারা উটের পিঠে সওয়ার হয় তাহলে বুঝতে হবে ওরা ফিরে যাবে মক্কায় দীর্ঘ সফরে। আর যদি ঘোড়া ব্যবহার করে তাহলে ওদের গন্তব্যস্থল হবে মদীনা। নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম সামরিক ধী শক্তি থেকে অনুধাবন করতে পারেন যে, পথ চলতে চলতে শত্রু সেনারা আবার মদীনার উপর আক্রমণ করার ও লুটতরাজ করার সিদ্ধান্ত নিতে পারে। তাই তিনি আবু সুফিয়ানকে পশ্চাদধাবন কবার জন্য আবার অভিযানে বের হন। ইত্যাবসরে আবু সুফিয়ান উপলব্ধি করতে পারে যে, বিজয় অর্জনের জন্য সবটুকু সুযোগের ব্যবস্থায় না করে সে ভুল করে ফেলেছে।⁶ কিন্তু পরবর্তীতে সে মুসলিমদের প্রস্তুতির কথা শুনতে পেরে চলে যেতে বাধ্য হয়।
টিকাঃ
৬. লে:কর্নেল এম কোরেশী, গৌরবদীপ্ত জিহাদ, অনু: মুহাম্মদ লুতফুল হক, ১ম প্রকাশ, ঢাকা:ই,ফা,বা, ১৯৮৯।
📄 খন্দকের যুদ্ধ: পরিখা খনন ও দ্বিমুখী আক্রমণ প্রতিহতকরণ
খন্দকের যুদ্ধে নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম প্রতিরক্ষা ব্যবস্থায় কোথায় কি ত্রুটি আছে এবং কোথায় পরিখা খনন করতে হবে তা নিরূপণ করেন। পরিখাটি এতখানি চওড়া করেন যে, একটি দ্রুতগামী ঘোড়াও লাফ দিয়ে তা অতিক্রম করতে পারত না। আবার ৩/৪ ফুট গভীর থাকায় কেউ পরিখায় পড়ে গেলেও নিজ প্রচেষ্টায় উঠে আসাও সম্ভব ছিল না। মক্কাবাসীরা এ ধরনের পরিখা যুদ্ধে মোটেও পারদর্শী ছিল না। তাই তারা পরিখা অতিক্রম করতে পারল না।
পরবর্তীতে যখন মুশরিকদের দ্বারা অবরোধ চলছিল, তখন তারা বিকল্প অন্য একটি পরিকল্পনা করছিল। তারা দেখল দীর্ঘ মাস ব্যাপী যুদ্ধ করার পরও বিজয় অর্জনে ব্যর্থ হয়েছে। তদপ্রেক্ষিতে খায়বরের নেতার অবস্থা অনুধাবন করার জন্য অতি সংগোপনে মদীনা সফর করেন। ইহুদী গোত্র বনু কুরায়জা তখনো মদীনায় বসবাস করছিল এবং মুসলিমরাও ছিল তাদের প্রতি আস্থাশীল । খায়বরের বনু নযির গোত্রের ইহুদী নেতা মদীনার ইয়াহুদী গোত্র বনু কুরায়জার নেতার সঙ্গে যোগাযোগ স্থাপন করল। সে বনূ কুরায়জার নেতাকে এ মর্মে রাজী করতে সমর্থ হল মিত্রবাহিনী যখন মুসলিমদের বিরুদ্ধে মুখোমুখি সংঘর্ষে লিপ্ত থাকবে, বনু কুরায়জা তখন পশ্চাৎ দিক থেকে মুসলিমদের আক্রমণ করবে। দু'দিক থেকে চাপে পড়ে মুসলিম বাহিনী নাস্তানাবুদ হবে এবং তাদের পরাজয় ঘটবে। নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইহুদীদের গোপন ষড়যন্ত্রকে জানতে পারেন। তিনি তার সামরিক ও রাজনৈতিক প্রজ্ঞা দিয়ে মিত্র বাহিনীর এ ষড়যন্ত্রকে নস্যাৎ করার প্রচেষ্টা চালান। এ কাজের জন্য তিনি এমন একজন লোককে নির্বাচন করলেন যাকে সকলেই পৌত্তলিক হিসেবে জানত। অথচ প্রকৃতপক্ষে তিনি ছিলেন একজন নওমুসলিম। নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার উপর রাজনৈতিক মিশনের দায়িত্ব দিয়ে প্রথমে বনু কুরায়জায় পাঠান। তিনি বনু কুরায়জাকে বললেন, মিত্র বাহিনী যে কখনো তাদের পরিত্যাগ করবে না, এ ব্যাপারে তাদের নিশ্চিত হওয়া আবশ্যক। কারণ যুদ্ধ শেষে এককভাবে তাদেরকে মদিনায় থাকতে হবে এবং মুসলিমদের প্রতিরোধ করার মত সমর্থ তাদের নেই। তিনি তাদের আরও পরামর্শ দিলেন যে, তাদের উচিত হবে মুশরিকদের নিকট হতে কয়েকজন ব্যক্তিকে জামিন হিসেবে রাখা। এর ফলে শেষ মুহুর্তেও যে মুশরিকরা তাদের সঙ্গে বিশ্বাসঘাতকতা করবে না সে বিষয়ে নিশ্চিত হওয়া যাবে। এরপর তিনি গেলেন মিত্র শিবিরে কোরাইশ ক্যাম্পে, সেখানে তিনি পরিচিত ছিলেন একজন পৌত্তলিক হিসেবে। তিনি তাদেরকে বনু কুরায়জা ও মুসলিমদের মধ্যকার যোগাযোগের কথা জানালেন, গোপন তথ্য ফাঁস করার ভঙ্গিতে তিনি বললেন ইয়াহুদীরা কয়েকজন কোরাইশ নেতাকে নিজেদের কাছে নিতে চায় এবং তারা তাদেরকে সোপর্দ করবে নবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর হাতে। পরবর্তীতে কোরাইশ নেতারা বনু কুরায়জার সঙ্গে আনুষ্ঠানিক বৈঠকে বসে এবং বনু কোরায়জা দুটো দাবী উত্থাপন করে। প্রথমত: কোরাইশদের কয়েকজন লোককে তাদের নিকটে জামিন হিসেবে রাখতে হবে। দ্বিতীয়ত, শনিবার যুদ্ধ করা যাবে না। ফলশ্রুতিতে কোরাইশ এবং বনু কুরায়জার মধ্যকার মৈত্রী সম্পর্কের এখানেই সমাপ্তি ঘটে এবং শাওয়াল মাসের শেষে দিনটিতে মদীনার উত্তর দক্ষিণ দিক হতে একযোগে যে আক্রমণ হওয়ার কথা ছিল রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এ সমরবিদ্যায় গভীর মেধা থাকার কারণে উক্ত আক্রমণকে বিনা যুদ্ধে প্রতিহত করা হল।