📘 সমরবিদ হিসাবে মুহাম্মাদ সা > 📄 সমর শব্দের বিশ্লেষণ ও আরবী প্রতিশব্দ

📄 সমর শব্দের বিশ্লেষণ ও আরবী প্রতিশব্দ


সমর শব্দের বিশ্লেষণ: সমর অর্থ হলো যুদ্ধ, রন, সংগ্রাম।¹ ইংরেজিতে একে বলে War, battle, Combat, Conflict, Fight.

সমর শব্দটির কিছু আরবী প্রতিশব্দ: সমর শব্দের আরবী সমার্থক শব্দ হলো, ১.আল-হারব ২.আল-সীয়ার ৩.নুফুর ৪. খুরুজ ৫.দরব আল-রিকাব ৬.আল-কুওয়াত ৭.রিবাত আল-খায়িল ৮. রাওউন ৯. ওয়াগা ১০. হায়‍্যাজ ১১. গাযওয়াহ ১২. সারিয়‍্যাহ ১৩. কিতাল ১৪. জিহাদ।

1. আল-হারব (الحرب): সমরের একটি আরবী সমার্থক শব্দ। এর অর্থ যুদ্ধ। শব্দটি ধ্বংস, অনিষ্ট, হত্যা, ও কৃতঘ্নতা অর্থেও ব্যবহৃত হয়। হারব এর প্রচলিত অর্থে সশস্ত্র সংগ্রামকে বুঝায়। অবশ্য এ সংজ্ঞা পরিবর্তিত হয়ে বর্তমানে সামনাসামনি না হয়েও (আধুনিক অস্ত্র শস্ত্রের সাহায্যে) শত্রুর মুকাবিলা। আল-কুরআনে হারব শব্দটি ছ'টি জায়গায় ব্যবহৃত হয়েছে।

2. আস-সীয়ার- (السير): সীয়ার হচ্ছে সীরাহ এর বহুবচন। এর অর্থ হচ্ছে পন্থা, জীবন চরিত ও পদ্ধতি। আসকালানী তাঁর ফাতহুল বারীতে উল্লেখ করেছেন, মহানবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম- এর জীবন চরিত্র বর্ণনার মধ্যে যুদ্ধ-বিগ্রহের বর্ণনা আসার জন্য সীরাহকেও জিহাদের পর্যায়ভুক্ত করেছেন। অবশ্য কেউ কেউ (আইন বিশারদ) সীরাহকে মাগাযী (যুদ্ধ) হিসেবে ধরেছেন। অবশ্য কেউ কেউ সীয়ারকে মাগাযী বলেন নি, তবে মাগাযী (যুদ্ধ) ও সন্ধির বিধানগুলো মহানবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর জীবন চরিত্র আলোচনার মধ্যে স্থান পেয়েছে।

3. নুফুর- (نفور): শব্দটি نفر-থেকে নির্গত। এর অর্থ অভিযান। ঘৃণা, বিমুখতা, অনীহা, পালানো, বিক্ষিপ্ত বা পৃথক পৃথক দল, হিজরত, সর্বোপরি এর এক অর্থ অভিযানে বের হওয়া। কালক্রমে এখন শব্দটি যুদ্ধ বা সশস্ত্র অর্থেও ব্যবহৃত হচ্ছে।

4. খুরুজ (خروج): এর সাধারণ অর্থ বের হওয়া। তবে যুদ্ধাভিযানে বের হওয়াকেও বুঝায়।

5. দরব আল- রিকাব- (ضرب الرقاب): এর অর্থ আঘাত। আল-কুরআনে ব্যবহৃত শব্দদ্বয়ের অর্থ গর্দানের ওপর আঘাত করা।

6. আল- কুওয়াত (القوة): এর অর্থ শক্তি। এ শব্দটি সশস্ত্র যুদ্ধের জন্য প্রস্তুতি অর্থে আল- কুরআনে ব্যবহৃত হয়েছে।

7. রিবাত আল-খায়িল- (رباط الخيل): এর অর্থ সীমান্ত রক্ষার জন্য অশ্বারোহী সেনার চৌকি বা ছাউনির ব্যবস্থাপকরণ। এ শব্দটি সশস্ত্র যুদ্ধের জন্য প্রস্তুতি অর্থে আল-কুরআনে ব্যবহৃত হয়েছে।

8. রাওউন- (روع): এর অর্থ ভয় বা আতংক। প্রাক ইসলামী যুগ থেকে এ শব্দটি যুদ্ধ অর্থে ব্যবহৃত হয়ে আসছে।

9. ওয়াগা- (وغي): এর অর্থ শোরগোল গোলযোগ। এ শব্দটি দিয়েও যুদ্ধ বুঝানো হয়েছে।

10. হায়‍্যাজ- (هياج): এর অর্থ ক্রোধ বা আক্রোশ। এ শব্দটিও যুদ্ধ অর্থে সুপ্রাচীন কাল থেকে ব্যবহৃত হয়ে আসছে।

11. গাযওয়াহ- (غزوة): এর অর্থ যুদ্ধ যাতে রাসূল সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সক্রিয় অংশগ্রহণ ছিল।

12. সারিয়‍্যাহ (سرية): এর অর্থ যুদ্ধ (যাতে রাসূল সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সক্রিয় অংশ গ্রহণ ছিল না)।

13. কিতাল- (قتال): কিতাল শব্দটির অর্থ মারা, হত্যা, যুদ্ধ, প্রতিশোধ, অভিশাপ, সর্বোপরি সশস্ত্র সংগ্রামকে কিতাল বলে। আল-কুরআনে আল্লাহর একত্ববাদকে অস্বীকারকারীর (কাফির) বিরুদ্ধে সশস্ত্র সংগ্রামকে বুঝানোর (যুদ্ধের অনুমতি বা নির্দেশের) ক্ষেত্রে সাধারণত: قتال শব্দটির ব্যবহার হয়ে থাকে। সর্বপ্রথম যুদ্ধের অনুমতি সংক্রান্ত এ আয়াতে: 'তাদেরকে যুদ্ধের অনুমতি দেয়া হলো, যারা আক্রান্ত হয়েছে, যাদের প্রতি অত্যাচার করা হয়েছে। নিশ্চয়ই আল্লাহ তাদেরকে সাহায্য করতে সক্ষম' ব্যবহৃত হয়েছে। বানী ইসরাঈল সম্প্রদায়ের যুদ্ধ করার ইচ্ছা প্রকাশের পরিপ্রেক্ষিতে আল্লাহ তা'আলার পক্ষ থেকে জবাবে নাযিলকৃত আয়াতেও কিতাল শব্দ ব্যবহার করা হয়েছে। মুসলিমদের দু'বিরোধী দলের সংগ্রামের পর মীমাংসার জন্য রাসূল সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে নির্দেশিত আয়াতেও কিতাল শব্দটি প্রয়োগ হতে দেখা গেছে। قتال শব্দটির মূল অর্থ সশস্ত্র যুদ্ধ। আল-কুরআনে সশস্ত্র যুদ্ধ সংক্রান্ত আয়াতগুলোতে جهاد শব্দটি একবারও ব্যবহার করা হয়নি। মূলত: এখানেই جهاد এবং قتال এর মধ্যে পার্থক্য। আর জিহাদ হচ্ছে ব্যাপক অর্থবোধক শব্দ, আর কিতাল হচ্ছে নির্দিষ্ট অর্থ প্রকাশক শব্দ। জিহাদ প্রত্যেক মুসলিম ব্যক্তির জন্য ফরযে আইন, আর কিতাল যুদ্ধক্ষম ব্যক্তির জন্য কিছু সুনির্দিষ্ট শর্ত সাপেক্ষে ফরয।² কিন্তু যুদ্ধে অক্ষম মুসলিমদের জন্য তা ফরযে কিফায়া।

14. জিহাদ- (جهاد): শব্দটি جهد শব্দ থেকে নির্গত। ج (জিম) বর্ণের ওপর পেশ হলে এর অর্থশক্তি ও সামর্থ্য, কঠিন, অতিরিক্ত, পরিশ্রম। আর জিমের ওপর ফাতাহ হলে এর অর্থ শক্তি সামর্থ্য ব্যয় করা, প্রচেষ্টা, লক্ষ্যে পৌঁছা পর্যন্ত প্রচেষ্টা চালানো, পরীক্ষা করা, আগ্রহ প্রকাশ করা, ক্ষীণ বা দুর্বল করা, অধ্যবসায় সহকারে কাজ করা, এবং সাধ্যানুযায়ী চেষ্টা করা। যুদ্ধে দুশমন প্রতিরোধে সব শক্তি সামর্থ্য প্রয়োগ করা। তাই জিহাদ হচ্ছে শত্রু দমনের লক্ষ্যে শক্তি প্রয়োগ। ইসলামী পরিভাষায়- জিহাদ হচ্ছে কাফির-আল্লাহদ্রোহীদের বিরুদ্ধে সম্মিলিত শ্রম ও প্রচেষ্টা চালানো। অথবা কাফেরদের হাত থেকে আল্লাহর দ্বীনকে হিফাযত করার জন্য পরিচালিত যাবতীয় প্রচেষ্টাই জিহাদ। যা প্রত্যেক মুসলিমের ওপর ফরয করা হয়েছে।
ইমাম আবু হানিফা রাহিমাহুল্লাহ বলেন, জিহাদ হলো সত্যধর্ম গ্রহণের আহবান, প্রত্যাখ্যাত হলে যুদ্ধ করা।
ইমাম শাফেয়ী বলেন, দ্বীন ইসলাম প্রতিষ্ঠায় কাফিরদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করাই জিহাদ।
ইমাম মালিক বলেন, আল্লাহর কালেমা প্রচারের লক্ষ্যে (চুক্তিবদ্ধ জাতি ছাড়া) কাফিরের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার নাম জিহাদ।
গরীব আল হাদীছ ওয়া আল আছার গ্রন্থে উল্লেখ আছে যে, জিহাদ হচ্ছে, কাফিরদের বিরুদ্ধে প্রত্যেক ব্যক্তির নিজস্ব শক্তি সামর্থ্য ও যোগ্যতা অনুপাতে যুদ্ধের জন্য প্রস্তুতি গ্রহণ। এ প্রস্তুতি কথা ও কাজ উভয় দ্বারা হতে পারে।

অতএব, সমরবিদ বলতে বুঝায় যুদ্ধ, রন সংক্রান্ত বিষয়ে পারদর্শী বা অভিজ্ঞ ব্যক্তি। পরিভাষায়: জার্মানির প্রতিরক্ষা বিশেষজ্ঞ ক্লজ উইজ বলেন: সমরনীতি, প্রতিরক্ষানীতি ও কৌশল সম্পর্কে অভিজ্ঞ ব্যক্তিই হলেন সমরবিদ। আর সমরনীতি ও কৌশল বলতে আমরা বুঝি কোন দেশের স্বার্থ সংরক্ষণের জন্য দুশমনের সাথে লড়াই করা।³
সুতরাং সমরনীতি সম্পর্কে অভিজ্ঞ যে কোন সমরনায়কই সমরবিদ। সাধারণত কোন যুদ্ধে সফল নেতৃত্বদানকারী ও সফলতা অর্জনকারীকে আমরা সমরবিদের অন্তর্ভুক্ত করতে পারি।

যুদ্ধ ও সমরনীতিঃ যুদ্ধ ও সমরনীতি এক নয়। সমরনীতি সাধারণত রাষ্ট্রনায়ক কিংবা রাজনীতিবিদগণ প্রণয়ন করে থাকেন। এক সময় হয়ত যুদ্ধ করার ইচ্ছা থাকে না, কিন্তু অবস্থা এমন দাঁড়ায় যে, যুদ্ধ না করলে দেশ ও জাতি রক্ষা হয় না। আবার কখনো শত্রু দেশ প্রান্তে উপনীত, কিন্তু যুদ্ধের পরিবর্তে তখন সন্ধি করাই শ্রেয় বিবেচিত হয়। কখনও বা যুদ্ধের প্রবল ইচ্ছা, কিন্তু তখন যুদ্ধ করা ক্ষতিকর কিংবা বোকামি হয়। আবার শত্রু হয়ত বহু দুরে, কিন্তু কখনো অগ্রবর্তী হয়ে তাদের পথ রোধ করা আবশ্যক হয়ে পড়ে। ফলকথা দেশ ও জাতির অবস্থা সামনে রেখে কখনো যুদ্ধ করা এবং কখনো না করা, কখনো কারো সাথে চুক্তিবদ্ধ হওয়া এবং কখনো চুক্তি না করা। কখনো সৈন্য সংখ্যা বৃদ্ধি করা, কখনো কম করা, কখনো দেশ রক্ষা খাতে কত ব্যয় করা। সৈন্যদের জন্য কখন কি অস্ত্র ও রসদ সংগ্রহ করা এবং যুদ্ধ বাধলে সেসব রসদ কিভাবে ব্যবহার করা। কোথায় ঘাঁটি তৈরি করা, কখন কি সংবাদ প্রচার করা এবং কি সংবাদ গোপন রাখা উচিত ইত্যাদি যাবতীয় বিষয় সমরনীতির অন্তর্ভুক্ত। আর যুদ্ধ বলতে বুঝায় ঐসকল নীতির অনুসরণে শত্রুর মুকাবিলা করা।
যুদ্ধের সাফল্যের জন্য প্রথমেই প্রয়োজন হয় কোন সুদক্ষ সমরবিদের, যার দূরদর্শিতা ও প্রয়োজনীয় নির্দেশের উপর সবকিছু নির্ভর করে। দ্বিতীয়ত প্রয়োজন হয় কোন যুদ্ধনিপুণ সেনাপতির, যার আদেশে সৈন্যবাহিনী পরিচালিত হবে। তৃতীয়ত প্রয়োজন হয় বীর সাহসী, ধৈর্যশীল ও অনুগত যোদ্ধা-বাহিনীর, যারা যুদ্ধক্ষেত্রেও ধৈর্য ও আনুগত্যেও চরম পরাকাষ্ঠা প্রদর্শন করবেন। এ দৃষ্টিকোণ থেকে বিচার বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে, মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম একই সঙ্গে শ্রেষ্ঠ সমরনীতিবিদ এবং শ্রেষ্ঠ সেনাপতি হিসেবে যুদ্ধের নীতি নির্ধারণ ও যুদ্ধ পরিচালনা করেছেন। তেমনিভাবে মুজাহিদ বাহিনীকেও তিনি এমন ভাবে গড়ে তুলেছিলেন যে, এদের সমকক্ষ পৃথিবীর ইতিহাসে আর কেউ নেই।

টিকাঃ
১. এস,কে, আহমদ,জয় নব অভিধান, ঢাকা: জয় বুকস ইন্টা:১৪০৬ পৃ.৩১১।
২. তন্মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ কয়েকটি শর্ত হচ্ছে: ১- সুনির্দিষ্ট কোনো রাষ্ট্রপ্রধানের অধীনে সে যুদ্ধ হতে হবে। সুতরাং যেখানে কোনো जनप्रतिनिধিত্যপূর্ণ সরকার আছে, সেখানে সে সরকারের অনুমতি ব্যতীত কারও বিরুদ্ধে সশস্ত্র যুদ্ধ করা যাবে না। ২- অবশ্যই তা যুদ্ধরত কাফের-মুশরিকদের বিরুদ্ধে হতে হবে। মুসলিমদের বিরুদ্ধে মুসলিমদের কোনো সশস্ত্র যুদ্ধ ইসলাম অনুমোদন করে নি। অনুরূপভাবে মুসলিমদেশে নিরাপত্তাসহ বসবাসকারী কোনো অমুসলিমের বিরুদ্ধেও এ ধরণের যুদ্ধ করা যাবে না। [সম্পাদক]
৩. মেজর জেনারেল আকবর খান, মহানবীর প্রতিরক্ষা কৌশল, পৃ.২৯; হাদীসে দেফা,অনুবাদক: আবু সাইদ ওমর আলী, ঢাকা:ই,ফা,বা, প্রথম প্রকাশ-১৯৮৪,

📘 সমরবিদ হিসাবে মুহাম্মাদ সা > 📄 যুদ্ধ কেন এবং কোন ধরনের?

📄 যুদ্ধ কেন এবং কোন ধরনের?


রাসূল সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম যখন আরবের কাফির মুশরিকদের দীনের পথে আহবান জানালেন তখন তারা বিরোধিতা করতে লাগল। তার দ্বীন প্রচারেও তারা ভীত ও আতঙ্কগ্রস্থ হয়ে পড়ে। তাদের আশংকা হলো যে, দীর্ঘদিন যাবত তারা যেভাবে মানুষের উপর শাসন প্রতিষ্ঠা করেছে এবং অত্যাচার নির্যাতন চালিয়ে যাচ্ছে তার অবসান হয়ে নতুন ইসলামী সমাজ প্রতিষ্ঠিত হবে। ফলে তারা মুখের ফুৎকারে আল্লাহর দ্বীনকে নিভিয়ে দিতে সকল কূটকৌশল গ্রহণ করে। এসবের মোকাবিলায় নির্দোষ নিরপরাধ ও নির্যাতিত মুসলিমদের রক্ষা করার জন্য মহান আল্লাহ জিহাদের অনুমতি দিয়েছেন। মহান আল্লাহ বলেন:
أُذِنَ لِلَّذِينَ يُقَتَلُونَ بِأَنَّهُمْ ظُلِمُوا وَإِنَّ اللَّهَ عَلَى نَصْرِهِمْ لَقَدِيرٌ ﴿٣٩﴾ [الحج: ٣٩]
“(কাফিরগন) যাদের সাথে যুদ্ধ করতে প্রবৃত্ত তাদেরকে যুদ্ধের অনুমতি দেয়া হয়েছে। যেহেতু তারা মাজলুম, আর আল্লাহ নিশ্চয় তাদেরকে সাহায্য দানে সক্ষম।” (সূরা হজ্জ:৩৯)

وَقَاتِلُواْ فِي سَبِيلِ اللَّهِ الَّذِينَ يُقَاتِلُونَكُمْ وَلَا تَعْتَدُواْ إِنَّ اللَّهَ لَا يُحِبُّ الْمُعْتَدِينَ ﴿١٩٠﴾ [البقرة: ١٩٠]
“যারা তোমাদের সাথে যুদ্ধ করতে প্রবৃত্ত হয়। আল্লাহর পথে তোমরা তাদের সাথে যুদ্ধ করে। কিন্তু তাদেরকে অগ্রে আক্রমণ করে সীমালঙ্ঘন করিও না। নিশ্চয়ই আল্লাহ সীমালঙ্ঘনকারীদেরকে ভালবাসেন না।” (সরা আল বাকারাহ:১৯০)

কুরআনের অন্যত্রে এসেছে
الَّذِينَ أُخْرِجُواْ مِن دِيَارِهِم بِغَيْرِ حَقٍّ إِلَّا أَن يَقُولُوا رَبُّنَا اللَّهُ وَلَوْلَا دَفْعُ اللَّهِ النَّاسَ بَعْضَهُم بِبَعْضٍ لَّهُدِّمَتْ صَوَامِعُ وَبِيَعٌ وَصَلَوَاتٌ وَمَسَاجِدُ يُذْكَرُ فِيهَا اسْمُ اللَّهِ كَثِيرًا وَلَيَنصُرَنَّ اللَّهُ مَن يَنصُرُهُ إِنَّ اللَّهَ لَقَوِيٌّ عَزِيزٌ ﴿٤٠﴾ [الحج: ٤٠]
“যারা অন্যায়ভাবে নিজ দেশ হতে বহিষ্কৃত হয়েছে, অন্য কোনও অপরাধে নয়। বরং এতটুকু বলার জন্য যে, আমাদের প্রতিপালক আল্লাহ। আল্লাহ যদি কিছু মানুষকে অপর কিছু মানুষদ্বারা পরাভূত না করতেন তবে সন্ন্যাসীদের তপস্যা-কুটির, ইসায়ীদের ভজনালয়, ইয়াহুদীদের পূজা-গৃহ এবং মুসলিমদের মসজিদ ইত্যাদি যেখানে অসংখ্যবার আল্লাহর নাম উচ্চারিত হয়ে থাকে, নিশ্চয় ধ্বংস হয়ে যেতো। আর যে ব্যক্তি তার (দ্বীনের) সাহায্য করবে অবশ্য আল্লাহ তাকে সাহায্য করবেন, নিশ্চয় আল্লাহ তা'আলা শক্তিশালী ও পরাক্রমশালী।” (সূরা হজ্জ:৪০)

উপরোক্ত আয়াতে কারীমাগুলো বিশ্লেষণ করলে বুঝা যায় যে, নির্যাতিত নিপীড়িত দেশ থেকে বিনা অপরাধে বহিষ্কৃত মুসলিমদের সাথে যুদ্ধে লিপ্ত থাকা কাফির মুশরিকদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করার জন্য ইসলাম নির্দেশ দিয়েছে। তবে এক্ষেত্রে কোনও অবস্থাতেই কোনও প্রকার সীমালঙ্ঘন করা বৈধ নয়।

রাসূল সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম জীবনে প্রত্যক্ষ ও পরোক্ষভাবে যেসব যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছিলেন তার বেশিরভাগই ছিল প্রতিরক্ষামূলক। আবার কোথাও কোথাও তিনি আল্লাহর পথে দাওয়াতদানে বাধা হওয়ার কারণে কাফেরদের বিরুদ্ধে যুদ্ধ করেছিলেন। তন্মধ্যে ওহুদ এবং খন্দকের যুদ্ধ ছিল সরাসরি প্রতিরক্ষামূলক। আর বদর, তাবুক ও মক্কা বিজয়ের কারণগুলো বিশ্লেষণ করলেও একথাই প্রতিভাত হয় যে, এসব যুদ্ধের মূলে ছিল কাফেরদের চরম বাড়াবাড়ি, অগ্রে সৈন্যবাহিনী নিয়ে মদীনা আক্রমণ, দাওয়াতের পথে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি প্রভৃতি। অতএব যেসব প্রাচ্যবিদ এসব যুদ্ধকে শুধু আক্রমনাত্মক বলেন তা অপপ্রচার বৈ কিছুই নয়।
রাসূল সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর বয়স যখন ৫৩ বছর তখন তিনি মদিনায় হিজরত করেন, তারপর থেকে যুদ্ধের সূচনা হয়। কিন্তু নবুয়ত লাভ করেছিলেন ৪০ বছর বয়সে। অবশিষ্ট তের বছর অনেক অত্যাচার নির্যাতন সহ্য করেছেন, হাবশায় হিজরত করেছেন। তার প্রিয় সাহাবীগণের উপর অনেক নির্যাতন চালানো হয়েছে। তথাপিও দীনের স্বার্থে ধৈর্য ধারণ করেছেন। যদি যুদ্ধের উদ্দেশ্য শুধুই আক্রমনাত্মক হতো তাহলে ধৈর্যের প্রয়োজন ছিল কেন?
মহানবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম কোন কোনটিতে স্বয়ং নিজে উপস্থিত হয়ে যুদ্ধ পরিচালনা করেছেন, যাকে ঐতিহাসিকগণ গাযওয়া বলে। আবার কোন কোন অভিযানে নিজে অংশ গ্রহণ না করে, বিশেষ সাহাবার সেনাপতিত্বে বাহিনী প্রেরণ করেছেন, এগুলোকে সারিয়া বলা হয়। মহানবী সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর জীবনে মোট ২৯ টি গাযওয়াহ এবং ৬৩ টি সারিয়‍্যাহ সংঘটিত হয়েছিল। তাঁর সশরীরে অংশগ্রহণকৃত গাযওয়ার সংখ্যা নয়টি যথা: বদর, ওহুদ, আল মারায়সী, খন্দক, কুরায়জা, খায়বর, ফাতহ্ মাক্কাহ্, হুনাইন, আত-তায়েফ।

📘 সমরবিদ হিসাবে মুহাম্মাদ সা > 📄 রাসূল (ﷺ) কয়তি যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছেন

📄 রাসূল (ﷺ) কয়তি যুদ্ধে অংশগ্রহণ করেছেন


রাসূল সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাঁর জীবনে মোট সাতাশটি জিহাদে সরাসরি নেতৃত্ব দিয়েছেন। মুহাম্মাদ ইবনে ইসহাক, ওয়াকেদী, ইবনে সাদ উক্ত মতের সাথে একাত্মতা ঘোষণা করেছেন। কিন্তু সা'ঈদ ইবনে মুসাইয়‍্যাবের মতে, ২৪ টি এবং জাবের ইবনে আব্দুল্লাহর মতে ২১ টি এবং যায়েদ ইবনে আরকামের মতে ১৯ টি, মূসা ইবনে ওকবার মতে ৮ টি ।
মূলত سرية غزوة جيش بعث এর সংজ্ঞা নিরূপণে পার্থক্য থাকার কারণে উক্ত মতপার্থক্য পরিলক্ষিত হয়।

📘 সমরবিদ হিসাবে মুহাম্মাদ সা > 📄 মহানবী সা এর সমর জিবনের বিভিন্ন দিকের পর্যালোচনা

📄 মহানবী সা এর সমর জিবনের বিভিন্ন দিকের পর্যালোচনা


যদি আমরা রাসূল সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সমর জীবনের বিভিন্ন গুরুত্বপূর্ণ দিকগুলো পর্যালোচনা করি তাহলে আমাদের কাছে স্পষ্ট হয়ে যাবে যে, রাসূল সাল্লাল্লাহু 'আলাইহি ওয়াসাল্লাম একজন সমরবিদ হিসেবে কত উচ্চ আসনের ছিলেন। যোদ্ধা হিসেবে তিনি কেমন ছিলেন? সাহাবায়ে কিরামকে তিনি কিভাবে প্রশিক্ষণ দিয়েছেন। তার যুদ্ধ উপকরণ কেমন ছিল? যুদ্ধের ময়দানে তিনি কেমন কৌশল অবলম্বন করেন? নিম্নের আলোচনা থেকে এসব প্রশ্নের উত্তর আমরা সহজেই পেয়ে যাব।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00