📘 সমকালীন কুসংস্কার ও সামাজিক প্রথা > 📄 তালাককে রাগ প্রশমনের হাতিয়ার মনে করা

📄 তালাককে রাগ প্রশমনের হাতিয়ার মনে করা


আমাদের সমাজের বহুলোক তালাককে রাগ প্রশমনের হাতিয়ার মনে করে। স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে কোনরূপ মতবিরোধ দেখা দিলে, আর পরিস্থিতি উত্তপ্ত হয়ে ক্রোধের পর্যায়ে পৌঁছলে, সাথে সাথে স্বামী তালাকের শব্দ মুখ দিয়ে বের করা শুরু করে দেয়।
অথচ তালাক তো কোন গালি নয় যে তা রাগের সময় বলা হবে এবং ক্রোধ প্রশমনে তা প্রয়োগ করা হবে। তালাক মূলত: বৈবাহিক সম্পর্ক বিলুপ্ত ঘোষণার চূড়ান্ত রূপ। বাস্তব জীবনে এর ফলাফল খুবই কঠিন ও তিক্ত। এর মাধ্যমে শুধু বৈবাহিক সম্পর্কই ছিন্ন হয়না; বরং পারিবারিক জীবনের অনেক সমস্যাও এর কারণে সৃষ্টি হয়। স্বামী-স্ত্রী একে অপরের জন্য পর হয়ে যায়। সন্তানদের লালন-পালন ব্যবস্থা এলোমেলো হয়ে যায়। সর্বোপরি এর প্রভাব শুধু স্বামী-স্ত্রীর মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকেনা, বরং সন্তান-সন্ততি এমনকি কখনো কখনো উভয়ের বংশে পর্যন্ত এর সদূর প্রসারী প্রভাব প্রতিফলিত হয়।
একারণেই ইসলাম তালাকের অনুমতি প্রদান করলেও একে “আবগাযুল মুবাহাত” বা নিকৃষ্টতম বৈধকর্ম বলে ঘোষণা করেছে। সূত্র: সুনানে আবূ দাউদ ১/৩৩০, মুসতাদরাকে হাকেম ২/২১৮
তাছাড়া, স্বামী-স্ত্রীকে ইসলাম এমন নির্দেশনা প্রদান করেছে, যার উপর আমল করা হলে তালাকের মত কঠিন ও জটিল পরিস্থিতি খুব কমই সৃষ্টি হবে। এতদসত্ত্বেও যদি তালাক প্রদানের প্রয়োজন হয় তাহলে এর জন্য এমন পন্থা বাতলে দিয়েছে, যাতে ক্ষতির ভাগ খুবই সামান্য হয়।
কিন্তু অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় যে, বর্তমান সমাজের অধিকাংশ মুসলমান সেসব বিষয়ে অবগত নন এবং অবগত হওয়ার প্রয়োজন আছে বলেও মনে করেননা। ফলে, স্বামী-স্ত্রীর মাঝে মনমালিন্য বা কোন বিষয়ে কথা কাটাকাটি হলে সর্ব প্রথম যে অস্ত্রটি তারা একে অপরের উপর ব্যবহার করেন তা হলো, তালাক এবং তাও এমন পন্থায় যে পরবর্তীতে এক সাথে ঘর-সংসার করার ইচ্ছা হলেও তা আর সম্ভব হয়না। ফলে, যা হওয়ার তাই হয়।
তখন আবার সমাজের কেউ কেউ তাকে বুঝায় যে, রাগের অবস্থায় তালাক দিলে তালাক হয়না বা শুধু লিখিত দিলে এবং মৌখিক ভাবে তালাকের কথা না বললে তালাক হয়না বা একাকি তালাক দিলে এবং তালাকের সাক্ষী উপস্থিত না থাকলে তালাক হয়না বা তালাকের সময় স্ত্রী কাছে না থাকলে বা না শুনলে তালাক হয়না বা স্ত্রী কর্তৃক তালাক নামা গ্রহণ না করে ফিরিয়ে দিলে তালাক হয়না ইত্যাদি সব শরীয়ত বরোধী কথাবার্তা, যেগুলোর স্বপক্ষে না আছে কোন গ্রহণযোগ্য দলীল-প্রমাণ আর না আছে শরীয়ত স্বীকৃত কোন যুক্তি।
কারণ, শরীয়তের বিধান হলো, ইচ্ছায়-অনিচ্ছায়, খুশি হয়ে, অখুশি হয়ে, নিয়্যত করে, নিয়্যত ব্যতিরেকে, মৌখিক ভাবে, লিখিত ভাবে স্ত্রীর উপস্থিতিতে, অনুপস্থিতিতে, একাকী, জন সম্মুখে যে কোন অবস্থায় যেকোন ভাবে স্ত্রীকে তালাক প্রদান করলে তালাক পতিত হয়ে যায়। সুতরাং তালাক দেওয়ার পূর্বে অবশ্যই এ বিষয়ে শরীয়তের মাসআলা মাসায়েল ভাল ভাবে জেনে বুঝে ঠান্ডা মাথায় এর পরিণতি সম্বন্ধে বার বার চিন্তা করে তালাক দেয়া জরুরী। আল্লাহ আমাদের তওফীক দান করুন।

📘 সমকালীন কুসংস্কার ও সামাজিক প্রথা > 📄 স্ত্রীকে তিন তালাক দেওয়ার পরও তাকে নিয়ে ঘর সংসার করা

📄 স্ত্রীকে তিন তালাক দেওয়ার পরও তাকে নিয়ে ঘর সংসার করা


তালাকের ব্যাপারে আমাদের সমাজে জঘণ্যতম যে ভ্রান্তিটি রয়েছে তা হলো, তিন তালাকের কমকে মানুষ সাধারণত: তালাকই মনে করেনা। তারা মনে করে এক তালাক বা দুই তালাক দিলে তালাকই হয়না। একারণেই তালাক দেয়ার পরিস্থিতি তৈরী হলে তারা তিন তালাকের কমে ক্ষান্ত হয়না। অথচ এক তালাক দিলেই তালাকের উদ্দেশ্য সাধিত হয়ে যায়। আর প্রকৃতসত্য হলো এই যে, এক তালাক দেয়াই শরীয়তের দৃষ্টিতে তালাক প্রদানের সঠিক ও উত্তম পদ্ধতি। কারণ, এভাবে তালাক দিলে পরবর্তীতে বেবাহিক সম্পর্ক পূর্ণবহালের সুযোগ থাকে।
এক সাথে তিন তালাক দেওয়া শরীয়তে নিষিদ্ধ ও গুনাহের কাজ। আর এ গুনাহের প্রাথমিক শাস্তি হলো, পরবর্তীতে ইচ্ছা থকলেও বৈবাহিক সম্পর্ক পূর্ণবহালের সুযোগ শেষ হয়ে যাওয়া। হানাফী, শাফেঈ, মালেকী, হাম্বলী তথা চারও মাযহাবই এ ব্যাপারে একমত।
অনেক সময় দেখা যায়, স্বামী যদি এক তালাক দিয়ে থেমে যায় তাহলে স্ত্রী বা অন্য কেউ তাকে কটু কথা বলে বা অন্য কোন উপায়ে তাকে আরো উত্তেজিত করে এমন পরিস্থিতি সৃষ্টি করে যাতে সে তিন তালাক দিতে বাধ্য হয়।
মোটকথা, তিন তালাক দেওয়ার পরই কেবল স্বামী-স্ত্রীর রাগ দমন হয়। উত্তেজনা প্রশমিত হয়। পরিবার-পরিজনের ক্রোধেও ভাটা পড়ে। সকলের হুঁশ ফিরে আসে। তখন শুরু হয় কন্নাকাটি। কারণ, এতক্ষণে তাদের ঘর-সংসার বিরান হয়ে গেছে।
এরপর যখন মাসআলা জানতে পারে যে, শরঈ হালালা ব্যতীত তাদের পরষ্পরে ঘর-সংসার করার আর কোন সুযোগ নেই। স্ত্রী এখন ইদ্দত পালন করে অন্যত্র বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হবে এবং ঐ স্বামীর সাথে তার দৈহিক মিলন হবে। অতপর সে যদি মৃত্যু বরণ করে কিংবা স্বেচ্ছায় তাকে তালাক দিয়ে দেয় তাহলে ঐ তালাক বা মৃত্যুর ইদ্দত পালন করার পরই কেবল তারা চাইলে নতুন মহরানা ধার্য করে নিয়মতান্ত্রিক বিবাহের পরই কেবল তারা পুনরায় ঘর-সংসার করতে পারবে। এছাড়া, তাদের ঘর-সংসার করার শরীয়তের দৃষ্টিতে আর কোন পথ নেই। তখন খুঁজতে থাকে ভিন্ন পথ। চলে যায় স্বঘোষিত আহলে হাদীস তথা গাইরে মুকাল্লিদ সম্প্রদায়ের কাছে। তারা ফাতওয়া দিয়ে দেয় একই মজলিসে বা এক বাক্যে তিন তালাক দিলে এক তালাক পতিত হয়; তিন তালাক নয়। অথচ তাদের এ ফাতওয়া যে সুন্নাহ ও ইজমা বিরোধী তা ভিন্ন শিরোনামে প্রমাণ করে এসেছি। সুতরাং এখানে আর সে বিষয়ের পুনরাবৃত্তি করতে চাইনা।
মোটকথা, ঐ ভ্রান্ত ফাতওয়ার উপর ভিত্তি করে কিংবা শরীয়তের বিধান অগ্রাহ্য করে অবশেষে তালাক প্রাপ্তা ঐ হারাম স্ত্রীকে নিয়েই দিব্যি ঘর-সংসার করতে থাকে। অথচ শরীয়তের বিচারে ঐ স্ত্রীর সাথে তার ঘর-সংসার করা, মেলামেশা করা, সবই হারাম, নাজায়েয ও যিনা হিসাবে গণ্য। এছাড়া, তাদের এ মেলামেশা থেকে কোন সন্তান জন্ম নিলে তা জারজ সন্তান বলে গণ্য হয় এবং সারা জীবন এ হারামের মধ্যে লিপ্ত থেকে অবশেষে দুনিয়া থেকে বিদায় নেয়।
উপরন্তু, যদি শরঈ কোন কারণ ব্যতিরেকে এ তালাক দেয়া হয়ে থাকে তাহলে এ জুলুমের শাস্তিও দুনিয়া-আখেরাতে ভোগ করতে হয়。

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00