📄 মেয়ের বাড়ী থেকে ছেলের বাড়ীতে পিঠা মিষ্টান্ন ইত্যাদি পাঠানো
কোন কোন স্থানে মেয়ের বিয়ের আগের দিন, আবার কোথাও মেয়ের শশুর বাড়ীতে যাওয়ার পরের দিন মেয়ের বাড়ী থেকে ছেলের বাড়ীতে মাছ, মিষ্টি, দধি, পান, সুপারী ইত্যাদি পাঠানো হয়। কোথাও কোথাও এটাকে চৌথি বলা হয়। আবার কোথাও স্বামীর বাড়ী থেকে স্ত্রীর বাপের বাড়ীতে যাওয়ার পর স্বামীর উপর শশুরালয়ের জন্য মাছ, গোশত ইত্যাদি বাজার করা বাধ্যতামুলক মনে করা হয় এবং কোন স্বামী এটা না করলে তাকে অত্যন্ত ছোট মনের মানুষ ভাবা হয় বা তাকে হেয় প্রতিপন্ন করা হয়।
আসলে এ সবই বিজাতীয় প্রথা, এগুলোর সাথে দ্বীন ও শরীয়তের দুরতম সম্পর্ক নেই। এগুলো সবই হিন্দুদের থেকে আমদানী করা কুসংস্কার। সুতরাং এগুলো থেকে বেঁচে থাকা প্রতিটি মুসলমানের কর্তব্য।
📄 ঈদের সময় মেয়ের শ্বশুর বাড়ীতে উপহার সামগ্রী পাঠানো
অনেক স্থানে ঈদের সময় মেয়ের বাপের বাড়ী থেকে শশুর বাড়ীতে চাল, আটা, ময়দা, চিনি, সেমাই, নারিকেল, পিঠা ইত্যাদি পাঠানোর প্রথা রয়েছে। অনেক জায়গায় আবার আনুষ্ঠানিক ভাবে জামাইরও শ্বশুর, শাশুড়ী, শ্যালক, শালীকাদেরকে কাপড় চোপড় দেওয়া বাধ্যতামূলক। এমনকি এটাকে এতটাই জরুরী মনে করা হয় যে, ঋণ করে হলেও তা পালন করতে হবে। শরীয়তের দৃষ্টিতে এটা সীমা লঙ্ঘন ছাড়া আর কিছুই নয়।
সূত্র: ইসলামী বিবাহ পৃ:৩৮
📄 প্রতি বছর বিবাহ বার্ষিকীতে স্ত্রীকে উপহার দেয়া
স্ত্রীকে কোন কিছু দেয়ার দুটি অবস্থা হতে পারে। (১) প্রয়োজন অনুপাতে দেয়া। (২) প্রয়োজনাতিরিক্ত দেয়া।
প্রথম অবস্থায় যখনই স্ত্রীর প্রয়োজন হবে তখনই স্ত্রীকে তা প্রদান করবে। কারণ, এটাই হলো, তাকে দেয়ার নির্ধারিত সময়। আর দ্বিতীয় অবস্থায় স্ত্রীকে যা কিছু দেয়া হবে তা হাদিয়া বা উপহার হিসাবে গণ্য। আর উপহার দেয়ার নির্ধারিত কোন সময় নেই; যে কোন সময় দেয়া যেতে পারে।
কাজেই, প্রথম অবস্থায় যদি স্ত্রীর প্রয়োজন থাকা সত্ত্বেও না দিয়ে বিবাহ বার্ষিকীতে দেয়ার অপেক্ষা করা হয় তবে তা জায়েয হবেনা। আর দ্বিতীয় অবস্থায় বিষয়টি হাদিয়া হওয়ায় তার জন্যে কোন দিন নির্দিষ্ট করা অনুচিৎ। এতদসত্তেও বিবাহ বার্ষিকী বা অন্য কোন সময় এর জন্য নির্ধারিত করা হলে তা বদ রসম হিসাবে গণ্য হওয়ায় পরিত্যায্য।
সূত্র: ফাতাওয়া মাহমুদিয়া ৬/১৪৫৬-১৪৬, তাবলীগুল হক পৃ:২৪, ৮৯৭
📄 স্থায়ী বা অস্থায়ী পদ্ধতিতে জন্ম নিয়ন্ত্রণ করা
প্রথমত: জন্ম নিয়ন্ত্রণ শব্দটাই আপত্তিকর। কারণ, জন্ম নিয়ন্ত্রণের অধিকার মানুষের নেই। যেমনিভাবে মৃত্যু নিয়ন্ত্রণের অধিকার মানুষের নেই; বরং জন্ম মৃত্যু উভয়টিই একমাত্র আল্লাহ তা'আলার নিয়ন্ত্রণে।
বস্তুত: জন্ম নিয়ন্ত্রণ ইসলামের দুশমনদের একটা গভীর ষড়যন্ত্রের অংশ। তারা মুসলমানদের সংখ্যাধিক্য নিয়ে শংকিত। তাই জনসংখ্যা বিস্ফোরণের কথা বলে এ ব্যাপারে উৎসাহ করে। তারা মূলত: ঘোলা পানিতে মাছ শিকার করতে চায়। তারা চায় মুসলিম সমাজে এ পদ্ধতির মাধ্যমে যিনা ব্যভিচারের জোয়ার বইয়ে দিয়ে তাদেরকে আল্লাহর আযাবে নিক্ষিপ্ত করতে।
তাছাড়া, তথাকথিত জন্ম নিয়ন্ত্রণ অধিকাংশ ক্ষেত্রেই অভাব অনটন ও দরিদ্রতার ভয়ে এবং সুখী পরিবার গড়ার স্বপ্নে করা হয়ে থাকে। অথচ এটা ইসলামী আকীদার সুস্পষ্ট পরিপন্থী। কেননা, রিযিক দাতা একমাত্র আল্লাহ তা'আলা সমস্ত মাখলুকের রিযিকের যিম্মাদারী তিনি নিজেই গ্রহণ করেছেন। তিনি এমন কোন নিয়ম নির্ধারণ করেননি যে, সন্তান কম থাকলে তাকে বেশী রিযিক প্রদান করা হবে। আর বেশী থাকলে কম দেওয়া হবে; বরং সন্তান বেশী হওয়া স্বত্বেও তিনি পর্যাপ্ত রিযিক দান করতে পারেন। সুতরাং জন্ম নিয়ন্ত্রণের প্রচলিত ধ্যান ধারণা ঈমানের জন্য অত্যন্ত ঝুঁকিপূর্ণ।
পবিত্র কুরআনে কারীমে আল্লাহ তা'আলা ইরশাদ ফরমান, “তোমরা সন্তানদেরকে দারিদ্রতার ভয়ে ধ্বংস করো না। আমি তোমাদেরও রিযিকের ব্যবস্থা করব এবং তাদেরও রিযিকের ব্যবস্থা করব”। সূত্র: সূরা আন'আম, আয়াত-১৫১
অপর এক আয়াতে আল্লাহ তা'আলা ঘোষণা করেন, “তোমরা দারিদ্রতার আগাম আশংকায় তোমাদের সন্তানদেরকে ধ্বংস করোনা। আমিই তাদের এবং তোমাদের রিযিকের ব্যবস্থা করব"। সূত্র: সূরা বনী ইসরাঈল, আয়াত- ৩১
তাছাড়া, সন্তান বৃদ্ধি করা আখেরী উম্মতের উপর নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর বিশেষ অসিয়্যাত। এক হাদীসে প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ ফরমান, “তোমরা এমন বংশের মেয়েদেরকে বিবাহ কর যে বংশের মেয়েরা অধিক সন্তান জন্ম দেয়। কেননা, কিয়ামতের দিন আমি তোমাদের আধিক্য দিয়ে অন্যান্য উম্মতের উপর গর্ভবোধ করব।” সূত্র: আবু দাউদ, হাদীস নং ২০৫০
সুতরাং কুরআনের উল্লেখিত আয়াত ও হাদীসের ভাষ্য দ্বারা প্রমাণিত হয় যে, প্রচলিত জন্ম নিয়ন্ত্রণ শরীয়তে হারাম ও নাজায়েয।
তবে অত্যন্ত পরিতাপের বিষয় যে, কিছু কিছু সরকারী নামধারী আলেম হাদীসে বর্ণিত আযলকে বিকৃত করে প্রচলিত জন্ম নিয়ন্ত্রণ জায়েয করে জনসাধারণকে গুমরাহ করার অপতৎপরতায় লিপ্ত হয়েছে। অথচ নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর যুগের আযল আর প্রচলিত জন্ম নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি এক নয়। কারণ, আযলতো নিশ্চিত কোন পদ্ধতি নয়।
তদুপরি, প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আযলকে কখনো পছন্দ করেনি; বরং তিনি ঘোষণা করেছেন, কোন মুসলমান এরূপ করে বলে আমার ধারণা ছিল না। সূত্র: মু'জামুত তাবরানী হাদীস নং ৯৮ এক হাদীসে তিনি আযলকে গোপন যিন্দা কবর দান করার নামান্তর বলে উল্লেখ করেছেন। সূত্র: সহীহ মুসলিম ১/৪৬৬
অন্যত্র তিনি ইরশাদ করেছেন, “তোমরা যদি আযল না কর তাহলে তো তোমাদের কোন সমস্যা নেই।”
সারকথা, প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আযল (একটি সাময়িক ব্যবস্থা) সম্পর্কে অনুমতি দিয়েছিলেন ঈমান দুরস্ত করে; নষ্ট করে নয়। আবার সাথে সাথে এ ব্যাপারে অনুৎসাহিতও করেছেন। আর অনুমতি প্রদানও ছিল ব্যক্তিগত পর্যায়ে সাময়িক ব্যবস্থা হিসেবে। এখন এই আযলের অনুমতি দেখে তো জন্ম নিয়ন্ত্রণের ন্যায় স্থায়ী ব্যবস্থাকে জায়েয বলা কোন ক্রমেই ঠিক হবে না।
তাছাড়া, বর্তমানে মেয়াদী ও সাময়িক অন্যান্য পদ্ধতি গুলোকেও এই আযলের উপর ঢালাওভাবে কিয়াস করা বা অনুমান করা ঠিক হবে না। কেননা, বর্তমানে প্রচলিত এসব পদ্ধতি গুলোকে ব্যক্তিগত পর্যায়ে সীমাবদ্ধ রাখা হয়নি; বরং এটাকে সামাজিক আন্দোলনে রূপ দেওয়া হয়েছে এবং এর জন্য অনুৎসাহিত নয়; বরং উৎসাহিত করা হচ্ছে। অধিকন্তু, বাধ্যতামুলক করার চিন্তা ভাবনা চলছে। সর্বোপরি, এসব পদ্ধতি গ্রহণের জন্য উৎসাহিত করা হচ্ছে এমন সব বক্তব্য দিয়ে যা ঈমানী চেতনা বিরোধী।
অতএব, বুঝা গেল, হাদীসে আযলের অনুমতি দেয়া হয়েছিল যে আঙ্গিকে এবং যে মানসিকতার ভিত্তিতে, প্রচলিত জন্ম নিয়ন্ত্রণ পদ্ধতিতে তার সম্পূর্ণ ভিন্ন আঙ্গিকে ও ভিন্ন মানসিকতায় গ্রহণ করা হয়েছে। সুতরাং হাদীসে আযলের অনুমতি থেকে বর্তমানে প্রচলিত জন্মনিয়ন্ত্রণ পদ্ধতি সমূহকে ঢালাও ভাবে অনুমোদন দেওয়ার কোনই অবকাশ নেই।
অবশ্য, যদি শরঈ কোন উজর যেমন: মুসলমান দ্বীনদার অভিজ্ঞ ডাক্তার যদি কোন বিশেষ মহিলার ব্যাপারে এ মতামত দেয় যে, এ দুর্বল মহিলার স্বাস্থ্য গর্ভ ধারণের কারণে অধিক খারাপ হয়ে যাওয়ার আশংকা রয়েছে। তাহলে এমন মহিলার জন্য সাময়িক ভাবে গর্ভরোধ করা জায়েয আছে। তবে শর্ত হলো, এ ক্ষেত্রে এমন কোন পন্থা অবলম্বন করতে হবে, যাতে হারাম কাজের আশ্রয় নিতে না হয়।
অনুরুপ ভাবে, কোন মহিলার যদি বিশেষ কোন কারণে গর্ভ ধারণ ক্ষমতাই না থাকে; বরং গর্ভ ধারণের কারণে মৃত্যুর আশংকা থাকে এবং স্থায়ী ভাবে গর্ভরোধ করা ছাড়া অন্য কোন উপায় না থাকে তবে সেক্ষেত্রে মুসলিম দ্বীনদার ডাক্তারের সাথে পরামর্শ ক্রমে অপারেশন কিংবা অন্য কোন উপায়ে স্থায়ী ভাবে গর্ভরোধ করাও জায়েয আছে।
সূত্র: আল বাহরুর রায়েক ৩/২০০, শামী ৩/১৭৬