📘 সমকালীন কুসংস্কার ও সামাজিক প্রথা > 📄 বিবাহের পূর্বে বিয়ের প্রস্তাবিত ছেলে-মেয়ের পরস্প

📄 বিবাহের পূর্বে বিয়ের প্রস্তাবিত ছেলে-মেয়ের পরস্প


এ কথা সকলেই জানে যে, বিবাহের প্রস্তাব দেয়ার দ্বারাই বিবাহ সংঘঠিত হয়ে যায়না; বরং এর জন্য শর্ত হলো, দুজন সাক্ষীর সম্মুখে ছেলে মেয়ে বা তাদের উকিল কর্তৃক ইজাব, কবূল সংঘঠিত হওয়া। এর পূর্বে তারা একে অপরের জন্য আজনবী ও গাইরে মাহরাম থাকে। এমনকি মৌখিক ইজাব কবূল ছাড়া শুধু লিখিত ভাবে ইজাব কবুল করা বা এনগেজমেন্ট করার দ্বারাও বিবাহ সম্পন্ন হয়না।
সুতরাং এমতাবস্থায় শরঈ প্রয়োজন ছাড়া তাদের একে অপরের সাথে দেখা, সাক্ষাৎ করা, কথাবার্তা বলা নাজায়েয ও হারাম। অথচ আমাদের সমাজে দেখা যায়, বিয়ের শুধু লিখিত কাবিন হয়ে যাওয়ার পর বা বিয়ের এনগেজমেন্ট বা আংটি পরিয়ে কথাবার্তা পাকাপাকি হয়ে যাওয়ার পর ছেলে-মেয়ে পরষ্পরে অবাধে দেখা-সাক্ষাৎ করতে থাকে এবং ফোনে বিভিন্ন রস আলাপ করতে থাকে। এগুলো সবই নাজায়েয ও হারাম। কাজেই, শরঈ বিয়ে সংঘঠিত হওয়ার পূর্বে পরষ্পরে পূর্ণ পর্দা রক্ষা করা জরুরী।

সূত্র: সূরা আহযাব আয়াত- ৩২. আদ্দুররুল মুখতার ৩/৯, আল মওসূআহ ৩৫/১২২

📘 সমকালীন কুসংস্কার ও সামাজিক প্রথা > 📄 বিবাহে কনের মতামতের তোয়াক্কা না করা

📄 বিবাহে কনের মতামতের তোয়াক্কা না করা


বর্তমানে অনেক জায়গায় বিবাহের ক্ষেত্রে বর-কনের পছন্দ, অপছন্দ ও তাদের মতামতের কোন তোয়াক্কা করা হয়না। দুটি মানুষের সারা জীবনের সুখ দুঃখের সম্পর্ক যে বিষয়ের সাথে সে বিষয়ে তাদের মতামত না নিয়ে বাবা-মা কিংবা অন্য কোন তৃতীয় পক্ষের মতামত চাপিয়ে দেয়া যে কতটা অন্যায় তা বলার অপেক্ষা রাখে না।
অনেক সময় দেখা যায়, বর কিংবা কনের প্রবল আপত্তি স্বত্বেও এক রকম জবরদস্তি করে তাদের বিবাহ দিয়ে দেয়া হয়। অথবা তাদের মতামত দেয়াকে খারাপ মনে করা হয়। অথচ এভাবে তাদের সকল সুখ-স্বপ্ন ধূলিস্যাৎ করে মানসিক অস্বস্তিকর এক ভবিষ্যতের দিকে ঠেলে দেওয়া হয়। এমনটি করা শুধু শরীয়তেরই পরিপন্থী নয়; বরং সুস্থ বিবেক বোধেরও পরিপন্থী।
হযরত আয়েশা রা. থেকে বর্ণিত একটি হাদীসে আছে, তিনি বলেন, এক যুবতী মেয়ে তার নিকট এসে দুঃখ প্রকাশ করে বলল, আমার পিতা আমাকে তার ভ্রাতুষ্পুত্রের সাথে বিয়ে দিয়েছে নিজের সম্মান বৃদ্ধির জন্য। অথচ আমি এ বিয়েতে অসম্মত ছিলাম। তখন তিনি মেয়েটিকে প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে বললেন। প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আগমণ করলে হযরত আয়েশা রা. তাঁকে বিষয়টি অবহিত করলেন। তখন প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার পিতার নিকট খবর পাঠিয়ে তাকে ডেকে এনে মেয়েটিকে তার বিবাহের ব্যাপারে পূর্ণ স্বাধীনতা প্রদান করেন। মেয়েটি তখন বলল, ইয়া রাসূলাল্লাহ আমার পিতা যা করেছেন তা আমি মেনে নিলাম। তবে আমার শুধু এটা জানার ইচ্ছা ছিল যে, বিয়ের ব্যাপারে মেয়েদের কোন অধিকার আছে কিনা? সূত্র: সুনানুন নাসাঈ ২/৬৪
হযরত উমর রা. থেকে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, নিজ কন্যাদিগকে বিয়ে দিতে চাইলে তোমরা যে কোন কুৎসিত লোকের সাথে তাকে বিয়ে দিয়ে দাও। অথচ পুরুষের ন্যায় তাদেরও তো পছন্দ-অপছন্দ আছে! অর্থাৎ সেক্ষেত্রে তারা তাই অপছন্দ করে যা পুরুষরা অপছন্দ করে। ফলে, তারা তখন আল্লাহর নাফরমানীতে লিপ্ত হয়। সূত্র: মুসান্নাফে আব্দুর রাযযাক ৬/১৫৮
তাছাড়া, এজাতীয় বিবাহের পরিণতিও খুব একটা সুখকর হয় না। কাজেই, এহেন শরীয়ত গর্হিত কাজ থেকে বেঁচে থাকা সকলের কর্তব্য।
অবশ্য, কনেরও একথা মনে রাখা উচিৎ যে, সে প্রাপ্ত বয়স্ক হওয়ার পর যদি তার অভিভাবকগণ বাস্তবেই কোন উপযুক্ত দ্বীনদার ভাল ছেলের পক্ষ থেকে বিয়ের প্রস্তাব আনে তাহলে যৌক্তিক কারণ ছাড়া তার সেই বিয়েতে অমত হওয়া ঠিক নয়। কাজেই, তারা তাদের অভিভাবকদের অধীনে থেকেই পাত্র নির্বাচনের ক্ষেত্রে তাদের মতামত ব্যাক্ত করবে। নিজেদের কোন পছন্দ-অপছন্দ থাকলে শরীয়তের সীমা রেখার মধ্যে থেকে তা ব্যাক্ত করবে।

সূত্র: ফাতাওয়া দারুল উলূম দেওবন্দ ২/৪৬১-২, কিতাবুল ফাতাওয়া ৩/৩৬৭, ইসলামী বিবাহ পৃ: ১৩

📘 সমকালীন কুসংস্কার ও সামাজিক প্রথা > 📄 বিবাহে যৌতুক চাওয়া

📄 বিবাহে যৌতুক চাওয়া


শরীয়তে বিবাহের লেনদেন সম্পর্কে এতটুকু বলা হয়েছে যে, পাত্র নিজের সামর্থ অনুযায়ী পাত্রীকে মহরানা দিবে এবং স্ত্রীর সাথে সাক্ষাত হয়ে যাওয়ার পর সামর্থ অনুযায়ী আত্মীয় স্বজন ও বন্ধু-বান্ধবকে ওলীমা খাওয়াবে। বিবাহের খরচ এদুটিই। আর এ দুটিই স্বামীর দায়িত্ব। এছাড়া, স্ত্রীর ভরণ পোষণের ব্যাপার তো আছেই।
কিন্তু বর্তমানে ছেলে পক্ষ মেয়ে পক্ষের উপর অন্যায় ভাবে কিছু আর্থিক দায় দ্বায়িত্ব চাপিয়ে দেয়। এর মধ্যে অন্যতম হলো, যৌতুক প্রথা। দেখা যায় যে, ছেলে পক্ষ যৌতুক, উপহার, হাদিয়া বা অন্য কোন নামে মেয়ে পক্ষের উপর অন্যায় দাবী করে বসে। যেমন: ছেলেকে মোবাইল সেট, ঘড়ি, ফার্নিচার, মোটর সাইকেল, টেলিভিশন, ফ্লাট বাড়ী, গাড়ী ইত্যাদি দিতে হবে বা চাকুরী দিতে হবে বা বিদেশে পাঠিয়ে দিতে হবে। এছাড়াও, যুগের পরিবর্তনের সাথে সাথে এজাতীয় যৌতুকের আইটেমও বিভিন্ন রকম হচ্ছে। অথচ যৌতুক চাওয়া বা যৌতুকের জন্য পাত্রী পক্ষকে কোন প্রকার চাপ প্রয়োগ করা চরম শাস্তি মূলক অপরাধ এবং শরীয়তে নাযায়েয ও হারাম এবং মেয়ের অভিভাবকের উপর চরম জুলুমের শামিল। হাদীস শরীফে এসেছে, “কোন মুসলমানের সম্পদ তার আন্তরিক সন্তুষ্টি ব্যতিরেকে নেয়া হালাল নয়।” সূত্র: মিশকাত শরীফ পৃ: ২৫৫
সুতরাং এ বিষয়ে পাত্র পক্ষের সতর্ক থাকা অত্যন্ত জরুরী। তবে মেয়ের অভিভাবক যদি বিবাহের সময় ছাড়া অন্য কোন সময় স্বেচ্ছায় পূর্ণ সন্তুষ্টচিত্তে মেয়েকে কোন কিছু দিয়ে দিতে চান তবে দিতে পারবেন। এতে শরীয়তে কোন বাঁধা নেই।

📘 সমকালীন কুসংস্কার ও সামাজিক প্রথা > 📄 বরের সাথে দল বেঁধে বরযাত্রী সেজে কনের বাড়ীতে

📄 বরের সাথে দল বেঁধে বরযাত্রী সেজে কনের বাড়ীতে


আমাদের দেশে ব্যাপক ভাবে বিবাহ গুলোতে দেখা যায় যে, পাত্র পক্ষ পাত্রী পক্ষকে বলে দেয় বরযাত্রী হিসাবে ১০০/২০০ জন মেহমান আসবে। কাজেই, ইচ্ছায় অনিচ্ছায় কনে পক্ষকে এসব বরযাত্রীর মেহমান দারী ও খানা পিনার ব্যবস্থা করতে হয়। শরীয়তের দৃষ্টিতে এ ধরণের বরযাত্রা নাযায়েয।
এছাড়াও, অনেক সময় দেখা যায়, কনে পক্ষ স্বেচ্ছায় নির্ধারিত সংখ্যক লোকের মেহমান দারীর দায়িত্ব নিলে ছেলে পক্ষ তার চেয়ে বেশী লোকজন সাথে নিয়ে উপস্থিত হয়। অথচ অতিরিক্ত লোকজনের সেখানে যাওয়ার অর্থ হলো, বিনা দাওয়াতে কারো ঘরে প্রবেশ করা। শরীয়তে এটাও নাযায়েয। কেননা, হাদীস শরীফে বর্ণিত আছে, “যে ব্যক্তি বিনা দাওয়াতে কারো ঘরে উপস্থিত হলো, সে চোর হয়ে প্রবেশ করল আর লুটেরা হয়ে বেরিয়ে আসল।” অর্থাৎ এমন ব্যক্তি চোর এবং তার লুট পাটকারীর মত গুনাহ হবে। সূত্র: আবূ দাউদ ২/৫২৫
এখানে চিন্তা করা দরকার যে, একজন পিতা নিজের সব সংগতি দিয়ে নিজের আদরের দুলালীকে লালন পালন করে বড় করে বিয়ে দিয়ে অপরিচিত একটা ছেলের হাতে তুলে দিয়ে দূরে পাঠিয়ে দিচ্ছে, এটা তার জন্য কতবড় মর্মযাতনা! এর উপর যদি তাকে জমি বিক্রি করে বা বন্ধক রেখে বা মানুষের কাছ থেকে ঋণ নিয়ে বর যাত্রীদের আপ্যায়নের টাকা জোগাড় করতে বাধ্য হতে হয় তাহলে এর চেয়ে জুলুমের কথা আর কী হতে পারে? এটাতো ডাকাতি খানার শামিল। সুতরাং আমাদের জন্য এর থেকে বেচেঁ থাকা অত্যাবশ্যক।

সূত্র: মুসনাদে আহমদ ৫/৭২, শুয়াবুল ঈমান ২/৭৬৯, মিশকাত পৃ: ২৫৫

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00