📄 প্রেম করে/ভালোবেসে বিয়ে করা
বিবাহের পূর্বে বেগানা নারী-পুরুষের পারস্পরিক প্রেম ও ভালোবাসা সম্পূর্ণ অবৈধ ও হারাম এবং এর সূত্র ধরে তাদের দেখা-সাক্ষাৎ, প্রেমালাপ, প্রেম নিবেদন, প্রেমপত্র বিনিময় ইত্যাদি সবই নাজায়েয ও হারাম। কেউ যদি দেখা-সাক্ষাৎ নাও করে কথাবার্তা নাও বলে, তবুও অন্তত পক্ষে প্রেমিক-প্রেমিকার পরষ্পরে একে অপরকে মনে মনে কল্পনা করে আনন্দ ও তৃপ্তি অনুভব করা হারাম ও নাজায়েয।
তাছাড়া, সদা-সর্বদা পরষ্পর পরস্পরের ধ্যানে মগ্ন থাকার দরুন শরীয়তের বিধান লঙ্ঘনের পাশাপাশি স্বাস্থ ও মস্তিষ্ক দুর্বল হয়ে পরে। ফলশ্রুতিতে ভবিষ্যত দাম্পত্য জীবনে স্বামী-স্ত্রীর হক আদায় করতে ব্যর্থ ও লজ্জিত হতে হয়। হাদীস শরীফে আছে, “মানুষের অন্তরও যিনা করে। তা এভাবে যে, সে মনে মনে প্রেমাষ্পদকে চায় ও তার কল্পনায় মত্ত থাকে।"
অতএব, প্রচলিত প্রেম, ভালোবাসা সম্পূর্ণ রূপে নাজায়েয ও হারাম। এটা জায়েয হওয়ার কোন পন্থা নেই।
সূত্র: সূরা বাকারা, আয়াত- ১৬৫, সূরা মায়িদা, আয়াত-৫৪, বাওয়াদিরুন নাওয়াদের ২/৬৯৮, মিশকাত শরীফ পৃ: ২৬৯, আপকে মাসায়েল আওর উনকা হলো ৮/৪৮
📄 বন্ধু-বান্ধব নিয়ে ঘটা করে পাত্রী দেখা
পাত্রী দেখা শরীয়তের দৃষ্টিতে মুস্তাহাব। পারস্পারিক খোঁজ খবর নেওয়ার পর মহরের পরিমাণ সহ সবকিছু পাকাপাকি হয়ে গেলে অতি গোপনীয় ভাবে শুধুমাত্র পাত্র পাত্রীর চেহারা দেখতে পারবে। এর চেয়ে অধিক দেখতে চাইলে নির্ভরযোগ্য দ্বীনদার মহিলাদেরকে পাঠিয়ে দেখতে হবে। এমনকি পাত্রের পিতাও বিবাহের পূর্বে পাত্রীকে দেখতে পারবে না। কারণ, তখন পিতা ঐ মেয়ের জন্য গাইরে মাহরাম।
কিন্তু এক্ষেত্রে দেখা যায়, বর্তমানে ছেলে তার বন্ধু- বান্ধবদের সাথে নিয়ে ঘটা করে পাত্রীর মাথা থেকে পা পর্যন্ত খুঁটিয়ে খুঁটিয়ে দেখে। এটা শরীয়তে সম্পূর্ণ নিষেধ। কেননা, ঘটনাক্রমে যদি এ ছেলের সাথে ও মেয়ের বিবাহ না হয় তাহলে সেটা মেয়ের জন্য চরম মানসিক আঘাতের কারণ হয়।
তাছাড়া, একথা জানা জানি হয়ে গেলে অন্য পাত্র আসতে আগ্রহ প্রকাশ করে না। ফলে, এ মেয়ের বিবাহ দেয়া কঠিন হয়ে যায়। পাত্রী তো আর খোলা বাজারের মাছ বা গোশত নয় যে, যেই ইচ্ছা করবে যতটুকু দেখতে চাইবে যখনই চাইবে তাকে দেখানো হবে। মন চাইলে কিনবে না চাইলে না কিনবে; বরং পাত্রী তো আশরাফুল মাখলুকাত মাতৃজাতি। তার ইজ্জত সম্মান সংরক্ষণ করা সকলের কর্তব্য।
সূত্র: ইসলামী বিবাহ পৃ:১৩
📄 বিবাহের পূর্বে বিয়ের প্রস্তাবিত ছেলে-মেয়ের পরস্প
এ কথা সকলেই জানে যে, বিবাহের প্রস্তাব দেয়ার দ্বারাই বিবাহ সংঘঠিত হয়ে যায়না; বরং এর জন্য শর্ত হলো, দুজন সাক্ষীর সম্মুখে ছেলে মেয়ে বা তাদের উকিল কর্তৃক ইজাব, কবূল সংঘঠিত হওয়া। এর পূর্বে তারা একে অপরের জন্য আজনবী ও গাইরে মাহরাম থাকে। এমনকি মৌখিক ইজাব কবূল ছাড়া শুধু লিখিত ভাবে ইজাব কবুল করা বা এনগেজমেন্ট করার দ্বারাও বিবাহ সম্পন্ন হয়না।
সুতরাং এমতাবস্থায় শরঈ প্রয়োজন ছাড়া তাদের একে অপরের সাথে দেখা, সাক্ষাৎ করা, কথাবার্তা বলা নাজায়েয ও হারাম। অথচ আমাদের সমাজে দেখা যায়, বিয়ের শুধু লিখিত কাবিন হয়ে যাওয়ার পর বা বিয়ের এনগেজমেন্ট বা আংটি পরিয়ে কথাবার্তা পাকাপাকি হয়ে যাওয়ার পর ছেলে-মেয়ে পরষ্পরে অবাধে দেখা-সাক্ষাৎ করতে থাকে এবং ফোনে বিভিন্ন রস আলাপ করতে থাকে। এগুলো সবই নাজায়েয ও হারাম। কাজেই, শরঈ বিয়ে সংঘঠিত হওয়ার পূর্বে পরষ্পরে পূর্ণ পর্দা রক্ষা করা জরুরী।
সূত্র: সূরা আহযাব আয়াত- ৩২. আদ্দুররুল মুখতার ৩/৯, আল মওসূআহ ৩৫/১২২
📄 বিবাহে কনের মতামতের তোয়াক্কা না করা
বর্তমানে অনেক জায়গায় বিবাহের ক্ষেত্রে বর-কনের পছন্দ, অপছন্দ ও তাদের মতামতের কোন তোয়াক্কা করা হয়না। দুটি মানুষের সারা জীবনের সুখ দুঃখের সম্পর্ক যে বিষয়ের সাথে সে বিষয়ে তাদের মতামত না নিয়ে বাবা-মা কিংবা অন্য কোন তৃতীয় পক্ষের মতামত চাপিয়ে দেয়া যে কতটা অন্যায় তা বলার অপেক্ষা রাখে না।
অনেক সময় দেখা যায়, বর কিংবা কনের প্রবল আপত্তি স্বত্বেও এক রকম জবরদস্তি করে তাদের বিবাহ দিয়ে দেয়া হয়। অথবা তাদের মতামত দেয়াকে খারাপ মনে করা হয়। অথচ এভাবে তাদের সকল সুখ-স্বপ্ন ধূলিস্যাৎ করে মানসিক অস্বস্তিকর এক ভবিষ্যতের দিকে ঠেলে দেওয়া হয়। এমনটি করা শুধু শরীয়তেরই পরিপন্থী নয়; বরং সুস্থ বিবেক বোধেরও পরিপন্থী।
হযরত আয়েশা রা. থেকে বর্ণিত একটি হাদীসে আছে, তিনি বলেন, এক যুবতী মেয়ে তার নিকট এসে দুঃখ প্রকাশ করে বলল, আমার পিতা আমাকে তার ভ্রাতুষ্পুত্রের সাথে বিয়ে দিয়েছে নিজের সম্মান বৃদ্ধির জন্য। অথচ আমি এ বিয়েতে অসম্মত ছিলাম। তখন তিনি মেয়েটিকে প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর আসা পর্যন্ত অপেক্ষা করতে বললেন। প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আগমণ করলে হযরত আয়েশা রা. তাঁকে বিষয়টি অবহিত করলেন। তখন প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তার পিতার নিকট খবর পাঠিয়ে তাকে ডেকে এনে মেয়েটিকে তার বিবাহের ব্যাপারে পূর্ণ স্বাধীনতা প্রদান করেন। মেয়েটি তখন বলল, ইয়া রাসূলাল্লাহ আমার পিতা যা করেছেন তা আমি মেনে নিলাম। তবে আমার শুধু এটা জানার ইচ্ছা ছিল যে, বিয়ের ব্যাপারে মেয়েদের কোন অধিকার আছে কিনা? সূত্র: সুনানুন নাসাঈ ২/৬৪
হযরত উমর রা. থেকে বর্ণিত আছে, তিনি বলেন, নিজ কন্যাদিগকে বিয়ে দিতে চাইলে তোমরা যে কোন কুৎসিত লোকের সাথে তাকে বিয়ে দিয়ে দাও। অথচ পুরুষের ন্যায় তাদেরও তো পছন্দ-অপছন্দ আছে! অর্থাৎ সেক্ষেত্রে তারা তাই অপছন্দ করে যা পুরুষরা অপছন্দ করে। ফলে, তারা তখন আল্লাহর নাফরমানীতে লিপ্ত হয়। সূত্র: মুসান্নাফে আব্দুর রাযযাক ৬/১৫৮
তাছাড়া, এজাতীয় বিবাহের পরিণতিও খুব একটা সুখকর হয় না। কাজেই, এহেন শরীয়ত গর্হিত কাজ থেকে বেঁচে থাকা সকলের কর্তব্য।
অবশ্য, কনেরও একথা মনে রাখা উচিৎ যে, সে প্রাপ্ত বয়স্ক হওয়ার পর যদি তার অভিভাবকগণ বাস্তবেই কোন উপযুক্ত দ্বীনদার ভাল ছেলের পক্ষ থেকে বিয়ের প্রস্তাব আনে তাহলে যৌক্তিক কারণ ছাড়া তার সেই বিয়েতে অমত হওয়া ঠিক নয়। কাজেই, তারা তাদের অভিভাবকদের অধীনে থেকেই পাত্র নির্বাচনের ক্ষেত্রে তাদের মতামত ব্যাক্ত করবে। নিজেদের কোন পছন্দ-অপছন্দ থাকলে শরীয়তের সীমা রেখার মধ্যে থেকে তা ব্যাক্ত করবে।
সূত্র: ফাতাওয়া দারুল উলূম দেওবন্দ ২/৪৬১-২, কিতাবুল ফাতাওয়া ৩/৩৬৭, ইসলামী বিবাহ পৃ: ১৩