📄 ঈসালে সওয়াবের উদ্দেশ্যে কুরআন খতমের বিনিময় টাকা আদান-প্রদান করা
শরীয়তে মৃত ব্যক্তি র জন্য ঈসালে সওয়াব করা বৈধ। তা যে কোন নফল ইবাদতের মাধ্যমে হতে পারে। যেমন: দান সদকা করা, কুরআন তিলাওয়াত করা, যিকির আযকার করা ইত্যাদি। তবে তা হতে হবে পূর্ণ এখলাস ও একমাত্র আল্লাহর সন্তুষ্টির জন্য কোন প্রকার বিনিময় ছাড়া। কারণ, মৃত ব্যক্তি র উদ্দেশ্যে কুরআন ইত্যাদি খতম পড়ে কোন ধরণের হাদিয়া বা বিনিময় আদান-প্রদান করা সম্পূর্ণ হারাম ও নাজায়েয। এধরণের খতমের কোন সওয়াব মৃত ব্যক্তি র আমল নামায় পৌঁছায়না এবং তিলাওয়াতকারী ও এর কোন ছাওয়াব পায়না।
সূত্র: মুসনাদে আহমদ হা. নং ১৫৫৯, আল মুহীতু ল বুরহানী ১১/৩৪০, আল বাহরুর রায়িক ৮/৩৩, রদ্দুল মুহতার ৬/৫৬
📄 মাইকে শবীনা পড়ে ছাওয়াব রেসানী করা
আমাদের দেশে ছাওয়াব রেসানী করার একটি বদ রসম হলো, মাইকে শবীনা পড়ানো। নিকট অতীতে শহরে বা গ্রামে গঞ্জে এটার ব্যাপক প্রচলন দেখা যেতো। এভাবে মাইকে শবীনা পড়ানো ছাওয়াবের কাজ মনে হলেও প্রকৃত অর্থে এর মধ্যে অনেকগুলো হারাম কাজের সমন্বয় ঘটে। যেমন: রিয়া করা, লোক দেখানো, কুরআন তিলাওয়াতের বেহুরমতী ইত্যাদি। সূত্র: ফাতাওয়া শামী: ২/২৪১
মাইকে শবীনা বা খতম পড়ানোর কী প্রয়োজন? আল্লাহর উদ্দেশ্যেই যদি এটা পড়ানো হয়ে থাকে তাহলে আল্লাহ তো আর বধির নন যে, তাকে শোনানোর জন্য মাইকের প্রয়োজন হবে। এলাকার লোকেরাও তো মাইকে কুরআন শুনানোর জন্য তার নিকট দরখাস্ত করেনি। তাহলে সুনাম সুখ্যাতি কুড়ানো ছাড়া এর পিছনে আর কী উদ্দেশ্য থাকতে পারে?
এছাড়াও, এর মাধ্যমে সারারাত মানুষের ঘুমের ব্যাঘাত ঘটিয়ে তাদেরকে মহা সমস্যায় ফেলানো হয়। আশ পাশের লোকজন পেরেশান হয়ে যায়। অসুস্থ ব্যক্তিরা ঘুম না হওয়ায় আরো বেশী অসুস্থ হয়ে পড়ে। অথচ শরীয়ত এভাবে কাউকে সমস্যায় ফেলার অনুমতি দেয় না।
বিশেষত: যারা রাতে তাহাজ্জুদ পড়েন, যিকির আযকার করেন তাদের এ কারণে ভীষণ অসুবিধা হয়। আর কুরআনের বেহুরমতী তো আছেই। কেননা, যেখানে সকলে মনযোগের সাথে কুরআন শ্রবণ করে শুধুমাত্র সেখানেই উচ্চ স্বরে কুরআন তিলাওয়াতের অনুমতি আছে। কিন্তু যেখানে সকলেই স্ব স্ব কাজে ব্যস্ত, কুরআন শোনার ফুরসত নেই, সেখানে আওয়াজ করে কুরআন তিলাওয়াত করা ঠিক নয়।
মোটকথা, অনেক গুলো হারাম কাজের সমষ্টির নাম হলো, প্রচলিত শবীনা। তদুপরি, এটা যদি হয় পয়সার বিনিময়ে তাহলে তো গুনাহের মাত্রা কয়েকগুণ বেড়ে যায়। উপরন্ত, এসব হারাম ও গুনাহের সমষ্টিকে ছাওয়াব মনে করা আরেকটি হারাম এবং ঈমানের জন্য মারাত্মক হুমকী স্বরূপ। সুতরাং এসব বদ রসম বন্ধ করা একান্ত জরুরী।
উল্লেখিত, কোথাও যদি এমন হয় যে, জায়েয পন্থায় কুরআন শরীফ বিশুদ্ধ ভাবে তিলাওয়াত করা হবে বা কুরআন শরীফ খতম করা হবে এবং অনেক লোক আদবের সাথে সেই তিলাওয়াত শুনতে আগ্রহী, কিন্তু তিলাওয়াত কারীর আওয়াজ মাইক ছাড়া সকলের নিকট পৌঁছানো সম্ভব নয়, এ কারণে সেখানে এমন সাউন্ড বক্স ব্যবহার করা হয় যার আওয়াজ উক্ত মজলিসে সীমাবদ্ধ থাকে এবং এতে অন্য লোকদের অসুবিধা হয় না। তাহলে এভাবে মাইকের মাধ্যমে তিলাওয়াত করা জায়েয আছে।
সূত্র: মাজমাউয যাওয়ায়েদ ১/১৯১, ফাতাওয়া মাহমুদিয়া ১/১৮৮, আযীযুল ফাতাওয়া পৃঃ ৯৮, আহসানুল ফাতাওয়া, ১/৩৪৭
📄 ইয়াতীমের মাল খাওয়া
নিয়ম হলো, কাফন দাফন শেষে যত তাড়াতাড়ি সম্ভব কোন হক্কানী আলেম বা মুফতীর মাধ্যমে ওয়ারিসদের মাঝে মীরাছ বন্টন করে প্রত্যেককে তার নির্ধারিত অংশের মালিকানা বুঝিয়ে দেয়া। নাবালেগ ছেলে বা মেয়ের অংশ সংশ্লিষ্ট অভিভাবক বা মুরব্বী যিনি ঐ ইয়াতীম ও তার সম্পদ দেখা শুনা করবেন তার হাতে বুঝিয়ে দেয়া। কারণ, জরুরী ভিত্তিতে এটা করা না হলে ওয়ারিসদের মধ্যে যে নাবালেগ ও ইয়াতীম তার মাল খাওয়া হয়ে যায়।
কিন্তু বর্তমানে সম্পদ বন্টনের এ কাজটি জরুরী ভিত্তিতে না করার ফলে অনেক ক্ষেত্রেই ইয়াতীমের মাল খেয়ে অন্যান্য ওয়ারিসরা নিজের অজান্তেই জাহান্নামের আগুন পেটে ভরে এবং ইয়াতীমের মুরব্বী যেমন: তার বড় ভাই প্রমুখ ঐ ইয়াতীমের মাল খেতে থাকে।
এছাড়াও, ঐ যৌথ সম্পদ থেকেই আবার সমজিদ মাদরাসায় দান করে। ঘটা করে আত্মীয় স্বজন, পাড়া প্রতিবেশী, আলেম উলামাদেরকে দাওয়াত করে খাওয়ায়। অনেক বছর পর ঐ ইয়াতীম যখন বড় হয় তখন তাকে শুধু জমাজমি ও বাড়ীর অংশ বুঝিয়ে দেয়া হয়। বিগত বছর গুলোতে ঐ সম্পত্তি থেকে যে ফসল উৎপন্ন হয়েছে বা ভাড়া পাওয়া গেছে এবং তা থেকে তার পিছনে আয়ের সবটুকু যে ব্যয় করা হয়নি তা তাকে বুঝিয়ে দেওয়া হয় না; বরং ব্যয়ের বর্ধিত অংশ নিজেরা খরচ করে ফেলে। অথচ এসবই ইয়াতীমের মাল খাওয়ার দরুন হারাম ও জাহান্নাম খরীদ করার শামিল।
মনে রাখা দরকার, নাবালেগ সন্তানও বড়দের সমান অংশ পায়। কোন ক্ষেত্রে কড়া ক্রান্তিও কম পায় না।
অভিভাবকদের কর্তব্য হলো, উক্ত মাল থেকে তার ভরণ পোষণ, চিকিৎসা ও লেখা পড়ার জন্য খরচ করতে থাকা এবং অবশিষ্ট অংশ তার নামে হিফাজত করতে থাকা। অতপর সন্তান যখন প্রাপ্ত বয়স্ক ও বুদ্ধিমান হবে তখন তার সমুদয় সম্পত্তি এবং তা থেকে বর্ধিত আয় তাকে বুঝিয়ে দেওয়া। বিষয়টি বড়ই স্পর্শ কাতর। কারণ, কুরআনে কারীমে ইরশাদ হয়েছে, যারা অবৈধ ভাবে ইয়াতীমের মাল খায় তারা তাদের পেটে জাহান্নামের আগুন ভরে।
সূত্র: সুরা নিসা আয়াত: -১০
📄 বোনদের পাওনা তাদেরকে বুঝিয়ে না দিয়ে আত্মসাৎ করা
আমাদের সমাজে অত্যন্ত ব্যপক ভাবে একটি বিষয় লক্ষ্য করা যায়। তা হলো, মীরাছের সম্পদ থেকে ভাইয়েরা বোনদের অংশ দেয়না বা দিলেও সামান্য কিছু দিয়ে বিদায় করে দেয়। আবার অনেক সময় দেখা যায় যে, বোনেরা লৌকিকতা বশত: ভাইদেরকে বলে যে, আমি আমার অংশ নিবনা বা ভাইকে দিয়ে দিলাম। বোনদের এ কথায় ভাইয়েরা মহা খুশী হয়ে যায়। তাদের খুব আদর আপ্যায়ন শুর করে দেয়। অথচ তারা একটি বারও একথা চিন্তা করেনা যে, বোনদের কি সন্তান সন্ততি নেই? সবই তো আছে! তাহলে তারা নিজেদের অংশ ছেড়ে দিচ্ছে কেন?
আসল কথা হলো, বোনেরা অধিকাংশ সময় মনে করে যে, আমি যদি বাবার সম্পদ থেকে অংশ নিয়ে নেই, তাহলে বাপের বাড়ীতে আসার রাস্তা বন্ধ হয়ে যাবে। ভাইয়েরা আদর আপ্যায়ন খাতির তোষামোদ করবে না। কাজেই, বাপের বাড়ীতে আসার রাস্তা খোলা রাখার জন্য লৌকিকতা বশত: তাদের অংশের দাবী ছেড়ে দেয়।
অথচ এভাবে দাবী ছাড়লে উক্ত সম্পত্তি ভাইদের জন্য কখনো হালাল হয়ে যায়না। কেননা, অন্তরের পরিপূর্ণ সন্তুষ্টি ব্যতিরেকে একজনের মাল অপর জনের জন্য হালাল হয় না। সূত্র: বাইহাকী শরীফ, হাদীস নং-১১৪৪৫
সুতরাং বোনদের ঠকানো কিংবা লৌকিতার ভিত্তিতে তাদের থেকে প্রাপ্ত মাল ভাইদের জন্য হারাম ও অবৈধ। এতে বান্দার হক নষ্ট হয়, যা মহাপাপ এবং আল্লাহ তা'আলা তা ক্ষমা করবেন না। তাছাড়া, এভাবে নিজেরও হারাম খাওয়া হয় এবং স্ত্রী-সন্তানদেরকেও হারাম খাওয়ানো হয়। আর এ হারাম খাবার খেয়ে সন্তানও নাফরমান হয়ে যায়। হাদীস শরীফে এসেছে, “যেই দেহকে হারাম দ্বারা খোরাক দেয়া হয়েছে তা জান্নাতে প্রবেশকরবে না"। সূত্র: মুসনাদে আহমদ ৩/৩২১
সুতরাং কখনো এ ধরণের লোভ করা উচিৎ নয়; বরং পিতা মাতার মৃত্যুর পর ভাইয়েরা বোনদের ন্যায্য অংশ তাদের হাতে বুঝিয়ে দিবে এবং তাদের লৌকিকতার দান গ্রহণ করবে না; বরং বুঝিয়ে বলবে যে, তোমাদেরও মালের প্রয়োজন আছে। তোমাদের সন্তানাদীরও মালের প্রয়োজন পড়বে। কাজেই, তোমাদের অংশ তোমরা অবশ্যই নিয়ে যাও। আমরা আজীবন আমাদের নিজস্ব মাল দ্বারা সাধ্যানুযায়ী তোমাদের খেদমত ও দেখাশুনা করে যাব ইনশাআল্লাহ। কারণ, আমাদের নবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ঘোষণা করেছেন, কেউ যদি নিজের হায়াত ও মালের মধ্যে বরকত চায় তাহলে সে যেন সিলাহে রেহমী করে অর্থাৎ আত্মীয়-স্বজন বিশেষ করে বোন, ফুফু ও খালাদের খিদমত করে এবং তাদের খোঁজ খবর রাখে।
উল্লেখিত, এভাবে বুঝিয়ে বলে তাদেরকে তাদের অংশ হস্তান্তর করার পর যদি কোন বোন নিজের মালের একাংশ কিংবা পূর্ণ অংশ স্বীয় ভাইকে হাদিয়া দিয়ে দেয় তাহলে সেটা গ্রহণ করতে শরীয়তের দৃষ্টিতে কোন বাঁধা নেই; বরং ভাইদের জন্য সেটা হালাল হবে।
সূত্র: বুখারী শরীফ হাদীস নং-৫৮৬, মুসলিম শরীফ হাদীস নং ২৫৫৭