📄 কবর পাকা করা বা কবরের উপর স্মৃতি সৌধ নির্মাণ করা
কবরের চারপাশে বিভিন্ন উদ্দেশ্যে দেয়াল করা হয়ে থাকে। যেমন: সৌন্দর্য বর্ধন করা, গৌরব বা অহংকার প্রদর্শন করা, মজবুত করা, হেফাজত করা, কবরের চিহ্ন বিদ্যমান রাখা ইত্যাদি। উল্লেখিত উদ্দেশ্যসমূহের মধ্য হতে যদি সৌন্দর্য বর্ধন বা অহংকার প্রদর্শনের উদ্দেশ্যে কবরের চারপাশে দেয়াল দেয়া হয় তাহলে তা হারাম হবে। এছাড়া অন্যান্য উদ্দেশ্যে কবর পাকা করা মাকরূহে তাহরিমী যা হারামের কাছাকাছি পর্যায়ে।
কবর পাকা করা বলতে কবরের চারপাশে দেয়াল দেয়া বা দেয়াল উঁচু করে উপরের দিক দিয়ে ছাদের মতো ঢেকে দেওয়া বা কবরের উপর চুনা দিয়ে প্রলেপ দেওয়াকে বুঝায়। এমনকি কবরের চারপাশে একটি করে ইট দিয়েও যদি বেষ্টনি দেওয়া হয় তবুও তা শরীয়তে নিষিদ্ধ কবর পাকা করার অন্তর্ভূক্ত হবে।
উল্লেখ্য, শরীয়তে কবর পাকা করা জায়েয নেই। চাই তা উপরে সামান্য ফাঁকা রেখে করা হউক বা পুরা কবর ফাঁকা রেখে শুধু আশপাশ পাকা করা হউক।
মোটকথা, কবরের চারপাশে ইট, সিমেন্ট, টাইলস মার্বেল ইত্যাদি দ্বারা বেষ্টনি দেয়া শরীয়তে নাজায়েয। তবে কবরস্থানের হেফাজতের উদ্দেশ্যে তার চারপাশে ইট সিমেন্ট দিয়ে বাউন্ডারী করা জায়েয আছে।
সূত্র: মুসলিম ১/৩১২, ফাতাওয়ায়ে শামী ১/২৩৭, ফাতাওয়ায়ে কাযিখান ১/১৭১, ইমদাদুল আহকাম ১/৮১৩, ফাতাওয়ায়ে মাহমুদিয়া ১৩/৪১৩
📄 আজমীর শরীফ, শাহজালাল, শাহ পরান ইত্যাদি মাযার যিয়ারতের উদ্দেশ্যে সফর করা
যে কবর বা মাযার দূরে অবস্থিত, দীর্ঘ সফর করে যেখানে পৌঁছতে হয় সেখানে একমাত্র এ উদ্দেশ্যে সফর করা যে, উক্ত মাযার পবিত্র স্থান বা পূণ্যভূমি। কাজেই, সেখানে গেলে মনের আশা পূরণ হবে। বিপদ আপদ দূর হবে ইত্যাদি। তাহলে এ সফর শরীয়াতের দৃষ্টিতে নাজায়েয হবে। প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরূপ সফর করতে নিষেধ করেছেন। হযরত আবূ হুরাইরাহ রা. ও হযরত আবূ সাঈদ খুদরী রা. থেকে বর্ণিত প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ ফরমান, “তিনটি মসজিদ ব্যতীত অন্য কোন স্থান অভিমূখে পূণ্যস্থল মনে করে সফর করবেনা। মসজিদ তিনটি হচ্ছে, মসজিদুল হারাম, মসজিদুল আকসা ও আমার এই মসজিদ তথা মসজিদে নববী।” সূত্র: মুসলিম শরীফ ১/৪৪৯
আলোচ্য হাদীসের বর্ণনা অনুযায়ী কোন পীর আউলিয়ার মাযারকে পূণ্যস্থান মনে করা, অধিক ছাওয়াবের আশায় তা যিয়ারতের উদ্দেশ্যে সফর করা বৈধ হবে না।
মুসান্নাফে আব্দুর রাযযাক নামক হাদীস গ্রন্থে বর্ণিত আছে, হযরত আরফাজাহ রহ. বর্ণনা করেন, আমি হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে উমর রা. কে বললাম, আমি তুর পাহাড়ে যাওয়ার ইচ্ছা করেছি। তিনি বললেন, তিনটি মসজিদ ছাড়া অন্য কোন স্থানকে পূণ্যস্থান মনে করে ইহার উদ্দেশ্যে সফর করা যায় না। সেই তিনটি মসজিদ হচ্ছে, মসজিদুল হারাম, মসজিদুল আকসা ও মসজিদুন নববী। সুতরাং তুর পাহাড়ে সফরের ইচ্ছা পরিত্যাগ কর। সূত্র: মুসান্নাফে আব্দুর রাযযাক ৫/১৩৫
ইমাম আহমদ ইবনে হাম্বল রহ. উল্লেখ করেছেন, হযরত আবু হুরায়রা রা. বর্ণনা করেন, তুর পাহাড় থেকে প্রত্যবর্তন কালে আবূ বসরা গিফারী রা. এর সাথে আমার সাক্ষাত হলো। তিনি জিজ্ঞাসা করলেন, কোথা থেকে এসেছেন? আমি বললাম, তুর পাহাড় থেকে। তিনি বললেন, তুর পাহাড়ে যাওয়ার পূর্বে যদি আপনার সাথে আমার সাক্ষাত হতো তাহলে আমার থেকে প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নিষেধ বাণী শ্রবণ করে আপনি তুর পাহাড়ে যেতেন না। কারণ, আমি হযরত নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কে বলতে শুনেছি, তিনটি স্থান ছাড়া অন্য কোন স্থানকে পুণ্যস্থান মনে করে তার উদ্দেশ্যে সফর করবে না। সূত্র: মুসনাদে আহমদ ৬/৭, মুআত্তা ইমাম মালেক পৃ: ৩৮
আর আমাদের প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর রওজা মুবারক এর যিয়ারত যেহেতু মসজিদে নববীর সাথেই হয়ে যায় সেহেতু ইহা ছাড়া অন্য কোন ওলী বুযুর্গের মাযারকে পূণ্যস্থান মনে করে তার যিয়ারতের উদ্দেশ্যে দূর দূরান্ত থেকে সফর করে আসা জায়েয নয়।
তবে যদি শুধুমাত্র যিয়ারত নয়; বরং অন্য কোন উদ্দেশ্যে কেউ দূরে কোথাও সফরে যায় আর সেখানে কোন পীর বা অলীর মাযারও রয়েছে এবং সেখানে কোন মেলা কিংবা শিরক বা বিদ'আত ঐ মুহুর্তে চালু না থাকে, তাহলে সময় সুযোগ মত তা যিয়ারত করে আসতে এবং সেখানে ছাওয়াব রেসানী করে আসতে কোন অসুবিধা নেই। কারণ, এ ক্ষেত্রে মূল সফর ঐ সফরকে পূণ্যস্থান মনে করে করা হয়নি; বরং সফর তো হয়েছে অন্য কোন বৈধ প্রয়োজনের খাতিরে। তবে যদি ঐ সময় সংশ্লিষ্ট সফরে মেলা বা শিরক বিদ'আত চালু থেকে থাকে। তাহলে এমতাবস্থায় মাযার ওয়ালা কোন হক্কানী পীর বুযুর্গ হলেও সেখানে যাওয়া যাবে না। আর ভন্ড পীরের মাযারে যাওয়ার তো প্রশ্নই উঠে না। সেখানে যাওয়া সর্বাবস্থাতেই হারাম।
সূত্র: শামী ২/২৪২, হুজ্জাতুল্লাহিলো বালিগাহ ১/১৬২, ৪৫৪, ইমাদাদুল মুদতীঈন রশীদিয়া পৃ: ১৫০, ফাতাওয়া দারুল উলূম ৫/৪৫৮
📄 আত্মহত্যা করা বা আত্মহত্যাকারীর জন্য ছাওয়াব রেসানী করা
আত্মহত্যা করা হারাম, নাজায়েয ও মারাত্মক কবীরাহ গুনাহ। হাদীস শরীফে এ ব্যাপারে কঠোর ধমকি এসেছে। একটি হাদীসে প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ ফরমান, “যে ব্যক্তি পাহাড় থেকে গড়িয়ে পড়ে আত্মহত্যা করবে সে জাহান্নামে যাবে এবং জাহান্নামে অনবরত নিক্ষিপ্ত হতে থাকবে এবং সেখানে চিরকাল অবস্থান করবে। আর যে ব্যক্তি বিষপান করে আত্মহত্যা করবে সেই বিষ তার হাতে থাকবে। সে জাহান্নামে ঐ বিষ পান করতে থাকবে এবং ঐ জাহান্নামে চিরকাল অবস্থান করবে। আর যে ব্যক্তি কোন ধারালো অস্ত্র দ্বারা আত্মহত্যা করবে সেই অস্ত্র তার হাতে থাকবে। যার দ্বারা সে জাহান্নামে স্বীয় পেটে যখম করতে থাকবে এবং সে জাহান্নামে চিরকাল অবস্থান করবে। সূত্র: মিশকাত শরীফ, পৃঃ ২৯৯
উল্লেখিত বর্ণিত হাদীসে আত্মহত্যাকারীর শাস্তি চিরস্থায়ী জাহান্নাম বলা হয়েছে এ অর্থে যে, যদি সে আত্মহত্যাকে জায়েয মনে করে আত্মহত্যা করে থাকে। কারণ, এ সূরতে সে ঈমান হারা হয়ে যায়। অন্যথায় হাদীসের অর্থ হলো, সে দীর্ঘকাল জাহান্নামে অবস্থান করবে। কারণ, এ সূরতে বেঈমান হয় না। তাই আল্লাহ তা'আলা চাইলে তার এ গুনাহ মাফও করে দিতে পারেন। সুতরাং আত্মহত্যাকারীর জন্য শরীয়ত সম্মত পন্থায় ঈসালে ছাওয়াব করা জায়েয আছে। এতে কোন অসুবিধা নেই।
সূত্র: মাহমুদিয়া ৬/৮৫, আহসানুল ফাতাওয়া ১/৩৬১, ইমদাদুল আহকাম ১/১১২, আযীযুল ফাতাওয়া পৃঃ ৩৪৪
📄 সত্তর হাজার বার কালিমা তয়্যিবা দ্বারা জাহান্নাম থেকে মুক্তি পাওয়া
কেউ কেউ নিজের জন্য মৃত্যুর পূর্বে অথবা অন্য কোন ব্যক্তির জন্য সত্তর হাজার বার খতমে তাহলীল বা লা ইলাহ ইল্লাল্লাহর খতম পড়ায়, এ ধারণায় যে, এর মাধ্যমে জাহান্নাম থেকে মুক্তি লাভ হবে।
একথা স্বতসিদ্ধ যে, কালিমা তয়্যিবা পড়া অনেক ছাওয়াবের কাজ এবং হাদীসের ভাষ্য অনুযায়ী এটি উত্তম যিকিরও বটে। এটা পড়া নিজের জন্যও উপকারী এবং অন্য মৃতের জন্যও উপকারী। কিন্তু উপরোল্লেখিত নির্দিষ্ট সংখায় তা পাঠ করলে বা মৃতের নামে পাঠালে জাহান্নাম থেকে মুক্তি লাভ হয় এটি রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে বর্ণিত কোন সহীহ বা জঈফ হাদীস দ্বারা প্রমাণিত নয়। কাজেই, এটা পড়লে মৃত ব্যক্তি জাহান্নাম থেকে মুক্তি পাবে নিশ্চিত ভাবে এমন বিশ্বাস রাখা যাবেনা এবং এটাকে হাদীস বা হাদীসের ভঙ্গীতে বর্ণনা করাও বৈধ হবেনা। তবে কোন কোন মাশায়েখ থেকে এমন বক্তব্য বর্ণিত আছে। সুতরাং কালেমা তয়্যিবা চাই সত্তর হাজার হোক চাই এর চেয়ে কম হোক, চাই বেশী হোক তা পাঠ করে মায়্যেতের নামে পাঠানো হলে তার ছাওয়াব পৌঁছবে এতে কোন সন্দেহ নেই।
সূত্র: মাজমাউ ফাতাওয়া ইবনে তাইমিয়্যা ২৪/১৮০, ফাতাওয়া ইবনে তাইমিয়্যা ১৩/৩৮৩