📄 দাফনের পর কবরে দাঁড়িয়ে আযান দেয়া
আমাদের দেশের কোন কোন স্থানে দেখা যায়, মুর্দাকে দাফন করার পর কবরের পার্শ্বে দাঁড়িয়ে আযান দেওয়া হয়। এভাবে আযান দেয়ার শরীয়তে কোন ভিত্তি নেই। সুতরাং এরূপ আযান দেয়া নিষেধ।
সূত্র: শামী ১/৩৯৩, আহসানুল ফাতাওয়া ১/৩৩৭, মাহমুদিয়া ১/২৯৬, ইমদাদুল ফাতাওয়া ৫/৩০১
📄 মাইয়্যেতকে দাফনের পর কবরের চার কোণে খুঁটি গাড়া
কবরে লাশ দাফনের পর তার চার কোণায় খেজুর বা অন্য কোন গাছের ডাল গাড়া এবং তার চার কোণে ধরে চার কুল পড়ার যে প্রথা আমাদের দেশে প্রচলিত আছে, শরীয়তের দৃষ্টিতে তা বিদ'আত ও বর্জনীয় কাজ। অনেকেই এটাকে জায়েয প্রমাণ করার জন্য মুসলিম শরীফে বর্ণিত একটি হাদীস দ্বারা দলীল পেশ করে থাকেন। হাদীসটি হলো, হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একদা দুটি কবরের উপর খেজুরের ডাল দু টুকরা করে গেড়ে বলেছিলেন, যতক্ষণ পর্যন্ত এ ডাল দুটি সজীব থাকবে ততক্ষণ পর্যন্ত কবরে অবস্থিত মাইয়্যেতদ্বয়ের আযাব হালকা করা হবে। সূত্র: সহীহ মুসলিম ১/১৪১
প্রকৃতপক্ষে, তাদের এ দলীল পেশ করা সঠিক নয়। কারণ, হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সুপারিশের কারণেই তাদের আযাব হালকা করা হয়েছিল। আর ডাল দুটি শুধুমাত্র আযাব কতক্ষণ হালকা থাকবে তার পরিমাণ নির্ধারণের জন্য গেড়ে দেয়া হয়েছিল। অর্থাৎ যতক্ষণ ডাল সজীব থাকবে এবং শুকাবেনা ততক্ষণ পর্যন্ত হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর দু'আর বরকতে তাদের কবরের আযাব হালকা থাকবে। যদি এমনটি না হতো; বরং তা সকলের জন্য হতো অথবা এটা কোন নেক কাজ হতো, তাহলে হযরত সাহাবায়ে কেরাম অবশ্যই এ আমল করতেন। কেননা, তারা হুজুর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর অনুসরণের ব্যাপারে আমাদের অপেক্ষা বেশী আগ্রহী ছিলেন। এতদসত্বেও কোন সাহাবী কখনো এমনটি করেছেন বলে প্রমাণ পাওয়া যায়না। তাছাড়া, কবরের চার কোণায় চার কুল পড়ার প্রমাণও কোন সহীহ হাদীসে পাওয়া যায়না। তবে হাদীসে এতটুকু প্রমাণিত আছে যে, মায়্যিতকে দাফনের পর মাইয়িতের মাথার দিকে সূরা বাকারার শুরু থেকে মুফলিহূন পর্যন্ত আর পায়ের দিকে সূরা বাকার শেষ আয়াত তথা আ-মানার রসূল থেকে শেষ পর্যন্ত তিলাওয়াত করবে। এটাই সুন্নত।
সূত্র: সহীহ মুসলিম ১/৩১২
📄 টাইলস বা নাম ফলকে মৃত ব্যক্তির নাম, পিতার নাম, মৃত্যু তারিখ, সন, ইত্যাদি লিখে কবরের পার্শ্বে স্থাপন করে রাখা
কবরস্থানে বা ব্যক্তিগত কবরে অনেক সময় দেখা যায়, বিভিন্ন কবরের পার্শ্বে টাইলস বা নাম ফলকে মৃত ব্যক্তির নাম, পিতা/মাতার নাম, মৃত্যু তারিখ, সন, কুরআনের আয়াত, দু'আ, কবিতা, প্রশংসা ইত্যিাদি লিখে কবরের পার্শ্বে স্থাপন করে রাখা হয়।
অথচ প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম একটি হাদীসে কবরের উপর কোন কিছু লিখে রাখতে নিষেধ করেছেন। সূত্র: তিরমিযী শরীফ হাদীস নং ১০৫২
এ কারণে অনেক ফকীহ কবরে উল্লেখিত বিষয় সমূহ লিখে রাখা শরীয়তের মানশা পরিপন্থী বলে তা করতে অনুৎসাহিত করেছেন। কারণ, এতে কবরের স্থান রিজার্ভ হয়ে যায় এবং এটা ব্যাপক ভাবে চলতে থাকলে এক সময় কবরের স্থান সংকট দেখা দিতে পারে।
তবে যেহেতু অপর একটি হাদীসে বর্ণিত আছে, প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম হযরত উসমান ইবনে মাজউন রা. এর কবর শনাক্ত করার জন্য তার কবরের পার্শ্বে একটি পাথর রেখে দিয়েছিলেন। সূত্র: সুনানে আবী দাউদ হা: নং ৩২০৬
তাই কবর পরিচয়ের স্বার্থে বিশেষ প্রয়োজনে সীমিত পর্যায়ে কবরের পার্শ্বে মৃত ব্যক্তির শুধু নাম ও সংক্ষিপ্ত পরিচয় লিখা জয়েয হবে। এছাড়া অন্য কিছু যেমন: কুরআনের আয়াত, দু'আ, কবিতা, প্রশংসা ইত্যাদি লিখে রাখা জায়েয হবেনা।
সূত্র: সুনানে তিরমিযী হাদীস নং ১০৫২, আল মুস্তাদরাক ১/৫২৫, মিরক্বাতুল মাফাতীহ ৪/১৬৬, শামী ২/২১৩৮, আল বাহরুর রায়েক ২/৩৪০, বাদায়ে ২/৬৫, আহসানুল ফাতাওয়া ৪/২৩১ কিফায়াতুল মুফতী ৪/৪৬ কিতাবুন নাওয়াযেল ৬/২৩৫, তুহফাতুল আলমাঈ ৩/৪৬৩-৪৬৪
📄 মাযার কেন্দ্রিক রসম রেওয়াজ ও অশ্লীলতা
মাযার অর্থ যিযারতের স্থান। আর যিয়ারতের স্থান বলতে কবর উদ্দেশ্য। কারণ, কবরকেই যিয়ারত করা হয়ে থাকে। সুতরাং আক্ষরিক অর্থে সমস্ত কবরই মাযার।
তবে সমাজে মাযার বলতে মানুষের ধারণায় কোন বুযুর্গের বাস্তব কবর কিংবা জনশ্রুতি বা কল্পনার উপর ভিত্তি করে কোন বুযুর্গ বা সাধকের নামে গড়ে উঠা তীর্থ কেন্দ্রকে মাযার বলা হয়ে থাকে।
আর এধরণের অধিকাংশ মাযার বর্তমানে শিরক-বিদ'আত ও অনৈতিক কর্মকান্ডের আঁখড়ায় পরিণত হয়েছে। যেমন: মাযার ওয়ালাকে সিজদা করা, তাকে উদ্দেশ্য করে রোনাযারী করা, তার নিকট ধন-দৌলত, সন্তান-সন্ততি, সুস্থতা, সচ্ছলতা, নির্বাচনে জয়লাভ সহ নানা উদ্দেশ্য প্রার্থনা করা, মাযারে মান্নত করা, পশু যবাই করা ইত্যাদি।
এগুলো সবই শিরক। কেউ এগুলোর কোন একটি করলে তার ঈমান চলে যাওয়ার আশংকা রয়েছে।
উপরন্তু, সেখানে নারী পুরুষের অবাধ মেলামেশা এবং মদ, গাঁজা সেবন সহ নানা অসামাজিক ও অনৈসলামিক কর্মকান্ড সংঘটিত হয়ে থাকে। সেই সাথে বিভিন্ন মেলা ও ওরশের নামে শরীয়ত বিরোধী অসংখ্য কাজকর্ম সেখানে হয়ে থাকে।
এছাড়া, সেখানে কবরের উপর গম্বুজ বানানো, কবরের উপর চাদর দেয়া, ফুল দেয়া, মোমবাতি, আগরবাতি জালানো, কবরকে তওয়াফ করা, চুমু খাওয়া, কবরের সামনে মাথা ঝুঁকানো, কবরের দিকে পিঠ দিয়ে বের হওয়াকে বেয়াদবী মনে করা, মাযারের নামে গরু ছাগল যবেহ করা, মাযারে শিরনি পাকিয়ে খাওয়া বা খাওয়ানো, মাযারে গান বাদ্য করা ইত্যাদি।
এগুলো সবই শরীয়তে হারাম ও নাজায়েজ। আর শরীয়তের হারামকে হালাল মনে করা এবং এগুলোকে আল্লাহর নৈকট্য লাভের মাধ্যম মনে করা আরো মারাত্মক গুনাহ এবং এর দ্বারা ঈমান চলে যাওয়ার আশংকা রয়েছে।
তাই এধরণের মাযারে যাওয়া এবং উল্লেখিত কর্মকান্ড সহ শরীয়ত বিরোধী সকল কর্মকান্ড থেকে অবশ্যই বিরত থেকে নিজের ঈমানকে হিফাজত করা জরুরী।
তবে শরীয়ত সম্মত পন্থায় কবর, মাযার যিয়ারত করা জায়েয আছে।
সূত্র: ফাতাওয়া মাহমুদিয়া ৫/৫৩৭, কিতাবুননাওয়াযেল ১/৬৬৮, ৬৬৯ আপকে মাসায়েল আওর উনকা হলো ৪/৪০২