📘 সমকালীন কুসংস্কার ও সামাজিক প্রথা > 📄 তা’বীয ব্যবহার করা

📄 তা’বীয ব্যবহার করা


একমাত্র আল্লাহ তা'আলাই সব কিছু করতে পারেন। তিনিই রোগ দান করেন এবং তিনিই রোগ থেকে মুক্তি দান করেন। অন্তরে এ বিশ্বাস রেখে শুধুমাত্র অসীলা স্বরূপ শরীয়ত সম্মত পন্থায় তা'বীয ব্যবহার করার অনুমতি আছে। এতে কোন রকম শিরক হবে না।
তা'বীয, ঝাড়-ফুঁক ব্যবহারের বিষয়টি এ যুগেই নতুন নয়; বরং আমাদের প্রিয়নবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর যুগেও ছিল। তিনি সাহাবাগণকে ঝাড়-ফুঁক করেছেন। এছাড়া, সাহাবাগণ থেকেও তা'বীয ব্যবহারের বিষয়টি প্রমাণিত আছে।
তবে কেউ যদি তা'বীয সম্পর্কে এই ধারণা পোষণ করে যে, তা'বীযের মধ্যে রোগ দূর করার ক্ষমতা আছে বা তা'বীয বিপদ-আপদ থেকে রক্ষা করতে পারে এবং তা'বীয ব্যবহার না করলে বা খুলে রাখলে বিপদ হতে পারে, তাহলে এ ধরণের বিশ্বাস নিয়ে তা'বীয ব্যবহার করা নিঃসন্দেহে শিরক হবে। ইলম বিহীন (অজ্ঞ) লোকেরা সাধারণত: এ ধরণের ভ্রান্ত বিশ্বাস নিয়ে তা'বীয ব্যবহার করে থাকে। এটাকে কঠোরভাবে নিষেধ করা কর্তব্য। আজকাল কিছু নামধারী মোল্লা, মুনশী বা ফকীর, দরবেশ আছে যারা মুসলমানদের ঈমান আকীদা দুর্বলতার সুযোগে তাবীজ কবজের কেরামতীর নামে তাদের ঈমান-আক্বীদা যতটুকু অবশিষ্ট ছিল তাও নিজেদের দুনিয়াবী স্বার্থে বরবাদ করে ছাড়ছে। এ জন্য সাধারণ মুসলমানদের কর্তব্য হলো, সর্বদা হক্কানী আলেমগণের সাথে জুড়ে থাকা। এছাড়া তাদের ঈমান-আকীদা রক্ষার দ্বিতীয় কোন পথ নেই।

সূত্র: মিশকাত শরীফ ২/৩৮৮

📘 সমকালীন কুসংস্কার ও সামাজিক প্রথা > 📄 তাবীজের কিতাবে লিখিত সূত্রের মাধ্যমে অথবা জিন হাজির করে তার মাধ্যমে রোগ নির্ণয় করা

📄 তাবীজের কিতাবে লিখিত সূত্রের মাধ্যমে অথবা জিন হাজির করে তার মাধ্যমে রোগ নির্ণয় করা


আমাদের দেশে প্রচলিত তাবীজ কবজের কিতাবসমূহে বিভিন্ন সূত্র লেখা থাকে, যেগুলোর সাহায্যে যোগ বিয়োগ করে কবিরাজগণ রোগীর ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকেন যে, এ রোগীকে জাদু করা হয়েছে। ঐ রোগীর উপর জীন সওয়ার হয়েছে বা জীনের নজর পড়েছে ইত্যাদি।
অনুরূপভাবে, অনেক কবিরাজ জ্বীন হাজির করে তার মাধ্যমে রোগীর ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেন যে, কেউ তাকে তাবিজ করেছে বা কুফরী কালামের মাধ্যমে ক্ষতি করেছে ইত্যাদি।
প্রশ্নহলো, এসব পদ্ধতি অবলম্বন করে রোগীর সমস্যা নির্ণয় করার শরঈ হুকুম কী?
উত্তর হলো, এভাবেও রোগীর সমস্যা নির্ণয় করা সম্ভব। এটা এমনই যেমন: ডাক্তারগণ রোগীর শীরা ধরে, জিহবা দেখে বিভিন্ন রোগ নির্ণয় করে থাকেন। শরীয়তে এ ব্যাপারে কোন নিষেধাজ্ঞা নেই। তবে, এ ব্যাপারে নিম্নে বর্ণিত শর্তাবলী কঠোর ভাবে অনুসরণ করতে হবে।
(১) উল্লেখিত উভয় পদ্ধতিতে কুফর বা শিরকের আশ্রয় গ্রহণ করা যাবেনা।
(২) এ বিষয়টিকে ধারণা পর্যন্তই সীমিত রাখতে হবে। অর্থাৎ এগুলোর কার্যকারিতা ও ফলাফলের ব্যাপারে নিশ্চিত বিশ্বাস রাখতে পারবেনা।
(৩) এগুলোকে প্রকৃতক্রিয়াশীল মনে করা যাবেনা। কাজেই, এগুলোর উপর ভিত্তি করে কাউকে দোষারোপ করা যাবেনা। কারণ, এগুলো শরঈ কোন প্রমাণ নয়।
(৪) এগুলোর মধ্যমে কারো জান মাল ও ইজ্জতের উপর আঘাত করা যাবেনা।
(৫) এগুলোর মধ্যে ধোঁকা প্রতারণা থাকতে পারবেনা। যেমন: কবিরাজ নিজেই উল্লেখিত পদ্ধতিগুলোর ব্যবহার জানেনা; বরং ছল চাতুরীর আশ্রয় নিয়ে এর মাধ্যমে মানুষকে প্রতারিত করে।

সূত্র : রদ্দুল মুহতার ১/৪৪, ফাতহুল মুলহিম ২/৭৭, ফাতাওয়া মাহমুদিয়া ২৮/২৯৪, জাওয়াহিরুল ফিকাহ ৮/৫০

📘 সমকালীন কুসংস্কার ও সামাজিক প্রথা > 📄 কোন ক্ষতির সম্মুখীন হলে “কার মুখ দেখে বের হয়েছিলাম” একথা বলা

📄 কোন ক্ষতির সম্মুখীন হলে “কার মুখ দেখে বের হয়েছিলাম” একথা বলা


কোন কোন মানুষকে বিপদ আপদের সম্মুখীন হলে একথা বলতে শুনা যায় যে, কার মুখ দেখে যে বের হয়েছিলাম !
বস্তুত এটি একটি গর্হিত কথা। শরীয়তে এর কোন ভিত্তি নেই। সুতরাং একটি গর্হিত কথার উপর নির্ভর করে প্রথম দেখা মানুষটির ব্যাপারে খারাপ ধারণা পোষণ করা মারাত্মক অন্যায়। কারণ; আল্লাহ তা'আলা বিভিন্ন হিকমতে বান্দাকে কোন বালা মসীবতে আপতিত করে থাকেন। এর সাথে প্রথম দেখা মানুষটির কোন সম্পর্ক নেই।

সূত্র: সূরা হুজুরাত আয়াত: ১২, বুখারী শরীফ, হাদীস নং ৫৭০৭

📘 সমকালীন কুসংস্কার ও সামাজিক প্রথা > 📄 প্রচলিত গণতন্ত্র একটি কুফরী মতবাদ

📄 প্রচলিত গণতন্ত্র একটি কুফরী মতবাদ


গনতন্ত্রের দু'টি দিক রয়েছে (এক) গণতান্ত্রিক চিন্তা ধারা (দুই) গণতান্ত্রিক কর্মসূচী।
গণতান্ত্রিক চিন্তাধারা গণতান্ত্রিক চিন্তাধারায় জনগণকে সর্বময় ক্ষমতার মূল উৎস মনে করা হয়। সংখ্যাধিক্যের ভিত্তিতে জনতার যে কোন সিদ্ধান্ত এ তন্ত্র মতে চূড়ান্ত ও অপরিহার্য। এক কথায়, সংখ্যাগরিষ্ঠের মতকে (নাঊযুবিল্লাহ) খোদায়ী ফয়সালার উপর স্থান দেয়া হয়, যার কোন সিদ্ধান্তই অগ্রাহ্য করা যাবে না।
শরীয়তের দৃষ্টিতে এসব চিন্তাধারা সবই হলো কুফরী চিন্তাধারা। যে ব্যক্তি বুঝে শুনে এসবের প্রতি আস্থাশীল হবে তার ঈমান চলে যাওয়ার প্রবল আশঙ্কা রয়েছে। অবশ্য, কেউ যদি গণতন্ত্রের এসব মূল মন্ত্র না জেনে অপরের দেখাদেখি গণতন্ত্রকে সমর্থন করে তাহলে সে কাফের না হলেও কুফরী তন্ত্রের সমর্থনকারী হিসাবে সে মারত্মক গুনাহগার হবে।
পাশ্চাত্য গণতন্ত্রের মূল মন্ত্রগুলো কুফরী হওয়ার প্রমাণ হলো, এগুলো কুরআন-হাদীসের স্পষ্ট বর্ণনার সাথে সরাসরি সাংঘর্ষিক। নিম্নে এধরণের কয়েকটি আয়াত উল্লেখ করা হলো:
আল্লাহ পাক কুরআন মাজীদে ইরশাদ করেন, “নিশ্চয়ই সকল ক্ষমতা একমাত্র আল্লাহ তাআলারই।"সূত্র: সূরা বাকারা আয়াত - ১৬৫
অন্যত্র ইরশাদ ফরমান, আল্লাহ তা'আলাই বিধানদাতা। সূত্র: সূরা ইউসূফ আয়াত- ৪০
অপর আয়াতে ইরশাদ করেন, নিঃসন্দেহে আল্লাহ তা'আলার নিকট ধর্ম একমাত্র ইসলাম। সূত্র: সূরা আলে-ইমরান আয়াত-৮৩
আরো ইরশাদ হচ্ছে, “যে ব্যক্তি ইসলাম ছাড়া অন্য ধর্ম তালাশ করে (গ্রহণ করে) কস্মিনকালেও তা মেনে নেয়া হবে না এবং আখিরাতে সে হবে ক্ষতিগ্রস্ত।” সূত্র: আলে-ইমরান আয়াত - ৮৫
অন্য আয়াতে ঘোষিত হচ্ছে, "আল্লাহ ও তদীয় রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কোন বিষয় নির্ধারণ করলে, কোন ঈমানদার নর-নারীর সে বিষয়ে ভিন্ন মত পোষণ করার অধিকার নেই। আর যে আল্লাহ ও তার রাসূলের আদেশ অমান্য করে সে প্রকাশ্য পথভ্রষ্টতায় পতিত হয়। সূত্র: সূরা আহযাব আয়াত ৩৬
গণতান্ত্রিক কর্মসূচী
(ক) গণতান্ত্রিক রাজনীতির কর্মসূচীর মধ্যে অন্যতম হলো, সংখ্যাগরিষ্ঠের ভিত্তিতে ভোটের মাধ্যমে দেশের উচ্চ পর্যায়ের দায়িত্বশীল নির্ধারণ করা।
শরীয়তের দৃষ্টিতে গণভোটের এ পদ্ধতি সম্পূর্ণ অসার ও অযৌক্তিক। সুতরাং তা নাজায়েয। কুরআন পাকের বহু আয়াতে এ পদ্ধতির অসারতা প্রমাণ করত: বিরোধিতা করা হয়েছে। তন্মধ্য হতে নিম্নে কয়েকটি উল্লেখ করা হলো:
(১) আল্লাহ পাক ইরশাদ করেন, “আপনি যদি পৃথিবীর অধিকাংশের কথা মেনে নেন, তাহলে তারা আপনাকে আল্লাহর রাস্তা থেকে বিভ্রান্ত করে ফেলবে।” সূত্র: সূরা আলে-ইমরান আয়াত- ১১৬
(২) অন্য আয়াতে বর্ণিত হয়েছে, "তাদের অধিকাংশই শুধু অনুমানের উপর চলে। অথচ অনুমান সত্যের মোকাবেলায় কোন কাজেই আসে না।” সূত্র: সূরা ইউনুস আয়াত-৩৬
(৩) অপর আয়াতে আল্লাহ তা'আলা বলেন, "আপনি বলে দিন, অপবিত্র ও পবিত্র এক সমান নয়। যদিও অপবিত্রের আধিক্য তোমাকে বিস্মিত করে।” “সূত্র: সূরা আলে-ইমরান আয়াত- ১০০
উক্ত আয়াতসমূহের দ্বারা সুস্পষ্টভাবে প্রমাণিত হয় যে, জনগণের অধিকাংশ হবে মূর্খ, বোকা ও দায়িত্বহীন। আর প্রচলিত গণতন্ত্রে এদের অধিকাংশের রায়ের উপর সিদ্ধান্ত গ্রহণ করা হয়। সুতরাং তা নিশ্চিতভাবে ভুলই হবে। তাই, কোনরূপ বাছ-বিচার ছাড়া সংখ্যাধিক্যকে মাপকাঠি বানালে তা সুনিশ্চিতভাবে ভ্রষ্ট হবে। বর্তমানে গণতন্ত্রের নামে তাই হচ্ছে।
তবে যেহেতু প্রতিনিধি নির্বাচনের উক্ত নাজায়েয পদ্ধতি এদেশ থেকে ইংরেজ বিতাড়নের সময় ইসলামের দুশমনদের পক্ষ থেকে কৌশলে আমাদের উপর চাপিয়ে দেওয়া হয়েছে। মুসলিম রাজনৈতিক নেতাদের প্রচেষ্টা ছাড়া ব্যক্তি বিশেষের জন্য এ অবস্থা থেকে পরিত্রাণ পাওয়া মুশকিল ব্যাপার। সে জন্য গণতন্ত্র প্রতিষ্ঠার আন্দোলনে শরীক না হয়ে শুধু ভোটের সময় সকল প্রার্থীদের মাঝে তুলনামূলক ইসলাম, দেশ ও জাতির জন্য মঙ্গলজনক বা এমন লোকের অবর্তমানে কমপক্ষে অন্যের তুলনায় কম ক্ষতিকর প্রার্থীকে ভোট প্রদান করা জায়েয আছে। এক্ষেত্রে বিবেচ্য বিষয় হলো, সকল সৎ মানুষ ভোট প্রদান করা থেকে বিরত থাকলে অসৎ লোকেরা অসৎ প্রার্থীকেই নির্বাচিত করে নিবে। তখন সকলেরই অসৎ লোকের ফেতনায় পড়তে হবে। ফলে, ইসলামের আরো বেশী ক্ষতি সাধিত হয়ে যাবে।
তাছাড়া, এ পদ্ধতি ভুল হলেও ভোট প্রদান মূলত: সাক্ষ্য প্রদান করা, আর ন্যায়ের ব্যাপারে সাক্ষ্য প্রদান করা জরুরী, তাই, উযর ছাড়া যোগ্য প্রার্থীকে ভোট দান হতে বিরত থাকলে গুনাহ হবে।
যারা গণতান্ত্রিক ভোেট পদ্ধতিকে ইসলাম সম্মত নয় জেনেও প্রয়োজনের খাতিরে তুলনামূলক কোন সৎ প্রার্থীকে ভোট দেবে তাদেরকে কাফের বা ফাসেক কিছুই বলা যাবে না; বরং নিজেদেরও এসব ক্ষেত্রে ভোট দান থেকে বিরত না হওয়া জরুরী।
(খ) গণতান্ত্রিক অন্যান্য কর্মসূচীর মধ্যে রয়েছে মিছিল, মিটিং, সভা-সেমিনার, প্রচার-বিজ্ঞাপন, বিবৃতি, হরতাল, বয়কট, অনশন, ধর্মঘট, অবরোধ ইত্যাদি। এ সবের মধ্য হতে প্রচলিত হরতাল ও মিথ্যা বিবৃতি ও আমরণ অনশন শরীয়তের দৃষ্টিতে জায়েয নেই। এছাড়া, অন্য সব কর্মসূচী মূলত: বৈধ। তবে যদি নিছক দলীয় ও নেতৃত্বের লোভে এগুলো পালন করা হয় তাহলে তা জায়েয হবে না।
তেমনিভাবে, জনসাধারণকে অহেতুক কষ্ট দিয়ে কোন কর্মসূচী পালন করা হলে তাও জায়েয হবে না; বরং তাতে গুনাহ হবে। অবশ্য, শুধু এসব নাজায়েয কর্মসূচী পালন করলে তারা কাফেরও হবে না।
আর যদি বৈধ কর্মসূচী গুলো জাতীয় ও দ্বীনী স্বার্থে পালন করা হয় এবং জনসাধারণকে অহেতুক কষ্ট না দেওয়া হয় কিংবা তাদের আর্থিক কোন ক্ষয়-ক্ষতি না করা হয়; বরং স্বতঃস্ফূর্তভাবে মহৎ উদ্দেশ্য নিয়ে কেউ এগুলোতে শরীক হয় তাহলে সে ছাওয়াবের ভাগী হবে। এক্ষেত্রে প্রত্যেকের নিজ নিজ সাধ্য অনুযায়ী সহায়তা ও সমর্থন করা কর্তব্য।
উল্লেখ্য, গণতন্ত্র সহ ঈমান বিধ্বংসী অন্যান্য বাতিল মত ও বিশ্বাস সম্পর্কে জানার জন্য মুফতী মাওঃ মনসুরুল হক সাহেব দা.বা. প্রণীত কিতাবুল ঈমান পড়ুন। ইনশাআল্লাহ ঈমান-আমল হিফাজতে বড় সহায়ক হবে。

সূত্র: আহসানুল ফাতাওয়া ৬/২৪, জাওয়াহিরুল ফিকহ ১/৩৬, ফিকহী মাকালাত ২/২৮৬

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00