📄 গণক বা জ্যোতিষীর ভবিষত বাণী করা এবং তা বিশ্বাস করা
আমাদের দেশে অনেক গণক ও জ্যোতিষী দেখা যায়, যারা মানুষকে নানা বিষয়ে ভবিষ্যত বাণী করে থাকে। আর কতিপয় মানুষ আছে যারা তাদের কথা অন্ধের মত বিশ্বাস করে।
অথচ আল্লাহ তা'আলা পবিত্র কুরআনে ইরশাদ ফরমান, তিনি (আল্লাহ তা'আলা) অদৃশ্যের পরিজ্ঞাতা, তিনি তার অদৃশ্যের জ্ঞান কারো নিকট প্রকাশ করেননা তার মনোনীত রাসূল ছাড়া। সূত্রঃ সূরা জিন, আয়াত ২৬, ২৭
এছাড়া, প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ ফরমান, যে ব্যক্তি কোন জ্যোতিষী অথবা গণকের কাছে গেল এবং সে যা বলবে তা বিশ্বাস করল সে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর প্রতি যা নাযিল হয়েছে তার সাথে কুফরী করলো।
সূত্র: সুনানে আবূ দাউদ হা: ৩৯০৪, তিরমিযী হা: ১৩৫
উপরোক্ত আয়াত ও হাদীস দ্বারা প্রতীয়মান হয় যে, গণকদের ভবিষ্যতবাণী করা এবং অন্যদের তা বিশ্বাস করা কুফরী।
📄 রাশি গণনা করা
আমাদের দেশে কিছু লোক আছে, যারা মানুষের হাত দেখে বা অন্যান্য আলামত দেখে বিভিন্ন রাশি গণনা করে থাকে। যেমন : কাউকে বলে সিংহ রাশি, কাউকে বলে তুলা রাশি। এভাবে বিভিন্ন রাশির কথা বলে থাকে। মানুষও তার কথা সত্য মনে করে নিজের ব্যাপারে সেরূপই বিশ্বাস করে থাকে।
আসলে রাশি বলা হয়, সৌর জগতের কতগুলো গ্রহ-নক্ষত্রের কাল্পনিক প্রতীককে। এক্ষেত্রে সাধারণত:কয়েকটি রাশির কল্পনা করা হয়ে থাকে। যথা : মেশ, বৃষ, মিথুন, কর্কট, সিংহ, কন্যা, তুলা, বৃশ্চিক, মকর, কুম্ভ, ও মীন। জ্যোতিষ শাস্ত্রের ধারণা অনুযায়ী এ সব গ্রহ-নক্ষত্রের গতি, স্থিতি ও সঞ্চারের প্রভাবে ভবিষ্যত শুভ অশুভ নির্ণয় তথা ভাগ্য বিচার করা হয় এবং সেভাবেই তা সংঘঠিত হয়ে থাকে।
অথচ ইসলামী আকীদা অনুসারে গ্রহ নক্ষত্রের নিজস্ব কোন প্রভাব নেই। সকল ক্ষমতা একমাত্র আল্লাহ তা'আলার। অবশ্য, এগুলোর মধ্যে আল্লাহ কর্তৃক প্রদত্ত কোন প্রভাব থাকলে থাকতেও পারে। তবে, তা নিশ্চিত করে বলা যাবেনা। সুতরাং ভাল-মন্দ ভাগ্য গ্রহ-নক্ষত্রের প্রভাবে ঘটে এই আকীদা পোষণ করা শিরকী। অতএব, রাশি গণনা করা শরীয়তের দৃষ্টিতে জায়েয হবেনা।
সূত্র: সূরা আন'আম আয়াত ৫৭, মুসনাদে আহমাদ ৯/২৪০ রদ্দুল মুহতার ১/৪৫ ইমদাদুল আহকাম ১/১১৮
📄 তা’বীয ব্যবহার করা
একমাত্র আল্লাহ তা'আলাই সব কিছু করতে পারেন। তিনিই রোগ দান করেন এবং তিনিই রোগ থেকে মুক্তি দান করেন। অন্তরে এ বিশ্বাস রেখে শুধুমাত্র অসীলা স্বরূপ শরীয়ত সম্মত পন্থায় তা'বীয ব্যবহার করার অনুমতি আছে। এতে কোন রকম শিরক হবে না।
তা'বীয, ঝাড়-ফুঁক ব্যবহারের বিষয়টি এ যুগেই নতুন নয়; বরং আমাদের প্রিয়নবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর যুগেও ছিল। তিনি সাহাবাগণকে ঝাড়-ফুঁক করেছেন। এছাড়া, সাহাবাগণ থেকেও তা'বীয ব্যবহারের বিষয়টি প্রমাণিত আছে।
তবে কেউ যদি তা'বীয সম্পর্কে এই ধারণা পোষণ করে যে, তা'বীযের মধ্যে রোগ দূর করার ক্ষমতা আছে বা তা'বীয বিপদ-আপদ থেকে রক্ষা করতে পারে এবং তা'বীয ব্যবহার না করলে বা খুলে রাখলে বিপদ হতে পারে, তাহলে এ ধরণের বিশ্বাস নিয়ে তা'বীয ব্যবহার করা নিঃসন্দেহে শিরক হবে। ইলম বিহীন (অজ্ঞ) লোকেরা সাধারণত: এ ধরণের ভ্রান্ত বিশ্বাস নিয়ে তা'বীয ব্যবহার করে থাকে। এটাকে কঠোরভাবে নিষেধ করা কর্তব্য। আজকাল কিছু নামধারী মোল্লা, মুনশী বা ফকীর, দরবেশ আছে যারা মুসলমানদের ঈমান আকীদা দুর্বলতার সুযোগে তাবীজ কবজের কেরামতীর নামে তাদের ঈমান-আক্বীদা যতটুকু অবশিষ্ট ছিল তাও নিজেদের দুনিয়াবী স্বার্থে বরবাদ করে ছাড়ছে। এ জন্য সাধারণ মুসলমানদের কর্তব্য হলো, সর্বদা হক্কানী আলেমগণের সাথে জুড়ে থাকা। এছাড়া তাদের ঈমান-আকীদা রক্ষার দ্বিতীয় কোন পথ নেই।
সূত্র: মিশকাত শরীফ ২/৩৮৮
📄 তাবীজের কিতাবে লিখিত সূত্রের মাধ্যমে অথবা জিন হাজির করে তার মাধ্যমে রোগ নির্ণয় করা
আমাদের দেশে প্রচলিত তাবীজ কবজের কিতাবসমূহে বিভিন্ন সূত্র লেখা থাকে, যেগুলোর সাহায্যে যোগ বিয়োগ করে কবিরাজগণ রোগীর ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নিয়ে থাকেন যে, এ রোগীকে জাদু করা হয়েছে। ঐ রোগীর উপর জীন সওয়ার হয়েছে বা জীনের নজর পড়েছে ইত্যাদি।
অনুরূপভাবে, অনেক কবিরাজ জ্বীন হাজির করে তার মাধ্যমে রোগীর ব্যাপারে সিদ্ধান্ত নেন যে, কেউ তাকে তাবিজ করেছে বা কুফরী কালামের মাধ্যমে ক্ষতি করেছে ইত্যাদি।
প্রশ্নহলো, এসব পদ্ধতি অবলম্বন করে রোগীর সমস্যা নির্ণয় করার শরঈ হুকুম কী?
উত্তর হলো, এভাবেও রোগীর সমস্যা নির্ণয় করা সম্ভব। এটা এমনই যেমন: ডাক্তারগণ রোগীর শীরা ধরে, জিহবা দেখে বিভিন্ন রোগ নির্ণয় করে থাকেন। শরীয়তে এ ব্যাপারে কোন নিষেধাজ্ঞা নেই। তবে, এ ব্যাপারে নিম্নে বর্ণিত শর্তাবলী কঠোর ভাবে অনুসরণ করতে হবে।
(১) উল্লেখিত উভয় পদ্ধতিতে কুফর বা শিরকের আশ্রয় গ্রহণ করা যাবেনা।
(২) এ বিষয়টিকে ধারণা পর্যন্তই সীমিত রাখতে হবে। অর্থাৎ এগুলোর কার্যকারিতা ও ফলাফলের ব্যাপারে নিশ্চিত বিশ্বাস রাখতে পারবেনা।
(৩) এগুলোকে প্রকৃতক্রিয়াশীল মনে করা যাবেনা। কাজেই, এগুলোর উপর ভিত্তি করে কাউকে দোষারোপ করা যাবেনা। কারণ, এগুলো শরঈ কোন প্রমাণ নয়।
(৪) এগুলোর মধ্যমে কারো জান মাল ও ইজ্জতের উপর আঘাত করা যাবেনা।
(৫) এগুলোর মধ্যে ধোঁকা প্রতারণা থাকতে পারবেনা। যেমন: কবিরাজ নিজেই উল্লেখিত পদ্ধতিগুলোর ব্যবহার জানেনা; বরং ছল চাতুরীর আশ্রয় নিয়ে এর মাধ্যমে মানুষকে প্রতারিত করে।
সূত্র : রদ্দুল মুহতার ১/৪৪, ফাতহুল মুলহিম ২/৭৭, ফাতাওয়া মাহমুদিয়া ২৮/২৯৪, জাওয়াহিরুল ফিকাহ ৮/৫০