📄 মাযহাব অনুসরণ করা ছাড়া সরাসরি কুরআন হাদীসের উপর আমল করা
বর্তমানে দ্বীনের নামে ব্যপকভাবে প্রচারণা চালানো হচ্ছে যে, দ্বীনের উপর চলার জন্য কোন মাজহাবের অনুসরণের প্রয়োজন নেই; বরং সরাসরি কুরআন হাদীস থেকে আমল করাই যথেষ্ট।
বস্তুত: এসব বক্তব্য সম্পূর্ণ ভ্রান্ত ও যুগ যুগ ধরে মাযহাব অনুসরণে দ্বীন পালনকারী মুসলমানদেরকে বিভ্রান্ত করার একটা অপচেষ্টা মাত্র। এগুলোর পিছনে ইয়াহুদী নাসারাদের কোন ষড়যন্ত্র আছে কিনা? তা খতিয়ে দেখা প্রয়োজন।
আসলে সাধারণ মুসলমান কেন? বিজ্ঞ আলেমের পক্ষেও সরাসরি কুরআন হাদীস বুঝে আমল করা দুঃসাধ্য। এ কারণেই সর্ব যুগেই বড় বড় মুহাক্কিক আলেমগণও ইমামগণের অনুসরণ করে গেছেন। আর যারা কোন ইমামের তাকলীদ ব্যতীত নিজে নিজে হাদীস বুঝে আমল করতে গিয়েছেন তারা পদে পদে নানা বিপদের সম্মুখীন হয়েছেন এবং শেষ পর্যন্ত আল্লাহর গোলামীর পরিবর্তে নিজের নফসের গোলামী করে শরীয়ত বিবর্জিত পথে পরিচালিত হয়েছেন।
শরীয়তের নির্দেশ হলো, মানুষ নিজে যা বুঝতে পারে না বা নিজের জানা নেই তা যারা বিজ্ঞ তাদের থেকে বুঝে বা জেনে নেয়া। যেমন: কুরআনে কারীমের সূরা নাহলে আল্লাহ পাক ইরশাদ করেন, তোমরা যদি না জান, তাহলে পারদর্শী ও আলেমগণ থেকে তা জেনে নাও। সূরা নাহল, আয়াত-৪৩
উল্লেখ্য, শরীয়তের দলীল শুধুমাত্র হাদীস নয়, বরং মাশাইখগণের ঐক্যমতে শরীয়তের দলীল মোট ৪টি যথা: কুরআন, সুন্নাহ, ইজমা ও কিয়াস।
পবিত্র কুরআন ও সুন্নাহর মাঝে সমন্বয় সাধন করে সঠিক আমলের পথ নির্ণয় করা হচ্ছে কিয়াস। আর এ কাজ কোন সহজ কাজ নয়। আর এ কাজের যোগ্যতা অনুপাতে ফকীহগণের মধ্যেও শ্রেণী বিন্যাস রয়েছে। মহান আল্লাহর পক্ষ থেকে যারা কুরআন হাদীস গবেষণা করে শরঈ মাসায়েলকে উদ্ভাবনের মত যোগ্যতা অর্জন করেছেন এবং সাহাবায়ে কিরামের স্বর্ণ যুগের নিকটবর্তী হওয়ায় শরীয়ত সম্পর্কে সম্যক জ্ঞান লাভে সক্ষম হয়েছেন তারা যেভাবে কুরআন সুন্নাহ বুঝেছেন, উল্লেখিত আয়াতের ভিত্তিতে তাদের বুঝকে গ্রহণ করা উম্মতের জন্য নিরাপদ ও আশংকা মুক্ত।
তাই সবাই যে যার মতে ক্ষুদ্র জ্ঞানে কুরআন সুন্নাহর উল্টো ব্যাখ্যা করে শরীয়তকে যাতে খেলনা ও তামাশার বস্তুতে পরিণত না করতে পারে সেজন্য স্বর্বস্বীকৃত চার মাজহাবের কোন একটির অনুসরণ করা ওয়াজিব বলে উলামায়ে উম্মতের ইজমা (ঐকমত্য) প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। এ ইজমাকে প্রত্যখ্যান করে উল্টো পথে ধাবিত হওয়া কারো জন্য সমীচীন নয়। আর আল্লাহ তা'আলা ইজমায়ে উম্মতকে মান্য করা জরুরী বলে ঘোষণা করেছেন। সূত্র: সূরা নিসা, আয়াত-১১৫,
মাজহাবের গুরুত্ব অপরিসীম বলে হানাফী বিজ্ঞ ফকীহগণ মাজহাব মানাকে ওয়াজিব বলে সিদ্ধান্ত দিয়েছেন।
সূত্র: ইমদাদুল মুফতিঈন ১/৯৫১, জাওয়াহিরুল ফিকহ ১/১২৭, কিফায়াতুল মুফতী ১/৩২৫
একটু লক্ষ্য করলেই বুঝতে পারব যে, আমরা আমাদের দুনিয়াবী সকল গুরত্বপূর্ণ বিষয়াবলীতে নিজ নিজ ক্ষেত্রে অভিজ্ঞ ব্যক্তি থেকে পরামর্শ গ্রহণ করে থাকি। কাজেই, দুনিয়াবী বিষয়ে বিজ্ঞ লোকের তাকলীদ করাকে আমরা যেমন জরুরী ও যুক্তি সংগত মনে করি, তেমনি পরকালের ব্যাপারে শরীয়তের ব্যাপারে পারদর্শী ব্যক্তির তাকলীদ করা অতি জরুরী ও অত্যাবশ্যক হওয়াই যুক্তিযুক্ত।
মজার ব্যাপার হলো, যারা তাকলীদ প্রত্যখ্যান করে সরাসির কুরআন হাদীস থেকে আমল করার প্রবক্তা তারাও কিন্তু কুরআন হাদীসের ব্যাখ্যা নিশ্চয়ই কোন না কোন আলেম থেকে শিখে বা শুনে আমল করে থাকেন। আর সাধারণ কোন আলেমের ব্যাখ্যার চেয়ে কোন মুহাক্কিক, স্বীকৃত সাহেবে মাজহাব ইমামের গবেষণালব্ধ ব্যাখ্যা গ্রহণ করাই অধিক গ্রহণযোগ্য হবে, এটাই স্বাভাবিক।
এখানে আরেকটি বিষয় লক্ষণীয়। তাহলো, শরীয়তের আহকামগুলোকে চার ভাগে ভাগ করা যায়। এর মধ্য হতে শুধুমাত্র প্রথম প্রকার আহকামের ক্ষেত্রে কোন ইমামের তাকলীদ করার প্রয়োজন নাই। এছাড়া, অবশিষ্ট তিন প্রকার আহকামের ক্ষেত্রে কোন ইমামের তাকলীদ বা অনুসরণ করা অপরিহার্য। এছাড়া আর কোন বিকল্প নেই। নিম্নে আমরা উল্লেখিত ৪ প্রকার হুকুমসহ উল্লেখ করছি।
১। আহকামে মানসূসাহ সরীহাহ (অর্থাৎ শরীয়তের এমন সুস্পষ্ট আহকাম যেগুলোর কোন ব্যাখ্যার প্রয়োজন নেই এবং শরীয়তের অন্য কোন নসের সাথে সাংঘর্ষিক ও নয়। যেমন: নামায পড়া, রোজা রাখা, হজ্ব করা, যাকাত দেয়া, জেহাদ করা ইত্যাদি।
বস্তুত: এ প্রকার আহকামের উপর আমল করার জন্য কোন ইমামের অনুসরণের প্রয়োজন নেই; বরং সরাসরি কুরআন হাদীস থেকে আমল করা সম্ভব।
২। আহকামে মানসূসাহ মুতা'আরিজাহ (অর্থাৎ শরীয়তের এমন সুস্পষ্ট আহকাম যেগুলো পরস্পর সাংঘর্ষিক। যেমন: নামাযে রফয়ে এদাইন করা (রুকুতে যাওয়া এবং রুকু থেকে উঠার সময় উভয় হাত উঠানো) এটা করার ব্যাপারেও হাদীস বর্ণিত আছে। আবার না করার ব্যাপারেও হাদীস বর্ণিত আছে। এ ধরণের ক্ষেত্রে একজন মুসলমান কী করবে? এক সঙ্গে দুটির উপর আমল করা সম্ভব নয় এবং এতেও কোন সন্দেহ নেই যে, উভয় প্রকার হাদীস একই সময়ে বর্ণিত হয়নি; বরং এর মধ্যে একটি আমল পূর্বের ও অপরটি পরের হবে। কারণ, মানুষের ক্রমানুগতিতে ইসলাম গ্রহণ ও আমলী দৃঢ়তা অর্জনের প্রেক্ষিতে হুকুম আহকাম পর্যায়ক্রমে ধীরে ধীরে নাযিল হয়ে চূড়ান্ত পর্যায়ে পৌঁছেছে। যেমন: ইসলামের প্রথম যুগে নামায পাঁচ ওয়াক্ত ছিলনা। আবার যা ছিল তাও দু রাকাত করে ছিল। উপরন্ত তখন নামাযের ভিতর কথা বলা যায়েয ছিল। এমনি ভাবে, অন্য অনেক হুকুম আহকাম পর্যায়ক্রমে রদ বদল হয়েছে। প্রশ্নহলো, দুটির কোনটি আগের এবং কোনটি পরের বা কোনটি শক্তিশালী আর কোনটি দুর্বল এবং সর্ব বিবেচনায় কোনটি আমলের অধিক উপযুক্ত? এ সিদ্ধান্ত কে দিবে? নিঃসন্দেহে এ সিদ্ধান্ত শরীয়ত সম্পর্কে পারদর্শী বিজ্ঞ ইমামগণই সর্বাধিক সঠিক দিতে পারবেন। পক্ষান্তরে, পরবর্তী যামানায় এগুলোর সঠিক সমাধান দেওয়া অত্যন্ত কঠিন ও দুঃসাধ্য ব্যাপার, যা বলাই বাহুল্য।
সুতরাং এমন পরিস্থিতিতে ইমাম আযম আবূ হানীফার রহ. এর ইলম ও গুণের উপর যার আস্থা রয়েছে সে আবূ হানীফা রহ. বর্ণিত মতের উপর আমল করত: অপরটি ছেড়ে দিবে। কিংবা উপরোক্ত হাদীসদ্বয়ের পারস্পারিক বৈপরিত্ব নিরসনে ইমাম আবু হানীফার রহ. ব্যাখ্যার উপর আমল করবে।
পক্ষান্তরে, ইমাম শাফেঈর রহ. উপর যার আস্থা রয়েছে সে শাফেঈ রহ. কর্তৃক বর্ণিত মতের উপর আমল করবে। এভাবে অন্যান্য ইমামগণের ব্যাপারেও একই কথা প্রযোজ্য। কারণ, চার মাজহাবের মুজতাহিদ ইমামগণ উলামায়ে উম্মতে মুহাম্মদীর নজরে সর্ব সম্মতিক্রমে যোগ্য মুজতাহিদ, আহলে ইলম হিসাবে গ্রহণীয়।
হয়েছেন। কেননা, প্রথমত: তারা যমানায়ে রিসালাতের নিকটতম ইলমী জোয়ারের সমসাময়িক ব্যক্তি ছিলেন। দ্বিতীয়ত: তারা প্রত্যেকেই মুজতাহিদে কামেল, পবিত্র কুরআন, হাদীস ও ইজমা সম্পর্কে অনন্য গভীর জ্ঞানের অধিকারী ছিলেন। তাদের যুগে ও তাদের পরবর্তী যুগ হতে বর্তমান যুগ পর্যন্ত তাদের মত কুরআন ও হাদীসে পারদর্শী মুজতাহিদ দ্বিতীয় আর পয়দা হয়নি। তাই তাদের গবেষণা, ইজতেহাদে নির্ণীত কুরআন হাদীসের সার আমলই পরবর্তী সকল মুসলমানের জন্য পালনীয় সাব্যস্ত হয়েছে। তাঁরা আজীবন গবেষণা করে ইসলামের নিয়ম-নীতির যে রূপ-রেখা উপস্থাপন করেছেন তা সকলের নিকট গ্রহণীয় হিসাবে স্থান পেয়েছে। তারা হুকুম আহকাম ও মাসাঈলের ব্যাপারে এমন কতগুলো মূলনীতি নির্ধারণ করেছেন যে, সেগুলোর নিরীখে কিয়ামত পর্যন্ত উদ্ভুত সকল মাসাঈলের সমাধান করা যেতে পারে। এজন্য মুতাআখখেরীন উলামায়ে কিরাম এ ব্যাপারে একমত হয়েছেন যে, ইমাম চতুষ্ঠয়ের পরবর্তী যমানার লোকদের জন্য তাঁদের যে কোন এক ইমামের তাকলীদ অর্থাৎ তার গবেষণা লব্ধ শরঈ হুকুম-আহকাম পালন করা ওয়াজিব। এ কারণেই বর্তমানে চার মাজহাবের মধ্য হতে কোন এক মাজহাবের তাকলীদ বা অনুসরণ করা ওয়াজিব।
অতএব, বর্তমানে যারা মাজহাব বর্জন করে সরাসরি কুরআন হাদীস বুঝে আমল করতে তৎপর হবেন তারা নিজ প্রবৃত্তির অনুসারী সাব্যস্ত হবেন।
তথাকথিত আহলে হাদীস নাম ধারীরা কীভাবে শুধু কুরআন হাদীসের জাহেরী বিষয় বস্তুর উপর আমল কারী হতে চান তা আমাদের বোধগম্য নয়। কারণ, বর্তমান আধুনিক যমানায় এমন অনেক বিষয়ের উদ্ভব হয়েছে যেগুলোর হুকুম কুরআন হাদীসের কোথাও উল্লেখ নেই। যেমন: উড়োজাহাযে নামায পড়া যাবে কিনা? বীমা ইন্স্যুরেন্স জায়েয কিনা? এধরণের প্রচুর বিষয় রয়েছে। অতএব, এসকল মাসাঈলের ব্যাপারে আইম্মায়ে মুজতাহিদীদের উসূল ভিত্তিক ও গবেষণালব্ধ ফয়সালা মেনে নেয়া ব্যতিরেকে গত্যান্তর আছে কি?
তাই নফসানী খাহেশাতের গোলামী না করে কোন এক মাজহাব গ্রহণ করে নেয়াই কর্তব্য। নতুবা শরীয়ত মানার নামে নিজের নফসের গোলামী করা হবে, যা নিস:ন্দেহে গোমরাহীর পথ তা কখনো কাম্য নয়। কেননা, মানুষ স্বভাবগত ভাবে যা সহজ এবং যা তার স্বার্থের অনুকূলে সেটাই গ্রহণ করতে চেষ্টা করে। বর্তমানে স্বঘোষিত আহলে হাদীসগণ তাই করে আসছেন। চার মাজহাবের মধ্য হতে কোন একটির অনুসারী নয় বলে তারা ওয়াজিব তরক কারী হয়েছেন, আর বর্তমান যমানায় আহলে হাদীসগণ আকাবিরগণকে গালি গালাজ করা এবং মাজহাবের অনুসারীদের প্রতি কুধারণা পোষণ করার কারণে আহলে সুন্নাত ওয়াল জামাত থেকে খারিজ। তবে তারা ইসলামের গন্ডি বহির্ভূত বলে পরিগণিত হবেননা। সূত্র: আহসানুল ফাতাওয়া ১/৪১১, ইমদাদুল মুফতিঈন ১/১৫১, জাওয়াহিরুল ফিকহ ১/১২৭, কিফায়াতুল মুফতী: ১/৩২৫
৩। এমন আহকাম যে গুলোর ভিত্তি এমন নুসূসের উপর যেগুলো একাধিক ব্যাখ্যা সম্বলিত। এ ধরণের নুসূসের ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্ট নসের কোন অর্থটি নেয়া হবে আর কোনটাকে পরিহার করা হবে? এ সিদ্ধান্তও শরীয়তের বিজ্ঞ ইমামগণ ব্যতীত অন্য কেউ দিতে পারবেননা। সুতরাং এক্ষেত্রেও যেই ব্যক্তি যেই ইমামের উপর আস্থাশীল সেই ব্যক্তি সেই ইমামের মতের উপর আমল করবেন এটাই স্বাভাবিক।
৪। শরীয়তের এমন আহকাম যেগুালো সরাসরি কুরআন-হাদীসে উল্লেখ নেই; বরং কুরআন হাদীসের গভীর থেকে কিয়াস করত: বের করা অত্যাবশ্যক। আর এ কাজও কেবল কুরআন হাদীসে প্রাজ্ঞ, অভিজ্ঞ ইমামগণই সবচেয়ে সঠিকভাবে করতে পারবেন। কাজেই, এমন ক্ষেত্রে অন্যদের কর্তব্য হলো, ইমামগণের বের করে আনা হুকুম অনুযায়ী আমল করা। যেমন: একজন বেগানা পুরুষ ও বেগানা নারীর বীর্য একত্রিত করে টিউবে রাখা হলো, এবং সেখান থেকে বাচ্চা জন্ম নিল। প্রশ্নহলো, এ বাচ্চার বংশ প্রমাণিত হবে কিনা? যদি হয় তবে কার থেকে প্রমাণিত হবে? এ বাচ্চাকে বৈধ না অবৈধ বাচ্চা বলা হবে ? এটা অত্যন্ত স্পষ্ট কথা যে, কুরআন, সুন্নাহতে এ মাসআলা স্পষ্ট ভাবে উল্লেখ নেই। কাজেই, কুরআন ও হাদীসের মৌলিক নীতিমালার আলোকে এ মাসআলা এবং এধরণের ঘটিতব্য অগণিত মাসআলার হুকুম বের করতে হবে। আর এ জটিল কাজটিও কেবল ইমামগণ করতে সক্ষম; অন্য কেউ নয়। অন্যদের কর্তব্য হলো, এক্ষেত্রে ইমামগণের অনুসরণ করা।
উপরোক্ত আলোচনা দ্বারা প্রমাণিত হলো, শরীয়তের হুকুম আহকামের মধ্যে শুধুমাত্র প্রথম প্রকার তথা আহকামে মানসূসাহ সরীহার ক্ষেত্রে কোন ইমামের অনুসরণের প্রয়োজন নেই। এছাড়া, অবশিষ্ট ৩ প্রকার হুকুম আহকামের ক্ষেত্রে ইমামগণের অনুসরণের বিকল্প নেই। আর এ বিষয়ে উলামায়ে উম্মতের ইজমা (ঐকমত্য) প্রতিষ্ঠিত হয়েছে। সূত্র: তুহফাতুল আলমাঈ ১/৮৫, ৮৬
স্বল্প পরিসরে এ বিষয়ে বিস্তারিত আলোচনার সুযোগ নেই। এ বিষয়ে বিস্তারিত জানার জন্য জাষ্টিস আল্লামা তকী উসমানী দা.কর্তৃক লিখিত তাকলীদ কী শরঈ হাইছিয়্যত ও মুফতী মনসুরুল হক দা. বা.কর্তৃক লিখিত 'মাযহাব ও তাক্বলীদ' নামক কিতাব দ্রষ্টব্য
📄 গণক বা জ্যোতিষীর ভবিষত বাণী করা এবং তা বিশ্বাস করা
আমাদের দেশে অনেক গণক ও জ্যোতিষী দেখা যায়, যারা মানুষকে নানা বিষয়ে ভবিষ্যত বাণী করে থাকে। আর কতিপয় মানুষ আছে যারা তাদের কথা অন্ধের মত বিশ্বাস করে।
অথচ আল্লাহ তা'আলা পবিত্র কুরআনে ইরশাদ ফরমান, তিনি (আল্লাহ তা'আলা) অদৃশ্যের পরিজ্ঞাতা, তিনি তার অদৃশ্যের জ্ঞান কারো নিকট প্রকাশ করেননা তার মনোনীত রাসূল ছাড়া। সূত্রঃ সূরা জিন, আয়াত ২৬, ২৭
এছাড়া, প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এরশাদ ফরমান, যে ব্যক্তি কোন জ্যোতিষী অথবা গণকের কাছে গেল এবং সে যা বলবে তা বিশ্বাস করল সে মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর প্রতি যা নাযিল হয়েছে তার সাথে কুফরী করলো।
সূত্র: সুনানে আবূ দাউদ হা: ৩৯০৪, তিরমিযী হা: ১৩৫
উপরোক্ত আয়াত ও হাদীস দ্বারা প্রতীয়মান হয় যে, গণকদের ভবিষ্যতবাণী করা এবং অন্যদের তা বিশ্বাস করা কুফরী।
📄 রাশি গণনা করা
আমাদের দেশে কিছু লোক আছে, যারা মানুষের হাত দেখে বা অন্যান্য আলামত দেখে বিভিন্ন রাশি গণনা করে থাকে। যেমন : কাউকে বলে সিংহ রাশি, কাউকে বলে তুলা রাশি। এভাবে বিভিন্ন রাশির কথা বলে থাকে। মানুষও তার কথা সত্য মনে করে নিজের ব্যাপারে সেরূপই বিশ্বাস করে থাকে।
আসলে রাশি বলা হয়, সৌর জগতের কতগুলো গ্রহ-নক্ষত্রের কাল্পনিক প্রতীককে। এক্ষেত্রে সাধারণত:কয়েকটি রাশির কল্পনা করা হয়ে থাকে। যথা : মেশ, বৃষ, মিথুন, কর্কট, সিংহ, কন্যা, তুলা, বৃশ্চিক, মকর, কুম্ভ, ও মীন। জ্যোতিষ শাস্ত্রের ধারণা অনুযায়ী এ সব গ্রহ-নক্ষত্রের গতি, স্থিতি ও সঞ্চারের প্রভাবে ভবিষ্যত শুভ অশুভ নির্ণয় তথা ভাগ্য বিচার করা হয় এবং সেভাবেই তা সংঘঠিত হয়ে থাকে।
অথচ ইসলামী আকীদা অনুসারে গ্রহ নক্ষত্রের নিজস্ব কোন প্রভাব নেই। সকল ক্ষমতা একমাত্র আল্লাহ তা'আলার। অবশ্য, এগুলোর মধ্যে আল্লাহ কর্তৃক প্রদত্ত কোন প্রভাব থাকলে থাকতেও পারে। তবে, তা নিশ্চিত করে বলা যাবেনা। সুতরাং ভাল-মন্দ ভাগ্য গ্রহ-নক্ষত্রের প্রভাবে ঘটে এই আকীদা পোষণ করা শিরকী। অতএব, রাশি গণনা করা শরীয়তের দৃষ্টিতে জায়েয হবেনা।
সূত্র: সূরা আন'আম আয়াত ৫৭, মুসনাদে আহমাদ ৯/২৪০ রদ্দুল মুহতার ১/৪৫ ইমদাদুল আহকাম ১/১১৮
📄 তা’বীয ব্যবহার করা
একমাত্র আল্লাহ তা'আলাই সব কিছু করতে পারেন। তিনিই রোগ দান করেন এবং তিনিই রোগ থেকে মুক্তি দান করেন। অন্তরে এ বিশ্বাস রেখে শুধুমাত্র অসীলা স্বরূপ শরীয়ত সম্মত পন্থায় তা'বীয ব্যবহার করার অনুমতি আছে। এতে কোন রকম শিরক হবে না।
তা'বীয, ঝাড়-ফুঁক ব্যবহারের বিষয়টি এ যুগেই নতুন নয়; বরং আমাদের প্রিয়নবী হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এর যুগেও ছিল। তিনি সাহাবাগণকে ঝাড়-ফুঁক করেছেন। এছাড়া, সাহাবাগণ থেকেও তা'বীয ব্যবহারের বিষয়টি প্রমাণিত আছে।
তবে কেউ যদি তা'বীয সম্পর্কে এই ধারণা পোষণ করে যে, তা'বীযের মধ্যে রোগ দূর করার ক্ষমতা আছে বা তা'বীয বিপদ-আপদ থেকে রক্ষা করতে পারে এবং তা'বীয ব্যবহার না করলে বা খুলে রাখলে বিপদ হতে পারে, তাহলে এ ধরণের বিশ্বাস নিয়ে তা'বীয ব্যবহার করা নিঃসন্দেহে শিরক হবে। ইলম বিহীন (অজ্ঞ) লোকেরা সাধারণত: এ ধরণের ভ্রান্ত বিশ্বাস নিয়ে তা'বীয ব্যবহার করে থাকে। এটাকে কঠোরভাবে নিষেধ করা কর্তব্য। আজকাল কিছু নামধারী মোল্লা, মুনশী বা ফকীর, দরবেশ আছে যারা মুসলমানদের ঈমান আকীদা দুর্বলতার সুযোগে তাবীজ কবজের কেরামতীর নামে তাদের ঈমান-আক্বীদা যতটুকু অবশিষ্ট ছিল তাও নিজেদের দুনিয়াবী স্বার্থে বরবাদ করে ছাড়ছে। এ জন্য সাধারণ মুসলমানদের কর্তব্য হলো, সর্বদা হক্কানী আলেমগণের সাথে জুড়ে থাকা। এছাড়া তাদের ঈমান-আকীদা রক্ষার দ্বিতীয় কোন পথ নেই।
সূত্র: মিশকাত শরীফ ২/৩৮৮