📄 পীর/ফকীরকে সিজদা করা
আমাদের দেশে বর্তমানে পীর-মুরীদীর ব্যবসা বেশ জমজমাট। তাইতো দেখা যায়, পীরের নামে কতিপয় অসাধু, ভন্ড, প্রতারক দেশের বিভিন্ন স্থানে পীরালী ব্যবসা খুলে বসেছে। তারা কতিপয় দালাল নিয়োগ করে রেখেছে, যারা পীরের গুণ কীত্তন করে মুরীদ সংগ্রহের কাজ করে। এছাড়া, তারা মুরীদদেরকে দরবারে প্রবেশের আদব শিখায় যে, মাথা ঝুঁকিয়ে পীর বাবার দরবারে প্রবেশকরতে হবে এবং বাবার নৈকট্য পেতে হলে তাকে সিজদাও করতে হবে।
অথচ আল্লাহ ছাড়া অন্য কাউকে সিজদা করা হারাম। যে উদ্দেশ্যেই তা করা হোকনা কেন সেটা হারাম হিসাবেই গণ্য হবে। কারণ, কাউকে সিজদা করার দুটি উদ্দেশ্য হতে পারে। (১) সিজদায়ে তাজিমী তথা সম্মান সূচক সিজদা করা। (২) সিজদায়ে ইবাদত তথা ইবাদতের উদ্দেশে সিজদা করা।
আর কোন মাখলুককে করা উভয় প্রকার সিজদাই হারাম। উপরন্তু, দ্বিতীয় প্রকার সিজদা কুফরও বটে।
আর যদি কাউকে মাধ্যম বানিয়ে আল্লাকে সিজদা করা জায়েয হতো, তাহলে এর সবচেয়ে বেশী হকদার ছিলেন রাসূলে আকরাম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম। অথচ কুরআন হাদীসের কোথাও এতদসংক্রান্ত কোন বর্ণনা নেই। শুধু তাই নয়; বরং এ ব্যাপারে প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম কঠোর ভাবে নিষেধাজ্ঞা আরোপ করে গেছেন। সুতরাং গাইরুল্লাকে সিজদা করার ব্যাপারে যত যুক্তিই দেয়া হোকনা কেন সবগুলো শয়তানী যুক্তি। এর দ্বারা হারাম ও কুফরী কাজ কখনো হালাল হবেনা।
সূত্র: সহীহ মুসলিম হাদীস নং ৫৩২, মুসনাদে আহমদ হাদীস নং ৭৩৫৮, রাহে সুন্নত পৃ: ২৮১
📄 কাদিয়ানীদের ব্যাপারে শরীয়তের ফয়সালা
বিশ্বের সমস্ত হক্কানী উলামায়ে কিরাম ও মুফতীগণের সর্বসম্মত সিদ্ধান্ত হলো, গোলম আহমদ কাদিয়ানী ও তার অনুসারী গোষ্ঠী খতমে নবুওয়াত তথা হযরত মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর শেষ নবী হওয়াকে অস্বীকার করার দরুন কাফের এবং একটি অমুসলিম বাতিল ফিরকাহ। সূত্র: ফাতাওয়ায়ে দারুল উলূম ১২/৩৩৪
কোন মুসলমান তাদের এ ভ্রান্ত বিশ্বাসের সাথে ঐক্যমত পোষণ করলে সাথে সাথে তার ঈমান চলে যাবে। বর্তমানে বাংলাদেশে এদের প্রাদুর্ভাব লক্ষ্য করা যাচ্ছে। ধর্মপ্রাণ মুসলমানদের ঐক্যবদ্ধভাবে এসব কাফের ও ঈমান ধ্বংসকারীদের প্রতিহত করা জরুরী ও ঈমানী দায়িত্ব। এ ব্যাপারে বিস্তারিত জানার জন্য কাদিয়ানীদের সম্পর্কে হক পন্থী উলামায়ে কিরামের লিখা বই পুস্তক পড়া জরুরী।
এছাড়াও, এর জন্য প্রয়োজন খতমে নবুওয়াত, ইসমতে আম্বিয়া ও রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর শেষ নবী হওয়াসহ অন্যান্য সকল সহীহ আকায়েদের ব্যাপক প্রচার ও প্রসার। বাস্তবক্ষেত্রে এটা প্রতিবাদ ও প্রতিরোধ আন্দোলনের চেয়ে বেশী কার্যকর। এজন্য প্রত্যেক মসজিদে 'আকীদাতুত ত্বহাবী' নামক কিতাব অথবা হযরত থানবীর রহ. 'বেহেস্তী যেওর' বা 'তালীমুদ্দীনের আকায়েদ' অধ্যায়ের তা'লীমের ব্যবস্থা করা যেতে পারে। হক্কানী উলামায়ে কিরাম তাঁদের ওয়ায মাহফিল সমূহে আকায়েদ বিষয়ক বয়ান বেশী বেশী করবেন।
এভাবে মুসলমানদের মাঝে সহীহ আকায়েদের প্রচার ব্যাপক করার দ্বারা বাতিল আকীদা ও আন্দোলন সমূহ নিজে নিজেই দূরীভূত হতে বাধ্য। উদাহরণস্বরূপ বলা যেতে পারে, রাতের অন্ধকারে যদি ইঁদুর, ব্যাঙ, সাপ ইত্যাদি বিড়ম্বনার শিকার হয়ে গৃহস্বামী একটি একটি করে মারতে থাকে, তাহলে সারা রাত জেগেও সেগুলো মেরে শেষ করতে পারবে না। কিন্তু যদি ঘরে বাতি জালানো হয়, তাহলে এক নিমিষেই সবগুলো লেজ গুটিয়ে এদিক সেদিক পালিয়ে যেতে বাধ্য হবে। তেমনিভাবে, দিকে দিকে হকের মশাল প্রজ্জ্বলিত করা হলে সমস্ত বাতিল মতবাদ ও বাতিল প্রচারকারী সংস্থা বা সংগঠনগুলোও জনসমর্থন না পেয়ে আপন আপন লেজ গুটিয়ে নিতে বাধ্য হবে। চাই তা যত বড় শক্তিশালী ও সুসংগঠিত হোক না কেন।
যেমন: সহীহ আকায়েদের তা'লীম চালু করা হলে, তাতে সর্ব প্রথমেই কুফরী কথা ও কাজ, শিরকী কথা ও কাজ এবং বিদ'আত সহ সর্বপ্রকার কুসংস্কারমূলক কাজ, ধ্যান ধারণা ও ভ্রান্ত বিশ্বাস সমূহ এক এক করে সবিস্তারে আলোচনা করা হবে। তাতে সর্ব প্রকার ভন্ডামী, ভন্ডপীরদের অবৈধ ব্যবসা, মাযার পূজা, দরগাহ পূজা ও মসজিদ পূজা ইত্যাদি বন্ধ হবে। তারপর খতমে নবুওয়াত তথা মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ই সর্বশেষ নবী তাঁর পরে আর কোন নবী আসবে না। এ আলোচনাও আসবে। এভাবে জনমনে এ বিশ্বাস বদ্ধমূল করে দিতে পারলে অমুসলিম কাদিয়ানী আন্দোলন মাটিতে মিশে যাবে।
খতমে নবুওয়াতের একটি দলীল হলো, স্বয়ং আল্লাহ তা'আলা (যার হাতে নবুওয়াতের উৎস এবং যিনি সমস্ত নবীর প্রেরক) তাঁর কালামে পাকে স্পষ্টভাবে ঘোষণা করেছেন, মুহাম্মদ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তোমাদের কোন পুরুষের পিতা নন; বরং তিনি আল্লহর রাসূল ও সর্ব শেষ নবী। সূত্র: সূরাহ আহযাব ৪০, মুফতী শফী রহ. তার লিখিত 'খতমে নবুওয়ত' নামক কিতাবে খতমে নবুওয়াত সম্পর্কে শতাধিক আয়াত ও দুই শতাধিক সহীহ হাদীস একত্রিত করেছেন। হাদীসে মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেছেন আমি সর্বশেষ নবী, আমার পর আর কোন নবী আসবেনা। সূত্র: তিরমিযী হাদীস নং ২৩৬৬ সাথে সাথে তিনি এ বলেও সতর্ক করে গেছেন যে, আমার পরে একাধিক মিথ্যা নবুওয়তের দাবীদারের আবির্ভাব ঘটবে। তোমরা তাদের থেকে সতর্ক থেকো।
সূত্র: বুখারী, হাদীস- ৩৫৩৫, আবূ দাউদ, হাদীস নং ৪২৫৪, তাফসীরে তবারী: ২৮৭৬২, মুসলিম হাদীস ১১৯৫, দুররে মানসূর ১২/৬৩, রুহুল মা'আনী-১৪/২২
📄 শীয়া ইছনা আশারিয়া ফিরকা ইসলাম থেকে খারেজ
শীয়া ইমামিয়া সম্প্রদায়ের অন্যতম শাখা দল ইছনা আশারিয়া সম্প্রদায়ের অনেক কুফরী আকীদা রয়েছে। তাদের কিছু গোমরাহ ও কুফরী আকীদা নিম্নে উল্লেখ করা হলো।
১. এ সম্প্রদায়ের ভিত্তি হলো, ইমামতের আকীদার উপর। ইমামগণ সম্পর্কে তাদের ধর্মীয় নেতা খোমেনী লিখেছেন যে, আমাদের ইমামগণের এমন মর্তবা ও পজিশন অর্জিত আছে, যে পর্যন্ত কোন নৈকট্যশীল ফেরেশতা ও নবী-রাসূলগণও পৌঁছতে পারেন না। সূত্র: আল হুকুমাতুল ইসলামিয়া পৃ. ৫২
উক্ত গ্রন্থের অন্য স্থানে লিখেছেন, সৃষ্টিজগতের প্রতিটি কণার উপর ইমামগণের আধিপত্য রয়েছে। (প্রাগুক্ত)
২. হযরত শাইখাইন অর্থাৎ আবূ বকর ও উমর রা. ও যিননুরাইন হযরত উসমান রা. ও অধিকাংশ সাহাবায়ে কেরাম সম্পর্কে খোমেনীর মন্তব্য হচ্ছে, আবু বকর, উমর আন্তরিক ভাবে মুসলমান ছিলেন না। রাজত্ব ও ক্ষমতা লাভের আশায় কেবল বাহ্যত ইসলাম ধর্ম গ্রহণ করেছিলেন। এ উদ্দেশ্য সফল না হলে তারা ইসলামের বিরুদ্ধেই দল তৈরী করে ফেলতেন এবং ইসলামের শত্রু হয়েই মাঠে নামতেন। সূত্র: কাশফুল আসরার: ১১৩/১১৪
তার মতে হযরত আবূ বকর রা. ও হযরত উমর রা. কুরআনের বহু আয়াতের সরাসরি বিরোধিতা করেছেন এবং নিজেদের পক্ষ থেকে হাদীস বানিয়ে বর্ণনা করেছেন। (প্রাগুক্ত)
এ ছাড়া, তিনি হযরত উসমান রা. ও হযরত মুয়াবিয়া রা. কে যালিম ও দুশ্চরিত্রবান বলে আখ্যা দিয়েছেন। সূত্র: কাশফুল আমরার পৃ. ১০৭
৩. শীয়াদের একজন ইমাম উচ্চ পর্যায়ের মুজতাহিদ বাকের মজলিসী। তার রচিত পুস্তকসমূহ পাঠ করতে স্বয়ং খোমেনী কাশফুল আসরার এর ১২১ নং পৃষ্ঠায় পাঠকগণকে অনুরোধ জানিয়েছেন। এই মজলিসী নিজ কিতাবে লিখেছেন যে, উম্মুল মুমিনীন হযরত আয়েশা রা. ও হযরত হাফছা রা. মুরতাদ এবং তারা দুজন রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লামকে বিষপানে শহীদ করেছেন। সূত্র: হায়াতুল কুলুব: পৃ. ৭৪৫
বাকের মজলিসীর মতে তিনজন ব্যতীত সকল সাহাবা মুরতাদ হয়ে গিয়েছিলেন। ঐ তিন জন হলেন, হযরত সালমান ফারসী, হযরত মিকদাদ ও হযরত আবু যর রা.। সূত্র: হায়াতুল কুলুব: ২/৮৩৭
৪. শীয়া ইছনা আশারিয়া সম্প্রদায়ের বহু কুফরী আকীদার মধ্যে একটি হচ্ছে, কুরআন পরিবর্তনের আকীদা। বাকের মজলিসী নিজ গ্রন্থে লিখেছেন যে, আল কুরআনে পরিবর্তন সাধিত হয়েছে এবং এ সম্পর্কিত দুই হাজারেরও বেশী রেওয়ায়েত রয়েছে, যেগুলো মশহুর পর্যায়ের। সূত্র: ফযলুল খেতাব পৃ. ২২৭
খোমেনী ও তার ইছনা আশারিয়া সম্প্রদায়ের এ সকল ভ্রান্ত আকীদার মাধ্যমে কুরআনের বহু আয়াত ও হাদীসে মুতাওয়াতিরকে মিথ্যা সাব্যস্ত করা হয়েছে। এ কারণে প্রত্যেকযুগের উলামায়ে কেরাম শীয়া ইছনা আশারিয়া ফেরকাকে কাফের বলে ফাতাওয়া দিয়েছেন। যেমন: ইবনে তাইমিয়া হাম্বলী রহ. কাজী ইয়াজ মালেকী রহ. বড় পীর আব্দুল কাদের জিলানী রহ. কামাল ইবনে হুমাম হানাফী রহ. আল্লামা ইবনে আবেদীন শামী রহ. শাহ ওয়ালীউল্লাহ মুহাদ্দিসে দেহলোবী রহ. এবং মুফতী মাহমূদ দেওবন্দী রহ. প্রমূখ উল্লেখযোগ্য।
মোটকথা, খোমেনী ও ইছনা আশারিয়া সম্প্রদায়ের উল্লেখিত বাতিল আকীদাসমূহের কারণে কুরআন, হাদীস ও ইজমায়ে উম্মতের দৃষ্টিতে ইছনা আশারিয়া সম্প্রদায় ইসলাম থেকে খারেজ এবং ইরানের বিপ্লব কোন ইসলামী বিপ্লব নয়; বরং সেটা নির্ভেজাল শিয়া বিপ্লব।
উপরে আমরা তাদের ভ্রান্ত আকীদাসমূহ হতে মাত্র হাতেগোনা কয়েকটি আকীদা উল্লেখ করেছি। এ সম্পর্কে বিস্তারিত জানতে হলে পড়ুন:
হেদায়াতুশ শীয়া, লেখক: আল্লামা রশীদ আহমদ গাঙ্গুহী রহ.
ইরানী ইনকেলাব ইমাম খোমেনী ও শিয়া মতবাদ, লেখক: আল্লামা মনযূর নোমানী রহ.। বঙ্গানুবাদ মাওলানা মুহিউদ্দীন খান রহ.। জাওয়াহিরুল ফাতাওয়া, লেখক: মুফতী আব্দুস সালাম চাটগামী), ১/৩৬৮-৫০৫, তোহফায়ে ইছনা আশারিয়া, লেখক: শাহ আব্দুল আযীয মুহাদ্দিসে দেহলোবী রাহ., ফাতাওয়া শামী ৬/৩৭৮, ফতহুল কাদীর ১/৩০৪, ফাতাওয়া আলমগীরী ২/২৬৪, আল ফছল লি-ইবনে হাযাম ২/৭৮।
📄 আহলে হাদীস সম্প্রদায়ের মুখোশ উন্মোচন এবং তাদের ভ্রান্তি নিরসন
প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম থেকে কথা, কাজ ও সমর্থনমূলক যা কিছু বর্ণিত হয়েছে, সবই হাদীসের অন্তর্ভুক্ত। যদিও সে সবগুলো উম্মতের আমলের জন্য নয়। যেমন: রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আল্লাহ তা'আলার নির্দেশে নয়টি বিবাহ করেছেন। এটা হাদীস, তবে হাদীস হওয়া সত্যেও উম্মতের জন্য এর অনুসরণ জায়েয নেই। কারণ, এর অনুসরণ অন্য দলীলের ভিত্তিতে উম্মতের জন্য নিষিদ্ধ সাব্যস্ত হয়েছে। উম্মতের করণীয় হিসেবে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম যা কিছু রেখে গেছেন, সে সবই সুন্নতের অন্তর্ভুক্ত। তবে গাইরে মুকাল্লিদদের আহলে হাদীস নাম গ্রহণ করাটাই আপত্তিকর। কেননা, আহলে হাদীসের অর্থ হলো, হাদীসের অনুসারী অথচ সব হাদীস উম্মতের অনুসরণের জন্য নয়; বরং মহানবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বিভিন্ন রেওয়ায়েতে আমাদেরকে সুন্নাহর অনুসরণ করারই আদেশ দিয়েছেন। যেমন: রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, তোমরা আমার ও আমার সুপথপ্রাপ্ত খলিফাগণের সুন্নাতকে অবলম্বন কর। তোমরা তাঁদের আদর্শ শক্তভাবে ধারণ কর এবং দাঁত দিয়ে কামড়ে ধর। সূত্র: আবূ দাউদ শরীফ ২/৬৩৫
প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আরো ইরশাদ করেন, আমি তোমাদের মাঝে দু'টি জিনিস রেখে যাচ্ছি। যত দিন তোমরা তা শক্তভাবে আঁকড়ে রাখবে, ততদিন তোমরা পথভ্রষ্ট হবে না। একটি হচ্ছে, আল্লাহর কিতাব (আল-কুরআন) ও অপরটি হচ্ছে, তাঁর রাসূল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর সুন্নাত (আদর্শ)। সূত্র: মুআত্তা ইমাম মালিক রহ. পৃ:৩৬৩
উল্লেখ্য, চার মাযহাবের ইমাম ও ফিকহের অন্যান্য মুজতাহিদ ফকীহ ইমামগণ এ উম্মতের মধ্যে অতি উচ্চ মর্যাদা সম্পন্ন ব্যক্তি ছিলেন। সমগ্র আহলে হক তাঁদের মর্যাদা মেনে নিয়েছেন। সুতরাং তাঁদের সম্বন্ধে কোনরূপ বিরূপ মন্তব্য করা জায়েয নয়। কারণ, একজন সাধারণ মুসলমানকে গালি দেয়া যখন শরীয়তে হারাম। তখন এত বড় উঁচু দর্জার উলামায়ে কিরাম ও বুযুর্গগণকে গালি দেয়া বা তাদের ব্যাপারে বিরূপ ভাব রাখা অমার্জনীয় অপরাধ বৈকি।
জটিল ও অস্পষ্ট বিষয় সমূহে ইমামগণের কোন একজনের তাকলীদ বা অনুসরণকে শিরক বলা মহা অন্যায় ও মূর্খতার বহিঃপ্রকাশ। কারণ, মাযহাবের অনুসারীগণ কখনও আল্লাহ ও আল্লাহর রাসূলের অনুসরণের মত ঐ সব ইমামকে অনুসরণ করেন না; বরং জটিল ব্যাপার সমূহে বা যেসব ক্ষেত্রে বাহ্যিকভাবে আয়াত বা হাদীস পরস্পর বিরোধী বলে মনে হয়, শুধু সেসব ক্ষেত্রেই তাদের ব্যাখ্যা অনুসরণ করা হয়। যা মূলত: আল্লাহ ও আল্লাহর রাসূলেরই অনুসরণ। আর এক্ষেত্রে তাদের ব্যাখ্যা অনুযায়ী আমল করা অধিক নিরাপদ।
কেননা, তারা নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর যামানার খুব নিকটবর্তী ছিলেন। কাজেই, সঙ্গত কারণেই সেই প্রজ্ঞাবান ফকীহ ইমামগণের ব্যাখ্যা ও অভিমত আমাদের দীর্ঘ পিছনের সারির লোকদের ব্যাখ্যার চেয়ে অধিক উত্তম ও বরণীয় হবে। তাই উল্লেখিত পন্থাটি অত্যান্ত সুন্দর, যুক্তিযুক্ত ও নিরাপদ। এবিষয়টি কোন বিবেকবান মুসলমানের নিকট অস্পষ্ট থাকতে পারে না। কুরআন-সুন্নাহর সঠিক ব্যাখ্যার ক্ষেত্রে বিজ্ঞ আলেমের অনুসরণ করার ধারা সাহাবাদের রা. যুগ থেকেই চলে আসছে। প্রিয় নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর জীবদ্দশায় তো সকলেই তাঁকে জিজ্ঞাসা করে বা তাঁকে দেখে আমল করতেন। কিন্তু তাঁর ইন্তেকালের পর লক্ষাধিক সাহাবায়ে কেরাম থেকে মাত্র সীমিত সংখ্যক সাহাবা রাযি. মাসআলা-মাসাঈল ও ফাতাওয়া দেয়ার খিদমত আঞ্জাম দিতেন। সাধারণত: এক এক এলাকার লোকজন একজন ফকীহ সাহাবী রা. এর ফাতাওয়া অনুযায়ী আমল করতেন। হাদীসের কিতাবে এর একাধিক বর্ণনা এসেছে। যেমন: কূফাতে হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা., মদীনায় হযরত যায়েদ ইবনে ছাবেত রা. প্রমুখ।
আহলে হাদীস সম্প্রদায়ের ভাইয়েরা এ তাকলীদ বা অনুসরণকে কি শিরক বলবেন ? তাছাড়া, পবিত্র কুরআনের সাতজন কারীর কিরআতে সাব'আ প্রসিদ্ধ আছে। তারা নিজেরা নিশ্চয়ই সাত কিরআতের কোন নির্দিষ্ট একটা কিরাআত অবলম্বন করে কুরআন তিলাওয়াত করে থাকেন। অর্থাৎ সাত কারীগণ থেকে শুধুমাত্র একজন কারীকে অনুসরণ করে থাকেন। তাহলে তাদের কথামত এটা কি শিরক হবে? কখনই না। যাই হোক, ইমামের তাকলীদ বা অনুসরণ সাহাবাগণের রা. যামানা থেকে চলে আসছে। এটাই স্বাভাবিক নিয়ম। দুনিয়ার দিক দিয়েও আমরা সাধারণতঃ প্রত্যেক ব্যাপারে ঐ বিষয়ে পারদর্শী লোকের তাকলীদ বা অনুসরণ করে থাকি। তেমনিভাবে, সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ হলো-দ্বীন। এ দ্বীন তথা কুরআন-হাদীসের ব্যাখ্যার ব্যাপারে যারা সবচেয়ে বিশেষজ্ঞ ছিলেন, তাদের ব্যাখ্যা মেনে নেয়াটাই তো নিরাপদ। আর মহান আল্লাহ তা'আলা তো সেই নির্দেশই দিয়েছেন: যে "তোমরা না জানলে, যারা জানে তাদেরকে জিজ্ঞেস কর। সূত্র: সূরা নাহল, আয়াত-৪৩
এছাড়া বিভিন্ন হাদীসে নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আকাবিরে সাহাবাগণের অনুসরণের নির্দেশ দিয়েছেন। সূত্র:তিরমিযী ২/৯৬
ইমামগণের মতামত বাদ দিয়ে নিজেদের খিয়াল-খুশিমত কুরআন-হাদীসের ব্যাখ্যা দেয়া এবং মাযহাব মানাকে অস্বীকার করা শরীয়তের মধ্যে মারত্মক বিদ'আত বলে আহলে হকগণ উল্লেখ করেছেন। কারণ, কথিত আহলে হাদীস সম্প্রদায়ের আবির্ভাব ৫৪২ হিজরীর পর হয়েছে।
সুতরাং ফকীহ সাহাবাগণের তাকলীদ বা অনুসরণ স্বয়ং সাহাবাগণ করে গেছেন। ঐ সব ফকীহ সাহাবাগণের সমস্ত ফাতাওয়া ও আলোচনার বিবরণ আইম্মায়ে মুজতাহিদগণ সংরক্ষণ করেছেন এবং কুরআন-সুন্নাহর ভিত্তিতে ঐ সকল ফকীহ সাহাবাগণের বর্ণনার আলোকে বুনিয়াদী কানুন ও বিস্তারিত মাসাঈল পেশ করেছেন। সুতরাং ইমামগণের তাকলীদ প্রকৃতপক্ষে কুরআন-সুন্নাহ ও ফকীহ সাহাবাগণের ব্যাখ্যারই তাকলীদ বা অনুসরণ। এটা কখনও ঐসব ইমামগণের ব্যক্তিত্বের তাকলীদ নয় যে, তাকে শিরক গণ্য করা হবে। যদি তা শিরক সাব্যস্ত হয়, তবে আহলে হাদীস সম্প্রদায়ের সাধারণ লোকেরা তো তাদের আলেমগণের কথামতই সব আমল করে থাকেন। সরাসরি কুরআন-হাদীস বুঝার ক্ষমতা নিশ্চয় তাদের নেই। তাহলে তাদের দৃষ্টিতে তারা নিজেরাই কি শিরকের শিকার গণ্য হবেন না? আহলে হাদীস দাবীদাররা প্রায়শই মাযহাবের অনুসারীগণের ব্যাপারে কটাক্ষ ও বিরূপ সমালোচনা করতে থাকেন। যা কোন শরীফ সম্ভ্রান্ত লোকের শান নয়। অপরদিকে, হানাফীগণ একান্ত নিরুপায় হয়ে তাদের ভুল তথ্যের জবাব দিতে বাধ্য হন।
তারা প্রায়শই বলে থাকেন যে, হাদীসের সাথে হানাফীগণের নামাযের সামাঞ্জস্য নেই। তাদের এ অভিযোগ ভিত্তিহীন, অবান্তর ও তাদের স্থূলদৃষ্টির পরিচায়ক। কেননা, একাধিক সহীহ ও বিশুদ্ধ হাদীসে রফ'য়ে ইয়াদাইন একবার তথা শুধু তাকবীরে তাহরীমার সময় করার কথা উল্লেখ আছে। অনেক সহীহ হাদীসে ইমামের পিছনে কিরাআত বা সূরা ফাতিহা পড়া সম্পর্কে নিষেধাজ্ঞা এসেছে। হুযূর সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম নামাযে আমীন নিঃশব্দে পড়েছেন বলে উল্লেখ আছে। এ সম্পর্কে কতিপয় সহীহ হাদীস নিম্নে উদ্ধৃত হলো:
(ক) হযরত জাবের ইবনে সামুরাহ রা. বলেন, নামাযের সময় রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদের নিকট আসলেন এবং বললেন, তোমাদের কী হলো যে, তোমাদেরকে দেখতে পাচ্ছি, তোমরা রফ'য়ে ইদাঈন করছ দুর্দান্ত ঘোড়ার লেজের ন্যায়? নামাযের মধ্যে স্থীর থাক। সূত্র: মুসলিম ১/১৮১
(খ) হযরত আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ রা. বলেন, আমি কি তোমাদেরকে প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এর নামায সম্পর্কে অবহিত করবনা? এ কথা বলে তিনি নামায পড়ে দেখালেন এবং নামাযে তাকবীরে তাহরীমার সময় একবার রফ'য়ে ইদাঈন করলেন। (দু'হাত উত্তোলন করলেন।) নামাযে আর কোথাও তিনি রফ'য়ে ইদাঈন করলেন না। সূত্র: তিরমিযী ১/৫৯
(গ) হযরত আবূ মূসা আশ'আরী রা. বলেন, নিশ্চয়ই প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম আমাদেরকে ওয়াজ-খুৎবাহ শুনিয়েছেন। আমাদের জন্য সুন্নত তরীকা বর্ণনা করেছেন এবং আমাদেরকে নামায শিক্ষা দিয়েছেন। তিনি ইরশাদ করেছেন, তোমরা স্বীয় কাতারসমূহ সোজা কর। অতঃপর তোমাদের একজন তোমাদের নামাযের ইমামতি করবেন। তিনি যখন তকবীর বলবেন, তোমরাও তকবীর বলবে। আর তিনি যখন কিরাত পড়বেন, তখন তোমরা চুপ থাকবে। সূত্র:মুসলিম ১/১৭৪
(ঘ) হযরত জাবের রা. বর্ণনা করেন, রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম ইরশাদ করেন, যার ইমাম আছে, সেই ইমামের কিরাতই তার কিরআত। সূত্র: মুসান্নাফে ইবনে আবী শাইবা ৩/৩৮২
(ঙ) হযরত আলক্বামা ইবনে ওয়াইল রা. স্বীয় পিতা হতে বর্ণনা করেন যে, নবী করীম সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সূরা ফাতিহা শেষ করলেন তৎপর বললেন, আমীন। তখন তা আস্তে বললেন। সূত্র: তিরমিযী শরীফ: পৃ. ৫৮
এখানে কতিপয় দৃষ্টান্ত পেশ করা হলো মাত্র। হানাফীগণের প্রত্যেক আমলের মূলেই এরূপ সহীহ হাদীস বিদ্যমান রয়েছে। প্রসিদ্ধ হাদীসের কিতাব ত্বহাবী শরীফ হানাফী মাযহাবের অনুসরণীয় হাদীস সমূহ দ্বারাই সমৃদ্ধ। এতে বুঝা গেল, হানাফীগণের নামাযের প্রত্যেকটা আমল সহীহ রেওয়ায়েত দ্বারাই প্রমাণিত। বিস্তারিত জানতে চাইলে, "নসবুর রায়াহ” “আওজাযুল মাসালিক” "ই'লা উসসুনান" "আসারুস সুনান” “কিতাবুস সুন্নাহ” প্রভৃতি কিতাব দেখার জন্য অনুরোধ করছি。