📄 শরীয়তের বিধি-বিধান নিয়ে কটূক্তি করা, বিদ্রুপ করা
ইসলাম আল্লাহ পাকের একমাত্র মনোনীত ধর্ম এবং একটি পূর্ণাঙ্গ জীবন ব্যবস্থা। এর প্রতিটি বিধি-বিধান সর্বযুগে ও সর্বদেশে সর্বস্তরের মানুষের জন্য সমান ভাবে প্রযোজ্য। আর যেহেতু এ ধর্ম মহান রাব্বুল 'আলামীন কর্তৃক মনোনীত, তাই এর বিধি-বিধান চির শাশ্বত ও অলংঘনীয়। ইসলামের সূচনা কালে যে সকল আইন-কানুন ইসলামে বিধিবদ্ধ ছিল, আজ দেড় হাজার বছর পরও সে সকল কানূনই বহাল আছে এবং ভবিষ্যতেও বলবৎ থাকবে। এর মধ্যে কোন রকমের পরিবর্তন বা পরিবর্ধনের চেষ্টা করা, অথবা পরিবর্তনের দাবী তোলা ধর্মদ্রোহীতার শামিল।
সুতরাং ইসলামের ছোট বড় মৌলিক আক্বায়েদ ও আহকাম প্রত্যেক মুসলমানের জন্য মেনে নেয়া ফরয। এর কোন একটাকে অস্বীকার করলে বা তুচ্ছ জ্ঞান করলে অথবা কোন বিষয় নিয়ে বিদ্রুপ-উপহাস করলে ইসলামের গন্ডি থেকে বের হয়ে যাবে। সূত্র: ফাতাওয়া শামী ৪/২২২, ফাতাওয়া দারুল উলূম ১২/৩৫৫
মনে রাখতে হবে, কোন মুসলমান যদি ধর্মীয় হুকুম-আহকাম ও আচার-অনুষ্ঠান পালন না করে, কিন্তু সে কোন ধর্মীয় বিধি-বিধানকে অস্বীকার বা কটাক্ষও করে না, তাহলে সে ফাসেক (অপরাধী ও গুণাহগার) বলে গণ্য হবে। ফলে, এ অবস্থায় যদি সে মারা যায়, তাহলে নিয়ম মাফিক তার জানাযা পড়তে হবে। তবে বিশিষ্ট আলেম-উলামা ও নেতৃস্থানীয় ব্যক্তিবর্গের তাতে অংশ গ্রহণ না করা উচিৎ। যাতে করে এ ধরণের মানুষের কিছুটা বোধদায় হয় এবং এর থেকে শিক্ষা গ্রহণ করে স্বীয় অবস্থা থেকে ফিরে আসে। সূত্র: ইমদাদুল আহকাম ১/১৩১, ফাতাওয়া দারুল উলূম ৫/৩৪৯
পক্ষান্তরে, ইসলামে ধর্মদ্রোহীর পরিণতি অত্যন্ত ভয়াবহ। সে বিষয়ে জানার পূর্বে ধর্মদ্রোহী বা মুরতাদ (ধর্মত্যাগী) এর পরিচয় বিস্তারিত জানা প্রয়োজন।
মুরতাদের সজ্ঞা: যদি মুসলমান নামধারী কেউ ইসলামের মৌলিক আক্বীদা-বিশ্বাস যথা: কবর, হাশর, মীযান, পুলসিরাত, বেহেশত, দোযখ, পুনরুত্থান, নামায, রোযা, হজ্ব, যাকাত প্রভৃতির কোন একটি অস্বীকার বা অবিশ্বাস করে, তাহলে সে মুরতাদ (ধর্মত্যাগী) বলে গণ্য হবে। সূত্র: ফাতাওয়া তাতারখানিয়াহ ৫/৫০০
উল্লেখ্য, মু'মিন হওয়ার জন্য সকল আক্বীদায় বিশ্বাসী হওয়া জরুরী। কিন্তু কাফের বা মুরতাদ হওয়ার জন্য সবগুলি অস্বীকার করা জরুরী নয়; বরং জরুরী আক্বীদা-বিশ্বাস সমূহের কোন একটিকে অবিশ্বাস করলেই মুরতাদ হয়ে যাবে।
নিম্নে এর কয়েকটি উদাহরণ পেশ করা হচ্ছে: কেউ আল্লাহ তা'আলা সম্বন্ধে কটূক্তি করলে কিংবা তাঁর কোন বিধি-বিধান নিয়ে সমালোচনা কলে সে মুরতাদ। সূত্র: ফাতাওয়ায়ে তাতারখানিয়াহ ১০/১০৭
কেউ ইসলাম ধর্ম সম্বন্ধে কটূক্তি করলে, কিংবা গালি গালাজ করলে বা অশালীন কোন মন্তব্য করলে সে মুরতাদ। সূত্র: ফাতাওয়া মাহমুদিয়া ১০/১০৭
কুরআন পাকের সাথে কেউ বেয়াদবী করলে, বা তার সম্বন্ধে আপত্তি জনক কোন কথা বললে সে মুরতাদ। সূত্র: ফাতাওয়া দারুল উলূম ১২/৩৬৩
নারী জাতির পর্দা ব্যবস্থাকে কেউ কটাক্ষ করলে এবং এ সম্বন্ধে বর্ণিত কুরআন-হাদীসের আহকাম অস্বীকার করলে সেও মুরতাদ। সূত্র: ফাতাওয়া দারুল উলূম ১২/৩৩৯
অতএব, ধর্মদ্রোহীর ব্যাপারে শরীয়তের ফয়সালা হলো, (১) রাষ্ট্রীয়ভাবে তাকে বন্দী করা হবে এবং প্রকাশ্য তওবার জন্য বাধ্য করা হবে। আর তাওবা করতে অস্বীকার করলে তাকে ফাঁসীতে ঝুলানো হবে।
(২) তওবার পূর্ব পর্যন্ত পরিবার-পরিজন, আত্মীয়-স্বজন, বন্ধু-বান্ধব ও অন্যান্য মুসলমানের জন্য তার সাথে সম্পর্ক রাখা, উঠা-বসা করা, কথা-বার্তা বলা, লেনদেন করা জায়েয হবে না; বরং হারাম হবে। এছাড়াও, সে মহিলা হলে স্বামী থেকে তার বিবাহ বিচ্ছেদ হয়ে যাবে। বিধায়, তখন তাদের উভয়ের দেখা সাক্ষাত, মেলা-মেশা সবই হারাম হবে। সহবাস করলে তা অবৈধ বা যিনা হবে। সন্তান ভূমিষ্ঠ হলে সে হারামযাদা বা জারজ সন্তান বলে গণ্য হবে। সূত্র: আদ দুররুল মুখতার ৩/১৯৩
(৩) সে মৃত্যু বরণ করলে তার জানাযা পড়া হারাম হবে। সূত্র: ফাতাওয়া দারুল উলূম ৫/২৯
(৪) আত্মীয় স্বজন কর্তৃক তার জানাযার ব্যবস্থা করাও হারাম হবে। সূত্র: ফাতাওয়া দারুল উলূম ৫/২৯০
(৫) মুসলমানদের কবরস্থানে তাকে মাটি দেয়া যাবেনা; বরং কোন গর্তের মধ্যে ফেলে তাকে মাটি চাপা দিতে হবে। সূত্র: আদ্দুররুল মুখতার ২/২৩০, ফাতাওয়া দারুল উলূম ৫/২৯১
এগুলো হলো, তার দুনিয়াবী বিধি-বিধান। আর পরকালীন ভয়াবহ শাস্তি যে কত কঠিন হবে তা বলারই অপেক্ষা রাখে না।
📄 প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সম্পর্কে কটূক্তি করা
প্রিয়নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম সম্পর্কে যদি কেউ কটূক্তি করে কিংবা অবমাননাকর কোন কথা বলে তাহলে তার ঈমান চলে যাবে এবং বিবাহিত হলে তার বিবাহ বন্ধন ছিন্ন হয়ে যাবে। কাজেই, তখন তার নতুন করে কালিমা পড়ে তাওবা করতে হবে এবং বিবাহিত হলে বিবাহ দোহরিয়ে নিতে হবে। এছাড়া, স্থানীয় ভাবে চেয়ারম্যান, মেম্বার, মাতব্বর ও গণ্যমান্য ব্যক্তিবর্গ মিলে জন সম্মুখে তাকে দৃষ্টান্তমূলক শাস্তি দিতে পারবে।
সূত্র: আদ্দুররুল মুখতার ৪/২৩১, ফাতাওয়া দারুল উলূম ১২/৩৬২, ফাতাওয়া মাহমুদিয়া ১৪/৫৩
📄 সাহাবায়ে কেরামের রা. সমালোচনা করা
সাহাবাগণের রা. প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করা, তাদের দোষ চর্চা করা বড় ধরণের গুনাহ এবং ইসলামী আকীদা পরিপন্থী। এর দ্বারা ঈমান ক্ষতিগ্রস্ত হয়ে যায়। স্বয়ং আল্লাহ তা'আলা সকল সাহাবাগণের রা. বেহেশতী হওয়ার সুসংবাদ দিয়েছেন এবং নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম তাদের সমালোচনা করতে কঠোর ভাষায় নিষেধ করেছেন। এমনকি তিনি বলেছেন, যাদের অন্তরে আমার প্রতি বিদ্বেষ আছে, তারাই কেবল আমার সাহাবাদের দোষচর্চা করতে পারে।
বলা বাহুল্য, সাহাবাগণ মাসুম বা এমন নিষ্পাপ নন যে, তাদের দ্বারা কোন গুনাহই সংঘঠিত হতে পারবেনা; বরং তাদের দ্বারা কখনো কোন ত্রুটি বা গুনাহ হতে পারে। অবশ্য, তদের থেকে কখনো কোন গুনাহ হয়ে গেলে তারা কাল বিলম্ব না করে তৎক্ষণাত তাওবা করে নিজেদেরকে গুনাহ থেকে পাক সাফ করে নিয়েছেন।
দ্বীনের জন্য তাঁরা এত বড় বড় ও যবরদস্ত কুরবানী পেশ করেছেন যা অন্য কারো দ্বারা সম্ভব হয় নাই। কিয়ামত পর্যন্ত সম্ভব হবেও না। এ কারণে তাদের ভুল-ত্রুটি নিয়ে সমালোচনা করা উম্মতের জন্য হারাম। পক্ষান্তরে, তাদের ব্যাপারে ভাল আলোচনা করা ঈমানের অঙ্গ। সাহাবাগণ মাসুম নন সত্য, তবে তারা মাগফুর তথা ক্ষমাপ্রাপ্ত ও হকের মাপকাঠি। “আকীকাদাতু তাহাবী” নামক কিতাবে বর্ণিত আছে, সাহাবাগণের প্রতি মহাব্বত রাখা দ্বীন-ঈমান ও ইহসান। তাদের প্রতি বিদ্বেষ রাখা কুফরী, মুনাফিকী ও সীমালঙ্ঘণের শামিল।
উল্লেখিত আলোচনা দ্বারা দিবালোকের ন্যায় স্পষ্ট হলো যে, সাহাবাগণের রা. দোষচর্চা ও সমালোচনা করা শরীয়তে নিষিদ্ধ।
সূত্র: সূরা তওবা আয়াত-১০০, সূরা মুহাম্মদ আয়াত-২৬ মুসলিম শরীফ হাদীস নং ৪৬২, আকীদাতুত তহাবী পৃ: ১৪০
📄 আলেম উলামাকে গালি দেওয়া বা অবজ্ঞা করা
কোন সাধারণ মুসলমানকেও গালি দেয়া, তুচ্ছ তাচ্ছিল্য ও অপমান করা নাজায়েয ও কবীরা গুনাহ। আর আলেমকে গালি দেয়া আরও ভয়াবহ অন্যায় ও কবীরা গুনাহ।
সুতরাং কোন আলেমদেরকে আলেম হওয়ার কারণে এবং দ্বীনী ইলম তথা কুরআন সুন্নাহ ও শরীয়তের ধারক বাহক হওয়ার কারণে তাদের প্রতি বিদ্বেষ পোষণ করলে অথবা তাদেরকে তুচ্ছ তাচ্ছিল্য করার উদ্দেশ্যে গালিগালাজ করলে বা অপমান অপদস্ত করলে সে কাফের হয়ে যাবে।
ফলে, কালেমা পড়ে নতুন করে মুসলমান হতে হবে। আর বিবাহিত হলে বিবাহ দোহরিয়ে নিতে হবে।
যদি সে মুসলমান হতে অস্বীকার করে তাহলে তাকে দেশান্তরের শাস্তি দেয়া যাবে।
আর যোক্তিক কোন কারণ ব্যতীত দুনিয়াবী উদ্দেশ্যে যেমন: ব্যক্তিগত শত্রুতা ইত্যাদির কারণে কোন আলেমকে গালিগালাজ, তুচ্ছতাচ্ছিল্য বা অপমান করলে সে ফাসেক হয়ে যাবে এবং ভবিষ্যতে তার ব্যাপারে কুফরীর আশংকাও রয়েছে।
এক্ষেত্রেও তার কর্তব্য হলো, ইস্তেগফার করা এবং অন্তর থেকে আলেম বিদ্বেষ দূর করে তাদেরকে ওয়ারিশে নবী হিসাবে সম্মান ও ইহতেরাম করা।
সূত্র: বোখারী শরীফ ১/১২, মুসলিম শরীফ ১/৫৮, রদ্দুল মোহতার ৬/৩৫৮, ফাতাওয়া হিন্দিয়া ২/২৭, ইমদাদুল ফাতাওয়া ৫৩৯৯, ফাতাওয়া উসমানী ১/৮৪, আহসানুল ফাতাওয়া ১/৩৮, কিফায়েতুল মুফতী ১/৫৪