📘 সলাত পরিত্যাগকারির বিধান > 📄 সলাত পরিত্যাগ বা অন্য কোন ভাবে ধর্ম পরিত্যাগ করলে যে সমস্ত বিধান প্রযোজ্য হয় সেই প্রসঙ্গে

📄 সলাত পরিত্যাগ বা অন্য কোন ভাবে ধর্ম পরিত্যাগ করলে যে সমস্ত বিধান প্রযোজ্য হয় সেই প্রসঙ্গে


ধর্মত্যাগীর প্রতি কিছু ইহলৌকিক ও কিছু পারলৌকিক বিধান প্রযোজ্য হয়।

প্রথমতঃ ইহলৌকিক বিধানসমূহঃ
১। তার মালিকানা ক্ষুণ্ণ হয় : যে সমস্ত ব্যাপারে ইসলাম মালিক/অভিভাবক বা অভিভাবকত্ব থাকার শর্ত করেছে সে সমস্ত ব্যাপারে তাকে মালিক বানানো যাবে না। অতএব নিজের সন্তান বা অন্য কারো সে অভিভাবকত্ব করতে পারবে না। অনুরূপভাবে স্বীয় কন্যা বা অন্য কোন কন্যার ওয়ালী হয়ে বিবাহ দিতে পারবে না।

আমাদের ফাক্বীহঙ্গণ তাদের সংক্ষিপ্ত ও বিস্তারিত সকল পুস্তকে উল্লেখ করেছেন যে, কোন মুসলিম নারীর বিবাহের জন্য ওয়ালীকে মুসলিম হওয়া শর্ত। তাঁরা বলেছেন যে, কোন কাফির কোন মুসলমি নারীর ওয়ালী হতে পারবে না।
ইবনু আব্বাস (রাঃ) বলেছেন, সঠিক বুদ্ধি সম্পন্ন ওয়ালী ব্যতীত বিবাহ হবে না। আর সবচেয়ে বড় সঠিকতা হলো ইসলাম ধর্ম মানা এবং সবচেয়ে জঘন্য নিবুদ্ধিতা ও বোকামী হলো কাফির ও ধর্মত্যাগী হওয়া। আল্লাহ তা'আলা বলেছেনঃ
وَمَنْ يَرْغَبُ عَنْ مِلَّةِ إِبْرَاهِيمَ إِلَّا مَنْ سَفِهَ نَفْسَهُ
ইবরাহীম নাবীর ধর্ম থেকে ঐ ব্যক্তিই বিমুখ হবে যে নিতান্ত বোকা। (সূরা আল-বাকারাহ ১৩০)

২। আত্মীয়-স্বজনের ওয়ারিশ (উত্তরাধিকারী) হওয়ার অধিকার খর্ব হবে। কেননা, একজন কাফির একজন মুসলিমের উত্তরাধিকারী হতে পারবে না এবং একজন মুসলিমও একজন কাফিরের উত্তরাধিকারী হতে পারবে না। কারণ উসামাহ্ বিন যায়েদের বর্ণিত হাদীসে এসেছেঃ
أن النبي صلى الله عليه وسلم قال : «لا يرث المسلم الكافر ولا الكافر المسلم». أخرجه البخاري ومسلم وغيرهما .
নাবী সورية এরশাদ করেছেন যে, একজন কাফির একজন মুসলিমের উত্তরাধিকারী হতে পারবে না এবং একজন মুসলিমও একজন কাফিরের উত্তরাধিকারী হতে পারবে না। হাদীসটি ইমাম বুখারী, মুসলিম ও অন্যান্যগণ বর্ণনা করেছে।

৩। তার জন্য মক্কা এবং তার হারাম কৃত সীমারেখায় প্রবেশ করা হারাম। যেহেতু আল্লাহ তা'আলা বলেছেন:
يَأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِنَّمَا المُشْرِكُونَ نَجَسٌ فَلَا يَقْرَبُوا المَسْجِدَ الْحَرَامَ بَعْدَ عَامِهِمْ هَذَا )
হে মু'মিনগণ! মুশরিকরা অপবিত্র, সুতরাং তারা যেন এ বছর পর মাসজিদুল হারামের নিকটবর্তী না হয়। (সূরা আত-তাওবাহ ২৮)

৪। তার জবেহকৃত পশুর গোশত ভক্ষণ হারাম। কেননা, জবাই করার জন্য শর্ত হলো জবেহকারীকে মুসলিম কিংবা ইয়াহুদ কিংবা নাসারা হতে হবে। পক্ষান্তরে ধর্মত্যাগী, প্রতিমা পূজারী, অগ্নি পূজারী ও এদের সাদৃশ কারো জবেহকৃত পশু হালাল নয়।
খাযিন তার তাফসীর গ্রন্থে বলেছেনঃ
قال الخازن في تفسيره : «أجمعوا على تحريم ذبائح المجوس وسائر أهل الشرك من مشركي العرب وعبدة الأصنام ومن لا كتاب له».
বিদ্বানগণ ঐকমত্য পোষণ করেছেন যে, অগ্নি পূজারী, শির্কপন্থী, আরবের মুশরিক, প্রতিমা পূজারী ও কিতাবহীনদের জবেহকৃত পশু হারাম।

قال الإمام أحمد : «لا أعلم أحداً قال بخلافه إلا أن يكون صاحب بدعة».
ইমাম আহমাদ বিন হাম্বল (রহঃ) বলেছেন যে, কোন বিদআতী ছাড়া কেউ উক্ত মতের বিরুদ্ধে উক্তি করেছে বলে আমি জানি না।

৫। মৃত্যুর পর তার উপর জানাযা পড়া এবং তার জন্য ক্ষমা ও রহমতের দু'আ করা হারাম।
কেননা, আল্লাহ তা'আলা বলেছেন:
وَلَا تُصَلِّ عَلَى أَحَدٍ مِّنْهُمْ مَّاتَ أَبَدًا وَلَا تَقُمْ عَلَى قَبْرِهِ ، إِنَّهُمْ كَفَرُوا بِاللَّهِ وَرَسُولِهِ وَمَاتُوا وَهُمْ فَسِقُونَ ﴾
খবরদার! তাদের কেউ মারা গেলে তার উপর সলাত পড়বে না এবং তার কবরের নিকট দাঁড়াবেও না। নিশ্চয় তারা আল্লাহ ও তাঁর রাসূল -এর সাথে কুফরী করেছে এবং ফাসিক অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেছে। (সূরা আত-তাওবাহ ৮৪)
আল্লাহ তা'আলা আরো বলেছেনঃ
مَا كَانَ لِلنَّبِيِّ وَالَّذِينَ آمَنُوا أَن يَسْتَغْفِرُوا لِلْمُشْرِكِينَ وَلَوْ كَانُوا أُولِي قُرْبَى مِنْ بَعْدِ مَا تَبَيَّنَ لَهُمْ أَنَّهُمْ أَصْحَبُ الجَحِيمِ - وَمَا كَانَ اسْتِغْ فَارُ إِبْرَاهِيمَ لَأَبِيهِ إِلَّا عَنْ مَّوْعِدَةٍ وَعَدَهَا إِيَّاهُ جِ فَلَمَّا تَبَيَّنَ لَهُ أَنَّهُ عَدُ للهِ تَبَرَّأَ مِنْهُ ، إِنَّ أَبْرَهِيمَ لَأَوَّاهُ حَلِيمٌ ﴾
নাবী এবং যারা ঈমান এনেছে তাদের পক্ষে মুশরিকদের জাহান্নামী হওয়া স্পষ্ট হওয়ার পরও তাদের জন্য ক্ষমা ভিক্ষা করা আদৌ উচিত নয়। যদিও তারা তাদের নিকটাত্মীয়ই হোক না কেন? এবং ইবরাহীম (আঃ)-এর তার পিতার জন্য ক্ষমা ভিক্ষা করাটা তার সঙ্গে কৃত ওয়াদা রক্ষা ছাড়া আর কিছু নয়। তবুও যখন তার নিকট স্পষ্ট হয়ে গেল যে, সে আল্লাহর শত্রু তখনই তার থেকে বিমুখ হয়ে গিয়েছেন। নিশ্চয় ইবরাহীম (আঃ) অধিক ধৈর্যশীল ও অধিক প্রত্যাবর্তনকারী। (সুরা আত-তাওবাহ ১১৩-১১৪)

যে ব্যক্তি কাফির অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেছে- তার কুফরী যে কারণেই হোক, তার জন্য কোন ব্যক্তির রহমত ও মাগফিরাতের দু'আ করা মানেই দু'আর ব্যাপারে বাড়াবাড়ি করা ও আল্লাহর সঙ্গে একপ্রকার মশকারী করা এবং আল্লাহর নাবী ও মু'মিনগণের পথ থেকে বিচ্যুত হওয়া।

কি করে শোভা পায় ঐ ব্যক্তির জন্য যে আল্লাহ এবং পরকালের প্রতি বিশ্বাস স্থাপন করেছে, এমন ব্যক্তির জন্য ক্ষমা ও রহমতের দু'আ করা যে কাফির অবস্থায় মৃত্যুবরণ করেছে? সে তো আল্লাহর শত্রু। যেমন আল্লাহ তা'আলা এরশাদ করেছেনঃ
مَنْ كَانَ عَدُوًّا لِلَّهِ وَمَائِكَتِهِ وَرُسُلِهِ وَجِبْرِيلَ وَ مِنْكُلَ فَإِنَّ اللهَ عَدُوٌّ لِلْكَفِرِينَ )
যে ব্যক্তি আল্লাহ, ফেরেশতামণ্ডলী, রাসূলগণ এবং জিবরাঈল ও মিকাঈলের সঙ্গে শত্রুতা পোষণ করবে (সে কাফির) এবং নিশ্চয় আল্লাহর কাফিরদের শত্রু। (সুরা আল-বাকারাহ ৯৮)

মু'মিনের জন্য প্রত্যেক কাফিরের সাথে সম্পর্ক ছিন্ন করা অপরিহার্য কর্তব্য। কেননা, আল্লাহ তা'আলা বলেছেন:
وَإِذْ قَالَ إِبْرَاهِيمُ لَأَبِيهِ وَقَوْمِهِ إِنَّنِي بَرَاء مِمَّا تَعْبُدُونَ - الا الَّذِي فَطَرَنِي فَإِنَّهُ سَيَهْدِينَ ﴾
স্মরণ করো, যখন ইবরাহীম ঘোষণা দিল তার পিতা ও স্বগোত্রকে এ বলে যে, তোমরা যার উপাসনা কর তার থেকে আমি মুক্ত। কিন্তু ঐ সত্ত্বা থেকে নয়, যিনি আমাকে সৃষ্টি করেছেন। নিশ্চয় তিনি আমাকে সঠিত পথপ্রদর্শন করবেন। (সূরা যুফ ২৬-২৭)

আল্লাহ আরো বলেছেন:
قَد كَانَت لَكُم أَسْوَةٌ حَسَنَةٌ فِي إِبْرَاهِيمَ وَالَّذِينَ مَعَهُ ، إِذْ قَالُوا لِقَوْمِهِمْ إِنَّا بُرَءُوا مِنْكُمْ وَمِمَّا تَعْبُدُونَ مِنْ دُونِ اللَّهِ : كَفَرْنَا بِكُم وَبَدَا بَيْنَنَا وَبَيْنَكُمُ الْعَدَاوَةُ وَالبَغْضَاءُ أَبَدًا حَتَّى تُؤْمِنُوا بِاللَّهِ وحده
তোমাদের জন্য ইবরাহীম ও তার সহচরবৃন্দের মাঝে উত্তম আদর্শ নিহিত রয়েছে। কেননা, তারা স্বগোত্রকে এ বলে ঘোষণা দিয়েছিল যে, আমরা তোমাদের থেকে ও আল্লাহ ব্যতীত তোমরা যার উপাসনা করে থাকো তার থেকে একেবারে মুক্ত এবং তোমাদেরকে অস্বীকার করি এবং এক আল্লাহর প্রতি বিশ্বাস স্থাপন না করা পর্যন্ত আমাদের ও তোমাদের মাঝে শত্রুতা ও বিদ্বেষের সূচনা হল। (সুরা মুমতাহিনা ৪)

ঈমানের সবচেয়ে মজবুত কজা হলো আল্লাহর ওয়াস্তে ভালবাসা, আল্লাহর ওয়াস্তে ঘৃণা করা, আল্লাহর ওয়াস্তে বন্ধুত্ব স্থাপন করা, আল্লাহর ওয়াস্তে শত্রুতা করা, যাতে তোমার ভালবাসা, ঘৃণা করা, বন্ধুত্ব করা, শত্রুতা করা, আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনার্থে হয়।

৬। তার জন্য মুসলিমাহ্ মহিলা বিবাহ করা হারাম। কেননা, সে তো কাফির এবং কাফিরের জন্য মুসলমান নারী বিবাহ করা হালাল নয়, এটাই দলীল প্রমাণ ও ইজমা দ্বারা সাব্যস্ত।
আল্লাহ তা'আলা বলেছেন:
يأَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا إِذَا جَاءَكُمُ المُؤْمِنَتُ مُهْجِرَتِ فَامْتَحِنُوهُنَّ وَ اللَّهُ أَعْلَمُ بِإِيْمَانِهِنَّ ، فَإِنْ عَلِمْتُمُوهُنَّ مُؤْمِنَتٍ فَلَا تَرْجِعُوهُنَّ إِلَى الْكُفَّارِ لا هُنَّ حِلَّ لَّهُمْ وَلَا هُمْ يَحِلُّونَ لَهُنَّ )
হে মু'মিনগণ! যখন তোমাদের নিকট মু'মিনা মহিলারা হিজরত করে আসে তখন তাদেরকে পরীক্ষা কর, আল্লাহ অধিক জ্ঞাত তাদের ঈমান সম্পর্কে। (পরীক্ষার মাধ্যমে) যদি জানতে পারো যে, তারা মু'মিনা; তাহলে খবরদার তাদেরকে আর কাফিরদের নিকট ফিরিয়ে দিওনা। কেননা, তারা তাদের জন্য হালাল নয় এবং ওরাও এদের জন্য হালাল নয়। (সুরা মুমতাহিনা ১০)

মুগনী গ্রন্থের ৬ষ্ঠ খণ্ডের ৫৯২ পৃষ্ঠায় গ্রন্থকার বলেছেন যে, সমস্ত বিদ্বান মহলের ঐকমত্যানুসারে আহলে কিতাব (ইয়াহুদ নাসারা) ব্যতীত যত কাফির রয়েছে তাদের নারী এবং জবেহকৃত পশুর গোশত হারাম। আরো বলেছেন যে, ধর্মত্যাগী নারীকে বিবাহ করা হারাম। সে যেই ধর্মেই থেকে থাকুক। কেননা, তার স্বীকৃতি দানের ফলেই- যে ধর্মে ধর্মান্তরিত হয়েছে সেই ধর্মের বিধান তার জন্য সাব্যস্ত হবে না। সুতরাং তাকে হালাল জানা ঠিক নয়।

এবং অষ্টম খণ্ডের ১৩০ পৃষ্ঠায় মুরতাদ (ধর্মত্যাগীদের) বর্ণনার অধ্যায়ে বলেছেন, যদিও সে বিয়ে করে ফেলে, তবে তার বিবাহ শুদ্ধ হবে না। কেননা, বিবাহের উপর বহাল রাখাখাবে না, আর যে বিষয় বিবাহের উপর বহাল রাখা রোধ করে সে তার সংঘটনকেও রোধ করবে। ব্যাপারটি ঠিক কোন কাফিরের মুসলিম নারীকে বিবাহ করার ন্যায়।

প্রিয় পাঠক, আপনি দেখতেই পেলেন যে, গ্রন্থকার ধর্মত্যাগকারীকে বিবাহ করা অবৈধ ঘোষণা দিলেন এবং ধর্মত্যাগীর জন্যও (মুসলিম নারী) বিবাহ করা ঠিক নয়। তাহলে কোন্টি হবে যদি ধর্মত্যাগের ব্যাপারটি ঘটে বিবাহ বন্ধন সম্পাদনের পর?

মুগনী গ্রন্থের ৬ষ্ঠ খণ্ডের ২৯৮ পৃষ্ঠায় গ্রন্থকার বলেছেন যে, যদি মিলনের পূর্বে স্বামী-স্ত্রীর মধ্যে কোন একজন মুরতাদ (ধর্মত্যাগী) হয়ে যায় তাহলে তৎক্ষণাৎই বিবাহ বিচ্ছেদ হয়ে যাবে এবং কেউ কারো ওয়ারিশ (উত্তরাধিকারী) হতে পারবে না। কিন্তু যদি মিলনের পর মুরতাদ হয় তাহলে এ ব্যাপারে, দু'টি বর্ণনা এসেছে।

একটি হলো- তৎক্ষণাৎই বিবাহ বিচ্ছেদ হয়ে যাবে।
দ্বিতীয়টি হলো- ইদ্দত্ পূর্ণ হওয়া পর্যন্ত বন্ধন বিদ্যমান থাকবে।

মুগনী গ্রন্থের ৬ষ্ঠ খণ্ডের ৬৩৯ পৃষ্ঠায় উল্লেখ রয়েছে যে, অধিকাংশ বিদ্বানের মতে, মিলনের পূর্বে ধর্মত্যাগী হলে বিবাহ বিচ্ছেদ হয়ে যাবে এবং এই মতের স্বপক্ষে দলীলও দেয়া হয়েছে।

ইমাম মালিক ও আবূ হানীফা (রহঃ)-এর মতানুসারে মিলনের পরেও তৎক্ষণাৎ বিবাহ বিচ্ছেদ হয়ে যাবে। ইমাম শাফিয়ী (রহঃ)-এর মতে ইদ্দত শেষ হওয়া পর্যন্ত বন্ধন অবশিষ্ট থাকবে।

উক্ত মতামত অনুসারে বুঝা যায় যে, ইমাম চতুষ্টয়ের ঐকমত্যে স্বামী-স্ত্রীর কোন একজন ধর্মত্যাগী হলে বিবাহ বিচ্ছেদ হয়ে যায়। তবে মিলনের পূর্বে হলে তৎক্ষণাৎই বিচ্ছেদ হবে এবং মিলনের পর হলে ইমাম আবূ হানিফা ও ইমাম মালিক (রহঃ)-এর নিকট তৎক্ষণাৎই বিচ্ছেদ হয়ে যাবে। ইমাম শাফিয়ী (রহঃ)-এর নিকট ইদ্দতের পর বিচ্ছেদ হবে। ইমাম আহমাদ (রহঃ)-এর নিকট থেকে দু'রকমেরই বর্ণনা এসেছে।

৬ষ্ঠ খণ্ডের ৬৪০ পৃষ্ঠায় এরূপ এসেছে যে, যদি স্বামী-স্ত্রী উভয়ে এক সঙ্গে ধর্মত্যাগী হয় তবে তাদের হুকুম হলো, যে কোন একজন ধর্মত্যাগী হওয়ার মতই। যদি মিলনের পূর্বে হয় তাহলে তৎক্ষণাৎই বিবাহ বিচ্ছেদ হয়ে যাবে কিন্তু যদি মিলনের পর হয় তাহলে তৎক্ষণাৎ বিচ্ছেদ হবে না; ইদ্দত শেষ হলে হবে। এক্ষেত্রেও উক্ত বর্ণনা দু'টি প্রণিধানযোগ্য। আর এটাই ইমাম শাফিয়ী (রহঃ)-এর মত।

ইমাম আবূ হানীফা (রহঃ) বলেছেন যে, যেহেতু তারা ভিন্নধর্মী হয়নি তাই এক সঙ্গে ইসলাম গ্রহণ করার অবস্থার সাথে তুলনা করে তাদের বিবাহ বিচ্ছেদ না হওয়াই শ্রেয়। কিন্তু মুগনী গ্রন্থের গ্রন্থকার এ কিয়াসকে সম্পূর্ণভাবে ভেঙ্গে ফেলেছেন।

সুতরাং যখন স্পষ্ট হয়ে গেল যে, ধর্মত্যাগী নারী হোক বা পুরুষ হোক কোন মুসলমানের সাথে তার বিবাহ ঠিক নয়। কুরআন-হাদীসের নির্দেশ এবং অধিকাংশ সাহাবায়ে কিরামের উক্তি অনুসারে সলাত পরিত্যাগকারী কাফির।

সুতরাং এটা স্পষ্ট কথা যে, যে ব্যক্তি সলাত পড়ে না অথচ মুসলমান নারী বিবাহ করেছে, নিঃসন্দেহে তার বিবাহ অশুদ্ধ এবং এ বিবাহ বন্ধনে তার জন্য সেই স্ত্রী বৈধ নয়। যদি সে তাওবাহ করতঃ আবার ইসলামে প্রত্যাবর্তন করে তবে অবশ্যই তাকে নতুন করে সেই স্ত্রীকে বিবাহ করতে হবে এবং অনুরূপ বিধান প্রযোজ্য হবে নারীর ক্ষেত্রে যদি সে সলাত না পড়ে।

এ মাসআলাটি কাফিরদের কুফর অবস্থায় বিবাহের চেয়ে ভিন্ন রূপ। যেমন- কোন কাফির পুরুষ কাফির মহিলাকে বিবাহ করল, অতঃপর স্ত্রী ইসলাম গ্রহণ করল। যদি তার ইসলাম গ্রহণ মিলনের পূর্বে হয় তাহলে বিবাহ বিচ্ছেদ হয়ে যাবে। কিন্তু যদি তার ইসলাম গ্রহণ মিলনের পর হয় তাহলে বিবাহ বিচ্ছেদ হবে না। ইদ্দত পূর্ণ হওয়ার পূর্বেই যদি স্বামী ইসলাম গ্রহণ করে তবে তার স্ত্রী ঠিকই থাকবে। কিন্তু যদি ইদ্দত পূর্ণ হওয়ার পর ইসলাম গ্রহণ করে তবে সেই স্ত্রীর প্রতি তার কোন অধিকার থাকবে না। কারণ ইসলাম আনার পর থেকেই তো বিবাহ বিচ্ছেদ স্পষ্ট হয়ে গিয়েছিল।
নাবী سرة -এর যুগে কাফিররা স্বস্ত্রী ইসলাম গ্রহণ করত এবং নাবী তাদেরকে তাদের বিবাহের উপর স্থির রেখে দিতেন। কিন্তু হারামের কারণ বিদ্যমান পাওয়া গেলে পৃথক করে দিতেন। যেমন অগ্নিপূজক স্বামী-স্ত্রী তাদের মাঝে (ইসলামের নিয়মানুসারে) বিবাহ অবৈধ হওয়ার সম্পর্ক রয়েছে, তাহলে ইসলাম গ্রহণ করলে অবশ্যই দু'জনের মাঝে পৃথক করতে হবে।

উক্ত মাসআলাটি ঐ মুসলিমের মাসআলার মত নয়, যে ব্যক্তি সলাত পরিত্যাগ করার মাধ্যমে কাফির হয়েছে। অতঃপর মুসলিম নারীকে বিবাহ করেছে। কেননা, কুরআন-হাদীস ও ইজমায়ে উম্মাত দ্বারা সাব্যস্ত হয়েছে মুসলমান নারী কাফিরের জন্য হালাল নয়, যদিও সে ধর্মত্যাগী কাফির না হয়ে প্রকৃত কাফিরও হয়।

অতএব যদি কোন কাফির মুসলিম নারী বিবাহ করে তবে তার বিবাহ বাতিল বলে গণ্য হবে এবং তাদের মাঝে পৃথক করা আবশ্যক এবং যদি ইসলাম গ্রহণ করে সেই স্ত্রীকে পেতে চায় তাহলে নতুন আকুদ্‌ ব্যতীত সেটা সম্ভব হবে না।

৭। সলাত পরিত্যাগকারী কর্তৃক মুসলিম মহিলার গর্ভধারিত সন্তানদের হুকুমঃ
সর্বাবস্থায় সন্তান মায়ের বলে গণ্য হবে। কিন্তু যাদের নিকট সলাত পরিত্যাগকারী কাফির নয়, তাদের নিকট সন্তান সর্বাবস্থায় বিবাহকারী ব্যক্তির বলে গণ্য হবে। কেননা, তাদের নিকট তার এ বিবাহ শুদ্ধ বলে গণ্য। কিন্তু আমরা প্রথম অধ্যায়ে উল্লিখিত গবেষণা অনুসারে পর্যবেক্ষণ করলে দেখবো- যদি স্বামী এমন হয় যে, তার বিবাহ বাতিল; তাই জানে না বা জানা সত্ত্বেও বিশ্বাস করে না, এক্ষেত্রে সন্তান তারই থাকবে। কেননা, এমতাবস্থায় তার বিশ্বাস অনুপাতে তার মিলন বৈধ। তার এ মিলনকে সংশয় বিজড়িত মিলনের ভিতর গণ্য করে তার সাথে বংশধর সম্পৃক্ত করা যাবে।

কিন্তু যদি জেনে থাকে যে, তার বিবাহ বাতিল এবং তা বিশ্বাসও করে তবে সন্তানাদি তার দিকে সম্পৃক্ত করা যাবে না। কেননা, এক্ষেত্রে যাদের দৃষ্টিতে তার মিলন হারাম- তাদের মতে সে সকল সন্তান এমন পানি দ্বারা সৃষ্টি হয়েছে যে পানি তার জন্য হালাল নয় এমন নারীর গর্ভে ঢেলেছে।

দ্বিতীয়তঃ ধর্মত্যাগীর পরকালীন হুকুম:
১। ফেরেশতাগণ তাকে শাসাবে এবং আঘাত করতে থাকবে। তাদের মুখমণ্ডল এবং পশ্চাৎ দেশে প্রহর করবে। আল্লাহ তা'আলা এরশাদ করেছেনঃ.
وَلَو تَرَى إِذْ يَتَوَفَّى الَّذِينَ كَفَرُوا لَا الْمَلَئِكَةُ يَضْرِبُونَ وُجُوهَهُمْ وَأَدْبَارَهُمْ ج وَذُوقُوا عَذَابَ الحَرِيقِ - ذَلِكَ بِمَا قَدَّمَت أيدِيكُمْ وَأَنَّ اللَّهَ لَيْسَ بِظَلَّامٍ لِلْعَبِيدِ )
(ইস্ কি করুণ অবস্থা) যদি তুমি দেখতে যখন ফেরেশতারা কাফেরদের মৃত্যু ঘটায় এবং তাদের মুখমণ্ডল ও পশ্চাৎ দেশে প্রহার করে (এবং বলে) আস্বাদন কর যন্ত্রণাদায়ক শাস্তি। এ হলো সে সবের বিনিময় যা তোমরা তোমাদের পূর্বে পাঠিয়েছ নিজের হাতে। নিশ্চয় আল্লাহ বান্দাদের উপর একটুও অত্যাচার করেন না। (সূরা আনফাল ৫০-৫১)

২। কাফির এবং মুশরিকদের সাথে তার পুনরুত্থান হবে।
আল্লাহ তা'আলা এরশাদ করেছেনঃ
احْشُرُوا الَّذِينَ ظَلَمُوا وَأَزْوَاجَهُمْ وَمَا كَانُوا يَعْبُدُونَ - مِنْ دُونِ اللَّهِ فَاهْدُوهُمْ إِلَى صِرَاطِ الْجَحِيمِ)
(হে ফেরেশতামণ্ডলী আমার) যারা শির্ক করেছে তাদেরকে এবং তাদের সঙ্গী-সাথীদেরকে ও আল্লাহ ব্যতীত তারা যাদের উপাসনা করত তাদেরকে তাড়িয়ে নিয়ে (হাশরের মাঠে) একত্রিত কর এবং দোযখের সোজা পথটি তাদেরকে দেখিয়ে দাও। (সূরা সফফাত ২২-২৩)
أزواج শব্দটি زوج শব্দের বহুবচন এর অর্থঃ প্রকার, ধরণ, মত।
অর্থাৎ যারা শির্ক করেছে তাদেরকে এবং তাদের শ্রেণীভুক্ত সকল শির্কপন্থী এবং কুফ্রপন্থীদেরকে একত্রিত কর।

৩। তারা চিরন্তন জাহান্নামে অবস্থান করবে। কেননা, আল্লাহ তা'আলা এরশাদ করেছেনঃ
إِنَّ اللَّهَ لَعَنَ الكَفِرِينَ وَأَعَدَّلَهُمْ سَعِيراً - خُلِدِينَ فِيهَا أَبَدًا ج لا يَجِدُونَ وَلِيًّا وَلَا نَصِيرًا - يَوْمَ تُقَلَّبُ وُجُوهُهُمْ فِي النَّارِ يَقُولُونَ يُلَيتَنَا أَطَعْنَا اللَّهَ وَأَطَعْنَا الرَّسُولاً
নিশ্চয় কাফিরদের প্রতি আল্লাহ লা'নাত (ভর্ৎসনা) বর্ষণ করেন এবং তাদের জন্য দোযখ প্রস্তুত করে রেখেছেন। তারা চিরদিন তার ভিতরে অবস্থান করবে এবং কোন বন্ধু ও সাহায্যকারী পাবে না। যে দিন তাদের মুখমণ্ডলগুলো জাহান্নামের অভিমুখে করা হবে (সে দিন আফসোস করে) বলবে, ইস্ যদি আল্লাহ এবং রাসূলের অনুসরণ করতাম। (সূরা আহযাব ৬৪-৬৬)

এখান থেকেই আলোচ্য মাসআলাটির উপর বক্তব্য শেষ হলো।
উপসংহারে লিখক বেনামাযীদের উদ্দেশে তার মূল্যবান উপদেশ দিয়েছেন-

যারা তাওবাহ করতে ইচ্ছুক তাদের জন্য তাওবার দরজা এখনো উন্মুক্ত রয়েছে। সুতরাং হে আমার মুসলিম ভাই! অতীতের কর্মকাণ্ডের জন্য অনুতপ্ত হয়ে, পুনরায় এমন না করার অঙ্গীকার করে, আল্লাহর সন্তুষ্টির কাজ করার দৃঢ় সংকল্প করতঃ খালিস অন্তরে আল্লাহর নিকট তাওবাহ করুন। আল্লাহ তো বলেছেনঃ
إِلَّا مَنْ تَابَ وَآمَنَ وَعَمِلَ عَمَلًا صَالِحًا فَأُولَئِكَ يُبَدِّلُ اللهُ سَيِّاتِهِمْ حَسَنَتٍ ، وَكَانَ اللهُ غَفُورًا رَّحِيمًا - وَمَنْ تَابَ وَعَمِلَ صَالِحًا فَإِنَّهُ يَتُوبُ إِلَى اللَّهِ مَتَابًا )
যে ব্যক্তি তাওবাহ করবে এবং ঈমান আনবে ও সৎ কাজ করবে তার পাপরাশিকে আল্লাহ পুণ্যের দ্বারা পরিবর্তন করে দেবেন। নিশ্চয় আল্লাহ অধিক ক্ষমাশীল ও দয়ালু। আর যে তাওবাহ করে ও সৎকাজ করে, প্রকৃতপক্ষে সেই আল্লাহর দিকে প্রত্যাবর্তন করে। (সূরা ফুরক্বান ৭০-৭১)

আল্লাহর নিকট এই প্রার্থনা- তিনি যেন আমাদের সকল কাজ-কর্ম সঠিকভাবে সম্পাদন করা সহজ করে এবং আমাদের সকলকে সরল সঠিক পথপ্রদর্শন করেন। ঐ সকল ব্যক্তিবর্গের পথ যাদেরকে তিনি পুরস্কৃত করেছেন- নাবীগণ, সত্যবাদীগণ, শহীদগণ এবং সৎকর্মশীল বান্দাগণ। ওদের পথ নয়, যারা পথভ্রষ্ট ও ক্রোধভাজন হয়েছে।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00