📘 সলাত পরিত্যাগকারির বিধান > 📄 সলাত পরিত্যাগকারীর বিধান

📄 সলাত পরিত্যাগকারীর বিধান


এই সলাত পরিত্যাগকরীর বিধান সম্পর্কিত মাসআলাটি ইল্মে দীনের মাসআলাসমূহের মধ্যে একটি বড় ধরনের (গুরুত্বপূর্ণ) মাসআলা। পূর্বাপর বিদ্বানগণ এতে মতানৈক্য করেছেন।

ইমাম আহমদ বিন হাম্বাল বলেছেন: সলাত পরিত্যাগকারী কাফির, দ্বীন থেকে বহিষ্কৃত। যদি তাওবাহ করে সলাত না পড়ে তাহলে তাকে হত্যা করা হবে।

ইমাম আবূ হানিফা, মালিক ও শাফিয়ী বলেছেন: সে ফাসিক (পাপাচারী) কিন্তু কাফির নয়।

অতঃপর (শাস্তি নির্ধারণে) মতানৈক্য করেছেন।

ইমাম মালিক ও শাফিয়ী বলেছেন: শাস্তি স্বরূপ তাকে হত্যা করা হবে। ইমাম আবু হানিফা বলেছেন, তাকে শাসাতে হবে, হত্যা করা যাবে না (লিখক বলেন যে, যখন দেখা গেল যে,) এই মাসআলাটি মতভেদযুক্ত মাসআলাসমূহের অন্তর্ভুক্ত তখন উচিত হবে মাসআলাটি কুরআন হাদীসের দিকে প্রত্যাবর্তন করা। কেননা, আল্লাহ বলেছেন,
وَمَا اختَلَفتُمْ فِيْهِ مِنْ شَيْ فَحُكْمُهُ إِلَى اللَّهِ ﴾
তোমরা যে ব্যাপারেই মতভেদ কর তার (চূড়ান্ত) ফয়সালা আল্লাহর নিকট রয়েছে। (সূরা শূরা ১০)
তিনি আরো বলেছেন:
فَإِنْ تَنَازَعْتُمْ فِي شَيْ فَرُدُّوهُ إِلَى اللهِ وَالرَّسُولِ إِنْ كُنْتُمْ تُؤْمِنُونَ بِاللَّهِ وَالْيَوْمِ الْآخِرِ ، ذَلِكَ خَيْرٌ وَأَحْسَنُ تَأْوِيلاً
যদি তোমরা কোন ব্যাপারে মতভেদ কর তাহলে সেটি আল্লাহ ও রাসূলের দিকে প্রত্যাবর্তন কর। যদি তোমরা আল্লাহ ও কিয়ামত দিবসের উপর বিশ্বাস স্থাপন করে থাক। এটাই হলো উত্তম ও উৎকৃষ্ট প্রত্যাবর্তনস্থল। অর্থাৎ আল্লাহ ও কিয়ামত দিবসের প্রতি বিশ্বাসী হলে মতানৈক্য সংঘটিত সকল বিষয়ে সকল ব্যাপারে ফয়সালা কুরআন হাদীস থেকে গ্রহণ করতে হবে। (সূরা আন-নিসা ৫৯)

মতভেদের সময় একমাত্র কুরআন হাদীসের দিকে এজন্য প্রত্যাবর্তন করতে হবে। কেননা, দু'মতভেদকারীর মধ্যে কোন একজনের অপরের বিরুদ্ধে অকাট্য দলীল হতে পারে না। কারণ প্রত্যেকেই মনে করে যে তার কথাই ঠিক। অথচ কারো কথাই গ্রহণের ক্ষেত্রে প্রাধান্য পাওয়ার উপযোগী নয়। তাই সে ব্যাপারে ফয়সালা নিতে হলে অবশ্যই কুরআন ও সুন্নাতের মূলের দিকে প্রত্যাবর্তন করতে হবে। আমরা যদি এই সলাত পরিত্যাগকারীর বিধান সম্পর্কিত মাসআলাটি কুরআন ও হাদীসের দিকে প্রত্যাবর্তন করি তাহলে দেখা যাবে যে, কুরআন হাদীসের নির্দেশ অনুসারে সলাত পরিত্যাগকারী দ্বীন হতে বহিষ্কৃত কাফির।

প্রথমতঃ উক্ত ব্যাপারে কুরআনের দলীল সমূহঃ
فَإِنْ تَابُوا وَأَقَامُوا الصَّلوةَ وَاتَوُ الزَّكَوةَ فَإِخْوَانُكُمْ فِي الدِّينِ
আল্লাহ তা'আলা বলেন, যদি তারা তাওবাহ করে সলাত প্রতিষ্ঠা করে এবং যাকাত আদায় করে তাহলে তারা তোমাদের দীনী ভাই। (সূরা তাওবাহ ১১)
আল্লাহ তাআলা সূরা মারয়ামে বলেন-
فَخَلَفَ مِنْ بَعْدِهِمْ خَلْفٌ أَضَاعُوا الصَّلوةَ وَاتَّبَعُوا الشَّهَوتِ فَسَوفَ يَلْقَوْنَ غَيًا - إِلَّا مَنْ تَابَ وَآمَنَ وَعَمِلَ صَالِحًا فَأُولَئِكَ يَدْخُلُونَ الْجَنَّةَ وَلَا يُظْلَمُونَ شَيْئًا )
অতঃপর ঐ (পুন্যবান) পুরুষগণের পরবর্তীতে এমন (অসৎকর্মশীল) লোকদের উদ্ভব হলো যারা সলাতকে ধ্বংস করে দিল এবং নিজেদের মনোবৃত্তির অনুসরণ করল। অতিসত্বর তারা তাদের পথভ্রষ্টতার ফল ভোগ করবে। কিন্তু যারা তাওবাহ করেছে, ঈমান এনেছে এবং সৎ আমল করেছ তারা নয়। তারা জান্নাতে প্রবেশ করবে আর তারা কিঞ্চিৎ মাত্র অত্যাচারিত হবেনা। (সূরা মারইয়াম ৫৯-৬০)

দ্বিতীয় আয়াত (অর্থাৎ) সূরা মারইয়ামের আয়াতের নির্দেশনা
আল্লাহ তা'আলা সলাত ধ্বংসকারী এবং মনোবৃত্তির অনুসরণকরীদের সম্পর্কে বলেছেন )الاّ مَنْ تَابَ وَأَمَنَ( কিন্তু যে তাওবা করবে এবং ঈমান আনবে। অতএব এ কথাই নির্দেশ করছে যে, তারা সলাত ধ্বংস করার সময় ও মনোবৃত্তির অনুসরণ করার সময় মু'মিন ছিল না এবং প্রথম আয়াত অর্থাৎ সূরা আত-তাওবার নির্দেশনা হলো এই যে, আল্লাহ তা'আলা আমাদের ও মুশরিকদের মাঝে ভ্রাতৃত্ব সাব্যস্ত হওয়ার তিনটি শর্তারোপ করেছেন:
প্রথম শর্ত: তাদেরকে শির্ক থেকে তাওবাহ করতে হবে।
দ্বিতীয় শর্তঃ তাদেরকে সলাত প্রতিষ্ঠা করতে হবে
তৃতীয় শর্তঃ তাদেরকে যাকাত প্রদান করতে হব।

কিন্তু যদি শির্ক থেকে তাওবাহ করে সলাত প্রতিষ্ঠা না করে, যাকাত আদায় না করে তাহলে তারা আমাদের (মুসলমানদের) ভাই নয়। অনুরূপভাবে যদি সলাত প্রতিষ্ঠা করে এবং যাকাত আদায় না করে তবুও তারা আমাদের ভাই নয়। (এই হলো আয়াতের নির্দেশনা)

দ্বীনী ভ্রাতৃত্ব তখনই ক্ষুণ্ণ হয় যখন কোন ব্যক্তি দ্বীন থেকে সম্পূর্ণভাবে বের হয়ে যায়। সে জন্য ফসুকু (ছোট খাটো পাপ) ও কুফ্র দুনা কুফ্ অর্থাৎ ছোটখাটো কুফরীর কারণে ভ্রাতৃত্ব ক্ষুণ্ণ হয় না।
এর জন্য দেখুন হত্যার বদলে হত্যা সম্পর্কিত আয়াতটিতে:
فَمَنْ عُفِى لَهُ مِنْ أَخِيهِ شَيْ فَاتَّبَاعٌ مِ بِالْمَعْرُوفِ وَأَذَاءَ إِلَيْهِ بِإِحْسَانٍ
সে ব্যক্তি (হত্যাকারী ব্যাক্তি) স্বীয় (হত্যাকৃত) ভাই (কর্তৃক রক্তপণ) হতে কিছু ক্ষমাপ্রাপ্ত হয় সে যেন ভালভাবে তার অনুসরণ করে অর্থাৎগ্রহণ করে এবং অবশিষ্ট অংশ সুন্দরভাবে আদায় করে দেয়। (সুরা আল-বাকারাহ ১৭৮)

যদিও কাউকে স্বেচ্ছায় হত্যা করা কবীরা গুনাহসমূহের অর্ন্তভুক্ত তবুও আল্লাহ তা'আলা উক্ত আয়াতে হত্যাকারীর হত্যাকৃতের ভাই বলে আখ্যা দিয়েছেন। (হত্যা করা কবীরা গুনাহ তার দলীল) কেননা আল্লাহ বলেছেনঃ
وَمَنْ يَقْتُلْ مُؤْمِنًا مُتَعَمِّدًا فَجَزَاؤُهُ جَهَنَّمُ خَلِدًا فِيهَا وَغَضِبَ اللهُ عَلَيْهِ وَلَعَنَهُ وَأَعَدَّلَهُ عَذَابًا عَظِيمًا )
যে ব্যক্তি কোন মু'মিনকে ইচ্ছাকৃতভাবে হত্যা করবে। তার শাস্তি চিরন্তন জাহান্নাম এবং তার প্রতি আল্লাহর ক্রোধ ও লা'নত বর্ষণ করবেন এবং তার জন্য ভীষণ কঠিন শাস্তির ব্যবস্থা করে রেখেছেন। (সূরা আন-নিসা ৯৩)

আরো দৃষ্টি দিন পরস্পরে লড়াই বিসংবাদকারী দু'টি মু'মিন দলের ব্যাপারে আল্লাহর বাণীটির দিকে:
وَإِنْ طَائِفَتْنِ مِنَ المُؤْمِنِينَ اقْتَتَلُوا فَأَصْلِحُوا بَيْنَهُمَا ..... إِنَّمَا المُؤْمِنُونَ إِخْوَةٌ فَأَصْلِحُوا بَيْنَ أَخَوَيْكُمْ ﴾
যদি মু'মিনদের দু'টি দল পরস্পরে লড়াই বিসংবাদ করে তাহলে তোমরা তাদের মাঝে মীমাংসা করো ......... নিশ্চয় মু'মিনগণ পরস্পরে ভাই ভাই। অতএব তোমাদের দু' ভায়ের মাঝে (বিসংবাদ হলে) মীমাংসা করো। (সুরা আল-হুজরাত ৯-১০)
আল্লাহ তা'আলা (উক্ত আয়াতদ্বয়ে) মীমাংসাকারী দলটি ও বিসংবাদকারী দল দু'টির মাঝে ভ্রাতৃত্ব সম্পর্ক সাব্যস্ত করেছেন। অথচ (অন্য হাদীসের দ্বারা বুঝা যায় যে,) মু'মিনের সঙ্গে লড়াই করা কুফ্র। যেমন ইমাম বুখারী ও অন্যান্যগণের বর্ণিত সহীহ হাদীসে এসেছে।
عن ابن مسعود رضي الله عنه أن النبى صلى الله عليه وسلم قال : «سباب المسلم فسوق، وقتاله كفر ».
ইবনু মাসউদ হতে বর্ণিত, নবী করীম আলাইহি বলেছেন: মুসলিম ব্যক্তিকে গালি দেয়া পাপ এবং তার সাথে লড়াই করা কুফরী।
কুফরী বলা হয়েছে বটে কিন্তু এ কুফরী ধর্ম হতে বহিষ্কারকারী কুফরী নয়। কেননা, যদি ধর্ম হতে বহিষ্কারকারী কুফরী হতো তাহলে ঈমানী ভ্রাতৃত্ব অবশিষ্ট থাকত না। কারণ কুরআনের আয়াতের নির্দেশ অনুসারে পরস্পরে বিসংবাদ হওয়ার পরেও ঈমানী ভ্রাতৃত্ব অক্ষুণ্ণ থাকার কথা বুঝা যায়।

অতঃএব এবার স্পষ্টভাবে জানা গেল যে সলাت পরিত্যাগ করা ধর্ম হতে বিচ্যুতকারী কুফরী। কারণ যদি সলাত পরিত্যাগ করা ফিসক (বা সাধারণ পাপ) হতো কিংবা ধর্ম হতে বিচ্যুতকারী কুফরী না হতো তাহলে দ্বীনী ভ্রাতৃত্ব ক্ষুণ্ণ হতো না। যেমন মু'মিনকে হত্যা করলে বা তার সঙ্গে লড়াই করলে দ্বীনী ভ্রাতৃত্ব ক্ষুণ্ণ হয় না।

একটি প্রশ্নঃ সূরা তাওবার আয়াতের মর্মানুসারে যাকাত অনাদায়কারীও কি কাফির?
উত্তর: কোন কোন বিদ্বানের মতানুসারে যাকাত অনাদায়কারীও কাফির। ইমাম আহমাদ হতে এ ব্যাপারে দু'টি বর্ণনা এসেছে- একটি বর্ণনা উক্ত মতপন্থী। অগ্রাধিকার যোগ্যমতে সে কাফির নয়। তবে তাকে কঠিন শাস্তি দেয়া হবে। যে শাস্তির কথা আল্লাহ তা'আলা কুরআনে এবং রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহ আলাইহি হাদীসে উল্লেখ করেছেন। যেমন- আবূ হুরাইরার হাদীসে এসেছেঃ
ان النبى صلى الله عليه وسلم ذكـر عـقـوبة مانع الزكاة، وفي اخره، ثم يرى سبيله، إما إلى الجنة وإما إلى النار.
রাসূলুল্লাহ শাল্লাল্লাহ আলাইহি যাকাত অনাদায়কারীর শাস্তির কথা উল্লেখ করে হাদীসের শেষের দিকে বলেছেন। অতঃপর সে তার রাস্তা দেখতে থাকবে জান্নাতের দিকে কিংবা জাহান্নামের দিকে। উক্ত হাদীসটি ইমাম মুসলিম (রহঃ) যাকাত অনাদায়কারীর গুনাহর অধ্যায়ে দীর্ঘতার সাথে বর্ণনা করেছেন।

উক্ত হাদীসটি যাকাত অনাদায়কারী কাফির না হওয়ার প্রমাণ। কারণ যদি সে কাফির হতো জান্নাতের দিকে রাস্তা দেখার কোন সুযোগই পেত না। সুতরাং এ হাদীসের স্পষ্ট শব্দের বর্ণনা সূরা আত-তাওবার আয়াতের উপলব্ধ মর্মের উপর প্রাধান্য পাবে। যেমনটি ফিক্‌হী ব্যাকরণ দ্বারা জানা যায়।

দ্বিতীয়তঃ সুন্নাহ্ বা হাদীস হতে প্রমাণপঞ্জী।
قال صلى الله عليه وسلم : « إن بين الرجل وبين الشرك، والكفر، ترك الصلاة». رواه مسلم في كتاب الإيمان عن جابر بن عبد الله، عن النبي صلى الله عليه وسلم.
রাসুলুল্লাহ বলেছেন, নিশ্চয় একজন মু'মিন ব্যক্তির মধ্যে এবং শির্ক ও কুফরের মাঝে পার্থক্য হলো সলাত পরিত্যাগ করা।
হাদীসটি ইমাম মুসলিম জাবির (রাঃ)-এর বরাতে কিতাবুল ঈমানে বর্ণনা করেছেনঃ
عن بريدة بن الحصيب رضي الله عنه، قال : سمعت رسول الله صلى الله عليه وسلم يقول : "العهد الذي بيننا وبينهم الصلاة، فمن تركها فقد كفر". رواه أحمد وأبو داود والترمذي والنسائي وابن ماجة.
বুরাইদা বিন হুসাইব হতে বর্ণিত। তিনি বলেন যে, আমি রাসূলুল্লাহ -কে বলতে শুনেছি আমাদের মাঝে এবং তাদের অর্থাৎ মুশরিকদের মাঝে একমাত্র চুক্তি হলো সলাত, যে ব্যক্তি তা ছেড়ে দিবে সে কাফির হয়ে যাবে।

হাদীসটি বর্ণনা করেছেন ইমাম আহমাদ, আবু দাউদ, তিরমিযী, নাসাঈ ও ইবনু মাজাহ।
এখানে كفر অর্থ الكفر المخرج عن الملة বা ধর্ম হতে বহিষ্কারকারী কুফর। কেননা, রাসূলুল্লাহ সলাতকে মু'মিন এবং কাফিরের মধ্যে পার্থক্যের মাপকাঠি বলে ঘোষণা দিয়েছেন এবং এটা সর্বজনবিদিত যে, কুফুর ইসলাম ধর্মের বিপরীত। সুতরাং যে ব্যক্তি এ চুক্তি না মানবে সে কাফিদের অন্তর্ভুক্ত।
وفي صحيح مسلم عن أم سلمة رضي الله عنها، أن النبي صلى الله عليه وسلم قال "ستكون أمراء، فتعرفون وتنكرون، فمن عرف بريء، ومن أنكر سلم، ولكن من رضي وتابع. قالوا : "أفلا نقاتلهم؟" قال : "لا ما صلوا".
সহীহ মুসলিমে উম্মে সালামাহ হতে বর্ণিত হয়েছে। নবী জয়া সাল্লাম বলেছেন, অচিরে এমন কিছু নেতার আবির্ভাব ঘটবে তোমরা যাদের কুআচরণ চিনবে এবং অস্বীকার করবে। যে চিনবে সে মুক্তি পাবে। আর যে অস্বীকার করবে সে নিরাপত্তা পাবে। কিন্তু যারা তাদের কর্মকাণ্ডে সন্তুষ্ট হয়ে তাদের অনুসরণ করবে তাদের রক্ষা নেই। তারা (সাহাবাগণ) বললেন, আমরা কি তাদের সাথে যুদ্ধে লিপ্ত হবো না? রাসূল সাল্লাল্লার বললেনঃ না, যতক্ষণ পর্যন্ত তারা সলাত পড়তে থাকবে যুদ্ধ করা যাবে না।
وفي صحيح مسلم أيضاً، من حديث عوف بن مالك رضي الله عنه أن النبي صلى الله عليه وسلم ، قال : "خيار أئمتكم الذين تحبونهم ويجبونكم، ويصلون عليكم وتصلون عليهم، وشرار أئمتكم الذين تبغضونهم ويبغضونكم، وتلعنونهم ويلعنونكم". قيل : يارسول الله : أفلا ننابذهم بالسيف؟ قال : "لا" ما أقاموا فيكم الصلاة".
সহীহ মুললিমে আউফ বিন মালিক থেকে বর্ণিত আছে যে, নাবী বলেছেন- তোমাদের মধ্যে সর্বোত্তম নেতা তারাই যাদেরকে তোমরা ভালবাসো আর তারাও তোমাদেরকে ভালবাসে এবং তারা তোমাদের জন্য দু'আ করে এবং তোমরাও তাদের জন্যে দু'আ কর। তোমাদের মধ্যে সবচেয়ে নিকৃষ্ট নেতা তারা যাদেরকে তোমরা ঘৃণা করো ও তারাও তোমাদেরকে ঘৃণা করে, তোমরা তাদের প্রতি অভিসম্পাত করো এবং তারাও তোমাদের প্রতি অভিসম্পাত করে। রাসূলুল্লাহ -কে জিজ্ঞেস করা হলো, হে আল্লাহর রাসূল! আমরা কি তাদের সাথে তলোয়ার দিয়ে যুদ্ধ করবো না? আল্লাহর নাবী সাল্লাল্লাহ বললেনঃ না, যতক্ষণ তারা তোমাদের মাঝে সলাত প্রতিষ্ঠা করতে থাকে ততক্ষণ পর্যন্ত নয়।

শেষোক্ত হাদীসদ্বয়ের মধ্যে দলীল পাওয়া যায় যদি নেতাগণ সলাত প্রতিষ্ঠা না করে তাহলে তাদের সাথে তলোয়ার নিয়ে যুদ্ধে লিপ্ত হওয়া যাবে। অথচ যতক্ষণ পর্যন্ত নেতারা স্পষ্ট কাফির না হয় ততক্ষণ পর্যন্ত তাদের সঙ্গে যুদ্ধে লিপ্ত হওয়া বৈধ নয়। এ ব্যাপারে কুরআন হাদীস থেকে স্পষ্ট দলীলও রয়েছে।
لقول عبادة بن الصامت رضي الله عنه : "دعانا رسول الله صلى الله عليه وسلم، فبايعناه، فكان فيما أخذ علينا، أن بايعنا على السمع والطاعة في منشطنا، ومكرهنا، وعسرنا ، ويسرنا ، وأثرة علينا وأن لا ننازع الأمر أهله". قال : "إلا أن تروا كفراً بواحاً عندكم من الله فيه برهان". متفق عليه.
উবাদা বিন সামিত (রাঃ) বলেন: একদিন রাসূলুল্লাহ পারামাছ আলাইহি আমাদেরকে বায়আতের জন্য ডাকলেন, আমরা এসে বায়আত করলাম।
তিনি যেই বিষয়গুলির উপর আমাদের বায়আত গ্রহণ করেছিলেন, সেগুলির কিছুটা এরূপ: খুশী না খুশী, স্বচ্ছল-অস্বচ্ছল এবং বঞ্চিত সকল অবস্থায় নেতার কথা শ্রবণ করবো এবং অনুসরণ করবো এর উপর বায়আত করেছিলাম। (আরো বায়আত করেছিলাম) যেন কোন কাজের বা পদের (নেতৃত্বের) উপযুক্ত ব্যক্তির সাথে বিসংবাদ না করি। অতঃপর বলেছেন, কিন্তু তোমাদের নিকট আল্লাহ প্রদত্ত দলীলের ভিত্তিতে যদি দেখ যে, সে স্পষ্ট কাফির হয়ে গেছে তাহলে তাকে ছাড়িওনা।

এ হাদীসের আলোকে তাদের সলাত পরিত্যাগ করাটা (যার কারণে নাবী তাদের সাথে তলোয়ার দিয়ে যুদ্ধ করার অনুমতি দিয়েছেন) স্পষ্ট কুফরী যার ব্যাপারে আমাদের নিকট কুরআনের দলীল রয়েছে। কিতাব ও সুন্নাতের কোনটাতেই সলাত পরিত্যাগকারী কাফির নয় বা সে মু'মিন বলে উল্লেখ হয়নি। এ ব্যাপারে যা দলীল পাওয়া যায় তা দ্বারা খুব বেশী তাওহীদের ফযীলত ও সাওয়াবের কথা সাব্যস্ত হয় এবং সে সমস্ত দলীল স্বীয় আভ্যন্তরীণ বিভিন্ন বাক বেষ্টনীর দ্বারা পরিবেষ্টিত হয়ে যাওয়ায় সলাত পরিত্যাগ করার নিষিদ্ধতা বহন করছে। অথবা ঐ সমস্ত দলীল মানুষের ঐ অবস্থার পরিপ্রেক্ষিতে প্রযোজ্য হবে যে অবস্থায় সলাত পরিত্যাগ করার জন্য তার গ্রহণযোগ্য, কারণ বা আপত্তি থাকে। অথবা ঐ সমস্ত দলীল সাধারণ ভঙ্গিতে বর্ণিত হয়েছে। সুতরাং সলাত পরিত্যাগকারীর কাফির হওয়া নির্দেশক দলীলগুলো খাস (বিশেষ) ধরা হবে এবং খাস (বিশেষ) দলীল আম (সাধারণ) দলীলের উপর প্রাধান্যতা লাভ করে থাকে।

প্রশ্ন: সলাত পরিত্যাগকারীর কাফির হওয়া নির্দেশক দলীলগুলোকে তার উজ্জব (আবশ্যিকতা)-কে অস্বীকার করার অর্থে অর্পণ করা যায় না?
উত্তরঃ না, তা ঠিক হবে না। কেননা, এতে দু'টো আশঙ্কা আছে।

প্রথম আশঙ্কা: শারি' (শরীয়ত প্রবর্তক) কর্তৃক গণ্যকৃত গুণ যার পরিপ্রেক্ষিতে বিধান দিয়েছেন তা বাত্বিল সাব্যস্ত হয়।
কেননা, শারি' কাফির হওয়ার বিধানকে (সলাত) পরিত্যাগের সাথে সম্পৃক্ত করেছেন অস্বীকারের সাথে নয়। ধর্মীয় ভ্রাতৃত্ব সম্পর্ক সাব্যস্ত করেছেন সলাত প্রতিষ্ঠা করার ভিত্তিতে। শুধু মৌখিকভাবে তার ওয়াজিব হওয়ার স্বীকারোক্তির ভিত্তিতে নয়। কেননা, আল্লাহ তো এ কথা বলেননি যে, যদি তারা তাওবাহ করে এবং সলাত ওয়াজিব হওয়া স্বীকার করে এবং রাসূলুল্লাহ এ কথা বলেননি যে, এক ব্যক্তির মাঝে এবং শির্ক ও কুফরের মাঝে পার্থক্য হলো সলাতের উজ্ব (আবশ্যিকতা)-কে অস্বীকার করা বা এ কথাও বলেননি যে, আমাদের মাঝে এবং তাদের মাঝে চুক্তি হলো সলাতের উজুব (আবশ্যিকতা) স্বীকার করা।
সুতরাং যে ব্যক্তি তার ওয়াজিব হওয়াকে অস্বীকার করবে সে কাফির হয়ে যাবে। যদি এটাই আল্লাহ এবং রাসূল-এর উদ্দেশ্য হতো তাহলে সেটা ছাড়া অন্য কোন উদ্দেশ্য (অর্থ) নেয়া কুরআনের আয়াত বর্ণনার পরিপন্থী হতো। কেননা, আল্লাহ তা'আলা এরশাদ করেছেনঃ
وَنَزَّلْنَا عَلَيْكَ الْكِتَبَ تِبْيَانًا لِكُلِّ شَيْءٍ )
আমি তোমার উপর কিতাব অবতীর্ণ করেছি সব কিছু বর্ণনা করার জন্য। (সূরা নাহল ৮৯)
নাবী- -কে সম্বোধন করে আরো বলেছেন:
وَأَنْزَلْنَا إِلَيْكَ الذِّكْرَ لِتُبَيِّنَ لِلنَّاسِ مَا نُزِّلَ إِلَيْهِمْ ﴾
আমি তোমার নিকট যিক্র (কুরআন) অবতীর্ণ করেছি যাতে মানুষের জন্য যা কিছু অবতীর্ণ করা হয়েছে সব বর্ণনা করে দাও। (সুরা নাহল ৪৪)

দ্বিতীয় আশঙ্কা: এমন গুণ গণ্য করা হয় যাকে শারি' বিধানের জন্য সংশ্লিষ্ট করেননি। কেননা, পাঁচ ওয়াক্ত সলাতের ওজুব (আবশ্যিকতা) অস্বীকার করলে ঐ ব্যক্তিরই কাফির হওয়া অনিবার্য হয় যার ওজুবের ব্যাপারে অজ্ঞতার আপত্তি গ্রহণযোগ্য নয়; চাই সে সলাত পড়ুক বা নাই পড়ুক।
অতএব যদি কোন ব্যক্তি সকল শর্ত শারায়েত, আরকান, আহকাম, ওয়াজিব, মুস্তাহাব পালন করতঃ পাঁচ ওয়াক্ত সলাত আদায় করে কিন্তু বিনা আপত্তিতে তার ওজুব অস্বীকার করে তাহলেও সে কাফির, যদিও পরিত্যাগ করলো না। সুতরাং প্রতীয়মান হলো যে, (সলাত পরিত্যাগকারীর কাফির হওয়া নির্দেশক) দলীলগুলোকে তার ওয়াজিব অস্বীকার করার অর্থে নেয়া ঠিক হবে না। সঠিক কথা এটাই যে, সলাত পরিত্যাগকারী কাফির, ধর্ম হতে বহিষ্কৃত। যেমন- ইবনু আবী হাতিম কর্তৃক স্বীয় সুনান গ্রন্থে উবাদা বিন সামিতের বরাতে বর্ণিত হাদীসের ভিতর তার সরাসরি প্রমাণ পাওয়া যায়।
عن عبادة بن الصامت رضي الله عنه، قال : أوصانا رسول الله صلى الله عليه وسلم : «لا تشركوا بالله شيئاً، ولا تتركوا الصلاة عمداً ، فمن تركها عمداً متعمداً فقد خرج من الملة».
উবাদাহ বিন সামিত (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ আলাইরি তথ্যসাল্লাম আমাদেরকে উপদেশ দিয়েছেন- খবরদার, তোমরা আল্লাহর সাথে শরিক স্থাপন করো না এবং ইচ্ছাকৃতভাবে সলাত পরিত্যাগ করো না। কেননা, যে ইচ্ছাকৃতভাবে সলাত পরিত্যাগ করে, সে ধর্ম হতে বহিষ্কার হয়ে যায়।

যদিও আমরা উক্ত হাদীসগুলোকে অস্বীকার বশতঃ পরিত্যাগের অর্থে ব্যবহার করি তাহলে শুধু সলাতের ব্যাপারে বিশেষভাবে এ কথা বলার কোন কিছু থাকে না। কেননা, অস্বীকারের ব্যাপারটা ব্যাপকভাবে যাকাত, রোযা ও হাজ্জের ক্ষেত্রেও প্রযোজ্য। যদিও কেউ ওগুলোর মধ্যেকার কোন একটির ওয়াজিব অস্বীকার করে তাহলেও কাফির হয়ে যাবে। যদি অজ্ঞতার কারণে তার আপত্তি অগ্রাহ্য হয়ে থাকে। আর সলাত পরিত্যাগকারীর কাফির হওয়া যেমন বর্ণিত শ্রুতিগত দলীলের দাবী, তেমনি বিবেকগত দলীলেরও দাবী।

কেমন করে সলাত পরিত্যাগ করা সত্ত্বেও এক ব্যক্তির নিকট ঈমান থাকতে পারে। অথচ সলাত হলো দ্বীনের স্তম্ভ? সলাত আদায় করার প্রতি প্রেরণাদায়ক যে হাদীস এসেছে প্রত্যেক বিবেকবান মু'মিনকে যত্ন সহ তা আদায় করা ও প্রতিষ্ঠা করার নির্দেশ দান করে। পরিত্যাগের কারণে যে শাস্তির হুমকি এসেছে প্রত্যেক বিবেকবান মু'মিনের জন্য তাকে পরিত্যাগ না করার ও বিনষ্ট না করার ব্যাপারে সাবধানতা অবলম্বন করা ও ভীতিগ্রস্ত হওয়ার নির্দেশ পাওয়া যায়। অতএব এমন (দ্বিমুখী) দলীল বিদ্যমান থাকা সত্ত্বেও সলাত পরিত্যাগ করা, মানে ত্যাগকারীর নিকট ঈমান অবশিষ্ট না থাকা।

প্রশ্ন: সলাত পরিত্যাগকারীর কাফির হওয়া নির্দেশক হাদীসগুলোর অর্থ ধর্মের কুফরী না হয়ে নি'মাতের (অর্থাৎ আল্লাহর দানের) কুফরী অর্থের সম্ভবনা রাখে না কি? অথবা কুফরী থেকে বড় কুফরী উদ্দেশ্য না নিয়ে ছোট কুফরী উদ্দেশ্য নেয়া যায় না কি?'
তাহলে আল্লাহর নাবী আলাইহি -এর নিম্ন বর্ণিত হাদীছ দু'টির অন্তর্ভুক্ত হয়ে যেত-
إثنتان بالناس هما بهم كفر : الطعن في النسب، والنياحة على الميت». وقوله : «سباب المسلم فسوق وقتاله كفر». ونحو ذلك.
(হাদীস দু'টির অর্থ) মানুষের দু'টি আচরণ কুফরী আচরণঃ
১। বংশের ত্রুটি বর্ণনা করা
২। মৃত ব্যক্তির জন্য বিলাপ করে ক্রন্দন করা।
(দ্বিতীয় হাদীসের অর্থ) মু'মিনকে গালি দেয়া ফুসুকু (পাপাচারী) এবং তার সঙ্গে লড়াই করা কুফরী। (উল্লেখ্য হাদীস দু'টিতে কুফর অর্থ ছোট কুফর উদ্দেশ্য) আরো এ অর্থের ন্যায় অপরাপর হাদীছসমূহ রয়েছে।
উত্তর : এ সম্ভাবনা ও সদৃশ্যতা প্রদান করা বিভিন্ন কারণে ঠিক নয়। (কারণগুলো নিম্নে উল্লেখ করা হলো)
১। নাবী সলাতকে কুফর ও ঈমান এবং মু'মিন ও কাফিরের মাঝে পার্থক্য নির্ণয়কারী সীমারেখা ধার্য করেছেন। আর সীমারেখা সীমিত জিনিসকে অন্য জিনিস হতে পৃথক করে বের করে দেয়। সুতরাং সীমা ও সীমিত দু'টি পরস্পর বিরোধী বিপরীত জিনিস যার একটি আর একটির ভিতর প্রবেশ করতে পারে না।
২। সলাত হলো ইসলামের একটি রুকুন বা স্তম্ভ। অতএব তার পরিত্যাগকারীরকে কুফর গুণে গুণান্বিত করাটাই নির্দেশ করছে যে, এটা ইসলাম হতে বহিষ্কারকারী কুফর।
৩। অন্য দলীল দ্বারা সলাত পরিত্যাগকারীর কাফির ও ধর্মচ্যুত হওয়ার নির্দেশ পাওয়া যায়। অতএব উক্ত দলীলের নির্দেশ অনুসারে কুফরের অর্থ ধর্ম হতে বহিষ্কারকারী কুফর নেয়াই উচিত।
৪। কুফর শব্দের ব্যবহার ভঙ্গী ভিন্ন রূপী: সলাত পরিত্যাগের ক্ষেত্রে বলেছেন- একজন মু'মিন ব্যক্তি এবং শির্ক ও কুফরের মধ্যে পার্থক্য হলো সলাত।
الكفر শব্দটি ال )আলিফলাম আর্টিক্যাল) দ্বারা ব্যবহার করেছেন যার অর্থ সত্যিকারী কুফর। পক্ষান্তরে كفر শব্দটি আর্টিক্যালবিহীন কিংবা ক্রিয়াপদরূপে ব্যবহার করা হলে নির্দেশ করতো যে এ কাজটি কুফরীর অর্ন্তভুক্ত কিংবা এ কাজটিতে কুফরী করেছে। কিন্তু ঐ কুফরী নয়, যে কুফরী ইসলাম থেকে বহিষ্কার করে দেয়। শাইখুল ইসলাম ইবনু তাইমিয়াহ সুন্না মুহাম্মাদিয়ার ছাপা ইকুতিযাউস সিরাতিল মুসতাক্বীম গ্রন্থের ৭০ পৃষ্ঠায় আল্লাহর নাবী পাল্লারার আলাইহি إثنتان بالناس هطما بهم كفر 9721917 - আলোচনা করতে যেয়ে বলেছেন।
আল্লাহর নাবী সাল্লাল্লাহ আলাইহি ওয়াসাল্লাম -এর বাণী:
هما بهم كفر অর্থাৎ এই দু'টি আচরণ কুফর, মানুষের সাথে জড়িত থাকে। স্বয়ং আচরণ দু'টি কুফর; কুফরী আচরণসমূহের যেখানেই তার অবস্থান হোক না কেন। এ দু'টি সর্বদায় মানুষের সাথে সংশ্লিষ্ট থাকে। কিন্তু আবার কারো নিকট কুফরের শাখাসমূহের কোন একটি শাখা পাওয়া গেলেই প্রকৃত কাফির হয়ে যায় না। যেমন কারো নিকট ঈমানের শাখাসমূহের মধ্যে কোন একটি শাখা পাওয়া গেলেই খাঁটি মু'মিন হয় না।
২। পার্থক্য রয়েছে আলিফলাম আর্টিক্যাল সংযুক্ত کفر এর মাঝে : যেমন রাসূলুল্লাহ এর বাণী:
ليس بين العبد وبين الكفر ، أو الشرك إلا ترك الصلاة »
এবং হাঁ বোধক বাক্যে আর্টিক্যালবিহীন كفر এর মাঝে।
অতএব যখন স্পষ্ট হলো যে, উল্লিখিত দলীলাদির ভিত্তিতে বিনা ওযরে সলাত পরিত্যগকারী ধর্ম হতে বিচ্যুত কাফির তখন ইমাম আহমাদ বিন হাম্বলের গৃহীত মতই সঠিক হলো আর এটাই ইমাম শাফিয়ীর দু'টি মতের একটি মত। যেমন ইমান ইবনু কাসীর আল্লাহর বাণী:
فَخَلَفَ مِنْ بَعْدِهِمْ خَلْفٌ أَضَاعُوا الصَّلوةَ وَاتَّبَعُوا الشَّهَوتِ ﴾
এর ভাষ্যে উল্লেখ করেছেন এবং ইমাম ইবনুল কাইয়েমও কিতাবুস সলাত গ্রন্থে উল্লেখ করেছেন যে, এটাই ইমাম শাফিয়ীর দু'টি মতের একটি মত। ইমাম তাহাবীও ইমাম শাফিয়ী থেকে অনুরূপ কথা নকল করেছেন।

অধিকাংশ সাহাবায়ে কেরام এ মতেরই অনুসারী ছিলেন বরং একাধিক জন এ কথার উপর তাদের ইজমার কথা উল্লেখ করেছেন।
قال عبد الله بن شقيق : كان أصحاب النبي صلى الله عليه وسلم لا يرون شيئاً من الأعمال تركه كفر غير الصلاة". رواه الترمذي والحاكم وصححه على شر طهما.
আবদুল্লাহ বিন শাক্বীক বলেছেন: নাবী -এর সাহাবাবর্গ সলাত ব্যতীত অন্য কোন আমল পরিত্যাগের জন্য কাফির হওয়ার মত পোষণ করতেন না। এ হাদীসটি ইমাম তিরমিযী ও হাকিম বর্ণনা করেছেন এবং হাকিম বুখারী এবং মুসলিমের শর্তের উপর সহীহ বলে উল্লেখ করেছেন।
قال إسحاق بن راهويه الإمام المعروف : «صح عن النبي صلى الله عليه وسلم أن تارك الصلاة كافر، وكذلك كان رأي أهل العلم من لدن النبي صلى الله عليه وسلم، إلى يومنا هذا، أن تارك الصلاة عمداً من غير عذر حتى يخرج وقتها كافر».
প্রসিদ্ধ ইমাম ইসহাক বিন রাওয়াহ্ বলেছেন যে, বিশুদ্ধ সূত্রে নবী আদাল্লাম থেকে বর্ণিত হয়েছে যে, সলাত পরিত্যাগকারী কাফির এবং এভাবে নবী হতে আমাদের এ যুগ পর্যন্ত বিদ্বানগণের এই মত ছিল যে, বিনা আপত্তিতে ইচ্ছাকৃতভাবে সময়মত সলাত পড়া পরিত্যাগকারী কাফির।

ইবনু হাযম উল্লেখ করেছেন যে, উক্ত বিধান বর্ণিত হয়েছে উমার, আবদুর রহমান বিন আউফ, মুআয বিন জাবাল, আবূ হুরাইরাহ ও অপারাপর সাহাবাগণ হতে।
তিনি আরো বলেন যে, সাহাবাগণের মধ্যে কেউ এর বিরোধিতা করেছেন বলে জানি না।

মুন্যিরী স্বীয় গ্রন্থ 'তারগীব তারহীব'-এ ইমাম ইবনু হায্য থেকে এ কথা নকল করেছেন এবং আরো কিছু সাহাবায়ে কিরামের নাম বৃদ্ধি করেছেন। তারা হলেন, আবদুল্লাহ বিন মাসউদ, আবদুল্লাহ বিন আব্বাস, জাবির বিন আবদুল্লাহ ও আবুদ্ দারদা প্রমুখ গণ।

আরো বলেন, সাহাবাগণ ব্যতীত যারা এ মতের অনুসারী তারা হলেন- ইমাম আহমাদ বিন হাম্বাল, ইসহাক বিন রাহ্ওয়াহ্, নাঙ্গ, হাকাম বিন উ'য়ায়নাহ, আইয়ুব্‌ সিখিয়ানী, আবু দাউদ তায়ালিসী, আবূ বাক্স বিন আবি শাইবাহ্, যুহাইর বিন হাব ও অন্যান্যগণ।

প্রশ্ন: যারা সলাত পরিত্যাগকারীর কাফির হওয়ার পক্ষপাতি নয় তাদের দলীলের কি উত্তর দিবেন?
উত্তর: তাদের ঐ সমস্ত দলীলে সলাত পরিত্যাগকারীকে কাফির বলা যাবে না বা সে মু'মিন কিংবা সে জাহান্নামে প্রবেশ করবে না বা জান্নাতে প্রবেশ করবে এমন কিছুই উল্লেখ হয়নি। যে ব্যক্তি ঐ সমস্ত দলীল গভীর দৃষ্টিতে দেখবে সে তাদের দলীলগুলোকে পাঁচ ভাগে বিভক্ত পাবে। কোন ভাগই কাফির বলার পক্ষপাতিদের দলীলের বিরোধী নয়।

প্রথম: দুর্বল হাদীস যেগুলো বিষয়ের প্রতি অস্পষ্ট, দলীল গ্রহণের চেষ্টা করেও তার দ্বারা কোন উপকার গ্রহণ করতে পারেনি।

দ্বিতীয়: এমন হাদীস যার ভিতর মূল বিষয়ের কোন দলীল নাই। যেমন তাদের কেউ কেউ আল্লাহর এই বাণী থেকে দলীল গ্রহণ করেছেন।
إِنَّ اللَّهَ لَا يَغْفِرُ أَنْ يُشْرَكَ بِهِ وَيَغْفِرُ مَا دُونَ ذَلِكَ لِمَنْ يَشَاءُ )
নিশ্চয় আল্লাহ তার সাথে শরীক স্থাপনের পাপ মার্জনা করবেন না, তবে এর চেয়ে ছোট সকল পাপ মার্জনা করবেন। (সুরা আন-নিসা ৪৮)
অত্র আয়াতে )مادون ذلك( এর অর্থ: যে পাপ তার চেয়ে নিম্নপর্যায়ের হবে। এটা অর্থ নয় যে, ওটা ব্যতীত যত পাপ রয়েছে সব ক্ষমা করবেন। এ কারণে যে, যে ব্যক্তি আল্লাহ এবং রাসূল-এর সংবাদকে মিথ্যা প্রতিপন্ন করবে সে কাফির যাকে আল্লাহ (ক্ষমা না চাইলে) ক্ষমা করবেন না অথচ তার এ পাপ শির্ক নয়।
যদি মেনেও নেয়া যায় যে, )مادون ذلك( এর অর্থ )ماسوى ذلك( অর্থাৎ শির্ক ব্যতীত সকল পাপ। তাহলে এটা ঐ আম (ব্যাপক অর্থবোধক) দলীলের আওতাভুক্ত হবে যাকে শির্ক ও কুফ্র সাব্যস্তকারী দলীল ব্যতীত অন্য ইসলামচ্যুতকারী অমার্জনীয় পাপের কথা নির্দেশক হাদীস দ্বারা বিশিষ্ট করা হয়েছে। যদিও সেটা শির্ক না হয়।

তৃতীয় : এমন হাদীস যা আম (ব্যাপক অর্থবোধক) সলাত পরিত্যাগকারীর কাফির হওয়া নির্দেশক হাদীস দ্বারা খাস (বিশিষ্ট) হয়েছে। যেমন- মুআয বিন জাবাল থেকে বর্ণিত হাদীসে রাসূলুল্লাহ বলেছেন-
)) ما من عبد يشهد أن لا إله إلا الله وأن محمداً بعده ورسوله إلا حرمه الله على النار»
যে ব্যক্তি সাক্ষ্য প্রদান করবে যে, আল্লাহ ব্যতীত কেউ প্রকৃত উপাস্য হওয়ার যোগ্য নয় এবং মুহাম্মাদ পারাজাদ আলাইহি তাঁর বান্দা ও রাসূল। আল্লাহ তাকে জাহান্নামের জন্য হারাম করে দিবেন। এ হলো বিশিষ্ট কৃত সাধারণ দলীলের কিছু শব্দ। অনুরূপভাবে আবূ হুরাইরাহ, ওবাদাতুবনুস্ সামিত ও আত্বানু মালিক (রাঃ) থেকেও বর্ণিত হয়েছে।

চতুর্থ: এমন সাধারণ দলীল যা অন্য হাদীস দ্বারা বিশিষ্ট হয়েছে ফলে সলাত পরিত্যাগ করা সম্ভব নয়।
যেমন আত্মান বিন মালিকের হাদীসে আল্লাহর নবী সাল্লাল্লাছ বলেছেন,
فإن الله حرم على النار من قال لا إله إلا الله يبتغي بذلك وجه الله». رواه البخاري.
নিশ্চয় আল্লাহ ঐ ব্যক্তিকে জাহান্নামের জন্য হারাম করেছেন যে ব্যক্তি 'লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ' বলে তার মাধ্যমে আল্লাহর সন্তুষ্টি কামনা করে। হাদীসটি ইমাম বুখারী বর্ণনা করেছেন।

আরো বলেছেন মুআয (রাঃ)-এর হাদীসেঃ
«ما من أحد يشهد أن لا إله إلا الله وأن محمداً رسول الله صدقاً من قلبه إلا حرمه الله على النار » رواه البخاري.
যে ব্যক্তির অন্তর থেকে সত্যিকারার্থে সাক্ষ্য প্রদান করে যে, আল্লাহ ব্যতীত কেউ প্রকৃত উপাস্য হওয়ার যোগ্য নয় এবং মুহাম্মাদ আলামাহ আল্লাহর রাসূল। আল্লাহ তাকে (স্পর্শ করা) জাহান্নামের জন্য হারাম করে দিবেন। হাদীসটি ইমাম বুখারী (রহঃ) বর্ণনা করেছেন।
সাক্ষ্য দু'টি অর্থাৎ আল্লাহর একত্বতা ও মুহাম্মাদ -এর রিসালাতের সাক্ষ্য মনের ইখলাস এবং সত্যিকারার্থে অন্তর থেকে দেয়াই তাকে (সলাত পরিত্যাগকারীকে) সলাত পরিত্যাগ থেকে বিরত রাখবে।

যেহেতু যে ব্যক্তিই সাক্ষ্য দু'টি সত্যিকারার্থে মনের ইখলাসের সাথে প্রদান করবে সে ব্যক্তিই সলাত না পড়ে পারবে না। কারণ সলাত হলো ইসলামের স্তম্ভ এবং রব ও বান্দার মাঝে সম্পর্ক স্থাপনকারী উপায়। যদি সত্যিকারার্থে তার আল্লাহর সন্তুষ্টি কাম্য হয় তাহলে অবশ্যই সে ওটা পালন করবে যেটা তার জন্য সেই সন্তুষ্টি অর্জনে সহায়ক হয় এবং অবশ্যই সে ঐ সমস্ত জিনিস (কাজ) থেকে বিরত থাকবে যে কাজ তার অভীষ্ট লক্ষ্য অর্জনে অন্তরায় হয়।

অনুরূপভাবে যে ব্যক্তি সত্যিকারার্থে অন্তর থেকে সাক্ষ্য প্রদান করবে যে, আল্লাহ ব্যতীত কেউ উপাস্য হওয়ার যোগ্য নয় এবং মুহাম্মাদ সাল্লাল্লাছ আলাইহি সাল্লাম তার রাসূল, অবশ্যই তার এ বিশ্বাস তাকে রাসূল আলাইছি -এর অনুসরণ করতঃ খাঁটিভাবে আল্লাহর জন্য সলাত আদায় করতে উদ্বুদ্ধ করবে। কারণ এটা সত্যিকারার্থে সাক্ষ্য প্রদানের দাবী।

পঞ্চম: এমন অবস্থার সাথে নির্দিষ্ট যেই অবস্থায় সলাত পরিত্যাগ করলে আপত্তিগ্রহণযোগ্য। যেমন ইমাম ইবনু মাজাহ হুযাইফা বিন ইয়ামানের বরাতে বর্ণনা করেছেন-
» يدرس الإسلام كما يدرس وشي الثوب الحديث وفـيـه. وتبقى طوائف من الناس الشيخ الكبير والعجوز يقولون : « أدركنا آباءنا على هذه الكلمة لا إله إلا الله فنحن نقولها » فقال له صلة : ما تغني عنهم لا إله إلا الله وهم لا يدرون ما صلاة، ولا صيام، ولا نسك ولا صدقة فأعرض عنه حذيفة ثم ردها عليه ثلاثاً كل ذلك يعرض عنه حذيفة ثم أقبل عليه في الثالثة فقال : «يا صلة تنجيهم من النار » ثلاثاً. ))
ইসলাম বিলুপ্ত হয়ে যাবে যেমন কাপড়ের ছাপ বিলুপ্ত হয়ে যায়। হাদীসটি দীর্ঘ, এর ভিতরে উল্লেখ হয়েছে। কিছু শ্রেণীর বৃদ্ধ-বৃদ্ধা মানুষ অবশিষ্ট থাকবে; তারা বলবে আমরা তো আমাদের বাপ-দাদাদেরকে (শুধু) এই কালেমাই পড়তে শুনেছি لا إله إلا الله তাই আমরাও সেটাই বলি।
সিলাহ্ নামক এক ব্যক্তি (হুযাইফার শ্রোতা) তাঁকে বলল, তারা সলাত, সিয়াম, কুরবানী, সাদাকা (যাকাত) কিছু জানল না; তাদের জন্য এ কালেমা ১১ إله إلا الله - যথেষ্ট হবে না। (এ কথা শুনে) হুযাইফা তার থেকে মুখ ফিরিয়ে নিলেন। এভাবে তিনবার সে ব্যক্তি এ কথাটা বলল প্রত্যেকবারই হুযাইফাহ তার থেকে মুখ ফিরিয়ে নিলেন। অতঃপর তৃতীয় বারে তাকে বললেন, জেনে রাখ হে সিলাহ্! এ কালেমাই তাদেরকে জাহান্নাম থেকে রক্ষা করবে- এ কথাটি তিনবার বললেন, তাদেরকে ঐ কালেমাই জাহান্নাম থেকে রক্ষা করবে এজন্য যে, তারা শরীয়ত সম্পর্কে অজ্ঞ থাকার কারণে শরীয়তের অন্যান্য কাজ পরিত্যাগের জন্য তাদের আপত্তি গ্রহণীয়। তাদের সাধ্যমত তারা অতটুকুই করতে পেরেছে। তাদের অবস্থা ঐ সমস্ত লোেকদের মত যারা শরীয়ত পাওয়ার পূর্বে বা পাওয়ার পর সে অনুযায়ী আমল করতে পাওয়ার পূর্বে মৃত্যুবরণ করেছে।

যেমন কেউ কালিমাহ্ শাহাদাত পড়লো কিন্তু শরীয়ত অনুযায়ী আমল করার সুযোগ পাওয়ার পূর্বে মারা গের অথবা কাফির ভূমিতে ইসলাম গ্রহণ করলো কিন্তু শরীয়ত সম্পর্কে জানতে পারার পূর্বেই মারা গেল।

মোট কথা, যারা সলাত পরিত্যাগকারীকে কাফির মনে করে না তাদের দলীল কাফির হওয়ার মতপন্থীদের দলীলের বিরোধিতার যোগ্য নয়। কেননা, তারা যে সমস্ত দলীল পেশ করে থাকেন দুর্বল, অস্পষ্ট কিংবা মূল বিষয়ের প্রতি নির্দেশ করে না কিংবা এমন গুণে গুণান্বিত যার কারণে সলাত পরিত্যাগ করা যেতে পারে না। কিংবা এমন অবস্থার সাথে নির্দিষ্ট যে অবস্থায় সলাত পরিত্যাগ করলে আপত্তি গ্রহণীয়। কিংবা আম হাদীস- যাকে কাফির হওয়া নির্দেশক দলীল বিশিষ্ট করেছে।

যখন বিরোধহীন ও প্রতিদ্বন্দ্বীহীন দলীল দ্বারা সলাত পরিত্যাগকারীর কাফির হওয়া স্পষ্ট হয়ে গেল, তখন তার প্রতি কাফির ও ধর্মত্যাগকারীর বিধান প্রযোজ্য হওয়া ওয়াজিব। কেননা, বিধান সর্বাবস্থায় (বিদ্যমান অবিদ্যমানে) তার কারণের সাথে প্রদক্ষিণশীল।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00