📄 রাসূলুল্লাহ্ ﷺ এর হেলমেট (শিরস্ত্রাণ) এর বিবরণ
بَابُ مَا جَاءَ فِي صِفَةٍ مِغْفَرِ رَسُولِ اللَّهِ ﷺ
অধ্যায়-১৬: রাসূলুল্লাহ ﷺ এর হেলমেট (শিরস্ত্রাণ) এর বিবরণ
عَنْ أَنَسِ بْنِ مَالِكٍ الله : أَنَّ النَّبِيَّ ﷺ دَخَلَ مَكَّةَ وَعَلَيْهِ مِغْفَرْ ، فَقِيلَ لَهُ : هَذَا ابْنُ خَطَلٍ مُتَعَلِّقَ بِأَسْتَارِ الْكَعْبَةِ ، فَقَالَ : اقْتُلُوهُ
৮৪. আনাস ইবনে মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী শিরস্ত্রাণ পরিহিত অবস্থায় মক্কায় (বিজয়ী বেশে) প্রবেশ করেন। তখন তাঁকে বলা হলো, ঐ যে ইবনে খাতাল কাবাগৃহের গিলাফ ধরে ঝুলছে। তিনি বললেন, তোমরা তাকে হত্যা করো।
ব্যাখ্যা: ইবনে খাতালকে যে কারণে হত্যা করা হয়: জাহেলী যুগে তার নাম ছিল আবদুল উজ্জা। সে মদিনায় এসে ইসলাম কবুল করলে তার নাম রাখা হয় আবদুল্লাহ। রাসূলুল্লাহ তাকে এক এলাকায় যাকাত আদায় করার জন্য নিযুক্ত করেন। তার সহযোগী একজন মুসলিম গোলাম ছিল। খাবার তৈরি করতে একটু দেরী হওয়ায় সে ক্ষিপ্ত হয়ে গোলামটিকে মেরে ফেলে এবং পালিয়ে মক্কায় গিয়ে ধর্মত্যাগী বা মুরতাদ হয়ে যায়। তাই মক্কা বিজয়ের দিন এ পাপিষ্ঠের মৃত্যুদণ্ড কার্যকর করা হয়। তৎকালীন সময়ে আরবের মুশরিকরা কাবা ঘরের প্রতি পরম সম্মান প্রদর্শন করত। কোন অপরাধী কাবা ঘরের চাদর ধরে থাকলে তাকে নিরাপত্তা দেয়া হতো। নিয়মানুযায়ী নিরাপত্তার আশায় ইবনে খাতাল ঐ সময় কাবার গিলাফ ধরে থাকে। রাসূলুল্লাহ তাকে হত্যার আদেশ দিলে সাহাবীগণ তাকে যম্যম্ কূপ ও মাকামে ইব্রাহীমের মধ্যবর্তী স্থানে এনে হত্যা করেন।
عَنْ أَنَسِ بْنِ مَالِكٍ ، أَنَّ رَسُولَ اللهِ ﷺ دَخَلَ مَكَّةَ عَامَ الْفَتْحِ ، وَعَلَى رَأْسِهِ الْمِغْفَرُ قَالَ : فَلَمَّا نَزَعَهُ جَاءَهُ رَجُلٌ ، فَقَالَ لَهُ : ابْنُ خَطَلٍ مُتَعَلِّقٌ بِأَسْتَارِ الْكَعْبَةِ فَقَالَ : اقْتُلُوهُ. قَالَ ابْنُ شِهَابٍ : وَبَلَغَنِي أَنَّ رَسُولَ اللَّهِ ﷺ لَمْ يَكُنْ يَوْمَئِذٍ مُحْرِمًا
৮৫. আনাস ইবনে মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, মক্কা বিজয়ের বছর রাসূলুল্লাহ তাঁর মাথায় হেলমেট পরিধান করে মক্কায় প্রবেশ করেন। বর্ণনাকারী বলেন, এরপর তিনি তা খুলে রাখেন। এমন সময় এক ব্যক্তি এসে সংবাদ দিল যে, ইবনে খাতাল কাবা ঘরের গিলাফ ধরে ঝুলছে। তিনি বললেন, তোমরা তাকে হত্যা করো।
ইবনে শিহাব (রহঃ) বলেন, এ মর্মে আমার নিকট হাদীস পৌঁছেছে যে, রাসূলুল্লাহ সে দিন ইহরাম অবস্থায় ছিলেন না।
টিকাঃ
⁸⁶ সহীহ বুখারী, হা/১৮৪৬; সহীহ মুসলিম, হা/৩৩৭৪; আবু দাউদ, হা/২৬৮৭; নাসাঈ, হা/২৮৬৭; মুসনাদে আহমাদ, হা/১২০৮৭; ইবনে খুযাইমা, হা/৩০৬৩; ইবনে হিব্বান, হা/৩৭১৯; মুসনাদে বাযযার, হা/৬২৯০।
⁸⁷ মুয়াত্তা মালেক, হা/৯৪৬; সহীহ বুখারী, হা/৪২৪৬; মুসnaদে আহমাদ, হা/১০৯৫৫।
📄 নবী ﷺ এর পাগড়ি
সে সময় রাসূলুল্লাহ ও সাহাবীগণের মাঝে পাগড়ি পরিধানের ব্যাপক প্রচলন ছিল। তবে তারা কখনো কখনো শুধু টুপিও পরিধান করতেন। আর খুব কম সময়েই তাঁরা খালি মাথায় থাকতেন। পাগড়ি ছিল তাঁদের সৌন্দর্য ও মর্যাদার পোশাকসমূহের অন্যতম। তাঁরা কেবল সালাতের জন্য পাগড়ি ব্যবহার করতেন না। বরং তাঁরা পোশাকের অংশ হিসেবে সবসময়ই পাগড়ি পরিধান করতেন এবং ঐ অবস্থাতেই সালাত আদায় করতেন।
রাসূলুল্লাহ কালো পাগড়ি পরিধান করতেন:
عَنْ جَابِرِ الله قَالَ : دَخَلَ النَّبِيُّ ﷺ مَكَّةَ يَوْمَ الْفَتْحِ وَعَلَيْهِ عِمَامَةٌ سَوْدَاءُ
৮৬. জাবির (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, মক্কা বিজয়ের দিন নবী কালো পাগড়ি পরিহিত অবস্থায় মক্কায় প্রবেশ করেন।**
ব্যাখ্যা: বিভিন্ন হাদীসের বর্ণনার আলোকে বুঝা যায় যে, রাসূলুল্লাহ সমগ্র জীবনে যে রঙের পাগড়ি ব্যবহার করেছেন তা হলো: সাদা, সবুজ এবং কালো।
তিনি পাগড়ি পরিধান করে খুৎবা প্রদান করতেন:
عَنْ عَمْرِو بْنِ حُرَيْثٍ ، قَالَ : رَأَيْتُ النَّبِيَّ ﷺ يَخْطُبُ عَلَى الْمِنْبَرِ وَعَلَيْهِ عِمَامَةٌ سَوْدَاءُ
৮৭. আমর ইবনে হুরায়স (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ কে কালো পাগড়ি পরিহিত অবস্থায় মিম্বারের উপর খুৎবা দিতে দেখেছি।*৯
তিনি পাগড়ির কিছু অংশ দু'কাঁধের মধ্যবর্তী স্থানে ঝুলিয়ে দিতেন:
عَنِ ابْنِ عُمَرَ قَالَ : كَانَ النَّبِيُّ ﷺ إِذَا اعْتَمَّ سَدَلَ عِمَامَتَهُ بَيْنَ كَتِفَيْهِ . قَالَ نَافِعٌ : وَكَانَ ابْنُ عُمَرَ ، يَفْعَلُ ذَلِكَ . قَالَ عُبَيْدُ اللهِ : وَرَأَيْتُ الْقَاسِمَ بْنَ مُحَمَّدٍ ، وَسَالِمًا يَفْعَلَانِ ذَلِكَ
৮৮. ইবনে উমর (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী যখন পাগড়ি পরিধান করতেন তখন দু'কাঁধের মধ্যবর্তী স্থানে ঝুলিয়ে দিতেন। নাফি' (রহঃ) বলেন, ইবনে উমর (রাঃ)ও অনুরূপ করতেন। উবায়দুল্লাহ (রহঃ) বলেন, আমি কাসিম ইবনে মুহাম্মাদ ও সালিম (রহঃ)-কেও অনুরূপ করতে দেখেছি।
টিকাঃ
** সহীহ মুসলিম, হা/৩৩৭৫; আবু দাউদ, হা/৪০৭৮; সুনানে নাসাঈ, হা/৫৩৪৪; ইবনে মাজাহ, হা/২৮২২: মুসনাদে আহমাদ, হা/১৪৯৪৭; ইবনে হিব্বান, হা/৫৪২৫।
*৯ সহীহ মুসলিম, হা/৩৩৭৭; আবু দাউদ, হা/৪০৭৯; ইবনে মাজাহ, হা/১১০৪।
*০ শারহুস সুন্নাহ, হা/৩১০৯; জামেউস সগীর, হা/৮৮০৫; সিলসিলা সহীহাহ, হা/৭১৭; মিশকাত, হা/৪৩৩৮।
📄 রাসূলুল্লাহ্ ﷺ এর লুঙ্গির বিবরণ
রাসূলুল্লাহ মোটা লুঙ্গি পরিধান করতেন:
عَنْ أَبِي بُرْدَةَ ، قَالَ : أَخْرَجَتْ إِلَيْنَا عَائِشَةُ كِسَاءٌ مُلَبَدًا وَإِزَارًا غَلِيظًا ، فَقَالَتْ : قُبِضَ رُوحُ رَسُولِ اللَّهِ ﷺ فِي هَذَيْنِ
৯০. আবু বুরদা (রহঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একবার আয়েশা (রাঃ) আমাদের সামনে একটি তালিযুক্ত চাদর ও একটি মোটা লুঙ্গি বের করে আনেন। তারপর তিনি বললেন, ওফাতের সময় রাসূলুল্লাহ এ দুটি কাপড় পরিহিত ছিলেন। ২
ব্যাখ্যা: 'ইযার' ও রিদা' ছিল রাসূলুল্লাহ এর যুগে আরব দেশের অধিক প্রচলিত পোশাক। একটি শরীরের নিম্নাংশে জড়ানো ও একটি শরীরের উপরাংশে কাঁধের উপর দিয়ে জড়ানো থাকত। নিম্নাংশের চাদর বা সেলাইবিহীন লুঙ্গিকে ইযার বলা হয়। আর উপরাংশের চাদরকে রিদা বলা হয়। রাসূলুল্লাহ বিভিন্ন প্রকার পোশাক পরিধান করতেন, তিনি কামীস (জামা) পছন্দ করতেন। তবে ব্যবহারের আধিক্যের দিক থেকে লুঙ্গি ও চাদরই সবচেয়ে বেশি পরিধান করতেন।
তিনি অর্ধ গোছ পর্যন্ত লুঙ্গি ঝুলিয়ে পরিধান করতেন:
عَنِ الْأَشْعَثِ بْنِ سُلَيْمٍ قَالَ : سَمِعْتُ عَمَّتِي ، تُحَدِّثُ عَنْ عَيْهَا قَالَ : بَيْنَا أَنَا أَمْشِي بِالْمَدِينَةِ إِذَا إِنْسَانٌ خَلْفِي يَقُوْلُ : ارْفَعُ إِزَارَكَ ، فَإِنَّهُ اَتْقَى وَأَبْقَى فَإِذَا هُوَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ فَقُلْتُ : يَا رَسُولَ اللَّهِ إِنَّمَا هِيَ بُرْدَةً مَلْحَاءُ قَالَ : أَمَا لَكَ فِي أُسْوَةٌ ؟ فَنَظَرْتُ فَإِذَا إِزَارُهُ إِلَى نِصْفِ سَاقَيْهِ
৯১. আশ'আস ইবনে সুলায়েম (রহঃ) বলেন, আমি আমার ফুফু হতে হাদীস শুনেছি। তিনি তাঁর চাচা (উবাইদ ইবনে খালিদ) হতে বর্ণনা করেন। তিনি বলেন, আমি একবার মদিনা যাচ্ছিলাম। পথিমধ্যে একজন লোক পেছন থেকে আমাকে চিৎকার করে বলে উঠলেন, তোমার কাপড় উপরে উঠাও; কারণ, তা অধিকতর (ধূলাবালি হতে) হেফাযতকারী ও স্থায়িত্বদানকারী। আমি পেছনে তাকিয়ে দেখলাম তিনি আর কেউ নন, স্বয়ং রাসূলুল্লাহ ﷺ। আমি বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! এ তো সাদা ডোরা কালো কাপড় (এতে আবার অহংকার করার কি আছে?) তিনি বললেন, আমার মধ্যে কি তোমার জন্য অনুকরণীয় আদর্শ নেই? তখন আমি লক্ষ্য করলাম, তাঁর লুঙ্গি অর্ধ গোছ (হাটুর নিচে ও গোড়ালীর উপর) পর্যন্ত ঝুলন্ত।৯৩
তিনি টাখনুর নিচে লুঙ্গি পরিধান করতে নিষেধ করেছেন :
عَنْ حُذَيْفَةَ بْنِ الْيَمَانِ هِ قَالَ : أَخَذَ رَسُولُ اللهِ ﷺ بِعَضَلَةِ سَاقِي أَوْ سَاقِهِ فَقَالَ : هَذَا مَوْضِعُ الْإِزَارِ ، فَإِنْ آبَيْتَ فَأَسْفَلَ ، فَإِنْ أَبَيْتَ فَلَا حَقَّ لِلإِزَارِ فِي الْكَعْبَيْنِ
৯২. হুযায়ফা ইবনে ইয়ামান (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একবার রাসূলুল্লাহ ﷺ আমার পায়ের গোছা অথবা (রাবীর সন্দেহ) পায়ের নলার গোশত ধরে বললেন, এ-ই হলো লুঙ্গি পরিধানের নিম্নতম স্থান। তুমি যদি এটাতে তৃপ্তিবোধ না কর তাহলে সামান্য নিচে নামাতে পার। এতেও যদি তুমি তৃপ্তিবোধ না কর, তাহলে জেনে রেখো, লুঙ্গি টাখনুর নিচে পরিধান করার কোন অধিকার তোমার নেই। ৯৪
টিকাঃ
২ সহীহ বুখারী, হা/১৮৫৮; মুসনাদে আহমাদ, হা/২৪০৮৩; মুস্তাদরাকে হাকেম, হা/৪২০৬।
৯৩ সুনানুল কুবরা লিন নাসাঈ, হা/(৯৬০৩; শারহুস সুন্নাহ, হা/৩০৭৯; মুসনাদুত তায়ালুসী, হা/১২৮৬, শু'আবুল ঈমান, হা/৫৭৩৭।
৯৪ ইবনে মাজাহ, হা/৩৫৭২; মুসনাদে আহমাদ হা/২৩৪৫০।
📄 রাসূলুল্লাহ্ ﷺ এর হাঁটা-চলা
বَابُ مَا جَاءَ فِي مَشْيَةِ رَسُولِ اللهِ ﷺ
অধ্যায়- ১৯: রাসূলুল্লাহ ﷺ এর হাঁটা-চলা
عَنْ إِبْرَاهِيمُ بْنُ مُحَمَّدٍ . مِنْ وَلَدِ عَلِيِّ بْنِ أَبِي طَالِبٍ قَالَ : كَانَ عَلِيٌّ إِذَا وَصَفَ النَّبِيَّ ﷺ قَالَ : كَانَ إِذَا مَشَى تَقَلَّعَ كَأَنَّمَا يَنْحَظُ مِنْ صَبَبٍ
৯৩. আলী ইবনে আবু তালিব এর নাতী ইবরাহীম ইবনে মুহাম্মাদ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আলী (রাঃ) যখন নবী ﷺ এর চরিত্র ও বৈশিষ্ট্য বর্ণনা করতেন তখন বলতেন, তিনি যখন পথ চলতেন তখন পা তুলে এমনভাবে চলতেন যে, মনে হতো তিনি যেন উঁচু স্থান হতে নিচে অবতরণ করছেন।
عَنْ عَلِيِّ بْنِ أَبِي طَالِبٍ ، قَالَ : كَانَ النَّبِيُّ ﷺ إِذَا مَشَى تَكَفَّا تَكَفُوا كَأَنَّمَا يَنْحَطُ مِنْ صَبَبٍ
৯৪. আলী ইবনে আবু তালিব (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ যখন পথ চলতেন তখন সামনের দিকে এমনভাবে ঝুঁকে হাঁটতেন, মনে হতো তিনি যেন কোন উঁচু স্থান হতে নিচে অবতরণ করছেন।
টিকাঃ
⁹⁵ শারহুস সুন্নাহ, হা/৩৩৫৩; মুসনাদে আহমাদ, হা/৭৪৬; মিশকাত, হা/৫৭৯০।