📘 সহীহ শামায়েলে তিরমিযী > 📄 রাসূলুল্লাহ্ ﷺ এর জীবন-যাপন

📄 রাসূলুল্লাহ্ ﷺ এর জীবন-যাপন


بَابُ مَا جَاءَ فِي عَيْشِ رَسُولِ اللهِ ﷺ
অধ্যায়-৯: রাসূলুল্লাহ এর জীবন-যাপন

রাসূলুল্লাহ সাধারণ জীবন-যাপন করতেন:

عَنْ مُحَمَّدِ بْنِ سِيرِينَ قَالَ : كُنَّا عِنْدَ أَبِي هُرَيْرَةَ ، وَعَلَيْهِ ثَوْبَانِ مُسَشَّقَانِ مِنْ كَتَانٍ فَتَمَخَّطَ فِي أَحَدِهِمَا ، فَقَالَ : بَحْ بَحْ يَتَمَخَّطُ أَبُو هُرَيْرَةَ فِي الْكَتَّانِ ، لَقَدْ رَأَيْتُنِي وَإِنِّي لَآخِرُ فِيمَا بَيْنَ مِنْبَرِ رَسُولِ اللَّهِ ﷺ وَحُجْرَةِ عَائِشَةَ مَغْشِيًّا عَلَيَّ فَيَجِيءُ الْجَانِي فَيَضَعُ رِجْلَهُ عَلَى عُنُقِي يَرَى أَنَّ بِي جُنُونًا ، وَمَا بِي جُنُونٌ ، وَمَا هُوَ إِلَّا الْجُمْعُ

৫৬. মুহাম্মদ ইবনে সীরীন (রহঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমরা একদিন আবু হুরায়রা (রাঃ)-এর কাছে উপস্থিত ছিলাম। তখন তাঁর দেহে দুটি কাতানের কাপড় (অর্থাৎ একটি কাতানের চাদর ও একটি লুঙ্গি) শোভা পাচ্ছিল। আবু হুরায়রা (রাঃ) তার একটি দ্বারা নাক পরিস্কার করছিলেন। তখন তিনি বলে উঠলেন। বাহ, বাহ! আবু হুরায়রা কাতানের কাপড় দ্বারা নাক পরিস্কার করছ! অথচ এক সময় এমন ছিল যখন আমি নিজে রাসূলুল্লাহ এর মিম্বর এবং আয়েশা (রাঃ) এর হুজরার পার্শ্বে পেটের জ্বালায় কাতর হয়ে অচেতন অবস্থায় পড়ে থাকতাম। প্রায় আগন্তুকই আমাকে মৃগী রোগী মনে করে গর্দানে পা দ্বারা আঘাত করত। প্রকৃতপক্ষে আমার মধ্যে উন্মাদনার লেশমাত্র ছিল না, বরং প্রচণ্ড ক্ষুধার জ্বালাতেই আমার এ অবস্থা হতো।

ব্যাখ্যা: রাসূলুল্লাহ এর জীবনী গ্রন্থে আবু হুরায়রা (রাঃ) এর ঘটনা বর্ণনার কারণ হলো, তিনি রাসূলুল্লাহ এর একনিষ্ঠ খাদেম ছিলেন। আবু হুরায়রা (রাঃ) ছিলেন আসহাবে সুফ্ফার একজন সদস্য। তাঁরা রাসূলুল্লাহ এর মেহমান ছিলেন। আর মেহমানের অবস্থা থেকে মেযবানের অবস্থা নির্ণয় করা যায়। অর্থাৎ মেহমান যেহেতু খাবারের জন্য কষ্ট করছেন এতে সহজেই অনুমান করা যায় যে, মেযবান তথা নবী এর ঘরে তখন পর্যাপ্ত খাবার ছিল না।

আবূ হুরায়রা (রাঃ) উক্ত হাদীসে তাঁর ইসলাম গ্রহণের পর প্রাথমিক সময়ের অবস্থা এবং পরবর্তী অবস্থার মধ্যে পার্থক্য করেছেন। এটা রাসূলুল্লাহ এর ইন্তেকালের পরের ঘটনা।

টিকাঃ
⁵* সহীহ বুখারী, হা/৭৩২৪।

📘 সহীহ শামায়েলে তিরমিযী > 📄 রাসূলুল্লাহ্ ﷺ এর মোজা ব্যবহার

📄 রাসূলুল্লাহ্ ﷺ এর মোজা ব্যবহার


রাসূলুল্লাহ ﷺ নাজ্জাশীর হাদিয়াকৃত কালো রঙের মোজা পরিধান করতেন:
عَنِ ابْنِ بُرَيْدَةَ ، عَنْ أَبِيْهِ . أَنَّ النَّجَاشِيَ أَهْدَى لِلنَّبِيِّ ﷺ خُفَّيْنِ أَسْوَدَيْنِ سَادَجَيْنِ. فَلَبِسَهُمَا ثُمَّ تَوَضَّأَ وَمَسَحَ عَلَيْهِمَا
৫৮. ইবনে বুরাইদা (রাঃ) তাঁর পিতা হতে বর্ণনা করেন যে, একদা নাজ্জাশী রাসূলুল্লাহ-কে এক জোড়া কালো রঙের মোজা হাদিয়া পাঠান। এরপর তিনি ঐ মোজা দুটি পরিধান করে ওযু করলেন এবং এর উপর মাসেহ করলেন।
ব্যাখ্যা: তৎকালীন হাবশার (আবিসিনিয়ার) বাদশার উপাধি ছিল নাজ্জাশী। মক্কা হতে মুসলমানদের হাবশায় হিজরত করাটা নাজ্জাশীর শাসনামলে হয়েছিল। তিনি ইসলাম কবুল করেছিলেন। নাজ্জাশী রাসূলুল্লাহ-কে বিভিন্ন জিনিস উপহার হিসেবে পাঠিয়ে ছিলেন। তার মধ্যে একটি কোর্তা, একটি পাজামা এবং একটি রুমাল ছিল। রাসূলুল্লাহ তাঁর মৃত্যুর সংবাদ শুনে সাহাবীদেরকে নিয়ে গায়েবানা জানাযা আদায় করেছিলেন। আর এটাই হলো প্রথম গায়েবানা জানাযার নামায।

টিকাঃ
৬০ আবু দাউদ, হা/১৫৫; ইবনে মাজাহ, হা/৫৪৯; মুসনাদে আহমাদ, হা/২৩০৩১: সুনানে কুবরা লিল বায়হাকী, হা/১৩৯৪।

📘 সহীহ শামায়েলে তিরমিযী > 📄 রাসূলুল্লাহ্ ﷺ এর জুতার বিবরণ

📄 রাসূলুল্লাহ্ ﷺ এর জুতার বিবরণ


রাসূলুল্লাহ এর প্রতিটি জুতায় দুটি করে ফিতা ছিল:
عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ ﷺ قَالَ : كَانَ لِنَعْلِ رَسُولِ اللَّهِ ﷺ قِبَالَانِ مَثْنِيٌّ شِرَا لَهُمَا
৫৯. ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ এর প্রতিটি জুতায় দুটি করে ফিতা ছিল। ৬১
তাঁর জুতা ছিল চামড়ার:
حَدَّثَنَا عِيسَى بْنُ طَهْمَانَ قَالَ : أَخْرَجَ إِلَيْنَا أَنَسُ بْنُ مَالِكٍ نَعْلَيْنِ جَرْدَا وَيْنِ لَهُمَا قِبَالَانِ. قَالَ : فَحَدَّثَنِي ثَابِتٌ بَعْدُ عَنْ أَنَسٍ أَنَّهُمَا كَانَتَا نَعْلَي النَّبِيِّ ﷺ
৬০. ঈসা ইবনে তাহমান (রহঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আনাস ইবনে মালিক (রাঃ) আমাদের সম্মুখে দুটি লোমশূণ্য জুতা নিয়ে আসেন। আর ঐ দুটিতে দুটি করে চামড়ার ফিতা ছিল। তিনি (আহমাদ) বলেন, পরে সাবিত (রহঃ) আমাকে আনাস (রাঃ) হতে হাদীস শোনান যে, সে জুতা দুটি ছিল রাসূলুল্লাহ এর। ৬২
ব্যাখ্যা: সে সময়ে আরবে পশমসহ চামড়া দ্বারা জুতা বানানোর রীতি ছিল এবং এ ধরনের জুতা পরিধানের রীতি ছিল। এজন্য বর্ণনাকারী স্পষ্ট করে বর্ণনা করেন যে, রাসূলুল্লাহ এর জুতা পশমবিহীন ছিল।
তিনি এসব জুতা পরে ওযু করতেন:
عَنْ عُبَيْدِ بْنِ جُرَيْجٍ ، أَنَّهُ قَالَ لِابْنِ عُمَرَ : رَأَيْتُكَ تَلْبَسُ النِّعَالَ السَّبْنِيَّةَ ، قَالَ : إِنِّي رَأَيْتُ رَسُولَ اللَّهِ ﷺ يَلْبَسُ النِّعَالَ الَّتِي لَيْسَ فِيهَا شَعَرٌ ، وَيَتَوَضَّأُ فِيهَا ، فَأَنَا أُحِبُّ أَنْ الْبَسَهَا
৬১. উবাইদ ইবনে জুরাইজ (রহঃ) হতে বর্ণিত। তিনি ইবনে উমর (রাঃ)-কে বললেন, আমি আপনাকে লোমশূণ্য জুতা পরিধান করতে দেখেছি। অতঃপর তিনি বললেন, আমি রাসূলুল্লাহ কে এমন জুতা পরিধান করতে দেখেছি, যাতে কোন লোম ছিল না। আর তিনি সে জুতা পরিধান করে ওযু করেছেন। তাই আমি লোমশূণ্য জুতা অধিক ভালোবাসি। ৮০
তাঁর জুতার ফিতা দুটি ছিল চামড়ার:
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ ﷺ ، قَالَ : كَانَ لِنَعْلِ رَسُوْلِ اللَّهِ ﷺ قِبَالَانِ
৬২. আবু হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ এর জুতায় দুটি করে চামড়ার ফিতা ছিল। ৬৪
রাসূলুল্লাহ তালিযুক্ত জুতাও পরিধান করতেন:
عَنْ عَمْرِو بْنِ حُرَيْثٍ ﷺ يَقُولُ : رَأَيْتُ رَسُولَ اللهِ ﷺ يُصَلِّي فِي نَعْلَيْنِ مَخْصُوفَتَيْنِ
৬৩. আমর ইবনে হুরায়ছ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ -কে তালিযুক্ত জুতা পরিধান করে সালাত আদায় করতে দেখেছি। ৬৫
তিনি এক পায়ে জুতা পরিধান করতে নিষেধ করেছেন:
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ ، أَنَّ رَسُولَ اللهِ ﷺ قَالَ : لَا يَمْشِيَنَّ أَحَدُكُمْ فِي نَعْلٍ وَاحِدَةٍ ، لِيُنْعِلُهُمَا جَمِيعًا أَوْ لِيُحْفِهِمَا جَمِيعًا
৬৪. আবু হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ বলেছেন, তোমাদের কেউ যেন এক পায়ে জুতা পরিধান করে না হাঁটে। হয়তো দু'পায়ে জুতা পরিধান করবে কিংবা খালি পায়ে হাঁটবে। ৬৬
عَنْ جَابِرٍ ، أَنَّ النَّبِيَّ ﷺ نَهَى أَنْ يَأْكُلَ ، يَعْنِي الرَّجُلَ ، بِشِمَالِهِ ، أَوْ يَمْشِيَ فِي نَعْلٍ وَاحِدَةٍ
৬৫. জাবির (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী বাম হাতে খেতে এবং এক পায়ে জুতা পরিধান করতে নিষেধ করেছেন। ৬৭
জুতা পরিধান করা এবং খোলার ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ এর দিক নিদের্শনা:
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ ، أَنَّ النَّبِيَّ ﷺ قَالَ : إِذَا انْتَعَلَ أَحَدُكُمْ فَلْيَبْدَأُ بِالْيَمِينِ ، وَإِذَا نَزَعَ فَلْيَبْدَأُ بِالشِّمَالِ ، فَلْتَكُنِ الْيَمِينُ أَوْ لَهُمَا تُنْعَلُ وَاخِرَهُمَا تُنْزَعُ
৬৬. আবু হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত। নবী ইরশাদ করেছেন, যখন তোমাদের কেউ জুতা পরিধান করে তখন সে যেন ডান দিক থেকে আরম্ভ করে। কিন্তু খোলার সময় যেন বাম দিক হতে আরম্ভ করে। আর তাই জুতা পরিধানে ডান পা প্রথমে দেবে এবং খোলার সময় বাম পা হতে প্রথমে জুতা খোলবে। ৬৮
রাসূলুল্লাহ ডান দিক থেকে জুতা পরিধান করতেন:
عَنْ عَائِشَةَ قَالَتْ : كَانَ رَسُولُ اللهِ ﷺ يُحِبُّ التَّيَمَنَ مَا اسْتَطَاعَ فِي تَرْجُلِهِ وَتَنَعُلِهِ وَظُهُورِهِ
৬৭. আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ তাঁর কেশ বিন্যাস করা, জুতা পরিধান করা ও পবিত্রতা অর্জনের ব্যাপারে ডান দিক হতে আরম্ভ করা পছন্দ করতেন। ৬৯
আবু বকর ও উমর (রাঃ)ও রাসূলুল্লাহর এর ন্যায় জুতা ব্যবহার করতেন:
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ ، قَالَ : كَانَ لِنَعْلِ رَسُولِ اللهِ ﷺ قِبَالَانِ وَأَبِي بَكْرٍ وَعُمَرَ ، وَأَوَّلُ مَنْ عَقَدَ عَقْدًا وَاحِدًا عُثْمَانُ
৬৮. আবু হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ, আবু বকর (রাঃ) ও উমর (রাঃ) প্রমুখের জুতায় দুটি করে ফিতা ছিল। উসমান (রাঃ)-ই সর্বপ্রথম এক ফিতাবিশিষ্ট জুতা পরিধান করেন। ৭০

টিকাঃ
৬১ ইবনে মাজাহ, হা/৩৬১৪; শারহুস সুন্নাহ, হা/৩১৫৪।
৬২ সহীহ বুখারী, হা/৩১২৭।
৮০ মুয়াত্তা ইমাম মালেক, হা/৭৩৩; সহীহ বুখারী, হা/১৬৬; সহীহ মুসলিম, হা/২৮৭৫; আবু দাউদ, হা/১৭৭৪; মুসনাদে আহমাদ, হা/৫৩৩৮; সহীহ ইবনে হিব্বান, হা/৩৭৬৩।
৬৪ মুজামুল সগীর, হা/২৫৪।
৬৮ সুনানে কুবরা লিন নাসাঈ, হা/৯৭১৭; মুসনাদে আবু ইয়ালা, হা/১৪৬৫।
৬৬ মুয়াত্তা মালেক, হা/১৬৩৩; সহীহ বুখারী, হা/৫৮৫৬।
৬৭ সহীহ মুসলিম, হা/৫৬২০; মুসনাদে আহমাদ, হা/১৪১৫৩; সুনানুল কুবরা লিল বায়হাকী, হা/৩৩৩২।
৬৮ মুয়াত্তা মালেক, হা/১৬৩৪; সহীহ বুখারী, হা/৫৮৫৫; মুসনাদে আহমাদ, হা/১০০০৪।
৬৯ সহীহ বুখারী, হা/৪২৬; সুনানে নাসাঈ, হা/৪২১; মুসনাদে আহমাদ, হা/২৪৬৭১; ইবনে হিব্বান, হা/১০৯১।
৭০ মুজামুল কাবীর, হা/১২৮।

📘 সহীহ শামায়েলে তিরমিযী > 📄 রাসূলুল্লাহ্ ﷺ এর আংটির বিবরণ

📄 রাসূলুল্লাহ্ ﷺ এর আংটির বিবরণ


রাসূলুল্লাহ এর আংটিতে আবিসিনীয় পাথর বসানো ছিল:
عَنْ أَنَسِ بْنِ مَالِكٍ قَالَ : كَانَ خَاتَمُ النَّبِيِّ ﷺ مِنْ وَرِقٍ ، وَكَانَ فَقُهُ حَبَشِيًّا
৬৯. আনাস ইবনে মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী রূপার আংটি ব্যবহার করতেন। আর তাঁর আংটিতে আবিসিনীয় পাথর বসানো ছিল। ৭১
রাসূলুল্লাহ সীল মারার জন্য আংটিটি তৈরি করেছিলেন:
عَنْ أَنَسِ بْنِ مَالِكٍ هُ قَالَ : لَمَّا أَرَادَ رَسُولُ اللهِ ﷺ أَنْ يَكْتُبَ إِلَى الْعَجَمِ قِيلَ لَهُ : إِنَّ الْعَجَمَ لَا يَقْبَلُونَ إِلَّا كِتَابًا عَلَيْهِ خَاتَمْ ، فَاصْطَنَعَ خَاتَمًا فَكَانِي أَنْظُرُ إِلَى بَيَاضِهِ فِي كَفِهِ
৭১. আনাস ইবনে মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ যখন অনারব রাজা-বাদশাহদের কাছে দাওয়াতপত্র প্রেরণের সংকল্প (ইচ্ছা) করেন তখন তাঁকে জানিয়ে দেয়া হয় যে, তারা সীল ছাড়া চিঠি গ্রহণ করে না। তাই তিনি একটি আংটি তৈরি করান। তাঁর হাতের নিচে রাখা আংটিটির ঔজ্জ্বল্য যেন আজও আমার চোখের সামনে ভাসছে।৭৩
ব্যাখ্যা: রাসূলুল্লাহ প্রথমত কোন আংটি তৈরি করেননি। কিন্তু যখন অবগত হলেন বিভিন্ন রাজা-বাদশাহগণ সীল-মোহর ছাড়া চিঠিপত্রের মূল্যায়ন করেন না, তাই রাসূলুল্লাহ দীনের দাওয়াত দিয়ে চিঠি প্রেরণের জন্য আংটি তৈরি করেন।
হাদীস থেকে প্রতিয়মান হয় যে, চিঠিপত্রের মাধ্যমে দীনের দাওয়াত দেয়াও সুন্নত। সুলায়মান (আঃ) সর্বপ্রথম চিঠির মাধ্যমে সাবার রাণী বিলকীসকে দাওয়াত দিয়েছিলেন।
আংটিটিতে 'মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ' অংকিত ছিল:
عَنْ أَنَسِ بْنِ مَالِكٍ ، قَالَ : كَانَ نَقْشُ خَاتَمِ رَسُولِ اللهِ ﷺ : مُحَمَّدٌ سَطْرٌ ، وَرَسُولٌ سَطْرٌ ، وَاللَّهُ سَطْرٌ
৭২. আনাস ইবনে মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ এর আংটিতে 'মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ' অংকিত ছিল। 'মুহাম্মাদ' এক লাইনে, 'রাসূল' এক লাইনে এবং 'আল্লাহ' এক লাইনে। ৭৪
عَنْ أَنَسِ بْنِ مَالِكٍ ه . أَنَّ النَّبِيَّ ﷺ كَتَبَ إِلَى كِسْرَى وَقَيْصَرَ وَالنَّجَاشِيِّ ، فَقِيلَ لَهُ : إِنَّهُمْ لَا يَقْبَلُونَ كِتَابًا إِلَّا بِخَاتَمٍ فَصَاغَ رَسُولُ اللهِ ﷺ خَاتَمًا حَلْقَتُهُ فِضَّةٌ ، وَنُقِشَ فِيْهِ : مُحَمَّدٌ رَسُولُ اللَّهِ
৭৩. আনাস ইবনে মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী পারস্য সম্রাট কিসরা, রোম সম্রাট কায়সার এবং আবিসিনীয় বাদশাহ নাজ্জাশীর নিকট (ইসলাম গ্রহণের দাওয়াত দিয়ে) চিঠি লেখার ইচ্ছে পোষণ করেন। তখন তাঁকে জানানো হলো যে, তারা সীল-মোহর ছাড়া চিঠি গ্রহণ করেন না। এরপর রাসূলুল্লাহ একটি আংটি তৈরি করান, যার বৃত্তটি ছিল রৌপ্যের। আর তিনি ঐ আংটিতে 'মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ' অংকিত করান। ৭৫
ব্যাখ্যা: রাসূলুল্লাহ যেসব বাদশাহর নামে চিঠি পাঠিয়েছেন: রাসূলুল্লাহ যেসব রাজা-বাদশাহ ও শাসকদের নামে ইসলামের দাওয়াত দিয়ে চিঠি প্রেরণ করেন তাদের কয়েকজনের তালিকা নিম্নে দেয়া হলো:
১. রোমের সম্রাট হিরাক্লিয়াস : সাহাবী দিহইয়া কালবী (রাঃ) তার কাছে চিঠি নিয়ে যান। রাসূলুল্লাহ ﷺ এর নবুওয়াতের প্রতি তার বিশ্বাস থাকার পরও তিনি ঈমান আনেননি। তবে রাসূলুল্লাহ ﷺ এর চিঠির কোন অবমাননাও করেননি।
২. পারস্যের সম্রাট পারভেজ : আবদুল্লাহ ইবনে হুযাফা আস-সাহমী (রাঃ) তার কাছে চিঠি নিয়ে যান। পাপী পারভেজ রাসূলুল্লাহ ﷺ এর চিঠি ছিঁড়ে টুকরা টুকরা করে ফেলে। অতঃপর রাসূলুল্লাহ ﷺ এর বদ দু'আর ফলে তার রাজ্যও ভেঙ্গে টুকরা টুকরা হয়ে যায়।
৩. আবিসিনিয়ার অধিপতি নাজ্জাশী : এ চিঠির বাহক সাহাবী আমর ইবনে উমাইয়া (রাঃ)। যে নাজ্জাশী হাবশায় মুসলমানদেরকে স্থান দিয়েছিলেন তাঁর নাম আমবাসা। ষষ্ঠ হিজরী সনে তিনি ইসলাম গ্রহণ করেন এবং নবম হিজরী সনে মারা যান। মদিনায় রাসূলুল্লাহ ﷺ তাঁর গায়েবানা জানাযা আদায় করেন।
৪. মিশরের রাজা মুকাওকিস : তার কাছে চিঠি নিয়ে যান হাতিব ইবনে আবী বালতা'আ। তিনি ইসলাম কবুল করেননি। তবে রাসূলুল্লাহ ﷺ এর নিকট হাদিয়া প্রেরণ করেন।
৫. বাহরাইনের রাজা মুনযির ইবনে সাদী: আলা ইবনে হাযরাম (রাঃ) তার কাছে চিঠি নিয়ে যান। তিনি ইসলাম কবুল করেন এবং ইসলামী খিলাফাতের অন্তর্ভুক্ত হয়ে যান।
৬. আম্মানের রাজা: সে সময় আম্মানে ছিল দু'জন বাদশাহ। রাসূলুল্লাহ ﷺ আমর ইবনে আস (রাঃ) এর মাধ্যমে তাদের কাছে চিঠি প্রেরণ করেন। চিঠি পেয়ে তাঁরা উভয়েই ইসলাম গ্রহণ করেন।
আংটিটি পর্যায়ক্রমে খলীফাগণ ব্যবহার করেন এবং উসমান (রাঃ) এর হাত থেকে তা একটি কূপে পড়ে যায়:
عَنِ ابْنِ عُمَرَ ، قَالَ : اتَّخَذَ رَسُولُ اللهِ ﷺ خَاتَمًا مِنْ وَرِقٍ ، فَكَانَ فِي يَدِهِ ثُمَّ كَانَ فِي يَدِ أَبِي بَكْرٍ ، وَيَدِ عُمَرَ ثُمَّ كَانَ فِي يَدِ عُثْمَانَ ، حَتَّى وَقَعَ فِي بِئْرِ آرِيسٍ نَقْشُهُ : مُحَمَّدٌ رَسُولُ اللَّهِ
৭৪. ইবনে উমর (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ একটি রূপার আংটি তৈরি করান। সর্বদা তা তাঁর হাতে থাকত। তারপর তা পালাক্রমে আবু বকর (রাঃ) উমর (রাঃ) এর হাতে আসে। এরপর উসমান (রাঃ) এর হাত থেকে (মু'আয়কিবের সাথে লেনদেনের সময়) তা আরীস নামক কূপে পড়ে যায়। তাতে 'মুহাম্মাদুর রাসূলুল্লাহ' অংকিত ছিল। ৭৬
ব্যাখ্যা: এ কূপটি মসজিদে কুবার নিকটস্থ একটি খেজুর বাগানে অবস্থিত ছিল। সিরীয় ভাষাতে 'আরীস' অর্থ কৃষক। আরীস নামক একজন ইয়াহুদির নাম অনুপাতে ঐ কূপের নামকরণ করা হয়েছিল 'বি'রে আরীস' বা আরীসের কূপ।

টিকাঃ
৭১ আবু দাউদ, হা/৪২১৮
৭২ নাসাঈ, হা/৫২১৮; মুসনাদে আহমাদ, হা/৫৩৬৬।
৭৩ সহীহ মুসলিম, হা/৫৬০২; মুসনাদে আবু ইয়ালা, হা/৩০৭৫।
৭৪ সহীহ বুখারী, হা/৫৮৭৮; ইবনে হিব্বান, হা/১৪১৪।
৭৫ সহীহ মুসলিম, হা/৫৬০৩।
৭৬ সহীহ বুখারী, হা/৫৮৭৩; সহীহ মুসলিম, হা/৫৫৯৭; মুসনাদে আহমাদ, হা/৪৭৩৪; সুনানে কুবরা লিন নাসাঈ, হা/৭৮১৪।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00