📄 রাসূলুল্লাহ্ ﷺ এর পোশাক-পরিচ্ছদ
بَابُ مَا جَاءَ فِي لِبَاسِ رَسُولِ اللَّهِ ﷺ
অধ্যায়- ৮: রাসূলুল্লাহ ﷺ এর পোশাক-পরিচ্ছদ
পোশাক পরিধান করা কোন ক্ষেত্রে ফরয, কোন ক্ষেত্রে হারাম, কোন ক্ষেত্রে মুস্তাহাব, আবার কোন ক্ষেত্রে মুবাহ। ফরয পোশাক হলো এতটুকু পরিধান করা, যা দ্বারা সতর আবৃত করা যায়। মুstahab হলো যার ব্যাপারে শরীয়ত উৎসাহ দান করেছে। যেমন- দু'ঈদে উত্তম পোশাক পরিধান করা। মাকরূহ ঐ পোশাক, যা পরিধান করতে উৎসাহিত করা হয়নি। যেমন- ধনীদের সর্বদা ছিন্ন ও পুরাতন কাপড় পরিধান করা। হারাম ঐ পোশাক, যা শরীয়তে নিষিদ্ধ। যেমন- পুরুষের জন্য ওজর ব্যতীত রেশমী কাপড় পরিধান করা ইত্যাদি।
রাসূলুল্লাহ ﷺ এর প্রিয় পোষাক ছিল কামীস:
عَنْ أُمِّ سَلَمَةَ ، قَالَتْ : كَانَ أَحَبَّ الشَّيَابِ إِلَى رَسُولِ اللَّهِ ﷺ الْقَمِيصُ
৪৪. উম্মে সালামা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ পোশাক হিসেবে 'কামীস' বা জামা সর্বাধিক পছন্দ করতেন।
ব্যাখ্যা: বিভিন্ন হাদীসের ভিত্তিতে বুঝা যায়, রাসূলুল্লাহ ﷺ বিভিন্ন ধরনের জামা পরিধান করতেন। তার কোনটির দৈর্ঘ্য ছিল টাখনু অবধি। কোনটি কিছুটা ছোট, যা হাঁটুর নিম্নভাগ পর্যন্ত ছিল। আবার কোনটির হাতা ছিল হাতের আঙ্গুলের প্রান্ত পর্যন্ত লম্বা। কোনটির হাতা কিছুটা ছোট, যা কব্জি পর্যন্ত ছিল।
পুরুষের পোশাক পরিধানের ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ ﷺ একটি বিশেষ দিক অত্যন্ত গুরুত্ব প্রদান করেছেন। তিনি পুরুষের পোশাকের নিচের অংশ পায়ের গোড়ালী থেকে উপরে রাখার আদেশ করেছেন এবং গোড়ালীর নিচে পাজামা, লুঙ্গি, জামা বা কোন পোশাক পরিধান করতে হারাম ঘোষণা করেছেন।
সর্বদা রাসূলুল্লাহ ﷺ এর লুঙ্গি ও জামা 'টাখনুর' উপরে থাকত। সাধারণত তিনি পোশাকের নিচের অংশ হাঁটু ও গোড়ালীর বরাবর বা 'নিসফে সাক' পর্যন্ত পরিধান করতেন। বিভিন্ন হাদীসে তিনি মুসলিম উম্মাহর পুরুষগণকে এভাবে পোশাক পরিধান করতে আদেশ দিয়েছেন। সুতরাং মুসলিম পুরুষের জন্য স্বেচ্ছায় টাখনুর নিচে পোশাক পরিধান করা হারাম। আবু হুরায়রা, আবদুল্লাহ ইবনে উমর ও অন্যান্য সাহাবী কর্তৃক বর্ণিত হাদীসে রাসূলুল্লাহ ﷺ বলেন, যে ব্যক্তি দাম্ভিকতার সাথে নিজের পোশাক ঝুলিয়ে পরিধান করবে, আল্লাহ তা'আলা ক্বিয়ামতের দিন তার দিকে রহমতের দৃষ্টিতে তাকাবেন না।
টিকাঃ
⁴⁴ ইবনে মাজাহ, হা/৩৪৯৭; ইবনে হিব্বান, হা/৬০৭৩; মুস্তাদরাকে হাকেম, হা/৮২৪৮।
⁴⁵ ইবনে মাজাহ, হা/৪০২৭।
⁴⁶ সহীহ বুখারী, হা/৩৬৬৫; সহীহ মুসলিম, হা/৫৫৭৮।
মুসলিমের পোশাকের নীতি:
(১) পুরুষের পোশাক রেশমী হবে না।
(২) পোশাক সতর ঢাকার মতো হবে।
(৩) পুরুষের পোশাক মহিলাগণ পরবে না। আর মহিলা পুরুষের পোশাক পরবে না।
(৪) পোশাক যেন অহংকার প্রকাশার্থে না হয়।
(৫) পুরুষরা টাখনুর নিচে পোশাক পরিধান করবে না।
(৬) ইচ্ছাকৃতভাবে কাফিরদের সাদৃশ্য অবলম্বনার্থে তাদের পোশাক পরিধান করা যাবে না।
রাসূলুল্লাহ তাঁর জামার বোতাম খোলা রাখতেন:
عَنْ مُعَاوِيَةَ بْنِ قُرَّةَ ، عَنْ أَبِيْهِ قَالَ : أَتَيْتُ رَسُولَ اللهِ ﷺ فِي رَهْطٍ مِنْ مُزَيْنَةَ لِنُبَايِعَهُ ، وَإِنَّ قَمِيصَهُ لَمُطْلَقٌ ، أَوْ قَالَ : زِرُّ قَمِيصِهِ مُطلَقٌ ، قَالَ : فَأَدْخَلْتُ يَدِي فِي جَيْبِ قَمِيصِهِ فَمَسَسْتُ الْخَاتَمَ
৪৫. মু'আবিয়া ইবনে কুররা (রাঃ) তাঁর পিতা হতে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, আমি মুযায়না গোত্রের একদল লোকের সাথে বায়'আত গ্রহণ করার জন্য রাসূলুল্লাহ এর কাছে উপস্থিত হলাম। এ সময় তাঁর জামার বোতাম খোলা ছিল। আমি তখন (বরকত লাভ করার জন্য) জামার ফাঁক দিয়ে হাত ঢুকিয়ে মোহরে নবুওয়াত স্পর্শ করলাম।
ব্যাখ্যা: বিভিন্ন হাদীসের আলোকে মনে হয় যে, রাসূলুল্লাহ এর জামার বোতাম ছিল। তবে তিনি সাধারণত বোতাম লাগাতেন না। ফলে জামার ভেতর হাত প্রবেশ করিয়ে পিঠের মোহরে নবুওয়াত স্পর্শ করা সহজ ছিল।
তিনি ইয়ামেনী নকশী কাপড়ও পরিধান করতেন:
عَنْ أَنَسِ بْنِ مَالِكٍ ، أَنَّ النَّبِيَّ ﷺ خَرَجَ وَهُوَ يَتَّكِيُّ عَلَى أُسَامَةَ بْنِ زَيْدٍ عَلَيْهِ ثَوْبٌ قِطْرِيٌّ قَدْ تَوَشَحَ بِهِ ، فَصَلَّى بِهِمْ
৪৬. আনাস ইবনে মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত। একদা নবী উসামা ইবনে যায়েদ (রাঃ)-এর কাঁধে ভর করে বাইরে বের হলেন। এ সময় তাঁর দেহে পরা ছিল একটি ইয়ামেনী নকশী কাপড়। তারপর তিনি লোকদের নামাযের ইমামতি করেন।
ব্যাখ্যা: রাসূলুল্লাহ অসুস্থতার কারণে উসামা (রাঃ) এর কাঁধে ভর করে এসেছিলেন।
টিকাঃ
** আবু দাউদ, হা/৪০৮৪; মুসনাদে আহমাদ, হা/১৫৬১৯।
⁴⁸ মুসনাদে আহমাদ, হা/১৩৭৮৭।
তিনি নতুন কাপড় পরিধানকালে কাপড়ের নাম উচ্চারণ পূর্বক দু'আ পাঠ করতেন:
عَنْ أَبِي سَعِيدٍ الْخُدْرِيِّ قَالَ : كَانَ رَسُولُ اللهِ ﷺ إِذَا اسْتَجَدَّ ثَوْبًا سَمَّاهُ بِاسْمِهِ عِمَامَةً أَوْ قَمِيصًا أَوْ رِدَاءً . ثُمَّ يَقُولُ : اللَّهُمَّ لَكَ الْحَمْدُ كَمَا كَسَوْتَنِيْهِ ، أَسْأَلُكَ خَيْرَةً وَخَيْرَ مَا صُنِعَ لَهُ . وَأَعُوذُ بِكَ مِنْ شَرِّهِ وَشَرِّ مَا صُنِعَ لَهُ
৪৭. আবু সা'ঈদ খুদরী (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ যখন নতুন কাপড় পরিধান করতেন তখন কাপড়ের নাম পাগড়ি অথবা কামীস অথবা চাদর ইত্যাদি উচ্চারণ করতেন। তারপর তিনি এ দু'আ পড়তেন।
اللَّهُمَّ لَكَ الْحَمْدُ كَمَا كَسَوْتَنِيْهِ ، أَسْأَلُكَ خَيْرَهُ وَخَيْرَ مَا صُنِعَ لَهُ وَأَعُوْذُ بِكَ مِنْ شَرِّهِ وَشَرِّ مَا صُنِعَ لَهُ
অর্থাৎ হে আল্লাহ! তোমারই জন্য যাবতীয় প্রশংসা। যেহেতু তুমিই আমাকে তা পরিধান করিয়েছ। আমি তোমার কাছে এর কল্যাণ প্রার্থনা করছি, আরো কল্যাণ চাচ্ছি যে উদ্দেশে এটা তৈরি করা হয়েছে তার। আর আমি তোমার স্মরণাপন্ন হচ্ছি এর যাবতীয় অনিষ্ট হতে এবং যে উদ্দেশে তৈরি করা হয়েছে তার অনিষ্ট হতে।
ব্যাখ্যা: যখন রাসূলুল্লাহ কোন নতুন জামা পরিধান করতেন, তখন আনন্দ প্রকাশার্থে তার নাম নির্ধারণ করতেন। যেমন- বলতেন, আল্লাহ তা'আলা আমাকে এ জামাটি বা পাগড়িটি দান করেছেন। তারপর দু'আ পাঠ করে পরিধান করতেন।
রাসূলুল্লাহ এর একটি প্রিয় পোষাক ছিল হিবারা:
عَنْ أَنَسِ بْنِ مَالِكٍ ، قَالَ : كَانَ اَحَبَّ الشَّيَابِ إِلَى رَسُولِ اللَّهِ ﷺ يَلْبَسُهُ الْحِبَرَةُ
৪৮. আনাস ইবনে মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ এর নিকট সর্বাধিক প্রিয় কাপড় হলো (ইয়ামানে তৈরি চাদর) হিবারা।
ব্যাখ্যা: সে সময়ে পোশাকের বিখ্যাত স্থান ইয়ামানের তৈরি ডোরা ও কারুকার্য সম্বলিত সূতী বা কাতান প্রকৃতির চাদরকে 'হিবারা' বলা হতো। এগুলো কখনো লাল, কখনো নীল, আবার কখনো সবুজ ডোরাকাটা হতো।
টিকাঃ
⁴⁹ আবু দাউদ, হা/৪০২২; মুসনাদে আহমাদ, হা/১১২৬৬; ইবনে হিব্বান, হা/৪৫২০; সুনানে কুবরা লিন নাসাঈ, হা/১০০৬৮: মুস্তাদরাকে হাকেম, হা/৭৪০৮।
** সহীহ বুখারী, হা/৫৮১৩; সহীহ মুসলিম, হা/৫৫৬২; নাসাঈ, হা/৫৩১৫; মুসনাদে আহমাদ, হা/১৪১৪০; সুনানে কুবরা লিন নাসাঈ, হা/৯৫৬৮।
তিনি লাল রঙ্গের নকশী করা চাদরও পরিধান করতেন:
عَنْ أَبِي جُحَيْفَةً قَالَ : رَأَيْتُ النَّبِيَّ ﷺ وَعَلَيْهِ حُلَّةٌ حَمْرَاءُ كَأَنِّي أَنْظُرُ إِلَى بَرِيقِ سَاقَيْهِ
৪৯. আবু জুহাইফা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি নবী -কে লাল নকশী চাদর পরা অবস্থায় দেখেছি। আজও যেন আমি তাঁর উভয় গোড়ালীর ঔজ্জ্বল্য প্রত্যক্ষ করছি।
তিনি লাল হুল্লা কাপড়ও পরিধান করতেন:
عَنِ الْبَرَاءِ بْنِ عَازِبٍ ، قَالَ : مَا رَأَيْتُ أَحَدًا مِّنَ النَّاسِ أَحْسَنَ فِي حُلَّةٍ حَمْرَاءَ مِنْ رَسُولِ اللَّهِ ، إِنْ كَانَتْ جُمَّتُهُ لَتَضْرِبُ قَرِيبًا مِّنْ مَنْكِبَيْهِ
৫০. বারা ইবনে আযিব (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, 'লাল হুল্লা' পরিহিত কাউকে আমি রাসূলুল্লাহ এর চেয়ে অধিক সুদর্শন দেখিনি। আর তাঁর কেশ (জুম্মা) উভয় কাঁধ স্পর্শ করছিল।
ব্যাখ্যা: এখানে উদ্দেশ্য হচ্ছে সেলাই ছাড়া লুঙ্গি ও চাদর। এগুলো তৎকালীন আরব দেশের সর্বাধিক ব্যবহৃত পোশাক ছিল। এটি রাসূলুল্লাহ সর্বাধিক ব্যবহার করতেন। কেউ কেউ বলেছেন, চাদর ও লুঙ্গি একই প্রকারের একই রংয়ের প্রস্তুত হলে তাকে حُلَّةٌ বলে।
তিনি সবুজ চাদরও পরিধান করতেন:
عَنْ أَبِي رِمْئَةَ قَالَ : رَأَيْتُ النَّبِيَّ ﷺ وَعَلَيْهِ بُرْدَانِ أَخْضَرَانِ
৫১. আবু রিমছা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি নবী কে দুটি সবুজ চাদর পরিহিত অবস্থায় দেখেছি।
ব্যাখ্যা: রাসূলুল্লাহ তৎকালীন সময়ে প্রচলিত বিভিন্ন রংয়ের পোশাক পরিধান করেছেন। বিভিন্ন হাদীসের আলোকে প্রমাণিত হয় যে, তার মধ্যে সবুজ, সাদা ও মিশ্রিত রং তিনি পছন্দ করতেন।
তিনি সাহাবীদেরকে সাদা রঙের কাপড় পরিধান করতে উপদেশ দিয়েছেন:
عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ ، قَالَ : قَالَ رَسُولُ اللهِ ﷺ : عَلَيْكُمْ بِالْبَيَاضِ مِنَ الثَّيَابِ لِيَلْبَسْهَا أَحْيَاؤُكُمْ ، وَكَفْنُوا فِيهَا مَوْتَاكُمْ ، فَإِنَّهَا مِنْ خَيْرِ ثِيَابِكُمْ
টিকাঃ
⁵¹ সহীহ মুসলিম, হা/১১৪৭; মুসনাদে আহমাদ, হা/১৮৭৮১।
⁵² সহীহ বুখারী, হা/৫৮০১; নাসাঈ, হা/৫০৬২; মুসনাদে আহমাদ, হা/১৮৬৩৬; সুনানে কুবরা, হা/৯২৭৫।
⁵⁰ নাসাঈ, হা/১৫৭২; মুসনাদে আহমাদ, হা/৭১১৭; সানানুল কুবরা লিন নাসাঈ, হা/১৭৯৪।
৫২. ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ বলেছেন, তোমরা সাদা রঙের কাপড় পরিধান করবে। তোমাদের জীবিতরা যেন সাদা কাপড় পরিধান করে এবং মৃতদেরকে সাদা কাপড় দিয়ে দাফন দেয়। কেননা, সাদা কাপড় তোমাদের সর্বোত্তম পোশাক।
عَنْ سَمُرَةَ بْنِ جُنْدُبٍ له قَالَ : قَالَ رَسُولُ اللهِ ﷺ : الْبَسُوا الْبَيَاضَ ؛ فَإِنَّهَا أَظْهَرُ وَأَطْيَبُ . وَكَفَنُوا فِيهَا مَوْتَاكُمْ
৫৩. সামুরা ইবনে জুনদুব (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ বলেছেন, তোমরা সাদা কাপড় পরিধান করো। কারণ, তা সর্বাধিক পবিত্র ও উত্তম। আর তা দিয়েই তোমরা মৃতদের কাফন দাও।
তিনি কালো রঙের পশমী চাদরও পরিধান করতেন:
عَنْ عَائِشَةَ قَالَتْ : خَرَجَ رَسُولُ اللهِ ﷺ ذَاتَ غَدَاةٍ وَعَلَيْهِ مِرْطٌ مِنْ شَعَرٍ أَسْوَدَ
৫৪. আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একবার রাসূলুল্লাহ প্রত্যুষে বাইরে বের হন। তখন তাঁর দেহে কালো পশমের একটি চাদর শোভা পাচ্ছিল।
তিনি আঁটসাঁট অস্তিন বিশিষ্ট রুমী জুব্বা পরিধান করেছিলেন:
عَنِ الْمُغِيرَةِ بْنِ شُعْبَةَ الله، أَنَّ النَّبِيَّ ﷺ لَبِسَ جُبَّةً رُومِيَّةً ضَيِّقَةَ الْكُمَيْنِ
৫৫. মুগীরা ইবনে শু'বা হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একবার রাসূলুল্লাহ আঁটসাঁট আস্তিন বিশিষ্ট একটি রুমী জুব্বা পরিধান করেন।
ব্যাখ্যা: রাসূলুল্লাহ যখন যে পোশাক পেয়েছেন তাই ব্যবহার করেছেন। তিনি সুতি, পশমী ও কাতানের তৈরি প্রভৃতি পোশাক ব্যবহার করেছেন। সবুজ, লাল, হলুদ, সাদা, কালো ও মিশ্রিত যখন যে রংয়ের পোশাক পেয়েছেন পরিধান করেছেন। কারণ আরবে কোন পোশাক তৈরি হতো না। এগুলো মক্কা-মদিনার বাইরে সিরিয়া, ইয়ামান প্রভৃতি দেশে তৈরি হতো। তাই ব্যবসায়ীগণ যে পোশাক আনতেন তাই সাধ্যমতো ক্রয় করে বা উপহার হিসেবে যা পেতেন তাই ব্যবহার করতেন।
টিকাঃ
⁵⁴ নাসাঈ, হা/৫৩২৩; সুনানুল কুবরা লিন নাসাঈ, হা/৯৫৬৬।
⁵⁵ মু'জামুল কাবীর, হা/৯৬৪; সহীহ তারগীব ওয়াত তারহীব, হা/২০২৭।
⁵⁶ সহীহ মুসলিম, হা/৫৫৬৬; আবু দাউদ, হা/৪০৩৪; মুসনাদে আহমাদ, হা/২৫৩৩৪; সুনানের কুবরা লিল বাইহাকী, হা/৪৩৫৩; মুস্তাদরাকে হাকেম, হা/৪৭০৭।
⁵⁷ মুসনাদে আহমাদ, হা/১৮২৬৫।
📄 রাসূলুল্লাহ্ ﷺ এর জীবন-যাপন
بَابُ مَا جَاءَ فِي عَيْشِ رَسُولِ اللهِ ﷺ
অধ্যায়-৯: রাসূলুল্লাহ এর জীবন-যাপন
রাসূলুল্লাহ সাধারণ জীবন-যাপন করতেন:
عَنْ مُحَمَّدِ بْنِ سِيرِينَ قَالَ : كُنَّا عِنْدَ أَبِي هُرَيْرَةَ ، وَعَلَيْهِ ثَوْبَانِ مُسَشَّقَانِ مِنْ كَتَانٍ فَتَمَخَّطَ فِي أَحَدِهِمَا ، فَقَالَ : بَحْ بَحْ يَتَمَخَّطُ أَبُو هُرَيْرَةَ فِي الْكَتَّانِ ، لَقَدْ رَأَيْتُنِي وَإِنِّي لَآخِرُ فِيمَا بَيْنَ مِنْبَرِ رَسُولِ اللَّهِ ﷺ وَحُجْرَةِ عَائِشَةَ مَغْشِيًّا عَلَيَّ فَيَجِيءُ الْجَانِي فَيَضَعُ رِجْلَهُ عَلَى عُنُقِي يَرَى أَنَّ بِي جُنُونًا ، وَمَا بِي جُنُونٌ ، وَمَا هُوَ إِلَّا الْجُمْعُ
৫৬. মুহাম্মদ ইবনে সীরীন (রহঃ) থেকে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমরা একদিন আবু হুরায়রা (রাঃ)-এর কাছে উপস্থিত ছিলাম। তখন তাঁর দেহে দুটি কাতানের কাপড় (অর্থাৎ একটি কাতানের চাদর ও একটি লুঙ্গি) শোভা পাচ্ছিল। আবু হুরায়রা (রাঃ) তার একটি দ্বারা নাক পরিস্কার করছিলেন। তখন তিনি বলে উঠলেন। বাহ, বাহ! আবু হুরায়রা কাতানের কাপড় দ্বারা নাক পরিস্কার করছ! অথচ এক সময় এমন ছিল যখন আমি নিজে রাসূলুল্লাহ এর মিম্বর এবং আয়েশা (রাঃ) এর হুজরার পার্শ্বে পেটের জ্বালায় কাতর হয়ে অচেতন অবস্থায় পড়ে থাকতাম। প্রায় আগন্তুকই আমাকে মৃগী রোগী মনে করে গর্দানে পা দ্বারা আঘাত করত। প্রকৃতপক্ষে আমার মধ্যে উন্মাদনার লেশমাত্র ছিল না, বরং প্রচণ্ড ক্ষুধার জ্বালাতেই আমার এ অবস্থা হতো।
ব্যাখ্যা: রাসূলুল্লাহ এর জীবনী গ্রন্থে আবু হুরায়রা (রাঃ) এর ঘটনা বর্ণনার কারণ হলো, তিনি রাসূলুল্লাহ এর একনিষ্ঠ খাদেম ছিলেন। আবু হুরায়রা (রাঃ) ছিলেন আসহাবে সুফ্ফার একজন সদস্য। তাঁরা রাসূলুল্লাহ এর মেহমান ছিলেন। আর মেহমানের অবস্থা থেকে মেযবানের অবস্থা নির্ণয় করা যায়। অর্থাৎ মেহমান যেহেতু খাবারের জন্য কষ্ট করছেন এতে সহজেই অনুমান করা যায় যে, মেযবান তথা নবী এর ঘরে তখন পর্যাপ্ত খাবার ছিল না।
আবূ হুরায়রা (রাঃ) উক্ত হাদীসে তাঁর ইসলাম গ্রহণের পর প্রাথমিক সময়ের অবস্থা এবং পরবর্তী অবস্থার মধ্যে পার্থক্য করেছেন। এটা রাসূলুল্লাহ এর ইন্তেকালের পরের ঘটনা।
টিকাঃ
⁵* সহীহ বুখারী, হা/৭৩২৪।
📄 রাসূলুল্লাহ্ ﷺ এর মোজা ব্যবহার
রাসূলুল্লাহ ﷺ নাজ্জাশীর হাদিয়াকৃত কালো রঙের মোজা পরিধান করতেন:
عَنِ ابْنِ بُرَيْدَةَ ، عَنْ أَبِيْهِ . أَنَّ النَّجَاشِيَ أَهْدَى لِلنَّبِيِّ ﷺ خُفَّيْنِ أَسْوَدَيْنِ سَادَجَيْنِ. فَلَبِسَهُمَا ثُمَّ تَوَضَّأَ وَمَسَحَ عَلَيْهِمَا
৫৮. ইবনে বুরাইদা (রাঃ) তাঁর পিতা হতে বর্ণনা করেন যে, একদা নাজ্জাশী রাসূলুল্লাহ-কে এক জোড়া কালো রঙের মোজা হাদিয়া পাঠান। এরপর তিনি ঐ মোজা দুটি পরিধান করে ওযু করলেন এবং এর উপর মাসেহ করলেন।
ব্যাখ্যা: তৎকালীন হাবশার (আবিসিনিয়ার) বাদশার উপাধি ছিল নাজ্জাশী। মক্কা হতে মুসলমানদের হাবশায় হিজরত করাটা নাজ্জাশীর শাসনামলে হয়েছিল। তিনি ইসলাম কবুল করেছিলেন। নাজ্জাশী রাসূলুল্লাহ-কে বিভিন্ন জিনিস উপহার হিসেবে পাঠিয়ে ছিলেন। তার মধ্যে একটি কোর্তা, একটি পাজামা এবং একটি রুমাল ছিল। রাসূলুল্লাহ তাঁর মৃত্যুর সংবাদ শুনে সাহাবীদেরকে নিয়ে গায়েবানা জানাযা আদায় করেছিলেন। আর এটাই হলো প্রথম গায়েবানা জানাযার নামায।
টিকাঃ
৬০ আবু দাউদ, হা/১৫৫; ইবনে মাজাহ, হা/৫৪৯; মুসনাদে আহমাদ, হা/২৩০৩১: সুনানে কুবরা লিল বায়হাকী, হা/১৩৯৪।
📄 রাসূলুল্লাহ্ ﷺ এর জুতার বিবরণ
রাসূলুল্লাহ এর প্রতিটি জুতায় দুটি করে ফিতা ছিল:
عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ ﷺ قَالَ : كَانَ لِنَعْلِ رَسُولِ اللَّهِ ﷺ قِبَالَانِ مَثْنِيٌّ شِرَا لَهُمَا
৫৯. ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ এর প্রতিটি জুতায় দুটি করে ফিতা ছিল। ৬১
তাঁর জুতা ছিল চামড়ার:
حَدَّثَنَا عِيسَى بْنُ طَهْمَانَ قَالَ : أَخْرَجَ إِلَيْنَا أَنَسُ بْنُ مَالِكٍ نَعْلَيْنِ جَرْدَا وَيْنِ لَهُمَا قِبَالَانِ. قَالَ : فَحَدَّثَنِي ثَابِتٌ بَعْدُ عَنْ أَنَسٍ أَنَّهُمَا كَانَتَا نَعْلَي النَّبِيِّ ﷺ
৬০. ঈসা ইবনে তাহমান (রহঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আনাস ইবনে মালিক (রাঃ) আমাদের সম্মুখে দুটি লোমশূণ্য জুতা নিয়ে আসেন। আর ঐ দুটিতে দুটি করে চামড়ার ফিতা ছিল। তিনি (আহমাদ) বলেন, পরে সাবিত (রহঃ) আমাকে আনাস (রাঃ) হতে হাদীস শোনান যে, সে জুতা দুটি ছিল রাসূলুল্লাহ এর। ৬২
ব্যাখ্যা: সে সময়ে আরবে পশমসহ চামড়া দ্বারা জুতা বানানোর রীতি ছিল এবং এ ধরনের জুতা পরিধানের রীতি ছিল। এজন্য বর্ণনাকারী স্পষ্ট করে বর্ণনা করেন যে, রাসূলুল্লাহ এর জুতা পশমবিহীন ছিল।
তিনি এসব জুতা পরে ওযু করতেন:
عَنْ عُبَيْدِ بْنِ جُرَيْجٍ ، أَنَّهُ قَالَ لِابْنِ عُمَرَ : رَأَيْتُكَ تَلْبَسُ النِّعَالَ السَّبْنِيَّةَ ، قَالَ : إِنِّي رَأَيْتُ رَسُولَ اللَّهِ ﷺ يَلْبَسُ النِّعَالَ الَّتِي لَيْسَ فِيهَا شَعَرٌ ، وَيَتَوَضَّأُ فِيهَا ، فَأَنَا أُحِبُّ أَنْ الْبَسَهَا
৬১. উবাইদ ইবনে জুরাইজ (রহঃ) হতে বর্ণিত। তিনি ইবনে উমর (রাঃ)-কে বললেন, আমি আপনাকে লোমশূণ্য জুতা পরিধান করতে দেখেছি। অতঃপর তিনি বললেন, আমি রাসূলুল্লাহ কে এমন জুতা পরিধান করতে দেখেছি, যাতে কোন লোম ছিল না। আর তিনি সে জুতা পরিধান করে ওযু করেছেন। তাই আমি লোমশূণ্য জুতা অধিক ভালোবাসি। ৮০
তাঁর জুতার ফিতা দুটি ছিল চামড়ার:
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ ﷺ ، قَالَ : كَانَ لِنَعْلِ رَسُوْلِ اللَّهِ ﷺ قِبَالَانِ
৬২. আবু হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ এর জুতায় দুটি করে চামড়ার ফিতা ছিল। ৬৪
রাসূলুল্লাহ তালিযুক্ত জুতাও পরিধান করতেন:
عَنْ عَمْرِو بْنِ حُرَيْثٍ ﷺ يَقُولُ : رَأَيْتُ رَسُولَ اللهِ ﷺ يُصَلِّي فِي نَعْلَيْنِ مَخْصُوفَتَيْنِ
৬৩. আমর ইবনে হুরায়ছ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ -কে তালিযুক্ত জুতা পরিধান করে সালাত আদায় করতে দেখেছি। ৬৫
তিনি এক পায়ে জুতা পরিধান করতে নিষেধ করেছেন:
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ ، أَنَّ رَسُولَ اللهِ ﷺ قَالَ : لَا يَمْشِيَنَّ أَحَدُكُمْ فِي نَعْلٍ وَاحِدَةٍ ، لِيُنْعِلُهُمَا جَمِيعًا أَوْ لِيُحْفِهِمَا جَمِيعًا
৬৪. আবু হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ বলেছেন, তোমাদের কেউ যেন এক পায়ে জুতা পরিধান করে না হাঁটে। হয়তো দু'পায়ে জুতা পরিধান করবে কিংবা খালি পায়ে হাঁটবে। ৬৬
عَنْ جَابِرٍ ، أَنَّ النَّبِيَّ ﷺ نَهَى أَنْ يَأْكُلَ ، يَعْنِي الرَّجُلَ ، بِشِمَالِهِ ، أَوْ يَمْشِيَ فِي نَعْلٍ وَاحِدَةٍ
৬৫. জাবির (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী বাম হাতে খেতে এবং এক পায়ে জুতা পরিধান করতে নিষেধ করেছেন। ৬৭
জুতা পরিধান করা এবং খোলার ব্যাপারে রাসূলুল্লাহ এর দিক নিদের্শনা:
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ ، أَنَّ النَّبِيَّ ﷺ قَالَ : إِذَا انْتَعَلَ أَحَدُكُمْ فَلْيَبْدَأُ بِالْيَمِينِ ، وَإِذَا نَزَعَ فَلْيَبْدَأُ بِالشِّمَالِ ، فَلْتَكُنِ الْيَمِينُ أَوْ لَهُمَا تُنْعَلُ وَاخِرَهُمَا تُنْزَعُ
৬৬. আবু হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত। নবী ইরশাদ করেছেন, যখন তোমাদের কেউ জুতা পরিধান করে তখন সে যেন ডান দিক থেকে আরম্ভ করে। কিন্তু খোলার সময় যেন বাম দিক হতে আরম্ভ করে। আর তাই জুতা পরিধানে ডান পা প্রথমে দেবে এবং খোলার সময় বাম পা হতে প্রথমে জুতা খোলবে। ৬৮
রাসূলুল্লাহ ডান দিক থেকে জুতা পরিধান করতেন:
عَنْ عَائِشَةَ قَالَتْ : كَانَ رَسُولُ اللهِ ﷺ يُحِبُّ التَّيَمَنَ مَا اسْتَطَاعَ فِي تَرْجُلِهِ وَتَنَعُلِهِ وَظُهُورِهِ
৬৭. আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ তাঁর কেশ বিন্যাস করা, জুতা পরিধান করা ও পবিত্রতা অর্জনের ব্যাপারে ডান দিক হতে আরম্ভ করা পছন্দ করতেন। ৬৯
আবু বকর ও উমর (রাঃ)ও রাসূলুল্লাহর এর ন্যায় জুতা ব্যবহার করতেন:
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ ، قَالَ : كَانَ لِنَعْلِ رَسُولِ اللهِ ﷺ قِبَالَانِ وَأَبِي بَكْرٍ وَعُمَرَ ، وَأَوَّلُ مَنْ عَقَدَ عَقْدًا وَاحِدًا عُثْمَانُ
৬৮. আবু হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ, আবু বকর (রাঃ) ও উমর (রাঃ) প্রমুখের জুতায় দুটি করে ফিতা ছিল। উসমান (রাঃ)-ই সর্বপ্রথম এক ফিতাবিশিষ্ট জুতা পরিধান করেন। ৭০
টিকাঃ
৬১ ইবনে মাজাহ, হা/৩৬১৪; শারহুস সুন্নাহ, হা/৩১৫৪।
৬২ সহীহ বুখারী, হা/৩১২৭।
৮০ মুয়াত্তা ইমাম মালেক, হা/৭৩৩; সহীহ বুখারী, হা/১৬৬; সহীহ মুসলিম, হা/২৮৭৫; আবু দাউদ, হা/১৭৭৪; মুসনাদে আহমাদ, হা/৫৩৩৮; সহীহ ইবনে হিব্বান, হা/৩৭৬৩।
৬৪ মুজামুল সগীর, হা/২৫৪।
৬৮ সুনানে কুবরা লিন নাসাঈ, হা/৯৭১৭; মুসনাদে আবু ইয়ালা, হা/১৪৬৫।
৬৬ মুয়াত্তা মালেক, হা/১৬৩৩; সহীহ বুখারী, হা/৫৮৫৬।
৬৭ সহীহ মুসলিম, হা/৫৬২০; মুসনাদে আহমাদ, হা/১৪১৫৩; সুনানুল কুবরা লিল বায়হাকী, হা/৩৩৩২।
৬৮ মুয়াত্তা মালেক, হা/১৬৩৪; সহীহ বুখারী, হা/৫৮৫৫; মুসনাদে আহমাদ, হা/১০০০৪।
৬৯ সহীহ বুখারী, হা/৪২৬; সুনানে নাসাঈ, হা/৪২১; মুসনাদে আহমাদ, হা/২৪৬৭১; ইবনে হিব্বান, হা/১০৯১।
৭০ মুজামুল কাবীর, হা/১২৮।