📄 রাসূলুল্লাহ্ ﷺ এর দৈহিক গঠন
বِسْمِ اللَّهِ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ
بَابُ مَا جَاءَ فِي خَلْقِ رَسُولِ اللَّهِ ﷺ
অধ্যায়- ১: রাসূলুল্লাহ ﷺ এর দৈহিক গঠন
রাসূলুল্লাহ ﷺ বেশি দীর্ঘ ছিলেন না, আবার বেশি খাটোও ছিলেন না:
عَنْ أَنَسِ بْنِ مَالِكِ يَقُولُ : كَانَ رَسُولُ اللهِ ﷺ لَيْسَ بِالطَّوِيلِ الْبَائِنِ ، وَلَا بِالْقَصِيرِ ، وَلَا بِالْأَبْيَضِ الْأَمْهَقِ ، وَلَا بِالْآدَمِ ، وَلَا بِالْجَعْدِ الْقَطَطِ ، وَلَا بِالسَّبْطِ ، بَعَثَهُ اللَّهُ تَعَالَى عَلَى رَأْسِ أَرْبَعِينَ سَنَةً . فَأَقَامَ بِمَكَّةَ عَشْرَ سِنِينَ ، وَبِالْمَدِينَةِ عَشْرَ سِنِينَ ، وَتَوَفَّاهُ اللَّهُ تَعَالَى عَلَى رَأْسِ سِتِّينَ سَنَةً ، وَلَيْسَ فِي رَأْسِهِ وَلِحْيَتِهِ عِشْرُونَ شَعْرَةً بَيْضَاءَ
১. আনাস ইবনে মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ খুব দীর্ঘ ছিলেন না আবার খাটোও ছিলেন না। তিনি ধবধবে সাদা কিংবা বাদামী বর্ণেরও ছিলেন না। তাঁর চুল একেবারে কোঁকড়ানো ছিল না, আবার একদম সোজাও ছিল না। ৪০ বছর বয়সে আল্লাহ তা'আলা তাঁকে নবুওয়াত দান করেন। এরপর মক্কায় ১০ বছর এবং মদিনায় ১০ বছর কাটান। আল্লাহ তা'আলা ৬০ বছর বয়সে তাঁকে ওফাত দান করেন। ওফাতকালে তাঁর মাথা ও দাড়ির ২০টি চুলও সাদা ছিল না।'
ব্যাখ্যা: রাসূলুল্লাহ ﷺ এর মাঝে যেমন উত্তম গুণাবলির সর্বাধিক সমাবেশ ঘটেছিল, তেমনি তাঁর দৈহিক সৌন্দর্যও ছিল অতুলনীয়। এ হাদীস থেকে বুঝা যায় যে, রাসূলুল্লাহ ﷺ বেমানান দীর্ঘকায় ছিলেন না। আবার অতি খাটোও ছিলেন না। বরং মাঝারি গড়নের চেয়ে একটু দীর্ঘ ছিলেন। উল্লেখ্য যে, নবী ﷺ এর ইন্তেকাল হয়েছে ৬৩ বছর বয়সে। তিনি মক্কায় ১৩ বছর এবং মদিনায় ১০ বছর অতিবাহিত করেছেন। এ সংক্রান্ত হাদীসগুলো এ গ্রন্থের শেষের দিকে উল্লেখ করা হয়েছে। বর্ণিত হাদীসটিতে দশকের পরের সংখ্যা ৩ বাদ দিয়ে মক্কায় অবস্থানকাল ১০ বছর এবং নবী ﷺ এর মোট বয়স ৬০ উল্লেখ করা হয়েছে।
টিকাঃ
¹ সহীহ বুখারী, হা/৫৯০০; সহীহ মুসলিম, হা/৬২৩৫; মুয়াত্তা মালেক, হা/১৬৩৯; ইবনে মাজাহ, হা/১৩৫৪৩; মুসনাদুল বাযযার, হা/৬১৮৯; শারহুস সুন্নাহ, হা/৩৭৩৫; সহীহ ইবনে হিব্বান, হা/৬৩৮৭।
তিনি ছিলেন গৌরবর্ণের :
عَنْ أَنَسِ بْنِ مَالِكٍ له قَالَ : كَانَ رَسُولُ اللهِ ﷺ رَبْعَةً . لَيْسَ بِالطَّوِيلِ وَلَا بِالْقَصِيرِ ، حَسَنَ الْجِسْمِ ، وَكَانَ شَعْرُهُ لَيْسَ بِجَعْدٍ وَلَا سَبْطٍ أَسْمَرَ اللَّوْنِ ، إِذَا مَشَى يَتَكَفَأُ
২. আনাস ইবনে মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ মধ্যমাকৃতির ছিলেন। বেশি লম্বা কিংবা বেশি খাটোও ছিলেন না। তাঁর দেহ ছিল খুব আকর্ষণীয়। আর তাঁর চুল বেশি কোঁকড়ানো কিংবা একেবারে সোজাও ছিল না। তিনি ছিলেন গৌরবর্ণের। পথ চলতে তিনি সামনের দিকে কিছুটা ঝুঁকে চলতেন।'
তিনি ছিলেন মধ্যমাকৃতির :
عَنِ الْبَرَاءِ بْنَ عَازِبِ الله يَقُولُ : كَانَ رَسُولُ اللهِ ﷺ رَجُلًا مَرْبُوعًا بَعِيدَ مَا بَيْنَ الْمَنْكِبَيْنِ . عَظِيمَ الْجُمَّةِ إِلَى شَحْمَةِ أُذُنَيْهِ الْيُسْرَى ، عَلَيْهِ حُلَّةٌ حَمْرَاءُ ، مَا رَأَيْتُ شَيْئًا قَطُّ أَحْسَنَ مِنْهُ
৩. বারা ইবনে আযিব (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ মধ্যমাকৃতির ছিলেন। তাঁর দুই কাঁধের মধ্যবর্তী অংশ ছিল তুলনামূলক প্রশস্ত। তাঁর ঘন চুলগুলো কানের লতি পর্যন্ত লম্বা ছিল। তাঁর দেহে লাল লুঙ্গি ও লাল চাদর শোভা পেত। আমি তাঁর তুলনায় সুদর্শন কাউকে কখনো দেখিনি।'
ব্যাখ্যা : এ হাদীসে লাল চাদর ও লুঙ্গি পরিধান করার কথা উল্লেখ করা হয়েছে। অথচ রাসূলুল্লাহ ﷺ পুরুষের জন্যে লাল রংয়ের কাপড় পরিধান করতে নিষেধ করেছেন। এ বিরোধ সমাধানে কেউ কেউ বলেন, উজ্জ্বল লাল পরিধান করতে নিষেধ করা হয়েছে। এখানে যে কাপড়দ্বয়ের কথা বলা হয়েছে, সেটা লাল ডোরাকাটা ছিল, উজ্জ্বল লাল বর্ণের ছিল না।
তাঁর দু'কাঁধের মধ্যবর্তী স্থান প্রশস্ত ছিল :
عَنِ الْبَرَاءِ بْنِ عَازِبٍ ، قَالَ : مَا رَأَيْتُ مِنْ ذِي لِمَةٍ فِي حُلَّةٍ حَمْرَاءَ أَحْسَنَ مِنْ رَسُولِ اللَّهِ ، لَهُ شَعْرٌ يَضْرِبُ مَنْكِبَيْهِ . بَعِيْدُ مَا بَيْنَ الْمَنْكِبَيْنِ ، لَمْ يَكُنْ بِالْقَصِيرِ وَلَا بِالطَّوِيلِ
৪. বারা ইবনে আযিব (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি কাঁধ পর্যন্ত লম্বা চুলবিশিষ্ট লাল চাদর ও লাল লুঙ্গি পরিহিত অবস্থায় রাসূলুল্লাহ ﷺ এর চেয়ে সুদর্শন কাউকে দেখিনি। তাঁর কেশগুচ্ছ ছিল কাঁধ বরাবর। তাঁর দু'কাঁধের মধ্যবর্তী স্থান অন্যদের তুলনায় কিছুটা প্রশস্ত ছিল। তিনি অধিক খাটো বা অধিক দীর্ঘাকৃতির ছিলেন না।
টিকাঃ
¹ মুসনাদে আবু ই'আলা, হা/৩৮৩২; শারহুস সুন্নাহ, হা/৩৬৪০।
² সহীহ বুখারী, হা/৩৫৫১; সহীহ মুসলিম, হা/৬২১০; নাসাঈ, হা/৫২৩২।
³ সহীহ মুসলিম, হা/৬২১১; মুসনাদে আহমাদ, হা/১৮৫৮১।
ব্যাখ্যা: ৩ নং হাদীসে বর্ণিত হয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ ﷺ এর মাথার চুল কানের লতি পর্যন্ত দীর্ঘ ছিল। আর এ হাদীসে বলা হয়েছে, কাঁধ পর্যন্ত দীর্ঘ ছিল। উভয় বক্তব্যই ঠিক। কেননা, চুল সব সময় এক অবস্থায় থাকে না। কখনো কম হয়, কখনো বেশি হয়। আবার ইচ্ছাকৃতভাবেও বড় ছোট রাখা হয়। চুলের ভিন্ন ভিন্ন অবস্থার ব্যাখ্যা এভাবে করা যায় যে, তিনি সর্বোচ্চ কাঁধ পর্যন্ত লম্বা করেছেন, যাকে ‘জিম্মা’ বলা হয়। আর সর্বাধিক ছোট করার পরিমাণ ছিল কানের লতি, যাকে 'ওয়াফরা' বলে। আর এর মাঝামাঝি অবস্থানকে ‘লিম্মা’ বলা হয়।
তাঁর হস্তদ্বয় ও পদদ্বয়ের তালু এবং আঙ্গুলসমূহ ছিল মাংসল :
عَنْ عَلِيِّ بْنِ أَبِي طَالِبٍ له قَالَ : لَمْ يَكُنِ النَّبِيُّ ﷺ بِالطَّوِيلِ وَلَا بِالْقَصِيرِ ، شَئْنُ الْكَفَّيْنِ وَالْقَدَمَيْنِ ، ضَخْمُ الرَّأْسِ ، ضَخْمُ الْكَرَادِيْسِ ، طَوِيلُ الْمَسْرُبَةِ ، إِذَا مَشَى تَكَفَّا تَكَفُوًا كَأَنَّهَا يَنْحَظُ مِنْ صَبَبٍ ، لَمْ أَرَ قَبْلَهُ وَلَا بَعْدَهُ مِثْلَهُ
৫. আলী ইবনে আবু তালিব (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, নবী ﷺ বেশি দীর্ঘ কিংবা বেশি খাটো ছিলেন না। তাঁর হস্তদ্বয় ও পদদ্বয়ের তালু এবং আঙ্গুলসমূহ ছিল মাংসল। তাঁর মাথা ছিল কিছুটা বড় এবং হাত-পায়ের জোড়াগুলো ছিল মোটা। বুক হতে নাভি পর্যন্ত পশমের একটি সরু রেখা প্রলম্বিত ছিল। যখন পথ চলতেন মনে হতো যেন কোন উঁচু স্থান হতে নিচে অবতরণ করছেন। বর্ণনাকারী বলেন, তাঁর পূর্বে কিংবা পরে আমি তাঁর মতো (অনুপম আকর্ষণীয়) আর কাউকে দেখিনি।
তিনি ছিলেন প্রশস্ত মুখ, ডাগর চক্ষু এবং সরু গোড়ালি বিশিষ্ট:
عَنْ جَابِرِ بْنِ سَمُرَةَ لله يَقُولُ : كَانَ رَسُولُ اللهِ ﷺ ضَلِيعَ الْفَمِ ، أَشْكَلَ الْعَيْنِ . مَنْهُوسَ الْعَقِبِ . قَالَ شُعْبَةُ : قُلْتُ لِسِمَالٍ : مَا ضَلِيعُ الْفَمِ ؟ قَالَ : عَظِيمُ الْفَمِ ، قُلْتُ : مَا أَشْكَلُ الْعَيْنِ ؟ قَالَ : طَوِيلُ شِقِّ الْعَيْنِ ، قُلْتُ : مَا مَنْهُوسُ الْعَقِبِ ؟ قَالَ : قَلِيْلٌ لَحْمِ الْعَقِبِ
৬. জাবির ইবনে সামুরা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ এর মুখ প্রশস্ত ছিল। চোখের শুভ্রতার মাঝে কিছুটা লালিমা ছিল। পায়ের গোড়ালি স্বল্প মাংসল ছিল। শু'বা (রহঃ) বলেন, আমি সিমাক (রহঃ)-কে বললাম, ضَلِيْعُ الْفَمِ (যলী'উল ফাম) কী? তিনি বললেন, বড় মুখগহ্বর বিশিষ্ট।
টিকাঃ
⁴ মুসনাদে আহমাদ, হা/৭৪৬; মুস্তাদরাকে হাকেম, হা/৪১৯৪; সহীহ ইবনে হিব্বান, হা/৬৩১১।
আমি আবার বললাম, اَشْكُلُ الْعَيْنِ (আঙ্কালুল 'আইন) কী? তিনি বললেন, ডাগর চক্ষুবিশিষ্ট। আমি বললাম, مَنْهُوسُ الْعَقِبِ (মানহুসুল 'আক্বিব) কী? তিনি বললেন, সরু গোড়ালি বিশিষ্ট।
তিনি ছিলেন পূর্ণিমার চাঁদের চেয়েও চমৎকার:
عَنْ جَابِرِ بْنِ سَمُرَةَ قَالَ : رَأَيْتُ رَسُولَ اللهِ ﷺ فِي لَيْلَةٍ اِضْحِيَانٍ ، وَعَلَيْهِ حُلَةٌ حَمْرَاءُ . فَجَعَلْتُ اَنْظُرُ إِلَيْهِ وَإِلَى الْقَمَرِ ، فَلَهُوَ عِنْدِي أَحْسَنُ مِنَ الْقَمَرِ
৭. জাবির ইবনে সামুরা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি একবার পূর্ণিমা রাত্রির স্নিগ্ধ আলোতে রাসূলুল্লাহ -কে লাল চাদর ও লুঙ্গি পরিহিত অবস্থায় দেখলাম। তখন আমি একবার তাঁর দিকে ও একবার চাঁদের দিকে তাকাতে থাকলাম। মনে হলো তিনি আমার কাছে পূর্ণিমার চাঁদের চেয়ে অধিকতর চমৎকার।
عَنْ أَبِي إِسْحَاقَ قَالَ : سَأَلَ رَجُلٌ الْبَرَاءَ بْنَ عَازِبِ : أَكَانَ وَجْهُ رَسُولِ اللَّهِ ﷺ مِثْلَ السَّيْفِ ؟ قَالَ : لَا ، بَلْ مِثْلَ الْقَمَرِ
৮. আবু ইসহাক (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একবার বারা ইবনে আযিব (রাঃ)-কে এক ব্যক্তি জিজ্ঞেস করল, রাসূলুল্লাহ এর চেহারা কি তরবারির ন্যায় ছিল? তিনি বললেন, না; বরং তা ছিল চাঁদের মতো।
ব্যাখ্যা: তরবারির সাথে সাদৃশ্য করা এ জন্য ত্রুটিযুক্ত ছিল যে, এতে চেহারা অধিক লম্বা হওয়ার ধারণা সৃষ্টি হতে পারে। তাছাড়া তরবারির চমকে শুভ্রতা বেশি থাকে, কিন্তু উজ্জ্বলতা থাকে না। তাই বারা ইবনে আযিব (রাঃ) তরবারির কথা অস্বীকার করে চাঁদের সাথে তুলনা করেছেন।
তাঁর শুভ্রতা ছিল রৌপ্যের ন্যায়:
عَنْ أَبِي هُرَيْرَةَ ، قَالَ : كَانَ رَسُولُ اللهِ ﷺ أَبْيَضَ كَأَنَّمَا صِيغَ مِنْ فِضَّةٍ ، رَجِلَ الشَّعْرِ
৯. আবু হুরায়রা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ শুভ্রতায় ছিলেন রৌপ্যের ন্যায় এবং তাঁর চুলগুলো ছিল কিছুটা কোঁকড়ানো।'
টিকাঃ
* সহীহ মুসলিম, হা/৬২১৬; মুসনাদে আহমাদ, হা/২১০২৪; সহীহ ইবনে হিব্বান, হা/৬২৮৯; জামেউস সগীর, হা/৮৯৫২; মিশকাত, হা/৫৭৮৪।
* মুস্তাদরাকে হাকেম, হা/৭৩৮৩; মা'রেফাতুস সাহাবা, হা/১৪৩৫; মিশকাত, হা/৫৭৯৪।
* সহীহ বুখারী, হা/৩৫৫২; মুসনাদে আহমাদ, হা/১৮৫০১; দারেমী, হা/৬৪; সহীহ ইবনে হিব্বান, হা/৬২৮৭।
* জামেউস সগীর, হা/৮৭৪৮; সিলসিলা সহীহাহ, হা/২০৫৩।
ব্যাখ্যা: আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত এ অধ্যায়ের সর্বপ্রথম হাদীসে উল্লেখিত হয়েছে যে, রাসূলুল্লাহ এর গায়ের রং নিরেট সাদা ছিল না। তাই এ হাদীসে তাকে রূপার সাথে তুলনা করা হয়েছে। তিনি লাল মিশ্রিত সাদা ছিলেন এবং উজ্জ্বল সুন্দর ছিলেন।
তিনি ছিলেন ইবরাহীম (আঃ) এর সাথে সাদৃশ্যপূর্ণ:
عَنْ جَابِرِ بْنِ عَبْدِ اللَّهِ . أَنَّ رَسُوْلَ اللهِ ﷺ قَالَ : عُرِضَ عَلَيَّ الْأَنْبِيَاءُ . فَإِذَا مُوسَى عَلَيْهِ السَّلَامُ ضَرْبٌ مِّنَ الرِّجَالِ ، كَأَنَّهُ مِنْ رِجَالِ شَنُوءَةَ . وَرَأَيْتُ عِيسَى ابْنَ مَرْيَمَ عَلَيْهِ السَّلَامُ . فَإِذَا أَقْرَبُ مَنْ رَأَيْتُ بِهِ شَبَهَا عُرْوَةُ بْنُ مَسْعُودٍ ، وَرَأَيْتُ إِبْرَاهِيمَ عَلَيْهِ السَّلَامُ ، فَإِذَا أَقْرَبُ مَنْ رَأَيْتُ بِهِ شَبَهَا صَاحِبُكُمْ ، يَعْنِي نَفْسَهُ. وَرَأَيْتُ جِبْرِيلَ عَلَيْهِ السَّلَامُ فَإِذَا أَقْرَبُ مَنْ رَأَيْتُ بِهِ شَبَهَا دِحْيَةً
১০. জাবির ইবনে আবদুল্লাহ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ বলেছেন, আমার কাছে নবীগণকে পেশ করা হয়। মূসা (আঃ) এর মধ্যে বিভিন্ন লোকের সাদৃশ্য বিদ্ধমান ছিল। তিনি যেন শানুয়াহ গোত্রের লোক। আমি ঈসা ইবনে মারইয়াম (আঃ)-কে উরওয়া ইবনে মাসউদের সাদৃশ্যপূর্ণ দেখতে পাই। তারপর আমি ইবরাহীম (আঃ)-কে দেখতে পাই এবং তাঁকে পাই 'তোমাদের সঙ্গীর' সাথে সর্বাধিক সাদৃশ্যপূর্ণ। তোমাদের সঙ্গী বলে তিনি নিজেকে বুঝিয়েছেন। আর আমি জিবরাঈল (আঃ)-কে দিহইয়া (কালবী) এর সাথে সদৃশ্যপূর্ণ দেখতে পাই।'
তিনি ছিলেন শুভ্রকায় ও লাবণ্যময়:
عَنْ أَبِي الطُّفَيْلِ هِ يَقُولُ : رَأَيْتُ النَّبِيَّ ﷺ وَمَا بَقِيَ عَلَى وَجْهِ الْأَرْضِ أَحَدٌ رَأَهُ غَيْرِي . قُلْتُ : صِفْهُ لِي ، قَالَ : كَانَ أَبْيَضَ مَلِيْحًا مُقَصَّدًا
১১. আবু তুফায়েল (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ কে দেখেছি- তবে তাঁকে যারা দেখেছেন তাঁদের মধ্যে আমি ছাড়া কেউ ভূপৃষ্ঠে বেঁচে নেই। (বর্ণনাকারী বললেন) আমি বললাম আপনি আমার কাছে তাঁর বিবরণ পেশ করুন। তিনি বললেন, তিনি ছিলেন শুভ্রকায় ও লাবণ্যময় সুসামঞ্জস্যপূর্ণ।
টিকাঃ
¹⁰ সহীহ মুসলিম, হা/৪৪১; মুসনাদে আহমাদ, হা/১৪৬২৯; সহীহ ইবনে হিব্বান, হা/৬২৩২; জামেউস সগীর, হা/৭৪৫১; মিশকাত, হা/৫৭১৪।
¹¹ সহীহ মুসলিম, হা/৬২১৮; মুসনাদে আহমাদ, হা/২৩৮৪৮; আদাবুল মুফরাদ, হা/৭৯০; শারহুস সুন্নাহ, হা/৩৬৪৮; জামেউস সগীর, হা/৮৭৫১; মিশকাত, হা/৫৭৮৫।
📄 রাসূলুল্লাহ্ ﷺ এর মোহরে নবুওয়াত
بَابُ مَا جَاءَ فِي خَاتَمِ النُّبُوَّةِ
অধ্যায়-২: নবী এর মোহরে নবুওয়াত
এত অর্থ- আংটি, মোহর, সীল। মোহরে নবুওয়াত হলো রাসূলুল্লাহ এর দু'কাঁধের মাঝামাঝি স্থানে অবস্থিত একটি গোশতের টুকরা। এটি ছিল রাসূলুল্লাহ এর নবুওয়াতের নিদর্শন; আর এ নিদর্শনের কথা পূর্ববর্তী আসমানী কিতাবসমূহেও বর্ণিত ছিল।
নবী এর দু'কাঁধের মধ্যভাগে মোহরে নবুওয়াত ছিল:
عَنِ السَّائِبِ بْنِ يَزِيدَ يَقُولُ : ذَهَبَتْ بِي خَالَتِي إِلَى النَّبِيِّ ﷺ فَقَالَتْ : يَا رَسُولَ اللَّهِ ، إِنَّ ابْنَ أُخْتِي وَجِعٌ ، فَمَسَحَ رَأْسِي وَدَعَا لِي بِالْبَرَكَةِ ، وَتَوَضَّاً ، فَشَرِبْتُ مِنْ وَضُوْلِهِ ، وَقُمْتُ خَلْفَ ظَهْرِهِ ، فَنَظَرْتُ إِلَى الْخَاتَمِ بَيْنَ كَتِفَيْهِ ، فَإِذَا هُوَ مِثْلُ زِرِّ الْحَجَلَةِ
১২. সায়িব ইবনে ইয়াযীদ (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদা আমার খালা আমাকে নিয়ে রাসূলুল্লাহ এর কাছে গেলেন। এরপর তিনি আরয করলেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমার ভাগ্নে অসুস্থ। তখন রাসূলুল্লাহ আমার মাথায় হাত বুলালেন এবং আমার কল্যাণের জন্য দু'আ করলেন। তারপর তিনি ওযু করলেন। আমি তাঁর ওযূর অবশিষ্ট পানি পান করলাম এবং তাঁর পেছনে গিয়ে দাঁড়ালাম। সহসা তাঁর দু'কাঁধের মধ্যস্থ মোহরে নবুওয়াতের প্রতি আমার দৃষ্টি পড়ে, যা দেখতে পাখির (কবুতরের) ডিমের মতো।
তা ছিল ডিমের ন্যায় লাল গোশতপিণ্ড:
عَنْ جَابِرِ بْنِ سَمُرَةَ ، قَالَ : رَأَيْتُ الْخَاتَمَ بَيْنَ كَتِفَيْ رَسُولِ اللهِ ﷺ غُدَّةً حَمْرَاءَ مِثْلَ بَيْضَةِ الْحَمَامَةِ
১৩. জাবির ইবনে সামুরা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি রাসূলুল্লাহ এর দু'কাঁধের মধ্যবর্তী স্থানে মোহরে নবুওয়াত দেখেছি। আর তা যেন ছিল ডিমের ন্যায় লাল গোশতপিণ্ড।
টিকাঃ
¹² সহীহ বুখারী, হা/১৯০; সহীহ মুসলিম, হা/৬২৩৩; মু'জামুল কাবীর, হা/৬৫৪০; শারহুস সুন্নাহ, হা/৩৬২২; মিশকাত, হা/৪৭৬।
¹⁰ সহীহ মুসলিম, হা/৬২৩০; মুসনাদে আহমাদ, হা/২১০৩৬; মুস্তাদরাকে হাকেম, হা/৪১৯৭; সহীহ ইবনে হিব্বান, হা/৬৩০১; জামেউস সগীর, হা/৮৯৩৯; মিশকাত, হা/৫৭৭৯।
সাহাবীগণ ইচ্ছে করলে মোহরে নবুওয়াতকে চুম্বন করতে পারতেন:
عَنْ رُمَيْثَةً قَالَتْ : سَمِعْتُ رَسُولَ اللهِ ﷺ وَلَوْ أَشَاءُ أَنْ أُقَبِلَ الْخَاتَمَ الَّذِي بَيْنَ كَتِفَيْهِ مِنْ قُرْبِهِ لَفَعَلْتُ ، يَقُولُ لِسَعْدِ بْنِ مُعَادٍ يَوْمَ مَاتَ : اهْتَزَّ لَهُ عَرْشُ الرَّحْمَنِ
১৪. রুমায়সা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, সা'দ ইবনে মুয়ায (রাঃ) এর ওফাতের দিন আমি রাসূলুল্লাহ ﷺ কে বলতে শুনেছি যে, তাঁর মৃত্যুতে রহমান (আল্লাহ তা'আলা) এর আরশ কেঁপে উঠেছিল। রুমায়ছা (রাঃ) বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ যখন এ উক্তি করেন তখন আমি তাঁর এত নিকটে ছিলাম যে, ইচ্ছে করলে তাঁর মোহরে নবুওয়াত চুম্বন করতে পারতাম।
সেটি ছিল এক গুচ্ছ কেশের মতো:
عَنْ أَبِي زَيْدٍ عَمْرُو بْنُ أَخْطَبَ الْأَنْصَارِيُّ ، قَالَ : قَالَ لِي رَسُولُ اللهِ ﷺ : يَا أَبَا زَيْدٍ ، أَدْنُ مِنِّي فَامْسَحُ ظَهْرِي ، فَمَسَحْتُ ظَهْرَهُ فَوَقَعَتْ أَصَابِعِي عَلَى الْخَاتَمِ قُلْتُ : وَمَا الْخَاتَمُ ؟ قَالَ : شَعَرَاتٌ مُجْتَمِعَاتٌ
১৫. আবু যায়েদ আমর বিন আখতাব আনসারী (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ ﷺ আমাকে বললেন, হে আবু যায়েদ! আমার কাছে এসো এবং আমার পৃষ্ঠদেশে হাত বুলাও। তখন আমি তাঁর পিঠে হাত বুলাতে থাকলাম। এক পর্যায়ে আমার আঙ্গুলগুলো মোহরে নবুওয়াতের উপর লেগে গেল। বর্ণনাকারী আমর বিন আখতাব (রাঃ) কে বললেন, 'খাতাম' (মোহরে নবুওয়াত) কী জিনিস? তিনি বললেন, এক গুচ্ছ কেশ।
সালমান ফারসি (রাঃ) মোহরে নবুওয়াত দেখে ঈমান এনেছিলেন:
عَنْ أَبِي بُرَيْدَةَ اللهِ، يَقُوْلُ : جَاءَ سَلْمَانُ الْفَارِسِيُّ إِلَى رَسُولِ اللهِ ﷺ حِينَ قَدِمَ الْمَدِينَةَ بِمَائِدَةٍ عَلَيْهَا رُطَبٌ فَوَضَعَهَا بَيْنَ يَدَيْ رَسُولِ اللهِ ﷺ ، فَقَالَ : يَا سَلْمَانُ مَا هُذَا ؟ فَقَالَ : صَدَقَةٌ عَلَيْكَ وَعَلَى أَصْحَابِكَ ، فَقَالَ : إِرْفَعُهَا ، فَإِنَّا لَا تَأْكُلُ الصَّدَقَةَ قَالَ : فَرَفَعَهَا ، فَجَاءَ الْغَدَ بِمِثْلِهِ ، فَوَضَعَهُ بَيْنَ يَدَيْ رَسُولِ اللَّهِ ﷺ ، فَقَالَ : مَا هَذَا يَا سَلْمَانُ ؟ فَقَالَ : هَدِيَّةٌ لَكَ . فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ لِأَصْحَابِهِ : أَبْسُطُوا. ثُمَّ نَظَرَ إِلَى الْخَاتَمِ عَلَى ظَهْرِ رَسُولِ اللهِ ﷺ فَأَمَنَ بِهِ وَكَانَ لِلْيَهُودِ فَاشْتَرَاهُ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ بِكَذَا وَكَذَا دِرْهَمَا عَلَى أَنْ يَغْرِسَ لَهُمْ نَخْلًا فَيَعْمَلَ سَلْمَانُ فِيْهِ حَتَّى تُطْعِمَ فَغَرَسَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ النَّحْلَ إِلَّا نَخْلَةٌ وَاحِدَةً غَرَسَهَا عُمَرُ فَحَمَلَتِ النَّخْلُ مِنْ عَامِهَا وَلَمْ تَحْمِلْ نَخْلَةٌ فَقَالَ رَسُولُ اللَّهِ ﷺ مَا شَأْنُ هَذِهِ النَّخْلَةِ فَقَالَ عُمَرُ يَا رَسُولَ اللهِ أَنَا غَرَسْتُهَا فَنَزَعَهَا رَسُولُ اللهِ ﷺ فَغَرَسَهَا فَحَمَلَتْ مِنْ عَامِهَا
টিকাঃ
¹⁴ মুসনাদে আহমাদ, হা/২৬৮৩৬; মু'জামুল কাবীর, হা/২০১৬৫; মা'রেফাতুস সাহাবা, হা/৭০০৫।
* মুসনাদে আহমাদ, হা/২২৯৪০; মুস্তাদরাকে হাকেম, হা/৪১৯৮।
১৬. আবু বুরায়দা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ এর মদিনায় হিজরতের পর একবার সালমান ফারসী (রাঃ) একটি পাত্রে কিছু কাঁচা খেজুর নিয়ে এলেন এবং তিনি তা রাসূলুল্লাহ এর সামনে রাখলেন। রাসূলুল্লাহ বললেন, হে সালমান! এগুলো কিসের খেজুর? (অর্থাৎ হাদিয়া না সাদাকা?) তিনি বললেন, এগুলো আপনার ও আপনার সাথীদের জন্য সাদাকা। রাসূলুল্লাহ বললেন, এগুলো তুলে নাও। আমরা সাদাকা খাই না। বর্ণনাকারী বলেন, অতঃপর তিনি তা তুলে নিলেন। পরের দিন তিনি অনুরূপ খেজুর নিয়ে আসলেন এবং রাসূলুল্লাহ এর সামনে পেশ করেন। তখন তিনি বললেন, সালমান! এসব কিসের খেজুর? সালমান (রাঃ) বললেন, আপনার জন্য হাদিয়া। তখন রাসূলুল্লাহ তাঁর সাহাবীগণকে বললেন, তোমরা হস্ত প্রসারিত করো (হাদিয়া গ্রহণ করো)। এরপর সালমান (রাঃ) রাসূলুল্লাহ এর পৃষ্ঠদেশে মোহরে নবুওয়াত দেখতে পেলেন; অতঃপর ঈমান আনলেন।
(বর্ণনাকারী বলেন) সালমান (রাঃ) জনৈক ইয়াহুদির গোলাম ছিলেন। রাসূলুল্লাহ তাকে এত এত দিরহামের বিনিময়ে এবং এ শর্তে খরিদ করেন যে, সালমান তাঁর ইয়াহুদি মনিবের জন্য একটি খেজুর বাগান করে দেবে এবং তাতে ফল আসা পর্যন্ত তত্ত্বাবধান করতে থাকবে। রাসূলুল্লাহ তাঁর নিজ হাতে একটি চারা ছাড়া সবগুলো রোপণ করলেন এবং একটি চারা গাছ ওমর (রাঃ) রোপণ করেছিলেন। সে বছরই সকল গাছেই খেজুর আসল কিন্তু একটি গাছে খেজুর আসল না। তখন রাসূলুল্লাহ বললেন, এ গাছটির এ অবস্থা কেন? উমর (রাঃ) বললেন, হে আল্লাহর রাসূল! আমি এটি রোপণ করেছিলাম। তখন রাসূলুল্লাহ ঐ চারাটি উপড়িয়ে আবার রোপণ করলেন। ফলে সে বছরই তাতে খেজুর আসল।
ব্যাখ্যা : إِنَّا لَا تَأْكُلُ الصَّدَقَةَ আমরা সাদাকা ভক্ষণ করি না' এ বাক্যের মধ্যে আমরা দ্বারা রাসূলুল্লাহ এবং তাঁর ঐ সমস্ত আত্মীয়-স্বজনকে বুঝানো হয়েছে, যাদের জন্য সাদাকা খাওয়া হারাম।
এটি ছিল এক টুকরো বাড়তি গোশত:
عَنْ أَبِي نَضْرَةَ الْعَوَقِي قَالَ : سَأَلْتُ أَبَا سَعِيدٍ الْخُدْرِيِّ الله عَنْ خَاتَمِ رَسُوْلِ اللَّهِ ﷺ يَعْنِي خَاتَمَ النُّبُوَّةِ فَقَالَ : كَانَ فِي ظَهْرِهِ بَضْعَةٌ نَاشِرَةٌ
টিকাঃ
¹⁶ মুসনাদে আহমাদ, হা/২৩০৪৭; শারহুল মা'আনী, হা/২৯৮৬; মুসনাদুল বাযযার, হা/৪৪০৭।
১৭. আবু নজর আওয়াকী (রহ.) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি আবু সা'ঈদ খুদরী (রাঃ)-কে রাসূলুল্লাহ এর মোহরে নবুওয়াত সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলাম। তখন তিনি বললেন, তা ছিল তাঁর পৃষ্ঠদেশের উপর এক টুকরো বাড়তি গোশত।
এটি ছিল মুষ্টিবদ্ধ আঙ্গুলীর ন্যায়, আর এর চারপার্শ্বে আচিলের মতো কতগুলো তিলক ছিল:
عَنْ عَبْدِ اللهِ بْنِ سَرْجِسَ ةِ قَالَ : أَتَيْتُ رَسُولَ اللهِ ﷺ وَهُوَ فِي نَاسٍ مِنْ أَصْحَابِهِ ، فَدُرْتُ هُكَذَا مِنْ خَلْفِهِ ، فَعَرَفَ الَّذِي أُرِيدُ ، فَأَلْقَى الرِّدَاءَ عَنْ ظَهْرِهِ ، فَرَأَيْتُ مَوْضِعَ الْخَاتَمِ عَلَى كَتِفَيْهِ مِثْلَ الْجُمْعِ حَوْلَهَا خِيْلَانٌ كَأَنَّهَا ثَأْلِيلُ . فَرَجَعْتُ حَتَّى اسْتَقْبَلْتُهُ ، فَقُلْتُ : غَفَرَ اللَّهُ لَكَ يَا رَسُولَ اللهِ ، فَقَالَ : وَلَكَ فَقَالَ الْقَوْمُ : اَسْتَغْفَرَ لَكَ رَسُولُ اللهِ ﷺ ؟ فَقَالَ : نَعَمْ ، وَلَكُمْ . ثُمَّ تَلَا هُذِهِ الْآيَةَ وَاسْتَغْفِرْ لِذَنْبِكَ وَلِلْمُؤْمِنِينَ وَالْمُؤْمِنَاتِ
১৮. আবদুল্লাহ ইবনে সারজিস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদা আমি রাসূলুল্লাহ এর কাছে আসলাম। তখন তিনি তাঁর সাহাবীগণের মাঝে ঘুরতেছিলেন। এক পর্যায়ে আমি তাঁর পিছু ধরলাম। তিনি আমার মনোবাঞ্ছনা বুঝতে পেরে পিঠ থেকে চাদর সরিয়ে ফেলেন। তখন আমি তাঁর দু'কাঁধের মধ্যবর্তী স্থানে মোহরে নবুওয়াত দেখতে পাই। আর তা ছিল মুষ্টিবদ্ধ আঙ্গুলীর ন্যায় এবং এর চারপার্শ্বে আচিলের মতো কতগুলো তিলক শোভা পাচ্ছিল। এরপর আমি তাঁর সামনে এসে দাঁড়ালাম এবং বললাম, হে আল্লাহর রাসূল! আল্লাহ আপনাকে ক্ষমা করুন। তখন তিনি বললেন, তোমাকেও ক্ষমা করুন। তারপর লোকে আমাকে বলতে লাগল, তুমি বড়ই সৌভাগ্যবান। রাসূলুল্লাহ তোমার মাগফিরাত কামনা করেছেন। তখন তিনি বললেন, হ্যাঁ- তিনি তোমাদের জন্যও দু'আ করেছেন। এরপর তিনি এ আয়াত তিলাওয়াত করেন-
وَاسْتَغْفِرْ لِذَنْبِكَ وَلِلْمُؤْمِنِينَ وَالْمُؤْمِنَاتِ (হে রাসূল!) আপনি আপনার জন্য এবং মুমিন পুরুষ ও নারীদের জন্য মাগফিরাত কামনা করুন। (সূরা মুহাম্মাদ- ১৯)
টিকাঃ
¹⁷ জামেউস সগীর, হা/৮৯৩৯; সিলসিলা সহীহাহ, হা/২০৯৩।
* সুনানুল কুবra লিন নাসাঈ, হা/১১৪৩২; মা'রেফাতুস সাহাবা, হা/৩৭৩১।
📄 রাসূলুল্লাহ্ ﷺ এর চুল
بَابُ مَا جَاءَ فِي شَعْرِ رَسُولِ اللَّهِ ﷺ
অধ্যায়-৩: রাসূলুল্লাহ এর চুল
রাসূলুল্লাহ এর মাথার চুল দু'কানের মধ্যভাগ পর্যন্ত লম্বা ছিল:
عَنْ أَنَسِ بْنِ مَالِكٍ ، قَالَ : كَانَ شَعْرُ رَسُولِ اللَّهِ ﷺ إِلَى نِصْفِ أُذُنَيْهِ
১৯. আনাস ইবনে মালিক (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ এর মাথার চুল দু'কানের মধ্যভাগ পর্যন্ত লম্বা ছিল।
عَنْ عَائِشَةَ ، قَالَتْ : كُنْتُ اغْتَسِلُ أَنَا وَرَسُولُ اللهِ ﷺ مِنْ إِنَاءٍ وَاحِدٍ ، وَكَانَ لَهُ شَعْرٌ فَوْقَ الْجُمَّةِ وَدُونَ الْوَفْرَةِ
২০. আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি এবং রাসূলুল্লাহ একত্রে একই পাত্রের পানি দ্বারা গোসল করতাম। আর তাঁর চুল কানের লতি এবং মধ্যবর্তী স্থান বরাবর লম্বা ছিল।
عَنِ الْبَرَاءِ بْنِ عَازِبٍ ، قَالَ : كَانَ رَسُولُ اللهِ ﷺ مَرْبُوعًا ، بَعِيدَ مَا بَيْنَ الْمِنْكَبَيْنِ . وَكَانَتْ جُمَّتُهُ تَضْرِبُ شَحْمَةَ أَذُنَيْهِ
২১. বারা ইবনে আযিব (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ মধ্যমাকৃতির দেহবিশিষ্ট ছিলেন। তাঁর দু'কাঁধের মধ্যবর্তী স্থান প্রশস্ত ছিল। তাঁর মাথার চুল কানের লতি পর্যন্ত লম্বা ছিল।
তাঁর চুল সামান্য কোঁকড়ানো ছিল:
عَنْ قَتَادَةَ قَالَ : قُلْتُ لِأَنَسٍ : كَيْفَ كَانَ شَعْرُ رَسُولِ اللهِ ﷺ ؟ قَالَ : لَمْ يَكُنْ بِالْجَعْدِ وَلَا بِالسَّبْطِ ، كَانَ يَبْلُغُ شَعْرُهُ شَحْمَةَ أُذُنَيْهِ
২২. কাতাদা (রহঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ এর কেশ কেমন ছিল সে সম্পর্কে আমি আনাস (রাঃ)-এর নিকট জিজ্ঞেস করেছিলাম। তিনি বললেন, তিনি অত্যাধিক কোঁকড়ানো কিংবা একেবারে সোজা কেশবিশিষ্ট ছিলেন না। তাঁর কেশ উভয় কানের লতি পর্যন্ত শোভা পেত।
টিকাঃ
¹⁹ নাসাঈ, হা/৫২৩৪; শারহুস সুন্নাহ, হা/৩৬৩৮।
²⁰ শারহুস সুন্নাহ, হা/৩১৩৭; মিশকাত, হা/৪৪৬০।
²¹ সহীহ বুখারী, হা/৩৫৫১; সহীহ মুসলিম, হা/৬২১০; আবু দাউদ, হা/৪০৭৪; নাসাঈ, হা/৫২৩২; মুসনাদে আহমাদ, হা/১৮৪৯৬; সহীহ ইবনে হিব্বান, হা/৬২৮৪; মিশকাত, হা/৫৭৮৩।
²² সহীহ মুসলিম, হা/৬২১৩; নাসাঈ, হা/৫০৫৩; মুসনাদে আহমাদ, হা/১২৪০৫; সহীহ ইবনে হিব্বান, হা/৬২৯১।
তিনি চুলের মধ্যে বেণী বাঁধতেন:
عَنْ أُمِّ هَانِي بِنْتِ أَبِي طَالِبٍ ، قَالَتْ : قَدِمَ رَسُوْلُ اللَّهِ ﷺ مَكَّةَ قَدْمَةٌ وَلَهُ أَرْبَعُ غَدَائِرَ
২৩. উম্মে হানী বিনতে আবু তালিব (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, একদা রাসূলুল্লাহ চারটি চুলের বেণী নিয়ে মক্কায় আগমন করেছিলেন।
ব্যাখ্যা: উল্লেখিত হাদীসে বেণী বা ঝুটি বলতে মহিলাদের মতো বেণী বা ঝুটি উদ্দেশ্য নয়। বরং এর দ্বারা বিশেষ ধরনের চুলের পরিপাটির উদ্দেশ্য। কেননা রাসূলুল্লাহ পুরুষদেরকে মহিলাদের সাদৃশ্য অবলম্বন করতে কঠোরভাবে নিষেধ করেছেন।
عَنْ أَنَسٍ : أَنَّ شَعْرَ رَسُولِ اللَّهِ ﷺ كَانَ إِلَى أَنْصَافِ أُذْنَيْهِ
২৪. আনাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ এর মাথার চুল তাঁর দু'কানের মাঝামাঝি পর্যন্ত লম্বা ছিল।
রাসূলুল্লাহ চুলের মধ্যে সিঁথি করতেন:
عَنِ ابْنِ عَبَّاسٍ : أَنَّ رَسُولَ اللهِ ﷺ كَانَ يُسْدِلُ شَعْرَهُ ، وَكَانَ الْمُشْرِكُوْنَ يَفْرِقُونَ رُءُوسَهُمْ ، وَكَانَ أَهْلُ الْكِتَابِ يُسْدِلُونَ رُءُوسَهُمْ . وَكَانَ يُحِبُّ مُوَافَقَةً أَهْلِ الْكِتَابِ فِيْمَا لَمْ يُؤْمَرُ فِيْهِ بِشَيْءٍ ، ثُمَّ فَرَقَ رَسُوْلُ اللَّهِ ﷺ رَأْسَهُ
২৫. ইবনে আব্বাস (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ তাঁর কেশ নিম্নদেশে ঝুলিয়ে রাখতেন (অর্থাৎ প্রথমদিকে তিনি সিঁথি করতেন না)। আর মুশরিকরা তাদের মাথায় সিঁথি করত। পক্ষান্তরে আহলে কিতাব তাদের মাথার চুল ঝুলিয়ে রাখত। প্রথমদিকে রাসূলুল্লাহ যে ব্যাপারে প্রত্যাদেশ না পেতেন, সেসব ব্যাপারে আহলে কিতাবদের অনুসরণ পছন্দ করতেন। এরপর রাসূলুল্লাহ তাঁর কেশকে সিঁথি করতেন।
عَنْ أُمِّ هَانِي ، قَالَتْ : رَأَيْتُ رَسُولَ اللَّهِ ﷺ ذَا ضَفَائِرَ أَرْبِعِ
২৬. উম্মে হানী (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ-কে আমি চুলের চারটি বেণী বাঁধা অবস্থায় দেখেছি।
টিকাঃ
²⁰ আবু দাউদ, হা/৪১৯৩; ইবনে মাজাহ, হা/৩৬৩১; মুসনাদে আহমাদ, হা/২৬৯৩৪; মুসান্নাফে ইবনে আবি শায়বা, হা/২৫৫৭৩; মিশকাত, হা/৪৪৪৬।
²⁴ সহীহ মুসলিম, হা/৬২১৫; আবু দাউদ, হা/৪১৮৮; নাসাঈ, হা/৫০৬১; মুসনাদে আহমাদ, হা/১২১৩৯।
²⁵ সহীহ বুখারী, হা/৩৫৫৮; নাসাঈ, হা/৫২৩৮; মুসনাদে আহমাদ, হা/২৬০৫।
²⁶ মুসনাদে আহমাদ, হা/২৭৪৩০; মু'জামুল কাবীর লিত তাবারানী, হা/২০৪৮৩।
📄 রাসূলুল্লাহ্ ﷺ এর মাথার চুল বিন্যাস করা
بَابُ مَا جَاءَ فِي تَرَجُلِ رَسُولِ اللَّهِ ﷺ
অধ্যায়-৪: রাসূলুল্লাহ এর মাথার চুল বিন্যাস করা
রাসূলুল্লাহ মাথার কেশ পরিপাটি করতেন:
عَنْ عَائِشَةَ ، قَالَتْ : كُنْتُ أُرَجِلُ رَأْسَ رَسُولِ اللَّهِ ﷺ وَأَنَا حَائِضٌ
২৭. আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, আমি হায়েয (ঋতুবতী) অবস্থায় রাসূলুল্লাহ এর মাথার কেশ পরিপাটি করতাম।
তিনি ডান দিক থেকে কেশ বিন্যাস করতেন:
عَنْ عَائِشَةَ قَالَتْ : إِنْ كَانَ رَسُولُ اللهِ ﷺ لَيُحِبُّ التَّيَمَنَ فِي ظُهُورِهِ إِذَا تَطَهَّرَ ، وَفِي تَرَجُلِهِ إِذَا تَرَجَّلَ ، وَفِي انْتِعَالِهِ إِذَا انْتَعَلَ
২৮. আয়েশা (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ যখন ওযু করতেন তখন ডান দিক থেকে শুরু করতেন, কেশ বিন্যাস ও জুতা পরিধানের কাজও ডান দিক থেকে আরম্ভ করতেন।
ব্যাখ্যা: হাদীসে উল্লেখিত বিষয়গুলোই নয়; বরং যেসব কাজে সৌন্দর্য ও মর্যাদা বৃদ্ধি পায়, সেসব কাজ ডান দিকে হতে আরম্ভ করা মুস্তাহাব। যেমন- জামা বা মোজা পরিধান করার সময় ডান দিক থেকে শুরু করা পছন্দনীয়। কারণ এর দ্বারা সৌন্দর্য বৃদ্ধি পায়। এমনিভাবে মসজিদে প্রবেশ করার সময় ডান পা প্রথমে দেবে। কারণ মসজিদে প্রবেশ করা মর্যাদার বিষয়। আর যেসব কাজে সৌন্দর্য ও মর্যাদা বৃদ্ধি পায় না, সেসব কাজ বাম দিক থেকে আরম্ভ করা মুস্তাহাব। যেমন- পায়খানায় প্রবেশের সময় বাম পা আগে দেয়া, কাপড় ও জুতা খোলার সময় বাম পার্শ্ব হতে খুলা আরম্ভ করা এবং মসজিদ হতে বের হওয়ার সময় বাম পা আগে বের করা। আয়েশা (রাঃ) কর্তৃক বর্ণিত হাদীসটি মূলনীতি হিসেবে গণ্য হবে।
তিনি প্রত্যহ কেশ বিন্যাস করতে নিষেধ করেছেন:
عَنْ عَبْدِ اللهِ بْنِ مُغَفَّلٍ له . قَالَ : نَهَى رَسُولُ اللَّهِ ﷺ عَنِ التَّرَجُلِ إِلَّا غِيًّا
২৯. আবদুল্লাহ ইবনে মুগাফ্ফাল (রাঃ) হতে বর্ণিত। তিনি বলেন, রাসূলুল্লাহ প্রত্যহ (বারবার) কেশ বিন্যাস করতে নিষেধ করেছেন।
টিকাঃ
²⁷ মুয়াত্তা ইমাম মালেক, হা/১৩৩; সহীহ বুখারী, হা/২৯৫; নাসাঈ, হা/২৭৭; মু'জামুল আওসাত, হা/২০৬৬; দারেমী, হা/১০৫৮; সহীহ ইবনে হিব্বান, হা/১৩৫৯; মিশকাত, হা/৪৪১৯।
²⁸ সহীহ মুসলিম, হা/৬৩৯; ইবনে মাজাহ, হা/৪০১; মুসনাদে আহমাদ, হা/২৫৭০৫; মুসনাদে আবু ই'আলা, হা/৪৮৫১।