📄 কখন ও কোথায় দু‘আ’ কবুল হয়
নিম্নলিখিত সময়, স্থান ও অবস্থায় দুআ’ কবুল করা হয় বলে হাদীস-সূত্রে জানতে পারা যায়:-
শবে কদরে, রাত্রির শেষ তৃতীয়াংশে, ফরদ নামাযের পশ্চাতে (সালাম ফিরার পূর্বে), আযান ও ইকামতের মধ্যবর্তীকালে, ইকামত হলে, রাতের কোন এক মুহূর্তে, জুমুআর রাত্রি-দিনের কোন এক মুহূর্তে, ফরদ নামাযের জন্য আযান দেওয়ার সময়, বৃষ্টি বর্ষণের সময়, জিহাদে হানাহানি চলা কালে, সত্য নিয়তে ও দৃঢ় প্রত্যয়ের সাথে যমযম পানি পান করার সময়, সিজদাবনত অবস্থায়, রাত্রি কালে ঘুম থেকে জেগে ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহু ওয়াহদাহু লা শারীকালাহু, লাহুল মুলক, ওয়াল্লাহুল হামদ, ওয়াহুয়া আলা কুল্লি শাইইন কাদীর। আল হামদু লিল্লাহ, সুবহানাল্লাহ, অলা ইলাহা ইল্লাল্লাহ, আল্লাহু আকবার, অলা হাওলা অলা কুওয়াতা ইল্লা বিল্লাহ’ বলে দুআ’ করার সময়, অযু করে ঘুমিয়ে রাত্রে জেগে দুআ’ করার সময়, ইসমে আযম দ্বারা দুআ’ করার সময়, কারো মৃত্যুর পর, শেষ তাশাহহুদে আল্লাহর প্রশংসা করে ও নবী (ﷺ)-এর উপর দরূদ পাঠ ক’রে দুআ’ করার সময়, কারো অনুপস্থিতিতে তার জন্য কেউ দুআ’ করার সময়, রমযান মাসে, যিকরের মজলিসে, বিপদের সময়, ‘ইন্না লিল্লাহ------ আল্লাহুম্মা’ জুরনী-----’ পড়ার সময়, নির্মল ইখলাস ও আল্লাহর প্রতি হৃদয়ের পরম ভক্তি ও চরম আগ্রহের সময়, অত্যাচারিত অত্যাচারীর উপর বদ্দুআ করলে, পিতামাতা পুত্রের জন্য দুআ’ অথবা বদ্দুআ করলে, মুসাফির দুআ’ করলে, রোযাদার দুআ’ করলে, আর্তব্যক্তি দুআ’ করলে, ন্যায়পরায়ণ বাদশাহ দুআ’ করলে, কা’বঘরের ভিতরে, সাফার উপর, মারওয়ার উপর, আরাফার দিনে আরাফার ময়দানে, মাশআরুল হারামের নিকট, মিনায় ছোট ও মধ্যম জামারায় পাথর মারার পর, ইসতিফতাহে নির্দিষ্ট দুআ’ পাঠ করলে, সুরাহ ফাতিহাহ পাঠ করার সময় ও শেষে আমীন বলার সময়, রুকূ’ থেকে মাথা তুলে ইত্যাদি।⁹¹
টিকাঃ
৯১. আদ দুআ’ মিনাল কিতাবি অস সুন্নাহ ১০-১৫ পৃ:
📄 দু‘আ’ কবুল না হবার কারণ
১। অনেকে দুআ’ করে, কিন্তু তাদের দুআ’ কবুল হয় না, চায় অথচ পায় না। এর কতকগুলো কারণ আছে, যেমন; শীঘ্রতা করা। দুআ’ করার পরই যে মঞ্জুর হবে তা জরুরী নয়। যেমন আল্লাহর রসূল (ﷺ) বলেন, “তোমাদের কারো দুআ’ কবুল করা হয়, যতক্ষণ না সে তাড়াতাড়ি করে। বলে, “দুআ’ করলাম অথচ কবুল হল না।”⁹²
২। সৃষ্টিকর্তা সর্বজ্ঞ আল্লাহ তায়ালার হিকমাত। বান্দা দুআ'তে যা চায়, তা তার জন্য মঙ্গলদায়ক কি না, তা সে সঠিক জানে না। কিন্তু আল্লাহ তাআলা সব কিছু জানেন, বান্দা যা চাচ্ছে, তা তার জন্য কল্যাণকর হবে কি না, তা বর্তমানেই তার জন্য ফলপ্রসূ, নাকি কিছুদিন বা দীর্ঘদিন পর? অথবা যা চাচ্ছে, তা তার জন্য যথোপযুক্ত নয়। বরং অন্য কিছু তার জন্য অধিক লাভদায়ক। অথবা কল্যাণ আসার চেয়ে আসন্ন বিপদ থেকে নিষ্কৃতি পাওয়া তার জন্য ভালো। তাই আল্লাহ বান্দার জন্য যা করেন, তা তার মঙ্গলের জন্যই করেন। বান্দার আসল মঙ্গলের প্রতি খেয়াল রেখে কখনো দুআ' কবুল হয়, কখনো কবুল হয় না। তা বলে তার দুআ' করাটা বৃথা নষ্ট হয়ে যায় না। প্রিয় নবী (ﷺ) বলেন, “কোনো মুসলিম যখন আল্লাহর নিকট এমন দুআ' করে, যাতে পাপ ও জ্ঞাতিবন্ধন ছিন্নতা নেই, তখন আল্লাহ তাকে তিনটের একটা দান ক'রে থাকেন; সত্তর তার দুআ' মঞ্জুর করা হয় অথবা পরকালের জন্য তা জমা রাখা হয় অথবা অনুরূপ কোনো অকল্যাণকে তার জীবন হতে দূর করা হয়।” লোকেরা বলল, ‘তাহলে আমরা অধিক অধিক দুআ' করব।’ তিনি বললেন, “আল্লাহও অধিক দানশীল।”⁶²
৩। কোনো পাপ বা জ্ঞাতিবন্ধন ছিন্ন করার দুআ' করলে তা কবুল হয় না। পাপের দুআ' যেমন, অভিনেতা অভিনেত্রীদের অভিনয়ে উন্নতির জন্য দুআ', চোরের চুরি করতে ধরা না পড়ার দুআ' ইত্যাদি।
৪। হারাম পানাহার ও পরিধান করা।
৫। দুআ'তে দৃঢ়তা না হওয়া এবং আল্লাহর ইচ্ছায় 'যদি' যোগ করা। যেহেতু আল্লাহর ইচ্ছার বিরুদ্ধে কিছু নেই। যেমন দুআ'র আদবে আলোচিত হয়েছে।
৬। সৎকাজের আদেশ এবং অসৎকাজে বাধা দান ত্যাগ করা। মানুষ নিজে ভালো হলেই যথেষ্ট নয়। অপরকে ভালো করার চেষ্টা করাও তার সর্বাঙ্গীন ভালো হবার পরিপূরক। তাই সর্বাসুন্দর ভালো লোক হতে চাইলে সামর্থ্যানুযায়ী সৎকাজের আদেশ দিতে হবে এবং সম্মুখে বা জানতে কোনো পাপকাজ ঘটলে, তাতে সাধ্যানুক্রমে (হাত দ্বারা, না পারলে মুখ দ্বারা) বাধা দিতে হবে। তাও না পারলে, অন্তর দ্বারা ঘৃণা করতে হবে। নচেৎ শান্তিতে সেও তাদের দলভুক্ত হবে, আর তার দুআ'ও মঞ্জুর হবে না।⁶³
৭। কিছু পাপ বা নির্দিষ্ট অবাধ্যাচরণে লিপ্ত থাকা। যার অবাধ্যচারণ করা হয় ও যার কথার অন্যথাচরণ করা হয় তার নিকট প্রার্থনা করে কিছু পাওয়ার আশা সব সময় করা যায় না। এ ব্যাপারে রসূল (ﷺ)-এর একটি ইঙ্গিত; তিনি বলেন, “তিন ব্যক্তি দুআ' করে অথচ তাদের দুআ' মঞ্জুর করা হয় না: (১) যে ব্যক্তির বিবাহ-বন্ধনে কোনো দুশ্চরিত্রা স্ত্রী থাকে অথচ তাকে তালাক দেয় না, (২) এক ব্যক্তি অপর ব্যক্তির নিকট মালের অধিকারী থাকে অথচ তার ওপর সাক্ষী রাখে না। (৩) যে ব্যক্তি নির্বিধারে তার সম্পদ দান করে অথচ আল্লাহ পাক বলেন, “আর তোমাদের সম্পদ নির্বোধদের হাতে অর্পণ করো না-।”³⁸
টিকাঃ
৯২. বুখারী ৬৩/১৪০, মুসলিম ৪/২০৯৫
৬২. আহমাদ ৩/১৮, হাকিম ১/৪৮০, যাদুল মাসীর ১/১৯০
৬৩. বুখারী ১১/১০৪, ৪/২০৬০
৩৮. সূরাহ নিসা ৪: ৫, হাকিম ২/৩০২
📄 দু‘আ’ কবুল হবার কারণ
পূর্বের আলোচনা হতে কি কি কারণে দু‘আ’ মঞ্জুর হয়, তা স্পষ্ট হয়ে গেছে। যেমন হালাল খাওয়া পরা, দু‘আ’র ফললাভের জন্য তাড়াতাড়ি না করা, পাপ ও জ্ঞাতিবন্ধন ছিন্ন করার দু‘আ’ না করা এবং গোনাহ থেকে দূরে থেকে বিশুদ্ধচিত্তে আল্লাহরই নিকট দু‘আ’ করা ইত্যাদি।
দু‘আ’ কবুলের এক শর্ত হল বিশুদ্ধ ঈমান। তাই কাফির বা মুশরিকের দু‘আ’ বা বদদু‘আ’ কবুল নয়। অবশ্য কাফির যদি মুসলিমের হকে দু‘আ’ করে তবে তাতে ‘আমীন’ বলা বৈধ। কারণ মুসলিমের হকে কাফিরের দু‘আ’ও কবুল হয়ে থাকে।
টিকাঃ
৩৯. আল যিক্র অদ্-দু‘আ’ দ্রষ্টব্য
৪০. সিলসিলাহ সহীহাহ ৬/৪৮৩
📄 শুদ্ধ দু‘আ’
দু‘আ’ ও যিকিরকারী মুসলিমদের জন্য একটি সতর্কতার বিষয় এই যে, কেউ যেন দু‘আ’ ও যিকির করতে গিয়ে বিদআত ক’রে না বসে। দু‘আ’ বা যিকির কেবল তাই করা উচিত, যা আল্লাহ ও তাঁর রাসূল (ﷺ) শিক্ষা দিয়েছেন। অথবা কোনো সাহাবী তাঁর জীবনে তা আমল করে গেছেন। যা কিতাব ও সহীহ (ও হাসান) সুন্নাতে অথবা কোনো সাহাবাওয়ারা আমলে প্রমাণিত। যেহেতু সহীহ হাদীসের উপর আমলই মুসলিমদের জন্য যথেষ্ট। অন্যান্য জাল ও দুর্বল হাদীস অথবা কোনো আলিমের মনগড়া কল্পিত আরবী বাক্য দ্বারা যিকির বা দু‘আ’ বিদআত হবে। যেমন যদি কোনো অনির্দিষ্ট দু‘আ’ বা যিকির কোনো স্থান, সময়, নিয়ম, গুণ, সংখ্যা বা কারণ ইত্যাদি দ্বারা নির্দিষ্ট করে নেওয়া হয়, তাহলে তাও বিদআতরূপে পরিগণিত হবে। তাই সাধারণ ক্ষেত্রে ও নিজের প্রয়োজনের সময় দু‘আ’ করতেও কুরআনী দু‘আ’, শুদ্ধ হাদীসে বর্ণিত দু‘আ’য়ে-রাসূল অথবা শুদ্ধ প্রমাণিত কোনো সাহাবীদের দুআ বেছে নেওয়া উচিত। কোনো দুআ না পেলে হামদ ও দরূদ পড়ে নিজের ভাষায় নিজের প্রয়োজন আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করা চলে।
পক্ষান্তরে রাসূল (ﷺ) যে স্থানে বা সময়ে দুআ করতে নির্দেশ দিয়েছেন বা নিজে দুআ করেছেন সেই দুআ’র সেই নিয়ম ও পদ্ধতি সকলের ক্ষেত্রে মান্য হবে। যেমন ইস্তিসকা’য়, আরাফায়, সাফা মারওয়ার উপর, ছোট ও মধ্যম জামারায় পাথর মারার পর, কুনূতে, কেউ দুআ করতে আবেদন করলে তার জন্য (কখনো কখনো) হাত তুলে দুআ করেছেন। এসব ক্ষেত্রে হাত তুলে দুআ করা হবে। নামাজের পর দুআ বা যিকির করেছেন বা করতে নির্দেশ দিয়েছেন, কিন্তু হাত তোলেননি বা তুলতে নির্দেশ দেননি, দাফনের পর দুআ করতে নির্দেশ দিয়েছেন, কিন্তু হাত তুলতে বলেননি বা নিজেও হাত তুলে ওখানে দুআ করেননি, বর-কনের জন্য দুআ করেছেন, কিন্তু হাত তোলেননি। তাই এ সব ক্ষেত্রে এবং যেখানে তাঁর আদর্শ বর্তমান রয়েছে, সেখানে হাত তোলা দুআর আদব বলে আমরা হাত তুলতে পারি না। তাই তো জুমুআর খুতবায় দুআর বিষয় হলেও, হাত তোলা বিদআত। মাসরূক বলেন, ‘(জুমুআর দিন ইমাম-মুক্তাদী মিলে যারা হাত তুলে দুআ করে) আল্লাহ তাদের হাত কেটে নিন।’
অনুরূপ কারণে জামাআতে থাকতেও আল্লাহর রাসূল (ﷺ) যেখানে জামাআতী দুআ করেননি বা কোনো সাহাবীও করেননি, সেখানে আমরাও জামাআত করে দুআ করতে পারি না। তিনি যেমন করেছেন বা নির্দেশ দিয়েছেন, সাহাবায় কিরাম ঐ সব ক্ষেত্রে যেমন করেছেন, তেমনইটা করা আমাদের কর্তব্য। অনুসরণে আমাদের কল্যাণ এবং নতুনভাবে কিছু করাতেই বিপদ আছে। আসুন, আমরা আগামীতে দেখি, আমাদের আদর্শ রাসূল (ﷺ) কোথায়, কোন সময়ে, কিভাবে, কতবার, কী দুআ বা যিকির পড়েছেন বা পড়তে উদ্বুদ্ধ করেছেন এবং সেই মতই আমল করি। যেগুলো প্রার্থনার সাধারণ দুআ সেগুলো আমাদের প্রয়োজন মতো সময়ে অর্থের প্রতি লক্ষ্য করে বেছে নিয়ে প্রার্থনা করি।
টিকাঃ
৬৭. মুসান্নাফ ইবনু আবী শায়বাহ্ ৫৪৮১ ও ৫৪৬৩ নং