📘 সহীহ দুআ ঝাড়ফুঁক ও যিকর 📄 যিকরের প্রকার

📄 যিকরের প্রকার


যিক্‌র দুই প্রকার :
১। আল্লাহ তাআলার সুন্দরতম নামাবলী এবং মহত্তম গুণাবলীর যিক্‌র করা, এসব দ্বারা তাঁর প্রশংসা ও গুণগান করা এবং আল্লাহর জন্য যা উপযুক্ত নয় তা থেকে তাঁকে পাক ও পবিত্র মনে করা। এই যিক্‌রও আবার দুই প্রকারের;
ক- আল্লাহর নাম ও গুণাবলী দ্বারা তাঁর প্রশংসা রচনা করা। যেমন ‘সুবহানাল্লাহ’, ‘আল-হামদু লিল্লাহ’, ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’, ‘আল্লাহু আকবার’ প্রভৃতি।
খ- আল্লাহর নাম ও গুণাবলীর অর্থ ও আহকাম উল্লেখ করা। যেমন বলা যে, আল্লাহ তাআলা বান্দার সমস্ত শব্দ শুনেন, সকল স্পন্দন দেখেন তাঁর নিকট কোন কর্মই গুপ্ত থাকে না, বান্দার মাতা-পিতা অপেক্ষা তিনিই বান্দার উপর অধিক দয়াময়। তিনি সর্ব বিষয়ে সর্বশক্তিমান --ইত্যাদি।
কিন্তু এ ক্ষেত্রে সতর্কতার বিষয় এই যে, যিক্‌রকারী যেন সেই নাম ও গুণের কথাই উল্লেখ করে, যার দ্বারা আল্লাহ পাক নিজের প্রশংসা করেছেন অথবা তাঁর রসূল (ﷺ) যার দ্বারা তাঁর গুণগান করেছেন। এতে যেন কোন প্রকারের হেরফের ও দৃষ্টান্ত বা উপমা বর্ণনা না করা হয় এবং গুণের দলীলাকে নিরর্থক বা আল্লাহকে ঐ গুণহীন মনে করা না হয়। যেমন ঐ সকল নাম ও সিফাতের কোন দূর-ব্যাখ্যা করাও বৈধ নয়।
पक्षান্তরে এই যিক্‌র আবার তিন প্রকারের; হামদ, সানা এবং মাজদ। সত্ত্বায় ও ভক্তির সাথে আল্লাহর সিফাতে-কামাল উল্লেখ করে প্রশংসা করাকে ‘হামদ’ বলা হয়। গুণের পর আরো গুণগানের উল্লেখ করে প্রশংসা করাকে ‘সানা’ বলা হয় এবং আল্লাহ তাআলার মাহাত্ম্য ও শান-শওকত এবং মহিমা ও সার্বভৌমত্বের গুণাবলী দ্বারা প্রশংসা করাকে ‘মাজ্‌দ’ বলা হয়। এই তিন প্রকার প্রশংসা সুরাহ ফাতিহার প্রারম্ভে একত্রিত হয়েছে। অতএব বান্দা যখন নামাযে বলে (الْحَمْدُ لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ) অর্থাৎ, ‘সমস্ত প্রশংসা বিশ্বজগতের প্রতিপালক আল্লাহর নিমিত্তে’ তখন আল্লাহ বলেন, ‘বান্দা আমার প্রশংসা করল।’ যখন বলে, (الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ) অর্থাৎ ‘যিনি অনন্ত করুণাময়, পরম দয়ালু’ তখন আল্লাহ বলেন, ‘বান্দা আমার স্তুতি বর্ণনা করল।’ আর বান্দা যখন বলে, (مَالِكِ يَوْمِ الدِّينِ) অর্থাৎ ‘বিচার দিনের অধিপতি’ তখন আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘বান্দা আমার গৌরব বর্ণনা করল।

২। আল্লাহর আদেশ, নিষেধ এবং বিভিন্ন অনুশাসনের যিক্‌র (স্মরণ) করা। এটিও দুই রকম;
ক - আল্লাহর বিধান উল্লেখ ও জ্ঞাপন করে তাঁর স্মরণ করা। যেমন বলা যে, আল্লাহ এই করতে আদেশ করেছেন, অমুক করতে নিষেধ করেছেন, তিনি এই কাজে সন্তুষ্ট, ঐ কাজে রাগান্বিত ইত্যাদি।
খ - তাঁর বিধান ও অনুশাসন পালন করে তাঁর যিক্‌র (স্মরণ করা, যেমন, যে কাজ তিনি আদেশ করেছেন সত্বর তা পালন করে তাঁর যিক্‌র করা, যা নিষেধ করেছেন সত্বর তা বর্জন করে তাঁর স্মরণ করা। এই সকল যিক্‌র যদি যিক্‌রকারীর নিকট একত্রিত হয়, তবে তার যিক্‌র শ্রেষ্ঠতম যিক্‌র।

যিকরের আরো এক প্রকার যিক্‌র; আল্লাহ তাআলার দেওয়া সম্পদ, দান অনুগ্রহ, সাহায্য ইত্যাদির স্থান ও কাল প্রভৃতি উল্লেখ করে যিক্‌র (শুক্‌র) করা। এটিও এক উত্তম যিক্‌র।
সুতরাং উক্ত পাঁচ প্রকার যিক্‌র, যা কখনো অন্তর ও রসনা দ্বারা হয় এবং এটিই সর্বশ্রেষ্ঠ যিক্‌র। আবার কখনো কেবল অন্তর দ্বারা হয়, যা দ্বিতীয় পর্যায়ের এবং কখনো বা কেবল রসনা দ্বারা হয়, যা তৃতীয় পর্যায়ের। ২ নং যিক্‌র হলে অন্যান্য অঙ্গ দ্বারা কার্যে পরিণত করাও যিক্‌র হয়। অতএব মুমিনের সারা জীবন ও জীবনের প্রতি মুহূর্তটাই যিক্‌রের স্থল। যেমন রসূল (ﷺ)-এর যিক্‌রে আমরা বুঝতে পারব।

উল্লেখ্য যে, দুআ অপেক্ষা যিক্‌র উত্তম। যেহেতু যিক্‌রে আল্লাহ তাআলার সুন্দরতম নাম, মহিমাময় গুণ ইত্যাদির সাথে তাঁর প্রশংসা করা হয়। কিন্তু দুআতে বান্দা নিজের প্রয়োজন আল্লাহর নিকট জানিয়ে তার পূরণ ভিক্ষা করে থাকে। যে দুইয়ের মাঝে রয়েছে বিরাট পার্থক্য। আবার যিক্‌র অপেক্ষা কুরআন তিলাওয়াত উত্তম। কিন্তু যথোপযুক্ত সময়কালে তিলাওয়াত, যিক্‌র ও দুআ’ স- ব স্থানে শ্রেষ্ঠ।¹¹

টিকাঃ
১১. মুসলিম ৩৪৮

যিক্‌র দুই প্রকার :
১। আল্লাহ তাআলার সুন্দরতম নামাবলী এবং মহত্তম গুণাবলীর যিক্‌র করা, এসব দ্বারা তাঁর প্রশংসা ও গুণগান করা এবং আল্লাহর জন্য যা উপযুক্ত নয় তা থেকে তাঁকে পাক ও পবিত্র মনে করা। এই যিক্‌রও আবার দুই প্রকারের;
ক- আল্লাহর নাম ও গুণাবলী দ্বারা তাঁর প্রশংসা রচনা করা। যেমন ‘সুবহানাল্লাহ’, ‘আল-হামদু লিল্লাহ’, ‘লা ইলাহা ইল্লাল্লাহ’, ‘আল্লাহু আকবার’ প্রভৃতি।
খ- আল্লাহর নাম ও গুণাবলীর অর্থ ও আহকাম উল্লেখ করা। যেমন বলা যে, আল্লাহ তাআলা বান্দার সমস্ত শব্দ শুনেন, সকল স্পন্দন দেখেন তাঁর নিকট কোন কর্মই গুপ্ত থাকে না, বান্দার মাতা-পিতা অপেক্ষা তিনিই বান্দার উপর অধিক দয়াময়। তিনি সর্ব বিষয়ে সর্বশক্তিমান --ইত্যাদি।
কিন্তু এ ক্ষেত্রে সতর্কতার বিষয় এই যে, যিক্‌রকারী যেন সেই নাম ও গুণের কথাই উল্লেখ করে, যার দ্বারা আল্লাহ পাক নিজের প্রশংসা করেছেন অথবা তাঁর রসূল (ﷺ) যার দ্বারা তাঁর গুণগান করেছেন। এতে যেন কোন প্রকারের হেরফের ও দৃষ্টান্ত বা উপমা বর্ণনা না করা হয় এবং গুণের দলীলাকে নিরর্থক বা আল্লাহকে ঐ গুণহীন মনে করা না হয়। যেমন ঐ সকল নাম ও সিফাতের কোন দূর-ব্যাখ্যা করাও বৈধ নয়।
पक्षান্তরে এই যিক্‌র আবার তিন প্রকারের; হামদ, সানা এবং মাজদ। সত্ত্বায় ও ভক্তির সাথে আল্লাহর সিফাতে-কামাল উল্লেখ করে প্রশংসা করাকে ‘হামদ’ বলা হয়। গুণের পর আরো গুণগানের উল্লেখ করে প্রশংসা করাকে ‘সানা’ বলা হয় এবং আল্লাহ তাআলার মাহাত্ম্য ও শান-শওকত এবং মহিমা ও সার্বভৌমত্বের গুণাবলী দ্বারা প্রশংসা করাকে ‘মাজ্‌দ’ বলা হয়। এই তিন প্রকার প্রশংসা সুরাহ ফাতিহার প্রারম্ভে একত্রিত হয়েছে। অতএব বান্দা যখন নামাযে বলে (الْحَمْدُ لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ) অর্থাৎ, ‘সমস্ত প্রশংসা বিশ্বজগতের প্রতিপালক আল্লাহর নিমিত্তে’ তখন আল্লাহ বলেন, ‘বান্দা আমার প্রশংসা করল।’ যখন বলে, (الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ) অর্থাৎ ‘যিনি অনন্ত করুণাময়, পরম দয়ালু’ তখন আল্লাহ বলেন, ‘বান্দা আমার স্তুতি বর্ণনা করল।’ আর বান্দা যখন বলে, (مَالِكِ يَوْمِ الدِّينِ) অর্থাৎ ‘বিচার দিনের অধিপতি’ তখন আল্লাহ তাআলা বলেন, ‘বান্দা আমার গৌরব বর্ণনা করল।

২। আল্লাহর আদেশ, নিষেধ এবং বিভিন্ন অনুশাসনের যিক্‌র (স্মরণ) করা। এটিও দুই রকম;
ক - আল্লাহর বিধান উল্লেখ ও জ্ঞাপন করে তাঁর স্মরণ করা। যেমন বলা যে, আল্লাহ এই করতে আদেশ করেছেন, অমুক করতে নিষেধ করেছেন, তিনি এই কাজে সন্তুষ্ট, ঐ কাজে রাগান্বিত ইত্যাদি।
খ - তাঁর বিধান ও অনুশাসন পালন করে তাঁর যিক্‌র (স্মরণ করা, যেমন, যে কাজ তিনি আদেশ করেছেন সত্বর তা পালন করে তাঁর যিক্‌র করা, যা নিষেধ করেছেন সত্বর তা বর্জন করে তাঁর স্মরণ করা। এই সকল যিক্‌র যদি যিক্‌রকারীর নিকট একত্রিত হয়, তবে তার যিক্‌র শ্রেষ্ঠতম যিক্‌র।

যিকরের আরো এক প্রকার যিক্‌র; আল্লাহ তাআলার দেওয়া সম্পদ, দান অনুগ্রহ, সাহায্য ইত্যাদির স্থান ও কাল প্রভৃতি উল্লেখ করে যিক্‌র (শুক্‌র) করা। এটিও এক উত্তম যিক্‌র।
সুতরাং উক্ত পাঁচ প্রকার যিক্‌র, যা কখনো অন্তর ও রসনা দ্বারা হয় এবং এটিই সর্বশ্রেষ্ঠ যিক্‌র। আবার কখনো কেবল অন্তর দ্বারা হয়, যা দ্বিতীয় পর্যায়ের এবং কখনো বা কেবল রসনা দ্বারা হয়, যা তৃতীয় পর্যায়ের। ২ নং যিক্‌র হলে অন্যান্য অঙ্গ দ্বারা কার্যে পরিণত করাও যিক্‌র হয়। অতএব মুমিনের সারা জীবন ও জীবনের প্রতি মুহূর্তটাই যিক্‌রের স্থল। যেমন রসূল (ﷺ)-এর যিক্‌রে আমরা বুঝতে পারব।

উল্লেখ্য যে, দুআ অপেক্ষা যিক্‌র উত্তম। যেহেতু যিক্‌রে আল্লাহ তাআলার সুন্দরতম নাম, মহিমাময় গুণ ইত্যাদির সাথে তাঁর প্রশংসা করা হয়। কিন্তু দুআতে বান্দা নিজের প্রয়োজন আল্লাহর নিকট জানিয়ে তার পূরণ ভিক্ষা করে থাকে। যে দুইয়ের মাঝে রয়েছে বিরাট পার্থক্য। আবার যিক্‌র অপেক্ষা কুরআন তিলাওয়াত উত্তম। কিন্তু যথোপযুক্ত সময়কালে তিলাওয়াত, যিক্‌র ও দুআ’ স- ব স্থানে শ্রেষ্ঠ।¹¹

টিকাঃ
১১. মুসলিম ৩৪৮

📘 সহীহ দুআ ঝাড়ফুঁক ও যিকর 📄 তিলাওয়াতের ফদীলত

📄 তিলাওয়াতের ফদীলত


প্রিয় নবী (ﷺ) বলেন, “যে ব্যক্তি আল্লাহর কিতাবের একটি অক্ষর পাঠ করবে, সে এর বিনিময়ে একটি নেকী অর্জন করবে। আর একটি নেকী দশগুণ করা হবে। (অর্থাৎ, একটি অক্ষর তিলাওয়াতের প্রতিদানে ১০টি নেকীর অধিকারী হবে।) আমি বলছি না যে, আলিফ-লাম-মীম’ একটি অক্ষর। (বরং এতে রয়েছে তিনটি অক্ষর।)”¹²

“তোমরা কুরআন পাঠ কর। কারণ তা কিয়ামতের দিন পাঠকারীদের জন্য সুপারিশকারী রূপে আবির্ভূত হবে।”¹³

“যে ব্যক্তি দশটি আয়াত পাঠ করবে, সে উদাসীনদের মধ্যে লিখিত হবে না, যে ব্যক্তি একশ’টি আয়াত পাঠ করবে, সে অনুগতদের মধ্যে লিখিত হবে। আর যে ব্যক্তি এক হাজারটি আয়াত পাঠ করবে, সে (অশেষ সওয়াবের) ধনপতিদের মধ্যে লিখিত হবে।”¹⁴

“তোমাদের মধ্যে সেই ব্যক্তি উত্তম, যে কুরআন শিক্ষা করে এবং অপরকে শিক্ষা দেয়।”¹⁵

“মাসজিদে গিয়ে একটি আয়াত শিক্ষা করা বা মুখস্থ করা একটি বৃহদাকার উট লাভ করার চেয়েও উত্তম।”¹⁶

“যে ব্যক্তি কষ্ট করেও কুরআন শুদ্ধ করে পড়ার চেষ্টা করে, তার ডবল সাওয়াব।”¹⁷

“কুরআন-ওয়ালারাই আল্লাহওয়ালা এবং তাঁর বিশিষ্ট বান্দা।”¹⁸

“কুরআন তিলাওয়াতকারী পরকালে সম্মানের মুকুট ও সম্মানের পোশাক পরিধান করবে। আল্লাহ তার প্রতি সন্তুষ্ট হবেন এবং আয়াতের সংখ্যা পরিমাণে সে উচ্চ মর্যাদায় উন্নীত হবে।”¹⁹

“মর্যাদায় সবচেয়ে বড় সুরাহ হল, সূরাহ ফাতেহা।”²⁰
“যে গৃহে সূরাহ বাক্বারাহ তিলাওয়াত হয়, সে গৃহে শয়তান (জ্বিন) প্রবেশ করে না।”²¹
“মর্যাদায় সর্বাপেক্ষা বড় আয়াত, আয়াতুল কুরসী।”²²
“রাত্রে সূরাহ বাক্বারার শেষ দুই আয়াত পাঠ করলে, তা সব কিছু হতে যথেষ্ট হবে।”²৩
“সূরাহ বাক্বারাহ ও আলু-ইমরান উভয় সূরাই তিলাওয়াতকারীর জন্য কিয়ামতে আল্লাহর নিকট সুপারিশ করবে।”²⁴
“সূরাহ কাহফের প্রথম দশ আয়াত মুখস্থ করলে দাজ্জালের ফিতনা থেকে মুক্তি লাভ করা সম্ভব হবে।”²৫
“জুমুআর দিন সূরাহ কাহফ পাঠ করলে দুই জুমুআর মধ্যবর্তী জীবন আলোকসময় হবে।”²৬
“সূরাহ মূলুক তার তিলাওয়াতকারীর জন্য সুপারিশ ক'রে পাপস্খলন করবে।”²৭
“চার বার সূরাহ ‘কাফিরুন’ পাঠ করলে এক খতমের সমান সাওয়াব লাভ হয়।”²৮
“সূরাহ ‘ইখলাস’ তিনবার পাঠ করলে এক খতমের সমান নেকী লাভ হয়।”²৯
“যে সূরাহ ইখলাস ভালোবাসে, সে আল্লাহর ভালোবাসা এবং জান্নাত লাভ করবে।”³⁰
“উক্ত সূরাহ দশবার পাঠ করলে পাঠকারীর জন্য জান্নাতে এক গৃহ নির্মাণ করা হবে।”³¹

“কোন সম্প্রদায় আল্লাহর গৃহসমূহের কোন গৃহে সমবেত হয় যখনই কুরআন তিলাওয়াত করে এবং আপোসে তার শিক্ষা গ্রহণ করে তখনই তাদের উপর শান্তি বর্ষিত হয়, রহমতও তাদেরকে ছেয়ে নেয়, ফিরিশ্‌তামণ্ডলী তাদেরকে বেষ্টিত করে রাখেন এবং আল্লাহ তাঁর নিকটবর্তী ফিরিশ্‌তাবর্গের নিকট তাদের কথা আলোচনা করেন।”³²

টিকাঃ
১২. বিস্তারিত দ্রষ্টব্য আল ওয়াবিলুস সায়াব
১৩. তিরমিযী ৫/১৭৫, সহীহুল জামি’ ৫/৩৮০
১৪. মুসলিম
১৫. সিলসিলাহ সহীহাহ ৬৪২
১৬. বুখারী ৬/১০৮
১৭. মুসলিম
১৮. বুখারী ও মুসলিম
১৯. সহীহুল জামি’ ৬১১৬
২০. সহীহুল জামি’, ৮৩৩০, ৮০২২, ৮০২১
২১. বুখারী
২২. মুসলিম
২৩. মুসলিম
২৪. বুখারী, মুসলিম
২৫. মুসলিম
২৬. মুসলিম
২৭. সহীহুল জামি’ ৬৪৬০
২৮. আবু দাউদ, তিরমিযী
২৯. সহীহুল জামি’ ৬৪৬৬
৩০. বুখারী, মুসলিম
৩১. বুখারী, মুসলিম
৩২. সহীহুল জামি’ ৬৪৬২
৩২. মুসলিম

📘 সহীহ দুআ ঝাড়ফুঁক ও যিকর 📄 দু‘আ’র ফদীলত

📄 দু‘আ’র ফদীলত


আল্লাহ তাআলা বলেন, ﴿وَقَالَ رَبُّكُمُ ادْعُونِي أَسْتَجِبْ لَكُمْ إِنَّ الَّذِينَ يَسْتَكْبِرُونَ عَنْ عِبَادَتِي سَيَدْخُلُونَ جَهَنَّمَ دَاخِرِينَ﴾ অর্থাৎ, তোমাদের প্রতিপালক বলেন, তোমরা আমাকে ডাক (আমার নিকট দুআ’ কর) আমি তোমাদের ডাকে সাড়া দেব (আমি তোমাদের দুআ’ কবুল করব)। যারা অহংকারে আমার উপাসনায় (আমার কাছে দুআ’ করা হতে) বিমুখ, ওরা লাঞ্ছিত হয়ে জাহান্নামে প্রবেশ করবে।” (সূরা গাফের/৬০ আয়াত)

তিনি আরো বলেন, “আর আমার বান্দাগণ যখন আমার সম্বন্ধে তোমাকে প্রশ্ন করে (তখন তুমি বল,), আমি তো কাছেই আছি। যখন কোন প্রার্থনাকারী আমার কাছে প্রার্থনা জানায়, তখন আমি তার প্রার্থনা মঞ্জুর করি।” (সূরা বাক্বারাহ ১৮৬)

রসূল (ﷺ) বলেন, “দুআ’ই তো ইবাদাত।”³³

“নিশ্চয় তোমাদের প্রভু লজ্জাশীল অনুগ্রহপরায়ণ, বান্দা যখন তাঁর দিকে দুই হাত তোলে, তখন তা শ্যূন্য ও নিরাশভাবে ফিরিয়ে দিতে বান্দা থেকে লজ্জা করেন।”³⁴

“যে আল্লাহর কাছে প্রার্থনা করে না, আল্লাহ তার উপর ক্রোধান্বিত হন।”³⁵

দুআ’ অন্যান্য ইবাদাতের মতও এক ইবাদাত। যা আল্লাহরই জন্য নির্দিষ্ট। সুতরাং গায়রুল্লাহর নিকট দুআ’ ও প্রার্থনা করলে বা কিছু চাইলে অথবা গায়রুল্লাহকে ডাকলে তা অবশ্যই শিরক হয়। তাই যাবতীয় দুআ’ ও প্রার্থনা কেবল আল্লাহরই নিকট করতে হয় এবং যত কিছু চাওয়া কেবল তাঁরই নিকট চাইতে হয়। সর্বপ্রকার, সর্বাবস্থায় এবং একই সময় অসংখ্য ডাক কেবল তিনিই শুনতে ও বুঝতে পারেন এবং সর্বপ্রকার দান কেবল তিনিই করতে পারেন।

টিকাঃ
৩৩. আবু দাউদ ২/৭৮, তিরমিযী ৫/২১১
৩৪. আবু দাউদ ২/৭৮, তিরমিযী ৫/৫৫৭
৩৫. তিরমিযী ৫/৪৫৬, ইবনু মাজাহ ২/১২৩৮

📘 সহীহ দুআ ঝাড়ফুঁক ও যিকর 📄 দু‘আ’র আদব

📄 দু‘আ’র আদব


সাধারণভাবে দুআ' করার কয়েকটি আদাব ও নিয়ম রয়েছে, যা পালন করা বাঞ্ছনীয়:

১। ইখলাস বা একনিষ্ঠতা। এটি সর্বোাপেক্ষা বড় আদাব। আল্লাহ তা‘আলা বলেন, “সুতরাং আল্লাহর আনুগত্যে বিশুদ্ধ-চিত্ত হয়ে তাঁকে ডাক, যদিও কাফিরগণ এ অপছন্দ করে।” (সূরাহ মু‘মিন ৪০: ১৪) “তারা তো আদিষ্ট হয়েছিল আল্লাহর আনুগত্যে বিশুদ্ধ-চিত্ত হয়ে একনিষ্ঠভাবে কেবল তাঁরই উপাসনা করতে--।” (সূরাহ বাইয়িনাহ ৫ আয়াত)

২। দৃঢ়তার সাথে প্রার্থনা ও দুআ' করা এবং আল্লাহ মজবুর করবেন এই কথার উপর দৃঢ় প্রত্যয় রাখা। রসূল (ﷺ) বলেন, “তোমাদের মধ্যে কেউ যেন না বলে, ‘হে আল্লাহ! যদি তুমি চাও, তাহলে আমাকে ক্ষমা করে দাও। হে আল্লাহ! যদি তুমি চাও, তাহলে আমাকে দয়া কর।’ বরং দৃঢ় নিশ্চিত হয়ে প্রার্থনা করা উচিত। যেহেতু আল্লাহকে তাঁর ইখতিয়ার বিরুদ্ধে কেউ বাধ্য করতে পারে না।”³⁷

৩। আগ্রহাতিশয্যে নাছোড় বান্দা হয়ে বার-বার দুআ' করা, দুআ'র ফল লাভে শীঘ্রতা না করা এবং অন্তরকে উপস্থিত রেখে প্রার্থনা করা। রসূল (ﷺ) বলেন, “তোমাদের কারো দুআ' কবুল করা হয়, যতক্ষণ না সে তাড়াতাড়ি করে। বলে, ‘দুআ' করলাম কিন্তু কবুল হল না।”³⁸ “বান্দার দুআ' কবুল হয়েই থাকে, যতক্ষণ সে কোন পাপের অথবা জ্ঞাতিত্ববন্ধন টুটার জন্য দুআ' না করে এবং (দুআ'র ফল লাভে) শীঘ্রতা না করে।” জিজ্ঞাসা করা হল, ‘হে আল্লাহর রসূল! শীঘ্রতা কেমন?’ বললেন, ‘এই বলা যে, ‘দুআ' করলাম, আরো দুআ' করলাম। অথচ কবুল হতে দেখলাম না।’ ফলে সে তখন আক্ষেপ করে এবং দুআ' করাই ত্যাগ করে বসে।’”³⁹ “তোমরা আল্লাহর নিকট দুআ' কর কবুল হবে এই দৃঢ় প্রত্যয় রেখে। আর জেনে রেখো যে, আল্লাহ উদাসীন ও অন্যমনস্কের হৃদয় থেকে দুআ' মঞ্জুর করেন না।”⁴⁰

মোট কথা দুআ' করার সময় মনকে সজাগ রাখতে হবে, তার দুআ' কবুল হবে --এই একীন রাখতে হবে এবং কি চাইছে তাও জানতে হবে। সুতরাং যারা অভ্যাসগতভাবে দুআ' ক'রে থাকে অথবা দুআ'য় কি চায়, তা তারা নিজেই না জেনে তোতার বুলি আওড়ানোর মত আরবীতে দুআ’ আওড়ে থাকে, তাদের দুআ’ মঞ্জুর হবে কি?

৪। সুখে-দুঃখে ও নিরাপদে-বিপদে সর্বদা প্রার্থনা করা। আল্লাহর রসূল (ﷺ) বলেন, “যে ব্যক্তি পছন্দ করে যে, দুঃখে ও বিপদে আল্লাহ তার দুআ’ কবুল করবেন, সেই ব্যক্তির উচিত, সুখে ও স্বাচ্ছন্দ্যে অধিক অধিক দুআ’ করা।”⁴¹

৫। নিজের পরিবার ও সম্পদের উপর বদ্দুআ’ না করা। আনসারদের এক ব্যক্তির সেচক উট চলতে চলতে থেমে গেলে ধমক দিয়ে বলল, ‘চল্, আল্লাহ তোকে অভিশাপ করুক।’ তা শুনে আল্লাহর রসূল (ﷺ) বললেন, “কে তার উটকে অভিশাপ দিচ্ছে?” লোকটি বলল, ‘আমি, হে আল্লাহর রসূল!’ তিনি বললেন, “নেমে যাও ওর পিঠ থেকে, অভিশপ্ত উট নিয়ে আমাদের সঙ্গে এসো না। তোমরা তোমাদের নিজেদের উপর বদ্দুআ’ করো না, তোমাদের সন্তানদের উপর বদ্দুআ’ করো না, আর তোমাদের সম্পদের উপরও বদ্দুআ’ করো না। যাতে আল্লাহর তরফ থেকে এমন মুহূর্তের সময় না হয়ে যায়, যে মুহূর্তে দান চাওয়া হলে মঞ্জুর (প্রদান) করা হয়।”⁴²

৬। কেবল আল্লাহ্‌রই নিকট প্রার্থনা করা। আল্লাহর রসূল (ﷺ) বলেন, “যখন কিছু চাইবে, তখন আল্লাহ্‌র নিকটেই চাও। যখন সাহায্য চাইবে, তখন আল্লাহ্‌র নিকটেই চাও।”⁴³ যেহেতু প্রার্থনা এক ইবাদাত। অন্যের কাছে প্রার্থনা করলে আল্লাহ্‌র ইবাদাতে শিরক করা হয়।

৭। উচ্চ ও নিঃশব্দের মধ্যবর্তী চাপা স্বরে সগোপনে প্রার্থনা করা। মহান আল্লাহ্‌ বলেন, “তোমরা বিনীতভাবে ও গোপনে তোমাদের প্রতিপালককে ডাক। তিনি সীমালঙ্ঘনকারীদের পছন্দ করেন না।” (সূরাহ আ’রাফ ৫৫ আয়াত)
আবু মূসা (রা.) বলেন, আমরা কোন সফরে নবী (ﷺ)-এর সাথে ছিলাম। লোকেরা জোরে-শোরে তাকবীর পড়তে শুরু করল। তখন নবী (ﷺ) বললেন, “হে লোক সকল! নিজেদের উপর কৃপা কর। নিশ্চয় তোমরা কোন বধির অথবা কোন (দূরবর্তী) অনুপস্থিতকে আহ্বান করছো না। বরং তোমরা সর্বশ্রোতা নিকটবর্তীকে আহ্বান করছ। তিনি (তাঁর ইলমসহ) তোমাদের সঙ্গে আছেন।”⁴⁴

৮। আল্লাহর সুন্দরতম নাম এবং মহত্তম গুণাবলীর অসীলায় অথবা কোন নেক আমলের অসীলায় দুআ' করা। আর এ ছাড়া কোন সৃষ্টি (যেমন, নবী, ওলী, আরশ, কুরসী প্রভৃতির) অসীলা ধরে দুআ' না করা। যেমনঃ- رَبَّنَا آمَنَّا فَاغْفِرْ لَنَا ذُنُوْبَنَا وَقِنَا عَذَابَ النَّارِ
অর্থ- হে আমাদের প্রতিপালক! নিশ্চয় আমরা ঈমান এনেছি, অতএব আমাদের অপরাধসমূহ মার্জনা কর এবং জাহান্নামের শাস্তি হতে আমাদেরকে রক্ষা কর। (সূরাহ আলে ইমরান ১৬ আয়াত)

৯। আল্লাহ তাআলার ইসমে আ'যম দিয়ে দুআ' শুরু করলে তিনি তা কবুল করেন। এই ইসমে আযম দ্বারা দুআ' করার বর্ণনা হাদীস শরীফে কয়েক রকম এসেছে;
ক- اَللّٰهُمَّ إِنِّي أَسْأَلُكَ بِأَنِّي أَشْهَدُ أَنَّكَ أَنْتَ اللّٰهُ لَا إِلٰهَ إِلَّا أَنْتَ الْأَحَدُ الصَّمَدُ الَّذِي لَمْ يَلِدْ وَلَمْ يُوْلَدْ وَلَمْ يَكُنْ لَهُ كُفُوًا أَحَدٌ
উচ্চারণঃ- আল্লাহুম্মা ইন্নী আসআলুকা বিআন্নী আশহাদু আন্নাকা আল্লাহু, লা ইলাহা ইল্লা আন্তাল আহাদুস সামাদুল্লাহী লাম ইয়ালিদ অলাম ইউলাদ, অলাম ইয়াকুল্লাহু কুফুওয়ান আহাদ।
অর্থ- আমি সাক্ষ্য দিচ্ছি যে, তুমি আল্লাহ, তুমি ব্যতীত কোন সত্য উপাস্য নেই। তুমি একক, ভরসাহীন, যিনি জনক নন জাতকও নন এবং যাঁর সমকক্ষ কেউ নেই -এই অসীলায় আমি তোমার নিকট প্রার্থনা করছি।⁴⁵

খ- اَللّٰهُمَّ إِنِّي أَسْأَلُكَ يَا اللّٰهُ بِأَنَّكَ الْوَاحِدُ الْأَحَدُ الصَّمَدُ الَّذِي لَمْ يَلِدْ وَلَمْ يُوْلَدْ وَلَمْ يَكُنْ لَّهُ كُفُوًا أَحَدٌ أَنْ تَغْفِرَلِي ذُنُوْبِي إِنَّكَ أَنْتَ الْغَفُوْرُ الرَّحِيْمُ
উচ্চারণঃ- আল্লাহুম্মা ইন্নী আসআলুকা ইয়া আল্লাহু বিআন্নাকাল ওয়াহিদুল আহাদুস সামাদুল্লাহী লাম ইয়ালিদ অলাম ইউলাদ অলাম ইয়াকুল্লাহু কুফুওয়ান আহাদ, আন তাগফিরা লী যুনুবী, ইন্নাকা আন্তাল গাফুরুর রাহীম।
অর্থ- হে আল্লাহ! নিশ্চয় আমি তোমার নিকট প্রার্থনা করছি, হে এক, একক, ভরসাহীন আল্লাহ! যিনি জনক নন জাতকও নন এবং যাঁর সমকক্ষ কেউ নেই, তুমি আমার গোনাহসমূহকে ক্ষমা করে দাও, নিশ্চয় তুমি ক্ষমাশীল দয়াবান।⁴¹

গ- اللَّهُمَّ إِنِّي أَسْأَلُكَ بِأَنَّ لَكَ الْحَمْدَ، لَا إِلَهَ إِلَّا أَنْتَ الْمَنَّانُ بَدِيعُ السَّمَوَاتِ وَالْأَرْضِ، يَا ذَا الْجَلَالِ وَالْإِكْرَامِ، يَا حَيُّ يَا قَيُّومُ
উচ্চারণঃ- আল্লাহুম্মা ইন্নী আসআলুকা বিআন্না লাকাল হাম্দ, লা ইলাহা ইল্লা আনতাল মান্নানু বাদিউস সামাওয়াতী ওয়াল আরদ, ইয়া যাল জালালি ওয়াল ইকরাম, ইয়া হাইয়্যু ইয়া কাইয়্যুম।
অর্থঃ- হে আল্লাহ! আমি তোমার নিকট প্রার্থনা করছি এই অসীলায় যে, সমস্ত প্রশংসা তোমারই, তুমি ব্যতীত কোন সত্য উপাস্য নেই। তুমি পরম অনুগ্রহদাতা, আকাশমণ্ডলী ও পৃথিবীর আবিষ্কর্তা, হে মহিমাময় এবং মহানুভব, হে চিরঞ্জীব অবিনশ্বর।⁴²

ঘ- لَا إِلَهَ إِلَّا أَنْتَ سُبْحَانَكَ إِنِّي كُنْتُ مِنَ الظَّالِمِينَ
অর্থঃ- তুমি ব্যতীত কোন সত্য উপাস্য নেই, তুমি পবিত্র মহান! অবশ্যই আমি সীমালঙ্ঘনকারী। (সূরাহ আম্বিয়া' ৮৭ আয়াত)

১০। আল্লাহর প্রশংসা (হামদ ও সানা) দিয়ে অতঃপর নবী (ﷺ)-এর উপর দরূদ পাঠ ক'রে দুআ’ শুরু করা এবং অনুরূপ শেষ করা। রসূল (ﷺ) বলেন, “যখন তোমাদের কেউ দুআ’ করবে, তখন তার উচিত আল্লাহর হামদ ও সানা দিয়ে শুরু করা, অতঃপর নবীর উপর দরূদ পড়া, অতঃপর ইচ্ছামত দুআ’ করা।⁴³

১১। কাকুতি-মিনতি, বিনয়, আশা, আগ্রহ, মুখাপেক্ষিতা ও ভীতির সাথে দুআ’ করা। একান্ত ‘ফকীর’ হয়ে আল্লাহর দরবারে অক্ষমতা, সংকীর্ণতা ও দূরবস্থার অভিযোগ করা। যেভাবে আইয়ুব নবী ব্যাধিগ্রস্ত হলে, যাকারিয়া নবী নিঃসন্তান হলে, ইউনূস নবী মাছের পেটে গেলে আল্লাহর কাছে দুআ’ করেছিলেন।
মহান আল্লাহ বলেন, “তোমার প্রতিপালককে মনে মনে সবিনয় ও সশঙ্কচিত্তে অনুচ্চ স্বরে প্রত্যূষে ও সন্ধ্যায় স্মরণ কর এবং উদাসীনদের দলভুক্ত হয়ো না।” (সূরাহ আ’রাফ ২০৫) “তারা সৎ কাজে প্রতিযোগিতা করত, আশা ও ভীতির সাথে আমাকে ডাকত এবং তারা ছিল আমার নিকট বিনীত।” (সূরাহ আম্বিয়া ৮০ আয়াত)
বান্দার যতই সুখ থাক, স্বাচ্ছন্দ্যের সাগরে ডুবে থাকলেও সে সর্বদা আল্লাহর রহমতের ভিখারী ও মুখাপেক্ষী। মিসকিন বান্দার যা আছে তা কাল চলে যেতে পারে। সব আছে বা সব পেয়েছি বলে দুআ’ বন্ধ করা মূর্খতা। সব কিছু থাকলেও যা আছে তা যাতে চলে না যায়, তার জন্যও দুআ’ করতে হবে। তাছাড়া পরজীবনের কথা তার অজানা। পরকালে সুখ পাবে কি না -সে বিষয়ে সে নিশ্চিত নয়। অতএব পরকালের সুখও তাকে চেয়ে নিতে হবে এবং সে প্রার্থনা হবে অনুনয়-বিনয় সহকারে; উদ্ধততার সাথে নয়।

১২। নিজের অপরাধ ও আল্লাহর অনুগ্রহকে স্বীকার করে ক্ষমা প্রার্থনা ও কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন-পূর্বক দুআ’ করা। এ বিষয়ে 'সাইয়েদুল ইস্তিগফার' দুআ’ ইস্তিগফারের অনুচ্ছেদে আসবে।

১৩। কষ্ট-কল্পনার সাথে ছন্দ বানিয়ে দুআ’ না করা। এ বিষয়ে ইবনে আব্বাস (রা.) বলেন, ‘প্রত্যেক জুমুআ’য় (সপ্তাহে) লোকেদেরকে মাত্র একবার ওয়াজ করা। যদি না মানো তবে দু’বার। তাও যদি না মানো তবে তিনবার। লোকদেরকে এই কুরআনের উপর বিরক্ত করো না। আর আমি যেন তোমাকে না (দেখতে) পাই যে, কোনো সম্প্রদায় তাদের নিজেদের কোনো কথায় ব্যাপৃত থাকলে তুমি তাদের নিকট গিয়ে নিজের বয়ান শুরু করে দাও এবং তাদের কথা কেটে তাদেরকে বিরক্ত কর। বরং তুমি সেখানে উপস্থিত হয়ে চুপ থাক; অতঃপর তারা সাগ্রহে আদেশ করলে তুমি বয়ান কর। খেয়াল করে ছন্দযুক্ত দুআ’ থেকে দূরে থাক। যেহেতু আমি রসূলুল্লাহ (ﷺ) ও তাঁর সাহাবাবর্গের নিকট উপলব্ধি করেছি যে, তারা এটাই করতেন। অর্থাৎ, ছন্দ বানিয়ে দুআ’ উপেক্ষা করতেন।''⁴⁹

১৪। তাওবাহ করে (অর্থাৎ বিশুদ্ধ চিত্তে, পাপ বর্জন ক’রে, লজ্জিত হয়ে, পুনঃ ঐ পাপে না ফিরার দৃঢ় প্রতিজ্ঞা ক’রে এবং অন্যায়ভাবে কারো মাল হরণ ক’রে থাকলে তা ফেরৎ দিয়ে ও কারো প্রতি জুলুম করে থাকলে তার প্রতিশোধ দিয়ে অথবা ক্ষমা চেয়ে তারপর) দুআ’ করা। যেহেতু পাপে লিপ্ত থাকলে দুআ’ কবুল হয় না।

১৫। হালাল পানাহার করা এবং হালাল পরিধান করা। এ বিষয়ে আল্লাহর রসূল (ﷺ) বলেন, “হে লোক সকল! আল্লাহ পবিত্র তিনি পবিত্র জিনিসই গ্রহণ করেন। নিশ্চয় আল্লাহ মু’মিনদেরকে সেই আদেশই করেছেন যে আদেশ রসূলগণকে করেছেন, তিনি বলেন, “হে রসূলগণ! তোমরা পবিত্র বস্তু আহার কর ও সৎকাজ কর, তোমরা যা কর সে সম্বন্ধে আমি সবিশেষ অবহিত।” (সূরাহ মু'মিনূন ২০: ৫১)
মহান আল্লাহ আরো বলেন, যার অর্থ, “হে মু'মিনগণ! আমি তোমাদেরকে যা দান করেছি তা থেকে পবিত্র বস্তু আহার কর---।” (সূরাহ বাক্বারাহ ১৭২)
অতঃপর রসূল (ﷺ) সেই ব্যক্তির কথা উল্লেখ করেন, যে ব্যক্তি ধূলোধূসরিত আলুথালু বেশে (সৎকাজের উদ্দেশ্যে) সফর করে। তার হাত দু'টিকে আকাশের দিকে তুলে, ‘হে প্রভু! হে আমার প্রতিপালক!’ বলে (দুআ' করে), কিন্তু তার আহার্য হারাম, তার পরিধেয় হারাম এবং হারাম খাদ্যে সে প্রতিপালিত হয়েছে। সুতরাং কেমন ক’রে তার প্রার্থনা মঞ্জুর হবে?”⁵⁰

১৬। খুব গুরুত্বপূর্ণ দুআ' হলে ফিরিয়ে ফিরিয়ে ৩ বার ক'রে বলা। যেমন আল্লাহর রসূল (ﷺ) যখন কুরাইশের উপর বদ্‌দুআ' করেছিলেন, তখন ৩ বার ক'রে বলেছিলেন।⁵¹

১৭। দুআ'র পূর্বে অযু করা। অবশ্য প্রত্যেক দুআ' বা যিকরের জন্য অযু বা গোসল করা জরুরী নয়। তবে সাধারণ প্রার্থনার জন্য মুস্তাহাব।⁵²

১৮। কেবলামুখি হয়ে দুআ' করা। এ আদবটিও সকল দুআ'র ক্ষেত্রে জরুরী নয়।

১৯। মুখ বরাবর দুই হাত তুলে দুআ' করা। এ আদবটিও সেখানে ব্যবহৃত, যেখানে আল্লাহর রসূলের নির্দেশ আছে। অথবা যেখানে কোন নির্দেশ নেই সেখানে সাধারণ প্রার্থনার ক্ষেত্রে এ আদবের খেয়াল রাখা উচিত। কিন্তু হাত তুলে দুআ'র শেষে মুখে হাত বুলানো প্রসঙ্গে কোন সহীহ হাদীস নেই। তাই মুখে হাত বুলানো বিদআত। প্রকাশ থাকে যে, ইস্তিগফার করার সময় একটি আঙ্গুল তুলে ইশারা ক'রে এবং সকাতর প্রার্থনার সময় দুই হাত মাথা বরাবর লম্বা ক'রে তুলে দুআ' করতে হয়।⁵³

২০। অশ্রু বিসর্জনের সাথে দুআ' করা।⁵⁴

২১। অপরের জন্য দুআ' করলে নিজের জন্য প্রথমে দুআ' শুরু করা। যেমন নবী (ﷺ) কারোও জন্য দুআ' করলে নিজের জন্য প্রথম শুরু করতেন।⁵⁵

২২। দুআ’য় সীমালঙ্ঘন ও অতিরঞ্জন না করা। যেমন, 'হে আল্লাহ! আমি জান্নাতের সম্পদ, সৌন্দর্য, হুর-গোলমান, দুধের নহর---চাই।' 'হে আল্লাহ! আমি জাহান্নামের আগুন থেকে, তার শিকল ও বেড়ি থেকে, ফুটন্ত পানি ও পূঁজ থেকে পানাহ চাই---।' 'হে আল্লাহ! আমি জান্নাতের ডান দিকে সাদা মহল চাই--।' ইত্যাদি বলে দুআ' করা বৈধ নয়। এখানে সংক্ষিপ্তভাবে জাহান্নাম থেকে রেহাই পেতে এবং জান্নাতে প্রবেশ করতে চাওয়াই যথেষ্ট। তাই তো সেই দুআ' করা উচিত, যার শব্দ কম অথচ অর্থ অনেক ব্যাপক।⁵⁶

দুআ’তে প্রায় ২০ প্রকার সীমালঙ্ঘন হতে পারে:
১ শিরক্মূলক দুআ' করা।
২ শারীয়াতে যা হবে না বলে, তা হতে দুআ' করা।
৩ শারীয়াতে যা হবে না বলে, তা হতে দুআ' করা; যেমন বলা যে, আল্লাহ! তুমি কাফিরকে জান্নাত দান কর, আমাকে দুনিয়ায় চিরস্থায়ী কর, আমাকে গায়েবী ইলম দাও বা আমাকে নিষ্পাপ কর' ইত্যাদি।
৪ জ্ঞান ও বিবেকে যা হওয়া সম্ভব, তা না হতে দুআ' করা।
৫ জ্ঞান ও বিবেকে যা হওয়া অসম্ভব তা হবার জন্য প্রার্থনা করা; যেমন, আল্লাহ! আমি যেন একই সময় দুই স্থানে উপস্থিত ও প্রকাশ হতে পারি' ইত্যাদি।
৬ সাধারণত যা ঘটা অসম্ভব তা ঘটতে প্রার্থনা করা। যেমন, আল্লাহ! আমাকে এমন মুরগী দাও, যে সোনার ডিম পাড়ে, আমাকে যেন পানাহার করতে না হয়' ইত্যাদি।
৭ শারীয়াতে যা হবে না বলে শ্রুত, পুনরায় তা না হতে প্রার্থনা করা; যেমন, আল্লাহ! তুমি কাফিরদেরকে জান্নাত দিও না' ইত্যাদি।
৮ শারীয়াতে যা হবে বলে শ্রুত, পুনরায় তা হতে দুআ' করা।
৯ প্রার্থিত বিষয়কে আল্লাহর ইচ্ছায় লটকে দেওয়া: যেমন, 'হে আল্লাহ! তুমি যদি চাও তাহলে আমাকে ক্ষমা কর' ইত্যাদি।
১০ অন্যায়ভাবে কারো উপর বদদুআ' করা।
১১ কোন হারাম বিষয় প্রার্থনা করা; যেমন, আমি যেন ব্যভিচার করতে বা চুরি করতে পারি।
১২ প্রয়োজনের অধিক উচ্চস্বরে দুআ’ করা।
১৩ অবনীতভাবে আল্লাহর অনুগ্রহের মুখাপেক্ষী না হয়ে দুআ’ করা।
১৪ আল্লাহর সঠিক নাম ও গুণ ব্যতিরেকে অন্য নাম ধরে ও গুণ বর্ণনা করে প্রার্থনা।
১৫ যা বান্দার জন্য উপযুক্ত নয় তা চাওয়া; যেমন, নবী বা ফিরিশতা হতে চাওয়া।
১৬ অপ্রয়োজনীয় লম্বা দুআ’ করা। (একই দুআ’ দু-তিন ভাষায় বলা।)
১৭ কষ্ট-কল্পনার সাথে ছন্দ বানিয়ে দুআ’ করা।
১৮ অকল্যাণীয় ইচ্ছাকৃত হো হো করে উচ্চ শব্দে দুআ’ করা।
১৯ নিয়মিত এমন প্রকার, এমন রূপে এবং এমন স্থান ও কালে দুআ’ করা যা কিতাব ও সুন্নাহতে প্রমাণিত নয়।
২০ গানের মত লম্বা সুর-ললিত কণ্ঠে দুআ’ করা।

২১। কোন পাপ কাজ করার উদ্দেশ্যে অথবা জ্ঞাতিবন্ধন ছিন্ন করার উদ্দেশ্যে দুআ’ না করা।
২২। সর্বপ্রকার গোনাহ থেকে দূরে থেকে দুআ’ করা।
২৩। সৎকাজের আদেশ ও মন্দ কাজে বাধা দেওয়া।
২৪। যে সময় স্থান ও অবস্থাকালে দুআ’ কবুল হয়, সে সময়াদিতে দুআ’ করার সুযোগ গ্রহণ করা।
২৫। ছোট না চেয়ে বড় কিছু চাওয়া।⁷⁶
২৬। এমন কিছু না চাওয়া, যা সহ্য করার ক্ষমতা নেই। যেমন, আখিরাতের আযাব দুনিয়াতেই না চাওয়া।⁷⁷

দুঃখ-কষ্ট চেয়ে ধৈর্য প্রার্থনা না ক'রে সরাসরি দুঃখ-কষ্ট থেকে পানাহ চাওয়া উচিত। তাই এমন প্রার্থনা করা বৈধ নয় :- ‘দুঃখ যদি দিও প্রভু, শক্তি দিও সহিবারে।’ ‘বিপদে মোরে রক্ষা করো এ নহে মোর প্রার্থনা বিপদে আমি না যেন করি ভয়, দুঃখ তাপে ব্যথিত চিত্তে নাইবা দিলে সান্ত্বনা দুঃখ যেন করিতে পারি জয়। সহায় মোর না যদি জুটে, নিজের বল না যেন টুটে সংসারেরে ঘটিলে ক্ষতি লভিলে শুধু বঞ্চনা নিজের মনে না যেন মানি ক্ষয়।’

টিকাঃ
৩৭. বুখারী ১১/১০৯, মুসলিম ৪/২০৬৩
৩৮. বুখারী ১১/১৪০, মুসলিম ৪/২০৬৫
৩৯. মুসলিম ৪/২০৬৫
৪০. তিরমিযী ৫/৩১৭
৪১. তিরমিযী ৫/৪৬২
৪২. মুসলিম ৪/২০০৪
৪৩. তিরমিযী ৪/৬৬৭, মুসলিম ১/২১৩
৪৪. বুখারী ৫/৭৫, মুসলিম ৪/২০৭৬
৪৫. আবু দাউদ ১৪৯০, তিরমিযী ৩৫৭৫, ইবনু মাজাহ ৩৮৫৭, আহমাদ, হাকিম, ইবনু হিব্বান
৪১. সহীহ নাসাঈ ১২৩৪
৪২. আবূ দাউদ ১৪৮৫, তিরমিযী, নাসাঈ, ইবনু মাজাহ ৩৮২৮, আহমাদ, হাকিম, ইবনু হিব্বান
৪৩. আবূ দাউদ ২/৭৭, তিরমিযী ৫/৫১৯, নাসাঈ ৩/৪৪
৪৯. বুখারী ৭/১৮০
৫০. মুসলিম ৪/৭০০
৫১. বুখারী ৪/৪৮, মুসলিম ৩/১৪১৮
৫২. বুখারী ৫/১০১, মুসলিম ৪/১৪৮৩
৫৩. আবু দাউদ, সহীহুল জামি' ৬৬৯৪নং
৫৪. মুসলিম ১/৯৯১
৫৫. তিরমিযী ৫/৪৮০
৫৬. আবু দাউদ ১/২৪, ২/৭৭
৭৫. মাজমাউল বায়ান ৭০ সংখ্যা ১৪৯৪ খ্রিঃ ১২০-১২৮ পৃঃ দ্রষ্টব্য
৭৬. মুসলিম ২৬৪৮
৭৭. মুসলিম ২৬৮৮

ফন্ট সাইজ
15px
17px