📘 সফলতার জন্য চাই উত্তম পরিকল্পনা > 📄 পরিকল্পনা ব্যর্থ হওয়ার কারণসমূহ

📄 পরিকল্পনা ব্যর্থ হওয়ার কারণসমূহ


এখন আমরা পরিকল্পনা ব্যর্থ হওয়ার কিছু কারণ নিয়ে আলোচনা করব। পরিকল্পনায় সফলতার জন্য নিম্নবর্ণিত বিষয়গুলো প্রয়োগ করে দেখা আবশ্যক।
১. হতাশা ও উদ্যমহীনতা
পরিকল্পনায় সফলতার জন্য সবচেয়ে বেশি বিপজ্জনক হলো, দ্রুত হতাশ হওয়া ও বাধা-বিপত্তির সামনে আত্মসমর্পণ করা।
হতাশা আত্মহত্যার শামিল। প্রকৃত মুমিন আল্লাহ তাআলার রহমত হতে নিরাশ হয় না। ব্যর্থতার অভিজ্ঞতার সামনে ভেঙে পড়ে না। বরং সে এ অভিজ্ঞতাকে মূল লক্ষ্যপানে এগিয়ে যেতে প্রস্তুতি ও অবলম্বন হিসেবে গ্রহণ করে। বিজ্ঞানী আই.এম.সিঙ্গার তার জীবনের প্রায় বিশ বছর সেলাই মেশিন আবিষ্কারের পেছনে ব্যয় করে দিয়েছেন। এ দীর্ঘকাল এ মেশিনের জন্য চিন্তা-গবেষণায় তার সময় কেটেছে।
তাই হে যুবক, নিজেকে আশাশূন্য করো না। নিরাশার কাছে নিজেকে সঁপে দিয়ে পরাজয় বরণ করো না!
নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কর্ম ও উদ্যমের প্রতি ছুটে যেতে এবং কর্মঠতার সাথে কাজ করার পথনির্দেশ করেছেন। পথনির্দেশ করেছেন হতাশা ঝেড়ে ফেলতে। তাওয়াকুলকে ৫৯ (তাওয়াক্কুলের বিপরীত) পরিহার করতে। এমনকি শেষ সময়ে এসেও অটল-অবিচল থাকতে। তিনি বলেছেন:
إِنْ قَامَتِ السَّاعَةُ وَبِيَدِ أَحَدِكُمْ فَسِيلَةٌ، فَإِنْ اسْتَطَاعَ أَنْ لَا يَقُومَ حَتَّى يَغْرِسَهَا فَلْيَفْعَلْ
'তোমাদের কারও হাতে যদি ছোট একটি খেজুর বৃক্ষ থাকে, আর এমতাবস্থায় কিয়ামত সংঘটিত হয়ে যায়। বৃক্ষটি রোপণ করে দাঁড়াতে সক্ষম না হলেও, সে যেন তা রোপণ করে দেয়। '৬০
ইবনে জারির রহ. উমারা বিন খুজাইমা বিন সাবিত থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, 'আমি উমর ইবনুল খাত্তাব রা. থেকে শুনেছি, তিনি আমার পিতাকে বললেন, "বৃক্ষরোপণে আপনার বাধা কীসের?"
তিনি বললেন, "আমি বৃদ্ধ মানুষ, আগামী দিন মরে যাব।"
তখন উমর রা. বললেন, "বৃক্ষরোপণ আপনার কাছে এতই কষ্টকর ঠেকছে?”
তারপর আমি আমার পিতার সাথে উমর রা.-কে নিজ হাতে বৃক্ষরোপণ করতে দেখেছিলাম।৬১
২. বিক্ষিপ্ততা
মানুষের কর্মজীবনে ব্যর্থতা, বড় বড় পরিকল্পনা বিনষ্ট হওয়া অথবা কাজের মান কমে যাওয়া এবং মানুষের জীবনে তার প্রভাব নষ্ট হয়ে যাওয়ার অন্যতম কারণ হলো-একাধিক পরিকল্পনায় বিক্ষিপ্ত থাকা। অনেক সময় একটি পরিকল্পনা সফল করতে অনেক মানুষের চেষ্টা ব্যয় করতে হয়। তাহলে এক ব্যক্তি সে একই পরিকল্পনা একাকী কীভাবে সম্পাদন করবে? আবার সে যদি নিজের একক শ্রম ব্যয় করে এমন কয়েকটা পরিকল্পনা চালাতে চায়, তবে ফলাফল কী হবে?
ومشتت العزمات يقضي عمره * حيران لا ظفر ولا إخفاق
'বিক্ষিপ্ত চিন্তার লোকেরা অস্থির জীবনযাপন করে। না বিজয় আসে আর না আসে ব্যর্থতা।'
আর এ কারণেই প্রকল্প বাস্তবায়নে একটি বাধা হলো, একই সময় একাধিক বড় বড় পরিকল্পনা শুরু করা। এর দৃষ্টান্তস্বরূপ শাইখ আহমাদ শাকির রহ.-এর উদাহরণ দেওয়া যায়। তিনি একই সময়ে কয়েকটি বড় বড় কাজ শুরু করেছিলেন।
প্রথমে শুরু করেছেন 'মুসনাদু ইমাম আহমাদ'-এর তাহকিক। তারপর 'সুনানুত তিরমিজি', অতঃপর ‘সহিহু ইবনি হিব্বান', এরপর ‘তাফসিরু ইবনি কাসির'-এর সংক্ষিপ্ত রূপ প্রণয়ন ও তাহকিকের কাজ শুরু করেন, এরপর ইবনে হাজমের 'আল-মুহাল্লা' কিতাবের তাহকিক শুরু করেছেন... যার ফলাফল ছিল কোনটিই তিনি পরিপূর্ণ করতে পারেননি।
৩. অক্ষমতা ও অলসতা
মানুষের অলসতা ও অক্ষমতা কত বড় বড় লক্ষ্যের সামনেই না প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়িয়েছে! এ কারণেই নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আল্লাহ তাআলার কাছে এই দুটি অনিষ্ট থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করতেন। তিনি দুআ করতেন:
اللهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنَ الْعَجْزِ وَالْكَسَلِ
'হে আল্লাহ, আমি আপনার কাছে অক্ষমতা ও অলসতা থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করছি।'৬২
আল্লাহর নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এ ধ্বংসাত্মক ব্যাধির সামনে আত্মসমর্পণের ব্যাপারে সতর্ক করেছেন। এবং এ কথার প্রতি ইঙ্গিত করেছেন যে, এটা কারও কর্ম বা ইচ্ছায় দুর্বলতা প্রবেশ করার অন্যতম কারণ। তিনি বলেন :
احْرِصْ عَلَى مَا يَنْفَعُكَ، وَاسْتَعِنْ بِاللَّهِ وَلَا تَعْجَزْ، وَإِنْ أَصَابَكَ شَيْءٌ، فَلَا تَقُلْ لَوْ أَنِّي فَعَلْتُ كَانَ كَذَا وَكَذَا، وَلَكِنْ قُلْ قَدَرُ اللَّهِ وَمَا شَاءَ فَعَلَ، فَإِنَّ «لَوْ تَفْتَحُ عَمَلَ الشَّيْطَانِ
'তোমার উপকারী বিষয়ে আগ্রহী হও। আল্লাহ তাআলার কাছে সাহায্য প্রার্থনা করো। অক্ষম হয়ে যেয়ো না। যদি তুমি কোনো বিপদে আক্রান্ত হও। তবে বলো না যে, "যদি আমি এমনটা করতাম, তাহলে এটা হতো, ওটা হতো।” বরং তুমি বলো, “আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে এটি নির্ধারিত এবং তিনি যা চান, তা করেন।" কারণ, “যদি” শব্দটা শয়তানের কাজের দরজা খুলে দেয়। '৬৩
الذل في دعة النفوس ولا أرى * عزّ المعيشة دون أن يُشقى لها
'লাঞ্ছনা রয়েছে বিলাসী অন্তরে। আমি তাকে কষ্টে ফেলা ব্যতীত সম্মানি জীবন দেখি না।'
রাগিব আল-আসবাহানি রহ. বলেন :
'যে ভেঙে পড়েছে এবং অকেজো হয়ে পড়েছে, সে মানবতা (বরং প্রাণিজগৎ) থেকে বের হয়ে গেছে এবং মৃতদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে গেছে।’৬৪
বলা হয়ে থাকে, অলসতা ও ক্রোধান্বিত হওয়া থেকে সাবধান! কারণ, যদি তুমি অলসতা করো, তবে হক আদায় করতে পারবে না। আর যদি ক্রোধান্বিত হও, তবে হকের ওপর সবর করতে পারবে না।'
إنَّ التواني أنكح العجز بنته * وساق إليها حين أنكحها مهرا
فراشا وطيئا ثم قال لها : اتكي * فغايتكما لا شك أن تلدا الفقرا
'অবহেলা তার মেয়েকে অপারগতার সাথে বিয়ে দেয় এবং তাকে বিয়ে দেওয়ার সময় মহর দেয়-কোমল বিছানার। আতঃপর মেয়েকে বলে, তুমি আরামে থাকো। সন্দেহাতীতভাবে তোমরা দারিদ্র্য জন্ম দেবে।'
অন্য এক কবি বলেন :
دببت للمجد والساعون قد بلغوا * جهد النفوس وألقوا دونه الأزرا
فكابدوا المجد حتى مل أكثرهم * وعانق المجد من أوفى ومن صبرا
لا تحسب المجد تمرا أنت أكله " لن تبلغ المجد حتى تلعق الصبرا
'চেষ্টাকারীরা সর্বোচ্চ সাধনা করে, কঠোর পরিশ্রম করে তবে মর্যাদা পেয়েছে।
আর তুমি স্রেফ হামাগুড়ি দিয়ে মর্যাদা পেতে চাইছ!
তারা মর্যাদা লাভের জন্য কষ্টের পথ ধরেছে। এর মধ্যে অনেকে বিরক্ত হয়ে পিছু হটেছে।
তবে মর্যাদার সাথে আলিঙ্গন করতে পেরেছে ওই ব্যক্তি, যে দৃঢ়পদে কর্ম সম্পাদন করেছে।
মনে করো না মর্যাদা কোনো খেজুর। হাতে নেবে, আর খেয়ে ফেলবে।
মর্যাদা তুমি ততক্ষণ পর্যন্ত হাতের মুঠোয় পাবে না, যতক্ষণ না ধৈর্যের তিক্ততাকে আস্বাদন করছ।'
অর্থাৎ অন্য কেউ সুউচ্চ মনোবলের মাধ্যমে মর্যাদা অর্জনে চেষ্টা করছে। আর তুমি তোমার কর্মবিমুখতার কারণে অলসের মতো চেষ্টা করছ এবং বয়স্ক বৃদ্ধের ন্যায় ধীরে ধীরে চলছ। তাহলে কীভাবে তুমি মর্যাদা অর্জন করবে?
৪. বিলম্ব করা ও দীর্ঘসূত্রতা
বিলম্ব মানে গুরুত্বপূর্ণ একটি কাজকে এক সময় থেকে অন্য সময়ে নিয়ে যাওয়া। আবার কখনো কখনো একেবারেই ভুলে যাওয়া। সালাফ বলেন :
'আমি তোমাদের “অচিরেই” শব্দ ব্যবহারে সর্তক করছি। কারণ, এটি ইবলিসের একটি সৈন্য।'
ولا أدخر شغل اليوم عن كسل * إلى غد إن يوم العاجزين غد
'আমি আজকের কাজ আগামী দিনের জন্য রেখে দিই না। কারণ, আগামী দিন হলো অক্ষমদের। আজকের দিন সক্ষমদের।'
আপনি লক্ষ্য স্থির করে ফেলেছেন তো আরম্ভ করতে বিলম্ব করবেন না। তৎক্ষণাৎ কাজ শুরু করুন। যদি আপনি বিলম্ব করতে থাকেন, তবে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে কখনো পৌঁছতে পারবেন না।
واترك منى النفس لا تحسبه يشبعها
إنَّ المنى رأس أموال المفاليس
'নফসের চাহিদা পরিত্যাগ করো। তাকে পরিতৃপ্ত করতে পারবে বলে ধারণা করো না।
কারণ, হতদরিদ্রদের মূলধন দুরাশা।'
দীর্ঘসূত্রতা সে অক্ষমদের দলিল, যারা কোনো কাজ করতে চায় না। কাজ করবে না, তাই নিজেকে আগামী দিনের কথা বলে বাঁচিয়ে রাখে। অথচ সে জানে যে, প্রতিদিনেরই ভিন্ন কাজ রয়েছে। আজকের দিনের যেমন আগামীকাল আছে। কালকের দিনেরও আগামী আছে।
انتبه من رقدة الغفلة، فالعمر قليل
واطرح سوف وحتى فهما داء دخيل
'গাফিলতির ঘুম থেকে জেগে ওঠো। কেননা, জীবনকাল স্বল্প সময়।
“অচিরেই” ও “যতক্ষণ”-কে ছুড়ে মারো। কারণ, এই দুটিই অন্তরের রোগ।'
নিজের পরিকল্পনা সম্পাদনে বিলম্ব করলে তোমার পরিকল্পনা অন্য কারও হয়ে যাবে। তোমার এ পরিকল্পনা অন্য কেউ সম্পাদন করে ফেলবে। পরিকল্পনা সম্পাদনের লাগাম তোমার হাতছাড়া হয়ে যাবে। আর এতে সর্বনিম্ন যে লোকসান তা হলো, অন্য কেউ আখিরাতের প্রতিদানে তোমার চেয়ে এগিয়ে যাবে।
৫. সময়ের অপব্যবহার
বর্তমানে উম্মাহ ও প্রতিটি মুসলিম ভয়ংকর এক বিপদের সম্মুখীন। আর তা হলো সময় অপচয়ের বিপদ। কারণ, সময় অপচয় করার অর্থ জীবন বিনষ্ট করা। সব জিনিসই হাত ছাড়া হলে পাওয়া যায়, কিন্তু সময় হাত ছাড়া হলে পাওয়া যায় না। আর এ কারণেই আমাদের উপলব্ধি করতে হবে যে, সময়ের পুনর্জন্ম হয় না—সময় দীর্ঘায়িত হয় না, থেমে থাকে না, পেছনে ফিরে যায় না। বরং সময় সামনে চলতে থাকে। এ জন্যই জীবনে সফলতার প্রথম শর্ত হলো, সময়ের সদ্ব্যবহার করা।
যতই মানুষের রচনায় 'সময়ের ব্যবস্থাপনা' নামক বাক্যাংশটি অনেকবারই উল্লেখ থাকুক না কেন। প্রকৃতপক্ষে মানুষ সময়ের ব্যবস্থাপনা করতে পারে না। কারণ সময় চলে আল্লাহ তাআলার নির্ধারিত নিয়মে। তবে আমরা সময় বয়ে চলার পথে তাকে কাজে লাগাতে পারি, কেবল এতটুকুই।
সময়ের অপচয় থেকে সাবধান করে উলামায়ে কিরাম ও জ্ঞানীদের বাণীমালা এবং অভিজ্ঞতা অর্জনকারীদের অভিমত ছাড়াও অনেক নস ও আসার বর্ণিত হয়েছে। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন :
نِعْمَتَانِ مَغْبُونُ فِيهِمَا كَثِيرٌ مِنَ النَّاسِ: الصِّحَّةُ وَالفَرَاغُ
'দুটি নিয়ামতের ব্যাপারে অধিকাংশ মানুষই প্রবঞ্চিত। (তা হলো) সুস্থতা ও অবসরতা। '৬৫
ইবনে আকিল আল-হাম্বলি রহ. বলেন :
'আমার জন্য জীবনের একটি মুহূর্তও অপচয় করা হালাল নয়। যদিও আমার জিহ্বা আলোচনা ও বিতর্ক থেকে এবং দৃষ্টি অধ্যয়ন থেকে নিস্তেজ হয়ে যায়। তবুও আমি শোয়া অবস্থায়, অবসর সময়েও আমার চিন্তাকে কাজে লাগাই। '৬৬
ইবনুল জাওজি রহ. বলেন :
'মানুষের উচিত নিজের সময়ের মর্যাদা ও মূল্য বোঝা। প্রতিটি মুহূর্তের সঠিক মূল্যায়ন হবে, যদি সে মহৎ কাজে তা ব্যয় করে। যদি সে এ সময়ে উত্তম থেকে উত্তমতর কথা ও কাজে মগ্ন থাকে। '৬৭
৬. কর্ম ও পরিকল্পনায় বিশৃঙ্খলা
বিশৃঙ্খলা দ্বারা উদ্দেশ্য হলো বিষয়গুলোর মাঝে তালগোল পাকিয়ে ফেলা, বিভিন্ন কাজে সংমিশ্রণ করে ফেলা এবং মানুষের সাধারণ জীবন পদ্ধতি ও তার চিন্তা, চালচলন এবং উত্তম-অনুত্তমের মাঝে বিশৃঙ্খলা প্রবেশ করা। একজন বিশৃঙ্খল মানুষ লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়, কর্ম বিনষ্ট করে, পূর্বপ্রস্তুতিহীন হয়, তার কোনো রূপরেখা থাকে না, সে দিকভ্রান্ত থাকে, চলার কোনো পদ্ধতি থাকে না তার, একটি কাজ শুরু করে ছেড়ে দেয়, আরেকটি শুরু করে অসম্পূর্ণ রেখে দেয়। একবার এই রাস্তায় হাঁটে তো পরক্ষণেই তা এড়িয়ে চলে। একটি পরিকল্পনা গ্রহণ করে তো কিছুক্ষণ পর ক্লান্ত হয়ে পড়ে।
وعاجز الرأي مضياع لفرصته * حتى إذا فات أمر عاتب القدرا
'সিদ্ধান্ত নিতে অক্ষম ব্যক্তি সুযোগ নষ্ট করে। অবশেষে যখন কোনো বিষয় ছুটে যায়, তখন তাকদিরকে সে ভর্ৎসনা করে।'
এমন ব্যক্তি নিজের কাজ নিজের অজান্তেই নষ্ট করে ফেলে।
৭. দুর্বল প্রেরণা
চাই প্রেরণা ব্যক্তির মনোবল থেকে দুর্বল হোক অথবা বাইরের অন্য কিছু থেকে দুর্বল হোক—যেমন তাকে সব সময় যে উৎসাহ-উদ্দীপনা দান করে সে দুর্বল। উদ্দীপনা না থাকা অনেক প্রকল্পের ক্ষেত্রে অলসতা তৈরি করে এবং মাঝপথেই কাজটির পরিসমাপ্তি ঘটায়। এ সমস্যার সমাধান হলো, পারস্পরিক উপদেশ ও নির্দেশনা প্রদান।
ইরাকের হাফিজে হাদিস আলি বিন আসিম থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন :
'আমার বাবা আমাকে এক লক্ষ দিরহাম ধরিয়ে দিয়ে বললেন, "যাও, এক লক্ষ হাদিস মুখস্থ করার আগে আমাকে মুখ দেখাবে না।”
এই ধরনের কথা পরিকল্পনা সম্পাদনে অনেক শক্তিশালী উদ্দীপনা তৈরি করে, অনেক শক্তিশালী প্রেরণাদায়ক হয়। তবে সবচেয়ে শক্তিশালী উদ্দীপনা ও প্রেরণা হচ্ছে—আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টি ও প্রতিদানের আশা এবং আখিরাত কামনা।
আল্লাহ তাআলা বলেন :
وَمَن يُرِدْ ثَوَابَ الدُّنْيَا نُؤْتِهِ مِنْهَا وَمَن يُرِدْ ثَوَابَ الْآخِرَةِ نُؤْتِهِ مِنْهَا وَسَنَجْزِي الشَّاكِرِينَ
'বস্তুত, যে ব্যক্তি দুনিয়ার প্রতিদান চাইবে, আমি তাকে তার অংশ (দুনিয়াতেই) দিয়ে দেবো। পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি আখিরাতের প্রতিদান চাইবে, আমি তাকে তার অংশ দিয়ে দেবো। আর যারা কৃতজ্ঞ, শীঘ্রই আমি তাদের প্রতিদান দেবো।’৬৮
৮. তত্ত্বাবধানে ও অব্যাহত রাখায় দুর্বলতা
তত্ত্বাবধানে ও অব্যাহত রাখায় দুর্বলতা পরিকল্পনা বাস্তবায়ন সূচনায় বিলম্ব ও শিথিলতা তৈরি করে। কখনো তো একটি পরিকল্পনাকে পুরো বন্ধ করে দেয়! কারণ, মানুষ তার পরিকল্পনায় আদেশদাতা ও বিদ্বেষের পাত্র।
৯. দুর্বল পরামর্শ
এটি এক ধরনের স্বনির্ভরতার দিকে নিয়ে যায়, যা অবহেলা এবং চিন্তাগত ও চারিত্রিক অবনতির দিকে ধাবিত করে।
১০. আত্মবিশ্বাসের দুর্বলতা
আত্মবিশ্বাস দুর্বল হওয়া অথবা হীনম্মন্যতার অনুভূতি আসা পরিকল্পনাকে ব্যর্থ করে। কিছু করতে সক্ষম না হওয়ার মতো চিন্তা এক ধরনের পরনির্ভরতা তৈরি করে। এমন চিন্তাধিকারী কাজ করা ছেড়ে দেয়। ইবনে আব্বাস রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন :
'যখন রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইনতিকাল করেন, তখন আমি এক আনসারিকে বললাম, “হে অমুক, এসো আমরা রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সাথিদের কাছ থেকে ইলম শিখব। আজ তাঁরা অনেকেই আছেন।”
তিনি আশ্চর্য হয়ে বললেন, “হে ইবনে আব্বাস! তুমি কি মনে করো, মানুষ তোমার প্রতি মুখাপেক্ষী হবে? অথচ মানুষের মাঝে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সাথিগণ উপস্থিত। যাঁদের তুমি দেখতে পাচ্ছ।”
সে এ কাজ পরিত্যাগ করল। আর আমি এ ব্যাপারে এগিয়ে আসলাম। যদি আমার কাছে কারও ব্যাপারে খবর পৌঁছত, তবে আমি তাঁর কাছে যেতাম। তাঁর দরজার সামনে আমার চাদর বিছিয়ে শুয়ে থাকতাম। বাতাস আমার চেহারা ধূলিমলিন করে দিত। যখন তিনি ঘর থেকে বের হতেন, আমাকে দেখে বলতেন, “হে আল্লাহর রাসুলের চাচাতো ভাই! আপনাকে কে এখানে নিয়ে আসলো? আপনি আমার কাছে সংবাদ পাঠাতেন, তাহলে আমিই আপনার কাছে যেতাম!”
আমি বলতাম, “না, আমিই আপনার কাছে আসার বেশি উপযুক্ত। অতঃপর আমি তাঁকে হাদিস জিজ্ঞেস করতাম।”
এরপর ইবনে আব্বাস রা. বলেন, “আনসার লোকটি জীবিত থাকতেই দেখে গেছেন যে, মানুষ হাদিস জানার জন্য আমার কাছে ভিড় জমাচ্ছে। তখন সে বলেছিল, “এই যুবকটি আমার চেয়ে বেশি বুদ্ধিমান ছিল।”'৬৯
১১. তাড়াহুড়া প্রবণতা ও ধীরস্থিরতা পরিত্যাগ
কারণ, অনেক সময় মনে একটি পরিকল্পনা এসেছে, কিন্তু সে তাড়াহুড়া না করলে কিছুক্ষণ পর আবার আরেকটি পরিকল্পনা হৃদয়ে আসবে-যার কারণে মনে হবে যে, প্রথম পরিকল্পনাটি ভুল ছিল এবং দ্বিতীয়টি তার চেয়ে উত্তম হতো। তাই তাড়াহুড়ো করে পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে যাওয়া পরিকল্পনার মৃত্যু ডেকে আনে।
১২. নিজের ব্যক্তিত্বের সক্ষমতার পরিমাপ করতে না পারা
নিজের ব্যক্তিত্ব পরিমাপ করতে না পারলে একাধিক পরিকল্পনা নিয়ে দ্বিধায় পড়ে যায়। একবার সে ইলম অর্জনে ব্রতী হয়। আবার কখনো হিফজ আরম্ভ করে উপলব্ধি করে যে, সে কুরআন হিফজের জন্য তেমন মেধাবী নয়। এরপর একবার সে ভিন্ন সম্প্রদায়ের লোকদের ইসলামের প্রতি দাওয়াত দেওয়ার ব্যাপারটি শুনল। এবার তো সে এ ব্যাপারে নিজের দুর্বলতা উপলব্ধি করল এবং এ দিকটিতে কাজ না করার জন্য নিজের মনের মাঝে দ্বিধা-দ্বন্দ্ব শুরু হয়ে গেলো তার। সে সব বিষয়ে সফল হতে চায়, অবশেষে কোনটিতেই সফল হতে পারে না। সে সবকিছু করতে চায়, তাই কোনো কাজই হয়ে ওঠে না তার।
এই ব্যক্তির মাঝে ও যে একটি তিরকে অনেকগুলো জায়গায় নিক্ষেপ করতে চায়, তার মাঝে কোনো পার্থক্য নেই। আর এমন ব্যক্তিদের পরিকল্পনার অবস্থা এমনই।
১৩. জীবনের কোনো লক্ষ্য না থাকা।
১৪. দায়িত্ববোধ না থাকা।
১৫. সত্তাগতভাবেই হতাশা হওয়া।
১৬. পরিকল্পনা বাস্তবায়নে কাজের মাঝে ঐকান্তিক প্রচেষ্টা না থাকা।
১৭. নিজের আশপাশের ভাই-বন্ধু, পরিবার ও সমাজ থেকে বাধাপ্রাপ্ত হওয়া এবং তাদের হতোদ্যম করা কথাবার্তা।
১৮. চলার পথে রাস্তার কারুকর্ম নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়া। কেননা, এটা পরিকল্পনা বাস্তবায়ন নস্যাৎ করে দেয়।
১৯. পরিকল্পনা পূর্ণ না হতেই তার ফলাফল অর্জনে তাড়াহুড়া করা
এটা ধৈর্যশক্তি দুর্বল হওয়ার আলামত। যার ধৈর্যশক্তি দুর্বল হবে, তার সফলতাও কম আসবে।
ومن قَلَّ فيما يتَّقيه اصطباره * فقد قل مما يرتجيه نصيبه
'নিজের গ্রহণীয় জিনিসে যার ধৈর্য কমে গেছে, কাঙ্ক্ষিত বিষয়ে তার অংশও কমে গেছে।'
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এমন ব্যক্তিদের প্রতি ক্রোধান্বিত হয়েছেন, যারা বিজয় ও তামকিনের শর্ত পূরণ করার আগেই বিজয় ও তামকিন প্রত্যাশা করে। তিনি বলেছেন :
وَاللهِ لَيُتِمَّنَّ هَذَا الأَمْرَ ، حَتَّى يَسِيرَ الرَّاكِبُ مِنْ صَنْعَاءَ إِلَى حَضْرَمَوْتَ، لَا يَخَافُ إِلَّا اللَّهَ، أَوِ الذَّنْبَ عَلَى غَنَمِهِ، وَلَكِنَّكُمْ تَسْتَعْجِلُونَ
'আল্লাহর শপথ, আল্লাহ তাআলা এই দ্বীনকে বিজয় করবেন। ফলে সানা থেকে হাজরামাওত পর্যন্ত একজন লোক নিশ্চিন্তে সফর করবে। তার মনে স্রেফ আল্লাহরই ভয় থাকবে, অন্য কিছুর ভয় থাকবে না। অথবা তার মেষপালের ওপর কেবল বাঘের ভয় থাকবে, অন্য কোনো চোর-ডাকাতের ভয় থাকবে না। কিন্তু তোমরা বড় তাড়াহুড়ো করছ। '৭১
এ জন্যই ফুকাহায়ে কিরামের একটি মূলনীতি হলো, 'যে সময় আসার আগে তাড়াহুড়া করবে, সে বঞ্চিত হওয়ার মাধ্যমে সাজাপ্রাপ্ত হবে।'
ومستعجل الشيء قبل الأوان يصيب الخسارة ويجني النصب
'সময় হওয়ার পূর্বে তাড়াহুড়ো করা ক্ষতির কারণ। এ কাজ করা মানে নিজের শ্রম অকেজো করে দেওয়া।'
তাই সবর খুবই জরুরি।

টিকাঃ
৫৯. কেউ যদি মাধ্যম গ্রহণ করে আল্লাহর ওপর ভরসা করে, তাকে তাওয়াক্কুল বলে। পক্ষান্তরে কেউ যদি মাধ্যম গ্রহণ না করে আল্লাহর ওপর ভরসা করার দাবি করে, তাকে তাওয়াকুল বলে। -অনুবাদক।
৬০. মুসনাদু আহমাদ: ১২৫৬৯। হাদিসটি সহিহ।
৬১. কানজুল উম্মাল : ৯১৩৬
৬২. সহিহুল বুখারি : ২৮২৩, সহিহু মুসলিম: ২৭০৬
৬৩. সহিহু মুসলিম: ২৬৬৪
৬৪. ফাইজুল কাদির: ২/২৯৩
৬৫. সহিহুল বুখারি: ৬৪১২
৬৬. শাজারাতুজ জাহাব: ৪/৩৬
৬৭. সাইদুল খতির: ৫৭
৬৮. সুরা আলি ইমরান: ১৪৫
৬৯. দারিমি রহ.-এর বর্ণনা: ৫৭০
৭০. সানা দ্বারা ইয়ামানের সানা উদ্দেশ্য হতে পারে। হাজরামাওতও ইয়ামানের একটি অঞ্চল। ইয়ামানের সানা ও হাজরামাওতের মাঝে দূরত্ব পাঁচ দিনের। আবার এখানে শামের সানা নামক স্থানটিও উদ্দেশ্য হতে পারে। সেটার দূরত্ব এর চেয়ে অনেক বেশি। ফাতহুল বারি: ৬/৬১৯।
৭১. সহিহুল বুখারি: ৩৬১২

📘 সফলতার জন্য চাই উত্তম পরিকল্পনা > 📄 পরিকল্পনা বাস্তবায়নে উচ্চ মনোবলের অধিকারী ও সফল যারা

📄 পরিকল্পনা বাস্তবায়নে উচ্চ মনোবলের অধিকারী ও সফল যারা


কিছু কিছু পরিকল্পনা সফলতার সাথে সম্পন্ন করার জন্য শক্তিশালী মনোবলের প্রয়োজন হয়। এ ব্যাপারে কিছু চমকপ্রদ দৃষ্টান্ত পেশ করছি পাঠক সমীপে।
• জুলকারনাইন ও তার পৃথিবী আবাদের পরিকল্পনা
আল্লাহ তাআলা বলেন :
إِنَّا مَكَّنَّا لَهُ فِي الْأَرْضِ وَآتَيْنَاهُ مِن كُلِّ شَيْءٍ سَبَبًا
'আমি তাকে পৃথিবীতে প্রতিষ্ঠিত করেছিলাম এবং প্রত্যেক বিষয়ের কার্যোপকরণ দান করেছিলাম। '৭২
আল্লাহ তাআলা জুলকারনাইনকে প্রতিষ্ঠিত করেছেন। তাকে সবকিছুর উপকরণ দান করেছেন। তাই আল্লাহ তাআলা তাকে যে উপকরণ দিয়েছেন, সেগুলো তিনি কাজে লাগিয়েছেন। নিজের লক্ষ্য বাস্তবায়নে ও গন্তব্যে পৌঁছতে এগুলো ব্যবহার করেছেন। তিনি নিজের চলা অব্যাহত রাখতে ও জিহাদ চালিয়ে যেতে বিশাল শ্রম ব্যয় করেছেন। তার সেনাবাহিনী গঠন করেছেন। তাদের প্রস্তুত ও সজ্জিত করেছেন। অর্থ ও শক্তির যা কিছু পেরেছেন সংগ্রহ করেছেন। এ সবই এ কারণেই করেছেন যে, তিনি উপলব্ধি করতে পেরেছেন—উপকরণ সংগ্রহ করা, শ্রম ব্যয় করা, সবকিছু প্রস্তুত করা তার নিজের উদ্দেশ্য সাধনে জরুরি।
জুলকারনাইন পৃথিবীকে আবাদ করতে চেয়েছেন এবং তাকে সমৃদ্ধ ও সুন্দর করতে চেয়েছেন। এমনকি তিনি এ জন্য নিজের সর্বোচ্চ শক্তি ও সামর্থ্য ব্যয় করেছেন। তিনি তৎকালীন সময়ের কারও চেয়ে সম্মানে কম থাকুক-সেটাতে সন্তুষ্ট ছিলেন না, যদিও সে সম্মান দুনিয়াবিও হোক না কেন। তিনি কোনো সীমায় এসে থেমে থাকেননি। তিনি কোনো অবস্থানে গিয়ে থেমে যাননি। বরং পুরো পৃথিবী ভ্রমণের ইচ্ছা করেছেন এবং শেষ পর্যন্ত সূর্যাস্তের স্থান পর্যন্ত পৌঁছেছেন। অতঃপর নিজ বাহিনী নিয়ে ভ্রমণ শুরু করেছেন এবং সূর্যোদয়ের স্থান পর্যন্ত পৌঁছেছেন। তারপর তিনি এমন এক পথ অবলম্বন করলেন, যার ফলে দুপ্রাচীর বেষ্টিত এলাকায়ও পৌঁছলেন। এরপর সে পুরো অঞ্চলটি নিজের রাজত্বের অন্তর্ভুক্ত করে নিলেন। সেখানে শাসন করলেন। প্রভাব বিস্তার করলেন। নির্যাতিতদের জন্য একটি আশ্রয়স্থল ও ভীতসন্ত্রস্তদের জন্য নিরাপদ একটি জায়গা তৈরি করে গেছেন।
কাসিমি রহ. বলেন :
'জুলকারনাইনের বর্ণনার একটি বিশ্লেষণ এমন—প্রতিবন্ধকতা দূরীকরণে উদ্যমের সাথে জেগে উঠতে হবে, হতে হবে কর্মঠ। উদ্যম ও সাহসিকতার এ প্রচেষ্টা উপকরণ ও মাধ্যমগুলোকে হাতে এনে দেয়, করে দেয় সহজলভ্য। সুতরাং সমুদ্র পাড়ি বা মরুভূমি অতিক্রম কষ্টকর বলে অজুহাত দেখিয়ে মর্যাদাহীন, দুর্বল ও নিম্নতা নিয়ে সন্তুষ্ট থাকা উচিত নয়। বরং উচিত হচ্ছে উদ্যমী হওয়া এবং নিজের পথ চলায় সুখ ও আনন্দের স্বাদ উপভোগ করা। যেমন জুলকারনাইন নিজের জীবন অতিবাহিত করেছেন। তার সারা জীবন কেটেছে বিজয়ের মিষ্টতা ও সফলতার স্বাদ উপভোগ করে। এমনটা এ কারণেই সম্ভব হয়েছিল যে, তিনি এমন ব্যক্তি ছিলেন না-যাকে উদ্দেশ্য অর্জনে কষ্ট-কাঠিন্য ঠেকিয়ে রাখবে।'৭৩
ইমাম নববি রহ. প্রতিদিন বারোটি দরস পাঠ করতেন। সপ্তাহে কিংবা মাসে নয়; বরং প্রতিদিন বারোটি দরস। 'আল-ওয়াসিত' কিতাবের দুই দরস। 'আল-মুহাজজাব' কিতাবের একটি দরস। (পরবর্তীকালে 'আল-মাজমু' নামক তাঁর বিশাল গ্রন্থে যার ব্যাখ্যা লিখেছেন।) 'আল-জামউ বাইনাস সহিহাইন' কিতাবের একটি দরস। 'সহিহু মুসলিম'-এর একটি দরস। নাহু নিয়ে লিখিত ইবনুজ জান্নির কিতাব 'আল-লুমউ'- এর একটি দরস। ভাষা নিয়ে লিখিত ইবনুস সিক্কিতের 'ইসলাহুল মানতিক'-এর একটি দরস। সরফবিষয়ক একটি দরস। উসুলুল ফিকহের একটি দরস; কখনো আবু ইসহাকের 'আল-লুমউ' থেকে আবার কখনো ফখরুদ্দিন রাজির 'আল-মুন্তাখাব' থেকে পড়তেন। আসমাউর রিজাল নিয়ে একটি দরস। উসুলুদ্দিন নিয়ে একটি দরস পাঠ করতেন।
তিনি বলেন, 'আমি টীকা আকারে কঠিন শব্দ, অস্পষ্ট ইবারত ও কঠিন ভাষাগুলো সমাধান করে দিয়েছি। আল্লাহ তাআলা আমার সময়ে বরকত দান করেছেন।'
তিনি দিন-রাত কখনো কোনো সময় নষ্ট করতেন না। সব সময় কাজে মগ্ন থাকতেন। এমনকি রাস্তায়ও এ নিয়ে মশগুল থাকতেন। তিনি এভাবে ধারাবাহিক ছয়টি বছর কাটিয়েছেন। এরপর লেখালেখি শুরু করেছেন।

জাবির বিন আব্দুল্লাহ আল-আনসারি রা.। একমাস সফর করে শামে পৌঁছলেন আব্দুল্লাহ বিন উনাইস রা. থেকে একটি হাদিস সংগ্রহ করতে।

আবু আইয়ুব রা. একটি হাদিস সম্পর্কে জিজ্ঞেস করতে উকবাহ বিন আমিরের কাছে মিশর গমন করেছেন।

সাইদ ইবনুল মুসাইয়িব রহ. বলেন, 'আমি একটি হাদিস সংগ্রহে রাতের পর রাত ও দিনের পর দিন সফর করেছিলাম।'

সাইদ ইবনু জুবাইর রহ. একটি আয়াতের তাফসির জানার জন্য কুফা থেকে মদিনায় এলেন।

ইবনে দাইলামি আব্দুল্লাহ বিন ফাইরুজ রহ. বলেন, 'আমার কাছে আব্দুল্লাহ বিন আমর ইবনুল আস রা.-এর নিকট একটি হাদিস থাকার খবর পৌঁছল। আমি সেই হাদিসটি জিজ্ঞেস করতে তায়িফ পর্যন্ত সফর করলাম।' আর ইবনে দাইলামি তখন ফিলিস্তিনে ছিলেন।'

ইমাম তাবারি রহ. এবং তাঁর তাফসির ও ইতিহাস গ্রন্থ সংকলন
ইবনে জারির আত-তাবারি রহ. তাঁর সঙ্গীদের বলেন, 'তোমরা কি আদম আ. থেকে আজ পর্যন্ত একটি ইতিহাস গ্রন্থ রচনায় আগ্রহ রাখো?'
তারা বলল, 'কত পৃষ্ঠায়?'
তিনি বললেন, 'আনুমানিক ত্রিশ হাজার পৃষ্ঠায়।'
তারা বলল, 'এটি শেষ করার আগেই জীবন শেষ হয়ে যাবে।'
তিনি বললেন, 'ইন্নালিল্লাহ! সাহসিকতা তো মরে গেছে।'
তারপর তিনি তিন হাজার পৃষ্ঠায় সংক্ষেপ করেছেন সে ইতিহাসকে। তিনি যখন তাফসির গ্রন্থ লেখার ইচ্ছা করলেন, তখনও তাদের এমন কথা বললেন। অতঃপর ইতিহাস গ্রন্থের ন্যায় তাও রচনা করলেন একই পরিমাণ পৃষ্ঠায়।
তিনি বলেন, 'আমি আল্লাহ তাআলার কাছে ইসতিখারা করেছি। তিন বছরের আগেই তা সংকলন পূর্ণ করার নিয়তের ওপর তাঁর কাছে সাহায্য প্রার্থনা করেছি। আল্লাহ আমাকে সাহায্য করেছেন। '৭৪

জাপানের বিশিষ্ট প্রযুক্তিবিদ
কিছু কিছু কাফিরের কাছেও আপনি ধৈর্য, কর্ম, চেষ্টা-প্রচেষ্টা ও উচ্চাকাঙ্ক্ষা দেখতে পাবেন। তার একটি উদাহরণ হলো, জাপানিরা তাদের একজন প্রজাকে জার্মানের যন্ত্রবিজ্ঞান অর্জনের এক মিশনে প্রেরণ করল। তার লক্ষ্য ছিল ইঞ্জিন তৈরি করা।
সে বলল, 'আমি এই বিষয়ে পড়াশোনা করলাম। যন্ত্রবিজ্ঞানের সবকিছু ভালোভাবে জেনে নিলাম। কিন্তু ইঞ্জিনের সামনে অক্ষম হয়ে পড়লাম।
একদা আমি নিজের পুরো বেতন দিয়ে একটি ইটালিয়ান ইঞ্জিন ক্রয় করলাম। তা বানানোর প্রক্রিয়া দেখতে লাগলাম। কেমন যেন আমি একটি মুক্তার মুকুটের দিকে তাকাচ্ছি। আমি মনে মনে বলছিলাম, এটাই ইউরোপের শক্তির গোপন রহস্য। যদি আমি এমন একটি যন্ত্র আবিষ্কার করতে পারি, তবে জাপানের ইতিহাস পাল্টিয়ে ফেলতে পারব। আমি ভাবলাম, যদি আমি এটি খুলে পুনরায় জোড়া দিতে পারতাম এবং আমি সেটা চালু করতাম এবং তা চালু হয়ে যেত। আমি ইউরোপীয় কারিগরির গোপন রহস্যের দিকে পা পা করে হেঁটে চললাম।
আমার কাছে যন্ত্রের যে নকশাটি ছিল, তা নিয়ে আসলাম। অনেকগুলো কাগজ নিলাম। কাজের যন্ত্রপাতি সংগ্রহ করে কাজ চালিয়ে গেলাম। আমি প্রতিটি যন্ত্রাংশের নকশা করে নিলাম। পুরো যন্ত্রটি খুলে ফেললাম। এরপর সিরিয়াল অনুযায়ী নকশা আঁকলাম। এরপর পুনরায় জোড়া দিলাম। পরে চালু করলে সাথে সাথে তা চালু হয়ে গেল!
আমি আনন্দে স্তব্দ হয়ে গেলাম। যেন আনন্দে আমার হৃদপিণ্ড থেমে গিয়েছিল সেদিন। তিন দিনের কাজ। দিনে মাত্র একবার আহার। খুব কম সময়ের ঘুম।
আমাদের মিশনপ্রধান আমার এই বিষয়টি জানতে পারলেন। তিনি আমার জন্য একটি অকেজো মেশিন নিয়ে এসে বললেন, “এটার সমস্যাটা বের করো! যেন এটা আবার চালু হয়। আমি দশদিন যাবৎ এটা নিয়ে ব্যস্ত ছিলাম। এরপর ভুলগুলো বুঝতে পারলাম। পুরাতন তিনটি যন্ত্রাংশ ক্ষয় হয়ে গিয়েছিল। এ ছাড়া বাকিগুলো আমি হাতুড়ি ও রেডিয়টরের সাহায্যে ঠিক করে দিয়েছি।
মিশনপ্রধান আমাকে নিজে নিজে কিছু যন্ত্রাংশ বানিয়ে তা জোড়া দিতে বললেন। অতঃপর আমি ডক্টরেট ডিগ্রি অর্জন ছেড়ে লোহা মিশ্রণ, তামা মিশ্রণ ও অ্যালুমেনিয়াম মিশ্রণের কারখানায় ভর্তি হলাম। যেমনটা আমার জার্মানি স্যারেরা কামনা করেছিলেন।
সেখানে আমি একজন কর্মচারী হিসেবে থাকলাম। খনিজ কারখানায় খনিজ কর্মকর্তার কাছে লাঞ্ছনার সাথে অবস্থান করলাম। তার হুকুম তামিল করছিলাম। যেভাবে বলছিল সেভাবে করছিলাম। যেন সে একজন বিরাট কেউ। আমি খাবারের সময় তার সেবা করেছি। প্রায় আট বছর যাবৎ এভাবে থাকলাম। দৈনিক প্রায় দশ থেকে পনেরো ঘণ্টা কাজ করতাম। আমার কাজ শেষ হওয়ার পর রাতে গার্ডের দায়িত্ব পালন করতাম। রাতের বেলা সাধারণভাবে কারিগরি নিয়মগুলো নিয়ে গবেষণা করতাম।
জাপানের গভর্নর মিকাডো আমার বিষয়টি জানতে পারলেন। নিজের পারসোনাল সম্পদ থেকে আমার জন্য তিনি স্বর্ণের পাঁচ হাজার ব্রিটিশ পাউন্ড পাঠালেন। আমি তা দিয়ে কারখানার সবগুলো যন্ত্রাংশ ক্রয় করলাম। এবং সেগুলো জমা করে দেশে পাঠিয়ে দিলাম। আমি দেশে পৌঁছামাত্রই গভর্নর মিকাডো আমার সাথে সাক্ষাৎ করতে চেয়েছিলেন। আমি বললাম, “পূর্ণ ইঞ্জিনটি পরিপূর্ণ সেটিং করা ব্যতীত আমি তার সাক্ষাতের উপযুক্ত নই।”
অতঃপর আমি নয় বছর পর সহযোগীদের নিয়ে কাজ করার পর Made in Japan যুক্ত দশটি ইঞ্জিন প্রাসাদে নিয়ে গেলাম। মিকাডো আমাদের কাছে প্রবেশ করলেন এবং মুচকি হাসলেন। বললেন, “আমার জীবনে এটি সবচেয়ে বেশি মিষ্ট মিউজিক যা আমি শুনেছি। একটি খাঁটি জাপানিজ মেশিনের আওয়াজ।””
বাতিলপন্থীদের তাদের বাতিলের প্রতি দাওয়াতের আশ্চর্য অবস্থা!
ডক্টর আব্দুল ওয়াদুদ শালবি বলেন :
'আমি দ্বিধায় পড়ে যাই মাদ্রিদে যখন ধর্মপ্রচারকদের প্রস্তুতি দেখি। বিশাল একটা ভবনের আঙিনায়, বড় একটি ফলকে লিখে রেখেছে, হে ধর্মপ্রচারক যুবক, আমরা তোমাকে কোনো পেশা বা কাজ, বিছানা বা জাজিমের জন্য প্রস্তুত করছি না। আমরা তোমাকে সতর্ক করছি যে, তোমার ধর্মপ্রচার-জীবনে শুধু দুঃখ-কষ্টই পাবে। আমরা তোমার সামনে যা পেশ করতে পারব তা হলো—জ্ঞান, রুটি ও ছোট কুটিরে শুষ্ক বিছানা। আর এর সবকিছুর বিনিময় তুমি আল্লাহ তাআলার কাছে পাবে। যখন তুমি মাসিহের পথে থাকবে, তুমি ভাগ্যবানদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে মৃত্যুবরণ করবে।'
এই বাণীগুলো ডাক্তারি, অস্ত্রোপচার ও ফার্মাসিউটিক্যালস ও অন্যান্য ডিগ্রিধারী বহু লোককে মরুভূমির শুষ্ক প্রান্তরে নিয়ে গেছে। যেখানে একটি তাঁবু ছাড়া আর কিছুই মিলে না। এমন দুর্গন্ধ জলাভূমিতেও নিয়ে গেছে যেখানে জীবাণু ছড়িয়ে আছে। সেখানে তারা দীর্ঘকাল বিনা বেতনে অবস্থান করছে। অবস্থান করেছে বিনা পদমর্যাদায়। যদি তাদের কেউ নিজের যোগ্যতা অনুযায়ী কাজ করত, তবে লাখ লাখ ডলার অর্জন করতে পারত। কিন্তু সে তা বিসর্জন দিয়েছে এক বাতিল মতবাদের জন্য, যাকে সে সঠিক ধারণা করেছে।
আশ্চর্য! অতি আশ্চর্য! এই জাতির হৃদয়গুলো বাতিলের প্রতি জমে যাওয়ার ওপর আশ্চর্য হতে হয়। তোমাদের হক দ্বীন থেকে তোমাদের বিচ্ছিন্ন হয়ে যাওয়ার ওপর আশ্চর্য হতে হয়।

টিকাঃ
৭২. সুরা আল-কাহফ : ৮৪
৭৩. মাহাসিনুত তা'বিল: ১১/৮৭
৭৪. সিয়ারু আ'লামিন নুবালা: ১৪/২৭৪-২৭৫

📘 সফলতার জন্য চাই উত্তম পরিকল্পনা > 📄 পরিশিষ্ট

📄 পরিশিষ্ট


উদ্দেশ্যহীন পথচলা জীবনের অপচয়, সময় বিনষ্টকরণ। কোনো মানুষ যদি নিজের গন্তব্য না চেনে, তবে সে পৌঁছতেও পারবে না। এলোমেলো হবে তার জীবন। উদ্ভ্রান্তের ন্যায় জীবনযাপন করবে সে। তাই প্রতিটি মুসলিমের জীবনেই এক বা একাধিক পরিকল্পনা থাকা উচিত। আমাদের এই পুস্তিকাটি যেন লক্ষ্য স্থির করতে ও পরিকল্পনা সাজাতে সাহায্য করে-আল্লাহ তাআলার কাছে এ কামনা।
হে আল্লাহ, আমাদেরকে কল্যাণের তাওফিক দিন। কল্যাণের প্রতি পথ প্রদর্শন করুন। আমাদের ও মন্দের মাঝে দূরত্ব তৈরি করে দিন। হে জগতের প্রতিপালক!
وصلى الله وسلم على نبينا محمد وعلى آله وصحبه أجمعين
- মুহাম্মাদ সালেহ আল-মুনাজ্জিদ

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00