📘 সফলতার জন্য চাই উত্তম পরিকল্পনা > 📄 পরিকল্পনা যে ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত হবে

📄 পরিকল্পনা যে ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত হবে


পরিকল্পনা যে ভিত্তিগুলোর ওপর প্রতিষ্ঠিত হবে, তন্মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ কিছু ভিত্তি হলো :
প্রথমত, পরিকল্পনা নির্ধারণ করা
যথাযথ পরিকল্পনা গ্রহণ একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এ জন্য দরকার পড়ে অনেক চিন্তা-ভাবনা ও অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের শরণাপন্ন হওয়ার।
পরিকল্পনাগুলোর কোন পরিকল্পনাটি সর্বোত্তম?
তার মাঝে কোনটি সম্পাদন করা সম্ভব আর কোনটি সম্পাদন করা সম্ভব নয়?
কোন পরিকল্পনাটির প্রতি উম্মাহ মুখাপেক্ষী? কোন পরিকল্পনাটি উম্মাহর জন্য সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন?
পরিকল্পনাকারীকে চূড়ান্ত পরিকল্পনা নির্ধারণের পূর্বে এ গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতে হবে।
দ্বিতীয়ত, পরিকল্পনা বাস্তবায়ন প্রস্তুতি ও রূপরেখা তৈরি করা
এ পর্যায়ে ব্যাপক একটি অবকাঠামো তৈরি করতে হবে। আবশ্যকীয় উদ্যোগগুলো গ্রহণ করতে হবে। প্রকল্পের লক্ষ্য-উদ্দেশ্য, গুরুত্ব, কাঙ্ক্ষিত ফলাফল, কাজের নকশা ও আবশ্যকীয় সম্ভাবনাসমূহও বের করতে হবে।
তৃতীয়ত, পরিকল্পনা বাস্তবায়ন
পরিকল্পনা নির্ধারণ ও তার নকশা তৈরির পর তা বাস্তবায়ন শুরু করতে হবে। আর এটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্তর।
চতুর্থত, পরিকল্পনার মূল্যায়ন
কখনো কখনো প্রকল্পটি বহিরাগত অনেক প্রতিক্রিয়ার সম্মুখীন হয়। কখনো বাস্তবায়নকালীন বা বাস্তবায়নের পর পরিকল্পনার মাঝে উন্নয়ন সাধিত হয়। তাই চূড়ান্ত ফলাফলকে তার পূর্বের ফলাফলের সাথে মিলিয়ে দেখা জরুরি। যেন জানা যায় যে, পরিকল্পনাটি সফল হয়েছে কি হয়নি।

📘 সফলতার জন্য চাই উত্তম পরিকল্পনা > 📄 কীভাবে আপনার পরিকল্পনা শুরু করবেন?

📄 কীভাবে আপনার পরিকল্পনা শুরু করবেন?


কখনো পরিকল্পনা নির্ধারিত হয় অনেক চিন্তা-ভাবনা ও গবেষণার পর। আবার কখনো কখনো স্রেফ প্রস্তাব বা পরামর্শের মাধ্যমেও হয়ে যায়। ইমাম বুখারি রহ. বলেন, 'আমি ইসহাক বিন রাহওয়াইহ-এর নিকট ছিলাম। তখন আমাদের কিছু সাথি বললেন, 'যদি তোমরা রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর হাদিসগুলো নিয়ে একটি সংক্ষিপ্ত গ্রন্থ রচনা করতে!' তাদের এই কথাটি আমার হৃদয়ে বসে গেল। এরপর আমি এ গ্রন্থটি (সহিহুল বুখারি) সংকলন করতে শুরু করলাম।’৩৭
ইমাম শাফিয়ি রহ.-এর 'আর-রিসালাহ'-এ গ্রন্থটি রচনা করা হয়েছে আব্দুর রহমান বিন মাহদির ইচ্ছা অনুযায়ী।
ইমাম শাওকানি রহ. 'নাইলুল আওতার শারহু মুনতাকাল আখবার' গ্রন্থটি তাঁর এক শাইখের পরামর্শে লিখেছেন।
কখনো স্রেফ উৎসাহব্যঞ্জক একটি বাক্যই পরিকল্পনা নির্ধারণের জন্য যথেষ্ট। যেমন : ইমাম জাহাবি রহ.। যিনি হাদিসের একজন মহান ইমাম ছিলেন। কীভাবে গড়ে উঠল তাঁর হাদিসে ব্যুৎপত্তি অর্জনের পরিকল্পনা? তিনি তাঁর শাইখ আলামুদ্দিন আল-বারজালি রহ. সম্পর্কে বলেন, 'শাইখ ইলমুদ্দিন সেই ব্যক্তি, যিনি আমার হৃদয়ে হাদিস অন্বেষণের ভালোবাসা তৈরি করে দিয়েছেন। তিনি আমার লেখা দেখে বললেন, “তোমার লেখা তো মুহাদ্দিসদের লেখার মতো।” তাঁর এই কথা আমার হৃদয়ে প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছিল।'৩৮
মুহাম্মাদ বিন আওফ রহ. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'নবীন বয়সে একদা আমি বল নিয়ে খেলছিলাম। বলটি গিয়ে আল-মুআফি বিন ইমরান আল-হিমসির সামনে পড়ল। বলটি নিতে তাঁর কাছে গেলাম।
তখন তিনি জিজ্ঞেস করলেন, "তুমি কার ছেলে?”
আমি বললাম, "আওফ বিন সুফইয়ানের ছেলে।”
তিনি বললেন, “আরে! তোমার পিতা তো আমার সাথি ছিলেন। তিনি আমাদের সাথে বসে হাদিস লিখতেন, ইলম শিখতেন। তোমার উচিত তোমার পিতার পদাঙ্ক অনুসরণ করা।”
এরপর আমি আমার মায়ের কাছে গেলাম। তাকে এই ঘটনা শোনালাম। মা বললেন, “ঘটনা সত্য। তিনি তোমার পিতার বন্ধু।”
মা আমাকে একটি লুঙ্গি ও কাপড় পরিয়ে দিলেন। আমি আল-মুআফির নিকট চলে এলাম। সাথে দোয়াত-কলম আর কাগজ নিয়ে আসলাম। তখন তিনি বললেন, “লেখো, ইসমাইল বিন আইয়াশ বর্ণনা করেন আব্দুর রহমান বিন সুলাইমান থেকে, তিনি বলেন, একটি ফলকে উম্মে দারদা আমাকে লিখে পাঠিয়েছিলেন-“তোমরা ছোট বয়সে ইলম শেখো। বড় হয়ে সে ইলম মানুষকে শেখাবে। প্রত্যেক কৃষক সে ফসলই ঘরে তুলবে, যা সে চাষ করেছে।””
এই ঘটনার ফলাফল কী ছিল?
এ বালক মহান এক ব্যক্তিত্বে পরিণত হয়েছেন। যার ব্যাপারে ইমাম জাহাবি রহ. বলেন, 'ইমাম, হাফিজ, মুজাওবিদ, হিমসের মুহাদ্দিস, জাফর আত-তায়ি আল-হিমসি।'
ইমাম আহমাদ বিন হাম্বল রহ. বলেন, 'চল্লিশ বছর যাবৎ শামে মুহাম্মাদ বিন আওফের দ্বিতীয় কোনো উদাহরণ ছিল না।'৪০
অনেক সময় আপনি আপনার চেয়ে মর্যাদায় কম লোকদের থেকেও বুদ্ধি পাবেন। সেটাকে তুচ্ছ মনে করবেন না; যদিও সে বুদ্ধি একটি প্রাণী বা কীট থেকেই আসুক না কেন।
সুলাইমান আ. হুদহুদ পাখির সংবাদের ভিত্তিতে বিরাট একটি দাওয়াহ-লক্ষ্য বাস্তবায়নের সুযোগ সম্পর্কে অবগত হয়েছেন। এরপর সে সুযোগ যথাযথ কাজে লাগিয়েছেন। যার ফলস্বরূপ সাবার রানি বলতে বাধ্য হয়েছিলেন, কুরআনের ভাষায় যার বর্ণনা-
قَالَتْ رَبِّ إِنِّي ظَلَمْتُ نَفْسِي وَأَسْلَمْتُ مَعَ سُلَيْمَانَ لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ
'সে বলল, “হে আমার পালনকর্তা, আমি তো নিজের প্রতি জুলুম করেছি। আমি সুলাইমানের সাথে বিশ্বজাহানের পালনকর্তা আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পণ করলাম।”'৪১
নাহুর প্রসিদ্ধ এক ইমাম কাসায়ি রহ.। একটি পিঁপড়া থেকে উপকার গ্রহণ করেছেন। তার জীবনীতে উল্লেখিত হয়েছে—তিনি ইলমে নাহু শিক্ষা শুরু করেন, কিন্তু তার কাছে এটি কঠিন মনে হলো। তাই ছেড়ে দেওয়ার ইচ্ছা করলেন। একদিন তিনি শুয়ে ছিলেন। দেখলেন একটি পিঁপড়া খাদ্য নিয়ে দেওয়ালে উঠতে চেষ্টা করছে। কিন্তু প্রতিবারই কিছুটা উঠে পড়ে যাচ্ছে। এভাবে কিছুক্ষণ চেষ্টা করার পর সে এক সময় উঠে গেল । তিনি এই ঘটনা থেকে শিক্ষা গ্রহণ করলেন। পূর্ণোদ্যমে ইলমে নাহুর পেছনে চেষ্টায় রত থাকলেন। শেষ পর্যন্ত নাহুর একজন ইমামে পরিণত হলেন।
অথবা নিজের সাথে ঘটে যাওয়া কোনো ঘটনা থেকে পরিকল্পনার বুদ্ধি আসে :
- ইবনে হাজিম রহ.। ‘মুহাল্লা' কিতাবের সংকলক। ফিকহের ক্ষেত্রে বিশেষ পাণ্ডিত্যের অধিকারী ছিলেন তিনি। তাঁর ফিকহ শেখার কারণ ছিল একটি জানাজা। একদিন তিনি এক জানাজায় অংশগ্রহণ করেছিলেন। সেখানকার মসজিদে প্রবেশ করলেন তিনি। কোনো নামাজ না পড়েই বসে গেলেন। এক ব্যক্তি এসে তাঁকে বললেন, 'দাঁড়াও এবং দুই রাকআত তাহিয়্যাতুল মসজিদের নামাজ পড়ো।' তখন তাঁর বয়স ২৬ বছর।
তিনি বলেন, 'আমি দাঁড়ালাম দুই রাকআত নামাজ পড়লাম। এরপর যখন জানাজার নামাজ শেষ করে মসজিদে প্রবেশ করে নামাজ পড়া শুরু করলাম। তখন আমাকে বলা হলো, "বসো, বসো, এখন নামাজের সময় নয়।" সময়টা ছিল আসরের পরের।'
তিনি বলেন, 'আমি ফিরে আসলাম। খুব চিন্তিত হয়ে পড়লাম। আমার শিক্ষক, যিনি আমার প্রতিপালনের দায়িত্বে ছিলেন—তাকে বললাম, “আমাকে ফকিহ আবু আব্দুল্লাহ বিন দাখুনের বাড়ির ঠিকানা বলে দিন!””
তিনি বলেন, 'আমি তাঁর বাড়ি চলে গেলাম। ঘটনাটি তাঁকে খুলে বললাম। আমাকে তিনি মুয়াত্তা মালিকের নির্দেশনা দিলেন। আমি তাঁর নিকট মুয়াত্তা অধ্যয়ন করতে শুরু করলাম। এভাবে তিন বছর যাবৎ তাঁর কাছে এবং অন্যদের কাছে কিতাব অধ্যয়নরত ছিলাম।' সর্বশেষ তিনি বহস করা শুরু করলেন। ৪২
ইমাম সিবওয়াহি। নাহুর আরেকজন ইমাম। নাহু-জ্ঞানে তাঁর দৃঢ়তা অর্জনের, ইলমে নাহুর জন্য তাঁর পরিকল্পনা গ্রহণের শুরুটা হলো এমন- তিনি শুরুতে মুহাদ্দিস ও ফকিহদের সাথি ছিলেন। হাম্মাদ বিন সালামার নিকট তিনি লেখা পেশ করতেন। একদিন তিনি লেখায় কিছু ভাষাগত ভুল করলেন। তাই তাঁর লেখা গ্রহণ করা হয়নি।
তখন তিনি বললেন, 'আমি এই বিষয়ে এত ইলম শিখব যে, আমাকে কখনো বলা হবে না যে, তুমি ভাষাগত ভুল করেছ।'
এরপর তিনি নাহু শিখতে আরম্ভ করলেন। খলিল বিন আহমাদের সাথে লেগে থাকলেন। ফলাফল! আজ পর্যন্ত তিনি নাহুর একজন বড় ইমাম হিসেবে সমাদৃত হচ্ছেন। যদিও তিনি মাত্র বত্রিশ বছর জীবিত ছিলেন। কেউ কেউ বলেন, চল্লিশের কাছাকাছি বয়সে তিনি মৃত্যুবরণ করেছেন।৪৩
কখনো আপনার পরিকল্পনাটা অন্যের শুরু করা পরিকল্পনার পূর্ণতা হতে পারে। এতে কোনো অসুবিধা নেই; বরং এটা অন্যের ওপর অনুগ্রহ হলো। যেসব পরিকল্পনা একজন শুরু করেছেন, আর অন্যজন পূর্ণতা দান করেছেন, এর একটি চমৎকার উদাহরণ হলো-কুরআন শরিফ একত্র করা। প্রথমে আবু বকর রা. একত্রকরণের পরিকল্পনাটি গ্রহণ করলেন। এরপর উসমান রা. এ কাজটি সুসমাপ্ত করলেন।
ইমাম নববি রহ. 'আল-মাজমু শারহুল মুহাজজাব' সংকলন শুরু করেছেন। এই কিতাবে নিজের ইলম ঢেলে দিয়েছেন। কিতাবটির ব্যাপারে ইবনে কাসির রহ. বলেন, 'যদি আল্লাহ তাআলা উনাকে কিতাবটি পূর্ণ করার তাওফিক দিতেন, তবে এটি আহকামের ব্যাপারে একটি অদ্বিতীয় কিতাব হতো—যেরকম কিতাব ইতিপূর্বে লেখা হয়নি।' কিন্তু তিনি ইনতিকাল করেন। কিতাবটি অসম্পূর্ণ রেখে যান। বাবুর রিবা (সুদের অধ্যায়) পর্যন্ত সমাপ্ত করে যেতে পেরেছিলেন তিনি।
তারপর আসলেন তাকিউদ্দিন আস-সুবকি রহ.। বাবুর রিবা থেকে বাবুত তাফলিস৪৪ পর্যন্ত পূর্ণ করলেন। তারপর অনেক বছর ও যুগ চলে যায়। এরপর আসলেন শাইখ মুহাম্মাদ নজিব আল-মুতিয়ি। তিনি এসে কিতাবটি পূর্ণ করলেন।
তাফসিরুল জালালাইন: জালালুদ্দিন মহল্লি রহ. সুরা কাহফ থেকে শুরু করে সুরা নাস পর্যন্ত তাফসির লিখলেন। এরপর সুরা ফাতিহার তাফসির শুরু করলেন। এ সুরা পর্যন্ত তাফসির শেষ করার পর ইনতিকাল করেন।
অতঃপর জালালুদ্দিন সুয়ুতি রহ. তাফসিরটি পূর্ণতা দান করেন। তিনি জালালুদ্দিন মহল্লির পদ্ধতি অনুসারে সুরা বাকারা থেকে শুরু করে সুরা ইসরার শেষ পর্যন্ত তাফসির সম্পন্ন করলেন।
- 'আজওয়াউল বায়ান ফি ইজাহিল কুরআন বিল কুরআন' সংকলন শুরু করেছেন মুহাম্মাদ আল-আমিন আশ-শানকিতি রহ.। সুরা মুজাদালার শেষ পর্যন্ত তাফসির পূর্ণ করেছিলেন তিনি। তারপর তাঁর ছাত্র শাইখ আতিয়্যাহ মুহাম্মাদ সালিম রহ. এ অনন্য তাফসির গ্রন্থটি সম্পূর্ণ করলেন।
বাইতুল মুকাদ্দাস বিজয় : বাদশাহ নুরুদ্দিন জিংকি রহ.। ক্রুসেডারদের হাত থেকে বাইতুল মুকাদ্দাস বিজয় নিজের হাতে হবে বলে আশা করতেন। তাই বিজয়ের পর মসজিদে আকসায় স্থাপন করবেন বলে বিশাল একটি মিম্বার বানালেন। তিনি বাইতুল মুকাদ্দাস বিজয়ে তাঁর জিহাদি কার্যক্রম শুরু করলেন। কিন্তু বাইতুল মুকাদ্দাস বিজয়ের আগেই তিনি মৃত্যুবরণ করলেন। রহিমাহুল্লাহ। এরপর আল্লাহ তাআলা কুদসের বিজয় দিলেন তাঁরই এক অনুসারীর হাতে। যাকে আমরা সালাহুদ্দিন আইয়ুবি নামে জানি। রহিমাহুল্লাহ।
কখনো একটি প্রকল্পে একাধিক ব্যক্তি অংশগ্রহণ করে পূর্ণ করে থাকেন। আব্দুর রহমান বিন কাসিম ও তাঁর ছেলে মুহাম্মাদ-এর প্রকল্প। শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া রহ.-এর ফতোয়া একত্র করতে সংকলনের পরিকল্পনা হাতে নিলেন। শাইখ আব্দুর রহমান বিন কাসিম তাঁর ছেলেকে নিয়ে বিভিন্ন শহর ও দেশ চষে বেড়িয়েছেন। নজদ, মক্কা, ইরাক, সিরিয়া, লেবানন, মিশর ও প্যারিস ইত্যাদি জায়গায় সফর করেছেন। ইবনে তাইমিয়া রহ.-এর পাণ্ডুলিপিগুলো সংগ্রহ করেছেন। পরিশেষে আমাদেরকে ৩৭ খণ্ডের এই বিশাল কিতাবটি উপহার দিলেন। উপহার দিলেন একটি বিরাট ও মহান কাজ।
কখনো কখনো পরিকল্পনাটি অভ্যন্তরীণ হয়, বাহ্যিক নয়। যেমন: সালমান আল-ফারসি রা.-এর সত্যসন্ধানী সফর। জাইদ বিন আমর বিন নুফাইল। যিনি সিরিয়ায় গমন করেছিলেন সত্য দ্বীনের সন্ধানে। অবশেষে ইবরাহিম আলাইহিস সালাম-এর একনিষ্ঠ দ্বীন পেলেন সেখানে।

টিকাঃ
৩৭. সিয়ারু আ'লামিন নুবালা : ১২/৪০১
৩৮. সিয়ারু আ'লামিন নুবালা : ১/৩৬
৩৯. কিরাআত ও তাজবিদ-শাস্ত্রজ্ঞ
৪০. সিয়ারু আ'লামিন নুবালা: ১২/৬১৩-৬১৫
৪১. সুরা আন-নামল: ৪৪
৪২. সিয়ারু আ'লামিন নুবালা: ১৮/১৯৯
৪৩. আল-বিদায়াহ ওয়ান-নিহায়াহ: ১০/১৭৬
৪৪. (কাউকে দেওলিয়া ঘোষণা করা অধ্যায়)- অনুবাদক।

📘 সফলতার জন্য চাই উত্তম পরিকল্পনা > 📄 উপযুক্ত পরিকল্পনা গ্রহণে নীতিমালা ও সতর্কতা

📄 উপযুক্ত পরিকল্পনা গ্রহণে নীতিমালা ও সতর্কতা


যেকোনো পরিকল্পনা গ্রহণের সময় নিম্নের বিষয়গুলোর প্রতি সতর্ক দৃষ্টি রাখা জরুরি:
১. কোনো পরিকল্পনা গ্রহণের সময় ইবাদতের বিষয়টি ভুলে যাবেন না
মানুষের জীবনের মূল লক্ষ্য হলো আল্লাহ তাআলার ইবাদত। তাই কোনো মানুষ যখন কোনো পরিকল্পনা গ্রহণ করবে, তাকে স্মরণ রাখতে হবে যে, সে আল্লাহ তাআলার বান্দা। তার জন্য আল্লাহ তাআলার ইবাদতের বিধানাবলি বাস্তবায়ন আবশ্যক।
আর এ কারণেই প্রতিটি পরিকল্পনা সাজানোর আগে নিজেকে নিজে প্রশ্ন করতে হবে, এই পরিকল্পনাটি কি আমাকে আল্লাহ তাআলার নৈকট্যশীল বানাবে নাকি দূরবর্তী করবে?
তাই আমরা যে সকল পরিকল্পনা গ্রহণ করব, সে সকল পরিকল্পনার ক্ষেত্রে আমরা যেমন অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে পরিকল্পনাটা কতটুকু ফলপ্রসূ, প্রায়োগিক দিক থেকে কতটা ফলপ্রসূ, সামাজিক দিক থেকে কতটুকু ফলপ্রসূ—এসব ফলাফল যেমন আমরা বিবেচনা করব; তেমনই আখিরাতের দিক থেকে এ পরিকল্পনাটা কতটা ফলপ্রসূ—আমরা কি তা ভেবে দেখব না? একজন বুদ্ধিমান ব্যক্তি আখিরাতকে ক্ষতিগ্রস্ত করবে এবং আল্লাহ তাআলা থেকে দূরে সরিয়ে দেবে-এমন পরিকল্পনা গ্রহণ করবে না।
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আমাদের এমন একটি পরিকল্পনার পথনির্দেশ করেছেন, যা নিয়ে প্রত্যেক যুবকই চিন্তিত থাকে। আর সেটি হলো বিয়ের বিষয়। বিয়ের বিষয়ে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কনে পছন্দ করার মাপকাঠিটি স্পষ্ট বর্ণনা করেছেন। যে বিয়ে করতে চায়, সে এর ওপর আমল করবে। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন :
تُنْكَحُ الْمَرْأَةُ لِأَرْبَعِ: لِمَالِهَا، وَلِحَسَبِهَا، وَلِجَمَالِهَا، وَلِدِينِهَا، فَأَظْفَرْ بِذَاتِ الدِّينِ تَرِبَتْ يَدَاكَ
'নারীকে বিবাহ করা হয় চারটি বিষয় দেখে। তার সম্পদের কারণে, তার বংশমর্যাদার কারণে, তার সৌন্দর্যের কারণে এবং তার দ্বীনদারির কারণে। অতএব তুমি দ্বীনদার মেয়ে বিবাহ করে সুখী ও সফল হও। (অন্যথায়) ধুলোয় ধূসরিত হোক তোমার উভয় হাত। '৪৫
আমাদের পরিকল্পনায় আমরা অনেকেই ইবাদতের দিকটি সম্পর্কে গাফিল থাকি। কোনো পরিকল্পনা গ্রহণের সময় এই দিকটি আমাদের স্মৃতিতে অবশ্যই উপস্থিত থাকা চাই। একাধিক প্রকল্পের মাঝে একটির ওপর অন্যটিকে প্রাধান্য দেওয়ার সময়ও এই বিষয়টি মস্তিষ্কে রাখা চাই। একজন মুসলিমের পার্থিব প্রতিটি কাজে ইবাদতের একটি দিক থাকে। বিয়ের ক্ষেত্রে ইবাদতের দিক হলো, নিজেকে পবিত্র রাখা এবং হারামে লিপ্ত না হওয়া। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন : وَفِي بُضْعِ أَحَدِكُمْ صَدَقَةً 'তোমাদের কারও (স্ত্রীর সাথে) সহবাসেও রয়েছে সদাকার সাওয়াব। ৪৬
যে ব্যক্তি কোনো অর্থনৈতিক প্রকল্প নিয়ে চিন্তা করে, সেও এর মাধ্যমে ইবাদতের নিয়ত করতে পারে। যেমন কেউ কোনো কোম্পানি বা প্রতিষ্ঠান গড়ে তোলার পরিকল্পনা করল। তার উদ্দেশ্য হলো, যেন এর মাধ্যমে লাভবান হতে পারে। এর মাধ্যমে যেন তার হালাল রুজির ব্যবস্থা হয়। হারাম উপার্জন থেকে বেঁচে থাকতে পারে। তো এটাই ইবাদতের দিক।
আর যিনি মিডিয়া-প্রকল্প গ্রহণ করবেন। যেমন: সাংবাদিকতা, কোনো চ্যানেল গড়ে তোলা অথবা কোনো ওয়েবসাইট তৈরি করা। এ ক্ষেত্রে তার লক্ষ্য থাকবে, মানুষকে প্রকৃত তথ্য ও বাস্তবতা অবহিত করা; ভালো কিছুর প্রচার এবং মন্দ প্রতিরোধ করা। আর এটাই তার মিডিয়া-প্রকল্পের ইবাদতের দিক।
আর যার সামাজিক কোনো প্রকল্পের ইচ্ছা। যেমন: এতিম সন্তানদের জন্য কোনো দাতব্য প্রতিষ্ঠান খোলা। অথবা পারিবারিক কোনো সমাবেশ-স্থল চালু করা। কিংবা বিনোদন অথবা অনুষ্ঠানের জন্য কোনো প্রতিষ্ঠান করা। অথবা এ ধরনের অন্য কোনো সামাজিক প্রকল্প চালু করা। তবে তার এ পরিকল্পনারও ইবাদতগত দিক রয়েছে।
বলা যায়, আমাদের প্রতিটি পরিকল্পনারই একটি ইবাদতগত দিক রয়েছে। চাই পরিকল্পনাটি সম্পূর্ণ দ্বীনি বিষয়ে হোক বা স্রেফ পার্থিব বিষয়েই হোক। মানুষ সর্বাবস্থায় আল্লাহ তাআলার বান্দা। সবকিছুতেই সে আল্লাহর বন্দেগি ও দাসত্বের মর্ম ফুটিয়ে তুলবে।
২. সক্ষমতা ও সম্ভাব্যতার প্রতি লক্ষ রাখা। সক্ষমতার ওপর ভিত্তি করে পরিকল্পনা নির্ধারণ করা
এ নীতিটি খেয়াল রাখলে পরিকল্পনাটি সামর্থ্যের বাইরে গিয়ে বিশাল আকার ধারণ করবে না। তাই গৃহীত পরিকল্পনাটি বাস্তবায়ন সম্ভব হবে কি না, তা ভেবে দেখতে হবে। উদাহরণস্বরূপ, আমরা যদি একটি বাণিজ্যিক প্রকল্প চালু করতে চাই, তবে আমাদের অর্থের পরিমাণের দিকে তাকাতে হবে। এ বাণিজ্যিক প্রকল্পের জন্য যথেষ্ট অর্থের জোগান থাকতে হবে। এরপর এ অর্থের পরিমাণের ওপর ভিত্তি করে কাজের পরিধি নির্ধারিত হবে।
অথবা মনে করুন, আপনি একটি চাকরির আবেদন করতে চাচ্ছেন। সে জন্য আপনাকে প্রথমে শিক্ষাগত যোগ্যতা ও আপনার অভিজ্ঞতার প্রতি লক্ষ করতে হবে। এর ভিত্তিতেই কাজের ডিপার্মেন্ট ও পদ নির্ধারিত হবে। তাই আপনাকে এর ওপর ভিত্তি করেই চাকরির জন্য আবেদন করতে হবে।
অনেক সময় এমন হয় যে, আপনি নিজের জন্য কিছু নির্ধারণ করে নিলেন। যেমন : দৈনিক কুরআনের পারার এক-চতুর্থাংশ মুখস্থের সিদ্ধান্ত নিলেন। কিন্তু আপনার মুখস্থ-শক্তি চার লাইনও অতিক্রম করে না। অথবা মনে করুন, আপনি দশটি স্থান ভ্রমণের লক্ষ্য নির্ধারণ করলেন। কিন্তু দুটি ভ্রমণের জন্যও যথেষ্ট অর্থ আপনার নেই! তাই পরিকল্পনার সময় সামর্থ্য ও সম্ভাবনার দিকটি মনে রাখতে হবে।
বিপরীতে কোনো কিছু বৃথা নষ্ট করা থেকে সতর্কর্তা গ্রহণ করতে হবে। যখন বড় ও শক্তিশালী কোনো পরিকল্পনা গ্রহণ করা সম্ভব, তখন উপকরণ ও উপস্থিত সক্ষমতাকে নিশ্চল করে রাখা যাবে না। একেবারেই ছোট কোনো পরিকল্পনা গ্রহণ করা যাবে না। যেমন: আমরা কারও কাছ থেকে প্রতিদিন পনেরো মিনিট কুরআন তিলাওয়াত কামনা করলাম; অথচ এর চেয়েও বেশি সামর্থ্য আছে তার।
তাই আকাশকুসুম পরিকল্পনা বা সক্ষমতার চেয়েও নিম্নমানের পরিকল্পনা- উভয়টিই সময় বিনষ্ট করা ও শক্তি অপচয় করার অন্তর্ভুক্ত।
যে পরিকল্পনা সুপ্ত প্রতিভার বিকাশ ঘটায়, সেটিই হলো উপযুক্ত পরিকল্পনা । যা ব্যক্তির কাছে থাকা উপকরণ কাজে লাগাতে সাহায্য করে, সেটিই উপযুক্ত পরিকল্পনা। যার বাস্তব প্রয়োগ সম্ভব হয়। যেমন রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন :
اكْلَفُوا مِنَ الْأَعْمَالِ مَا تُطِيقُونَ
'সামর্থ্য অনুযায়ী কাজের দায়িত্ব গ্রহণ করো। '৪৭
অর্থাৎ তোমরা যে কাজ সব সময় অবিচলতার সাথে করতে পারবে, তার দায়িত্ব গ্রহণ করো। কখনো করবে, কখনো করবে না—এমনটা যেন না হয়। ৪৮
খলিল বিন আহমাদ আল-ফারাহিদি রহ. বলেন, 'আমার কাছে এক লোক ছন্দশাস্ত্র শেখার জন্য বারবার আসা-যাওয়া করতে লাগল। অথচ সে ছিল দুর্বল মেধার। কিছু কাল আমার কাছে থেকেও কিছুই সে মনে বসাতে পারল না। একদিন আমি তাকে বললাম, 'এই কবিতাটি বিশ্লেষণ করো!'
إذا لم تستطع شيئا فدعه * وجاوزه إلى ما تستطيع
“যখন কোনো বিষয়ে তোমার সামর্থ্য নেই, তা ছেড়ে দাও এবং এড়িয়ে চলো। আর যা করতে সক্ষম তা করো।”
এরপর সে আমার সাথে তার জ্ঞানমাফিক ছন্দ নিয়ে বিশ্লেষণ শুরু করল। অতঃপর উঠে চলে গেল। আর কখনো সে আমার কাছে আসেনি। কবিতার এ দুছত্র দিয়ে আমি তাকে মূলত বাড়িতে চলে যাওয়ার জন্য বলেছিলাম। আমি আশ্চর্যান্বিত হলাম তার দুর্বল বোধশক্তি সত্ত্বেও আমি কবিতা দিয়ে যা উদ্দেশ্য নিয়েছি, তা সে বুঝতে পেরেছে। ১৪৯
৩. নিজের জন্য উপযোগী পরিকল্পনা জেনে নিন
পরিকল্পনা অনেক ধরনের হয়। বিভিন্ন প্রকারের হয়। সুতরাং আপনি নিজের উপযোগী পরিকল্পনা গ্রহণ করুন।
قَدْ عَلِمَ كُلُّ أُنَاسٍ مَّشْرَبَهُمْ
'তাদের সব গোত্রই চিনে নিল নিজ নিজ ঘাট। '৫০
وَلِكُلِّ وِجْهَةٌ هُوَ مُوَلِّيهَا
'আর প্রত্যেকের রয়েছে একটি দিক, যে দিকে সে মুখ করে (ইবাদত করে)। ৫১
নেক নিয়তের সাথে আল্লাহ তাআলার নিকট তাওফিক ও সাহায্য কামনার পর উপযুক্ত পরিকল্পনা গ্রহণ করা এবং ব্যক্তির নিজের জন্য উপযোগী পরিকল্পনা গ্রহণ করা সফলতা অর্জনে সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ বিষয়।
কোনো ব্যক্তি নিজের উপযোগী বিষয় সম্পর্কে জানার জন্য সব বিষয়ে দক্ষ হওয়া জরুরি নয়। ইউসুফ আ. নেতৃত্বের ব্যাপারে নিজের সক্ষমতার কথা জানতেন; তাই তিনি তা চেয়েছেন।
قَالَ اجْعَلْنِي عَلَى خَزَائِنِ الْأَرْضِ إِنِّي حَفِيظٌ عَلِيمٌ
'সে (ইউসুফ) বলল, "আমাকে দেশের ধনভান্ডারে নিযুক্ত করুন। আমি বিশ্বস্ত রক্ষক ও অধিক জ্ঞানবান। '৫২
অথচ নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আবু জার রা.-কে নেতৃত্ব দেওয়ার ব্যাপারে নেতিবাচক উত্তর দিয়েছেন।
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সাহাবিদের প্রতি লক্ষ করুন! তাঁরা একজন অপরজন থেকে বিভিন্ন বিষয়ে পৃথক বৈশিষ্ট্যের অধিকারী ছিলেন। তারা কেউ কেউ ছিলেন জিহাদের বৈশিষ্ট্যে বৈশিষ্ট্যবান। কেউ ছিলেন ইলমে বিশেষ পাণ্ডিত্যের অধিকারী। কেউ আবার বিশেষ কোনো শাস্ত্রে দক্ষ ছিলেন। কেউ দান ও বদান্যতায় ছিলেন বিশেষ বৈশিষ্ট্যের অধিকারী। এভাবে প্রত্যেকেই বিশেষ বিশেষ কিছু বৈশিষ্ট্যের অধিকারী ছিলেন।
৪. আপনি যে পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে চাচ্ছেন, তার জন্য নির্ধারিত সময়টি যথেষ্ট হওয়া
কেননা, ভালো পরিকল্পনা বাস্তবায়নে প্রধান প্রতিবন্ধকতা হলো, কাজটি পূর্ণতার জন্য যথেষ্ট সময় না রাখা। যেমন: কেউ মাধ্যমিক শিক্ষা সমাপ্তের পর এক বছরের ভেতর চিকিৎসাশাস্ত্রে বিশেষজ্ঞ হওয়ার সার্টিফিকেট অর্জন করতে চাইল। অথচ এত কম সময়ে এটি অর্জন করা সম্ভব নয়।
আর যে প্রকল্পটি কম সময়ে বাস্তবায়ন সম্ভব, সেখানে অধিক সময় ব্যয় করাও ব্যর্থতা। যেমন: কারও জন্য বিশ্ববিদ্যালয় থেকে চার বছরের ভেতর বের হওয়া সম্ভব। কিন্তু সে অলসতা করে, দীর্ঘসূত্রতা করে করে সময় পার করল, দেরি করতে থাকল। অবশেষে তার এই কোর্সটি আট বছরে বাস্তবায়ন সম্ভব হলো! বিয়ের জন্য যে দশ বছর যাবৎ অপেক্ষা করে, তার বিষয়টিও একই রকম।
এখানে সবচেয়ে ভয়াবহ ক্ষতি হচ্ছে সময় বিনষ্টের ক্ষতি। এটা এমন ক্ষতি যার কোনো মাশুল হয় না। জ্ঞানী ও বুদ্ধিমানদের নিকট সময়ের এমনই মূল্য, যার সামনে সম্পদ ও টাকার মূল্য তুচ্ছ।
৫. আপনি যে প্রকল্প বাস্তবায়ন করতে চাচ্ছেন, তার লক্ষ্য-উদ্দেশ্য শরয়িভাবে বৈধ হতে হবে
শরয়িভাবে সম্ভব এমন প্রকল্প অনেক আছে। অক্ষমদের ওপরই শুধু জীবন সংকীর্ণ হয়ে ওঠে। মাছের পেটে থেকেও ইউনুস আ. অকর্মণ্য থাকেননি। তিনি সেখানেও তাসবিহ পাঠে রত ছিলেন। কিছু পরিকল্পনা আছে, যা বাস্তবায়ন ও পূর্ণতা দান করার প্রতি আগ্রহী হওয়া বৈধ। আবার কিছু আছে, যার জন্য প্রচেষ্টা ব্যয় করা বা তা নিয়ে চিন্তা করা বৈধ নয়। সম্পদ উপার্জনে চেষ্টা করা, জীবন উপভোগ ও সৎ পথে ব্যয় করার উদ্দেশ্যে আর্থিক উন্নতি সাধন করা বৈধ পন্থায় হতে পারে। যেমন : ব্যবসা, চাষাবাদ, কারিগরি পেশা ইত্যাদি। আবার তা অবৈধ পন্থায়ও হতে পারে। যেমন : ঘুষ, সুদ, ধোঁকা-প্রতারণা, মাদক ও নেশাজাতীয় বস্তু বিক্রয় করা ইত্যাদি। কিন্তু কোথায় মাটি আর কোথায় সুরাইয়া তারকা!
প্রথম জন সম্পদ উপার্জন করেছে হালাল পদ্ধতিতে। এটি তার জন্য দুনিয়ার জিন্দেগিতে সফলতা এবং আখিরাতের জিন্দেগিতে মুক্তির মাধ্যম হবে, যদি সে তা উত্তমভাবে ব্যয় করে থাকে। আর দ্বিতীয় জন সম্পদ উপার্জন করেছে হারাম পদ্ধতিতে। এটা তার জন্য দুনিয়াতে হতভাগ্যতা এবং আখিরাতে কষ্টকর আজাবের কারণ হবে।
আরেকটি উদাহরণ হলো, একজন ক্লাসে ভালো রেজাল্ট করতে চায়। তাই সে ভালোভাবে পড়াশুনা করে, চেষ্টা-সাধনা চালিয়ে যায়। আল্লাহ তাআলার নিকট সাহায্য ও আশ্রয় কামনা করে। এর ওপর ভরসা করার পর নিজের ব্যাপারে আস্থা রেখে সফল হতে চায়। অন্যদিকে আরেকজন সফল হতে চায়; কিন্তু প্রতারণা, ধোঁকা ও অন্য সাথিদের ওপর ভরসা করে, সাথিদের থেকে দেখে দেখে লেখার পাঁয়তারা আঁটে।
-- উভয় ব্যক্তি কি একরকম?!
নিন্দনীয় পরিকল্পনার একটি হলো শিল্পী হতে চাওয়া, অনেকে আবার চায় অভিনেতা-অভিনেত্রী হতে বা গায়ক হতে।
তাদের কেউ কেউ বলবে, আমি দুনিয়াতে শুধু এই জিনিসটিই চাই যে, আমি সবচেয়ে বড় সুরকারের পুরস্কার গ্রহণ করব; তারপর চলে আসব। এটাই তার জীবনের লক্ষ্য। তার জীবন-মরণ শুধু এই উদ্দেশ্য বাস্তবায়ন ও এই পরিকল্পনাটি পূর্ণতা দান।
আপনার পরিকল্পনাটি সবচেয়ে শ্রেষ্ঠ ও বড় পরিকল্পনা কখন হবে? তখনই হবে যখন আপনার পরিকল্পনাটি এমন হবে, যার জন্য একজন মুসলিম পৃথিবীতে বেঁচে থাকে। হ্যাঁ, সে পরিকল্পনাটি হচ্ছে, আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টি অর্জন করে মহাসফলতা অর্জন করা।
এক লোকের কাছে তার স্ত্রী তালাক চাইল। তেলাপোকা-ঝিঁঝিপোকা নিয়ে সে লোকের বিশেষ গবেষণা ছিল। প্রত্যেক পারিবারিক ভ্রমণে সে বিষয়টি নিয়ে বিস্তারিত আলোচনা করতে পীড়াপীড়ি করত। কিন্তু স্ত্রী এটা সহ্য করতে পারছিল না। তাই স্ত্রী তার কাছে তালাক চেয়ে বসল।
৬. পরিকল্পনাটি সুস্পষ্টভাবে নির্ধারিত থাকতে হবে
পরিকল্পনাতে কোনো অস্পষ্টতা বা সন্দেহ থাকতে পারবে না। কারণ, অনির্ধারিত লক্ষ্য বা অস্পষ্ট উদ্দেশ্য উদ্দিষ্ট গন্তব্যে পৌঁছতে অক্ষম করে দেয় এবং ভ্রান্তিতে ফেলে দেয়।
এক পশ্চিমা বলেছিল, 'আমার কাছে ছয়জন বিশ্বস্ত সেবক আছে। তাদের কাছ থেকে আমি আজ যা জানি, তা শিখেছিলাম। সে সেবকদের নাম হলো, কী? কেন? কখন? কীভাবে? কোথায়? কে বা কার?
তুমি পরিকল্পনার মাধ্যমে কী চাও?
কেন তুমি এই পরিকল্পনা করার ইচ্ছা করলে?
কখন তোমার এ পরিকল্পনা শুরু করবে এবং কখন শেষ করবে?
কেমন হবে পরিকল্পনা বাস্তবায়নের মাধ্যম ও উপকরণ?
পরিকল্পনাটি কোথায় প্রতিষ্ঠিত হবে?
কাদের অভিজ্ঞতা থেকে তুমি এই প্রকল্পে সাহায্য গ্রহণ করবে?
এভাবেই এই প্রশ্নগুলো করতে হবে। কী? কেন? কখন? কোথায়? কীভাবে এবং কে বা কার?
নিজের অবস্থান পরিবর্তন করতে চাইলে অনেক পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে এবং দৃঢ়ভাবে করতে হবে। কখনো কখনো বিষয়টির জন্য পঠন, দীর্ঘ অধ্যয়ন, অনুসন্ধান ও পরার্মশের প্রয়োজন পড়বে। এরপরই সে স্পষ্ট লক্ষ্য নির্ধারণে সক্ষম হবে।
যেমন কেউ একটি ভার্সিটি থেকে সনদ নিয়ে বের হবে। কিন্তু সে এখনো তার ভবিষ্যৎ লক্ষ্য স্থির করেনি। এটাও নির্ধারণ করেনি যে, কোন প্রতিষ্ঠানে সে পাঠদান করবে। কখন থেকে শুরু করবে। এভাবে লক্ষ্য স্থির ও স্পষ্ট না থাকার কারণে তার লক্ষ্যে পৌঁছা কঠিন হয়ে যাবে।
কেউ নিজের চাকরি পরিবর্তন করতে চাইল এবং সে বিষয়টিকে এখানেই ক্ষান্ত করে দিল। অথবা শুধু সফর করতে চাইল এবং এতটুকুই। নিজের গন্তব্য নির্ধারণ করল না অথবা সফরের মাধ্যমে যে কাজটি করতে চাচ্ছে তার ধরনও নির্ধারণ করল না।
অনেক সময় আপনি বলবেন, আমি পড়ার ইচ্ছা করেছি। কিন্তু যে কিতাবগুলো পাঠ করবেন, তা নির্ধারণ করলেন না। অথবা বললেন, আমি কোনো সামাজিক বা দাতব্য প্রতিষ্ঠানে কাজ করতে চাই। কিন্তু আপনার এই সক্রিয় অংশগ্রহণ কোন ক্ষেত্রটিতে হবে, তা নির্ধারণ করলেন না। আপনি কি এতিমের দেখাশুনা করবেন নাকি হিফজখানার দায়িত্ব গ্রহণ করবেন? না কাউকে কোনো সাহায্যকরণে চেষ্টা করবেন? না অন্য কিছু করবেন?-এমন প্রশ্নের নির্দিষ্ট কোনো উত্তর নির্ধারণ করলেন না। তবে আপনার পরিকল্পনাটি সফল হবে না।
সুতরাং পরিকল্পনাটি সুস্পষ্ট থাকা আবশ্যক। পরিকল্পনাটি এলোমেলো না হয়ে সুনির্ধারিত থাকতে হবে; যেন বাস্তবায়নে কষ্টকর না হয়ে দাঁড়ায়। নিজের লক্ষ্য স্পষ্টরূপে নির্ধারণ করতে আপনাকে বিস্তারিতভাবে গবেষণা করতে হবে। আপনার পরিকল্পনাটি যেন এমন হয় যে, সবকিছু সফলভাবে বাস্তবায়িত হয়ে আপনার হাতের সামনেই আছে।
৭. পরিকল্পনাটি অধিক উপকারী হওয়া ও অন্য পরিকল্পনা থেকে উত্তম হওয়া
কখনো কখনো মানুষ এমন অনেক লক্ষ্য বাস্তবায়নের চেষ্টা করে, যার সকল পূর্বশর্তও বিদ্যমান আছে, কিন্তু আদৌ তার এমন পরিকল্পনা বাস্তবায়নের প্রয়োজনই নেই। বরং তার প্রয়োজন অন্য কোনো পরিকল্পনা, যা তার জন্য আরও উপকারী হবে। যেমন: কেউ অবকাশের দিনগুলো কাটানোর জন্য একটি বিশ্রামাগার বানাতে চায়। এ সামান্য কয়েকদিনের বিশ্রামের জন্য তো সে এমন কোনো ঘর বানাবে না, যেখানে পুরো বছর কাটানো যায়। বরং এ জন্য বড়জোর সে ছোট একটি তাঁবু খাটাবে।
তেমনই এমন কিছু পরিকল্পনা আছে, যার কোনো উপকারিতা বা ফলাফল নেই। যেমন : ডাকটিকেট কিংবা মুদ্রা সংগ্রহ করা-এমন পরিকল্পনা পরিহার করতে হবে।
আর কিছু আছে বৈধ। যেমন: ফুটবল খেলা, পত্র-পত্রিকা পাঠ করা, বন্ধু-বান্ধবদের সাথে সাক্ষাৎ করা, ভ্রমণ, বৈধ চিত্র অঙ্কন ইত্যাদি।
কিছু পরিকল্পনা আছে মুস্তাহাব। যেমন: সাঁতার শেখা ও নিক্ষেপণ বিদ্যা ইত্যাদি শিক্ষা করা।
কিছু আছে ওয়াজিব পরিকল্পনা। যেমন : বিয়ে করা।
এভাবেই মানুষের জন্য উত্তম ও অনুত্তমের শৃঙ্খলা বজায় রাখা আবশ্যক। যদি উত্তম-অনুত্তমের মাঝে তালগোল পাকিয়ে ফেলা হয়, তবে যেটা বিলম্বের সেটাকে আগে নিয়ে আসা হতে পারে; যেটা আগে আসার কথা সেটাকে পিছিয়ে নিয়ে যাওয়া হতে পারে।
অনেক সময় এমন স্বভাবের মানুষ ছোটো-খাটো তুচ্ছ-নগণ্য কাজে লিপ্ত হয়ে থাকতে পারে। অথচ তার পক্ষে অন্য কাজ করাও সম্ভব ছিল। তার পক্ষে এমন কোনো নিদর্শন স্থাপন করাও সম্ভব ছিল, যার উপকারিতা দুনিয়া ও আখিরাতে সেও পাবে এবং অন্যরাও পাবে। কিন্তু সে ছোট-খাটো তুচ্ছ-নগণ্য কর্মে লিপ্ত!
إذا غامرت في أمر مروم " فلا تقنع بما دون النجوم
'যখন তুমি বিশাল কোনো কাজের সাহস করেছ, তখন তার চেয়ে নিম্নের কিছুতে সন্তুষ্ট হয়ো না।'
মানুষের জন্য নিজের পরিকল্পনা নির্ধারণ করা ও তা বাস্তবায়নে প্রবল আগ্রহী হওয়া এবং উচ্চপদ অর্জনে সচেষ্ট হওয়া আবশ্যক। আমাদের জীবন সীমাবদ্ধ এবং সুযোগও বারবার আসে না। যে ব্যক্তি নিজের জীবনকে ছোট-খাটো ও তুচ্ছ বিষয়ে ব্যস্ত রাখে এবং এভাবে জীবন ক্ষয় করতে থাকে, তার স্বরূপ যেন সে নিম্ন ভূমিতে বসবাস করছে। তার পক্ষে সফলতার চূড়ান্ত ও সর্বোচ্চ পর্যায়ে উন্নতি সাধন করা সম্ভব নয়।
উদাহরণত যখন একজন ছাত্র তার উচ্চ মেধার মাধ্যমে উপকৃত হয়। মাধ্যমিক শিক্ষা থেকে ভালো ফলাফল অর্জন করে বের হয়। তার কাছে এমন যোগ্যতা থাকে, যা দিয়ে সে ডক্টরেট ডিগ্রি অর্জন করতে পারে। কিন্তু সে তার মাধ্যমিক শিক্ষার ওপরই সন্তুষ্ট হয়ে গেল এবং ছোট-খাটো কোনো চাকরির সন্ধান করতে লাগল। আর এভাবে সে নিজের যোগ্যতাকে গলা টিপে হত্যা করল। তার সম্ভাবনাগুলোকে জ্যান্ত কবর দিয়ে দিল। এর কারণ, তার লক্ষ্য ছিল ছোট এবং প্রত্যাশা ছিল সীমিত। তাই আমাদের গ্রহণ করতে হবে সবচেয়ে উত্তম ও সবচেয়ে উপকারী পরিকল্পনাটি।
৮. পরিকল্পনা বাস্তবায়নে সফলতা অর্জনের একটি মাধ্যম হলো, নিজের পরিকল্পনা এমন লোকদের থেকে গোপন রাখা, যাদের অবহিত করার কোনো প্রয়োজন নেই
যেমন হাদিসে বর্ণিত হয়েছে :
اسْتَعِينُوا عَلَى إِنْجَاحِ حَوَائِجِكُمْ بِالْكِثْمَانِ
'গোপনীয়তা অবলম্বনের মাধ্যমে তোমরা তোমাদের প্রয়োজন পূরণে সাহায্য কামনা করো। ৫৩
যদি কেউ নিজের গোপনীয়তা রক্ষা করতে অক্ষম হয়, তবে তার বিষয়টি ছড়িয়ে পড়লে অন্য কাউকে সে দুষতে পারবে না; বরং এ জন্য সে নিজেই দোষী হবে। গোপনীয়তা রক্ষা না করার কারণে কত পরিকল্পনাই না ভেস্তে গেছে বা তার বাস্তবায়ন ব্যর্থ হয়েছে অথবা চুরি হয়ে গেছে তার কর্মপ্রণালি!
৯. দ্রুত সম্পন্ন করা
যদি তুমি কোনো বিষয়ের ইচ্ছা করে থাকো, তবে দ্রুত সম্পন্ন করে ফেলো। আর যদি দৃঢ় সংকল্প করে থাকো, তবে অবিচল থাকো। মনে রেখো, যে পেছনের সারিতে পড়ে থাকতে চায়, সে গর্বের পাত্র হয় না। তাই প্রত্যেক মুসলিম যেন নিজের মাঝে ও কাঙ্ক্ষিত বিষয়ের মাঝে বাধা আসার আগেই সাধ্যমতো নিজের পরিকল্পনা স্থির ও তা বাস্তবায়ন সম্পন্ন করে নেয়।
إذا كنت ذا رأي فكن ذا عزيمة * فإن فساد الرأي أن تترددا
وإن كنت ذا عزم فأنفذه عاجلا * فإن فساد العزم أن يتقيدا
‘তুমি যদি চিন্তাশীল ব্যক্তি হও, তবে দৃঢ়প্রত্যয়ী হয়ে যাও। কেননা, দ্বিধা-দ্বন্দ্বের কারণে চিন্তাশক্তি বিফলে যায়।
আর যদি তুমি দৃঢ়প্রত্যয়ী হও, তবে দ্রুতই তা বাস্তবায়ন করে নাও। কারণ, দৃঢ় সংকল্প অকার্যকর থাকে বিলম্বের কারণে।'
আবু হুরাইরা রা. থেকে বর্ণিত, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন:
بَادِرُوا بِالأَعْمَالِ سَبْعًا هَلْ تُنْظَرُونَ إِلَّا إِلَى فَقْرٍ مُنْسٍ، أَوْ غِنًّى مُطْعٍ، أَوْ مَرَضِ مُفْسِدٍ، أَوْ هَرَمِ مُفَنَّدٍ، أَوْ مَوْتِ مُجْهِرٍ، أَوِ الدَّجَّالِ فَشَرُّ غَائِبِ يُنْتَظَرُ، أَوِ السَّاعَةِ؟ فَالسَّاعَةُ أَدْهَى وَأَمَرُّ
'সাতটি বিষয় আসার আগেই আমল করে নাও! তোমরা কি প্রতীক্ষায় আছ শুধু আত্মভোলা দারিদ্র্য, অহংকারপূর্ণ ধনাঢ্যতা, সর্বনাশা ব্যাধি, ধ্বংসকারী বার্ধক্য, প্রস্তুত মৃত্যু অথবা দাজ্জালের? অদৃশ্যের অনিষ্টতা অপেক্ষা করছ অথবা কিয়ামতের? কিয়ামত হচ্ছে অধিক ভয়াবহ ও অধিক তিক্তকর। '৫৪
فبادر إذا ما دام في العمر فسحة * وعدلك مقبول وصرفك قيم
وجد وسارع واغتنم زمنَ الصّبا " ففي زمن الإمكان تسعى وتغنم
'সুতরাং তুমি কাজের প্রতি ধাবিত হও যতক্ষণ জীবনে সুযোগ আছে; যতক্ষণ তোমার ইনসাফ গৃহীত হয় এবং তোমার ব্যয় মূল্যমান আছে। পরিশ্রম-সাধনা করো এবং দ্রুত চলো। শৈশবকে গনিমত মনে করো। তাহলে সামর্থ্যকালে চেষ্টা দ্রুত ও ফলদায়ক হবে।'
তাই পরিকল্পনা দ্রুত সম্পন্ন করুন। হয়তো উপযুক্ত সময় চলে যাচ্ছে।
১০. পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য শর্ত হলো একটি নির্দিষ্ট রূপরেখা থাকা
পরিকল্পনাটি যতই ভালো, শরিয়তসম্মত, সম্ভবপর ও নির্ধারিতই হোক না কেন-কিন্তু তা বাস্তবায়নের কোনো পদ্ধতি না থাকলে, সে পরিকল্পনা কেবল চিন্তা ও আশাই থেকে যায়। চিন্তা ও আশা থেকে এ পরিকল্পনাকে বাস্তবায়নের জন্য অবশ্যই একটি রূপরেখা থাকতে হবে।
এখানে এসে জীবন নিয়ে আন্তরিক ও কঠোর পরিশ্রমী মানুষজন এবং জীবন নিয়ে খেল-তামাশায় মত্ত ব্যক্তিদের পথ আলাদা হয়ে যায়।
দৃঢ় সংকল্পকারীদের লক্ষ্য এমনভাবে নির্ধারিত, যা বাস্তবায়ন ও অর্জনের পেছনে দৃঢ় চিন্তা ও যথাযথ প্রস্তুতি কাজ করে। তারা বাস্তবায়নের কাঠামো ও রূপরেখা প্রস্তুত করে রাখেন। দূর ও নিকটের উপকরণসমূহ তৈরি রাখেন। কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্য অর্জনের পথে কী কী বাধা আছে, তা তারা জেনে নেন। আর কীভাবে এসব প্রতিবন্ধকতা কেটে উঠা যাবে এবং সেগুলোর ওপর বিজয়ী হওয়া যাবে, সেগুলোর পথ ও পন্থাও তারা বের করে নেন।
আর গড়িমসি ও টালবাহানাকারীদের নিকট অধিকাংশ লক্ষ্যই হয় কেবল খেয়ালিপনাপ্রসূত। আর এ কারণেই আপনি তাদের পরিকল্পনা বাস্তবায়নে কোনো পদক্ষেপ গ্রহণ করতে দেখবেন না।
উদাহরণত কেউ দুবছরের মধ্যে ভবন নির্মাণের পরিকল্পনা গ্রহণ করল। তবে তাকে এই লক্ষ্যে পৌঁছাতে রূপরেখা তৈরি করতে হবে। যে রূপরেখায় থাকবে-পর্যাপ্ত অর্থের ব্যবস্থা করা, উপযুক্ত জমিন খুঁজে বের করা, ইঞ্জিনিয়ারিং ডিজাইন তৈরি করা, কন্ট্রাক্টরের সাথে চুক্তি করা, প্রয়োজনীয় উপকরণসমূহ ক্রয় করা। আর এসবই করতে হবে খুব সূক্ষ্ম পদক্ষেপ গ্রহণের মাধ্যমে এবং বিস্তারিতভাবে জেনে জেনে।
এমন পরিকল্পনা ও রূপরেখা নিয়ে আগুয়ান ব্যক্তির মাঝে এবং সে ব্যক্তির মাঝে বিশাল পার্থক্য রয়েছে, যে বসবাসের জন্য শুধু একটি গৃহ খোঁজে; এরপর আর বেশি কিছু চিন্তা করতে সে রাজি থাকে না।
কেউ যদি একটি গ্রন্থ রচনার ইচ্ছা করে, তবে তাকে অবশ্যই বিষয়বস্তু নির্ধারণ করতে হবে। তারপর প্রাথমিকভাবে উৎসমূলের ব্যাপারে বিস্তর গবেষণা করতে হবে। এরপর সেই বইয়ের অধ্যায়গুলো—আলোচনা, উদাহরণ, মাসআলার পরিচ্ছেদসমূহ ইত্যাদি প্রণয়নের একটি পরিকল্পনা গ্রহণ করতে হবে।
অন্যদিকে ব্যবসায়িক প্রকল্পের জন্য একটি ফলপ্রসূ অর্থনৈতিক রূপরেখা নির্ধারণ করতে হবে। রূপরেখাটি হবে এমন যে, প্রস্তাবিত পরিকল্পনার জন্য সব ধরনের তথ্য সংগ্রহ ও সংরক্ষণ করতে হবে। আর এখান থেকে বাস্তবায়ন সম্ভাবনা, বিপদাশঙ্কা ও প্রকল্পের সফলতার সম্ভাবনা কতটুকু— তা সমাধান করতে হবে।
এবং পরবর্তী সময়ে জানতে হবে যে, এই পরিকল্পনায় সফলতার মাধ্যম কী কী। তার ক্ষতি হবার কারণগুলো কী কী। সাথে সাথে এসব আঞ্চলিক মার্কেট ও তার চাহিদার সাথে মিলিয়ে নিতে হবে। এই পর্যায়ে এসে আঞ্চলিক মার্কেট এবং তার চাহিদা ও প্রয়োজনীয়তার ওপর গবেষণা- কার্যক্রম চালাতে হবে।
দ্বীনি বা দুনিয়াবি যেকোনো পরিকল্পনা-ই বাস্তবায়ন করতে গবেষণা, অধ্যয়ন, পরিকল্পনা, লক্ষ্য স্থির করা ও মাধ্যমসমূহ গ্রহণ করা এবং একটি রূপরেখা তৈরি করা আবশ্যক। এরপর এগুলোর অনুসরণ করে কাজ বণ্টন করা, উত্তম-অনুত্তম বিবেচনা করা ও উপযুক্ত সময় নির্ধারণ করতে হবে। এরপর কাজের ধারাবাহিকতা নির্ধারণ করতে হবে। যার মাধ্যমে পরিকল্পনা ও গবেষণা বাস্তব কাজে রূপ নেবে।
সীমালঙ্ঘনকারীরা নিজেদের তাত্ত্বিক চিন্তা ও পরিকল্পনার মাঝে ডুবে থাকে। এমনকি দিনের পর দিন, মাসের পর মাস চলে যায়, অনেক সময় বছরের পর বছর পেরিয়ে যায়—কিন্তু তারা তাদের তাত্ত্বিক পরিকল্পনা ও গবেষণা নিয়েই পড়ে থাকে।
আবার অবহেলাকারীরা উপকরণ সংগ্রহে অবহেলা করে। কার্যক্রম চালানো ও পরিকল্পনা বাস্তবায়নের পূর্বের পরিকল্পনা-গ্রহণ এবং তাত্ত্বিক পর্যালোচনার স্তরগুলোকে অবহেলা করে। ফলে গোলযোগ ও বিশৃঙ্খলার ওপর দাঁড়ায় তাদের এ রূপরেখা।
১১. ঊর্ধ্ব ও নিম্ন সীমা নির্ধারণ করা
পরিকল্পনার জন্য একটি নিম্ন সীমারেখা ও একটি ঊর্ধ্ব সীমারেখা থাকতে হবে। যেমন : আমাদের কেউ দৈনিক দুই থেকে চার ঘণ্টা কুরআন তিলাওয়াত করবে। অথবা সে তার তিন থেকে পাঁচজন সাথি ভাইয়ের সাথে সাক্ষাৎ করবে। পরিকল্পনার সময় এমন ঊর্ধ্ব ও নিম্ন সীমা নির্ধারণ করতে হবে।
১২. পরিকল্পনা তৈরি ও প্রয়োজনীয় বস্তুগুলো সংগ্রহ এবং বাস্তবায়ন-সময় নির্ধারণ করার পর লক্ষ্যে পৌঁছার জন্য পরিকল্পনা অনুযায়ী কাজ করা
মানুষ তার লক্ষ্যপানে ছুটে চলতে অনেক বাধার সম্মুখীন হয়। এ সকল বাধা তার পরিকল্পনাটি ভালোভাবে ঠিক করে নিতে উৎসাহিত করে। আসল লক্ষ্য অর্জনের জন্য প্রতিটি স্তরে ছোট ছোট লক্ষ্য অর্জনের প্রতি দৃষ্টি দিতে আহ্বান করে।
১৩. পরিকল্পনা পূর্ণ করতে অনড় থাকতে হবে
আপনি দৃঢ় হোন এবং সফলতা অর্জনের জন্য বাধা-বিপত্তির মোকাবেলা করে অবিরাম পথ চলুন। এমনকি যদিও আপনি কিছুক্ষণ পূর্বে বিশাল কোনো কষ্ট পেয়ে থাকেন; তবুও এখন পথ চলতে থাকুন।
وإذا ألح عليك خطب لا تهن" واضرب على الإلحاح بالإلحاح
'যদি কোনো অঘটন তোমার ওপর চাপ সৃষ্টি করে, তবে তুমি হীনবল হয়ো না। বরং চাপকে চাপের মাধ্যমে প্রতিহত করো।'
শুবাহ বিন হাজ্জাজ থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'আমি আমার মায়ের গামলা বিক্রি করলাম দশ দিনারে। '৫৫ তিনি হাদিস অন্বেষণের পরিকল্পনা বাস্তবায়নের জন্য তার মায়ের গামলা বিক্রি করেছিলেন।
বিশিষ্ট হাদিসবিশারদ ইয়াহইয়া বিন মুইনের পিতা মুইন তার ছেলের জন্য মিলিয়নের ওপর দিরহাম রেখে যান। ছেলে সব সম্পদ হাদিস অন্বেষণের পেছনে ব্যয় করে দেন। সবশেষে তার কাছে পরিধান করার মতো এক জোড়া পাদুকাও ছিল না।৫৬
হাফিজ মুহাম্মাদ বিন সাল্লাম আল-বিকান্দি রহ. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'আমি ইলম অর্জনে চল্লিশ হাজার (দিরহাম) খরচ করেছি। চল্লিশ হাজার (দিরহাম) খরচ করেছি ইলম প্রচারে। '৫৭
সুতরাং আপনাকে অটল ও অবিচল থাকতে হবে। পারব কি পারব না, হবে কি হবে না—এমন দুর্বলতা শুরুতেই আপনাকে যেন বাধাগ্রস্ত না করে অথবা চলার পথে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করতে না পারে।
واصل مسيرتك لا تقف مترددًا * فالعمر يمضي والسنون ثوان
'অবিরত পথ চলো এবং থমকে যেয়ো না। কারণ, জীবন চলমান আর বছরগুলো তো কিছু মুহূর্ত।'
১৪. পরিকল্পনা পূরণে রয়েছে বিশেষ এক আনন্দ
এই তো হাফিজ ইবনে হাজার আসকালানি রহ. সহিহুল বুখারির ব্যাখ্যাগ্রন্থ লেখা শুরু করেছেন ৭১৮ হিজরিতে। শেষ করেছেন ৮৪২ হিজরিতে। যেদিন তাঁর এ ব্যাখ্যাগ্রন্থ ফাতহুল বারি লেখা সম্পন্ন করলেন, সেদিন বিশাল এক ভোজসভার আয়োজন করলেন।
তাঁর ছাত্র ইমাম সাখাবি রহ. বলেন :
'তা ছিল একটি অবিস্মরণীয় দিন। আলিম, কাজি, আমির ও সম্মানিত ব্যক্তিদের উপস্থিতিতে এক অনুষ্ঠান হয়েছিল সেদিন! এমন অনুষ্ঠান সে সময়ের মানুষ কখনো আর দেখেনি। কবিগণ সেদিন অনেক গেয়েছিল। সেদিন তাদেরকে স্বর্ণ বণ্টন করা হয়। অনুষ্ঠানে সেদিন ৫০০ দিনারের মতো ব্যয় হয়েছিল। '৫৮

টিকাঃ
৪৫. সহিহুল বুখারি : ৫০৯০, সহিহু মুসলিম: ১৪৬৬
৪৬. সহিহু মুসলিম : ১০০৬
৪৭. সহিহুল বুখারি : ৬৪৬৫
৪৮. হাশিয়াতুস সিনদি আলান নাসায়ি: ২/২৪৭-২৪৮
৪৯. ওয়াফিয়াতুল আইয়ান: ২/২৪৭-২৪৮
৫০. সুরা আল-বাকারা: ৬০
৫১. সুরা আল-বাকারা: ১৪৮
৫২. সুরা ইউসুফ: ৫৫
৫৩. তাবারানি রহ. কৃত আল-মুজামুস সগির : ১১৮৬
৫৪. সুনানুত তিরমিজি: ২৩০৬, হাদিসটি হাসান।
৫৫. সিয়ারু আ'লামিন নুবালা: ৭/২২০
৫৬. সিয়ারু আ'লামিন নুবালা: ১১/৭৭
৫৭. সিয়ারু আ'লামিন নুবালা : ১০/৬৩০
৫৮. আল-জাওয়াহির ওয়াদ-দুরার ফি তারজামাতি শাইখুল ইসলাম ইবনু হাজার: ২/৭০২

📘 সফলতার জন্য চাই উত্তম পরিকল্পনা > 📄 পরিকল্পনা ব্যর্থ হওয়ার কারণসমূহ

📄 পরিকল্পনা ব্যর্থ হওয়ার কারণসমূহ


এখন আমরা পরিকল্পনা ব্যর্থ হওয়ার কিছু কারণ নিয়ে আলোচনা করব। পরিকল্পনায় সফলতার জন্য নিম্নবর্ণিত বিষয়গুলো প্রয়োগ করে দেখা আবশ্যক।
১. হতাশা ও উদ্যমহীনতা
পরিকল্পনায় সফলতার জন্য সবচেয়ে বেশি বিপজ্জনক হলো, দ্রুত হতাশ হওয়া ও বাধা-বিপত্তির সামনে আত্মসমর্পণ করা।
হতাশা আত্মহত্যার শামিল। প্রকৃত মুমিন আল্লাহ তাআলার রহমত হতে নিরাশ হয় না। ব্যর্থতার অভিজ্ঞতার সামনে ভেঙে পড়ে না। বরং সে এ অভিজ্ঞতাকে মূল লক্ষ্যপানে এগিয়ে যেতে প্রস্তুতি ও অবলম্বন হিসেবে গ্রহণ করে। বিজ্ঞানী আই.এম.সিঙ্গার তার জীবনের প্রায় বিশ বছর সেলাই মেশিন আবিষ্কারের পেছনে ব্যয় করে দিয়েছেন। এ দীর্ঘকাল এ মেশিনের জন্য চিন্তা-গবেষণায় তার সময় কেটেছে।
তাই হে যুবক, নিজেকে আশাশূন্য করো না। নিরাশার কাছে নিজেকে সঁপে দিয়ে পরাজয় বরণ করো না!
নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কর্ম ও উদ্যমের প্রতি ছুটে যেতে এবং কর্মঠতার সাথে কাজ করার পথনির্দেশ করেছেন। পথনির্দেশ করেছেন হতাশা ঝেড়ে ফেলতে। তাওয়াকুলকে ৫৯ (তাওয়াক্কুলের বিপরীত) পরিহার করতে। এমনকি শেষ সময়ে এসেও অটল-অবিচল থাকতে। তিনি বলেছেন:
إِنْ قَامَتِ السَّاعَةُ وَبِيَدِ أَحَدِكُمْ فَسِيلَةٌ، فَإِنْ اسْتَطَاعَ أَنْ لَا يَقُومَ حَتَّى يَغْرِسَهَا فَلْيَفْعَلْ
'তোমাদের কারও হাতে যদি ছোট একটি খেজুর বৃক্ষ থাকে, আর এমতাবস্থায় কিয়ামত সংঘটিত হয়ে যায়। বৃক্ষটি রোপণ করে দাঁড়াতে সক্ষম না হলেও, সে যেন তা রোপণ করে দেয়। '৬০
ইবনে জারির রহ. উমারা বিন খুজাইমা বিন সাবিত থেকে বর্ণনা করেন, তিনি বলেন, 'আমি উমর ইবনুল খাত্তাব রা. থেকে শুনেছি, তিনি আমার পিতাকে বললেন, "বৃক্ষরোপণে আপনার বাধা কীসের?"
তিনি বললেন, "আমি বৃদ্ধ মানুষ, আগামী দিন মরে যাব।"
তখন উমর রা. বললেন, "বৃক্ষরোপণ আপনার কাছে এতই কষ্টকর ঠেকছে?”
তারপর আমি আমার পিতার সাথে উমর রা.-কে নিজ হাতে বৃক্ষরোপণ করতে দেখেছিলাম।৬১
২. বিক্ষিপ্ততা
মানুষের কর্মজীবনে ব্যর্থতা, বড় বড় পরিকল্পনা বিনষ্ট হওয়া অথবা কাজের মান কমে যাওয়া এবং মানুষের জীবনে তার প্রভাব নষ্ট হয়ে যাওয়ার অন্যতম কারণ হলো-একাধিক পরিকল্পনায় বিক্ষিপ্ত থাকা। অনেক সময় একটি পরিকল্পনা সফল করতে অনেক মানুষের চেষ্টা ব্যয় করতে হয়। তাহলে এক ব্যক্তি সে একই পরিকল্পনা একাকী কীভাবে সম্পাদন করবে? আবার সে যদি নিজের একক শ্রম ব্যয় করে এমন কয়েকটা পরিকল্পনা চালাতে চায়, তবে ফলাফল কী হবে?
ومشتت العزمات يقضي عمره * حيران لا ظفر ولا إخفاق
'বিক্ষিপ্ত চিন্তার লোকেরা অস্থির জীবনযাপন করে। না বিজয় আসে আর না আসে ব্যর্থতা।'
আর এ কারণেই প্রকল্প বাস্তবায়নে একটি বাধা হলো, একই সময় একাধিক বড় বড় পরিকল্পনা শুরু করা। এর দৃষ্টান্তস্বরূপ শাইখ আহমাদ শাকির রহ.-এর উদাহরণ দেওয়া যায়। তিনি একই সময়ে কয়েকটি বড় বড় কাজ শুরু করেছিলেন।
প্রথমে শুরু করেছেন 'মুসনাদু ইমাম আহমাদ'-এর তাহকিক। তারপর 'সুনানুত তিরমিজি', অতঃপর ‘সহিহু ইবনি হিব্বান', এরপর ‘তাফসিরু ইবনি কাসির'-এর সংক্ষিপ্ত রূপ প্রণয়ন ও তাহকিকের কাজ শুরু করেন, এরপর ইবনে হাজমের 'আল-মুহাল্লা' কিতাবের তাহকিক শুরু করেছেন... যার ফলাফল ছিল কোনটিই তিনি পরিপূর্ণ করতে পারেননি।
৩. অক্ষমতা ও অলসতা
মানুষের অলসতা ও অক্ষমতা কত বড় বড় লক্ষ্যের সামনেই না প্রতিবন্ধক হয়ে দাঁড়িয়েছে! এ কারণেই নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম আল্লাহ তাআলার কাছে এই দুটি অনিষ্ট থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করতেন। তিনি দুআ করতেন:
اللهُمَّ إِنِّي أَعُوذُ بِكَ مِنَ الْعَجْزِ وَالْكَسَلِ
'হে আল্লাহ, আমি আপনার কাছে অক্ষমতা ও অলসতা থেকে আশ্রয় প্রার্থনা করছি।'৬২
আল্লাহর নবি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এ ধ্বংসাত্মক ব্যাধির সামনে আত্মসমর্পণের ব্যাপারে সতর্ক করেছেন। এবং এ কথার প্রতি ইঙ্গিত করেছেন যে, এটা কারও কর্ম বা ইচ্ছায় দুর্বলতা প্রবেশ করার অন্যতম কারণ। তিনি বলেন :
احْرِصْ عَلَى مَا يَنْفَعُكَ، وَاسْتَعِنْ بِاللَّهِ وَلَا تَعْجَزْ، وَإِنْ أَصَابَكَ شَيْءٌ، فَلَا تَقُلْ لَوْ أَنِّي فَعَلْتُ كَانَ كَذَا وَكَذَا، وَلَكِنْ قُلْ قَدَرُ اللَّهِ وَمَا شَاءَ فَعَلَ، فَإِنَّ «لَوْ تَفْتَحُ عَمَلَ الشَّيْطَانِ
'তোমার উপকারী বিষয়ে আগ্রহী হও। আল্লাহ তাআলার কাছে সাহায্য প্রার্থনা করো। অক্ষম হয়ে যেয়ো না। যদি তুমি কোনো বিপদে আক্রান্ত হও। তবে বলো না যে, "যদি আমি এমনটা করতাম, তাহলে এটা হতো, ওটা হতো।” বরং তুমি বলো, “আল্লাহ তাআলার পক্ষ থেকে এটি নির্ধারিত এবং তিনি যা চান, তা করেন।" কারণ, “যদি” শব্দটা শয়তানের কাজের দরজা খুলে দেয়। '৬৩
الذل في دعة النفوس ولا أرى * عزّ المعيشة دون أن يُشقى لها
'লাঞ্ছনা রয়েছে বিলাসী অন্তরে। আমি তাকে কষ্টে ফেলা ব্যতীত সম্মানি জীবন দেখি না।'
রাগিব আল-আসবাহানি রহ. বলেন :
'যে ভেঙে পড়েছে এবং অকেজো হয়ে পড়েছে, সে মানবতা (বরং প্রাণিজগৎ) থেকে বের হয়ে গেছে এবং মৃতদের অন্তর্ভুক্ত হয়ে গেছে।’৬৪
বলা হয়ে থাকে, অলসতা ও ক্রোধান্বিত হওয়া থেকে সাবধান! কারণ, যদি তুমি অলসতা করো, তবে হক আদায় করতে পারবে না। আর যদি ক্রোধান্বিত হও, তবে হকের ওপর সবর করতে পারবে না।'
إنَّ التواني أنكح العجز بنته * وساق إليها حين أنكحها مهرا
فراشا وطيئا ثم قال لها : اتكي * فغايتكما لا شك أن تلدا الفقرا
'অবহেলা তার মেয়েকে অপারগতার সাথে বিয়ে দেয় এবং তাকে বিয়ে দেওয়ার সময় মহর দেয়-কোমল বিছানার। আতঃপর মেয়েকে বলে, তুমি আরামে থাকো। সন্দেহাতীতভাবে তোমরা দারিদ্র্য জন্ম দেবে।'
অন্য এক কবি বলেন :
دببت للمجد والساعون قد بلغوا * جهد النفوس وألقوا دونه الأزرا
فكابدوا المجد حتى مل أكثرهم * وعانق المجد من أوفى ومن صبرا
لا تحسب المجد تمرا أنت أكله " لن تبلغ المجد حتى تلعق الصبرا
'চেষ্টাকারীরা সর্বোচ্চ সাধনা করে, কঠোর পরিশ্রম করে তবে মর্যাদা পেয়েছে।
আর তুমি স্রেফ হামাগুড়ি দিয়ে মর্যাদা পেতে চাইছ!
তারা মর্যাদা লাভের জন্য কষ্টের পথ ধরেছে। এর মধ্যে অনেকে বিরক্ত হয়ে পিছু হটেছে।
তবে মর্যাদার সাথে আলিঙ্গন করতে পেরেছে ওই ব্যক্তি, যে দৃঢ়পদে কর্ম সম্পাদন করেছে।
মনে করো না মর্যাদা কোনো খেজুর। হাতে নেবে, আর খেয়ে ফেলবে।
মর্যাদা তুমি ততক্ষণ পর্যন্ত হাতের মুঠোয় পাবে না, যতক্ষণ না ধৈর্যের তিক্ততাকে আস্বাদন করছ।'
অর্থাৎ অন্য কেউ সুউচ্চ মনোবলের মাধ্যমে মর্যাদা অর্জনে চেষ্টা করছে। আর তুমি তোমার কর্মবিমুখতার কারণে অলসের মতো চেষ্টা করছ এবং বয়স্ক বৃদ্ধের ন্যায় ধীরে ধীরে চলছ। তাহলে কীভাবে তুমি মর্যাদা অর্জন করবে?
৪. বিলম্ব করা ও দীর্ঘসূত্রতা
বিলম্ব মানে গুরুত্বপূর্ণ একটি কাজকে এক সময় থেকে অন্য সময়ে নিয়ে যাওয়া। আবার কখনো কখনো একেবারেই ভুলে যাওয়া। সালাফ বলেন :
'আমি তোমাদের “অচিরেই” শব্দ ব্যবহারে সর্তক করছি। কারণ, এটি ইবলিসের একটি সৈন্য।'
ولا أدخر شغل اليوم عن كسل * إلى غد إن يوم العاجزين غد
'আমি আজকের কাজ আগামী দিনের জন্য রেখে দিই না। কারণ, আগামী দিন হলো অক্ষমদের। আজকের দিন সক্ষমদের।'
আপনি লক্ষ্য স্থির করে ফেলেছেন তো আরম্ভ করতে বিলম্ব করবেন না। তৎক্ষণাৎ কাজ শুরু করুন। যদি আপনি বিলম্ব করতে থাকেন, তবে কাঙ্ক্ষিত লক্ষ্যে কখনো পৌঁছতে পারবেন না।
واترك منى النفس لا تحسبه يشبعها
إنَّ المنى رأس أموال المفاليس
'নফসের চাহিদা পরিত্যাগ করো। তাকে পরিতৃপ্ত করতে পারবে বলে ধারণা করো না।
কারণ, হতদরিদ্রদের মূলধন দুরাশা।'
দীর্ঘসূত্রতা সে অক্ষমদের দলিল, যারা কোনো কাজ করতে চায় না। কাজ করবে না, তাই নিজেকে আগামী দিনের কথা বলে বাঁচিয়ে রাখে। অথচ সে জানে যে, প্রতিদিনেরই ভিন্ন কাজ রয়েছে। আজকের দিনের যেমন আগামীকাল আছে। কালকের দিনেরও আগামী আছে।
انتبه من رقدة الغفلة، فالعمر قليل
واطرح سوف وحتى فهما داء دخيل
'গাফিলতির ঘুম থেকে জেগে ওঠো। কেননা, জীবনকাল স্বল্প সময়।
“অচিরেই” ও “যতক্ষণ”-কে ছুড়ে মারো। কারণ, এই দুটিই অন্তরের রোগ।'
নিজের পরিকল্পনা সম্পাদনে বিলম্ব করলে তোমার পরিকল্পনা অন্য কারও হয়ে যাবে। তোমার এ পরিকল্পনা অন্য কেউ সম্পাদন করে ফেলবে। পরিকল্পনা সম্পাদনের লাগাম তোমার হাতছাড়া হয়ে যাবে। আর এতে সর্বনিম্ন যে লোকসান তা হলো, অন্য কেউ আখিরাতের প্রতিদানে তোমার চেয়ে এগিয়ে যাবে।
৫. সময়ের অপব্যবহার
বর্তমানে উম্মাহ ও প্রতিটি মুসলিম ভয়ংকর এক বিপদের সম্মুখীন। আর তা হলো সময় অপচয়ের বিপদ। কারণ, সময় অপচয় করার অর্থ জীবন বিনষ্ট করা। সব জিনিসই হাত ছাড়া হলে পাওয়া যায়, কিন্তু সময় হাত ছাড়া হলে পাওয়া যায় না। আর এ কারণেই আমাদের উপলব্ধি করতে হবে যে, সময়ের পুনর্জন্ম হয় না—সময় দীর্ঘায়িত হয় না, থেমে থাকে না, পেছনে ফিরে যায় না। বরং সময় সামনে চলতে থাকে। এ জন্যই জীবনে সফলতার প্রথম শর্ত হলো, সময়ের সদ্ব্যবহার করা।
যতই মানুষের রচনায় 'সময়ের ব্যবস্থাপনা' নামক বাক্যাংশটি অনেকবারই উল্লেখ থাকুক না কেন। প্রকৃতপক্ষে মানুষ সময়ের ব্যবস্থাপনা করতে পারে না। কারণ সময় চলে আল্লাহ তাআলার নির্ধারিত নিয়মে। তবে আমরা সময় বয়ে চলার পথে তাকে কাজে লাগাতে পারি, কেবল এতটুকুই।
সময়ের অপচয় থেকে সাবধান করে উলামায়ে কিরাম ও জ্ঞানীদের বাণীমালা এবং অভিজ্ঞতা অর্জনকারীদের অভিমত ছাড়াও অনেক নস ও আসার বর্ণিত হয়েছে। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেছেন :
نِعْمَتَانِ مَغْبُونُ فِيهِمَا كَثِيرٌ مِنَ النَّاسِ: الصِّحَّةُ وَالفَرَاغُ
'দুটি নিয়ামতের ব্যাপারে অধিকাংশ মানুষই প্রবঞ্চিত। (তা হলো) সুস্থতা ও অবসরতা। '৬৫
ইবনে আকিল আল-হাম্বলি রহ. বলেন :
'আমার জন্য জীবনের একটি মুহূর্তও অপচয় করা হালাল নয়। যদিও আমার জিহ্বা আলোচনা ও বিতর্ক থেকে এবং দৃষ্টি অধ্যয়ন থেকে নিস্তেজ হয়ে যায়। তবুও আমি শোয়া অবস্থায়, অবসর সময়েও আমার চিন্তাকে কাজে লাগাই। '৬৬
ইবনুল জাওজি রহ. বলেন :
'মানুষের উচিত নিজের সময়ের মর্যাদা ও মূল্য বোঝা। প্রতিটি মুহূর্তের সঠিক মূল্যায়ন হবে, যদি সে মহৎ কাজে তা ব্যয় করে। যদি সে এ সময়ে উত্তম থেকে উত্তমতর কথা ও কাজে মগ্ন থাকে। '৬৭
৬. কর্ম ও পরিকল্পনায় বিশৃঙ্খলা
বিশৃঙ্খলা দ্বারা উদ্দেশ্য হলো বিষয়গুলোর মাঝে তালগোল পাকিয়ে ফেলা, বিভিন্ন কাজে সংমিশ্রণ করে ফেলা এবং মানুষের সাধারণ জীবন পদ্ধতি ও তার চিন্তা, চালচলন এবং উত্তম-অনুত্তমের মাঝে বিশৃঙ্খলা প্রবেশ করা। একজন বিশৃঙ্খল মানুষ লক্ষ্যভ্রষ্ট হয়, কর্ম বিনষ্ট করে, পূর্বপ্রস্তুতিহীন হয়, তার কোনো রূপরেখা থাকে না, সে দিকভ্রান্ত থাকে, চলার কোনো পদ্ধতি থাকে না তার, একটি কাজ শুরু করে ছেড়ে দেয়, আরেকটি শুরু করে অসম্পূর্ণ রেখে দেয়। একবার এই রাস্তায় হাঁটে তো পরক্ষণেই তা এড়িয়ে চলে। একটি পরিকল্পনা গ্রহণ করে তো কিছুক্ষণ পর ক্লান্ত হয়ে পড়ে।
وعاجز الرأي مضياع لفرصته * حتى إذا فات أمر عاتب القدرا
'সিদ্ধান্ত নিতে অক্ষম ব্যক্তি সুযোগ নষ্ট করে। অবশেষে যখন কোনো বিষয় ছুটে যায়, তখন তাকদিরকে সে ভর্ৎসনা করে।'
এমন ব্যক্তি নিজের কাজ নিজের অজান্তেই নষ্ট করে ফেলে।
৭. দুর্বল প্রেরণা
চাই প্রেরণা ব্যক্তির মনোবল থেকে দুর্বল হোক অথবা বাইরের অন্য কিছু থেকে দুর্বল হোক—যেমন তাকে সব সময় যে উৎসাহ-উদ্দীপনা দান করে সে দুর্বল। উদ্দীপনা না থাকা অনেক প্রকল্পের ক্ষেত্রে অলসতা তৈরি করে এবং মাঝপথেই কাজটির পরিসমাপ্তি ঘটায়। এ সমস্যার সমাধান হলো, পারস্পরিক উপদেশ ও নির্দেশনা প্রদান।
ইরাকের হাফিজে হাদিস আলি বিন আসিম থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন :
'আমার বাবা আমাকে এক লক্ষ দিরহাম ধরিয়ে দিয়ে বললেন, "যাও, এক লক্ষ হাদিস মুখস্থ করার আগে আমাকে মুখ দেখাবে না।”
এই ধরনের কথা পরিকল্পনা সম্পাদনে অনেক শক্তিশালী উদ্দীপনা তৈরি করে, অনেক শক্তিশালী প্রেরণাদায়ক হয়। তবে সবচেয়ে শক্তিশালী উদ্দীপনা ও প্রেরণা হচ্ছে—আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টি ও প্রতিদানের আশা এবং আখিরাত কামনা।
আল্লাহ তাআলা বলেন :
وَمَن يُرِدْ ثَوَابَ الدُّنْيَا نُؤْتِهِ مِنْهَا وَمَن يُرِدْ ثَوَابَ الْآخِرَةِ نُؤْتِهِ مِنْهَا وَسَنَجْزِي الشَّاكِرِينَ
'বস্তুত, যে ব্যক্তি দুনিয়ার প্রতিদান চাইবে, আমি তাকে তার অংশ (দুনিয়াতেই) দিয়ে দেবো। পক্ষান্তরে যে ব্যক্তি আখিরাতের প্রতিদান চাইবে, আমি তাকে তার অংশ দিয়ে দেবো। আর যারা কৃতজ্ঞ, শীঘ্রই আমি তাদের প্রতিদান দেবো।’৬৮
৮. তত্ত্বাবধানে ও অব্যাহত রাখায় দুর্বলতা
তত্ত্বাবধানে ও অব্যাহত রাখায় দুর্বলতা পরিকল্পনা বাস্তবায়ন সূচনায় বিলম্ব ও শিথিলতা তৈরি করে। কখনো তো একটি পরিকল্পনাকে পুরো বন্ধ করে দেয়! কারণ, মানুষ তার পরিকল্পনায় আদেশদাতা ও বিদ্বেষের পাত্র।
৯. দুর্বল পরামর্শ
এটি এক ধরনের স্বনির্ভরতার দিকে নিয়ে যায়, যা অবহেলা এবং চিন্তাগত ও চারিত্রিক অবনতির দিকে ধাবিত করে।
১০. আত্মবিশ্বাসের দুর্বলতা
আত্মবিশ্বাস দুর্বল হওয়া অথবা হীনম্মন্যতার অনুভূতি আসা পরিকল্পনাকে ব্যর্থ করে। কিছু করতে সক্ষম না হওয়ার মতো চিন্তা এক ধরনের পরনির্ভরতা তৈরি করে। এমন চিন্তাধিকারী কাজ করা ছেড়ে দেয়। ইবনে আব্বাস রা. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন :
'যখন রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম ইনতিকাল করেন, তখন আমি এক আনসারিকে বললাম, “হে অমুক, এসো আমরা রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সাথিদের কাছ থেকে ইলম শিখব। আজ তাঁরা অনেকেই আছেন।”
তিনি আশ্চর্য হয়ে বললেন, “হে ইবনে আব্বাস! তুমি কি মনে করো, মানুষ তোমার প্রতি মুখাপেক্ষী হবে? অথচ মানুষের মাঝে রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর সাথিগণ উপস্থিত। যাঁদের তুমি দেখতে পাচ্ছ।”
সে এ কাজ পরিত্যাগ করল। আর আমি এ ব্যাপারে এগিয়ে আসলাম। যদি আমার কাছে কারও ব্যাপারে খবর পৌঁছত, তবে আমি তাঁর কাছে যেতাম। তাঁর দরজার সামনে আমার চাদর বিছিয়ে শুয়ে থাকতাম। বাতাস আমার চেহারা ধূলিমলিন করে দিত। যখন তিনি ঘর থেকে বের হতেন, আমাকে দেখে বলতেন, “হে আল্লাহর রাসুলের চাচাতো ভাই! আপনাকে কে এখানে নিয়ে আসলো? আপনি আমার কাছে সংবাদ পাঠাতেন, তাহলে আমিই আপনার কাছে যেতাম!”
আমি বলতাম, “না, আমিই আপনার কাছে আসার বেশি উপযুক্ত। অতঃপর আমি তাঁকে হাদিস জিজ্ঞেস করতাম।”
এরপর ইবনে আব্বাস রা. বলেন, “আনসার লোকটি জীবিত থাকতেই দেখে গেছেন যে, মানুষ হাদিস জানার জন্য আমার কাছে ভিড় জমাচ্ছে। তখন সে বলেছিল, “এই যুবকটি আমার চেয়ে বেশি বুদ্ধিমান ছিল।”'৬৯
১১. তাড়াহুড়া প্রবণতা ও ধীরস্থিরতা পরিত্যাগ
কারণ, অনেক সময় মনে একটি পরিকল্পনা এসেছে, কিন্তু সে তাড়াহুড়া না করলে কিছুক্ষণ পর আবার আরেকটি পরিকল্পনা হৃদয়ে আসবে-যার কারণে মনে হবে যে, প্রথম পরিকল্পনাটি ভুল ছিল এবং দ্বিতীয়টি তার চেয়ে উত্তম হতো। তাই তাড়াহুড়ো করে পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে যাওয়া পরিকল্পনার মৃত্যু ডেকে আনে।
১২. নিজের ব্যক্তিত্বের সক্ষমতার পরিমাপ করতে না পারা
নিজের ব্যক্তিত্ব পরিমাপ করতে না পারলে একাধিক পরিকল্পনা নিয়ে দ্বিধায় পড়ে যায়। একবার সে ইলম অর্জনে ব্রতী হয়। আবার কখনো হিফজ আরম্ভ করে উপলব্ধি করে যে, সে কুরআন হিফজের জন্য তেমন মেধাবী নয়। এরপর একবার সে ভিন্ন সম্প্রদায়ের লোকদের ইসলামের প্রতি দাওয়াত দেওয়ার ব্যাপারটি শুনল। এবার তো সে এ ব্যাপারে নিজের দুর্বলতা উপলব্ধি করল এবং এ দিকটিতে কাজ না করার জন্য নিজের মনের মাঝে দ্বিধা-দ্বন্দ্ব শুরু হয়ে গেলো তার। সে সব বিষয়ে সফল হতে চায়, অবশেষে কোনটিতেই সফল হতে পারে না। সে সবকিছু করতে চায়, তাই কোনো কাজই হয়ে ওঠে না তার।
এই ব্যক্তির মাঝে ও যে একটি তিরকে অনেকগুলো জায়গায় নিক্ষেপ করতে চায়, তার মাঝে কোনো পার্থক্য নেই। আর এমন ব্যক্তিদের পরিকল্পনার অবস্থা এমনই।
১৩. জীবনের কোনো লক্ষ্য না থাকা।
১৪. দায়িত্ববোধ না থাকা।
১৫. সত্তাগতভাবেই হতাশা হওয়া।
১৬. পরিকল্পনা বাস্তবায়নে কাজের মাঝে ঐকান্তিক প্রচেষ্টা না থাকা।
১৭. নিজের আশপাশের ভাই-বন্ধু, পরিবার ও সমাজ থেকে বাধাপ্রাপ্ত হওয়া এবং তাদের হতোদ্যম করা কথাবার্তা।
১৮. চলার পথে রাস্তার কারুকর্ম নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়া। কেননা, এটা পরিকল্পনা বাস্তবায়ন নস্যাৎ করে দেয়।
১৯. পরিকল্পনা পূর্ণ না হতেই তার ফলাফল অর্জনে তাড়াহুড়া করা
এটা ধৈর্যশক্তি দুর্বল হওয়ার আলামত। যার ধৈর্যশক্তি দুর্বল হবে, তার সফলতাও কম আসবে।
ومن قَلَّ فيما يتَّقيه اصطباره * فقد قل مما يرتجيه نصيبه
'নিজের গ্রহণীয় জিনিসে যার ধৈর্য কমে গেছে, কাঙ্ক্ষিত বিষয়ে তার অংশও কমে গেছে।'
রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম এমন ব্যক্তিদের প্রতি ক্রোধান্বিত হয়েছেন, যারা বিজয় ও তামকিনের শর্ত পূরণ করার আগেই বিজয় ও তামকিন প্রত্যাশা করে। তিনি বলেছেন :
وَاللهِ لَيُتِمَّنَّ هَذَا الأَمْرَ ، حَتَّى يَسِيرَ الرَّاكِبُ مِنْ صَنْعَاءَ إِلَى حَضْرَمَوْتَ، لَا يَخَافُ إِلَّا اللَّهَ، أَوِ الذَّنْبَ عَلَى غَنَمِهِ، وَلَكِنَّكُمْ تَسْتَعْجِلُونَ
'আল্লাহর শপথ, আল্লাহ তাআলা এই দ্বীনকে বিজয় করবেন। ফলে সানা থেকে হাজরামাওত পর্যন্ত একজন লোক নিশ্চিন্তে সফর করবে। তার মনে স্রেফ আল্লাহরই ভয় থাকবে, অন্য কিছুর ভয় থাকবে না। অথবা তার মেষপালের ওপর কেবল বাঘের ভয় থাকবে, অন্য কোনো চোর-ডাকাতের ভয় থাকবে না। কিন্তু তোমরা বড় তাড়াহুড়ো করছ। '৭১
এ জন্যই ফুকাহায়ে কিরামের একটি মূলনীতি হলো, 'যে সময় আসার আগে তাড়াহুড়া করবে, সে বঞ্চিত হওয়ার মাধ্যমে সাজাপ্রাপ্ত হবে।'
ومستعجل الشيء قبل الأوان يصيب الخسارة ويجني النصب
'সময় হওয়ার পূর্বে তাড়াহুড়ো করা ক্ষতির কারণ। এ কাজ করা মানে নিজের শ্রম অকেজো করে দেওয়া।'
তাই সবর খুবই জরুরি।

টিকাঃ
৫৯. কেউ যদি মাধ্যম গ্রহণ করে আল্লাহর ওপর ভরসা করে, তাকে তাওয়াক্কুল বলে। পক্ষান্তরে কেউ যদি মাধ্যম গ্রহণ না করে আল্লাহর ওপর ভরসা করার দাবি করে, তাকে তাওয়াকুল বলে। -অনুবাদক।
৬০. মুসনাদু আহমাদ: ১২৫৬৯। হাদিসটি সহিহ।
৬১. কানজুল উম্মাল : ৯১৩৬
৬২. সহিহুল বুখারি : ২৮২৩, সহিহু মুসলিম: ২৭০৬
৬৩. সহিহু মুসলিম: ২৬৬৪
৬৪. ফাইজুল কাদির: ২/২৯৩
৬৫. সহিহুল বুখারি: ৬৪১২
৬৬. শাজারাতুজ জাহাব: ৪/৩৬
৬৭. সাইদুল খতির: ৫৭
৬৮. সুরা আলি ইমরান: ১৪৫
৬৯. দারিমি রহ.-এর বর্ণনা: ৫৭০
৭০. সানা দ্বারা ইয়ামানের সানা উদ্দেশ্য হতে পারে। হাজরামাওতও ইয়ামানের একটি অঞ্চল। ইয়ামানের সানা ও হাজরামাওতের মাঝে দূরত্ব পাঁচ দিনের। আবার এখানে শামের সানা নামক স্থানটিও উদ্দেশ্য হতে পারে। সেটার দূরত্ব এর চেয়ে অনেক বেশি। ফাতহুল বারি: ৬/৬১৯।
৭১. সহিহুল বুখারি: ৩৬১২

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00