📄 প্রত্যেক যুবকই এক একটি পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে সক্ষম
প্রত্যেক মুসলিমের মাঝেই এমন কিছু বৈশিষ্ট্য রয়েছে, যার কারণে সে অন্যদের থেকে স্বতন্ত্র। প্রত্যেকের মাঝেই এমন কিছু উদ্ভাবনী প্রতিভা রয়েছে, যা তাকে বড় করে তোলে। এ যোগ্যতার বিকাশ ঘটানো উচিত; যেন মুসলিমরা তা থেকে উপকৃত হতে পারে। কারণ, যে ব্যক্তি নিজ স্বার্থে জীবনযাপন করে, তার জীবন ছোট ও তুচ্ছতায় কাটে। এভাবেই একদিন সে মারা যায়। আর যে উম্মাহর জন্য বাঁচার চেষ্টা করে, সে মহান হয়ে বেঁচে থাকে এবং মহান হয়েই মৃত্যুবরণ করে।
আর যার কাছে নিজের কোনো শক্তি ও বৈশিষ্ট্য স্পষ্ট নয়, সে যেন কোনো শক্তি ও বৈশিষ্ট্য অন্বেষণ করে তা অর্জন করে নেয়। তার উন্নতি ও অগ্রগতি সাধন করে। এমন কোনো মানুষ নেই যে, তার নির্দিষ্ট কোনো স্বতন্ত্র প্রতিভা বা শক্তি থাকে না।
পৃথিবীর বুকে প্রত্যেক মানুষই এক একজন প্রতিভাবান, এক একজন সৃজনশীল ব্যক্তিত্বের অধিকারী। উসামা বিন জাইদ রা. এমন একটি সেনাবাহিনীকে সুন্দরভাবে পরিচালনা করেছিলেন, যেখানে বড় বড় সাহাবিগণ উপস্থিত ছিলেন। অথচ তখন তাঁর বয়স বিশ বছরও অতিক্রম করেনি। ২৮
আফরার দুই ছেলে মুআজ ও মুআওবিজ রা.। এই উম্মাহর ফিরাউন আবু জাহিলকে হত্যার জন্য তাঁরা উদগ্রীব ছিলেন। উন্মুক্ত তরবারি নিয়ে তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েন। তাকে তলোয়ারে আঘাত করেন। শেষ পর্যন্ত তাকে হত্যাও করে দেন। ২৯
ইবনে আব্বাস রা.। কুরআনের ভাষ্যকার। অল্প বয়সেই দ্বীনি ইলম ও কুরআনের আয়াত বোঝা ও মুখস্থের ক্ষেত্রে তথ্যসূত্রে পরিণত হয়েছেন।
ইমাম শাফিয়ি র. বলেন, 'আমি সাত বছর বয়সে কুরআন মুখস্থ করেছি। মুয়াত্তা মুখস্থ করেছি দশ বছর বয়সে।'৩০
অনেক মানুষই জানে না যে, আল্লাহ তাআলা তাকে কী কী নিয়ামতে ভূষিত করেছেন। আপনি যদি তাকে বলেন, তুমি কুরআনের কিছু অংশ মুখস্থ করার একটি পরিকল্পনা করো অথবা ইলমি কোনো বিষয় মুখস্থের পরিকল্পনা করো। তবে সে বলবে, 'আমার স্মৃতিশক্তি দুর্বল। বোধশক্তি আমার সীমাবদ্ধ। আমি মুখস্থ করতে পারি না।' এমনটা বলার কারণ হলো, সে এ ব্যাপারে কোনো উদ্যোগই গ্রহণ করেনি। যদি করত, তবে এ বিষয়ে তার মূর্খতা প্রকাশ পেয়ে যেত-সে ভুল প্রমাণিত হতো।
টিকাঃ
২৮. আল-বিদায়াহ ওয়ান-নিহায়াহ: ৬/২০৪
২৯. সহিহুল বুখারি: ৪০২০, সহিহু মুসলিম: ১৮০০
৩০. সিয়ারু আ'লামিন নুবালা: ১৯/৭
📄 প্রতিভা বিকাশে কিছু নির্দেশনা
একটি শিশুর প্রতিভা ও যোগ্যতা কোন খেলনার প্রতি তার আগ্রহ বিদ্যমান, এর মাধ্যমেই বোঝা সম্ভব। বর্তমানে ম্যাকানিক খেলনা রয়েছে। আঁকাজোকা করা, রং করার খেলনা রয়েছে। মিলানো, খোলা-যুক্ত করাসহ ইত্যাদি হরেক রকমের খেলনা রয়েছে।
ইবনুল কাইয়িম রহ. বলেন :
'একটি শিশুর শিশুকালের অবস্থার ওপর, যে কাজের জন্য সে নিজেকে প্রস্তুত করে, গঠন করে...তার বিপরীত কিছু তাকে চাপিয়ে দেওয়া যাবে না।... কারণ, সে যে জিনিসের জন্য প্রস্তুত নয় সেটা তার ওপর চাপিয়ে দিলে তাতে সে সফল হবে না; বরং যার জন্য সে প্রস্তুত ছিল, তা ছুটে যাবে।
যখন দেখা যাবে যে, তার বোধশক্তি ভালো, বুঝশক্তি পরিষ্কার, ধীশক্তি প্রখর। তবে এমনটা শিক্ষা অর্জনের জন্য তার সক্ষমতার চিহ্ন প্রকাশ করে। প্রকাশ করে সে ইলম শেখার জন্য প্রস্তুতিসম্পন্ন। তাই তার শূন্য হৃদয়ের ফলকে যেন ইলমের ভালোবাসা এঁকে দেওয়া হয়—তাহলে তা হৃদয়ে বসে যাবে এবং স্থির হয়ে যাবে। সাথে সাথে আগ্রহ বৃদ্ধি পেতে থাকবে।
কিন্তু যদি সবদিক থেকেই এর বিপরীত পরিলক্ষিত হয়। সে অশ্বারোহণ ও তার আসবাব, নিক্ষেপণ যন্ত্র ও বর্শা নিয়ে খেলা করে; ইলমের প্রতি তার কোনো আগ্রহ দৃষ্টিগোচর না হয়; নিজেকে এ জন্য গড়ে না তোলে—তবে তার জন্য অশ্বারোহণ ও তার অনুশীলন সহজলভ্য করে দিতে হবে। কারণ, এটি তার জন্য ও মুসলিমদের জন্য বেশি কল্যাণকর।
যদি তার আগ্রহ বিপরীত পরিলক্ষিত হয়। সে নিজেকে এ জন্য প্রস্তুত না করে; বরং তার দৃষ্টি থাকে কোনো কারিগরি পেশার প্রতি; এ জন্য নিজেকে সে প্রস্তুত করে, এর প্রতি আগ্রহ দেখায়-আর পেশাটাও যেহেতু উপকারী ও মুবাহ-তবে তার জন্য সেই সুযোগ করে দেওয়া উচিত।’৩১
মুসলিম উলামাগণ প্রতিভা ও শক্তির উদ্ভাবন করতেন। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নিকট যখন কেউ নির্দিষ্ট কোনো যোগ্যতা নিয়ে উপস্থিত হতো, তখন তার সে যোগ্যতাকে তিনি সরাসরি কাজে লাগিয়ে দিতেন। আবু মাহজুরাহ রা. ইসলাম-পূর্ব জাহিলি যুগে গায়ক ছিলেন। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার আওয়াজ শুনে বললেন :
اذْهَبْ فَأَذَّنْ عِنْدَ الْبَيْتِ الْحَرَامِا
'তুমি গিয়ে বাইতুল হারামের নিকট আজান দাও।'৩২
সুফইয়ান সাওরি রহ. ওয়াকি ইবনুল জাররাহ রহ.-এর দুচোখে তাকিয়ে বললেন, 'তোমরা দেখবে যে, এই লোকটি মহান হবে। মর্যাদাবান না হয়ে সে ইনতিকাল করবে না।'৩৩
ইমাম আবু হানিফা রহ. আবু ইউসুফ রহ.-এর মাঝে এবং মালিক রহ. শাফিয়ি রহ.-এর মাঝে তাদের মর্যাদাকর হওয়ার ব্যাপারটি নিরীক্ষণ করে বুঝতে পেরেছিলেন। ইমাম শাফিয়ি রহ. বলেন, 'যখন তিনি আমার কথা শুনলেন, তখন কিছুক্ষণ আমার দিকে তাকিয়ে থাকলেন। ইমাম মালিক রহ. ফিরাসাহ-সমৃদ্ধ ছিলেন। নিরীক্ষণ-শক্তির অধিকারী ছিলেন। তিনি আমাকে বললেন, “তোমার নাম কি?” আমি বললাম, “মুহাম্মাদ।” তিনি বললেন, “হে মুহাম্মাদ, আল্লাহকে ভয় করো। গুনাহ থেকে বেঁচে থাকো। নিশ্চয় অচিরেই তুমি বিশাল মর্যাদার অধিকারী হবে।””৩৫
আমি পাঁচ বছর বয়সী একটি শিশু পেলাম। সে কুরআন হিফজ করেছে। আমি তাকে পরীক্ষা করলাম আর অভিভূত হলাম, সে ঠিক ঠিক কুরআনের আয়াতগুলো স্থান-সহ বলে দিচ্ছে! আমি তার পিতাকে তার মুখস্থ-পদ্ধতি সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলাম। তিনি বললেন, 'যখন ছেলেটির বয়স দুবছর। তখন তিনি ছোট একটি রুমে অনেকগুলো খেলনা রাখলেন। সেখানে একটি টেপরেকর্ডার চালু করে রাখতেন। সব সময় তাতে কুরআন তিলাওয়াত চলত। অবশেষে যখন ছেলেটি তিন বছর অতিক্রম করল, তখন হিফজ শুরু করে দিল। পাঁচ বৎসর বয়সে হিফজ সম্পন্ন করল।
নিশ্চয় মানুষ অনেক যোগ্যতার অধিকারী। এই শিশুটির মুখস্থশক্তি ছিল প্রচণ্ড। কিন্তু তারবিয়াত, পরিকল্পনা ও পর্যবেক্ষণ, লক্ষ্য স্থির করা ব্যতীত তার হয়তো হিফজ সম্পন্ন করা হতো না। সে এই অঙ্গনের প্রতিভাবান কেউ হতো না। কিন্তু তার পিতার সূক্ষ্ম পর্যবেক্ষণ ও পরিকল্পনা তাকে এই অবস্থানে নিয়ে এসেছে।
অথচ সাধারণভাবে যদি কেউ তাকে হিফজের জন্য বলত, তবে সে বলত, 'আমার স্মৃতিশক্তি দুর্বল। আমার বোধশক্তি কম। আমি করতে পারব না। আমাকে দিয়ে হবে না।' তাহলে হয়তো সে কখনোই পারত না। তাই সূচনাটাই ঠিক মতো হওয়া উচিত।
কতক মানুষ নিজেদের পথে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে রেখেছে। কিংবা প্রতিবন্ধকতা থাকার ভুল ধারণা নিয়ে বসে আছে। কখনো কখনো প্রতিবন্ধকতা থাকলেও তা ছোট হয়। কিন্তু সে এ ছোট ছোট প্রতিবন্ধকতাগুলোকে অনেক বিশাল করে দেখে। কখনো বাধা ঠিকই থাকে। চাইলে সে একে অতিক্রম করতে পারে। কিন্তু সে তা অতিক্রম করতে চায় না। এ ক্ষেত্রে আমি বলব, তোমার কাছে যদি কোনো পরিকল্পনা থাকে। যদি তুমি তা করতে সক্ষম না হও, তবে তা অন্যকে দাও। আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কি কতিপয় নফল আমলের বিবরণ দিতে গিয়ে বলেননি যে—
تُعِينُ صَانِعًا أَوْ تَصْنَعُ لِأَخْرَقَ
'কোনো কারিগরকে কর্মে সাহায্য করবে। অথবা কোনো অনিপুণের জন্য তৈরি করবে।'৩৬
অর্থাৎ কাজটি করতে সক্ষম-এমন কোনো কারিগরকে সাহায্য করো। অথবা এমন কোনো নির্বোধের জন্য নিজেই তৈরি করো, যে সুন্দরভাবে তৈরি করতে পারে না; অথবা এমনই অক্ষম যে, একেবারে তৈরি করতেই পারবে না, তুমি তার জন্য তৈরি করে দাও।
টিকাঃ
৩১. তুহফাতুল মাওদুদ বিআহকামিল মাওলুদ: ২৪৩-২৪৪
৩২. সুনানুন নাসায়ি: ৬৩৩; হাদিসটি সহিহ।
৩৩. তারিখু দিমাশক: ৬২/৬৯
৩৪. ইলমুল ফিরাসাহ। মুখ, হাবভাব, চালচলন ইত্যাদি দেখে কারও চরিত্র নির্ণয় করতে পারার বিদ্যা। ইংরেজিতে একে Physiognomy বলে। - অনুবাদক।
৩৫. তারিখু দিমাশক: ৫১/২৮৬
৩৬. সহিহুল বুখারি : ২৫১৮, সহিহু মুসলিম : ৮৪
📄 পরিকল্পনা যে ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত হবে
পরিকল্পনা যে ভিত্তিগুলোর ওপর প্রতিষ্ঠিত হবে, তন্মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ কিছু ভিত্তি হলো :
প্রথমত, পরিকল্পনা নির্ধারণ করা
যথাযথ পরিকল্পনা গ্রহণ একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এ জন্য দরকার পড়ে অনেক চিন্তা-ভাবনা ও অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের শরণাপন্ন হওয়ার।
পরিকল্পনাগুলোর কোন পরিকল্পনাটি সর্বোত্তম?
তার মাঝে কোনটি সম্পাদন করা সম্ভব আর কোনটি সম্পাদন করা সম্ভব নয়?
কোন পরিকল্পনাটির প্রতি উম্মাহ মুখাপেক্ষী? কোন পরিকল্পনাটি উম্মাহর জন্য সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন?
পরিকল্পনাকারীকে চূড়ান্ত পরিকল্পনা নির্ধারণের পূর্বে এ গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতে হবে।
দ্বিতীয়ত, পরিকল্পনা বাস্তবায়ন প্রস্তুতি ও রূপরেখা তৈরি করা
এ পর্যায়ে ব্যাপক একটি অবকাঠামো তৈরি করতে হবে। আবশ্যকীয় উদ্যোগগুলো গ্রহণ করতে হবে। প্রকল্পের লক্ষ্য-উদ্দেশ্য, গুরুত্ব, কাঙ্ক্ষিত ফলাফল, কাজের নকশা ও আবশ্যকীয় সম্ভাবনাসমূহও বের করতে হবে।
তৃতীয়ত, পরিকল্পনা বাস্তবায়ন
পরিকল্পনা নির্ধারণ ও তার নকশা তৈরির পর তা বাস্তবায়ন শুরু করতে হবে। আর এটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্তর।
চতুর্থত, পরিকল্পনার মূল্যায়ন
কখনো কখনো প্রকল্পটি বহিরাগত অনেক প্রতিক্রিয়ার সম্মুখীন হয়। কখনো বাস্তবায়নকালীন বা বাস্তবায়নের পর পরিকল্পনার মাঝে উন্নয়ন সাধিত হয়। তাই চূড়ান্ত ফলাফলকে তার পূর্বের ফলাফলের সাথে মিলিয়ে দেখা জরুরি। যেন জানা যায় যে, পরিকল্পনাটি সফল হয়েছে কি হয়নি।
📄 কীভাবে আপনার পরিকল্পনা শুরু করবেন?
কখনো পরিকল্পনা নির্ধারিত হয় অনেক চিন্তা-ভাবনা ও গবেষণার পর। আবার কখনো কখনো স্রেফ প্রস্তাব বা পরামর্শের মাধ্যমেও হয়ে যায়। ইমাম বুখারি রহ. বলেন, 'আমি ইসহাক বিন রাহওয়াইহ-এর নিকট ছিলাম। তখন আমাদের কিছু সাথি বললেন, 'যদি তোমরা রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর হাদিসগুলো নিয়ে একটি সংক্ষিপ্ত গ্রন্থ রচনা করতে!' তাদের এই কথাটি আমার হৃদয়ে বসে গেল। এরপর আমি এ গ্রন্থটি (সহিহুল বুখারি) সংকলন করতে শুরু করলাম।’৩৭
ইমাম শাফিয়ি রহ.-এর 'আর-রিসালাহ'-এ গ্রন্থটি রচনা করা হয়েছে আব্দুর রহমান বিন মাহদির ইচ্ছা অনুযায়ী।
ইমাম শাওকানি রহ. 'নাইলুল আওতার শারহু মুনতাকাল আখবার' গ্রন্থটি তাঁর এক শাইখের পরামর্শে লিখেছেন।
কখনো স্রেফ উৎসাহব্যঞ্জক একটি বাক্যই পরিকল্পনা নির্ধারণের জন্য যথেষ্ট। যেমন : ইমাম জাহাবি রহ.। যিনি হাদিসের একজন মহান ইমাম ছিলেন। কীভাবে গড়ে উঠল তাঁর হাদিসে ব্যুৎপত্তি অর্জনের পরিকল্পনা? তিনি তাঁর শাইখ আলামুদ্দিন আল-বারজালি রহ. সম্পর্কে বলেন, 'শাইখ ইলমুদ্দিন সেই ব্যক্তি, যিনি আমার হৃদয়ে হাদিস অন্বেষণের ভালোবাসা তৈরি করে দিয়েছেন। তিনি আমার লেখা দেখে বললেন, “তোমার লেখা তো মুহাদ্দিসদের লেখার মতো।” তাঁর এই কথা আমার হৃদয়ে প্রতিক্রিয়া সৃষ্টি করেছিল।'৩৮
মুহাম্মাদ বিন আওফ রহ. থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, 'নবীন বয়সে একদা আমি বল নিয়ে খেলছিলাম। বলটি গিয়ে আল-মুআফি বিন ইমরান আল-হিমসির সামনে পড়ল। বলটি নিতে তাঁর কাছে গেলাম।
তখন তিনি জিজ্ঞেস করলেন, "তুমি কার ছেলে?”
আমি বললাম, "আওফ বিন সুফইয়ানের ছেলে।”
তিনি বললেন, “আরে! তোমার পিতা তো আমার সাথি ছিলেন। তিনি আমাদের সাথে বসে হাদিস লিখতেন, ইলম শিখতেন। তোমার উচিত তোমার পিতার পদাঙ্ক অনুসরণ করা।”
এরপর আমি আমার মায়ের কাছে গেলাম। তাকে এই ঘটনা শোনালাম। মা বললেন, “ঘটনা সত্য। তিনি তোমার পিতার বন্ধু।”
মা আমাকে একটি লুঙ্গি ও কাপড় পরিয়ে দিলেন। আমি আল-মুআফির নিকট চলে এলাম। সাথে দোয়াত-কলম আর কাগজ নিয়ে আসলাম। তখন তিনি বললেন, “লেখো, ইসমাইল বিন আইয়াশ বর্ণনা করেন আব্দুর রহমান বিন সুলাইমান থেকে, তিনি বলেন, একটি ফলকে উম্মে দারদা আমাকে লিখে পাঠিয়েছিলেন-“তোমরা ছোট বয়সে ইলম শেখো। বড় হয়ে সে ইলম মানুষকে শেখাবে। প্রত্যেক কৃষক সে ফসলই ঘরে তুলবে, যা সে চাষ করেছে।””
এই ঘটনার ফলাফল কী ছিল?
এ বালক মহান এক ব্যক্তিত্বে পরিণত হয়েছেন। যার ব্যাপারে ইমাম জাহাবি রহ. বলেন, 'ইমাম, হাফিজ, মুজাওবিদ, হিমসের মুহাদ্দিস, জাফর আত-তায়ি আল-হিমসি।'
ইমাম আহমাদ বিন হাম্বল রহ. বলেন, 'চল্লিশ বছর যাবৎ শামে মুহাম্মাদ বিন আওফের দ্বিতীয় কোনো উদাহরণ ছিল না।'৪০
অনেক সময় আপনি আপনার চেয়ে মর্যাদায় কম লোকদের থেকেও বুদ্ধি পাবেন। সেটাকে তুচ্ছ মনে করবেন না; যদিও সে বুদ্ধি একটি প্রাণী বা কীট থেকেই আসুক না কেন।
সুলাইমান আ. হুদহুদ পাখির সংবাদের ভিত্তিতে বিরাট একটি দাওয়াহ-লক্ষ্য বাস্তবায়নের সুযোগ সম্পর্কে অবগত হয়েছেন। এরপর সে সুযোগ যথাযথ কাজে লাগিয়েছেন। যার ফলস্বরূপ সাবার রানি বলতে বাধ্য হয়েছিলেন, কুরআনের ভাষায় যার বর্ণনা-
قَالَتْ رَبِّ إِنِّي ظَلَمْتُ نَفْسِي وَأَسْلَمْتُ مَعَ سُلَيْمَانَ لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ
'সে বলল, “হে আমার পালনকর্তা, আমি তো নিজের প্রতি জুলুম করেছি। আমি সুলাইমানের সাথে বিশ্বজাহানের পালনকর্তা আল্লাহর কাছে আত্মসমর্পণ করলাম।”'৪১
নাহুর প্রসিদ্ধ এক ইমাম কাসায়ি রহ.। একটি পিঁপড়া থেকে উপকার গ্রহণ করেছেন। তার জীবনীতে উল্লেখিত হয়েছে—তিনি ইলমে নাহু শিক্ষা শুরু করেন, কিন্তু তার কাছে এটি কঠিন মনে হলো। তাই ছেড়ে দেওয়ার ইচ্ছা করলেন। একদিন তিনি শুয়ে ছিলেন। দেখলেন একটি পিঁপড়া খাদ্য নিয়ে দেওয়ালে উঠতে চেষ্টা করছে। কিন্তু প্রতিবারই কিছুটা উঠে পড়ে যাচ্ছে। এভাবে কিছুক্ষণ চেষ্টা করার পর সে এক সময় উঠে গেল । তিনি এই ঘটনা থেকে শিক্ষা গ্রহণ করলেন। পূর্ণোদ্যমে ইলমে নাহুর পেছনে চেষ্টায় রত থাকলেন। শেষ পর্যন্ত নাহুর একজন ইমামে পরিণত হলেন।
অথবা নিজের সাথে ঘটে যাওয়া কোনো ঘটনা থেকে পরিকল্পনার বুদ্ধি আসে :
- ইবনে হাজিম রহ.। ‘মুহাল্লা' কিতাবের সংকলক। ফিকহের ক্ষেত্রে বিশেষ পাণ্ডিত্যের অধিকারী ছিলেন তিনি। তাঁর ফিকহ শেখার কারণ ছিল একটি জানাজা। একদিন তিনি এক জানাজায় অংশগ্রহণ করেছিলেন। সেখানকার মসজিদে প্রবেশ করলেন তিনি। কোনো নামাজ না পড়েই বসে গেলেন। এক ব্যক্তি এসে তাঁকে বললেন, 'দাঁড়াও এবং দুই রাকআত তাহিয়্যাতুল মসজিদের নামাজ পড়ো।' তখন তাঁর বয়স ২৬ বছর।
তিনি বলেন, 'আমি দাঁড়ালাম দুই রাকআত নামাজ পড়লাম। এরপর যখন জানাজার নামাজ শেষ করে মসজিদে প্রবেশ করে নামাজ পড়া শুরু করলাম। তখন আমাকে বলা হলো, "বসো, বসো, এখন নামাজের সময় নয়।" সময়টা ছিল আসরের পরের।'
তিনি বলেন, 'আমি ফিরে আসলাম। খুব চিন্তিত হয়ে পড়লাম। আমার শিক্ষক, যিনি আমার প্রতিপালনের দায়িত্বে ছিলেন—তাকে বললাম, “আমাকে ফকিহ আবু আব্দুল্লাহ বিন দাখুনের বাড়ির ঠিকানা বলে দিন!””
তিনি বলেন, 'আমি তাঁর বাড়ি চলে গেলাম। ঘটনাটি তাঁকে খুলে বললাম। আমাকে তিনি মুয়াত্তা মালিকের নির্দেশনা দিলেন। আমি তাঁর নিকট মুয়াত্তা অধ্যয়ন করতে শুরু করলাম। এভাবে তিন বছর যাবৎ তাঁর কাছে এবং অন্যদের কাছে কিতাব অধ্যয়নরত ছিলাম।' সর্বশেষ তিনি বহস করা শুরু করলেন। ৪২
ইমাম সিবওয়াহি। নাহুর আরেকজন ইমাম। নাহু-জ্ঞানে তাঁর দৃঢ়তা অর্জনের, ইলমে নাহুর জন্য তাঁর পরিকল্পনা গ্রহণের শুরুটা হলো এমন- তিনি শুরুতে মুহাদ্দিস ও ফকিহদের সাথি ছিলেন। হাম্মাদ বিন সালামার নিকট তিনি লেখা পেশ করতেন। একদিন তিনি লেখায় কিছু ভাষাগত ভুল করলেন। তাই তাঁর লেখা গ্রহণ করা হয়নি।
তখন তিনি বললেন, 'আমি এই বিষয়ে এত ইলম শিখব যে, আমাকে কখনো বলা হবে না যে, তুমি ভাষাগত ভুল করেছ।'
এরপর তিনি নাহু শিখতে আরম্ভ করলেন। খলিল বিন আহমাদের সাথে লেগে থাকলেন। ফলাফল! আজ পর্যন্ত তিনি নাহুর একজন বড় ইমাম হিসেবে সমাদৃত হচ্ছেন। যদিও তিনি মাত্র বত্রিশ বছর জীবিত ছিলেন। কেউ কেউ বলেন, চল্লিশের কাছাকাছি বয়সে তিনি মৃত্যুবরণ করেছেন।৪৩
কখনো আপনার পরিকল্পনাটা অন্যের শুরু করা পরিকল্পনার পূর্ণতা হতে পারে। এতে কোনো অসুবিধা নেই; বরং এটা অন্যের ওপর অনুগ্রহ হলো। যেসব পরিকল্পনা একজন শুরু করেছেন, আর অন্যজন পূর্ণতা দান করেছেন, এর একটি চমৎকার উদাহরণ হলো-কুরআন শরিফ একত্র করা। প্রথমে আবু বকর রা. একত্রকরণের পরিকল্পনাটি গ্রহণ করলেন। এরপর উসমান রা. এ কাজটি সুসমাপ্ত করলেন।
ইমাম নববি রহ. 'আল-মাজমু শারহুল মুহাজজাব' সংকলন শুরু করেছেন। এই কিতাবে নিজের ইলম ঢেলে দিয়েছেন। কিতাবটির ব্যাপারে ইবনে কাসির রহ. বলেন, 'যদি আল্লাহ তাআলা উনাকে কিতাবটি পূর্ণ করার তাওফিক দিতেন, তবে এটি আহকামের ব্যাপারে একটি অদ্বিতীয় কিতাব হতো—যেরকম কিতাব ইতিপূর্বে লেখা হয়নি।' কিন্তু তিনি ইনতিকাল করেন। কিতাবটি অসম্পূর্ণ রেখে যান। বাবুর রিবা (সুদের অধ্যায়) পর্যন্ত সমাপ্ত করে যেতে পেরেছিলেন তিনি।
তারপর আসলেন তাকিউদ্দিন আস-সুবকি রহ.। বাবুর রিবা থেকে বাবুত তাফলিস৪৪ পর্যন্ত পূর্ণ করলেন। তারপর অনেক বছর ও যুগ চলে যায়। এরপর আসলেন শাইখ মুহাম্মাদ নজিব আল-মুতিয়ি। তিনি এসে কিতাবটি পূর্ণ করলেন।
তাফসিরুল জালালাইন: জালালুদ্দিন মহল্লি রহ. সুরা কাহফ থেকে শুরু করে সুরা নাস পর্যন্ত তাফসির লিখলেন। এরপর সুরা ফাতিহার তাফসির শুরু করলেন। এ সুরা পর্যন্ত তাফসির শেষ করার পর ইনতিকাল করেন।
অতঃপর জালালুদ্দিন সুয়ুতি রহ. তাফসিরটি পূর্ণতা দান করেন। তিনি জালালুদ্দিন মহল্লির পদ্ধতি অনুসারে সুরা বাকারা থেকে শুরু করে সুরা ইসরার শেষ পর্যন্ত তাফসির সম্পন্ন করলেন।
- 'আজওয়াউল বায়ান ফি ইজাহিল কুরআন বিল কুরআন' সংকলন শুরু করেছেন মুহাম্মাদ আল-আমিন আশ-শানকিতি রহ.। সুরা মুজাদালার শেষ পর্যন্ত তাফসির পূর্ণ করেছিলেন তিনি। তারপর তাঁর ছাত্র শাইখ আতিয়্যাহ মুহাম্মাদ সালিম রহ. এ অনন্য তাফসির গ্রন্থটি সম্পূর্ণ করলেন।
বাইতুল মুকাদ্দাস বিজয় : বাদশাহ নুরুদ্দিন জিংকি রহ.। ক্রুসেডারদের হাত থেকে বাইতুল মুকাদ্দাস বিজয় নিজের হাতে হবে বলে আশা করতেন। তাই বিজয়ের পর মসজিদে আকসায় স্থাপন করবেন বলে বিশাল একটি মিম্বার বানালেন। তিনি বাইতুল মুকাদ্দাস বিজয়ে তাঁর জিহাদি কার্যক্রম শুরু করলেন। কিন্তু বাইতুল মুকাদ্দাস বিজয়ের আগেই তিনি মৃত্যুবরণ করলেন। রহিমাহুল্লাহ। এরপর আল্লাহ তাআলা কুদসের বিজয় দিলেন তাঁরই এক অনুসারীর হাতে। যাকে আমরা সালাহুদ্দিন আইয়ুবি নামে জানি। রহিমাহুল্লাহ।
কখনো একটি প্রকল্পে একাধিক ব্যক্তি অংশগ্রহণ করে পূর্ণ করে থাকেন। আব্দুর রহমান বিন কাসিম ও তাঁর ছেলে মুহাম্মাদ-এর প্রকল্প। শাইখুল ইসলাম ইবনে তাইমিয়া রহ.-এর ফতোয়া একত্র করতে সংকলনের পরিকল্পনা হাতে নিলেন। শাইখ আব্দুর রহমান বিন কাসিম তাঁর ছেলেকে নিয়ে বিভিন্ন শহর ও দেশ চষে বেড়িয়েছেন। নজদ, মক্কা, ইরাক, সিরিয়া, লেবানন, মিশর ও প্যারিস ইত্যাদি জায়গায় সফর করেছেন। ইবনে তাইমিয়া রহ.-এর পাণ্ডুলিপিগুলো সংগ্রহ করেছেন। পরিশেষে আমাদেরকে ৩৭ খণ্ডের এই বিশাল কিতাবটি উপহার দিলেন। উপহার দিলেন একটি বিরাট ও মহান কাজ।
কখনো কখনো পরিকল্পনাটি অভ্যন্তরীণ হয়, বাহ্যিক নয়। যেমন: সালমান আল-ফারসি রা.-এর সত্যসন্ধানী সফর। জাইদ বিন আমর বিন নুফাইল। যিনি সিরিয়ায় গমন করেছিলেন সত্য দ্বীনের সন্ধানে। অবশেষে ইবরাহিম আলাইহিস সালাম-এর একনিষ্ঠ দ্বীন পেলেন সেখানে।
টিকাঃ
৩৭. সিয়ারু আ'লামিন নুবালা : ১২/৪০১
৩৮. সিয়ারু আ'লামিন নুবালা : ১/৩৬
৩৯. কিরাআত ও তাজবিদ-শাস্ত্রজ্ঞ
৪০. সিয়ারু আ'লামিন নুবালা: ১২/৬১৩-৬১৫
৪১. সুরা আন-নামল: ৪৪
৪২. সিয়ারু আ'লামিন নুবালা: ১৮/১৯৯
৪৩. আল-বিদায়াহ ওয়ান-নিহায়াহ: ১০/১৭৬
৪৪. (কাউকে দেওলিয়া ঘোষণা করা অধ্যায়)- অনুবাদক।