📘 সফলতার জন্য চাই উত্তম পরিকল্পনা > 📄 পরিকল্পনার আছে নানান ধরন

📄 পরিকল্পনার আছে নানান ধরন


সৃষ্টির ব্যাপারে আল্লাহ তাআলার একটি নীতি হচ্ছে, যেভাবে তিনি রিজিক, স্বভাব ও আখলাক ভাগ করে দিয়েছেন-সেভাবে তিনি প্রতিভা ও যোগ্যতাকেও সৃষ্টির মাঝে ভাগ করে দিয়েছেন। তাদের ভিন্ন ভিন্ন বিষয়ে যোগ্যতা দিয়েছেন। ভাষা ও বর্ণের ন্যায় তাদের বিবেক ও বোধশক্তিতেও তাদেরকে পৃথক করে সৃষ্টি করেছেন।
وَمِنْ آيَاتِهِ خَلْقُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ وَاخْتِلَافُ أَلْسِنَتِكُمْ وَأَلْوَانِكُمْ
'তাঁর আরও এক নিদর্শন হচ্ছে, নভোমণ্ডল ও ভূমণ্ডলের সৃজন এবং তোমাদের ভাষা ও বর্ণের বৈচিত্র্য।'২৬
আর এই পার্থক্যটা দ্বীনি ও দুনিয়াবি-উভয় ক্ষেত্রেই বিদ্যমান। দ্বীনি বিষয়ে কেউ সালাতের ব্যাপারে অগ্রগামী। কেউ সদাকার ব্যাপারে, কেউ সিয়ামের ব্যাপারে, কেউ কুরআন অধ্যয়ন ও অধ্যাপনার ব্যাপারে অগ্রগামী। কেউ হন আকিদাশাস্ত্রে বিশেষজ্ঞ বা মুহাদ্দিস অথবা ফকিহ কিংবা মুফাসসির।
কাউকে আগ্রহী করা হয়েছে-অভাবীদের সাহায্য, অসহায়দের সহযোগিতা, মানুষের চিন্তা মুক্তকরণ, ঋণ পরিশোধকরণ, এতিমের খরচ বহন এবং তাদের দেখাশোনা করা, তাদের প্রতি সমবেদনা প্রকাশ করা, তাদের শিক্ষা-দীক্ষার ব্যবস্থা করা এবং তাদের রক্ষণাবেক্ষণ করার প্রতি। এভাবে সে অবিরাম কাজ চালিয়ে যাচ্ছে তার আগ্রহের বিষয়ে।
আবার কারও জন্য উন্মোচন করা হয়েছে—মানুষের ব্যাপারে সুপারিশ, সংশোধনে অগ্রগামী হওয়ার মতো কাজকে। ফলে সে কোনো বন্দীকে মুক্ত করতে অবদান রাখে। কারও রক্তের নিরাপত্তা বিধান করে। মন্দকে প্রতিরোধ করে। প্রাপককে তার অধিকার বুঝিয়ে দেয়। বাতিলকে বাধা প্রদান করে। অবিচার বন্ধ করে।
আর পার্থিব বিষয়ে কেউ চিকিৎসা-বিদ্যায় অগ্রগামী। কেউ আবার প্রকৌশলে কিংবা ব্যবসা, টেকনোলজি, মার্কেটিং ইত্যাদি ক্ষেত্রে অগ্রগামী।
আর কারও কারও রয়েছে নিজেকে পবিত্র রাখার জন্য একটি বিয়ের পরিকল্পনা। আবার কারও ডক্টরেট অর্জনের পরিকল্পনা। কারও থাকে গৃহ নির্মাণের প্ল্যান। তো কারও থাকে গাড়ি কেনার লক্ষ্য। কারও কোনো কোম্পানির চাকরি কিংবা দাতব্য প্রতিষ্ঠান চালু করা বা দাওয়াহ অঙ্গনে কাজ করার আগ্রহ। কারও আবার কোনো ভাষা শিক্ষার পরিকল্পনা ইত্যাদি।
কিছু পরিকল্পনা আছে, যা বাস্তবায়নে সুদীর্ঘ সময় প্রয়োজন। কখনো এমন পরিকল্পনা সম্পাদনে কয়েক বছর লেগে যায়। যেমন: উচ্চ শিক্ষা, একটি নেককার পরিবার গড়ে তোলা ও দাওয়াহ প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করা ইত্যাদি।
আবার কিছু পরিকল্পনা আছে সংক্ষিপ্ত সময়ের, যার সীমাটা দুই-এক বছরের। যেমন : পবিত্র কুরআন মুখস্থ করার পরিকল্পনা, কোনো ভাষা শিক্ষা করা বা কম্পিউটার প্রশিক্ষণ, কোনো দাতব্য কর্মে অংশগ্রহণ, কোনো লেকচার-অনুষ্ঠানের প্রচার-প্রসার, অথবা কোনো বই-পুস্তক, অডিও-ভিডিও ক্যাসেট বা দাওয়াহ উপকরণ বিতরণের মাধ্যমে কোনো দাওয়াহ কাজে অংশগ্রহণ করা। অথবা একটি সাক্ষাৎ বা আলোচনা সভার আয়োজন। দাতব্য প্রতিষ্ঠানগুলোর গৃহীত পরিকল্পনাতে সাহায্য করা; যেমন : কোনো রোজাদারের ইফতারের ব্যবস্থা করা, অভাবী ও দরিদ্র পরিবারের প্রয়োজনীয় জিনিস তাদের মাঝে বিতরণ করে দেওয়া এবং এতিমের ভরণপোষণের দায়িত্বগ্রহণ করা ইত্যাদি।
কিছু পরিকল্পনা আছে, যা মৌলিক-যার জন্য মনোযোগ ও ঢের সময়ের প্রয়োজন পড়ে। আবার কিছু পরিকল্পনা শাখাগত।
কিছু পরিকল্পনার জন্য মানুষের পুরো সময় ব্যয় করতে হয়। কিছু পরিকল্পনা আছে, যার কয়েকটির মাঝে সমন্বয় করে তা পূর্ণ করা সম্ভব।
কিছু আছে একক পরিকিল্পনা। কিছু আছে সম্মিলিত পরিকল্পনা। তবে সম্মিলিত পরিকল্পনা সফলতার জন্য বেশি উপকারী ও সম্ভাবনাময়।
তাই বলা যায়, পরিকল্পনা অনেক-দাওয়াহসংক্রান্ত, ইলমি, সামাজিক, ব্যবসায়িক, মিডিয়াভিত্তিক ইত্যাদি নানান ধরনের পরিকল্পনাই রয়েছে।
দাওয়াহ পরিকল্পনা
যেমন: শহরাঞ্চলের পরিবারগুলোকে জমা করে তাদের সামনে (দ্বীনি বিষয়ে) আলোচনা করা; কিছু দাওয়াহ-উপকরণ ক্রয় করে তা বিভিন্ন কর্মশালা, কারখানা ও কোম্পানির অফিসে বিতরণ করা; হাসপাতাল বা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোকে দাওয়াহর মাধ্যমে আলোকিত করা; ফতোয়া বা দিক-নির্দেশনাসংবলিত কোনো ব্যানার টানিয়ে দেওয়া; দাওয়াতি চিঠিপত্র প্রেরণ, মেইলে বার্তা প্রেরণ বা মোবাইল ম্যাসেজিং করা; ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ার মাধ্যমে বিভিন্ন ফোরামে দাওয়াহ কাজের প্রচার-প্রসার করা।
ইলমি পরিকল্পনা
যেমন: মুসলিমদের জন্য প্রশাসনিক, মানবিক বা চিকিৎসাসংক্রান্ত বিষয়ে লিখিত কল্যাণকর কোনো প্রবন্ধের অনুবাদ করা; উপকারী বিষয় পাঠ করা; কোনো আলোচনা বা দরস সাজানো; গ্রন্থ রচনা করা; হাদিস মুখস্থ করা; সহায়ক কিছু শিক্ষা করা যেমন : বিভিন্ন ভাষা, কম্পিউটার, ইন্টারনেট, সামাজিক, রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক বিষয়ে জ্ঞান অর্জন—এসবের যা কিছু বাস্তবায়ন ও অনুশীলন সম্ভব, তা অনুশীলন করা।
ইবাদতকেন্দ্রিক পরিকল্পনা
যেমন : বিশর বিন হারিস রহ.-এর অজিফা ছিল দৈনিক কুরআনের এক-তৃতীয়াংশ পাঠ করা। উরওয়াহ বিন জুবাইর দেখে দেখে কুরআনের এক-চতুর্থাংশ পাঠ করতেন। রাতের বেলা কিয়ামে তা তিলাওয়াত করতেন। যে রাতে তাঁর পা কেটে গিয়েছিল, কেবল সে রাতে তাঁর এ আমল ছুটে যায়। আর ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল রহ. প্রতি রাতে এক-সপ্তমাংশ পাঠ করতেন। এভাবে প্রতি সাত রাতে এক খতম দিতেন।
সামাজিক প্রকল্প
যেমন : বিবাহ-শাদি করানো, হাসপাতালে রোগীদের দেখতে যাওয়া ও তাদের সহযোগিতা করা, দরিদ্র পরিবারের দায়ভার গ্রহণ করা। আলি বিন হুসাইন জাইনুল আবিদিন রহ. রাতের আঁধারে পিঠে করে খাদ্য বহন করে মিসকিনদের অনুসন্ধানে বের হয়ে যেতেন। মদিনায় কিছু লোক ছিল যারা জানত না তাদের খাদ্য কোথা হতে আসে। যখন আলি বিন হুসাইন মারা গেলেন, তখন তাদের কাছে রাতের খাবার আসা বন্ধ হয়ে গেল। তাঁর মৃত্যুর পর পিঠে অনেকগুলো চিহ্ন দেখা গেল, যা রাতের বেলা বিধবা মহিলাদের ঘরে খাবার বহনের কারণে হয়েছিল। ২৭
ব্যবসায়িক প্রকল্প
যেমন : ছোট কোনো দোকান দিয়ে শুরু করা। এক লোক গাড়ির খুচরা যন্ত্রাংশ ও গাড়ি পরিস্কার করার কাজ নিয়ে ছোট একটি ব্যবসা চালু করল। পরবর্তীকালে তা বিশ বছরেরও কম সময়ে এত বড় এক কোম্পানিতে পরিণত হলো, যার একত্রিশটি শাখা প্রতিষ্ঠিত হয়ে ছিল। তাদের বর্ধনশীল মূলধনের পরিমাণ শত শত মিলিয়ন ডলারে পৌঁছে; বরং সম্ভবত বিলিয়ন ডলারে পৌঁছে যায়।
অনেক প্রতিষ্ঠান ও কোম্পানি প্রাথমিক পর্যায়ে ছোট একটি প্রকল্প ছিল। যেমন : গুগল সার্চ ইঞ্জিন। মুদ্রা পরিবহন ব্যবসা প্রাথমিক পর্যায়ে ছোট ছিল। পরে সেটা বিশাল হুন্ডি কোম্পানিতে পরিণত হয়েছে। ছোট একটি হোটেল থেকে অনেকগুলো হোটেলের স্বতন্ত্র একটি হোটেল-প্রতিষ্ঠানে রূপ পেয়েছে।
উন্নয়ন প্রকল্প
কোনো পেশার কারিগরি দিকগুলো শেখা ও শিল্প ইত্যাদি শেখা।
মিডিয়া প্রকল্প
যেমন : কোনো চ্যানেল কিংবা ওয়েবসাইট গড়ে তোলা অথবা কোনো ম্যাগাজিন বের করা।

টিকাঃ
২৬. সুরা আর-রুম: ২২
২৭. সিয়ারু আ'লামিন নুবালা: ৪/৩৯৩

📘 সফলতার জন্য চাই উত্তম পরিকল্পনা > 📄 প্রত্যেক যুবকই এক একটি পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে সক্ষম

📄 প্রত্যেক যুবকই এক একটি পরিকল্পনা বাস্তবায়ন করতে সক্ষম


প্রত্যেক মুসলিমের মাঝেই এমন কিছু বৈশিষ্ট্য রয়েছে, যার কারণে সে অন্যদের থেকে স্বতন্ত্র। প্রত্যেকের মাঝেই এমন কিছু উদ্ভাবনী প্রতিভা রয়েছে, যা তাকে বড় করে তোলে। এ যোগ্যতার বিকাশ ঘটানো উচিত; যেন মুসলিমরা তা থেকে উপকৃত হতে পারে। কারণ, যে ব্যক্তি নিজ স্বার্থে জীবনযাপন করে, তার জীবন ছোট ও তুচ্ছতায় কাটে। এভাবেই একদিন সে মারা যায়। আর যে উম্মাহর জন্য বাঁচার চেষ্টা করে, সে মহান হয়ে বেঁচে থাকে এবং মহান হয়েই মৃত্যুবরণ করে।
আর যার কাছে নিজের কোনো শক্তি ও বৈশিষ্ট্য স্পষ্ট নয়, সে যেন কোনো শক্তি ও বৈশিষ্ট্য অন্বেষণ করে তা অর্জন করে নেয়। তার উন্নতি ও অগ্রগতি সাধন করে। এমন কোনো মানুষ নেই যে, তার নির্দিষ্ট কোনো স্বতন্ত্র প্রতিভা বা শক্তি থাকে না।
পৃথিবীর বুকে প্রত্যেক মানুষই এক একজন প্রতিভাবান, এক একজন সৃজনশীল ব্যক্তিত্বের অধিকারী। উসামা বিন জাইদ রা. এমন একটি সেনাবাহিনীকে সুন্দরভাবে পরিচালনা করেছিলেন, যেখানে বড় বড় সাহাবিগণ উপস্থিত ছিলেন। অথচ তখন তাঁর বয়স বিশ বছরও অতিক্রম করেনি। ২৮
আফরার দুই ছেলে মুআজ ও মুআওবিজ রা.। এই উম্মাহর ফিরাউন আবু জাহিলকে হত্যার জন্য তাঁরা উদগ্রীব ছিলেন। উন্মুক্ত তরবারি নিয়ে তার ওপর ঝাঁপিয়ে পড়েন। তাকে তলোয়ারে আঘাত করেন। শেষ পর্যন্ত তাকে হত্যাও করে দেন। ২৯
ইবনে আব্বাস রা.। কুরআনের ভাষ্যকার। অল্প বয়সেই দ্বীনি ইলম ও কুরআনের আয়াত বোঝা ও মুখস্থের ক্ষেত্রে তথ্যসূত্রে পরিণত হয়েছেন।
ইমাম শাফিয়ি র. বলেন, 'আমি সাত বছর বয়সে কুরআন মুখস্থ করেছি। মুয়াত্তা মুখস্থ করেছি দশ বছর বয়সে।'৩০
অনেক মানুষই জানে না যে, আল্লাহ তাআলা তাকে কী কী নিয়ামতে ভূষিত করেছেন। আপনি যদি তাকে বলেন, তুমি কুরআনের কিছু অংশ মুখস্থ করার একটি পরিকল্পনা করো অথবা ইলমি কোনো বিষয় মুখস্থের পরিকল্পনা করো। তবে সে বলবে, 'আমার স্মৃতিশক্তি দুর্বল। বোধশক্তি আমার সীমাবদ্ধ। আমি মুখস্থ করতে পারি না।' এমনটা বলার কারণ হলো, সে এ ব্যাপারে কোনো উদ্যোগই গ্রহণ করেনি। যদি করত, তবে এ বিষয়ে তার মূর্খতা প্রকাশ পেয়ে যেত-সে ভুল প্রমাণিত হতো।

টিকাঃ
২৮. আল-বিদায়াহ ওয়ান-নিহায়াহ: ৬/২০৪
২৯. সহিহুল বুখারি: ৪০২০, সহিহু মুসলিম: ১৮০০
৩০. সিয়ারু আ'লামিন নুবালা: ১৯/৭

📘 সফলতার জন্য চাই উত্তম পরিকল্পনা > 📄 প্রতিভা বিকাশে কিছু নির্দেশনা

📄 প্রতিভা বিকাশে কিছু নির্দেশনা


একটি শিশুর প্রতিভা ও যোগ্যতা কোন খেলনার প্রতি তার আগ্রহ বিদ্যমান, এর মাধ্যমেই বোঝা সম্ভব। বর্তমানে ম্যাকানিক খেলনা রয়েছে। আঁকাজোকা করা, রং করার খেলনা রয়েছে। মিলানো, খোলা-যুক্ত করাসহ ইত্যাদি হরেক রকমের খেলনা রয়েছে।
ইবনুল কাইয়িম রহ. বলেন :
'একটি শিশুর শিশুকালের অবস্থার ওপর, যে কাজের জন্য সে নিজেকে প্রস্তুত করে, গঠন করে...তার বিপরীত কিছু তাকে চাপিয়ে দেওয়া যাবে না।... কারণ, সে যে জিনিসের জন্য প্রস্তুত নয় সেটা তার ওপর চাপিয়ে দিলে তাতে সে সফল হবে না; বরং যার জন্য সে প্রস্তুত ছিল, তা ছুটে যাবে।
যখন দেখা যাবে যে, তার বোধশক্তি ভালো, বুঝশক্তি পরিষ্কার, ধীশক্তি প্রখর। তবে এমনটা শিক্ষা অর্জনের জন্য তার সক্ষমতার চিহ্ন প্রকাশ করে। প্রকাশ করে সে ইলম শেখার জন্য প্রস্তুতিসম্পন্ন। তাই তার শূন্য হৃদয়ের ফলকে যেন ইলমের ভালোবাসা এঁকে দেওয়া হয়—তাহলে তা হৃদয়ে বসে যাবে এবং স্থির হয়ে যাবে। সাথে সাথে আগ্রহ বৃদ্ধি পেতে থাকবে।
কিন্তু যদি সবদিক থেকেই এর বিপরীত পরিলক্ষিত হয়। সে অশ্বারোহণ ও তার আসবাব, নিক্ষেপণ যন্ত্র ও বর্শা নিয়ে খেলা করে; ইলমের প্রতি তার কোনো আগ্রহ দৃষ্টিগোচর না হয়; নিজেকে এ জন্য গড়ে না তোলে—তবে তার জন্য অশ্বারোহণ ও তার অনুশীলন সহজলভ্য করে দিতে হবে। কারণ, এটি তার জন্য ও মুসলিমদের জন্য বেশি কল্যাণকর।
যদি তার আগ্রহ বিপরীত পরিলক্ষিত হয়। সে নিজেকে এ জন্য প্রস্তুত না করে; বরং তার দৃষ্টি থাকে কোনো কারিগরি পেশার প্রতি; এ জন্য নিজেকে সে প্রস্তুত করে, এর প্রতি আগ্রহ দেখায়-আর পেশাটাও যেহেতু উপকারী ও মুবাহ-তবে তার জন্য সেই সুযোগ করে দেওয়া উচিত।’৩১
মুসলিম উলামাগণ প্রতিভা ও শক্তির উদ্ভাবন করতেন। নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম-এর নিকট যখন কেউ নির্দিষ্ট কোনো যোগ্যতা নিয়ে উপস্থিত হতো, তখন তার সে যোগ্যতাকে তিনি সরাসরি কাজে লাগিয়ে দিতেন। আবু মাহজুরাহ রা. ইসলাম-পূর্ব জাহিলি যুগে গায়ক ছিলেন। রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম তার আওয়াজ শুনে বললেন :
اذْهَبْ فَأَذَّنْ عِنْدَ الْبَيْتِ الْحَرَامِا
'তুমি গিয়ে বাইতুল হারামের নিকট আজান দাও।'৩২
সুফইয়ান সাওরি রহ. ওয়াকি ইবনুল জাররাহ রহ.-এর দুচোখে তাকিয়ে বললেন, 'তোমরা দেখবে যে, এই লোকটি মহান হবে। মর্যাদাবান না হয়ে সে ইনতিকাল করবে না।'৩৩
ইমাম আবু হানিফা রহ. আবু ইউসুফ রহ.-এর মাঝে এবং মালিক রহ. শাফিয়ি রহ.-এর মাঝে তাদের মর্যাদাকর হওয়ার ব্যাপারটি নিরীক্ষণ করে বুঝতে পেরেছিলেন। ইমাম শাফিয়ি রহ. বলেন, 'যখন তিনি আমার কথা শুনলেন, তখন কিছুক্ষণ আমার দিকে তাকিয়ে থাকলেন। ইমাম মালিক রহ. ফিরাসাহ-সমৃদ্ধ ছিলেন। নিরীক্ষণ-শক্তির অধিকারী ছিলেন। তিনি আমাকে বললেন, “তোমার নাম কি?” আমি বললাম, “মুহাম্মাদ।” তিনি বললেন, “হে মুহাম্মাদ, আল্লাহকে ভয় করো। গুনাহ থেকে বেঁচে থাকো। নিশ্চয় অচিরেই তুমি বিশাল মর্যাদার অধিকারী হবে।””৩৫
আমি পাঁচ বছর বয়সী একটি শিশু পেলাম। সে কুরআন হিফজ করেছে। আমি তাকে পরীক্ষা করলাম আর অভিভূত হলাম, সে ঠিক ঠিক কুরআনের আয়াতগুলো স্থান-সহ বলে দিচ্ছে! আমি তার পিতাকে তার মুখস্থ-পদ্ধতি সম্পর্কে জিজ্ঞেস করলাম। তিনি বললেন, 'যখন ছেলেটির বয়স দুবছর। তখন তিনি ছোট একটি রুমে অনেকগুলো খেলনা রাখলেন। সেখানে একটি টেপরেকর্ডার চালু করে রাখতেন। সব সময় তাতে কুরআন তিলাওয়াত চলত। অবশেষে যখন ছেলেটি তিন বছর অতিক্রম করল, তখন হিফজ শুরু করে দিল। পাঁচ বৎসর বয়সে হিফজ সম্পন্ন করল।
নিশ্চয় মানুষ অনেক যোগ্যতার অধিকারী। এই শিশুটির মুখস্থশক্তি ছিল প্রচণ্ড। কিন্তু তারবিয়াত, পরিকল্পনা ও পর্যবেক্ষণ, লক্ষ্য স্থির করা ব্যতীত তার হয়তো হিফজ সম্পন্ন করা হতো না। সে এই অঙ্গনের প্রতিভাবান কেউ হতো না। কিন্তু তার পিতার সূক্ষ্ম পর্যবেক্ষণ ও পরিকল্পনা তাকে এই অবস্থানে নিয়ে এসেছে।
অথচ সাধারণভাবে যদি কেউ তাকে হিফজের জন্য বলত, তবে সে বলত, 'আমার স্মৃতিশক্তি দুর্বল। আমার বোধশক্তি কম। আমি করতে পারব না। আমাকে দিয়ে হবে না।' তাহলে হয়তো সে কখনোই পারত না। তাই সূচনাটাই ঠিক মতো হওয়া উচিত।
কতক মানুষ নিজেদের পথে প্রতিবন্ধকতা তৈরি করে রেখেছে। কিংবা প্রতিবন্ধকতা থাকার ভুল ধারণা নিয়ে বসে আছে। কখনো কখনো প্রতিবন্ধকতা থাকলেও তা ছোট হয়। কিন্তু সে এ ছোট ছোট প্রতিবন্ধকতাগুলোকে অনেক বিশাল করে দেখে। কখনো বাধা ঠিকই থাকে। চাইলে সে একে অতিক্রম করতে পারে। কিন্তু সে তা অতিক্রম করতে চায় না। এ ক্ষেত্রে আমি বলব, তোমার কাছে যদি কোনো পরিকল্পনা থাকে। যদি তুমি তা করতে সক্ষম না হও, তবে তা অন্যকে দাও। আল্লাহর রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম কি কতিপয় নফল আমলের বিবরণ দিতে গিয়ে বলেননি যে—
تُعِينُ صَانِعًا أَوْ تَصْنَعُ لِأَخْرَقَ
'কোনো কারিগরকে কর্মে সাহায্য করবে। অথবা কোনো অনিপুণের জন্য তৈরি করবে।'৩৬
অর্থাৎ কাজটি করতে সক্ষম-এমন কোনো কারিগরকে সাহায্য করো। অথবা এমন কোনো নির্বোধের জন্য নিজেই তৈরি করো, যে সুন্দরভাবে তৈরি করতে পারে না; অথবা এমনই অক্ষম যে, একেবারে তৈরি করতেই পারবে না, তুমি তার জন্য তৈরি করে দাও।

টিকাঃ
৩১. তুহফাতুল মাওদুদ বিআহকামিল মাওলুদ: ২৪৩-২৪৪
৩২. সুনানুন নাসায়ি: ৬৩৩; হাদিসটি সহিহ।
৩৩. তারিখু দিমাশক: ৬২/৬৯
৩৪. ইলমুল ফিরাসাহ। মুখ, হাবভাব, চালচলন ইত্যাদি দেখে কারও চরিত্র নির্ণয় করতে পারার বিদ্যা। ইংরেজিতে একে Physiognomy বলে। - অনুবাদক।
৩৫. তারিখু দিমাশক: ৫১/২৮৬
৩৬. সহিহুল বুখারি : ২৫১৮, সহিহু মুসলিম : ৮৪

📘 সফলতার জন্য চাই উত্তম পরিকল্পনা > 📄 পরিকল্পনা যে ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত হবে

📄 পরিকল্পনা যে ভিত্তির ওপর প্রতিষ্ঠিত হবে


পরিকল্পনা যে ভিত্তিগুলোর ওপর প্রতিষ্ঠিত হবে, তন্মধ্যে গুরুত্বপূর্ণ কিছু ভিত্তি হলো :
প্রথমত, পরিকল্পনা নির্ধারণ করা
যথাযথ পরিকল্পনা গ্রহণ একটি গুরুত্বপূর্ণ বিষয়। এ জন্য দরকার পড়ে অনেক চিন্তা-ভাবনা ও অভিজ্ঞ ব্যক্তিদের শরণাপন্ন হওয়ার।
পরিকল্পনাগুলোর কোন পরিকল্পনাটি সর্বোত্তম?
তার মাঝে কোনটি সম্পাদন করা সম্ভব আর কোনটি সম্পাদন করা সম্ভব নয়?
কোন পরিকল্পনাটির প্রতি উম্মাহ মুখাপেক্ষী? কোন পরিকল্পনাটি উম্মাহর জন্য সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন?
পরিকল্পনাকারীকে চূড়ান্ত পরিকল্পনা নির্ধারণের পূর্বে এ গুরুত্বপূর্ণ প্রশ্নগুলোর উত্তর খুঁজতে হবে।
দ্বিতীয়ত, পরিকল্পনা বাস্তবায়ন প্রস্তুতি ও রূপরেখা তৈরি করা
এ পর্যায়ে ব্যাপক একটি অবকাঠামো তৈরি করতে হবে। আবশ্যকীয় উদ্যোগগুলো গ্রহণ করতে হবে। প্রকল্পের লক্ষ্য-উদ্দেশ্য, গুরুত্ব, কাঙ্ক্ষিত ফলাফল, কাজের নকশা ও আবশ্যকীয় সম্ভাবনাসমূহও বের করতে হবে।
তৃতীয়ত, পরিকল্পনা বাস্তবায়ন
পরিকল্পনা নির্ধারণ ও তার নকশা তৈরির পর তা বাস্তবায়ন শুরু করতে হবে। আর এটাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ স্তর।
চতুর্থত, পরিকল্পনার মূল্যায়ন
কখনো কখনো প্রকল্পটি বহিরাগত অনেক প্রতিক্রিয়ার সম্মুখীন হয়। কখনো বাস্তবায়নকালীন বা বাস্তবায়নের পর পরিকল্পনার মাঝে উন্নয়ন সাধিত হয়। তাই চূড়ান্ত ফলাফলকে তার পূর্বের ফলাফলের সাথে মিলিয়ে দেখা জরুরি। যেন জানা যায় যে, পরিকল্পনাটি সফল হয়েছে কি হয়নি।

লিঙ্ক শেয়ার করুন
close

লিঙ্ক কপি করুন

0:00
0:00