📄 লেখকের কথা
الحمد لله رب العالمين، والصلاة والسلام على أشرف المرسلين وعلى آله وصحبه أجمعين. أما بعد.
আল্লাহ সুবহানাহু ওয়া তাআলা মানুষকে নিরর্থক সৃষ্টি করেননি; বরং তিনি মানুষকে মহান এক উদ্দেশ্যে সৃষ্টি করেছেন। তিনি তাদের সৃষ্টি করেছেন যেন তারা পৃথিবীতে যথাযথভাবে তাঁর ইবাদত-বন্দেগি করে। আল্লাহ বলেন : أَفَحَسِبْتُمْ أَنَّمَا خَلَقْنَاكُمْ عَبَثًا 'তোমরা কি ধারণা করো যে, আমি তোমাদের অনর্থক সৃষ্টি করেছি?' অর্থাৎ তোমরা কি এ ধারণা করো যে, আমি তোমাদের অযথা সৃষ্টি করেছি। তোমরা শুধু পানাহার, আনন্দ-ফুর্তি ও পার্থিব ভোগ-বিলাসে লিপ্ত হবে! আর আমিও তোমাদের ছেড়ে দেবো? তোমাদের কোনো আদেশ-নিষেধ করব না এবং প্রতিদান বা শাস্তিও প্রদান করব না?
أَفَحَسِبْتُمْ أَنَّمَا خَلَقْنَاكُمْ عَبَثًا وَأَنَّكُمْ إِلَيْنَا لَا تُرْجَعُونَ
'তোমরা কি ধারণা করো যে, আমি তোমাদের অনর্থক সৃষ্টি করেছি এবং তোমরা আমার কাছে ফিরে আসবে না।”
فَتَعَالَى اللَّهُ الْمَلِكُ الْحَقُّ لَا إِلَهَ إِلَّا هُوَ رَبُّ الْعَرْشِ الْكَرِيمِ
'মহিমান্বিত আল্লাহ, তিনি সত্যিকার মালিক, তিনি ব্যতীত কোনো মাবুদ নেই। তিনি সম্মানিত আরশের মালিক।'৪
উদ্দেশ্যহীন কোনো কিছু সৃষ্টি করার—এমন ভ্রান্ত চিন্তা থেকে তিনি পবিত্র। মানব সৃষ্টির উদ্দেশ্য সম্পর্কে এসব ভ্রান্ত চিন্তা তাঁর প্রজ্ঞার প্রতি ধৃষ্টতাস্বরূপ।
قد هيّؤوك لأمر لو فظنت له * فارباً بنفسك أن ترعى مع الهمل
'তারা তোমাকে এমন একটি বিষয়ের জন্য প্রস্তুত করেছে, যদি তুমি তা উপলব্ধি করতে! (কতই না ভালো হতো!)
সুতরাং অশ্রুতে ভাসার সে ভয়াবহ দিনটি আসার আগেই তুমি সচেতন হয়ে যাও।'
পার্থিব এই জগতে প্রত্যেক মুসলিমেরই কিছু লক্ষ্য-উদ্দেশ্য থাকে। যে লক্ষ্য-উদ্দেশ্য সে বাস্তবায়নের চেষ্টা করে। আর সে লক্ষ্য-উদ্দেশ্যের পুরোটাই আল্লাহ তাআলার ইবাদতের সাথে সম্পৃক্ত থাকে। ইবাদত কেবল নামাজ, রোজা ও জাকাতের মতো দ্বীনের প্রতীকস্বরূপ ইবাদতসমূহের মাঝেই সীমাবদ্ধ নয়; বরং ইবাদত শব্দটি পার্থিব এ জীবনে আল্লাহ তাআলার সন্তুষ্টির লক্ষ্যে মানুষের উচ্চারিত প্রতিটি উপকারী কথা বা মানুষের কৃত প্রতিটি উপকারী কাজকেই অন্তর্ভুক্ত করে।
قُلْ إِنَّ صَلَاتِي وَنُسُكِي وَمَحْيَايَ وَمَمَاتِي لِلَّهِ رَبِّ الْعَالَمِينَ
'আপনি বলুন, আমার নামাজ, আমার কুরবানি, আমার জীবন, আমার মরণ—সবই বিশ্বপ্রতিপালক আল্লাহরই জন্য।
পার্থিব কোনো কাজ হোক বা পরকালীন কোনো কাজ হোক, আল্লাহর জন্য করলে তার সবই ইবাদত বলে গণ্য হবে। তাই একজন মুসলিম জীবনের শেষ নিশ্বাস ত্যাগ করা পর্যন্ত নিজের কাজ অব্যাহত রাখে আল্লাহর সন্তুষ্টির উদ্দেশ্যে।
আপনার জীবনের পরিকল্পনা কী হবে? কীভাবে আপনি সঠিক পরিকল্পনা করবেন? কোন মৌলিক বিষয়গুলোর ওপর ভিত্তি করে সম্পাদন করবেন আপনার কর্মপ্রণালি? এ সকল প্রশ্নের জবাব নিয়েই আমাদের এই পুস্তিকাটি। আল্লাহ তাআলার কাছে নেক কাজে আমাদের হায়াত বৃদ্ধির প্রার্থনা করছি।
وصلى الله وسلم على نبينا محمد وعلى آله وصحبه أجمعين.
টিকাঃ
৩. সুরা আল-মুমিনুন: ১১৫
৪. সুরা আল-মুমিনুন: ১১৬
৫. তাফসিরু ইবনিস সাদি: ৫৬০
৬. সুরা আল-আনআম: ১৬২
📄 মানবজীবনে পরিকল্পনার গুরুত্ব
সালাফে সালিহিন লক্ষ্য-উদ্দেশ্যহীন অকর্মণ্য ব্যক্তিদের ধিক্কার জানাতেন। যেমন ইবনে মাসউদ রা. বলেন :
إِنِّي لَأَمْقُتُ أَنْ أَرَى الرَّجُلَ فَارِعًا لَا فِي عَمِل دُنْيَا، وَلَا آخِرَةٍ
'কাউকে অকর্মণ্য দেখলে আমি বেজায় ক্রুদ্ধ হই। না দুনিয়ার কোনো কাজ করে, না আখিরাতের জন্য কিছু করে।'৭
এ আসারটি উমর রা.-এর বাণী হিসাবে প্রসিদ্ধ। তাঁর বর্ণনাটি এমন :
إني لأكره أن أرى أحدكم سبهللا ، لا عمل دنيا، ولا في عمل آخره.
'আমি তোমাদের কাউকে অকর্মণ্য দেখতে অপছন্দ করি; যে না তার পার্থিব কোনো কাজ করছে, আর না আখিরাতের জন্য কিছু করছে। ৮
সাফারিনি রহ. বলেন, 'سبهللا' শব্দের অর্থ, চলাফেরায় অমনোযোগী-উদাসীন। না পার্থিব কাজে মনোযোগী আর না পরকালীন কোনো কাজের প্রতি আগ্রহী। যেমনটা কামুস অভিধানে আছে, যখন কেউ উদ্দেশ্যহীন চলাফেরা করে, তখন বলা হয় يمشى سبهللا " একজন উদাসীন ব্যক্তি শিক্ষার প্রতিও ব্রতী হয় না যে, কিছুটা শিখে নিল। কোনো কাজও করে না যে, সে কাজকে উপার্জনের মাধ্যম হিসাবে গ্রহণ করতে পারে। কোনো ইবাদতেও মগ্ন হয় না যে, যেন ইবাদতের মাধ্যমে নিজের আত্মা পরিশুদ্ধ করতে পারে। নিজেকে ও নিজের পরিবারকে বাঁচাতে পার্থিব কোনো পেশাও গ্রহণ করে না সে।
সবকিছুতে অবহেলা তার। সময় বয়ে যায়। বছরের পর বছর চলে যায়। কত সুযোগ হাত ছাড়া হয়ে যায়। কিন্তু সময়ের মূল্যায়ন, সময় কাজে লাগানোর চিন্তা পর্যন্ত করতে রাজি নয় সে!
প্রত্যেক মুসলিমের জন্য পার্থিব এ জীবনে এক বা একাধিক পরিকল্পনা থাকা আবশ্যক। কেননা, প্রত্যেকেই নিজের জীবন-যৌবনের ব্যাপারে জিজ্ঞাসিত হবে। ইবনে মাসউদ রা. হতে বর্ণিত, নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন :
لَا تَزُولُ قَدَمُ ابْنِ آدَمَ يَوْمَ القِيَامَةِ مِنْ عِنْدِ رَبِّهِ حَتَّى يُسْأَلَ عَنْ خَمْسٍ، عَنْ عُمُرِهِ فِيمَ أَفْنَاهُ، وَعَنْ شَبَابِهِ فِيمَ أَبْلَاهُ، وَمَالِهِ مِنْ أَيْنَ اكْتَسَبَهُ وَفِيمَ أَنْفَقَهُ، وَمَاذَا عَمِلَ فِيمَا عَلِمَ
'কিয়ামতের দিন আদম সন্তানের পা তার রবের সামনে থেকে ততক্ষণ পর্যন্ত সরবে না, যতক্ষণ না সে পাঁচটি প্রশ্নের জবাব দেয়। তার জীবন সে কোন কাজে নিঃশেষ করেছে? তার যৌবনকাল কীসে ব্যয় করেছে? কোথা থেকে সম্পদ উপার্জন করেছে এবং কোথায় তা ব্যয় করেছে? যে ইলম সে অর্জন করেছে, তার কতটুকু আমল করেছে?'১০
মানুষকে তার সফলতার ভিত্তিতে পরিমাপ করা হয়। বয়সের ভিত্তিতে নয়।
وَنَكْتُبُ مَا قَدَّمُوا وَآثَارَهُمْ، وَكُلَّ شَيْءٍ أَحْصَيْنَاهُ فِي إِمَامٍ مُّبِينٍ
'আর আমি তাদের কর্ম-কীর্তিসমূহ লিপিবদ্ধ করি। প্রত্যেক বস্তু আমি স্পষ্ট কিতাবে সংরক্ষণ করে রেখেছি।'১১
وَنَكْتُبُ مَا قَدَّمُوا ]তারা যা অগ্রে প্রেরণ করেছে, আমি তা লিখে রাখি।']-পার্থিব জীবনে তাদের ভালো-মন্দ আমল ও তাদের জীবনযাপনের ভালো-মন্দ অবস্থাদি আমি লিপিবদ্ধ করে রাখি। وَآثَارَهُمْ [তাদের চিহ্নসমূহ।] অর্থাৎ তাদের মাধ্যমে ভালো ও মন্দের যে নিদর্শন তাদের জীবিত থাকাকালীন এবং পরলোকগমনের পর অস্তিত্বে এসেছে; তাদের কথা, কাজ ও অবস্থা থেকে যে কর্মগুলো সম্পাদিত হয়েছে-তা আমি লিপিবদ্ধ করে রাখি।
نسب ابن آدم فعله * فانظر لنفسك في النسب
'বনি আদমের বংশপরিচয় হচ্ছে তার কর্মে। সুতরাং তুমি কাজের মাধ্যমে দেখে নাও-কী তোমার বংশপরিচয়!'
দেখে নাও, তুমি এই পৃথিবীর তরে কী করেছ? পরকালের জন্য কী প্রেরণ করেছ?
প্রত্যেকেরই উচিত নিজের কিছু নিদর্শন রেখে যাওয়া। মানুষকে তার বয়সের ভিত্তিতে পরিমাপ করা হয় না। কত সময় ধরে সে এ পৃথিবীতে ছিল-সে অনুযায়ী তার মর্যাদা নির্ধারিত হয় না। এমন কত মানুষ ছিল, যারা সুদীর্ঘ বয়স পেয়েছে; অথচ কোনো নিদর্শন না রেখেই দুনিয়া থেকে বিদায় নিয়েছে। আর এমন লোকও অনেক ছিল, যারা পৃথিবীতে অল্প কিছু দিন ছিলেন, কিন্তু মানুষের জন্য স্মরণীয় অনেক কিছু রেখে গেছেন।
ইমাম শাফিয়ি রহ. কত দিন বেঁচে ছিলেন? অথচ তিনি কত অবদান রেখে গেছেন! ইমাম নববি রহ. কত দিন জীবিত ছিলেন? তিনিও অল্প সময়ে কত অবদান রেখে গেছেন! শাইখ হাফিজ আহমাদ হিকামি রহ. কত দিন বেঁচে ছিলেন? কিন্তু কত কিছুই না রেখে গেছেন! এমন আরও অনেক শাইখ আছেন, যাঁরা জীবিত ছিলেন স্বল্প সময়, কিন্তু তাঁদের অবদান অগুনতি। তাঁরা মৃত্যুবরণ করেছেন, কিন্তু তাঁদের কর্ম বেঁচে আছে এখনও। তাই প্রত্যেক যুবকের বাস্তবায়নের জন্য কিছু লক্ষ্য থাকতে হবে। লক্ষ্য পূরণে কিছু পরিকল্পনা থাকতে হবে।
যে নিজের জন্য কোনো লক্ষ্য স্থির করে না, তার জীবন হয় এলোমেলো, অগোছালো। সে পূর্ব-পশ্চিম ও উত্তর-দক্ষিণ নির্ণয়ে তালগোল পাকিয়ে ফেলে। কোনো বিষয়ে সঠিক সিদ্ধান্তে পৌঁছতে সক্ষম হয় না। যে নিজের গন্তব্য সম্পর্কেই জানে না, সে কীভাবে গন্তব্যে পৌঁছবে?
আলি বিন আবি তালিব রা. বলেন :
'প্রত্যেক ব্যক্তির মূল্যায়ন হয় তার সুন্দর কর্মের মাধ্যমে।'১৩
আরিফগণ বলেন, 'প্রত্যেক ব্যক্তির মূল্যায়ন নির্ধারিত হয় তার লক্ষ্য অনুযায়ী।'১৪ এ কারণেই সবচেয়ে সত্য নাম হচ্ছে হারিস ও হুমাম।১৫
টিকাঃ
৭. তাবারানি রহ. কৃত আল-মুজামুল কাবির: ৯/১০৩
৮. জাইলায়ি রহ. বলেন, 'আমি কেবল ইবনু মাসউদ রা. থেকেই এমন বর্ণনা পেয়েছি। -তাখরিজু আহাদিসিল কাশশাফ: ২/৩৫৩।
৯. আল-কামুসুল মুহিত: سبهلل পরিচ্ছেদ দ্রষ্টব্য। লিসানুল আরব: ১১/২২৪, মাদ্দাহ: سبهلل।
১০. সুনানুত তিরমিজি: ২৪১৬; হাদিসটি সহিহ।
১১. সুরা ইয়াসিন : ১২
১২. তাফসিরুস সাদি: ৬৯২
১৩. মুফরাদাতু আলফাজিল কুরআন: ১/২৩৬
১৪. আল-জাওয়াবুস সহিহ : ৬/৩২৯
১৫. ইমাম বুখারি রহ. কৃত আল-আদাবুল মুফরাদ: ৮১৪। হাদিসটি সহিহ। - মানুষের মাঝে প্রোথিত স্বভাবের সাথে মিলযুক্ত নাম হচ্ছে হারিস ও হুমাম। হারিস (حارث) অর্থ, যে কাজ করে। প্রত্যেক মানুষই কিছু না কিছু করে, তাই সে হারিস। হুমام (همام) অর্থ, অনেক ইচ্ছা ও আগ্রহের অধিকারী। এ অর্থে প্রত্যেক মানুষই হুমাম। তাই এ নামদুটি মানুষের জন্য জন্য সবচেয়ে সত্য নাম। -অনুবাদক।
📄 আপনি কোন স্বপ্নটি বাস্তবায়ন করতে চান?
একবার হাজরে আসওয়াদের নিকট আব্দুল্লাহ, মুসআব, উরওয়াহ, ইবনে জুবায়ের বিন আওয়াম ও ইবনে উমর রা. একত্রিত হলেন। ইবনে উমর রা. বললেন, 'তোমাদের কার কী আশা?'
আব্দুল্লাহ রা. বললেন, 'আমি খলিফা হতে চাই।'
উরওয়াহ রহ. বললেন, 'আমি চাই মানুষ আমার কাছ থেকে ইলম শিখুক।'
মুসআব রহ. বললেন, 'আমি ইরাকের নেতৃত্ব চাই। আর তালহার মেয়ে আয়িশা ও হুসাইনের মেয়ে সাকিনাহকে বিয়ে করতে চাই।'
অতঃপর ইবনে উমর রা. বললেন, 'আমি চাই আল্লাহ আমাকে ক্ষমা করুন।'
তারা যে যা কিছুর আশা করেছেন, তা পেয়েছেন। আর আশা করি, ইবনে উমর রা.-কেও আল্লাহ ক্ষমা করে দিয়েছেন।১৬
যুবকদের উচিত বিশাল কিছু অর্জনের চেষ্টা করা। উমর বিন আব্দুল আজিজ রহ. বলেন :
'আমার হৃদয় প্রচণ্ড আগ্রহী। দুনিয়ার যে জিনিসই তাকে দেওয়া হয়, সে তার চেয়ে উত্তমটা পেতে চায়। যখন তাকে দুনিয়ার শ্রেষ্ঠ জিনিস (খিলাফত) দেওয়া হলো, সে এর চেয়েও শ্রেষ্ঠটি (জান্নাত) পেতে চাইল।'১৭
তিনি আরও বলেন :
'হায় আকাঙ্ক্ষা, আমার একটি আগ্রহী আত্মা আছে। সে আব্দুল মালিকের মেয়ে ফাতিমাকে বিয়ে করতে চেয়েছিল। অতঃপর আমি তাকে বিয়ে করেছি। নেতৃত্বের প্রতি আগ্রহী ছিল এবং তা আমি পেয়েছি। খিলাফতের প্রতি আগ্রহী ছিল; আমি তাও পেয়েছি। আর এখন জান্নাতের প্রতি আগ্রহী; আশা করি, ইনশাআল্লাহ সেটাও পাব।'১৮
হুসাইন রা. বলেন, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন :
إِنَّ اللَّهَ يُحِبُّ مَعَالِيَ الْأُمُورِ وَأَشْرَافَهَا، وَيَكْرَهُ سَفَاسِفَهَا
'আল্লাহ তাআলা কর্মের সর্বোত্তম ও সর্বশ্রেষ্ঠটি ভালোবাসেন। এবং নিম্নমানের কাজ অপছন্দ করেন। '১৯
বিশিষ্ট মুত্তাকি দুনিয়াবিমুখ শাইখ শাকিক বিন ইবরাহিম আল-বালখি রহ. (তাসাউফের একজন শাইখ) একদা ইবরাহিম বিন আদহামের সাথে সাক্ষাৎ করেন। ইবরাহিম বিন আদহাম তাকে বললেন, 'আপনার এই অবস্থানে আসার শুরুটা কেমন ছিল?' অর্থাৎ আপনার দুনিয়াবিমুখতা এবং দুনিয়ার্জন পরিহারের কারণ কী ছিল?
শাকিক রহ. : নির্জন এক স্থানে আমি ডানাকাটা একটি পাখি দেখলাম। সুস্থ একটি পাখি তার কাছে নিজের ঠোঁটে করে পোকামাকড় ধরে নিয়ে আসছে তাকে খাওয়াবার জন্য। তখন থেকেই আমি দুনিয়ার্জন বাদ দিয়ে ইবাদতে মগ্ন হয়ে গেলাম।
ইবরাহিম বিন আদহাম রহ. : আপনি সুস্থ পাখির ন্যায় হলেন না কেন, যে অসুস্থ পাখিটিকে আহার করায়? যেন আপনি তার চেয়ে শ্রেষ্ঠ হতে পারেন! আপনি কি নবিজি সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম-এর এই হাদিস শোনেননি? اليَدُ العُلْيَا خَيْرٌ مِنَ اليَدِ السُّفْلَى 'দানকারীর হাত গ্রহণকারীর হাত অপেক্ষা উত্তম। '২০
একজন মুমিনের নিদর্শন হচ্ছে, যেকোনো বিষয়ে সর্বোত্তমটি কামনা করবে; যেন সে নেককারদের মর্যাদায় পৌঁছতে পারে।
তখন শাকিক রহ. ইবরাহিম রহ.-এর হাত নিজের হাতে নিলেন। হাতে চুম্বন করে বললেন, 'হে আবু ইসহাক! আপনিই আমাদের উস্তাজ। '২১
একজন মুসলিম যতক্ষণ না তার কর্মের লক্ষ্য ও সর্বোচ্চ স্থানে পৌঁছে, ততক্ষণ সে পরিতুষ্ট হয় না। যদি সে ছাত্র হয়, তবে সবাইকে অতিক্রম করা ব্যতীত সন্তুষ্ট হয় না। আর যদি পিতা হয়, তবে সন্তান প্রতিপালনে কোনো ত্রুটি করে না। চেষ্টা করে যেন সন্তানরা অন্যদের জন্য আদর্শ হতে পারে। আল্লাহর দিকে পূর্ণ প্রত্যাবর্তনকারীদের দুআ বর্ণনায় আল্লাহ তাআলা বলেন : وَاجْعَلْنَا لِلْمُتَّقِينَ إِمَامًا (যারা দুআ করে এ বলে) আর আমাদেরকে মুত্তাকিদের জন্য আদর্শ বানিয়ে দিন।'২২
এ হাদিসটিতে উচ্চাকাঙ্ক্ষার বিষয়টি লক্ষ করুন-
فَإِذَا سَأَلْتُمُ اللهَ، فَاسْأَلُوهُ الفِرْدَوْسَ، فَإِنَّهُ أَوْسَطُ الجَنَّةِ وَأَعْلَى الجَنَّةِ أُرَاهُ - فَوْقَهُ عَرْشُ الرَّحْمَنِ، وَمِنْهُ تَفَجَّرُ أَنْهَارُ الجَنَّةِ
'যখন তোমরা আল্লাহ তাআলার কাছে (জান্নাত) প্রার্থনা করো, তখন জান্নাতুল ফিরদাওস প্রার্থনা করো। কারণ, এটি সর্বশ্রেষ্ঠ ও সর্বোচ্চ মানের জান্নাত। আমি তার ওপরে রহমানের আরশ দেখেছি। সেখান থেকেই জান্নাতের ঝর্ণাসমূহ প্রবাহিত হয়।'২৩
পরনির্ভর ব্যক্তি-যার দৃষ্টি কেবল নিচের দিকেই যায়, কখনো ওপরের দিকে তাকিয়েও দেখে না-তার কোনো মূল্য নেই, নেই কোনো সম্মান। সে নিজের উন্নতি কামনা করে না; বরং স্থবির হয়ে রয়। তাকে যারা ছাড়িয়ে গেছে, তাদের নাগাল পেতে চায় না সে। কখনোই তাদের সাথে সংযুক্ত হওয়ার ইচ্ছা করে না।
شباب خنع لا خير فيهم * وبورك في الشباب الطامحين
'হীনম্মন্য যুবকদের মাঝে কোনো কল্যাণ নেই। উচ্চাকাঙ্ক্ষী যুবকদের মাঝে কল্যাণই কল্যাণ নিহিত থাকে।'
মানুষ পাঁচ প্রকার। আপনি কোন প্রকারে?!
الناس خمسة إذا حسبتهم * ففارس يوم الوغى ذو درقة
يجول في ميدانها مبارزاً " إذا رأى صف القتال خرقة
ومحسن ينفق جوداً ماله * جميعه ذهبه وورقة
وعالم يدرس في كتابه * يسرده ورقة فورقة
وحاكم أقام فينا عدله * في قلبه للعالمين شفقة
وعابد يقوم في جنح الدجى * يشكو الجوى من النوى
فهؤلاء خيرهم وغيرهم * لا لحم فيهمو وليسوا مرقة
بل همج من همج متى مشوا * يضيقوا على التقي طرقة
'মানুষদের গণনা করলে পাঁচ প্রকারে বিভক্ত পাবে—
(এক.) যুদ্ধের দিন ঢালধারণকারী ঘোড়সওয়ার। সে যখন যুদ্ধের সারিগুলো বিশৃঙ্খল দেখে, তখন বীর বিক্রমে রণাঙ্গনে ঘুরে বেড়ায়।
(দুই.) এমন পরোপকারী, যে তার সর্বোত্তম সম্পদ দান করে। তার সোনা-রুপা সবকিছু দান করে।
(তিন.) এমন আলিম, যিনি কিতাবের দরস দেন। তিনি পৃষ্ঠার পর পৃষ্ঠা ধারাবাহিকভাবে পাঠ করতে থাকেন।
(চার.) এমন বিচারক, যিনি আমাদের মাঝে ন্যায় প্রতিষ্ঠা করেছেন। তার হৃদয়ে জগৎবাসীর প্রতি অনুকম্পা রয়েছে।
(পাঁচ.) অন্ধকার রাতে আল্লাহর সামনে দণ্ডায়মান আবিদ। যিনি দূরে থেকেও নিজের তীব্র ভালোবাসা ব্যক্ত করছেন আল্লাহর কাছে।
মানুষের মাঝে এ পাঁচ প্রকারই শ্রেষ্ঠ। অন্যদের মাঝে তো উদ্যম নেই যে, তারা সামনে বাড়বে। তাই তারা এদের সামনে কিছুই নয়। বরং তারা স্রেফ উচ্ছৃঙ্খল মানুষজন। যখন এরা পথ চলে, তখন মুত্তাকিদের জন্য সে পথ আর চলার মতো থাকে না।
ইবনে উমর রা. থেকে বর্ণিত, রাসুল সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়া সাল্লাম বলেন:
تَجِدُونَ النَّاسَ كَإِبِلٍ مِائَةٍ، لَا تَكَادُ تَجِدُ فِيهَا رَاحِلَةً
'তুমি উটের পালের মতো শত শত মানুষ দেখবে। কিন্তু তাদের মাঝে খুব কষ্টে চড়ার মতো একটি উট খুঁজে পেতে পারো। '২৪
হাদিসের মর্মার্থ হলো—সন্তুষ্টকারী গুণসম্পন্ন ও পূর্ণ গুণের অধিকারী মানুষের সংখ্যা খুব কমই পাওয়া যায়; যেমন উটের পালে বাহন অল্প পরিমাণে পাওয়া যায়।২৫
لولا المشقة ساد الناس كلهم * الجود يفقر والإقدام قتال
'নেতা হওয়া যদি কষ্টকর না হতো, তবে সব মানুষই নেতা হতো।
দানশীলতার ঝুঁকি দরিদ্র হওয়া আর অগ্রগামিতার ঝুঁকি যুদ্ধের মুখোমুখি হওয়া।'
পরিকল্পনা গ্রহণে মনকে আগ্রহী করে তোলার একটি মাধ্যম হলো, এমন বয়স্ক লোকদের প্রতি দৃষ্টিপাত করা, যাদের জীবন কোনো নিদর্শন রেখে যাওয়া ব্যতীতই নিঃশেষ হয়ে গেছে। তারা শুধু কয়েকটি সন্তান জন্ম দিয়েছে, এরপর সন্তানগুলো রেখে চলে গেছে—এই যা। এর বেশি কিছু এ লোক চিন্তা করতে পারেনি। জীবনে মহৎ কোনো কাজও করতে পারেনি। যে ব্যক্তি এ নিয়ে চিন্তা করে যে, 'একজন বয়স্ক লোক, যে নিজের জন্য উপকারী কোনো কিছু করেনি; বরং দুনিয়াতে বোঝা হয়ে আছে। দুনিয়া বা আখিরাতে উপকার বয়ে আনবে-এমন কিছু করার পরিকল্পনার প্রতি সে আগ্রহী ছিল না কখনো। একদিন নিজের শেষ সন্তানের বিয়ের ব্যবস্থা গ্রহণের পর নিজের পার্থিব জীবনের সমাপ্তি অনুভব করে সে। নিজের জীবনের আর কোনো অর্থই সে খুঁজে পায় না।' কোনো যুবক যখন এ ধরনের লোকদের প্রতি গভীরভাবে দৃষ্টিপাত করবে, সেও তখন উপলব্ধি করতে পারবে যে, তার অবশ্যই উচ্চাকাঙ্ক্ষা রাখা দরকার। উচ্চাকাঙ্ক্ষাই তাকে দুনিয়া ও আখিরাতে সর্বোচ্চ আসনে সমাসীন করতে পারে। অন্যথায় সেও অচিরেই এমন অবস্থায় পৌঁছবে, যার থেকে কোনো কল্যাণ বা উপকার আশা করা যাবে না।
إذا كنت لا تُرجَى لدفع ملمة * ولا كان للمعروف عندك مطمع
ولا كنت ذا جاه يعاش بجاهه * ولا أنت يوم الحشر فيمن يشفع
فعيشك في الدنيا وموتك واحد * وعود خلال عن وصالك أنفع
'তোমার কাছে যখন কোনো বিপদ হটানোর আশা করা যায় না, কোনো কল্যাণেরও প্রত্যাশা করা যায় না।
তুমি যখন সম্মানিত কেউ নও, যার সাথে সম্মানের সাথে বসবাস করা যায়। কিংবা হাশরের দিনে সুপারিশকারীদেরও কেউ নও তুমি।
তবে তোমার দুনিয়াতে বাঁচা-মরা দুটোই সমান। তোমার থেকে বন্ধুত্বের হাত গুটিয়ে নেওয়াই বেশি লাভজনক।'
টিকাঃ
১৬. সিয়ারু আ'লামিন নুবালা: ৪/১৪১
১৭. সিয়ারু আ'লামিন নুবালা: ৫/১৩৪
১৮. ওয়াফিয়াতুল আইয়ান: ২/৩০১
১৯. তাবারানি রহ. কৃত আল-মুজামুল কাবির: ২৮৯৪
২০. সহিহুল বুখারি: ১৪২৮
২১. ফাওয়াতুল ওফাইয়াত: ২/১০৬
২২. সুরা আল-ফুরকান: ৭৩
২৩. সহিহুল বুখারি: ২৭৯০
২৪. সহিহু মুসলিম: ২৫৪৭
২৫. তুহফাতুল আহওয়াজি: ৮/১৪১
📄 পরিকল্পনার আছে নানান ধরন
সৃষ্টির ব্যাপারে আল্লাহ তাআলার একটি নীতি হচ্ছে, যেভাবে তিনি রিজিক, স্বভাব ও আখলাক ভাগ করে দিয়েছেন-সেভাবে তিনি প্রতিভা ও যোগ্যতাকেও সৃষ্টির মাঝে ভাগ করে দিয়েছেন। তাদের ভিন্ন ভিন্ন বিষয়ে যোগ্যতা দিয়েছেন। ভাষা ও বর্ণের ন্যায় তাদের বিবেক ও বোধশক্তিতেও তাদেরকে পৃথক করে সৃষ্টি করেছেন।
وَمِنْ آيَاتِهِ خَلْقُ السَّمَاوَاتِ وَالْأَرْضِ وَاخْتِلَافُ أَلْسِنَتِكُمْ وَأَلْوَانِكُمْ
'তাঁর আরও এক নিদর্শন হচ্ছে, নভোমণ্ডল ও ভূমণ্ডলের সৃজন এবং তোমাদের ভাষা ও বর্ণের বৈচিত্র্য।'২৬
আর এই পার্থক্যটা দ্বীনি ও দুনিয়াবি-উভয় ক্ষেত্রেই বিদ্যমান। দ্বীনি বিষয়ে কেউ সালাতের ব্যাপারে অগ্রগামী। কেউ সদাকার ব্যাপারে, কেউ সিয়ামের ব্যাপারে, কেউ কুরআন অধ্যয়ন ও অধ্যাপনার ব্যাপারে অগ্রগামী। কেউ হন আকিদাশাস্ত্রে বিশেষজ্ঞ বা মুহাদ্দিস অথবা ফকিহ কিংবা মুফাসসির।
কাউকে আগ্রহী করা হয়েছে-অভাবীদের সাহায্য, অসহায়দের সহযোগিতা, মানুষের চিন্তা মুক্তকরণ, ঋণ পরিশোধকরণ, এতিমের খরচ বহন এবং তাদের দেখাশোনা করা, তাদের প্রতি সমবেদনা প্রকাশ করা, তাদের শিক্ষা-দীক্ষার ব্যবস্থা করা এবং তাদের রক্ষণাবেক্ষণ করার প্রতি। এভাবে সে অবিরাম কাজ চালিয়ে যাচ্ছে তার আগ্রহের বিষয়ে।
আবার কারও জন্য উন্মোচন করা হয়েছে—মানুষের ব্যাপারে সুপারিশ, সংশোধনে অগ্রগামী হওয়ার মতো কাজকে। ফলে সে কোনো বন্দীকে মুক্ত করতে অবদান রাখে। কারও রক্তের নিরাপত্তা বিধান করে। মন্দকে প্রতিরোধ করে। প্রাপককে তার অধিকার বুঝিয়ে দেয়। বাতিলকে বাধা প্রদান করে। অবিচার বন্ধ করে।
আর পার্থিব বিষয়ে কেউ চিকিৎসা-বিদ্যায় অগ্রগামী। কেউ আবার প্রকৌশলে কিংবা ব্যবসা, টেকনোলজি, মার্কেটিং ইত্যাদি ক্ষেত্রে অগ্রগামী।
আর কারও কারও রয়েছে নিজেকে পবিত্র রাখার জন্য একটি বিয়ের পরিকল্পনা। আবার কারও ডক্টরেট অর্জনের পরিকল্পনা। কারও থাকে গৃহ নির্মাণের প্ল্যান। তো কারও থাকে গাড়ি কেনার লক্ষ্য। কারও কোনো কোম্পানির চাকরি কিংবা দাতব্য প্রতিষ্ঠান চালু করা বা দাওয়াহ অঙ্গনে কাজ করার আগ্রহ। কারও আবার কোনো ভাষা শিক্ষার পরিকল্পনা ইত্যাদি।
কিছু পরিকল্পনা আছে, যা বাস্তবায়নে সুদীর্ঘ সময় প্রয়োজন। কখনো এমন পরিকল্পনা সম্পাদনে কয়েক বছর লেগে যায়। যেমন: উচ্চ শিক্ষা, একটি নেককার পরিবার গড়ে তোলা ও দাওয়াহ প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠা করা ইত্যাদি।
আবার কিছু পরিকল্পনা আছে সংক্ষিপ্ত সময়ের, যার সীমাটা দুই-এক বছরের। যেমন : পবিত্র কুরআন মুখস্থ করার পরিকল্পনা, কোনো ভাষা শিক্ষা করা বা কম্পিউটার প্রশিক্ষণ, কোনো দাতব্য কর্মে অংশগ্রহণ, কোনো লেকচার-অনুষ্ঠানের প্রচার-প্রসার, অথবা কোনো বই-পুস্তক, অডিও-ভিডিও ক্যাসেট বা দাওয়াহ উপকরণ বিতরণের মাধ্যমে কোনো দাওয়াহ কাজে অংশগ্রহণ করা। অথবা একটি সাক্ষাৎ বা আলোচনা সভার আয়োজন। দাতব্য প্রতিষ্ঠানগুলোর গৃহীত পরিকল্পনাতে সাহায্য করা; যেমন : কোনো রোজাদারের ইফতারের ব্যবস্থা করা, অভাবী ও দরিদ্র পরিবারের প্রয়োজনীয় জিনিস তাদের মাঝে বিতরণ করে দেওয়া এবং এতিমের ভরণপোষণের দায়িত্বগ্রহণ করা ইত্যাদি।
কিছু পরিকল্পনা আছে, যা মৌলিক-যার জন্য মনোযোগ ও ঢের সময়ের প্রয়োজন পড়ে। আবার কিছু পরিকল্পনা শাখাগত।
কিছু পরিকল্পনার জন্য মানুষের পুরো সময় ব্যয় করতে হয়। কিছু পরিকল্পনা আছে, যার কয়েকটির মাঝে সমন্বয় করে তা পূর্ণ করা সম্ভব।
কিছু আছে একক পরিকিল্পনা। কিছু আছে সম্মিলিত পরিকল্পনা। তবে সম্মিলিত পরিকল্পনা সফলতার জন্য বেশি উপকারী ও সম্ভাবনাময়।
তাই বলা যায়, পরিকল্পনা অনেক-দাওয়াহসংক্রান্ত, ইলমি, সামাজিক, ব্যবসায়িক, মিডিয়াভিত্তিক ইত্যাদি নানান ধরনের পরিকল্পনাই রয়েছে।
দাওয়াহ পরিকল্পনা
যেমন: শহরাঞ্চলের পরিবারগুলোকে জমা করে তাদের সামনে (দ্বীনি বিষয়ে) আলোচনা করা; কিছু দাওয়াহ-উপকরণ ক্রয় করে তা বিভিন্ন কর্মশালা, কারখানা ও কোম্পানির অফিসে বিতরণ করা; হাসপাতাল বা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সগুলোকে দাওয়াহর মাধ্যমে আলোকিত করা; ফতোয়া বা দিক-নির্দেশনাসংবলিত কোনো ব্যানার টানিয়ে দেওয়া; দাওয়াতি চিঠিপত্র প্রেরণ, মেইলে বার্তা প্রেরণ বা মোবাইল ম্যাসেজিং করা; ইলেক্ট্রনিক মিডিয়ার মাধ্যমে বিভিন্ন ফোরামে দাওয়াহ কাজের প্রচার-প্রসার করা।
ইলমি পরিকল্পনা
যেমন: মুসলিমদের জন্য প্রশাসনিক, মানবিক বা চিকিৎসাসংক্রান্ত বিষয়ে লিখিত কল্যাণকর কোনো প্রবন্ধের অনুবাদ করা; উপকারী বিষয় পাঠ করা; কোনো আলোচনা বা দরস সাজানো; গ্রন্থ রচনা করা; হাদিস মুখস্থ করা; সহায়ক কিছু শিক্ষা করা যেমন : বিভিন্ন ভাষা, কম্পিউটার, ইন্টারনেট, সামাজিক, রাজনৈতিক বা অর্থনৈতিক বিষয়ে জ্ঞান অর্জন—এসবের যা কিছু বাস্তবায়ন ও অনুশীলন সম্ভব, তা অনুশীলন করা।
ইবাদতকেন্দ্রিক পরিকল্পনা
যেমন : বিশর বিন হারিস রহ.-এর অজিফা ছিল দৈনিক কুরআনের এক-তৃতীয়াংশ পাঠ করা। উরওয়াহ বিন জুবাইর দেখে দেখে কুরআনের এক-চতুর্থাংশ পাঠ করতেন। রাতের বেলা কিয়ামে তা তিলাওয়াত করতেন। যে রাতে তাঁর পা কেটে গিয়েছিল, কেবল সে রাতে তাঁর এ আমল ছুটে যায়। আর ইমাম আহমাদ ইবনে হাম্বল রহ. প্রতি রাতে এক-সপ্তমাংশ পাঠ করতেন। এভাবে প্রতি সাত রাতে এক খতম দিতেন।
সামাজিক প্রকল্প
যেমন : বিবাহ-শাদি করানো, হাসপাতালে রোগীদের দেখতে যাওয়া ও তাদের সহযোগিতা করা, দরিদ্র পরিবারের দায়ভার গ্রহণ করা। আলি বিন হুসাইন জাইনুল আবিদিন রহ. রাতের আঁধারে পিঠে করে খাদ্য বহন করে মিসকিনদের অনুসন্ধানে বের হয়ে যেতেন। মদিনায় কিছু লোক ছিল যারা জানত না তাদের খাদ্য কোথা হতে আসে। যখন আলি বিন হুসাইন মারা গেলেন, তখন তাদের কাছে রাতের খাবার আসা বন্ধ হয়ে গেল। তাঁর মৃত্যুর পর পিঠে অনেকগুলো চিহ্ন দেখা গেল, যা রাতের বেলা বিধবা মহিলাদের ঘরে খাবার বহনের কারণে হয়েছিল। ২৭
ব্যবসায়িক প্রকল্প
যেমন : ছোট কোনো দোকান দিয়ে শুরু করা। এক লোক গাড়ির খুচরা যন্ত্রাংশ ও গাড়ি পরিস্কার করার কাজ নিয়ে ছোট একটি ব্যবসা চালু করল। পরবর্তীকালে তা বিশ বছরেরও কম সময়ে এত বড় এক কোম্পানিতে পরিণত হলো, যার একত্রিশটি শাখা প্রতিষ্ঠিত হয়ে ছিল। তাদের বর্ধনশীল মূলধনের পরিমাণ শত শত মিলিয়ন ডলারে পৌঁছে; বরং সম্ভবত বিলিয়ন ডলারে পৌঁছে যায়।
অনেক প্রতিষ্ঠান ও কোম্পানি প্রাথমিক পর্যায়ে ছোট একটি প্রকল্প ছিল। যেমন : গুগল সার্চ ইঞ্জিন। মুদ্রা পরিবহন ব্যবসা প্রাথমিক পর্যায়ে ছোট ছিল। পরে সেটা বিশাল হুন্ডি কোম্পানিতে পরিণত হয়েছে। ছোট একটি হোটেল থেকে অনেকগুলো হোটেলের স্বতন্ত্র একটি হোটেল-প্রতিষ্ঠানে রূপ পেয়েছে।
উন্নয়ন প্রকল্প
কোনো পেশার কারিগরি দিকগুলো শেখা ও শিল্প ইত্যাদি শেখা।
মিডিয়া প্রকল্প
যেমন : কোনো চ্যানেল কিংবা ওয়েবসাইট গড়ে তোলা অথবা কোনো ম্যাগাজিন বের করা।
টিকাঃ
২৬. সুরা আর-রুম: ২২
২৭. সিয়ারু আ'লামিন নুবালা: ৪/৩৯৩