📄 সবর বা ধৈর্যধারণে প্রতিবন্ধক কাজসমূহ
সবর বা ধৈর্য পালনের ক্ষেত্রে কিছু জিনিস মানুষকে প্রতিবন্ধকতা সৃষ্টি করে। তা নিম্নরূপ:
১. তাড়াহুড়া করা
তাড়াহুড়া বা ত্বরা প্রবণতা এটা মানুষের স্বভাবজাত বৈশিষ্ট্য। সে দ্রুত কোনো কিছু পেতে চায়। এবং সময়ের পূর্বেই সে আশা করে। এ দিকে ইঙ্গিত করে আল্লাহ তায়ালা বলেন-
خُلِقَ الْإِنسَانُ مِنْ عَجَلٍ سَأُرِيكُمْ آيَاتِي فَلَا تَسْتَعْجِلُونِ •
অর্থাৎ, মানুষকে সৃষ্টি করা হয়েছে তাড়াহুড়ার প্রবণতা দিয়ে। অচিরেই আমি তোমাদেরকে দেখাব আমার নিদর্শনাবলী। সুতরাং তোমরা তাড়াহুড়া করো না। (সূরা আম্বিয়া: ৩৭)
এখানে শব্দটি ব্যবহারিত হয়েছে। যার অর্থ হচ্ছে ত্বরা। এর স্বরূপ হচ্ছে কোনো কাজ সময়ের পূর্বেই সম্পূর্ণ করা। এটা স্বতন্ত্র দৃষ্টিতে নিন্দনীয়। অস্থিরতা ও তাড়াহুড়া মানুষের স্বভাবজাত বৈশিষ্ট্য। তাদের পক্ষে সহিষ্ণু ও শান্ত হওয়াটা কঠিন। যেমনি ভাবে কুরআনে এসেছে-
وَيَدْعُ الْإِنسَانُ بِالشَّرِّ دُعَاءَهُ بِالْخَيْرِ وَكَانَ الْإِنسَانُ عَجُولًا .
অর্থাৎ, আর মানুষ অকল্যাণের দু'আ করে, যেমন তার দু'আ হয় কল্যাণের জন্য। আর মানুষ তো তাড়াহুড়াপ্রবণ। (সূরা বনি ইসরাঈল: ১১)
এজন্য আল্লাহ তায়ালা তার প্রিয় হাবীবকে নির্দেশ দিচ্ছেন তাড়াহুড়া না করে ধৈর্যধারণ করার জন্য। যেমন বলা হচ্ছে-
فَاصْبِرْ كَمَا صَبَرَ أُولُو الْعَزْمِ مِنَ الرُّسُلِ وَلَا تَسْتَعْجِل لَّهُمْ كَأَنَّهُمْ يَوْمَ يَرَوْنَ مَا يُوعَدُونَ لَمْ يَلْبَثُوا إِلَّا سَاعَةً مِّن نَّهَارٍ بَلَاغٌ فَهَلْ يُهْلَكُ إِلَّا الْقَوْمُ الْفَاسِقُونَ .
অর্থাৎ, অতএব তুমি ধৈর্যধারণ কর, যেমন ধৈর্যধারণ করেছিল সুদৃঢ় সংকল্পের অধিকারী রাসূলগণ। আর তাদের জন্য তাড়াহুড়া করো না। তাদেরকে যে বিষয়ে সতর্ক করা হয়েছিল, যেদিন তারা তা প্রত্যক্ষ করবে, মনে হবে তারা পৃথিবীতে এক দিনের কিছু সময় অবস্থান করেছে। সুতরাং এটা এক ঘোষণা, তাই পাপাচারী কওমকেই ধ্বংস করা হবে। (সূরা আহকাফ: ৩৫)
আর তাড়াহুড়া করাটা মুমিনদের গুণাবলি নয়। কেননা তাড়াহুড়াটা শয়তানের পক্ষ থেকে আসে। যেমনিভাবে তাড়াহুড়া সম্পর্কে ইমাম ইবনে কিয়াম বলেন- তাড়াহুড়া শয়তানের পক্ষ থেকে আসে। আর সে এর মাধ্যমে বান্দাদের মধ্যে চঞ্চলতা, উদ্দেশ্যহীনতা ও বিভ্রান্তির সৃষ্টি করে।
২. রাগান্বিত হওয়া
সবরের প্রতিবন্ধক কাজসমূহের মধ্যে অন্যতম হচ্ছে রাগান্বিত হওয়া বা রুক্ষ স্বভাবের হওয়া। প্রতিশোধপরায়ণ স্বভাবের হয়ে থাকা। বিশেষ করে যারা আল্লাহর পথে দাওয়াত দেয় তাদেরকে অবশ্যই এগুলোকে পরিহার করতে হবে। তারা হবে শান্ত ও নম্র স্বভাবের। যেমনিভাবে কুরআন বলছে-
وَالَّذِينَ يَجْتَنِبُونَ كَبَائِرَ الْإِثْمِ وَالْفَوَاحِشَ وَإِذَا مَا غَضِبُوا هُمْ يَغْفِرُونَ .
অর্থাৎ, আর যারা গুরুতর পাপ ও অশ্লীল কার্যকলাপ থেকে বেঁচে থাকে এবং যখন রাগান্বিত হয় তখন তারা ক্ষমা করে দেয়। (সূরা শুয়ারা: ৩৭)
অন্য আয়াতে বলা হচ্ছে-
الَّذِينَ يُنفِقُونَ فِي السَّرَّاءِ وَالضَّرَّاءِ وَالْكَاظِمِينَ الْغَيْظَ وَالْعَافِينَ عَنِ النَّاسِ * وَاللَّهُ يُحِبُّ الْمُحْسِنِينَ .
অর্থাৎ, যারা সুসময়ে ও দুঃসময়ে ব্যয় করে এবং ক্রোধ সংবরণ করে ও মানুষকে ক্ষমা করে। আর আল্লাহ সৎকর্মশীলদের ভালোবাসেন। (সূরা আলে ইমরান: ১৩৪)
ক্রোধ বা রাগান্বিত হওয়া এটা ধৈর্যের পরিপন্থী/বিপরীত একটি কাজ। তাই ধৈর্যশীল ব্যক্তিকে অবশ্যই ক্রোধ/রাগান্বিত হওয়া থেকে নিজেকে বিরত রাখতে হবে। রাসূল (সা.) বলেছেন-
হযরত আবু হুরায়রা (রা:) থেকে বর্ণিত, রাসূল (সা.) বলেছেন, প্রকৃত বীর সে নয় যে কাউকে কুস্তিতে হারিয়ে দেয়। বরং আসল বীর হলো সে যে রাগের সময় নিজেকে নিয়ন্ত্রণ করতে পারে। (বুখারী ও মুসলিম) (বুখারী: ৬১১৪)
৩. হতাশ বা নিরাশ হওয়া
হতাশ বা নিরাশ হওয়া সবরের প্রতিবন্ধকসমূহের মধ্যে অন্যতম। কেননা হতাশার দ্বারা আশা-আকাঙ্ক্ষা নিভে যায়। বান্দা আল্লাহর গোলামী থেকে দূরে সরে যায় এবং অলসতা তাকে ঘিরে ধরে। যার ফলে সে আল্লাহর ইবাদত থেকে দূরে সরে যায়। এ জন্য আল্লাহ তায়ালা মুমিনদেরকে হতাশ ও দুঃখিত না হওয়ার জন্য উৎসাহিত করেছেন। যেমন বলা হচ্ছে-
وَلَا تَهِنُوا وَلَا تَحْزَنُوا وَأَنتُمُ الْأَعْلَوْنَ إِن كُنتُم مُّؤْمِنِينَ .
অর্থাৎ, আর তোমরা দুর্বল হয়ো না এবং দুঃখিত হয়ো না, আর তোমরাই বিজয়ী হবে যদি মুমিন হয়ে থাক। (সূরা আলে ইমরান: ১৩৯)
অন্য আয়াতে ইয়াকুব (আ.) তার সন্তানদের বলেছেন-
يَا بَنِيَّ اذْهَبُوا فَتَحَسَّسُوا مِن يُوسُفَ وَأَخِيهِ وَلَا تَيْأَسُوا مِن رَّوْحِ اللَّهِ ۖ إِنَّهُ لَا يَيْأَسُ مِن رَّوْحِ اللَّهِ إِلَّا الْقَوْمُ الْكَافِرُونَ .
অর্থাৎ, 'হে আমার ছেলেরা, তোমরা যাও এবং ইউসুফ ও তার ভাইয়ের খোঁজখবর নাও। আর তোমরা আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয়ো না। কেননা কাফির কওম ছাড়া কেউই আল্লাহর রহমত থেকে নিরাশ হয় না'। (সূরা ইউসুফ: ৮৭)
তাই ধৈর্যশীলদের উচিত হচ্ছে হতাশ না হওয়া। বরং আল্লাহর ওপর ভরসা রেখে পথ চলা ও বিপদে ধৈর্যধারণ করা।
৪. সংকীর্ণতা ও বিষন্নতা
সংকীর্ণতা ও বিষন্নতা সবরের প্রতিবন্ধক কাজসমূহের মধ্যে অন্যতম। কেননা সংকীর্ণতা ও বিষন্নতা ধৈর্যধারণে বাধা প্রদান করে থাকে। যেমনিভাবে আল্লাহ তায়ালা তার প্রিয় হাবীবকে বলেছেন-
وَاصْبِرْ وَمَا صَبْرُكَ إِلَّا بِاللَّهِ وَلَا تَحْزَنْ عَلَيْهِمْ وَلَا تَكُ فِي ضَيْقٍ مِّمَّا يَمْكُرُونَ .
অর্থাৎ, আর তুমি সবর কর। তোমার সবর তো শুধু আল্লাহর তাওফীকেই। তারা যেসব ষড়যন্ত্র করছে তুমি সে বিষয়ে সংকীর্ণমনা হয়ো না। (সূরা নাহল: ১২৭)
অন্য আয়াতে বলা হচ্ছে-
فَلَعَلَّكَ تَارِكٌ بَعْضَ مَا يُوحَى إِلَيْكَ وَضَائِقٌ بِهِ صَدْرُكَ أَن يَقُولُوا لَوْلَا أُنزِلَ عَلَيْهِ كَرْ أَوْ جَاءَ مَعَهُ مَلَكٌ إِنَّمَا أَنتَ نَذِيرٌ وَاللَّهُ عَلَى كُلِّ شَيْءٍ وَكِيلٌ .
অর্থাৎ, তাহলে সম্ভবত তুমি তোমার ওপর অবতীর্ণ ওহীর কিছু বিষয় ছেড়ে দেবে এবং তোমার বুক সঙ্কুচিত হবে এ কারণে যে, তারা বলে, 'কেন তার ওপর ধন-ভান্ডার অবতীর্ণ হয়নি কিংবা তার সাথে ফেরেশতা আসেনি'? তুমি তো শুধু সতর্ককারী আর আল্লাহ সব কিছুর তত্ত্বাবধায়ক। (সূরা হুদ: ১২)
لَعَلَّكَ بَاخِعٌ نَّفْسَكَ أَلَّا يَكُونُوا مُؤْمِنِينَ .
অর্থাৎ, তারা মুমিন হবে না বলে হয়তো তুমি আত্মবিনাশী হয়ে পড়বে। (সূরা শূরা: ৩)
فَلَا تَذْهَبْ نَفْسُكَ عَلَيْهِمْ حَسَرَاتٍ إِنَّ اللَّهَ عَلِيمٌ بِمَا يَصْنَعُونَ .
অর্থাৎ, অতএব তাদের জন্য আফসোস করে নিজে ধ্বংস হয়ো না। নিশ্চয় তারা যা করে আল্লাহ তা জানেন। (সূরা ফাতির: ৮)
فَلَعَلَّكَ بَاخِعٌ نَّفْسَكَ عَلَى آثَارِهِمْ إِن لَّمْ يُؤْمِنُوا بِهَذَا الْحَدِيثِ أَسَفًا .
অর্থাৎ, হয়তো তুমি তাদের পেছনে পেছনে ঘুরে দুঃখে নিজেকে শেষ করে দেবে, যদি তারা এই কথার প্রতি ঈমান আনে। (সূরা কাহাফ: ৬)
📄 সবর বা ধৈর্যধারণে সহায়ক কাজসমূহ
১. আল্লাহর রহমতের প্রশস্ততা ও করুণার ব্যাপকতার স্মরণ
মুসিবত দৃশ্যত অসহ্য-কষ্টদায়ক হলেও পশ্চাতে কল্যাণ বয়ে আনতে পারে। তাই বান্দার কর্তব্য আল্লাহর সুপ্রশস্ত রহমতের ওপর আস্থাবান থাকা। এরশাদ হচ্ছে:
وَعَسَى أَنْ تَكْرَهُوا شَيْئًا وَهُوَ خَيْرٌ لَكُمْ وَعَسَى أَنْ تُحِبُّوا شَيْئًا وَهُوَ شَرٌّ لَكُمْ وَاللَّهُ يَعْلَمُ وَأَنْتُمْ لَا تَعْلَمُونَ .
অর্থাৎ, "এবং হতে পারে কোনো বিষয় তোমরা অপছন্দ করছ, অথচ তা তোমাদের জন্য কল্যাণকর। আর হতে পারে কোনো বিষয় তোমরা পছন্দ করছ, অথচ তা তোমাদের জন্য অকল্যাণকর। আর আল্লাহ জানেন এবং তোমরা জান না।" (সূরা বাক্বারা: ২১৬)
রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেছেন: "মুমিনের বিষয়টি চমৎকার, আল্লাহ তায়ালা যা ফয়সালা করেন, তা-ই তার জন্য কল্যাণকর।" (মুসনাদে আহমদ: ২০২৮৩)
আল্লাহ তায়ালা মানব জাতিকে যে সমস্ত নেয়ামত ও অনুদান দ্বারা আবৃত করেছেন, তা নিয়ে ভাবনা-চিন্তা করা, যাতে এ অনুভূতির উদয় হয় যে, বর্তমান মুসিবত বিদ্যমান নেয়ামতের তুলনায় বিন্দুমাত্র। আল্লাহ তায়ালা চাইলে মুসিবত আরো বীভৎস-কঠোর হতে পারত। তদুপরি আল্লাহ তায়ালা আরো যেসমস্ত বালা মুসিবত থেকে নিরাপদ রেখেছেন, যেসকল দুর্ঘটনা থেকে নাজাত দিয়েছেন, তা অনেক বড়, অনেক বেশী।
খিজির ও মূসা আলাইহিস সালামের ঘটনায় উল্লেখিত বালকটিকে, খিজির হত্যা করেন, প্রথমে মূসা আলাইহিস সালাম আপত্তি জানান, খিজিরের অবহিত করণের দ্বারা জানতে পারেন, তার হত্যায় কল্যাণ নিহিত রয়েছে। এরশাদ হচ্ছে:
وَأَمَّا الْغُلَامُ فَكَانَ أَبَوَاهُ مُؤْمِنَيْنِ فَخَشِينَا أَنْ يُرْهِقَهُمَا طُغْيَانًا وَكُفْرًا. فَأَرَدْنَا أَنْ يُبْدِلَهُمَا رَبُّهُمَا خَيْرًا مِنْهُ زَكَاةً وَأَقْرَبَ رُحْمًا .
অর্থাৎ, "আর বালকটির বিষয় হলো, তার পিতা-মাতা ছিল মুমিন। অতঃপর আমি আশংকা করলাম তাঁর আশংকা নিছক ধারণা ভিত্তিক ছিল না, বরং আল্লাহর পক্ষ থেকে তিনি নিশ্চিত জানতে পেরেছিলেন যে, সে সীমালংঘন কুফরী দ্বারা তাদেরকে অতিষ্ঠ করে তুলবে। তাই আমি চাইলাম, তাদের রব তাদেরকে তার পরিবর্তে এমন সন্তান দান করবেন, যে হবে তার চেয়ে পবিত্রতায় উত্তম এবং দয়ামায়ায় অধিক ঘনিষ্ঠ।" (সূরা কাহাফ: ৮০-৮১)
এ প্রসঙ্গে রসূলুল্লাহ (সা.) বলেন:
"খিজির আলাইহিস সালাম যে ছেলেটিকে হত্যা করেছেন, তার জন্মই ছিল কাফির অবস্থায়, যদি সে বেঁচে থাকত সীমালঙ্ঘন ও অকৃতজ্ঞতা দ্বারা নিজ পিতা-মাতাকে হত্যা করত।" (সহীহ মুসলিম: ৪৮১১)
কাতাদাহ রহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন: তার জন্ম লাভে পিতা-মাতা উভয়ে যেমন আনন্দিত হয়েছে, তার মৃত্যুতে উভয়ে তেমন ব্যথিত হয়েছে। অথচ সে বেঁচে থাকলে, উভয়ের ধ্বংসের কারণ হত। সুতরাং প্রত্যেক ব্যক্তির উচিত আল্লাহ তায়ালার সিদ্ধান্তে সন্তুষ্ট ও পরিতৃপ্ত থাকা।
২. বিপদ-আপদে আল্লাহর দিকে প্রত্যাবর্তন
সবরের সহায়ক কাজগুলোর মধ্যে অন্যতম একটি কাজ হচ্ছে বিপদাপদে ধৈর্যধারণ করা এবং আল্লাহর দিকে প্রত্যাবর্তন করা। মূলত মুমিন ব্যক্তিদের বৈশিষ্ট্যই হলো যখন বিপদে আক্রান্ত হয় তখন বলে, নিশ্চয় আমরা আল্লাহর জন্য এবং নিশ্চয় আমরা তার দিকে প্রত্যাবর্তনকারী। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তায়ালা বলেন-
وَبَشِّرِ الصَّابِرِينَ * الَّذِينَ إِذَا أَصَابَتْهُم مُّصِيبَةٌ قَالُوا إِنَّا لِلَّهِ وَإِنَّا إِلَيْهِ رَاجِعُونَ . أُولَئِكَ عَلَيْهِمْ صَلَوَاتٌ مِّن رَّبِّهِمْ وَرَحْمَةٌ وَأُولَئِكَ هُمُ الْمُهْتَدُونَ .
অর্থাৎ, আর তুমি ধৈর্যশীলদের সুসংবাদ দাও। যারা তাদেরকে যখন বিপদ আক্রান্ত করে তখন বলে, নিশ্চয় আমরা আল্লাহর জন্য এবং নিশ্চয় আমরা তারদিকে প্রত্যাবর্তনকারী। তাদের ওপরই রয়েছে তাদের রবের পক্ষ থেকে মাগফিরাত ও রহমত এবং তারাই হিদায়াতপ্রাপ্ত। (সূরা বাক্বারা: ১৫৫-১৫৭)
রাসূল (সা.)-এর মুখঃনিসৃত বাণীতে বলা হচ্ছে-
"হযরত উম্মে সালামা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি রাসূল (সা.) কে বলতে শুনেছি যে, কোন মুসলমান যখন কোন বিপদে পতিত হয়, তখন সে যদি আল্লাহর নির্দেশানুযায়ী "ইন্না লিল্লাহি ওয়া ইন্না ইলাহি রাজিউন" বলে এবং এ দোয়া পাঠ করে, " হে আল্লাহ! আমাকে বিপদে ধৈর্যধারণের সাওয়াব দান কর এবং এর উত্তম স্থলাভিষিক্ত নাও।" তবে আল্লাহ তাকে উত্তম স্থলাভিষিক্ত দান করবেন। যখন আবু সালমার (তার স্বামী) ইন্তিকাল হলো, তখন আমি বললাম, আবু সালমা (রা.) থেকে কে উত্তম হতে পারে? তার পরিবারই প্রথম পরিবার যারা রাসূল (সা.) এর কাছে হিজরত করেছিল। এরপর আমি ঐ দোয়া পাঠ করলাম। ফলে আল্লাহ রাসূল (সা.)-এর আমার জন্য দান করলেন। উম্মে সালমা (রা.) বলেন, রাসূল (সা.) আমার নিকট হাতিব ইবন আবি বালতাআকে দিয়ে বিবাহের পয়গাম পাঠালেন। আমি বললাম, আমার একটি মেয়ে রয়েছে আর আমি একটু অভিমানী। তিনি বললেন, তার মেয়ের জন্য আমি দোয়া করছি যেন আল্লাহ তার সুব্যবস্থা করে দেন এবং এটাও দোয়া করছি যে, তিনি তার অভিমানকে দূর করে দেন।" (সহীহ মুসলিম: ১৯৯৮)২৩
৩. রাসূল (সা.) ও তার পূর্ববর্তী পূণ্যবান ব্যক্তিদের জীবন চরিত পর্যালোচনা করা
রাসূল (সা.) হচ্ছেন আল্লাহভীরু মুসলিম জাতির জন্য আদর্শ। বস্তুত রাসূল (সা.) কে উত্তম আদর্শ দিয়ে সৃষ্টি করা হয়েছে এ উদ্দেশ্যে যে তিনি যেন মানুষকে সঠিক পথপ্রদর্শন করাতে পারেন। যেমন আল্লাহ তায়ালা বলছেন-
لَقَدْ كَانَ لَكُمْ فِي رَسُولِ اللَّهِ أَسْوَةٌ حَسَنَةٌ لِمَنْ كَانَ يَرْجُو اللَّهَ وَالْيَوْمَ الْآخِرَ وَذَكَرَ اللَّهَ كَثِيرًا .
অর্থাৎ, অবশ্যই তোমাদের জন্য রাসূলুল্লাহর মধ্যে রয়েছে উত্তম আদর্শ। যারা আল্লাহ ও পরকাল প্রত্যাশা করে এবং আল্লাহকে অধিক স্মরণ করে। (সূরা আহযাব: ২১)
রাসূল (সা.)-এর সীরাত চিন্তাশীল, গবেষকদের উপজীব্য ও সান্ত্বনার বস্তু। তার পূর্ণ জীবনটাই ধৈর্য ও ত্যাগের দীপ্ত উপমা। লক্ষ্য করুন, স্বল্প সময়ের মধ্যে চাচা আবু তালিব, রাসূল (সা.) থেকে কাফিরদের অত্যাচার প্রতিহত করতেন; একমাত্র বিশ্বস্ত সহধর্মিণী খাদিজা; কয়েকজন ঔরসজাত মেয়ে এবং ছেলে ইব্রাহিম ইন্তেকাল করেন। চক্ষুযুগল অশ্রুসিক্ত, হৃদয় ভারাক্রান্ত, স্নায়ুতন্ত্র ও অস্থিমজ্জা নিশ্চল নির্বাক। এরপরও প্রভুর ভক্তিমাখা উক্তি:
"চোখ অশ্রুসিক্ত, অন্তর ব্যথিত, তবুও তা-ই মুখে উচ্চারণ করব, যাতে প্রভু সন্তুষ্ট, হে ইব্রাহিম! তোমার বিরহে আমরা গভীর মর্মাহত।" (সহীহ বুখারী: ১৩০৩)
আরো অনেক আত্মোৎসর্গকারী সাহাবায়ে কেরাম মারা যান, যাদের তিনি ভালোবাসতেন, যারা তার জন্য উৎসর্গ ছিলেন। এত সব দুঃখ-বেদনা তার শক্তিতে প্রভাব ফেলতে পারেনি। ধৈর্য-অভিপ্রায়গুলো ম্লান করতে পারেনি。
তদ্রূপ যে আদর্শবান পূর্বসূরীগণের জীবনচরিত পর্যালোচনা করবে, তাদের কর্মকুশলতায় অবগাহন করবে, সে সহসাই অবলোকন করবে, তারা বিবিধ কল্যাণ ও উচ্চ মর্যাদার অধিকারী একমাত্র ধৈর্যের সিঁড়ি বেয়েই হয়েছেন। আল্লাহ তায়ালা বলেন-
لَقَدْ كَانَ لَكُمْ فِيهِمْ أُسْوَةٌ حَسَنَةٌ لِّمَن كَانَ يَرْجُو اللَّهَ وَالْيَوْمَ الْآخِرَ * وَمَن يَتَوَلَّ فَإِنَّ اللَّهَ هُوَ الْغَنِيُّ الْحَمِيدُ .
অর্থাৎ, "নিশ্চয় তোমাদের জন্য তাদের মধ্যে ইবরাহীম (আ.) ও তাঁর অনুসারীদের মধ্যে উত্তম আদর্শ রয়েছে, যারা আল্লাহ ও শেষ দিবসের প্রত্যাশা করে, আর যে মুখ ফিরিয়ে নেয়, (সে জেনে রাখুক) নিশ্চয় আল্লাহ তো অভাবমুক্ত, সপ্রশংসিত।" (সূরা মুমতাহিনা: ৬)
উরওয়া ইবনে জুবায়েরের ঘটনা, আল্লাহ তায়ালা তাকে এক জায়গাতে, এক সাথে দুটি মুসিবত দিয়েছেন। পা কাটা এবং সন্তানের মৃত্যু। তা সত্ত্বেও তিনি শুধু এতটুকু বলেছেন, "হে আল্লাহ! আমার সাতটি ছেলে ছিল, একটি নিয়েছেন, ছয়টি অবশিষ্ট রেখেছেন। চারটি অঙ্গ ছিল একটি নিয়েছেন, তিনটি নিরাপদ রেখেছেন। মুসিবত দিয়েছেন, নেয়ামতও প্রদান করেছেন। দিয়েছেন আপনি, নিয়েছেনও আপনি।”২৪
উমর ইবনে আব্দুল আজিজ এর একজন ছেলের ইন্তেকাল হয়। তিনি তার দাফন সেরে কবরের পাশে সোজা দাঁড়িয়ে, লোকজন চারপাশ দিয়ে তাকে ঘিরে আছে, তিনি বলেন, "হে বৎস! তোমার প্রতি আল্লাহ রহমত বর্ষণ করুন। অবশ্যই তুমি তোমার পিতার অনুগত ছিলে। আল্লাহর শপথ! যখন থেকে আল্লাহ তোমাকে দান করেছেন, আমি তোমার প্রতি সন্তুষ্টই ছিলাম। তবে আল্লাহর শপথ করে বলছি, তোমাকে এখানে অর্থাৎ আল্লাহর নির্ধারিত স্থান কবরে দাফন করে আগেরচেয়ে' বেশি আনন্দিত। আল্লাহর কাছে তোমার বিনিময়ে আমি অধিক প্রতিদানের আশাবাদী।
৪. আপত্তি অভিযোগ ও অস্থিরতা ত্যাগ করা
যে কোনো বিপদাপদের সময় অসহিষ্ণুতা ও আপত্তি-অভিযোগ পরিহার করা। এটাই সান্ত্বনার শ্রেয়পথ। শান্তির উপায়-উপলক্ষ। যে এর থেকে বিরত থাকবে না, তার কষ্ট ও অশান্তি দ্বিগুণ হবে। বরং সে নিজেই স্বীয় শান্তি বিনাশকারী- নিঃশেষকারী। কোন অর্থেই তার জন্য ধৈর্য প্রযোজ্য হবে না, মুসিবত থেকে নাজাতও পাবে না। কারণ ধৈর্য যদি হয় বিপদাপদ মূলোৎপাটনকারী, অধৈর্যতা তার পৃষ্ঠপোষকতা-দানকারী। যার বিশ্বাস আছে, নির্ধারিত বস্তু নিশ্চিত হস্তগত হবে, নির্দিষ্ট বস্তু নিশ্চিত অর্জিত হবে, তার ধৈর্য পরিহার করা নিরেট বিড়ম্বনার আরেকটি মুসিবত। আল্লাহ তায়ালা বলেন-
مَا أَصَابَ مِنْ مُصِيبَةٍ فِي الْأَرْضِ وَلَا فِي أَنْفُسِكُمْ إِلَّا فِي كِتَابٍ مِنْ قَبْلِ أَنْ تَبْرَأَهَا إِنْ ذَلِكَ عَلَى اللَّهِ يَسِيرٌ. لِكَيْ لَا تَأْسَوْا عَلَى مَا فَاتَكُمْ وَلَا تَفْرَحُوا بِمَا أَتَاكُمْ وَاللَّهُ لَا يُحِبُّ كُلِّ مُخْتَالٍ فَخُورٍ .
অর্থাৎ, "যমীনে এবং তোমাদের নিজেদের মধ্যে এমন কোনো মুসীবত আপতিত হয় না, যা আমি সংঘটিত করার পূর্বে কিতাবে লিপিবদ্ধ রাখি না। নিশ্চয় এটা আল্লাহর পক্ষে খুবই সহজ। যাতে তোমরা আফসোস না কর তার ওপর যা তোমাদের থেকে হারিয়ে গেছে এবং তোমরা উৎফুল্ল না হও তিনি তোমাদেরকে যা দিয়েছেন তার কারণে। আর আল্লাহ কোনো উদ্ধত ও অহঙ্কারীকে পছন্দ করেন না।" (সূরা হাদীদ: ২২-২৩)
মনে রাখা প্রয়োজন! অস্থিরতা হারানো বস্তু ফিরিয়ে আনতে পারে না, বরং তা হিতকামনাকারীকে দুঃখিত ও অশুভ কামনাকারীকে আনন্দিত করে। সাবধান! মুসিবতের দুঃখের সাথে হতাশার নৈরাশ্য সংযোজন করো না। কারণ উভয়ের সঙ্গে ধৈর্যের সহাবস্থান হয় না। এমন বিপরীতধর্মী জিনিস অন্তরও গ্রহণ করে না। এ জন্য বলা হয়, "ধৈর্যের মুসিবত, সবচেয়ে বড় মুসিবত।" কথিত আছে, জনৈক দম্পতির খুব আদরের এক সন্তান মারা যায়, স্বামী স্ত্রীকে সান্ত্বনা দিয়ে বলে, আল্লাহকে ভয় কর, ছওয়াবের আশা রাখ, ধৈর্যধারণ কর। সে উত্তরে বলে, আমি যদি ধৈর্যকে হতাশার মাধ্যমে নষ্ট করে দেই। তাহলে এটাই হবে সবচেয়ে বড় মুসিবত।
সম্ভব ও সাধ্যের নাগালের জিনিস গ্রহণ করেই ধৈর্যধারণকারীদের মর্যাদা লাভ করা যায়। যেমন হাতাশা না করা, কাপড় না ছিড়া, গাল না চাপড়ানো, অভিযোগ না করা, মুসিবত প্রকাশ না করা, খাওয়া-দাওয়া ও পরিধানের অভ্যাস স্বাভাবিক রাখা, আল্লাহ তায়ালার ফায়সালাতে সন্তুষ্ট থাকা। এ বিশ্বাস করে, যা ফেরত নেয়া হয়েছে, তা আল্লাহর পক্ষ থেকে আমাদের কাছে আমানত ছিল। এবং সে পদ্ধতি গ্রহণ করা, যা হজরত উম্মে সুলাইম (রা.) গ্রহণ করেছিলেন।
বর্ণিত আছে, তাদের একটি ছেলে মারা গেলে, আপন স্বামী আবু তালহাকে তিনি এ বলে সান্ত্বনা দেন যে, কোন সম্প্রদায় যদি কোন দম্পতির নিকট একটি আমানত রাখে, অতঃপর তারা তাদের আমানত ফের নিয়ে নেয়, তাহলে আপনি সেটা কোন দৃষ্টিতে দেখবেন? তাদের নিষেধ করার কোন অধিকার আছে কি? উত্তর দিলেন, না। বললেন, আপনার ছেলেকে সে আমানত গণ্য করুন। তাকে হারানো পূণ্য জ্ঞান করুন।
এ ঘটনা অবহিত হয়ে রসূল (সা.) বলেন: "আল্লাহ তায়ালা তোমাদের গতরাতে বরকত দান করুন।" (সহীহ মুসলিম: ৪৪৯৬)
সর্বশেষ বলি, ধৈর্য ধৈর্যধারণকারীকে প্রশান্তি এনে দেয়, মুসিবতের পরিবর্তে পূণ্য এনে দেয়। অতএব স্বেচ্ছায় ধৈর্যধারণ করাই ভালো। অন্যথায় অযথা পেরেশান হয়ে, ধৈর্যধারণ করতে বাধ্য হবে। তাই বলা হয় "যে জ্ঞানীর মত ধৈর্যধারণ না করে, সে চতুষ্পদ জন্তুর মত যন্ত্রণা সহ্য করে।" হজরত আলী (রা.) বলেন: "যদি তুমি ধৈর্যধারণ করো, তাহলে তোমার ওপর তকদির বর্তাবে, তবে তুমি নেকি লাভ করবে। পক্ষান্তরে যদি ধৈর্যহারা হও, তাহলেও তোমার ওপর তকদির বর্তাবে, তবে তুমি গুণাহগার হবে।" ২৫
হজরত ওমর (রা.) বলেন: "আমরা উত্তম জীবনের বাহন হিসেবে ধৈর্যকেই পেয়েছি।"
হজরত আলী (রাঃ) থেকে বর্ণিত: "স্মরণ রেখ মাথা যেমন শরীরের অংশ, তদ্রূপ ধৈর্যও ঈমানের অংশ। আরো স্মরণ রাখ, যার ধৈর্য নেই, তার ঈমানও নেই।"
হজরত হাসান রহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন: "ক্রোধের সময় সহনশীলতার ঢোক এবং মুসিবতের সময় ধৈর্যের ঢোকের চেয়ে বড় ঢোক কেউ গলধকরণ করেনি।"
উমর ইবনে আব্দুল আজিজ রহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন: "আল্লাহ তায়ালা যদি কাউকে নেয়ামত দিয়ে পুনরায় নিয়ে নেন এবং বিনিময়ে ধৈর্য দান করেন, তাহলে বলতে হবে, দানকৃত বস্তুই উত্তম, নিয়ে নেয়া বস্তু থেকে।"
আল্লাহ তায়ালা আমাদেরকে প্রকৃত ধৈর্যশীল ও কৃতজ্ঞদের অন্তর্ভুক্ত করুন। আমাদের জন্য তিনিই যথেষ্ট, তিনিই আমাদের অভিভাবক।
৫. তাকদীরের ওপর বিশ্বাস স্থাপন করা
তাকদীরের ওপর বিশ্বাস স্থাপন করা প্রত্যেক মুমিনের জন্য অপরিহার্য। যে ব্যক্তি তাকদীরের ওপর বিশ্বাস স্থাপন করবে দুনিয়ার জীবনের দুঃখ-কষ্ট, বালা- মুসিবত তার কাছে নগন্য বলে মনে হবে। তাকদীরে বিশ্বাসী মুমিনগণ পার্থিব মুসিবতে সবচে কম প্রতিক্রিয়াশীল, কম অস্থির ও কম হতাশাগ্রস্ত হন। মূলত তাকদীরের প্রতি ঈমানই হচ্ছে শান্তি ও নিরাপত্তার ঠিকানা। তাকদীরে বিশ্বাস স্থাপনের কারণে আল্লাহ তায়ালা মুমিনদের হৃদয় নৈরাশ্য ও হতাশা মুক্ত রাখেন। যেমনিভাবে রাসূল (সা.) বলেছেন-
"জেনে রেখ, সমস্ত মানুষ জড়ো হয়ে যদি তোমার উপকার করতে চায়, কোনোও উপকার করতে পারবে না, তবে যতটুকু আল্লাহ তোমার জন্য লিখে রেখেছেন। আবার তারা সকলে মিলে যদি তোমার ক্ষতি করতে চায়, কোনোও ক্ষতি করতে পারবে্বা না, তবে যততুটু আল্লাহ তোমার কপালে লিখে রেখেছেন। কলম উঠিয়ে নেয়া হয়েছে, কিতাব শুকিয়ে গেছে।" (সহীহ তিরমিযী: ২৪৪০)
মানুষের হায়াত, রিযিক তার মায়ের উদর থেকেই নির্দিষ্ট। আনাস রাদিআল্লাহু আনহুর সূত্রে বর্ণিত, রসূলুল্লাহ (সা.) বলেন:
"আল্লাহ তায়ালা গর্ভাশয়ে একজন ফেরেস্তা নিযুক্ত করে রেখেছেন, পর্যায়ক্রমে সে বলতে থাকে, হে প্রভু জমাট রক্ত, হে প্রভু মাংস পিন্ড। যখন আল্লাহ তাকে সৃষ্টি করার ইচ্ছা করেন, ফেরেস্তা তখন বলে, হে প্রভু পুঃলিঙ্গ না স্ত্রী লিঙ্গ? ভাগ্যবান না হতভাগা? রিযিক কতটুকু? হায়াত কতটুকু? উত্তর অনুযায়ী পূর্ণ বিবরণ মায়ের পেটেই লিপিবদ্ধ করে দেয়া হয়।" (সহীহ বুখারী: ৬১০৬, সহীহ মুসলিম: ৪৭৮৫)
একদা রাসূল (সা.)-এর সহধর্মিনী উম্মে হাবিবা রাদিআল্লাহু আনহা মুনাজাতে বলেন, "হে আল্লাহ! আমার স্বামী রাসূল (সা.), আমার পিতা আবু সুফিয়ান এবং আমার ভাই মুয়াবিয়ার দ্বারা আমাকে উপকৃত করুন।" রাসূলুল্লাহ (সা.) বলেন: "তুমি নির্ধারিত হায়াত, নির্দিষ্ট কিছু দিন ও বণ্টনকৃত রিযিকের প্রার্থনা করেছ। যাতে আল্লাহ তায়ালা আগ-পাছ কিংবা কম-বেশী করবেন না। এরচেয়ে বরং তুমি যদি জাহান্নামের আগুণ ও কবরের আযাব থেকে নাজাত প্রার্থনা করতে, তাহলে তোমার জন্য তা কল্যাণকর ও মঙ্গলজনক হত।" (সহীহ মুসলিম: ৪৮১৪)
ইমাম নববী রাহমাতুল্লাহি আলাইহি বলেন, "হাদীসের বক্তব্য সুষ্পষ্ট, মানুষের হায়াত, রিযিক আল্লাহ কর্তৃক নির্ধারিত, তার অবিনশ্বর জ্ঞান অনুযায়ী লিপিবদ্ধ এবং হ্রাস-বৃদ্ধিহীন ও অপরিবর্তনীয়।"
ইবনে দায়লামী রাহমাতুল্লাহি আলাইহি উবাই ইবনে কাব রাদিআল্লাহু আনহুর নিকট আসেন এবং বলেন, আমার অন্তরে তাকদির সম্পর্কে সংশয়ের সৃষ্টি হয়েছে। আমাকে কিছু বর্ণনা করে শোনান। হতে পারে আল্লাহ আমার অন্তর থেকে তা দূর করে দিবেন। তিনি বলেন, আল্লাহ আসমান এবং জমিনবাসীদের শাস্তি দিলে, জালেম হিসেবে গণ্য হবেন না। আর তিনি তাদের সকলের ওপর রহম করলে, তার রহম-ই তাদের আমলের তুলনায় বেশী হবে। তাকদিরের প্রতি ঈমান ব্যতীত ওহুদ পরিমান স্বর্ণ দান করলেও কবুল হবে না। স্মরণ রেখ, যা তোমার হস্তগত হওয়ার তা কোনোভাবেই হস্তচ্যুত হওয়ার সাধ্য রাখে না। এতদভিন্ন অন্য আকিদা নিয়ে মৃত্যুবরণ করলে জাহান্নাম অবধারিত। তিনি বলেন, অতঃপর আমি আব্দুল্লাহ ইবনে মাসউদ এর কাছে আসি। তিনিও তদ্রূপ শোনালেন। হুযাইফাতুল য়ামান এর কাছে আসি, তিনিও তদ্রূপ বললেন। যায়েদ বিন ছাবেত এর কাছে আসি, তিনিও রসূলুল্লাহ (সা.) থেকে অনুরূপ বর্ণনা করে শোনালেন।" (আবু দাউদ: ৪০৭৭, আহমাদ: ২০৬০৭)
৬. যে কোন পরিস্থিতি মেনে নেয়ার মানসিকতা লালন করা
প্রত্যেকের প্রয়োজন মুসিবত আসার পূর্বেই নিজকে মুসিবত সহনীয় করে তোলা, অনুশীলন করা ও নিজেকে শুধরে নেয়া। কারণ ধৈর্য কষ্টসাধ্য জিনিস, যার জন্য পরিশ্রম অপরিহার্য।
এ কথা সত্য যে, দুনিয়া অনিত্য, ভঙ্গুর ও ক্ষণস্থায়ী। এতে কোনো প্রাণীর স্থায়িত্ব বলে কিছু নেই। আছে শুধু ক্ষয়িষ্ণু এক মেয়াদ, সীমিত সামর্থ। এ ছাড়া আর কিছুই নেই। রাসূলুল্লাহ (সা.) পার্থিব জীবনের উদাহরণে বলেন: "পার্থিব জীবন ঐ পথিকের ন্যায়, যে গ্রীষ্মে রৌদ্রজ্জ্বল তাপদগ্ধ দিনে যাত্রা আরম্ভ করল, অতঃপর দিনের ক্লান্তময় কিছু সময় একটি গাছের নীচে বিশ্রাম নিল, ক্ষণিক পরেই তা ত্যাগ করে পুনরায় যাত্রা আরম্ভ করল।" (মুসনাদে আহমাদ: ২৭৪৪)
হে মুসলিম! দুনিয়ার সচ্ছলতার দ্বারা ধোঁকা খেওনা, মনে করো না, দুনিয়া স্বীয় অবস্থায় আবহমানকাল বিদ্যমান থাকবে কিংবা পট পরিবর্তন বা উত্থান-পতন থেকে নিরাপদ রবে। অবশ্য যে দুনিয়াকে চিনেছে, এর অবস্থা পর্যবেক্ষণ করেছে, তার নিকট দুনিয়ার সচ্ছলতা মূল্যহীন।
জনৈক বিদ্বান ব্যক্তি বলেন, "যে দুনিয়া থেকে সতর্ক থেকেছে ভবিষ্যত জীবনে সে অস্থির হয়নি। যে অনুশীলন করেছে পরবর্তীতে তার পদস্খলন ঘটেনি। যে অবর্তমানে অপেক্ষমাণ ছিল বর্তমানে সে দুঃখিত হয়নি।" মুদ্দা কথা, যে পার্থিব জগতে দীর্ঘজীবি হতে চায়, তার প্রয়োজন মুসিবতের জন্য ধৈর্য্যশীল এক হৃদয়।২৬
টিকাঃ
২৩. আল-আনসারী, খালেদ বিন মুহাম্মাদ, সাফা'হাত মিনাস্ সবর, পৃঃ ৩২।
২৪. আযযাহবি, আবু আব্দুল্লাহ সামসুদ্দিন, সিয়ারু আ'লামিন নুবালা, ৪র্থ খণ্ড, পৃঃ ৪৩০।
২৫. আল মা'ওরদি, আবুল হাসান আলী বিন মুহাম্মদ বিন হাবিব, আদাবুদ দুনিয়া ওয়া দ্বীন, পৃ: ২৯৪।
২৬. কিয়াম (রহ.), ইমাম মুহাম্মাদ বিন আবু বকর ইবনে, ইদ্দাতুস সাবেরীন, পৃঃ ৫২৩।
📄 সবরের পুরস্কার
শত কষ্টের মাঝেও যারা আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের জন্য ধৈর্যধারণ করে, হোক সেটা আল্লাহর আনুগত্যের ক্ষেত্রে, অথবা সেটা নিষিদ্ধ কাজ থেকে বাঁচার জন্য কিংবা বিপদাপদ অবস্থায়। আল্লাহ তায়ালা তার জন্য উত্তম পুরস্কারের ব্যবস্থা করেছেন। তা নিম্নে উল্লেখ করা হলো-
জান্নাতে প্রবেশ ও রেশমী কাপড় পরিধানের সুসংবাদ
মুমিন ব্যক্তিদের পার্থিব জীবন হচ্ছে ধৈর্য বা সবরের জীবন। কারণ ঈমান আনার পর থেকে মৃত্যু পর্যন্ত তারা চলার পথে নিজের অবৈধ আশা-আকাঙ্ক্ষাকে অবদমিত করা, আল্লাহর নির্দিষ্ট সীমাসমূহ মেনে চলা, আল্লাহর নির্ধারিত ফরযসমূহ পালন করা, আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের জন্য সময়, অর্থ-সম্পদ, শ্রম, শক্তি ও যোগ্যতা এমনকি প্রয়োজনের মুহূর্তে প্রাণ পর্যন্ত কুরবানী করা, আল্লাহর পথ থেকে দূরে সরিয়ে দেয় এরূপ সমস্ত লোভ-লালসা ও আকর্ষণকে পদাঘাত করা, সত্য ও সঠিক পথে চলতে যেসব বিপদ ও দুঃখ-কষ্ট আসে তা সহ্য করা, ন্যায় ও সত্যপ্রীতির কারণে যে ক্ষতি মর্মবেদনা ও দুঃখ-কষ্ট এসে আঁকড়ে ধরে তা বরদাশত করা এসবই আল্লাহর এ ওয়াদার ওপর আস্থা রেখে করা যে এ সদাচরণের সুফল এ পৃথিবীতে নয় বরং মৃত্যুর পর আরেকটি জীবনে পাওয়া যাবে। সে সকল মুমিন বান্দাদের জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে রয়েছে চিরস্থায়ী জান্নাত ও জান্নাতি রেশমী কাপড় পরিধানের সুসংবাদ। যেমন পবিত্র কুরআনে বলা হচ্ছে-
وَجَزَاهُم بِمَا صَبَرُوا جَنَّةً وَحَرِيرًا • (سورة الدهر : ١٢)
অর্থাৎ, আর তারা যে ধৈর্যধারণ করেছিল তার পরিণামে তিনি তাদেরকে জান্নাত ও রেশমী বস্ত্রের পুরস্কার প্রদান করবেন। (সূরা দাহর: ১২)
অন্য আয়াতে তাদের জন্য রোদ্রের উত্তাপ ও তীব্র ঠাণ্ডা বিহীন উঁচু আসনে বসার সুসংবাদ দেয়া হচ্ছে। যেমনিভাবে আল্লাহ তায়ালা পবিত্র কুরআনে বলছেন-
مُتَّكِثِينَ فِيهَا عَلَى الْأَرَائِكِ لَا يَرَوْنَ فِيهَا شَمْسًا وَلَا زَمْهَرِيرًا .
অর্থাৎ, তারা সেখানে সুউচ্চ আসনে হেলান দিয়ে আসীন থাকবে। তারা সেখানে না দেখবে অতিশয় গরম, আর না অত্যধিক শীত। (সূরা দাহর: ১৩)
জান্নাতের সম্মানিত ফেরেশতাদের শাস্তি বর্ষণ
এ সকল মুমিন বান্দাদেরকে জান্নাতের সম্মানিত ফেরেশতাগন সালাম দেবে এবং তাদেরকে পরিপূর্ণ শান্তি ও নিরাপত্তার সুখবর দিবে। যেমন আল্লাহ তায়ালা বলছেন-
سَلَامٌ عَلَيْكُم بِمَا صَبَرْتُمْ فَنِعْمَ عُقْبَى الدَّارِ .
অর্থাৎ, (আর বলবে) 'শান্তি তোমাদের ওপর, কারণ তোমরা সবর করেছ, আর আখিরাতের এ পরিণাম কতই না উত্তম'। (সূরা রাদ: ২৪)
ক্ষমা ও উত্তম প্রতিদান
সবরকারী ব্যক্তি তো সেই যে কালের পরিবর্তনশীল অবস্থায় নিজের মানসিক ভারসাম্য অটুট রাখে। সময়ের প্রত্যেকটি পরিবর্তনের প্রভাব গ্রহণ করে সে নিজের রং বদলাতে থাকে না। বরং সব অবস্থায় যুক্তিসঙ্গত ও সঠিক মনোভাব ও দৃষ্টিভঙ্গী নিয়ে এগিয়ে চলে। যদি কখনো অবস্থা অনুকূল এসে যায় এবং সে ধনাঢ্যতা, কর্তৃত্ব ও খ্যাতির উচ্চাসনে চড়তে থাকে তাহলে শ্রেষ্ঠত্ব ও অহংকারের নেশায় মত্ত হয়ে বিপথে পরিচালিত হয় না। আর যদি কখনো বিপদ-আপদ ও সমস্যা-সংকটে করাল আঘাত ক্ষত-বিক্ষত করতে থাকে, তাহলে এহেন অবস্থায়ও সে নিজের মানবিক চরিত্র বিনষ্ট করে না। আল্লাহর পক্ষ থেকে সুখৈশ্বর্য বা বিপদ-মুসীবত যে কোনো আকারেই তাকে পরীক্ষায় ফেলা হোক না কেন উভয় অবস্থায় তার ধৈর্য ও সহিষ্ণুতা অপরিবর্তিত ও দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠিত থাকে। তার হৃদয়পাত্র কখনো কোনো ছোট বা বড় জিনিসের আধিক্যে উপচে পড়ে না। আল্লাহ তায়ালা এমন ধরনের লোকদের দোষ-ত্রুটি ক্ষমা করে দেন এবং তাদের সৎকাজের পুরস্কার প্রদান করেন। যেমনিভাবে কুরআন মাজীদে বলা হয়েছে-
إِلَّا الَّذِينَ صَبَرُوا وَعَمِلُوا الصَّالِحَاتِ أُولَئِكَ لَهُم مَّغْفِرَةٌ وَأَجْرٌ كَبِيرٌ .
অর্থাৎ, তবে যারা সবর করেছে এবং সৎকর্ম করেছে, তাদের জন্যই রয়েছে ক্ষমা ও মহাপ্রতিদান। (সূরা হুদ: ১১)
অগণিত পুরষ্কার
যারা মহান আল্লাহর ওপর ঈমান এনেছে এবং তাকওয়ার অবলম্বন করেছে। দুনিয়ায় আগত বিপদ-আপদের সময় ধৈর্যধারণ করেছে ও তাকদীরের ভাল-মন্দের ওপর বিশ্বাস স্থাপন করেছে, সে সকল বান্দাদের জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে অগণিত পুরষ্কারের কথা বলা হয়েছে। যেমন আল্লাহ তায়ালা বলছেন-
قُلْ يَا عِبَادِ الَّذِينَ آمَنُوا اتَّقُوا رَبَّكُمْ لِلَّذِينَ أَحْسَنُوا فِي هَذِهِ الدُّنْيَا حَسَنَةٌ وَأَرْضُ اللَّهِ وَاسِعَةٌ إِنَّمَا يُوَفِّى الصَّابِرُونَ أَجْرَهُم بِغَيْرِ حِسَابٍ .
অর্থাৎ, বল, 'হে আমার মুমিন বান্দারা যারা ঈমান এনেছ, তোমরা তোমাদের রবকে ভয় কর। যারা এ দুনিয়ায় ভালো কাজ করে তাদের জন্য রয়েছে কল্যাণ। আর আল্লাহর যমীন প্রশস্ত, কেবল ধৈর্যশীলদেরকেই তাদের প্রতিদান পূর্ণরূপে দেয়া হবে কোনো হিসেব ছাড়াই।' (সূরা যুমার: ১০)
ঈসা (আ.) এর অনুসারী যারা জাতীয়, বংশীয়, দলীয় ও স্বদেশের স্বার্থপ্রীতি থেকে মুক্ত ছিল এবং দ্বীনের ওপর অবিচল ছিল এবং নতুন নবীর আগমনে যে কঠিন পরীক্ষার মুখোমুখি হতে হয়েছিল তাতে প্রমাণ করে দিয়েছিল যে আসলে তারা ঈসা পূজারী নয় বরং তারা আল্লাহর পূজারী ছিল। তাদের এ কঠিন পরিস্থিতিতে তারা ধৈর্যধারণ করেছিল। আর আল্লাহ তায়ালা তাদের এ ধৈর্যের পুরস্কারস্বরূপ তাদেরকে দ্বিগুণ পুরস্কারের সুসংবাদ প্রদান করেছেন। যেমন কুরআনে এসেছে-
أُولَئِكَ يُؤْتَوْنَ أَجْرَهُم مَّرَّتَيْنِ بِمَا صَبَرُوا وَيَدْرَءُونَ بِالْحَسَنَةِ السَّيِّئَةَ وَمِمَّا رَزَقْنَاهُمْ يُنفِقُونَ .
অর্থাৎ, তাদেরকে দু'বার প্রতিদান দেয়া হবে। এ কারণে যে, তারা ধৈর্যধারণ করে এবং ভালো দ্বারা মন্দকে প্রতিহত করে। আর আমি তাদেরকে যে রিষ্ক দিয়েছি তা থেকে ব্যয় করে। (সূরা কাসাস: ৫৪)
নেতৃত্ব প্রদান
ধৈর্য ও অবিচলতার মাধ্যমে যে নেতৃত্বের উচ্চ আসনে অধিষ্ঠিত হওয়া যায়, তার বাস্তব উদাহরণ হচ্ছে বনী ইসরাঈল। আল্লাহর আয়াতের প্রতি তাদের যে দৃঢ়প্রত্যয় স্থাপন এবং আল্লাহর বিধান মেনে চলার ব্যাপারে যে সবর ও অবিচল নিষ্ঠা প্রদর্শন তার ফলশ্রুতিতে তারা শ্রেষ্ঠ জাতিসত্তায় পরিণত হয়েছিল এবং উন্নতির উচ্চ শিখরে আরোহণ করেছিল। বনী ইসরাঈল জাতির মধ্যে তারাই নেতৃত্ব লাভ করে যারা আল্লাহর কিতাবের প্রতি প্রকৃত বিশ্বস্ত ছিল এবং যারা বৈষয়িক স্বার্থোদ্ধার ও স্বাদ আস্বাদনের সীমা ছাড়িয়ে যেত না। তাদের প্রসঙ্গে পবিত্র কুরআনে এভাবে বলা হচ্ছে-
وَجَعَلْنَا مِنْهُمْ أَئِمَّةً يَهْدُونَ بِأَمْرِنَا لَمَّا صَبَرُوا وَكَانُوا بِآيَاتِنَا يُوقِنُونَ .
অর্থাৎ, আর আমি তাদের মধ্য থেকে বহু নেতা করেছিলাম, তারা আমার আদেশানুযায়ী সৎপথ প্রদর্শন করত, যখন তারা ধৈর্যধারণ করেছিল। আর তারা আমার আয়াতসমূহের প্রতি দৃঢ় বিশ্বাস রাখত। (সূরা আস্সাজদাহ: ২৪)
বিপদাপদে আল্লাহর সাহায্যের প্রতিশ্রুতি প্রদান
যে সকল ঈমানদার ব্যক্তিগণ কঠিন বিপদের মুহূর্তে ধৈর্যধারণ করে এবং নামাজ ও সবরের মাধ্যমে আল্লাহর নিকট আশ্রয় প্রার্থনা করে। আল্লাহ তায়ালা সে সকল মুমিন ব্যক্তিদেরকে বিপদ-মুসীবত সর্বাবস্থায় সাহায্যের প্রতিশ্রুতি প্রদান করেছেন। যেমন আল্লাহ তায়ালা বলছেন -
يَا أَيُّهَا الَّذِينَ آمَنُوا اسْتَعِينُوا بِالصَّبْرِ وَالصَّلَاةِ ۚ إِنَّ اللَّهَ مَعَ الصَّابِرِينَ
অর্থাৎ, হে মুমিনগণ, ধৈর্য ও সালাতের মাধ্যমে সাহায্য চাও। নিশ্চয় আল্লাহ ধৈর্যশীলদের সাথে আছেন। (সূরা বাক্বারা: ১৫৩)
শত্রুর ষড়যন্ত্র থেকে মুক্তিলাভ
কঠিন বিপদের মুহূর্তে ও শত্রুর হাজার ষড়যন্ত্র সত্ত্বেও কেউ যদি দৃঢ় মনোবল ও ধৈর্যধারণ করে আল্লাহর নিকট সাহায্য চায়। আল্লাহ তায়ালা তাকে শত্রুর ষড়যন্ত্র থেকে মুক্তিদান করেন এবং বিজয়ের পথ সুগম করে দেন। যেমন আল্লাহ তায়ালা বলছেন-
إِن تَمْسَسْكُمْ حَسَنَةٌ تَسُؤْهُمْ وَإِن تُصِبْكُمْ سَيِّئَةٌ يَفْرَحُوا بِهَا ۖ وَإِن تَصْبِرُوا وَتَتَّقُوا لَا يَضُرُّكُمْ كَيْدُهُمْ شَيْئًا ۗ إِنَّ اللَّهَ بِمَا يَعْمَلُونَ مُحِيطٌ .
অর্থাৎ, যদি তোমাদেরকে কোনো কল্যাণ স্পর্শ করে, তখন তাদের কষ্ট হয়। আর যদি তোমাদেরকে মন্দ স্পর্শ করে, তখন তারা তাতে খুশি হয়। আর যদি তোমরা ধৈর্য ধর এবং তাকওয়া অবলম্বন কর, তাহলে তাদের ষড়যন্ত্র তোমাদের কিছু ক্ষতি করবে না। নিশ্চয় আল্লাহ তারা যা করে, তা পরিবেষ্টনকারী। (সূরা আলে ইমরান: ১২০)
আল্লাহর রহমত ও হিদায়ত প্রদান
আল্লাহ তায়ালার পক্ষ থেকে মানুষের জীবনে যে পরীক্ষার সম্মুখীন হয় যেমন- ভীতি, ক্ষুধা, প্রাণ ও সম্পদের ক্ষতি, উপার্জন ও আমদানি হ্রাস ইত্যাদি পরীক্ষার সময় যে ব্যক্তি ধৈর্যের পথ অবলম্বন করে। সে সকল ব্যক্তির জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে রহমত ও হিদায়াত দানের সুসংবাদ দেওয়া হয়েছে। যেমনিভাবে কুরআনে বলা হয়েছে-
وَبَشِّرِ الصَّابِرِينَ * الَّذِينَ إِذَا أَصَابَتْهُم مُّصِيبَةٌ قَالُوا إِنَّا لِلَّهِ وَإِنَّا إِلَيْهِ رَاجِعُونَ . أُولَئِكَ عَلَيْهِمْ صَلَوَاتٌ مِّن رَّبِّهِمْ وَرَحْمَةٌ وَأُولَئِكَ هُمُ الْمُهْتَدُونَ .
অর্থাৎ, আর তুমি ধৈর্যশীলদের সুসংবাদ দাও। যারা তাদেরকে যখন বিপদ আক্রান্ত করে তখন বলে, নিশ্চয় আমরা আল্লাহর জন্য এবং নিশ্চয় আমরা তাঁর দিকে প্রত্যাবর্তনকারী। তাদের ওপরই রয়েছে তাদের রবের পক্ষ থেকে মাগফিরাত ও রহমত এবং তারাই হিদায়াতপ্রাপ্ত। (সূরা বাক্বারা: ১৫৫-১৫৭)
আল্লাহর ভালোবাসা ও প্রশংসা জ্ঞাপন
وَكَأَيِّن مِّن نَّبِيٍّ قَاتَلَ مَعَهُ رِبُّيُّونَ كَثِيرٌ فَمَا وَهَنُوا لِمَا أَصَابَهُمْ فِي سَبِيلِ اللَّهِ وَمَا ضَعُفُوا وَمَا اسْتَكَانُوا ۚ وَاللَّهُ يُحِبُّ الصَّابِرِينَ .
অর্থাৎ, আর কত নবী ছিল, যার সাথে থেকে অনেক আল্লাহওয়ালা লড়াই করেছে। তবে আল্লাহর পথে তাদের ওপর যা আপতিত হয়েছে তার জন্য তারা হতোদ্যম হয়নি। আর তারা দুর্বল হয়নি এবং তারা নত হয়নি। আর আল্লাহ ধৈর্যশীলদেরকে ভালোবাসেন। (সূরা আলে ইমরান: ১৪৬)
আল্লাহর নেক বান্দারা যখন বিপদের ও কঠিন সংকটের মুখোমুখি হয় তখন তারা তাদের রবের কাছে অভিযোগ করে না বরং ধৈর্যসহকারে তার চাপিয়ে দেয়া পরীক্ষাকে মেনে নেয় এবং তাতে উত্তীর্ণ হওয়ার জন্য আল্লাহর নিকট সাহায্য চায়। এমন ব্যক্তির জন্য আল্লাহর পক্ষ থেকে ভালোবাসা ও তাদের প্রশংসা জ্ঞাপন করা হয়। যা উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত, আমরা হযরত আইয়ুব (আ.) এর জীবনে দেখতে পাই। এ প্রসঙ্গে আল্লাহ তায়ালা বলেন-
وَخُذْ بِيَدِكَ ضِعْنَا فَاضْرِب بِهِ وَلَا تَحْنَتْ إِنَّا وَجَدْنَاهُ صَابِرًا نَّعْمَ الْعَبْدُ إِنَّهُ أَوَّابٌ .
অর্থাৎ, আর তুমি তোমার হাতে এক মুঠো তৃণলতা নাও এবং তা দিয়ে আঘাত কর। আর কসম ভঙ্গ করো না। নিশ্চয় আমি তাকে ধৈর্যশীল পেয়েছি। সে কতই না উত্তম বান্দা! নিশ্চয়ই সে ছিল আমার অভিমুখী। (সূরা সোয়াদ: ৪৪)
শত্রুর বিরুদ্ধে বিজয় লাভ
যারা আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের জন্য কাফিরদের বিরুদ্ধে যুদ্ধকালীন অবস্থায় লড়াই করে। সকল প্রকার ত্যাগ-কুরবানি ও দুঃখ-কষ্ট সহ্য করে। সে সকল ধৈর্যশীল ব্যক্তিদেরকে আল্লাহ তায়ালা বিজয় দান করেন। যেমনিভাবে বদর যুদ্ধে বিজয় দান করেছিলেন। যেমন কুরআনে বলা হচ্ছে-
بَلَى إِن تَصْبِرُوا وَتَتَّقُوا وَيَأْتُوكُم مِّن فَوْرِهِمْ هَذَا يُمْدِدْكُمْ رَبُّكُم بِخَمْسَةِ آلَافٍ مِّنَ الْمَلَائِكَةِ مُسَوِّمِينَ .
অর্থাৎ, হ্যাঁ, যদি তোমরা ধৈর্য ধর এবং তাকওয়া অবলম্বন কর, আর তারা হঠাৎ তোমাদের মুখোমুখি এসে যায়, তবে তোমাদের রব পাঁচ হাজার চিহ্নিত ফেরেশতা দ্বারা তোমাদেরকে সাহায্য করবেন। (সূরা আলে ইমরান: ১২৫)
আর যে জাতিকে দুর্বল মনে করা হতো আমি তাদেরকে যমীনের পূর্ব ও তার পশ্চিমের উত্তরাধিকারী বানালাম, যেখানে আমি বরকত দিয়েছি এবং বনী ইসরাঈলের ওপর তোমার রবের উত্তম বাণী পরিপূর্ণ হলো। কারণ তারা ধৈর্যধারণ করেছে। আর ধ্বংস করে দিলাম, যা কিছু তৈরি করেছিল ফিরআউন ও তার সম্প্রদায় এবং তারা যা নির্মাণ করেছিল। (সূরা আরাফ: ১৩৭)
জান্নাতে বাইতুল হামদ নামক গৃহ নির্মাণ
প্রিয়জন বিয়োগে যারা ধৈর্যধারণ করে ও আল্লাহর সন্তুষ্টি অর্জনের জন্য তাঁর প্রশংসা করে। সে সকল ব্যক্তিদের জন্য আল্লাহ তায়ালা জান্নাতে বাইতুল হামদ বা প্রশংসার গৃহ নির্মাণ করবেন। এ প্রসঙ্গে রাসূল (সা.) বলেছেন-
"হযরত আবু মূসা আশআরী (রা.) বর্ণনা করেন, রাসূল (সা.) বলেছেন, যখন কোনো ব্যক্তির বাচ্চা মারা যায় তখন আল্লাহ পাক ফেরেশতাদের জিজ্ঞেস করেন তোমরা আমার বান্দার ছেলের রূহ কবয করেছো? তারা জবাব দেয় জ্বি হ্যাঁ। আল্লাহ বলেন-তোমরা তার হৃদয়ের ফলকে ছিনিয়ে নিয়েছ? তারা জবাব দেয় জি হ্যাঁ। আল্লাহ জিজ্ঞেস করেন তো আমার বান্দাহ কি বলছে? তারা জবাব দেয় সে তোমার প্রশংসা করেছে এবং পড়েছে। এরপর আল্লাহ ফেরেশতাদের আদেশ করেন, তোমরা আমার বান্দাদের জন্য জান্নাতে ঘর বানাও এবং তার নাম বায়তুল হামদ (প্রশংসার ঘর) রাখো।" (রিয়াদুস সালেহীন: ১৩৯৫)
পরিশেষে, মহান আল্লাহর নিকট প্রার্থনা, হে আল্লাহ! তুমি আমাদেরকে সেই সকল ধৈর্যশীলদের মধ্যে অন্তর্ভূক্ত কর, যারা বিপদ-মুসিবত, দুঃখ-কষ্টে সবর করে। যারা সুখের সময় ও সুস্থতায় সবর করে। হে রব! আমাদের ধৈর্যকে তাদের মতো করে দাও, যারা একমাত্র তোমার সান্নিধ্য লাভের জন্য সবর করে এবং চিরস্থায়ী জান্নাতের অধিবাসী। আমীন।