📘 সবরের পুরস্কার 📄 ধৈর্যের অনন্য উদাহরণ হযরত মুহাম্মদ (সা.)

📄 ধৈর্যের অনন্য উদাহরণ হযরত মুহাম্মদ (সা.)


রাসূল (সা.)-এর জীবন বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে, তিনি আল্লাহর আনুগত্য ও মানুষের মাঝে আল্লাহর দ্বীন প্রচার কে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছেন। আর এই দাওয়াতি ময়দানে এমন অসংখ্য ঘটনা আছে, যেগুলোর মধ্যে রাসূল (সা.)-এর সর্বোচ্চ ত্যাগ এবং ধৈর্যের পরিচয় পাওয়া যায়। তিনি আল্লাহর নৈকট্য এবং তার থেকে বিনিময় লাভকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিতেন। এ কথা আমরা সবাই জানি, রাসূল (সা.) গোপনীয় দাওয়াতের ক্ষেত্রে সর্বাধিক ধৈর্যধারণ করেন। এমনকি মৃত্যুর পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্ত ধৈর্যের সর্বোচ্চ দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। দাওয়াতি ময়দানে রাসূল (সা.)-এর ধৈর্যের দৃষ্টান্ত স্থাপনের অসংখ্য ঘটনা বিদ্যমান।

সাফা পাহাড়ে সত্যের দাওয়াত এবং আবু জাহেলের অত্যাচার সত্ত্বেও ধৈর্যধারণ
আল্লাহ তায়ালা রাসূল (সা.) কে নিকট আত্মীয়দের ইসলামের দাওয়াত দেয়ার জন্য নির্দেশ দেন। যেমন আল্লাহ তায়ালা বলেন-
وَأَنْذِرْ عَشِيرَتَكَ الْأَقْرَبِينَ . وَاخْفِضْ جَنَاحَكَ لِمَنِ اتَّبَعَكَ مِنَ الْمُؤْمِنِينَ . فَإِنْ عَصَوْكَ فَقُلْ إِنِّي بَرِيءٌ مِمَّا تَعْمَلُونَ . وَتَوَكَّلْ عَلَى الْعَزِيزِ الرَّحِيمِ .
অর্থাৎ, "আর তুমি তোমার নিকট আত্মীয়দের সতর্ক কর। আর যে সব ঈমানদার, যারা তোমার অনুকরণ করে, তাদের প্রতি বিনয়ী হও। আর যদি তারা তোমার অবাধ্য হয়, তুমি তাদের বলে দাও, তোমরা যা করো তার দায় হতে আমি মুক্ত।” (সূরা শোয়ারা: ২১৪-২১৬)

মূলত এ আয়াত নাযিলের মাধ্যমেই প্রকাশ্যে ইসলামের দাওয়াত প্রদানের নির্দেশ আসে। প্রকাশ্যে দাওয়াতের নির্দেশ আসার পর রাসূল (সা.) মোটেই বিচলিত হননি, বরং তার বুদ্ধিমত্তা, তার সাহসিকতা, সহনশীলতা, সুন্দর ব্যবহার এবং ইখলাস, আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের ঐকান্তিক আগ্রহ ইত্যাদি অনেক কিছুই তার জীবনীতে ফুটে ওঠে। তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হচ্ছে সাফা পাহাড়ে রাসূল (সা.) প্রকাশ্যে সত্যের আহ্বান-
ইবনে আব্বাস (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন- যখন আল্লাহর বাণী "আর তুমি তোমার নিকট আত্মীয়দের সতর্ক কর।" যখন অবতীর্ণ হলো, তখন রাসূল (সা.) সাফা পাহাড়ের ওপর আরোহণ করে প্রতিটি গোত্রের নাম ধরে ধরে ডাক দিলেন- হে বনী ফাহর! হে বনী আদি! এ রকমভাবে কুরাইশের সম্ভ্রান্ত বংশকে- ডাকতে আরম্ভ করেন। তার ডাক শুনে সমস্ত মানুষ একত্রিত হলো। এমনকি যদি কোনো ব্যক্তি না আসতে পারতো, সে একজন প্রতিনিধিকে পাঠাতো, কি বলে তা শুনার জন্য। আবু জাহেল নিজে এবং কুরাইশরা সবাই উপস্থিত হলো। তারপর তিনি সবাইকে সম্বোধন করে বললেন, 'আমি যদি বলি, এ পাহাড়ের পাদদেশে অস্ত্র সজ্জিত এক বাহিনী তোমাদের ওপর আক্রমণের অপেক্ষায় আছে, তোমরা কি আমাকে বিশ্বাস করবে?' সকলে এক বাক্যে বলল, 'অবশ্যই বিশ্বাস করব।' কারণ, আমরা কখনো তোমাকে মিথ্যা বলতে দেখিনি। তিনি বললেন, আমি তোমাদের সতর্ক করছি ভয়াবহ শাস্তি- আল্লাহর আজাব সম্পর্কে। এ কথা শুনে আবু লাহাব বলল, 'তোমার জন্য ধ্বংস! পুরো দিনটাই তুমি আমাদের নষ্ট করলে। এ জন্যই কি আমাদের একত্রিত করেছ?' (সহীহ বুখারী: ৪৭৭০)

আবু লাহাবের এমন আচরণে আল্লাহর রাসূল (সা.) তাকে গালি দিলেন না এবং তার বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ করলেন না। বরং ধৈর্যসহকারে তিনি সবকিছু সহ্য করে গেলেন। আল্লাহ তায়ালা তার রাসূলের আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধির জন্য আয়াত নাযিল করলেন-
تَبَّتْ يَدَا أَبِي لَهَبٍ وَتَبَّ • مَا أَغْنَى عَنْهُ مَالُهُ وَمَا كَسَبَ .
অর্থাৎ, “ধ্বংস হোক আবু লাহাবের দুই হাত এবং সে নিজেও ধ্বংস হোক। তার ধন সম্পদ এবং তার কোনো উপার্জন কাজে আসে নাই।" (সূরা লাহাব: ১-২)

অন্য এক বর্ণনায় বলা হয়েছে-
হযরত আবু হুরায়রা (রা.) বর্ণনায় বর্ণিত, রাসূল (সা.) এক এক গোত্রকে আলাদা করে ডাকেন এবং প্রতিটি গোত্রকে বলেন, 'তোমরা নিজেদেরকে জাহান্নামের আগুণ হতে রক্ষা কর।' এবং কলিজার টুকরা ফাতেমা (রা.) কে ডেকে বলেন, 'হে ফাতেমা! তুমি তোমাকে জাহান্নামের আগুণ হতে রক্ষা কর। কারণ, আল্লাহর পাকড়াও হতে তোমাদের রক্ষা করার মত কোনো ক্ষমতা আমি রাখি না। হ্যাঁ, তবে আমার সাথে তোমার রক্তের সম্পর্ক থাকায় আমি তোমাকে আদর-যত্নে সিক্ত করতে পারার আশা রাখি।' (সহীহ বুখারী: ৪৭৭১)

উল্লেখিত হাদীসে দেখতে পাই, রাসূল (সা.)-এর দাওয়াত ছিল সর্বোচ্চ তাবলীগ ও ভীতি প্রদর্শন। এখানে রাসূল (সা.) একটি বিষয় স্পষ্ট করেন যে, কোনো ব্যক্তির নাজাতের উপায় কখনো বংশ মর্যাদা, পিতা-মাতার পরিচয়, আত্মীয়তা কিংবা জাতীয়তা ইত্যাদির মানদন্ডে হতে পারে না বরং এর মানদণ্ড হলো তাওহীদ ও রিসালাতের ওপর বিশ্বাস। এ ঘোষণার পর আরবদের মাঝে বংশ মর্যাদা এবং আত্মীয়তা ইত্যাদির গৌরব আর অহংকারের যে প্রবণতা ছিল, তা আর অবশিষ্ট রইল না। এবং আল্লাহ ও রাসূলের প্রতি আনুগত্য ভিন্ন অন্য যে কোনো উপকরণ-আত্মীয়তা, বংশবর্ণ ইত্যাদির ভিত্তিতে যে সব জাতীয়তা গড়ে উঠে তা একে বারে মূল্যহীন। গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান এবং প্রতিকুল প্রেক্ষাপটে ও তার বংশের লোকদের সর্বোচ্চ সতর্ক করলেন তিনি। তাদের ইসলামের সুশীতল ছায়াতলে আশ্রয় নেয়ার আহ্বান জানালেন। আল্লাহর কঠিন আজাব হতে ভয় দেখালেন এবং তাদের মূর্তি পূজা হতে বিরত থাকতে আহ্বান করলেন।১৭

যাইহোক, রাসূল (সা.) তার দাওয়াতি জীবনীতে ধৈর্য ও সহনশীলতার যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করে গেছেন, পৃথিবীর ইতিহাসে তা বিরল। আল্লাহর আদেশের আনুগত্য এবং তার প্রতি যে প্রগাঢ় ভালোবাসা তিনি দেখিয়েছেন, তা পৃথিবীর ইতিহাসে চিরদিন স্মরণীয় হয়ে থাকবে।

কুরাইশের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি বর্গের সাথে রাসূল (সা.)-এর আচরণ
কুরাইশরা যখন দেখতে পেল শুধু নির্যাতন এবং দমননীতি অবলম্বন করে মুসলমানদের থামানো সম্ভব নয় তখন তারা ভিন্ন কৌশল হিসেবে একটি আপোশ প্রস্তাব নিয়ে রাসূল (সা.)-এর দরবারে আসে। তারা মুহাম্মাদ (সা.) কে দুনিয়াবী যে কোনো প্রস্তাবে সম্মত করাতে প্রচেষ্টা চালায়। এদিকে রাসূলের চাচা আবু তালেব, যিনি তাকে দেখাশুনা করেন, বিভিন্ন ক্ষেত্রে তাকে সাহায্য সহযোগিতা এবং আশ্রয় দিয়ে থাকতেন, তাকেও একটি প্রস্তাব দেয়। দাবি জানায়, তিনি যেন মুহাম্মাদকে বিরত রাখেন এবং দ্বীনের দাওয়াত বন্ধ করে দেন।

কুরাইশ সর্দার এবং নেতারা আবু তালেবের নিকট এসে বলল, 'তুমি আমাদের মধ্যে সম্ভ্রান্ত, বয়স্ক, মর্যাদাবান এবং সম্মানী ব্যক্তি। আমরা অনুরোধ জানিয়ে ছিলাম তুমি তোমার ভাতিজাকে নিষেধ করবে। কিন্তু বাস্তবতা হলো তুমি নিষেধ করোনি। আমরা জানিয়ে দিচ্ছি, আমাদের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গেছে। সে আমাদের বাপ-দাদা সম্পর্কে মন্তব্য করে। আমাদের প্রতি অশুভ আচরণ করে। আমাদের উপাস্যগুলোর প্রতি কটূক্তি করে। আমরা আর বিলম্ব করতে পারব না। হয় তুমি তাকে বিরত রাখ অন্যথায় তুমি যুদ্ধের প্রস্তুতি নাও। এতে হয় তোমরা ধ্বংস হবে অথবা আমরা ধ্বংস হব।' আবু তালেব তাদের হুমকি এবং সময় বেঁধে দেয়াকে বিশেষ গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করেন এবং তা আমলে নেয়ার জন্য চেষ্টা করেন। তিনি তার স্বজাতি হতে বিচ্ছিন্ন হওয়ার আশঙ্কা করলেন। আর এই মুহূর্তে স্বজাতি হতে বিচ্ছিন্ন হওয়া এবং তাদের সাথে বিরোধে জড়িয়ে পড়ার মতো অনুকূল পরিবেশ তার ছিল না। তাই তিনি একটি অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির সম্মুখীন হন এবং উভয় সংকটে জড়িয়ে পড়েন। একদিকে ইসলাম গ্রহণকে সহজে মেনে নিতে পারছেন না, অন্য দিকে তার ভাতিজার অপমান এবং তার ওপর কোনো প্রকার অন্যায় অবিচারকে সহ্য করতে পারছিলেন না।

নিরুপায় হয়ে মুহাম্মাদ (সা.) কে ডেকে পাঠালেন এবং বললেন, 'হে ভাতিজা! নিজ বংশের লোকেরা আমার নিকট এসে এ ধরনের কথা বার্তা বলেছে। এ বলে তিনি তাদের কথার বিবরণ শোনালেন রাসূল (সা.) কে। তারপর আবু তালেব রাসূল (সা.) কে বললেন, 'তোমার সাধ্যের বাইরে কোনো কাজ করা দরকর নাই। এমন কোনো কাজের দায়িত্ব নিতে যাবে না, আমি যার সমাধান করতে পারব না। সুতরাং আমার পরামর্শ হলো, তোমার স্বজাতি যে সব কাজ অপছন্দ করে তুমি সে সব কাজ হতে বিরত থাক।'

রাসূল (সা.) তার চাচার কথায় একটুও কর্ণপাত করলেন না। তিনি আল্লাহর দিকে দাওয়াত এবং তাওহীদের দাওয়াত অব্যাহত রাখলেন। আল্লাহর দিকে আহ্বান করতে গিয়ে কারো কোনো কথায় গুরুত্ব দিতে তিনি সম্পূর্ণ নারাজ। কারণ, তিনি জানেন তিনি হকের ওপর প্রতিষ্ঠিত। তিনি বিশ্বাস করেন, তার এ দ্বীনকে আল্লাহই সাহায্য করবেন। তার এ দাওয়াত আল্লাহ তায়ালা একটি পর্যায়ে অবশ্যই পৌঁছাবেন। কিছু দিন যেতে না যেতে আবু তালেব দেখতে পেল মুহাম্মাদ (সা.) তার নীতি আদর্শের ওপর অটল, অবিচল এবং কুরাইশদের দাবি অনুসারে তাওহীদের দাওয়াত তিনি কখনো ছাড়বেন না। তখন আবু তালেব রাসূল (সা.) কে বললেন, 'আমি কসম করে বলছি, তারা তোমার নিকট একত্রিত হয়ে আসতে পারবে না, যতদিন না আমি মাটিতে প্রোথিত হবো এবং মাটিকে বালিশ বানাবো। তুমি নির্ভয়ে তোমার কাজ চালিয়ে যাও আর সুসংবাদ গ্রহণ কর। আর এ সুসংবাদ দ্বারা তোমার চোখকে শীতল কর।'১৮

উপরিউক্ত আলোচনা থেকে স্পষ্টভাবে প্রতিয়মাণ হচ্ছে যে, রাসূল (সা.) আল্লাহর দ্বীনকে দুনিয়াতে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য শুধুমাত্র বুদ্ধিমত্তা, প্রজ্ঞা ও মেধারই পরিচয় দেননি বরং তার অবিচল নীতি কাফিরদের সকল ষড়যন্ত্রকে ধূলিসাৎ করে দিয়েছিল। যা চিরদিন আমাদের জন্য অনুকরণীয় আদর্শ হয়ে থাকবে।

উতবা বিন রবিয়ার ঘটনা:
হামজা বিন আব্দুল মুত্তালিব (রা.) এবং উমার বিন খাত্তাব (রা.) এ দুজনের ইসলাম গ্রহণের পর মুশরিকদের আনন্দঘন আকাশে ফাটল ধরলো। তাদের দুশ্চিন্তার আর অন্ত রইলো না। এ ছাড়াও মুসলমানদের সংখ্যা দিন দিন বৃদ্ধি পাওয়া, প্রকাশ্যে ইসলামের ঘোষণা, ইসলামের বড় বড় দুশমনদের বিরোধিতা এবং তাদের জুলুম নির্যাতনের কোনো পরোয়া না করা ইত্যাদি বিষয় তাদের ঘুমকে হারাম করে দিল। তাদের মনের আশঙ্কা, ভয়ভীতি এবং দুশ্চিন্তা আরো বৃদ্ধি পেল। তারপর তারা উতবা বিন রাবিয়াকে কয়েকটি প্রস্তাব দিয়ে মুহাম্মাদ (সা.)-এর নিকট পাঠালো। তাদের ধারণা এর কোনো একটি প্রস্তাবে তাকে রাজি করানো যেতে পারে।

তাদের প্রস্তাব নিয়ে উতবা রাসূল (সা.)-এর নিকট এসে বলল, 'হে আমার ভাতিজা! তুমি জান, তুমি আমাদের নিকট একজন উচ্চ মর্যাদা সম্পন্ন ব্যক্তিত্বের অধিকারী। তোমার বংশ মর্যাদা আরবের সমগ্র মানুষের চাইতে বেশি। কিন্তু তুমি তোমার স্বজাতির নিকট এমন একটি বিষয় নিয়ে উপস্থিত হয়েছো, যা আমরা কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছি গঠন। কারণ, তুমি আমাদের ঐক্য বিনষ্ট করছো। আমাদের স্বপ্নকে ধূলিসাৎ করে দিচ্ছো এবং আমাদের উপাস্যগুলোকে কটাক্ষ করছো। আর আমাদের বাপ-দাদাদের হাজার বছরের লালিত ঐতিহ্যে আঘাত হানছো। সুতরাং তোমাকে কয়েকটি প্রস্তাব দিচ্ছি। মনোযোগ দিয়ে শুন। আশা করি যে কোনো একটি প্রস্তাবে তুমি সম্মতি জ্ঞাপন করবে। রাসূল (সা.) বিনীতভাবে বললেন, 'হে আবুল ওয়ালিদ! আপনার প্রস্তাবগুলো তুলে ধরুন!

তারপর সে বলল, 'যদি তোমার এ মিশনের উদ্দেশ্য টাকা-পয়সা, অর্থ-প্রাচুর্য হয়ে থাকে, তাহলে তোমাকে আমরা এত পরিমাণ ধন-সম্পদের মালিক বানাব, তাতে তুমি মক্কার মধ্যে সবার চেয়ে বেশি সম্পদশালী হবে। আর যদি তুমি নেতৃত্ব চাও, তোমাকে যাবতীয় সব কিছুর নেতা বানিয়ে দেব, তোমাকে ছাড়া একটি পাতাও তার জায়গা হতে সরবে না। আর যদি রাজত্ব চাও, তাহলে তোমাকে পুরো রাজত্ব দিয়ে দেব। আর যদি এমন হয় যে, তুমি যে সব কথা বলছ, তা কোনো মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে যাওয়ার কারণে হয়েছে; কারণ, অনেক সময় এমন হয়, তোমার মাথা হতে বিষয়টি কোনো ভাবে নামানো যাচ্ছে না। তাহলে আমরা তোমাকে উচ্চ চিকিৎসার জন্য যত অর্থের প্রয়োজন, তার সবই জোগান দেব। হতে পারে অনেক সময় মানুষের জ্ঞান বুদ্ধি কোনো খেয়াল বা কল্পনার কারণে লোপ পায়। রাসূল (সা.) খুব মনোযোগ দিয়ে উতবার কথা শুনতে লাগলেন। তারপর যখন কথা শেষ হলো।

রাসূল (সা.) বললেন, 'তোমার কথা শেষ হয়েছে হে আবুল ওয়ালিদ?' বলল, 'হ্যাঁ।' তাহলে এবার আমার থেকে শোনো! তারপর সে বলল, 'আচ্ছা বল।' রাসূল (সা.) তাকে এ আয়াতগুলো তিলাওয়াত করে শোনালেন-
حم • تَنزِيلٌ مِّنَ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ . كِتَابٌ فُصِّلَتْ آيَاتُهُ قُرْآنًا عَرَبِيًّا لِّقَوْمٍ يَعْلَمُونَ . بَشِيرًا وَنَذِيرًا فَأَعْرَضَ أَكْثَرُهُمْ فَهُمْ لَا يَسْمَعُونَ . وَقَالُوا قُلُوبُنَا فِي أَكِنَّةٍ مِّمَّا تَدْعُونَا إِلَيْهِ وَفِي آذَانِنَا وَقْرٌ وَمِن بَيْنِنَا وَبَيْنِكَ حِجَابٌ فَاعْمَلْ إِنَّنَا عَامِلُونَ .
অর্থাৎ, "হা-মীম। রাহমান রাহিমের পক্ষ হতে অবতীর্ণ। এটা এমন একটি কিতাব, যাতে তাঁর নিদর্শনসমূহের ব্যাখ্যা দেয়া হয়ে থাকে। কুরআন এমন জাতির জন্য যারা জানে। যা সুসংবাদদাতা এবং সতর্ককারী। কিন্তু অধিকাংশ লোক মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। সুতরাং তারা শুনবে না। আর তারা বলে, তুমি যে দিকে আহ্বান করো সে বিষয়ে আমাদের অন্তর আচ্ছাদিত আর আমাদের কানে ছিপি লাগানো এবং তোমার মাঝে আর আমার মাঝে রয়েছে পর্দা। সুতরাং তুমি তোমার কাজ কর আর আমরা আমাদের কাজ করি। (সূরা আস্-সাজদাহ: ১-৪)

"রাসূল (সা.) আয়াতগুলো পড়তে থাকেন। উতবা যখন কুরআনের আয়াত শুনতে পেলো তখন সে কান খাড়া করে দিলো। এবং তার দু হাত ঘাড়ের ওপর রেখে হেলান দিয়ে কুরআন শুনতে আরম্ভ করলো। রাসূল (সা.) যখন সাজদার আয়াত পর্যন্ত পৌঁছলেন তিনি সাজদা করলেন উতবাও তার সাথে সাজদা করল। তারপর তিনি বললেন, 'হে আবুল ওয়ালিদ! 'তুমি আমার কথা শুনেছো, তুমি এখন ফিরে যেতে পার।' অপর এক বর্ণনায় এসেছে, রাসূল (সা.) কুরআন পড়তে পড়তে যখন এ আয়াত পর্যন্ত পৌঁছলেন فَإِنْ أَعْرَضُوا فَقُلْ أَنذَرْتُكُمْ صَاعِقَة مِّثْلَ صَاعِقَةِ عَادٍ وَثَمُودَ অর্থাৎ, "যদি তারা বিমুখ হয়, তুমি তাদের বল আমি তোমাদের ভয়ংকর শাস্তির ভয় দেখাচ্ছি যে ভয়ংকর শাস্তি সামুদ এবং আদ জাতির অনুরূপ।” তখন উতবা বিচলিত হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল এবং সে তার হাতকে রাসূল (সা.)-এর মুখে রেখে বলল, 'আমি আল্লাহর কসম দিচ্ছি এবং আত্মীয়তার কসম দিচ্ছি, তুমি এ দাওয়াত হতে বিরত থাক।' এ কথা বলে সে দৌঁড়ে তার নিজ গোত্রের নিকট চলে গেল। এমনভাবে দৌঁড় দিল, যেন বিদ্যুৎ তার মাথার ওপর পড়ছিলো। গিয়ে কুরাইশদের পরামর্শ দিল, তারা যেন রাসূল (সা.)-এর বিষয় নিয়ে মাথা না ঘামায় এবং তাকে তার আপন অবস্থায় কাজ করতে ছেড়ে দেয়। সে বার বার তাদের বুঝানোর জন্য চেষ্টা চালায়।১৯

রাসূল (সা.) তাকে শুনানোর জন্য এ আয়াতকে নির্বাচন করেন। কারণ, তিনি যাতে উতবাকে বুঝাতে সক্ষম হন, রিসালাত এবং রাসূল (সা.)-এর হাকীকত কী হতে পারে। আর মুহাম্মাদ (সা.) মানুষের জন্য এমন এক কিতাব নিয়ে এসেছেন, যা দ্বারা তিনি তাদের পথভ্রষ্টতা হতে বের করে সৎপথে পরিচালনা করেন। তাদের তিনি অন্ধকার হতে বের করে আলোর পথ দেখান। তাদের তিনি জাহান্নাম হতে বাঁচান এবং জান্নাতের সন্ধান দেন। আর তিনি নিজেই সকলের পূর্বে এর ধারক বাহক। তাই এ দ্বীনের পরিপূর্ণ বিশ্বাস সর্বপ্রথম তাকেই করতে হবে এবং সর্বপ্রথম তাকেই তার বিধান সম্পর্কে জানতে হবে।

আল্লাহ যখন সমগ্র মানুষকে কোনো নির্দেশ দেন, তা মানার বিষয়ে সর্বপ্রথম মুহাম্মাদ (সা.) নিজেই সর্বাধিক বিবেচ্য ব্যক্তি। তিনি কোনো রাজত্ব চান না এবং কোনো টাকা-পয়সা চান না এবং কোনো ইজ্জত-সম্মান চান না। আল্লাহ তায়ালা তাকে সব কিছুর সুযোগ দেন এবং তিনি তা হতে নিজেকে বিরত রাখেন। ক্ষণস্থায়ী জীবনের মালামালের প্রতি লোভ-লালসা বলতে কিছুই তার ছিল না। কারণ, তিনি তার দাওয়াতে সত্যবাদী আর আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভে ঐকান্তিক।

তার এ অবস্থান, তাকে আল্লাহর পক্ষ হতে যে প্রজ্ঞা ও পরম ধৈর্য দেয়া হয়েছে, তার উৎকৃষ্ট দৃষ্টান্ত। তিনি তার দাওয়াত এবং মিশনকে সামনে এগিয়ে নিতে বদ্ধপরিকর ছিলেন। কোনো ধন-সম্পদ, অর্থ-প্রাচুর্য, নারি, বাড়ি, গাড়ী এবং রাজত্ব কোনো কিছুকেই তার বিনিময় প্রাধান্য দেননি এবং স্থান কাল পাত্র ভেদে এমন কথা পেশ করলেন, যা তখনকার সময়ের জন্য খুবই প্রয়োজন ছিল। মনে রাখতে হবে একেই বলে হিকমত এবং সর্বোত্তম আদর্শ।

আবু জাহেলের সাথে রাসূল (সা.)-এর আচরণ
কাফিররা সকলে মিলে সিদ্ধান্ত নিল তারা রাসূল (সা.) কে কষ্ট দেয়াসহ ইসলামে প্রবেশকারী মুসলমানদের ওপর নির্যাতনের সাথে সাথে ইসলামের জাগরণকে ঠেকাতে সব ধরনের কলাকৌশল এবং অপপ্রচার চালিয়ে যাবে। তারা নবী (সা.) কে বিভিন্নভাবে অপবাদ দিতে লাগল, তারা তাকে পাগল, যাদুকর, গণক, মিথ্যুক ইত্যাদি বলে গালি গালাজ করতে আরম্ভ করে। কিন্তু রাসূল (সা.) ছিলেন অটল অবিচল। তাদের কথায় কোনো প্রকার কর্ণপাত করেননি। আল্লাহর রহমত এবং আল্লাহর দ্বীনকে বিজয়ী করার আশায় সর্বাত্মক চেষ্টা অব্যাহত রাখেন। রাসূল (সা.) মুশরিকদের পক্ষ হতে এমন কষ্টের সম্মুখীন হন যে, কোনো ঈমানদার এত কষ্টের সম্মুখীন হননি। আবু জাহেল তার মাথাকে ধুলায় মিশিয়ে দিতে এবং তাকে দুনিয়া থেকে চির বিদায় দিতে চেয়েছিল। কিন্তু আল্লাহ তাকে হিফাযত করেন এবং আবু জাহেলের ষড়যন্ত্রকে তারই বিপক্ষে প্রয়োগ করেন।

আবু হুরাইরা (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আবু জাহেল তার সাথীদের জিজ্ঞাসা করল, 'মুহাম্মাদ কি তোমাদের সম্মুখে চেহারা মাটিতে মেশায়?' বলা হল, 'অবশ্যই, 'সে আমাদের সম্মুখে মাথা মাটিতে ঝুঁকায়।' এ কথা শোনে সে বলল, 'লাত এবং উযযার কসম করে বলছি, আমি যদি তাকে মাটিতে মাথা ঝোঁকানো অবস্থায় দেখতে পাই, তার গর্দানকে পদপিষ্ট করব অথবা তার চেহারাকে ধুলা-বালিতে মিশিয়ে দেব।' তারপর একবার রাসূল (সা.) সালাত আদায় করতে ছিলেন। দেখতে পেয়ে আবু জাহেল তার গর্দান পদপিষ্ট করার জন্য তার দিকে অগ্রসর হলো। যখন রাসূল (সা.)-এর নিকটে এলো, হঠাৎ সে পিছু হটতে আরম্ভ করল এবং দু-হাত দিয়ে নিজেকে আত্মরক্ষা করতে আরম্ভ করল। তাকে জিজ্ঞাসা করা হলো, 'তোমার কি হয়েছে, তুমি এমন করছো কেন?' তখন সে উত্তর দিল, 'আমি আমার এবং তার মাঝে আগুনের একটি পরিখা দেখতে পাই এবং তাতে অসংখ্য ডানা দেখতে পাই।' রাসূল (সা.) বলেন, 'যদি সে আমার কাছে আসতো, তাহলে ফেরেশতারা তাকে টুকরা টুকরা করে ফেলতো। তারপর এ ঘটনার ইঙ্গিত দিয়ে আল্লাহ তায়ালা আয়াত নাযিল করেন- كلا إن الإنسان ليطغى থেকে সূরা আলাকের শেষ পর্যন্ত। (সহীহ মুসলিম: ২৭৯৭)

আল্লাহ তায়ালা রাসূল (সা.) কে ঐ দুর্বৃত্ত এবং অন্যান্য দুর্বৃত্তের হাত হতে রক্ষা করেন। রাসূলুল্লাহ (সা.) সকল প্রকার কষ্ট, জুলুম নির্যাতন আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে নীরবে সয়ে যান এবং তার জান, মাল ও সময় আল্লাহর রাস্তায় উৎসর্গ করেন।২০

রাসূলের পিঠে উটের ভুঁড়ি রাখা
এ প্রসঙ্গে আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ (রা.) বর্ণনা করেন, একদিন রাসূল (সা.) বাইতুল্লাহর পাশে নামাজ আদায় করতে ছিলেন। আবু জাহেল এবং তার সঙ্গীরা একসাথে বসা ছিল। বিগত দিন একটি উট জবেহ করা হয়েছিল। আবু জাহেল বলল, 'কে উটের ভুঁড়িটি নিয়ে আসবে এবং মুহাম্মাদ যখন সাজদা করবে তার পিঠের ওপর রেখে দেবে।' তারপর তার দলের মধ্যে সবচেয়ে নিকৃষ্ট যে ব্যক্তি, সে উষ্ট্রের ভুঁড়িটি নিয়ে আসল এবং রাসূল (সা.) সাজদা করলে তার দুই কাঁধের ওপর রেখে তারা হাসাহাসি করতে আরম্ভ করে। তারা হাসতে হাসতে একে অপরের গায়ে ঢলে পড়লো। আমি পুরো বিষয়টি দেখতে পেলাম, যদি কোনো ক্ষমতা থাকতো তা হলে আমি রাসূল (সা.)-এর পৃষ্ঠ হতে তা সরিয়ে নিতাম! রাসূল (সা.) সাজদায় পড়ে রইলেন। কোনো ভাবে মাথা উঠাতে পারছিলেন না। এক লোক রাস্তা দিয়ে যাওয়ার সময় এ দৃশ্য দেখে ফাতেমা (রা.) কে সংবাদ দেন। তিনি এই খবর শোনামাত্র দৌঁড়ে আসলেন এবং রাসূল (সা.)-এর মাথা থেকে উটের ভুঁড়ি নামালেন। তারপর তাদের গালি গালাজ করতে লাগলেন। নামাজ শেষে রাসূল (সা.) উচ্চ আওয়াজে তাদের জন্য বদ দোয়া করতে আরম্ভ করেন। আর তার অভ্যাস ছিল, যখন দোয়া করতেন, তিন বার দোয়া করতেন। আবার যদি কোনো কিছু চাইতেন, তিন বার চাইতেন। রাসূল বললেন, 'হে আল্লাহ! তুমি কুরাইশদের শাস্তি দাও।' তিনবার বলেন। যখন তারা রাসূল এর বদদোয়া আওয়াজ শুনতে পেল, তাদের হাসি বন্ধ হয়ে গেল। এবং তারা তার বদদোয়াকে ভয় করতে আরম্ভ করে। তারপর রাসূল (সা.) তাদের নাম ধরে ধরে বদদোয়া করে বললেন, 'হে আল্লাহ তুমি আবু জাহল ইবনে হিশামকে ধ্বংস কর, উতবা বিন রাবিয়াকে ধ্বংস কর, শাইবা বিন রাবিয়া, ওয়ালিদ বিন উতবা, উমাইয়া বিন খালফ, উকবা বিন আবি মুয়িতকে ধ্বংস কর।' এভাবে তিনি সাত জন ব্যক্তির নাম উল্লেখ করেন আমি সপ্তম ব্যক্তির নাম ভুলে যাই। আল্লাহর কসম করে বলছি, যিনি রাসূল (সা.) কে সত্যের পয়গাম নিয়ে দুনিয়াতে প্রেরণ করেন, তিনি যাদের নাম নেন, তাদের সবাইকে বদর যুদ্ধের দিন অধঃমুখে হয়ে পড়ে থাকতে দেখি। তারপর তাদের বদর গর্তে নিক্ষেপ করা হলো। (সহীহ মুসলিম: ১৭৯৪)

উকবা বিন আবি মুয়াইতের ঘটনা
মুশরিকরা রাসূল (সা.) এর সাথে সবচেয়ে কঠিন যে আচরণ করে তার বর্ণনা এসেছে, সহীহ আল-বুখারীতে, উরওয়াহ বিন যুবায়ের হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি আবদুল্লাহ বিন আমর ইবনুল আসকে বলি, মুশরিকরা রাসূল (সা.) এর সাথে সবচেয়ে খারাপ যে আচরণ করেছে আপনি আমাকে তার বিবরণ দিন। তিনি বলেন, 'একদিন রাসূল (সা.) বাইতুল্লাহর পাশে নামাজ আদায় করতে ছিলেন এ অবস্থায় উকবা বিন আবি মুয়াইত এসে রাসূলের গলা চেপে ধরে এবং তার শরীরের কাপড়কে তার গলায় পেঁছিয়ে দেয়, তারপর সে খুব জোরে গলা চাপা দিলো, আবু বকর (রা.) এসে তার গলাও চেপে ধরলেন এবং রাসূল (সা.) থেকে তাকে দূরে সরিয়ে দিলেন এবং বললেন, 'তোমরা এমন এক ব্যক্তিকে হত্যা করবে যে বলে, আমার প্রতিপালক আল্লাহ! এবং তিনি তোমাদের নিকট তোমাদের প্রতিপালকের পক্ষ হতে প্রমাণসমূহ নিয়ে এসেছেন?' (সহীহ বুখারী: ৪৮১৫)

রাসূল (সা.) এবং তার সাহাবীদের ওপর মুশরিকদের নির্যাতনের আর কোনো অন্ত রইল না। তাদের নির্যাতনে অতিষ্ঠ হয়ে রাসূল (সা.) এর নিকট এসে অনেকেই সাহায্য চাইলেন এবং আল্লাহর কাছে দোয়া প্রার্থনা করতে এবং তাঁর সাহায্য কামনা করতে বলেন। তবে রাসূল (সা.) আল্লাহর সাহায্য লাভে প্রত্যয়ী ছিলেন এবং আল্লাহর মদদ তার পক্ষেই হবে এ বিশ্বাস তার পুরোপুরি ছিল। কারণ, তিনি জানতেন শেষ শুভপরিণতি একমাত্র মুত্তাকীদের পক্ষেই হয়ে থাকে এবং তারাই পরিশেষে সফলকাম হয়।

"খাব্বাব ইবনুল আরত (রা.) হতে বর্ণিত তিনি বলেন, 'রাসূল (সা.) একটি চাদরকে বালিশ বানিয়ে কাবা শরীফের ছায়ায় শুয়ে আছেন এ অবস্থায় তার নিকট গিয়ে অভিযোগের স্বরে আমরা বললাম, 'মুশরিকদের নির্যাতনে আমরা অসহায় হয়ে পড়ছি, আপনি কি আমাদের জন্য বিজয় প্রার্থনা করবেন না? আমাদের জন্য দোয়া করবেন না?' উত্তরে তিনি বলেন, 'তোমাদের পূর্বের লোকদের নির্যাতনের অবস্থা ছিল: তাদের কোনো এক লোককে ধরে আনা হতো এবং মাটিতে তার জন্য কূপ খনন করে তাকে এ কূপে নিক্ষেপ করে হত্যা করা হতো। অথবা একটি কাঠ কাটার করাত দিয়ে মাথার ওপর হতে নিচ পর্যন্ত কেটে দুই টুকরা করা হতো এবং তাদের শরীরকে লোহার চিরুনি দ্বারা চিরানো করা হতো। শরীরের হাড় ও রগ হতে গোশতকে আলাদা করে ফেলতো, তারপরও তাদের আল্লাহর ধর্ম থেকে বিন্দু পরিমাণও দূরে সরানো যেত না। আল্লাহর কসম করে বলছি, আল্লাহ তার দ্বীনকে পরিপূর্ণতা দান করবেন। ফলে এমন একটি সময় আসবে যখন একজন লোক 'সানাআ' হতে 'হাদ্রামাউত' পর্যন্ত এমন নিরাপদে ভ্রমণ করবে যে, সে একমাত্র আল্লাহ ছাড়া আর কাউকে ভয় করবে না। ছাগলের জন্য বাঘকে হুমকি মনে করবে না। কিন্তু তোমরা অতি তাড়াতাড়ি চাচ্ছো।” (সহীহ বুখারী: ৩৬১৬)

মোট কথা, মুসলমানদের এবং বিশেষ করে রাসূল (সা.)-এর ওপর তারা বিরামহীন নির্যাতন চালাতো এবং তাদের সর্ব প্রকার কষ্ট, যন্ত্রণা, মুসলমানদের সহ্য করতে হতো। কারণ, তাদের একমাত্র অপরাধ, তারা আল্লাহর দ্বীনকে মনে প্রাণে গ্রহণ করে নিয়েছে। আল্লাহর একত্ববাদে বিশ্বাস স্থাপন করেছে। হক ওই সত্যের ওপর অটল ও অবিচল থেকেছে। জাহেলিয়্যাতকে প্রত্যাখ্যান করেছে। তাদের কুসংস্কার এবং প্রতিমা পূজাকে বর্জন করেছে। এ ছাড়া তাদের আর কী অপরাধ ছিল?

আবু লাহাবের স্ত্রীর ঘটনা
রাসূল (সা.) মুশরিকদের পক্ষ হতে কঠিন নির্যাতনের সম্মুখীন হন। এমনকি তাকে এবং তার আনীত দ্বীনকে অপমান করার উদ্দেশ্যে তার নামের মধ্যে পর্যন্ত বিকৃতি আনতে কোনো প্রকার কুণ্ঠা বোধ করেনি। তাদের শত্রুতা এবং বিরোধিতা ধর্মীয় পর্যায়ে সীমাবদ্ধ না রেখে তা তার ব্যক্তি পর্যায়েও নিয়ে আসে। কুরাইশরা রাসূলের প্রতি তাদের অযৌক্তিক দুশমনী ও বাড়াবাড়িতে সীমা ছড়িয়ে যায়। যে নাম দ্বারা তার প্রশংসা বুঝায় তা পরিবর্তন করে, তার জন্য একটি বিপরীত নাম রাখে। যার অর্থ প্রকৃত নামের সম্পূর্ণ বিপরীত। তারা 'মুজাম্মাম' বলে তার নামকরণ করে। আর যখন তার নাম আলোচনা করত, বলত: 'মুজাম্মাম এ কাজ করেছে এবং মুজাম্মাম এখানে এসেছে।' অথচ রাসূল (সা.) এর প্রসিদ্ধ নাম হলো মুহাম্মাদ। মুজাম্মাম বলে কোনো নাম তার নেই। কিন্তু তার পরিণতিতে দেখা গেল, যে উদ্দেশ্যে এসব অপকর্মের আশ্রয় নিল, তা তাদের জন্য হিতে বিপরীত আকার ধারণ করল।

রাসূল (সা.) বলেন, 'এতে তোমরা আশ্চর্যবোধ কর না যে, আল্লাহ কীভাবে আমার থেকে কুরাইশদের গালি ফিরিয়ে নেন এবং তাদের অভিশাপ দেন। তারা মুজাম্মামকে গালি দিত এবং মুজাম্মামকে অভিশাপ করতো আর আমি তো মুজাম্মাম নই, আমি মুহাম্মাদ।' রাসূল (সা.)-এর পাঁচটি নাম ছিল তার একটি নামও মুজাম্মাম ছিল না। আবু লাহাবের স্ত্রী উম্মে জামিল তার সম্পর্কে এবং তার স্বামী সম্পর্কে কুরআনে অবতীর্ণ চিরন্তন বাণীর কথা শুনে, রাসূল (সা.) এর নিকট আসল, রাসূল তখন কাবা গৃহের পাশে বসা ছিলেন। তার সাথে ছিল আবু বকর (রা.)। আর আবু লাহাবের স্ত্রীর হাতে এক মুষ্টি পাথর ছিল। সে যখন তাদের নিকটে এসে পৌঁছলো আল্লাহ তার দৃষ্টি শক্তি কেড়ে নিলেন। সে রাসূল (সা.) কে আর দেখতে পেল না। শুধুমাত্র আবু বকরকে দেখতে পেল। তার ওপর চড়াও হয়ে বলল, 'হে আবু বকর তোমার সাথী কোথায়? শুনতে পেলাম সে আমার দুর্নাম করে, শপথ করে বলছি, যদি তাকে পেতাম, আমি তার মুখে এ পাথরগুলো ছুড়ে মারতাম।' মনে রেখো, আমি একজন কবি এবং তার বদনাম করতে আমিও কার্পণ্য করব না।২১

তারপর সে এ কাব্যাংশ আবৃতি করে 'আমি মুজাম্মামের নাফরমানি করি, তার নির্দেশের অমান্য করি এবং তার দ্বীনকে ঘৃণা করি।'

মুশরিকরা রাসূল এবং তার অনুসারীদের কষ্ট দেয়া অব্যাহত রাখল এবং মুসলমানদের সংখ্যা যত বৃদ্ধি পেতে লাগল তাদের নির্যাতনের মাত্রা এবং মুসলমানদের প্রতি তাদের হিংসা বিদ্বেষ তত প্রকট আকার ধারণ করল। তারা তাদের প্রতি বিভিন্ন ধরনের কটূক্তি এবং বদনাম রটাতে অপচেষ্টা চালাত। তারপর রাসূল (সা.) যখন মুসলমানদের দুরবস্থা দেখতে পান এবং তিনি নিজেই একমাত্র আল্লাহর হিফাজতে বেঁচে আছেন এবং চাচা আবু তালেব তাকে সহযোগিতা করলেও সে মুসলমানদের কোনো উপকার করতে পারছে না তাদের ওপর যে ধরনের নির্যাতন চলছে তা সে কোনোভাবেই ঠেকাতে পারে না। এভাবে মুসলমানদের দিনকাল অতিবাহিত হচ্ছিল, এরই মধ্যে অনেকে মারা যেত আবার কেউ কেউ অন্ধ হয়ে যেত আবার কেউ অর্ধাঙ্গ আবার কেউ বিকলাঙ্গ হয়ে যেত। বাধ্য হয়ে রাসূল (সা.) তার সাথীদের আবিসিনিয়ায় (ইথিওপিয়া) হিজরত করার অনুমতি দেন। ফলে উসমান বিন আফ্ফানের নেতৃত্বে বার জন পুরুষ এবং চার জন মহিলা আবিসিনিয়ায় হিজরত করেন। তারা সাগর তীরে পৌঁছলে আল্লাহ তাদের জন্য দুটি নৌকার ব্যবস্থা করেন। তার দ্বারা তারা তাদের গন্তব্য আবিসিনিয়ায় পৌঁছতে সক্ষম হন।

তখন নবুয়তের পঞ্চম বছরের রজব মাস। এদিকে কুরাইশরা তাদের সন্ধানে ঘর থেকে বের হলো এবং সাগরের তীর পর্যন্ত গিয়ে উপস্থিত হলো। কিন্তু তাদেরই দুর্ভাগ্য সেখানে গিয়ে তারা কাউকে পায়নি। তারপর তারা সেখান থেকে ক্রুদ্ধ হয়ে মক্কায় ফিরে আসে। পরবর্তীতে আবিসিনিয়ায় একটি মিথ্যা সংবাদ পৌঁছলো যে, কুরাইশরা রাসূল (সা.) কে কষ্ট দেয়া বন্ধ করে দিয়েছে এবং তাদের অনেকেই মুসলমান হয়ে গেছে। তাই তারা পুনরায় মক্কায় ফিরে আসেন। কিন্তু তারা মক্কায় ফিরে এসে যখন জানতে পারেন এ খবরটা ছিল মিথ্যা অপপ্রচার এবং এও জানতে পারেন, মুশরিকরা পূর্বের যে কোনো সময়ের তুলনায় এখন মুসলমানদের আরো বেশি কষ্ট দেয়। তাই তাদের কেউ কেউ অন্যের আশ্রয় নিয়ে মক্কায় প্রবেশ করেন আবার কেউ গোপনে মক্কায় প্রবেশ করেন। আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ (রা.) আশ্রয় প্রার্থনা করে মক্কায় প্রবেশ করেন। এ ঘটনার পর হতে মুসলমানদের ওপর নির্যাতন আরো বেড়ে যায় এবং আরো কঠিন অত্যাচারের সম্মুখীন হন।

তাদের জুলুম নির্যাতনে অতিষ্ঠ হয়ে রাসূল (সা.) দ্বিতীয়বার তাদের আবিসিনিয়ায় হিজরত করার অনুমতি দেন। দ্বিতীয়বার যারা হিজরত করেন তাদের সংখ্যা হলো আশি জন। তাদের মধ্যে ছিলেন আম্মার বিন ইয়াসার এবং নয়জন মহিলা। তারা সে দেশে নাজ্জাশী বাদশার আশীর্বাদে নিরাপদে বসবাস করতে থাকলেন। কিন্তু কিছু দিন যেতে না যেতে কুরাইশরা যখন জানতে পারল তখন তারা বিভিন্ন প্রকার উপঢৌকন নিয়ে নাজ্জাশী বাদশার নিকট দূত প্রেরণ করে। যেন সে আশ্রিত মুসলমানদের তার দেশ থেকে বের করে দেয় ও আবার মুশরিকদের নিকট ফেরত পাঠায়।

উপত্যকায় রাসূলের বন্দিজীবন
যখন কুরাইশরা ইসলামের প্রচার প্রসার, ব্যাপকভাবে মানুষের ইসলাম গ্রহণ, ইথিওপিয়ায় মুহাজিরদের সম্মান ও নিরাপদ আশ্রয় ও কুরাইশ প্রতিনিধিদল নিরাশ হয়ে ফিরে আসার ব্যাপারগুলো অবলোকন করল, তখন ইসলামের অনুসারীদের প্রতি তাদের ক্রোধ বেড়ে গেল এবং তারা বনী হাশেম, বনী আব্দুল মুত্তালিব ও বনী আবদে মানাফের বিরুদ্ধে পরস্পর চুক্তি সম্পাদন করতে একত্র হলো। তারা তাদের সাথে লেনদেন করবে না। পরস্পর বিবাহ-শাদী করবে না। কথা-বার্তা বলবে না ও উঠা-বসা করবে না। যাকে বলা যায় অবরোধ বা বয়কট। এ অবরোধ চলতে থাকবে যতক্ষণ না তারা রাসূল (সা.) কে তাদের হাতে সমর্পণ করবে। অতঃপর একটি চুক্তিনামা লিখে কাবার ছাদে ঝুলিয়ে দিল। ফলে আবু লাহাব ব্যতীত বনী হাশেম ও বনী আব্দুল মুত্তালিবের কাফির মুসলিম সকলে এক পক্ষ অবলম্বন করল। তারা মুসলিমদের সাথে অবরুদ্ধ হয়ে পড়ল। আবু লাহাব এদের গোত্রভুক্ত হওয়া সত্ত্বেও সে রাসূলুল্লাহ (সা.), বনী হাশেম ও বনী আব্দুল মুত্তালিবের বিরুদ্ধে কুরাইশদের সমর্থক থেকে গেল।

নবুয়তের সপ্তম বছরে মুহাররম মাসের শুরুর দিকের কোনো এক রাত্রিতে আবু তালেব ঘাঁটিতে রাসূল (সা.) কে অবরুদ্ধ করা হলো। তারা সেখানে আবদ্ধ সংকীর্ণতা ও খাদ্যসমাগ্রীর অভাব এবং বিচ্ছিন্নাবস্থায় তিন বছর যাবৎ অবরোধের দিনগুলো অতিবাহিত করলেন। এমনি হয়েছিল যে, ঘাঁটির আড়াল থেকে ক্ষুধার্ত বাচ্চাদের কান্নাকাটির আওয়াজ শোনো যাচ্ছিল। অতঃপর আল্লাহ তায়ালা তাঁর রাসূল (সা.) কে চুক্তিপত্রের সম্পর্কে অবহিত করলেন যে, একটি উইঁপোকা পাঠিয়ে জোর, জুলুম, আত্মীয়তা ছিন্নের চুক্তির সব লেখা খাইয়ে দিয়েছেন। শুধুমাত্র আল্লাহ তায়ালার নামটি অবশিষ্ট আছে। রাসূল (সা.) এ ব্যাপারে সকলকে সংবাদ দিলেন। ফলে একজন কুরাইশদের কাছে গেল এবং সংবাদ দিল যে, মুহাম্মাদ চুক্তিপত্র ধ্বংস হয়ে যাওয়ার কথা বলছে। যদি সে এতে মিথ্যাবাদী হয়, তাহলে আমরা তাকে তোমাদের হাতে দিয়ে দেব। আর যদি সত্যবাদী হয় তাহলে তোমাদের এই অবরোধ ও বয়কট থেকে ফিরে আসতে হবে। তারা বলল, 'তুমি ঠিকই বলেছ।' অতঃপর তারা কাগজের টুকরাটি নামিয়ে আনল। যখন তারা এই বিষয়টি রাসূলের কথামত দেখতে পেল তখন তাদের কুফরী আরো বেড়ে গেল।

নবুয়তের দশম বছরে নবী করিম (সা.) ও তার সাথীরা অবরুদ্ধ অবস্থা থেকে থেকে বের হয়ে আসলেন। এর ছয় মাস পর আবু তালেব মৃত্যুবরণ করল। তার মৃত্যুর তিনদিন পর খাদিজা (রা.) ইন্তেকাল করেন। কেউ কেউ অন্য মতও প্রকাশ করেছেন। বয়কট ও অবরোধ অবসানের পর অল্প দিনের ব্যবধানে আবু তালেব ও খাদিজার ইন্তেকাল হয়ে গেল। ফলে রাসূলের ওপর তার সম্প্রদায়ের নির্বোধরা দুঃসাহসিকতার সাথে, প্রকাশ্যে, আরো বেশি উৎপীড়ন-নিপীড়ন করতে থাকল। যার কারণে তার দুঃচিন্তা বেড়ে গেল এবং তাদের থেকে নিরাশ হয়ে গেলেন এবং তিনি তায়েফে চলে গেলেন এ আশায় যে, তায়েফবাসীরা তার ডাকে সাড়া দেবে। তাকে আশ্রয় দেবে। তাকে তার সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে সাহায্য করবে। সেখানেও কেউ তাকে আশ্রয় দেয়নি, কেউ সাহায্য করেনি। এবং তারা তাকে আরো বেশি কষ্ট দিয়েছে এবং তার সম্প্রদায়ের চেয়ে বেশি অত্যাচার করেছে।

তায়েফবাসীর সাথে নবী করীম (সা.)
নবুয়তের দশম বছরে শাওয়াল মাসে নবী করীম (সা.) তায়েফবাসীর উদ্দেশ্যে বের হলেন। তার ধারণা ছিল যে, তিনি সকীফ গোত্রে তার দাওয়াতের প্রতি সাড়া ও সাহায্য পাবেন। তার সাথে ছিল আজাদকৃত গোলাম যায়েদ বিন হারেসা। রাসূল (সা.) পথিমধ্যে যে গোত্রের পাশ দিয়ে অতিক্রম করতেন তাদের ইসলামের দাওয়াত দেন। তবে তাদের কেউ তার ডাকে সাড়া দেয়নি। যখন তিনি তায়েফে পৌঁছলেন তখন সেখানকার নেতাদের নিয়ে বসলেন এবং ইসলামের দাওয়াত দিলেন। তার দাওয়াতে তারা কোনো ভালো উত্তর দেয়নি।

রাসূল (সা.) এখানে দশদিন অবস্থান করেন এবং দেশের শীর্ষস্থানীয় লোকদের কাছে গিয়ে ইসলামের কথা বলেন। তাতেও ভালো কোনো সাড়া পাননি বরং তারা বলল, 'তুমি আমাদের দেশ থেকে বের হও! আমরা তোমার দাওয়াত গ্রহণ করতে পারলাম না।' তারা তাদের নির্বোধ ও বাচ্চাদেরকে তার প্রতি ক্ষেপিয়ে তার পিছনে লেলিয়ে দিল। অতঃপর যখন তিনি বের হতে ইচ্ছা করলেন তখন নির্বোধরা তার পিছু ধরল। তারা দু'সারি হয়ে তাকে পাথর নিক্ষেপ করল। অকথ্য ভাষায় গালাগালি করল এবং তার অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে পাথর নিক্ষেপ করে তার জুতাদ্বয় রক্তে রঞ্জিত করে দিল। আর যায়েদ বিন হারেসা নিজেই রাসূল (সা.) কে রক্ষা করতে ছিলেন। যার কারণে তার মাথা ক্ষতবিক্ষত হয়ে গিয়েছিল। অতঃপর রাসূল (সা.) তায়েফ থেকে দুশ্চিন্তা ও ভগ্নহৃদয় নিয়ে মক্কায় ফিরে আসেন।

মক্কায় আসার পথে আল্লাহ তায়ালা পাহাড়-পর্বতের দায়িত্বপ্রাপ্ত ফেরেশতাসহ জিবরীলকে পাঠান। সে তার কাছে অনুমতি চাচ্ছিল যে, দুটি পাহাড় যা তায়েফ ও মক্কার মধ্যবর্তী স্থানে অবস্থিত তা মক্কাবাসীর ওপর নিক্ষেপ করতে।

আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি রাসূল (সা.) কে বললেন, 'হে আল্লাহর রাসূল! আপনার কাছে কি উহুদ যুদ্ধের দিন অপেক্ষা আরো কোনো ভয়ানক দিন এসেছে?' তিনি বললেন যে, আমি তোমার সম্প্রদায় থেকে যে কষ্ট পাওয়ার তাতো পেয়েছি। তবে তার চেয়ে বেশি কষ্ট পেয়েছি আকাবার দিন। যখন আমি ইবনে আবদে ইয়ালীল বিন আবদে কিলালের কাছে দাওয়াত পেশ করলাম তারা আমার আহ্বানে সাড়া না দেয়ায় আমি চিন্তিত বেহুশ অবস্থায় চলে এলাম।

'কারনুস শায়ালব' নামক স্থানে এসে সংজ্ঞা ফিরে পেয়ে মাথা উত্তোলন করি তখন আমি একটি মেঘখণ্ড দেখতে পাই, যা আমাকে ছায়া দিচ্ছে। মেঘের দিকে তাকালে জিবরীলকে দেখি। অতঃপর সে আমাকে ডেকে বলল, 'আল্লাহ তায়ালা আপনার সম্প্রদায়ের কথা ও তাদের উত্তর শুনেছেন।' তিনি আপনার নিকট পর্বতমালার দায়িত্বে নিয়োজিত ফেরেশতাকে পাঠিয়েছেন। আপনি তাদের ব্যাপারে যে শাস্তি চান তাকে নির্দেশ করতে পারেন। রাসূল (সা.) বলেন, 'পর্বতমালার দায়িত্বে নিয়োজিত ফেরেশতা আমাকে আওয়াজ দিল এবং আমাকে সালাম দিল। অতঃপর বলল, 'হে মুহাম্মাদ! আপনার জাতি আপনাকে যা বলেছে আল্লাহ তায়ালা তা শুনেছেন। আর আমিতো পর্বতমালার দায়িত্বে নিয়োজিত ফেরেস্তা। আমার প্রভু আমাকে আপনার নিকট পাঠিয়েছেন। তাদের ব্যাপারে আপনার ইচ্ছা পূরণ করার জন্য। যদি আপনি চান তাহলে দু'পর্বতের মাঝে তাদেরকে মিশিয়ে দেব।' রাসূল (সা.) তাকে বললেন, 'বরং আমি চাই যে, আল্লাহ তায়ালা তাদের পরবর্তী বংশধর থেকে এমন প্রজন্ম বের করবেন যারা এক আল্লাহর ইবাদত করবে যার কোনো শরীক নাই। এবং তার সাথে কোনো কিছুকে শরীক করবে না।' রাসূল (সা.)-এর এ উত্তরের মধ্যে তার অনন্য ব্যক্তিত্ব ফুটে উঠেছে। এবং তার যে মহান চরিত্র ছিল, যার মাধ্যমে আল্লাহ তায়ালা তাকে সাহায্য করেছিলেন, তাও প্রকাশ পেয়েছে। এর মাধ্যমে তার জাতির প্রতি তার দয়া, ধৈর্য ও সহনশীলতার পরিচয় পাওয়া যায়। আর এটাই আল্লাহ তায়ালার এ বাণীর সাথে মিলে যায় :

فَبِمَا رَحْمَةٍ مِنَ اللَّهِ لِنْتَ لَهُمْ
অর্থাৎ, 'অতএব আল্লাহর অনুগ্রহ এই যে, তুমি তাদের প্রতি কোমল চিত্ত হয়ে গেছ। আর তুমি যদি কর্কশভাষী, কঠোর হৃদয় হতে, তবে নিশ্চয়ই তারা তোমার সংসর্গ হতে ফিরে যেত।' (সূরা আলে ইমরান: ১৫৯)

অন্য আয়াতে বলা হচ্ছে- وَمَا أَرْسَلْنَاكَ إِلَّا رَحْمَةً لِلْعَالَمِينَ অর্থাৎ, 'আমি তো তোমাকে সৃষ্টিকূলের প্রতি শুধু রহমতরূপেই প্রেরণ করেছি।' (সূরা আম্বিয়া: ১০৭) আল্লাহ তায়ালার অগণিত সালাত ও সালাম তার ওপর বর্ষিত হউক।

রাসূল (সা.) 'নাখলা' নামক স্থানে বেশ কয়েকদিন অবস্থান করলেন এবং মক্কায় ফিরে আসতে সংকল্প করলেন। ইসলাম ও আল্লাহর শাশ্বত রিসালাত পেশ করার ব্যাপারে তার প্রথম পরিকল্পনা নতুন করে আরম্ভ করার ইচ্ছা করলেন নতুন উদ্যমে। তখনই যায়েদ বিন হারেসা (রা.) রাসূল (সা.) কে বললেন, 'তাদের কাছে নতুন করে কিভাবে যাবেন? তারা তো আপনাকে বের করে দিয়েছে।'

যায়েদ (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূল (সা.) বললেন, 'হে যায়েদ! তুমি যা দেখতে পাচ্ছো, আল্লাহ তায়ালা এর থেকে বের হওয়ার কোনো রাস্তা দেখিয়ে দেবেন। আল্লাহ তার দ্বীনের সাহায্য করবেন ও তার নবীকে বিজয় দান করবেন। এরপর চলতে চলতে মক্কায় পৌঁছলেন। একজনকে 'খুজাআ' গোত্রের মুতয়েম বিন আদীর নিকট তার আশ্রয় প্রার্থনা করে পাঠালেন। মুতয়েম সাড়া দিলেন। তার সন্তান ও গোত্রের লোকদেরকে ডেকে বললেন, তোমরা যুদ্ধাস্ত্র ধর এবং কাবা ঘরের কোণায় অবস্থান গ্রহণ কর। কেননা, আমি মুহাম্মদ (সা.) কে আশ্রয় দিয়েছি। রাসূল (সা.) যায়েদ বিন হারেসা (রা.) কে সাথে নিয়ে প্রবেশ করে কাবা ঘরে গিয়ে যাত্রা শেষ করলেন। মুতয়েম বিন আদী তার সওয়ারীর ওপর দাঁড়িয়ে ডাক দিয়ে বললেন, 'হে কুরাইশ গোত্র! আমি মুহাম্মাদকে আশ্রয় দিয়েছি। তোমাদের মধ্য থেকে কেউ তার সাথে বিদ্রূপ করবে না।' রাসূল (সা.) রূকনে ইয়ামানির কাছে গেলেন তা স্পর্শ করলেন এবং দু'রাকআত নামায আদায় করলেন। এরপর নিজের বাড়িতে ফিরে গেলেন। মুতয়েম বিন আদী ও তার সন্তানেরা তার বাড়িতে প্রবেশ করা পর্যন্ত তাকে অস্ত্র দ্বারা পরিবেষ্টন করে রেখেছিলো।

রাসূল (সা.) যে এই কঠিন পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়েছেন তায়েফ সফরে, এটা তার দাওয়াতের কাজ চালিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে অদম্য ইচ্ছার স্পষ্ট প্রমাণ এবং মানুষেরা তার দাওয়াতে সাড়া না দেয়ায় তিনি আশাহত হননি। যখন প্রথম প্রান্তরে কোনো বাধা এসে উপস্থিত হয়েছে, তখন দাওয়াতের নতুন প্রান্তর খুঁজেছেন। এর মধ্যে এ কথারই প্রমাণ বহন করে যে, নবী (সা.) প্রজ্ঞার শিক্ষক ছিলেন। আর এটা এ কারণে যে, তিনি যখন তায়েফ আসলেন তখন সমস্ত দলপতি ও তায়েফের সাকীফ গোত্রের প্রধান কে দাওয়াতের জন্য বাছাই করলেন। আর এটা তো জানা কথাই, তারা দাওয়াত গ্রহণ করলে সমস্ত তায়েফবাসীর দাওয়াত গ্রহণ করবে।

নবী (সা.)-এর দুই পা থেকে রক্ত প্রবাহিত হওয়ার মধ্যে একথার সবচেয়ে বড় প্রমাণ যে, আল্লাহর রাস্তায় দাওয়াতের কাজে কত বড় কষ্ট ও নির্যাতন সহ্য করেছেন তিনি। নিজের জাতি ও তায়েফবাসীর ওপর তার বদদোয়া না করা, আর পর্বতসমূহের দায়িত্বে নিয়োজিত ফেরেস্তার পক্ষ থেকে তাদেরকে দুই পাহাড়ের মধ্যে ধ্বংস করার প্রস্তাবে সম্মতি না দেয়ার মধ্যে আরো বড় উদাহরণ যে, দায়ীর দাওয়াত গ্রহণ না করলে, তাকে কত পরিমাণ ধৈযধারণ করতে হয় এবং তাদের হিদায়েত না পাওয়ার কারণে নিরাশ হওয়া যাবে না। হতে পারে আল্লাহ পরবর্তীতে তাদের বংশধরদের মধ্য থেকে এমন কাউকে বের করবেন, যে এক আল্লাহর ইবাদত করবে এবং তার সাথে কাউকে শরিক করবে না। রাসূল (সা.)-এর কৌশলের মধ্য থেকে ছিল, মুতয়েম বিন আদির আশ্রয় গ্রহণ করার পূর্বে তিনি মক্কায় প্রবেশ করেননি। আর এভাবেই দায়ীর উচিত এমন কাউকে তালাশ করা যে তাকে শত্রুর ষড়যন্ত্র থেকে রক্ষা করবে, যাতে সে চাহিদা অনুযায়ী দাওয়াতের দায়িত্ব পালন করতে পারে।

রাসূল (সা.)-এর মুখমণ্ডল ক্ষতবিক্ষত ও দান্দান মুবারক শহীদ
এ প্রসঙ্গে বলা হচ্ছে-
"সাহল বিন সাআদ (রা.) থেকে বর্ণিত, তাকে প্রশ্ন করা হলো, উহুদ দিবসে নবী (সা.) এর আহত হওয়া সম্পর্কে। তিনি বললেন, 'তার মুখমণ্ডল আহত হলো, এবং তার দাঁতগুলো ভেঙে গেল। বর্মের ভাঙ্গা অংশ তার মাথায় প্রবেশ করল। ফাতেমা (রা.) রক্ত পরিষ্কার করছিলেন, এবং আলী (রা.) রক্ত বন্ধ করার চেষ্টা করছিলেন। যখন দেখলেন রক্ত বন্ধ না হয়ে আরো বেশি পরিমাণে বের হচ্ছে তখন ফাতেমা চাটাইতে আগুণ ধরিয়ে দিলেন, পুড়ে ছাই হয়ে গেল। অতঃপর তা ক্ষতস্থানে লাগিয়ে দিলেন, তখনই রক্ত বন্ধ হয়ে গেল। আর রাসূল (সা.) এ কঠিন কষ্ট বরদাশত করছিলেন।" (সহীহ বুখারি: ২৯১১)

যার মহত্ত্বের কাছে পাহাড়ও কেঁপে উঠে। তিনি এমন এক নবী, যিনি এ অবস্থায়ও তার জাতির বিরুদ্ধে বদ-দোয়া করেননি। বরং তাদের জন্য ক্ষমার দু'আ করেছেন। কেননা তারা বুঝে না। আব্দুল্লহ বিন মাসউদ (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, এখনো মনে হয় আমি রাসূলের দিকে চেয়ে আছি আর রাসূল (সা.) অন্য কোনো নবীর ঘটনা বর্ণনা করছেন, যাকে তার জাতি মেরেছে। এ অবস্থায় তিনি চোখ থেকে পানি মুছছিলেন এবং বলছিলেন, 'হে আল্লাহ! আমার জাতিকে মাফ করে দিন তারা বুঝে না।'২২

সমস্ত নবীগণ এবং তাদের মধ্যে সবার উপরে মুহাম্মাদ (সা.) ধৈর্য ও সহনশীলতা, ক্ষমা ও দয়ার মূর্তপ্রতীক ছিলেন। তিনি তার জাতির জন্য ক্ষমা ও করুণার সকল দ্বার খুলে দিয়েছিলেন। রাসূল (সা.) বলেন, 'আল্লাহর অভিশাপ ঐ জাতির ওপর অধিক হারে পতিত হয়, যে জাতি তাদের রাসূলের সাথে এ আচরণ করে। এ কথা বলার সময় তিনি তার দাঁতের দিকে ইঙ্গিত করছিলেন।

আল্লাহ তায়ালার ক্রোধ কঠোরতর হলো এমন ব্যক্তির ওপর, যে আল্লাহর রাসূল এর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছিল। উহুদ দিবসে নবী (সা.) এর আহত হওয়ার মধ্যে দাওয়াত-কর্মীদের জন্য সান্ত্বনা রয়েছে; তারা আল্লাহর রাস্তায় তাদের শরীরে যে কষ্ট বরদাশত করবে, অথবা তাদের স্বাধীনতা হরণ করা হবে অথবা তাদেরকে যে নির্যাতন করা হবে, সে সকল বিষয়ে তারা আল্লাহর পক্ষ থেকে পুরস্কারপ্রাপ্ত হবে।

নবী (সা.) ছিলেন ধৈর্যের উত্তম আদর্শ। তাকে যখনই কষ্ট দেওয়া হয়েছে তখনই তিনি তাতে ধৈর্যধারণ করেছেন। কাফিরেরা তাকে শুধু শারীরিক কষ্টই দেয়নি বরং সামাজিকভাবে হেয়-প্রতিপন্ন করা, অর্থনৈতিক ক্ষতি এমনকি মক্কার মর্যাদাবান ব্যক্তি হয়েও তাকে ও পরিবারকে বন্দী জীবন-যাপন করতে হয়েছে।

কিন্তু কোনভাবেই তারা রাসূল (সা.) কে আল্লাহর দ্বীনের দাওয়াত থেকে পিছু-হটাতে পারেনি বরং তিনি অবিচলতা, দৃঢ়তা এবং ধৈর্যশীলতার যে অন্যন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন, পৃথিবীর ইতিহাসে তা আজীবন স্মরণীয় হয়ে থাকবে।

টিকাঃ
১৭. আল্লামা ছফিউর রহমান মোবারকপুরী, আর রাহীকুল মাখতুম, পৃ: ৯৩-৯৫।
১৮. ইবনে হিশাম, সীরাতে ইবনে হিশাম, ১ম খণ্ড, পৃঃ ২৭৮।
১৯. কাসীর, হাফেজ ইমামুদ্দিন ইবনে, তাফসীরে ইবনে কাসীর, ৪র্থ খণ্ড, পৃঃ ৬১।
২০. গাযালী, মুহাম্মদ, ফিকহুস সীরাহ, পৃঃ ১০৬।
২১. হিসাম, ইবনে, সীরাতে ইবনে হিশাম, ১ম খণ্ড, পৃঃ ৩৭৮।
২২. কাহতানী, ড. সাঈদ বিন আলী বিন ওহাব, আনওয়া উস্ সবর ওয়া মাজাল্লাতহু, পৃঃ ৪৮-৫৭।

ফন্ট সাইজ
15px
17px
🎤 ভাষা বেছে নিন
🇧🇩
বাংলা
Bengali
🕌
আরবি
العربية