📄 ধৈর্যের পাহাড় হযরত ইব্রাহিম (আ.)
ধৈর্যের এক অনন্য দৃষ্টান্ত হযরত ইব্রাহিম (আ.)। জীবনের প্রতিটি স্তরে তাকে পরীক্ষার সম্মুখীন হতে হয়েছে। এমনকি নিক্ষিপ্ত হতে হয়েছে অগ্নিকুণ্ডে। তারপরও তিনি সত্যের দাওয়াত থেকে বিন্দুমাত্র পিছু হটেননি বরং ধৈর্যের সাথে প্রতিটি বিপদ মোকাবেলা করেছেন।
দাওয়াতের ক্ষেত্রে ইব্রাহিম (আ.)-এর ধৈর্যধারণ শুরু হয় তার পিতাকে দাওয়াত দানের মাধ্যমে। যিনি ছিলেন অগ্নি-পূজারক। যিনি ইব্রাহিম (আ.) কে প্রাণ নাশের হুমকি দিয়েছিলেন।
يَا أَبَتِ إِنِّي أَخَافُ أَن يَمَسَّكَ عَذَابٌ مِّنَ الرَّحْمَنِ فَتَكُونَ لِلشَّيْطَانِ وَلِيًّا • قَالَ أَرَاغِبٌ أَنتَ عَنْ آلِهَتِي يَا إِبْرَاهِيمُ لَئِن لَّمْ تَنتَهِ لَأَرْجُمَنَّكَ وَاهْجُرْنِي مَلِيًّا .
অর্থাৎ, 'হে আমার পিতা, আমি আশঙ্কা করছি যে, পরম করুণাময়ের (পক্ষ থেকে) তোমাকে আযাব স্পর্শ করবে, ফলে তুমি শয়তানের সঙ্গী হয়ে যাবে।' সে বলল, 'হে ইবরাহীম, তুমি কি আমার উপাস্যদের থেকে বিমুখ? যদি তুমি বিরত না হও, তবে অবশ্যই আমি তোমাকে পাথর মেরে হত্যা করব। আর তুমি চিরতরে আমাকে ছেড়ে যাও।' (সূরা মারইয়াম: ৪২-৪৬)
তার পিতার প্রাণনাশের হুমকিতে ইব্রাহিম (আ.) মনঃক্ষুণ্ণ হলেন না এবং তার প্রতি কোনো ক্ষোভ ও দেখালেন না। বরং ধৈর্যের সাথে বললেন-
قَالَ سَلَامٌ عَلَيْكَ سَأَسْتَغْفِرُ لَكَ رَبِّي إِنَّهُ كَانَ بِي حَفِيًّا وَأَعْتَزِلُكُمْ وَمَا تَدْعُونَ مِن دُونِ اللَّهِ وَأَدْعُو رَبِّي عَسَى أَلَّا أَكُونَ بِدُعَاءِ رَبِّي شَقِيًّا .
অর্থাৎ, ইবরাহীম বলল, 'তোমার প্রতি সালাম। আমি আমার রবের কাছে তোমার জন্য ক্ষমা চাইব। নিশ্চয় তিনি আমার প্রতি বড়ই অনুগ্রহশীল'। 'আর আমি তোমাদের ও আল্লাহ ছাড়া যাদের ইবাদত তোমরা কর তাদের পরিত্যাগ করছি এবং আমি আমার রবের ইবাদত করছি। আশা করি আমার রবের ইবাদত করে আমি ব্যর্থ হব না'। (সূরা মারইয়াম : ৪৭-৪৮)
অগ্নিকুণ্ডে নিক্ষিপ্ত হওয়ার সময় ধৈর্যধারণ
ইব্রাহিম (আ.) তার জাতির লোকদের আল্লাহর পথে দাওয়াত দিতে থাকলেন। কিন্তু কিছুতেই তার জাতির লোকেরা সত্য গ্রহণে প্রস্তুত হলো না। তখন ইব্রাহিম (আ.) তাদের অনুপস্থিতিতে তাদের ঠাকুর ঘরে প্রবেশ করলেন এবং সমস্ত দেবতাদের ভেঙে দিলেন শুধু বড় মূর্তিটি ছাড়া। যখন লোকেরা এসে দেখলো যে, তাদের দেবতাদের অবস্থা লণ্ড-ভণ্ড তখন তারা ইব্রাহিম (আ.) কে অপরাধী হিসেবে সাব্যস্ত করলো এবং তাকে জিজ্ঞেস করলো : ইব্রাহিম তুমি কি আমাদের দেবতাদের সাথে এই ব্যবহার করেছ? তখন ইব্রাহিম (আ.) বললেন: ওদের কেই জিজ্ঞেস করুন কে মেরেছে ওদের? ঐ বড় মূর্তিটাকেই জিজ্ঞেস করুন সেই ভেঙেছে কি না? তারা বললো: ইব্রাহিম! তুমি ভালো করেই জান দেবতাগুলো কথা বলতে পারে না। তখন ইব্রাহিম (আ.) বললেন : তোমরা আল্লাহকে বাদ দিয়ে কেন এমন সব জিনিসের পূজা-উপাসনা করো যেগুলো তোমাদের ভালোও করতে পারে না, মন্দও করতে পারে না?
কিন্তু বিষয়টি এখানেই শেষ হলো না, তারা ইব্রাহিমের ব্যাপারে রাজার কাছে বিচার দিলেন। তখন ইব্রাহিমকে রাজার (নমরূদ) দরবারে আনা হলো। এবং আল্লাহর পয়গাম্বর ইব্রাহিমের সাথে বাকযুদ্ধ হলো। শেষ পর্যন্ত রাজা ও তার লোকেরা সিদ্ধান্ত নিলো ইব্রাহিমকে অগ্নিকুণ্ডে পুড়িয়ে হত্যা করার। এ সম্পর্কে কুরআন বলছে-
قَالُوا حَرِّقُوهُ وَانصُرُوا آلِهَتَكُمْ إِن كُنتُمْ فَاعِلِينَ .
অর্থাৎ, তারা বলল, 'তাকে আগুনে পুড়িয়ে দাও এবং তোমাদের দেবদেবীদেরকে সাহায্য কর, যদি তোমরা কিছু করতে চাও'। (সূরা আম্বিয়া : ৬৮)
তারা একটি বিশাল অগ্নিকুণ্ডলি বানালো এবং সেখানে এক জাতীয় ভারী কাঠ একত্রিত করলো। তারা একমাস ধরে সেখানে বিভিন্ন স্থান থেকে কাঠ এনে বিশাল এক স্তূপ বানালো। এরপর এতে আগুণ ধরিয়ে দেওয়া হলো। সাতদিন পর্যন্ত এ আগুণ দাউদাউ করে জ্বললো। এরপর নমরূদ সেখানে ইব্রাহিম (আ.) নিক্ষেপের জন্য উপযুক্ত মনে করলো। আসলে এটা ছিল ইব্রাহিম (আ.) এর জন্য এক বড় পরীক্ষা। আল্লাহ তায়ালাও ইব্রাহিমকে পরীক্ষা করতে চাইলেন। তিনি দেখতে চাইলেন ইব্রাহিম কি জীবন বাঁচাবার জন্য ঈমান ত্যাগ করে, নাকি ঈমান বাঁচাবার জন্য জীবন কুরবানি করে। কিন্তু ইব্রাহিমতো অগ্নিপরীক্ষার বিজয়ী বীর। তিনি তো কিছুতেই জীবন বাঁচাবার জন্য আল্লাহকে এবং আল্লাহর দ্বীনকে ত্যাগ করতে পারেন না। তিনি তো আল্লাহ এবং আল্লাহর দ্বীনকে নিজের জীবনের চাইতে অনেক ভালোবাসেন। কাফেরেরা তাকে অগ্নিকুণ্ডে নিক্ষেপ করার জন্য নিয়ে গেল। তিনি তাদের কাছে নত হননি। জীবন ভিক্ষা চাননি। জীবন বাঁচাবার জন্য নিজের দ্বীন এবং ঈমান ত্যাগ করেননি। নিশ্চিত মনে আল্লাহর ওপর ভরসা করে তিনি অগ্নিকুণ্ডের দিকে এগিয়ে গেলেন। ওরা তাকে নিষ্ঠুরভাবে নিক্ষেপ করলো নিজেদের তৈরি করা নরকে। আল্লাহ ইব্রাহিমের প্রতি পরম খুশি হয়ে আগুনকে বলে দিলেন-
قُلْنَا يَا نَارُ كُونِي بَرْدًا وَسَلَامًا عَلَى إِبْرَاهِيمَ .
অর্থাৎ, আমি বললাম, 'হে আগুন, তুমি শীতল ও নিরাপদ হয়ে যাও ইবরাহীমের জন্য।' (সূরা আম্বিয়া: ৬৯)
এভাবে আল্লাহর নির্দেশে আগুন ঠাণ্ডা ও শীতল হয়ে গেল। আর ইব্রাহিম (আ.) তার ধৈর্যের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলেন।
স্ত্রী-পুত্রের মাধ্যমে পরীক্ষা
ইব্রাহিম (আ.) বৃদ্ধ বয়সে উপনীত হয়েছেন, কিন্তু তার কোনো সন্তানাদি নেই। স্ত্রী সারাহ ছিলেন একজন বন্ধ্যা মহিলা। তার কোনো সন্তানাদি হতো না। ইব্রাহিম আল্লাহর কাছে দোয়া করেন:
رَبِّ هَبْ لِي مِنَ الصَّالِحِينَ
অর্থাৎ, 'হে আমার রব, আমাকে সৎকর্মশীল সন্তান দান করুন'। (সূরা আস-সফফাত: ১০০)
পরম দয়াময় আল্লাহ তায়ালা তার দোয়া কবুল করেন। স্ত্রী হাজেরার ঘরে তার এক সুন্দর ফুটফুটে ছেলের জন্ম হয়। তিনি পুত্রের নাম রাখেন ইসমাঈল। বৃদ্ধ বয়সে শিশুপুত্রের হাসিতে তার মন ভরে ওঠে। কিন্তু এই পুত্রের ভালোবাসা নিয়েও আল্লাহ তাকে পরীক্ষায় ফেলেন। আল্লাহ তাকে পরীক্ষা করে চান, তিনি পুত্রের ভালোবাসার চাইতে আল্লাহর হুকুম পালন করাকে বড় জানেন কি না?
আল্লাহ তায়ালা ইব্রাহিম (আ.) কে নির্দেশ দিলেন তার পুত্র ইসমাঈল ও তার মা হাজেরাকে মক্কার জনমানব ও ফল পানি শস্যহীন মরুভূমিতে রেখে আসার জন্য। কিন্তু ইব্রাহিম যে আল্লাহকে সবার চেয়ে বেশি ভালোবাসেন। তিনি যে জানেন আল্লাহর হুকুম অমান্য করা যায়না। তাই তো তিনি হাজেরা আর শিশুপুত্র ইসমাঈলকে নিয়ে শত শত মাইল পথ পাড়ি দিয়ে মক্কায় এসে উপস্থিত হন। আল্লাহর নির্দেশে তিনি তাদের একটি নির্দিষ্ট স্থানে রেখে যান। হাজেরাকে বলে যান, আমি আল্লাহর হুকুমে তোমাদের এখানে রেখে গেলাম। হাজেরাকে কিছু খাদ্য ও এক মশক পানি দিয়ে আসেন। এভাবে প্রশান্ত সমুদ্রের মতো প্রশস্ত হৃদয় আর হিমালয়ের মতো অটল ধৈর্যশীল ইব্রাহিম আল্লাহ প্রদত্ত পরীক্ষায় বিজয়ী হলেন।
📄 হযরত মূসা (আ.) ধৈর্যধারণ
হযরত মূসা (আ.) ছিলেন যেমন আল্লাহর একজন সম্মানিত নবী তেমনি তিনি ছিলেন একজন ধৈর্যশীল বান্দা। অন্যান্য নবীদের পরীক্ষা হয়েছে সাধারণত নবুয়াত লাভের পরে। কিন্তু মূসা (আ.) এর পরীক্ষা শুরু হয়েছে তার জন্মলাভের পর থেকেই। বস্তুত নবুয়াত প্রাপ্তির পূর্বে ও পরে তার জীবনে বহু পরীক্ষার সম্মুখীন হয়েছেন। যেমন কুরআনে আল্লাহ তায়ালা মূসা (আ.) সম্পর্কে বলছেন- إِذْ تَمْشِي أُخْتُكَ فَتَقُولُ هَلْ أَدُلُّكُمْ عَلَى مَنْ يَكْفُلُهُ فَرَجَعْنَاكَ إِلَى أُمِّكَ كَيْ تَقَرَّ عَيْنُهَا وَلَا تَحْزَنَ وَقَتَلْتَ نَفْسًا فَنَجَّيْنَاكَ مِنَ الْغَمِّ وَفَتَنَّاكَ فُتُونًا فَلَبِثْتَ سِنِينَ فِي أَهْلِ مَدْيَنَ ثُمَّ جِئْتَ عَلَى قَدَرٍ يَا مُوسَى .
অর্থাৎ, যখন তোমার বোন (সিন্দুকের সাথে সাথে) চলছিল। অতঃপর সে গিয়ে বলল, 'আমি কি তোমাদেরকে এমন একজনের সন্ধান দেব, যে এর দায়িত্বভার নিতে পারবে'? অতঃপর আমি তোমাকে তোমার মায়ের নিকট ফিরিয়ে দিলাম; যাতে তার চোখ জুড়ায় এবং সে দুঃখ না পায়। আর তুমি এক ব্যক্তিকে হত্যা করেছিলে। তখন আমি তোমাকে মনোবেদনা থেকে মুক্তি দিলাম এবং তোমাকে আমি বিভিন্নভাবে পরীক্ষা করেছি। অতঃপর তুমি কয়েক বছর মাদইয়ানবাসীর মধ্যে অবস্থান করেছ। হে মূসা, তারপর নির্ধারিত সময়ে তুমি এসে উপস্থিত হলে'। (সূরা ত্বহা: ৪০)
এত পরীক্ষা এত কষ্ট সত্ত্বেও তিনি কখনো আল্লাহর ওপর থেকে আস্থা হারিয়ে ফেলেননি বরং ধৈর্যের সাথে সকল পরীক্ষা ও কষ্ট অতিক্রম করে আল্লাহর খাটি বান্দাতে পরিণত হয়েছেন।
মাদায়েনে হিজরতের সময় ধৈর্যধারণ
ফেরআউনের ঘরে মূসা (আ.) ক্রমেই বেড়ে উঠতে লাগলেন। শৈশব থেকে কৈশোরে, কৈশোর থেকে তারুণ্যে, তারুণ্য থেকে যৌবনে পদার্পণ করলেন। যৌবন প্রাপ্তির পর থেকে মূসা (আ.) একা একা শহরে ঘুরে বেড়াতেন জনগণের অবস্থা দেখার জন্য।
একদিন তিনি দেখলেন জনমানবশূন্য রাস্তায় দুটি লোক মারামারি করছে। তাদের একজন ছিল বনি ইসরাঈল আর অন্যজন কিবতি। মূসা (আ.) কে দেখেই ইসরাঈলি লোকটি মূসার নিকট সাহায্য চাইলো। কিবতি লোকটি খুব বাড়াবাড়ি করছে দেখে মূসা (আ.) তাকে থামাতে গিয়ে একটা চড় মারলেন। মূসা (আ.) ছিলেন খুব শক্তিশালী। চড় খেয়ে কিবতি লোকটি মৃত্যুমুখে পতিত হলো। আসলে মূসা (আ.) লোকটিকে হত্যা করতে চাননি বরং তিনি তাদের মারামারি থামাতে চেয়েছিলেন। এ ঘটনায় মূসা (আ.) খুব লজ্জিত ও ব্যথিত হলেন। তিনি সাথে সাথে আল্লাহর নিকট প্রার্থনা করলেন এই বলে-
قَالَ رَبِّ بِمَا أَنْعَمْتَ عَلَيَّ فَلَنْ أَكُونَ ظَهِيرًا لِّلْمُجْرِمِينَ .
অর্থাৎ, মূসা বলল, 'হে আমার রব, আপনি যেহেতু আমার প্রতি নিয়ামত দান করেন, তাই আমি কখনো আর অপরাধীদের সাহায্যকারী হব না। (সূরা কাসাস: ১৭)
আল্লাহ তায়ালা মূসা (আ.) এর দোয়া কবুল করলেন এবং তাকে ক্ষমা করে দিলেন। পরদিন সকালে ভয় ও শঙ্কা নিয়ে মূসা (আ.) ঘর থেকে বের হলেন। কারণ সরকারি লোকেরা চারদিকে কালকের হত্যাকারী কে খুঁজে বেড়াচ্ছে। মূসা (আ.) ভোর বিহানে চিন্তাগ্রস্ত মনে পথ চলছেন। কিন্তু যেখানে বাঘের ভয় সেখানেই রাত পোহায়। আবার সেই বনি ইসরাঈলি লোকটির সাথে দেখা। তখনও সেই লোকটি অন্য একটি কিবতি লোকের সাথে ঝগড়ায় লিপ্ত। গতদিনের মতো আজও মূসা কে দেখে লোকটি মূসার সাহায্য চাইলো। তখন মূসা (আ.) বললো, তুমি তো দেখছি বড় বিভ্রান্ত লোক এ বলে তিনি তাকে ধমক দিলেন। ধমক খেয়ে ইসরাঈল লোকটি মনে করলো মূসা বুঝি তাকেই মারতে আসছে। ফলে সে চিৎকার দিয়ে বলে উঠলো : মূসা তুমি কি আজ আমাকেও সেভাবে হত্যা করতে চাও, যেভাবে কাল একজনকে হত্যা করেছিলে? তুমি তো দেখছি বড় স্বৈরাচারী সংশোধনকামী নও।
একথা শুনার সাথে সাথে কিবতি লোকটি দে ছুট। এক দৌড়ে সে ছুটে এলো ফেরাউনের কাছে। সে বলে দিল কালকের লোকটিকে মূসা হত্যা করেছে এবং সে বনি ইসরাঈলের লোক। আর যায় কোথায়? ফেরাউন তার রক্ষী বাহিনীকে নির্দেশ দিল যেখানে পাও মূসাকে ধর এবং তাকে হত্যা কর। রাজার এ নির্দেশ শুনার সাথে সাথে মূসা (আ.) এর এক ভক্ত প্রাসাদের কর্মকর্তা মূসা (আ.) নিকট আসলো এবং বললো: মূসা দেশের কর্তারা তোমাকে হত্যা করার পরামর্শ করছে। তুমি এখনি ফেরাউনের রাজ্য ছেড়ে চলে যাও। খবরটা শুনেই মূসা (আ.) পাশ্ববর্তী রাজ্য মাদইয়ানের উদ্দেশ্যে যাত্রা করলেন। ইতিপূর্বে যেহেতু তিনি রাজপুত্রের ন্যায় জীবন যাপন করেছেন, তাই এই সফর তার নিকট খুবই কঠিন ছিল। এজন্য তিনি আল্লাহর নিকট আশ্রয় চাইলেন এই বলে-
وَلَمَّا تَوَجَّهَ تِلْقَاءَ مَدِّينَ قَالَ عَسَى رَبِّي أَن يَهْدِيَنِي سَوَاءَ السَّبِيلِ
অর্থাৎ, আর যখন মূসা মাদইয়ান অভিমুখে রওনা করল, তখন বলল, 'আশা করি আমার রব আমাকে সঠিক পথ প্রদর্শন করবেন'। (সূরা কাসাস: ২২)
সীমান্ত প্রহরীদের হাতে যেন ধরা না পড়েন, সে জন্যে খুব সতর্কভাবে সীমান্ত পার হলেন। একাধারে আট দিন হাঁটার পর মাদইয়ানের নিরাপদ এলাকায় এসে পৌঁছলেন। তখন তিনি খুবই ক্লান্ত-শ্রান্ত এবং ক্ষুধার্ত অবস্থায় একটি গাছের ছায়ার নিচে বসে পড়েন। মিসর থেকে মাদইয়ান পর্যন্ত তিনি দৌঁড়িয়ে পালিয়ে এসেছিলেন। তাই তার পায়ে ফোসকা উঠে গিয়েছিল। খাওয়ার কোনো দ্রব্য তার সাথে ছিল না। গাছের পাতা, ঘাস ইত্যাদি তিনি ভক্ষণ করেছিলেন। পেট তার পিঠের সাথে লেগে গিয়েছিল। ঐ সময় তিনি আধখানা খেজুরেরও মুখাপেক্ষী ছিলেন। এ সময় মূসা (আ.) ধৈর্যধারণ করেছিলেন এবং নিজেকে সম্পূর্ণরূপে স্বীয় পালনকর্তা আল্লাহর ওপরে সমর্পণ করেছিলেন ও প্রত্যাশা করেছিলেন নিশ্চয়ই আমার পালনকর্তা আমাকে সরল পথ দেখাবেন।
قَالَ ذَلِكَ بَيْنِي وَبَيْنَكَ أَيُّمَا الْأَجَلَيْنِ قَضَيْتُ فَلَا عُدْوَانَ عَلَيَّ وَاللَّهُ عَلَى مَا نَقُولُ وَكِيلٌ .
অর্থাৎ, মূসা বলল, 'এ চুক্তি আমার ও আপনার মধ্যে রইল। দু'টি মেয়াদের যেটিই আমি পূরণ করি না কেন, তাতে আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকবে না। আর আমরা যে বিষয়ে কথা বলছি, আল্লাহ তার সাক্ষী'। (সূরা কাসাস : ২৮)
অতএব আল্লাহ তায়ালা তার দোয়া কবুল করলেন। এবং মাদাইয়ানের মতো অপরিচিত রাজ্যে সসম্মানের সাথে সেখানে বসবাসের ব্যবস্থা করে দিলেন।
মু'জেযা যাদুর লড়াই ও ঈমানদারদের ধৈর্যধারণ
মূসা (আ.) তার স্ত্রী ও পরিবার নিয়ে মিসরে ফিরে আসলেন। তিনি আল্লাহর পক্ষ থেকে নবুয়াত লাভ করলেন ও দুটি নিদর্শন লাভ করলেন। এরপর তিনি আল্লাহর নির্দেশে ফেরআউনকে আল্লাহর একত্ববাদের দাওয়াত পেশ করলেন। কিন্তু অত্যাচারী ফেরআউন কিছুতেই তার দাওয়াত গ্রহণ করলো না বরং সে মূসা (আ.) কে কারাগারে নিক্ষেপের হুমকি দিল। তখন মূসা (আ.) আল্লাহর নিকট থেকে প্রেরিত দুটি নিদর্শন দেখালেন। তাদের মধ্যে একটি হচ্ছে মূসা (আ.) তার হাতের লাঠি মাটিতে নিক্ষেপ করলেন। সাথে সাথে লাঠি বিরাট অজগরে পরিণত হলো। তারপর সেটাকে ধরে ফেললেন এবং তা পুনরায় লাঠি হয়ে গেলো। অন্যটি হচ্ছে বগলের ভিতর থেকে হাত টেনে বের করলেন, সাথে সাথে তা জ্যোতির্ময় হয়ে উঠলো। এই অলৌকিক ঘটনা দেখে ফেরাউন হতভম্ব হয়ে গেলো। উপস্থিত লোকদের বলে উঠলো এতো জাদু! মূসা নিশ্চয়ই একজন দক্ষ জাদুকর হয়ে এসেছে। জাদু দিয়ে সে তোমাদেরকে নিজেদের মাতৃভূমি থেকে তাড়িয়ে দিতে চাইছে। এ সম্পর্কে কুরআন বলছে-
মূসা বলল, 'হে ফিরআউন, আমি তো সকল সৃষ্টির রবের পক্ষ থেকে রাসূল।' সমীচীন যে, আমি আল্লাহ সম্পর্কে সত্য ছাড়া বলব না। আমি তোমাদের রবের নিকট থেকে স্পষ্ট প্রমাণ নিয়ে তোমাদের কাছে এসেছি। সুতরাং তুমি বনী ইসরাঈলকে আমার সাথে পাঠিয়ে দাও।' সে বলল, 'তুমি যদি কোনো আয়াত নিয়ে আস, তবে তা পেশ কর, যদি তুমি সত্যবাদীদের অন্তর্ভুক্ত হও। তখন সে ছেড়ে দিল তার লাঠি। তৎক্ষণাৎ তা এক স্পষ্ট অজগর হয়ে গেল। আর সে বের করল তার হাত, তৎক্ষণাৎ তা দর্শকদের কাছে ধবধবে সাদা (দেখাচ্ছিল)। ফিরআউনের সম্প্রদায়ের সভাসদরা বলল, 'নিশ্চয় এ হলো বিজ্ঞ জাদুকর 'সে তোমাদেরকে তোমাদের দেশ থেকে বের করতে চায়। সুতরাং তোমরা কী নির্দেশ দেবে?'। (সূরা আরাফ: ১০৪-১১০)
ফেরাউন তার সঙ্গী-সাথীদের সাথে পরামর্শ করলো যে, যাদু দিয়েই মূসাকে পরাজিত করতে হবে। মিসরে যেসব বিখ্যাত যাদুকর ছিল, যারা বিশ্ববিখ্যাত, তাদের সকলকে একত্রিত করা হলো এবং মু'জেযা আর যাদুর প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হলো। (এখানে সংক্ষেপে বলে রাখি মু'জিযা অর্থ হচ্ছে মানুষের বুদ্ধিকে অক্ষমকারী। অর্থাৎ এমন কর্ম সংঘঠিত হওয়া যা মানুষের জ্ঞান ও ক্ষমতাবহির্ভূত। মু'জিযা কেবল নবীদের জন্য খাছ। যা নবীদের মাধ্যমে আল্লাহর পক্ষ থেকে হয়। পক্ষান্তরে যাদু কেবল দুষ্ট জিন ও মানুষের মাধ্যমেই হয়ে থাকে এবং তা হয় অদৃশ্য প্রাকৃতিক কারণের প্রভাবে। যাদু কেবল পৃথিবীতেই ক্রিয়াশীল হয়, আসমানে নয়। যাদু স্রেফ ভেল্কিবাজি ও প্রতারণা মাত্র। যাদুতে মানুষের বুদ্ধি বিভ্রাট ঘটে। যা মানুষকে প্রতারিত করে। এজন্য ইসলাম একে নিষিদ্ধ করেছে।) অবশেষে প্রতিযোগিতার দিন চলে এলো। দলে দলে মানুষ উপস্থিত হতে লাগলো প্রতিযোগিতা দেখার জন্য। মঞ্চে একদিকে উপস্থিত হযরত মূসা (আ.) ও তার ভাই হারুন (আ.) আর অন্যদিকে মিসরের শ্রেষ্ঠ যাদুকর দল।
প্রতিযোগিতা শুরু হলো। যাদুকরেরা উৎসাহিত হয়ে মূসাকে বলল: হে মূসা তুমি নিক্ষেপ কর, না হয় আমরা প্রথমে নিক্ষেপ করি। মূসা (আ.) বললেন তোমরাই নিক্ষেপ কর। অতঃপর তারা তাদের রশি ও লাঠি নিক্ষেপ করলো। তখন লোকদের চোখগুলোকে ধাঁধিয়ে দিল এবং তাদের ভীত-সন্ত্রস্ত করে তুলল ও এক মহাযাদু প্রদর্শন করল। তাদের যাদুর প্রভাবে মূসার মনে হলো যেন তাদের রশিগুলো ও লাঠিগুলো সাপের ন্যায় ছুটাছুটি করছে। তাতে মূসার মনে কিছুটা ভীতির সঞ্চার হলো। এমতাবস্থায় আল্লাহ অহি নাযিল করে মূসা (আ.) কে অভয় দিয়ে বললেন-
قُلْنَا لَا تَخَفْ إِنَّكَ أَنتَ الْأَعْلَىٰ ، وَأَلْقِ مَا فِي يَمِينِكَ تَلْقَفْ مَا صَنَعُوا ۖ إِنَّمَا صَنَعُوا كَيْدُ سَاحِرٍ ۖ وَلَا يُفْلِحُ السَّاحِرُ حَيْثُ أَتَىٰ
অর্থাৎ, আমি বললাম, 'তুমি ভয় পেয়ো না, নিশ্চয় তুমিই বিজয়ী হবে'। 'আর তোমার ডান হাতে যা আছে, তা ফেলে দাও। তারা যা করেছে, এটা সেগুলো গ্রাস করে ফেলবে। তারা যা করেছে, তা তো কেবল যাদুকরের কৌশল। আর যাদুকর যেখানেই আসুক না কেন, সে সফল হবে না'। (সূরা ত্বহা: ৬৮-৬৯)
তারপর মূসা (আ.) আল্লাহর নামে তার লাঠি নিক্ষেপ করলেন। দেখা গেল তা বিরাট অজগর সাপের ন্যায় রূপ ধারণ করল এবং যাদুকরদের সমস্ত অলীক কীর্তিগুলোকে গ্রাস করতে লাগল। এদৃশ্য দেখে যুগশ্রেষ্ঠ যাদুকরগণ বুঝে নিল যে মূসার এ যাদু আসলে যাদু নয়। কেননা যাদুর সর্বোচ্চ বিদ্যা তাদের কাছেই রয়েছে। এটা যাদু হতে পারে না। নিশ্চয়ই এর মধ্যে অলৌকিক কোনো সত্তার নিদর্শন রয়েছে, যা আয়ত্ত করা মানুষের ক্ষমতার বাইরে। এ সময় মূসা (আ.)-এর দেয়া তাওহীদের দাওয়াত ও আল্লাহর গযবের ভীতি তাদের অন্তরে প্রভাব বিস্তার করল। অতঃপর সত্য প্রতিষ্ঠিত হলো এবং বাতিল হয়ে গেল তাদের সমস্ত যাদুকর্ম। এভাবে তারা সেখানে পরাজিত হলো এবং লজ্জিত হয়ে ফিরে গেল। তারপর যাদুকররা সাজদায় পড়ে গেল এবং বলে উঠলো আমরা বিশ্বচরাচরের পালনকর্তার ওপরে বিশ্বাস স্থাপন করলাম যিনি মূসা ও হারূনের রব। কুরআন এ সম্পর্কে বলছে-
وَأُلْقِيَ السَّحَرَةُ سَاجِدِينَ * قَالُوا آمَنَّا بِرَبِّ الْعَالَمِينَ .
অর্থাৎ, আর যাদুকররা সাজদায় পড়ে গেল। তারা বলল, 'আমরা সকল সৃষ্টির রবের প্রতি ঈমান আনলাম। (সূরা আরাফ: ১২০-১২১)
فَأُلْقِيَ السَّحَرَةُ سَاجِدِينَ . قَالُوا آمَنَّا بِرَبِّ الْعَالَمِينَ * رَبِّ مُوسَى وَهَارُونَ .
অর্থাৎ, ফলে যাদুকররা সাজদাবনত হয়ে পড়ল। তারা বলল, 'আমরা ঈমান আনলাম সকল সৃষ্টির রবের প্রতি'। 'মূসা ও হারুনের রব। (সূরা শোয়ারা: ৪৬-৪৮)
فَأُلْقِيَ السَّحَرَةُ سُجَّدًا قَالُوا آمَنَّا بِرَبِّ هَارُونَ وَمُوسَى .
অর্থাৎ, অতঃপর যাদুকরেরা সাজদায় লুটিয়ে পড়ল। তারা বলল, 'আমরা হারূন ও মূসার রবের প্রতি ঈমান আনলাম'। (সূরা ত্বহা: ৭০)
পরাজয়ের এ দৃশ্য দেখে ভীত-বিহ্বল ফেরাউন নিজেকে সামলে নিয়ে উপস্থিত লাখো জনতার মনোবল চাঙ্গা রাখার জন্য যাদুকরদের উদ্দেশ্যে বলে উঠলো-
قَالَ فِرْعَوْنُ آمَنتُم بِهِ قَبْلَ أَنْ آذَنَ لَكُمْ إِنَّ هَذَا لَمَكْرٌ مَّكَرْتُمُوهُ فِي الْمَدِينَةِ لِتُخْرِجُوا مِنْهَا أَهْلَهَا فَسَوْفَ تَعْلَمُونَ .
অর্থাৎ, ফিরআউন বলল, 'আমি তোমাদেরকে অনুমতি দেয়ার আগে তোমরা তার প্রতি ঈমান আনলে! নিশ্চয় এটা এমন এক চক্রান্ত যা তোমরা শহরে করেছ, সেখান থেকে তার অধিবাসীকে বের করার জন্য। সুতরাং তোমরা অচিরেই জানতে পারবে।' (সূরা আরাফ: ১২৩)
ফিরআউন বলল, 'কী, আমি তোমাদেরকে অনুমতি দেয়ার আগেই তোমরা তার প্রতি ঈমান আনলে? নিশ্চয় সেই তোমাদের প্রধান, যে তোমাদেরকে যাদু শিখিয়েছে। সুতরাং আমি অবশ্যই তোমাদের হাত ও পা বিপরীত দিক থেকে কেটে ফেলব এবং আমি তোমাদেরকে খেজুর গাছের কাণ্ডে শূলিবিদ্ধ করবই। আর তোমরা অবশ্যই জানতে পারবে, আমাদের মধ্যে কার আযাব বেশি কঠোর এবং বেশি স্থায়ী। (সূরা ত্বহা: ৭১)
অতঃপর সম্রাটসুলভ হুমকি দিয়ে বলল,
قَالَ آمَنتُمْ لَهُ قَبْلَ أَنْ آذَنَ لَكُمْ إِنَّهُ لَكَبِيرُكُمُ الَّذِي عَلْمَكُمُ السِّحْرَ فَلَسَوْفَ تَعْلَمُونَ لَأَقَطِّعَنَّ أَيْدِيَكُمْ وَأَرْجُلَكُم مِّنْ خِلَافٍ وَلَأُصَلِّبَنَّكُمْ أَجْمَعِينَ .
অর্থাৎ, ফিরআউন বলল, 'আমি তোমাদেরকে অনুমতি দেয়ার পূর্বেই তোমরা তার প্রতি ঈমান আনলে? নিশ্চয় সে তোমাদের গুরু যে তোমাদের যাদু শিক্ষা দিয়েছে। অতএব অচিরেই তোমরা জানতে পারবে। আমি অবশ্যই তোমাদের হাতসমূহ ও তোমাদের পা-সমূহ বিপরীত দিক থেকে কেটে ফেলব এবং অবশ্যই তোমাদের সকলকে শূলিবিদ্ধ করব'। (সূরা শোয়ারা: ৪৯)
জবাবে যাদুকররা বলল,
قَالُوا لَا ضَيْرَ إِنَّا إِلَى رَبِّنَا مُنقَلِبُونَ • إِنَّا نَطْمَعُ أَن يَغْفِرَ لَنَا رَبُّنَا خَطَايَانَا أَن كُنَّا أَوَّلَ الْمُؤْمِنِينَ .
অর্থাৎ, তারা বলল, 'কোনো ক্ষতি নেই তাতে। অবশ্যই আমরা তো আমাদের রবের দিকেই ফিরে যাব।' আমরা আশা করি যে, আমাদের রব আমাদের অপরাধসমূহ ক্ষমা করে দেবেন, কারণ আমরা মুমিনদের মধ্যে প্রথম।' (সূরা শোয়ারা: ৫০-৫১)
যাদুকরদের দীপ্ত ঈমানের বলিষ্ঠতা দেখে বেশ কিছু যুবকের অন্তরে ঈমানের আলো প্রজ্জ্বলিত হলো। তারা ঈমানের ঘোষণা দিয়ে মূসার সাথী হয়ে গেল। তাদের ওপর শুরু হলো নির্যাতন। মূসার বংশের লোক হবার কারণে গোটা বনি ইসরাঈলের ওপরও নির্যাতন নেমে আসে। শত অত্যাচার সত্ত্বেও মূসা (আ.) কে তারা তার দাওয়াত থেকে নিবৃত্ত করতে পারলো না। তাদের অব্যাহত তৎপরতা দেখে ফেরাউনের পরিষদবর্গ তাকে বললো:
وَقَالَ الْمَلَأُ مِن قَوْمِ فِرْعَوْنَ أَتَذَرُ مُوسَىٰ وَقَوْمَهُ لِيُفْسِدُوا فِي الْأَرْضِ وَيَذَرَكَ وَالِهَتَكَ ۖ قَالَ سَنُقَتِّلُ أَبْنَاءَهُمْ وَنَسْتَحْيِي نِسَاءَهُمْ ۚ وَإِنَّا فَوْقَهُمْ قَاهِرُونَ .
অর্থাৎ, আর ফিরআউনের কওমের সভাসদগণ বলল, 'আপনি কি মূসা ও তার কওমকে ছেড়ে দেবেন, যাতে তারা যমীনে ফাসাদ করে এবং আপনাকেও আপনার উপাস্যগুলোকে বর্জন করে?' সে বলল, 'আমরা অতিসত্বর তাদের ছেলেদেরকে হত্যা করব আর মেয়েদেরকে জীবিত রাখব। আর নিশ্চয় আমরা তাদের ওপর ক্ষমতাবান।' (সূরা আরাফ: ১২৭)
ফেরাউন ঘোষণা করে দিলো : ওদের পুত্রদের হত্যা কর আর কন্যাদের জীবত রাখ। তারা দেখে নিক, আমি কতটা শক্তিশালী।
নির্যাতনে নিষ্পিষ্ট হতে হতে মূসা (আ.) এর অনুসারীরা বিচলিত হয়ে উঠলো। ফেরাউন বনু ইসরাঈলের ওপর যে যুলুম করেছিল তা হচ্ছে- ১. তাদের নবজাতক পুত্র সন্তানদের হত্যার নির্দেশ জারি। ২. ইবাদত গৃহসমূহ ধ্বংস করা। ৩. ফেরাউন তাদেরকে হিজরতে বাধা প্রদান করতো। ৪. জেল-জুলুম হত্যার পাশাপাশি ফেরাউন তাদেরকে ধর্মবিরোধী ও সমাজবিরোধী হিসেবে আখ্যায়িত করতো।
মূসা (আ.) ফেরাউনের এই জুলুম নির্যাতন থেকে বাঁচার জন্য তার স্বীয় ভীত- সন্ত্রস্ত কওমকে মূলত দুটি বিষয়ে উপদেশ প্রদান করেন। ১. শত্রুর মোকাবেলায় আল্লাহর সাহায্য প্রার্থনা করা এবং ২. আল্লাহর সাহায্য না আসা পর্যন্ত সাহসের সাথে ধৈর্য ধারণ করা। যেমন কুরআন বলছে-
قَالَ مُوسَىٰ لِقَوْمِهِ اسْتَعِينُوا بِاللَّهِ وَاصْبِرُوا ۖ إِنَّ الْأَرْضَ لِلَّهِ يُورِثُهَا مَن يَشَاءُ مِنْ عِبَادِهِ ۖ وَالْعَاقِبَةُ لِلْمُتَّقِينَ .
অর্থাৎ, মূসা তার কওমকে বলল, 'আল্লাহর কাছে সাহায্য চাও এবং ধৈর্যধারণ কর। নিশ্চয় যমীন আল্লাহর। তাঁর বান্দাদের মধ্যে যাকে তিনি চান তাকে তার উত্তরাধিকারী বানিয়ে দেন। আর পরিণাম মুত্তাকীদের জন্য।' (সূরা আরাফ: ১২৮)
এরপর মূসা ও হারূন (আ.) আল্লাহর নিকট ফেরাউনের বিরুদ্ধে বদদোয়া করলেন এভাবে-
وَقَالَ مُوسَىٰ رَبَّنَا إِنَّكَ آتَيْتَ فِرْعَوْنَ وَمَلَأَهُ زِينَةً وَأَمْوَالًا فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا رَبَّنَا لِيُضِلُّوا عَن سَبِيلِكَ ۖ رَبَّنَا اطْمِسْ عَلَىٰ أَمْوَالِهِمْ وَاشْدُدْ عَلَىٰ قُلُوبِهِمْ فَلَا يُؤْمِنُوا حَتَّىٰ يَرَوُا الْعَذَابَ الْأَلِيمَ ۖ قَالَ قَدْ أُجِيبَت دَعْوَتُكُمَا فَاسْتَقِيمَا وَلَا تَتَّبِعَانِّ سَبِيلَ الَّذِينَ لَا يَعْلَمُونَ .
অর্থাৎ, আর মূসা বলল, 'হে আমাদের রব, আপনি ফিরআউন ও তার পরিষদবর্গকে দুনিয়াবী জীবনে সৌন্দর্য ও ধন-সম্পদ দান করেছেন। হে আমাদের রব, যাতে তারা আপনার পথ থেকে গোমরাহ করতে পারে। হে আমাদের রব, তাদের ধন-সম্পদ নিশ্চিহ্ন করে দিন, তাদের অন্তরসমূহকে কঠোর করে দিন। ফলে তারা ঈমান আনবে না, যতক্ষণ না যন্ত্রণাদায়ক আযাব দেখে'। তিনি বললেন, 'তোমাদের দোয়া কবুল করা হয়েছে। সুতরাং তোমরা দৃঢ় থাক এবং যারা জানে না তাদের পথ অনুসরণ করো না'। (সূরা ইউনুস: ৮৮-৮৯)
মূসা ও হারূনের উপরিউক্ত দোয়া আল্লাহ কবুল করলেন। কিন্তু তার বাস্তবায়ন সঙ্গে সঙ্গে করলেন না। বরং সময় নিলেন নূন্যতম বিশ বছর। এরূপ প্রলম্বিত কর্মপদ্ধতির মাধ্যমে আল্লাহ মাযলূমের ধৈর্য পরীক্ষার সাথে সাথে যালেমেরও পরীক্ষা নিয়ে থাকেন এবং তাদের তাওবা করার ও হেদায়াত প্রাপ্তির সুযোগ দেন। যাতে পরে তাদের জন্য ওযর পেশ করার কোনো সুযোগ না থাকে। যেমন আল্লাহ বলেন-
فَإِذَا لَقِيتُمُ الَّذِينَ كَفَرُوا فَضَرْبَ الرِّقَابِ حَتَّى إِذَا أَثْخَنَتُمُوهُمْ فَشُدُّوا الْوَثَاقَ فَإِمَّا مَنَّا بَعْدُ وَإِمَّا فِدَاءً حَتَّى تَضَعَ الْحَرْبُ أَوْزَارَهَا ذَلِكَ وَلَوْ يَشَاءُ اللَّهُ لَانتَصَرَ مِنْهُمْ وَلَكِن لَّيَبْلُوَ بَعْضَكُم بِبَعْضٍ وَالَّذِينَ قُتِلُوا فِي سَبِيلِ اللَّهِ فَلَن يُضِلَّ أَعْمَالَهُمْ .
অর্থাৎ, অতএব তোমরা যখন কাফিরদের সাথে যুদ্ধে অবতীর্ণ হও, তখন তাদের ঘাড়ে আঘাত কর। পরিশেষে তোমরা যখন তাদেরকে সম্পূর্ণভাবে পর্যুদস্ত করবে তখন তাদেরকে শক্তভাবে বেঁধে নাও। তারপর হয় অনুগ্রহ না হয় মুক্তিপণ আদায়, যতক্ষণ না যুদ্ধ তার বোঝা রেখে দেয়। এটাই বিধান। আর আল্লাহ ইচ্ছা করলে তাদের কাছ থেকে প্রতিশোধ গ্রহণ করতে পারতেন, কিন্তু তিনি তোমাদের একজনকে অন্যের দ্বারা পরীক্ষা করতে চান। আর যারা আল্লাহর পথে নিহত হয়, তিনি কখনো তাদের আমলসমূহ বিনষ্ট করবেন না। (সূরা মুহাম্মদ: ৪)
সর্বশেষ কঠিন পরীক্ষা ও মূসা (আ.) এর দৃঢ়তা
ফেরাউন যখন মূসা (আ.) ও তার অনুসারীদের আর কিছুতেই সহ্য করতে পারলো না, এমনকি সে মূসা (আ.) কে হত্যা করার জন্য মরিয়া হয়ে উঠলো। এখানে আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্দেশ এলো -
فَأَسْرِ بِعِبَادِي لَيْلًا إِنَّكُم مُتَّبَعُونَ •
অর্থাৎ, (আল্লাহ বললেন) 'তাহলে আমার বান্দাদের নিয়ে রাতে বেরিয়ে পড়; নিশ্চয় তোমাদের পশ্চাদ্ধাবন করা হবে'। (সূরা দুখান: ২৩)
وَأَوْحَيْنَا إِلَى مُوسَى أَنْ أَسْرِ بِعِبَادِي إِنَّكُم مُّتَّبَعُونَ .
অর্থাৎ, আর আমি মূসার প্রতি এ মর্মে ওহী পাঠিয়েছিলাম যে, 'আমার বান্দাদের নিয়ে রাত্রিকালে যাত্রা শুরু কর, নিশ্চয়ই তোমাদের পিছু নেয়া হবে।' (সূরা শোয়ারা: ৫২)
وَلَقَدْ أَوْحَيْنَا إِلَى مُوسَى أَنْ أَسْرِ بِعِبَادِي فَاضْرِبْ لَهُمْ طَرِيقًا فِي الْبَحْرِ يَبَسًا لَّا تَخَافُ دَرَكًا وَلَا تَخْشَى .
অর্থাৎ, আর আমি অবশ্যই মূসার কাছে ওহী প্রেরণ করেছিলাম যে, 'আমার বান্দাদেরকে নিয়ে রাতের বেলায় রওনা হও। অতঃপর সজোরে আঘাত করে তাদের জন্য শুকনো রাস্তা বানাও। পেছন থেকে ধরে ফেলার আশঙ্কা করো না এবং ভয়ও করো না'। (সূরা ত্বহা: ৭৭)
আল্লাহর আদেশ শিরোধার্য। হযরত মূসা (আ.) মুসলমানদের ঘরে ঘরে সংগোপনে খবর পাঠিয়ে দিলেন হিজরত করার প্রস্তুতি নিতে। নির্দিষ্ট রাতের নির্দিষ্ট সময় মূসা (আ.) ও তার সাথীরা একত্রিত হলো। তারপর আল্লাহর নবী মূসার নেতৃত্বে দলেবলে তারা এগিয়ে চললেন ফিলিস্তিনের সিনাই ভূ-খণ্ড অভিমুখে। কিন্তু সামনেই লোহিত সাগর। এ সাগর পাড়ি দিয়েই ওপারে যেতে হবে তাদের। এদিকে ফেরাউনও বসে নেই সে তার সৈন্যসামন্ত নিয়ে মূসা ও তার সাথীদের আক্রমণ করার জন্য বেরিয়ে পড়ল।
মূসা (আ.) এর নবুয়তি জীবনে এটি ছিল একটি চূড়ান্ত পরীক্ষা। ইব্রাহিম (আ.) এর অগ্নি পরীক্ষার ন্যায় এটিও ছিল জীবন মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে এক মহাপরীক্ষা। পিছনে ফেরাউনের হিংস্র বাহিনী, সম্মুখে অথৈ সাগর। এই কঠিন সময়ে বনু ইসরাঈলের আতঙ্ক ও হাহাকারের মধ্যে ও মূসা ছিলেন স্থির ও নিষ্কম্প। দৃঢ় হিমাদ্রির ন্যায় তিনি আল্লাহর ওপর বিশ্বাসে অটল থাকেন এবং সাথীদের সান্ত্বনা দিয়ে আল্লাহর রহমত কামনা করেন। এ সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালা বলেন- "তারপর তারা সূর্যোদয়ের প্রাক্কালে তাদের পিছু নিল। অতঃপর যখন উভয় দল পরস্পরকে দেখল, তখন মূসার সাথীরা বলল, অবশ্যই 'আমরা ধরা পড়ে গেলাম!' মূসা বলল, 'কক্ষনো নয়; আমার সাথে আমার রব রয়েছেন। নিশ্চয় অচিরেই তিনি আমাকে পথনির্দেশ দেবেন'। অতঃপর আমি মূসার প্রতি ওহী পাঠালাম, 'তোমার লাঠি দ্বারা সমুদ্রে আঘাত কর।' ফলে তা বিভক্ত হয়ে গেল। তারপর প্রত্যেক ভাগ বিশাল পাহাড় সদৃশ হয়ে গেল। আর আমি অপর দলটিকে সেই জায়গায় নিকটবর্তী করলাম, আর আমি মূসা ও তার সাথে যারা ছিল সকলকে উদ্ধার করলাম, তারপর অপর দলটিকে ডুবিয়ে দিলাম।" (সূরা শোয়ারা: ৬০-৬৬)
আল্লাহর নির্দেশের সাথে সাথে মূসা (আ.) সাগরে লাঠি নিক্ষেপ করলেন। আঘাত লাগতেই সমুদ্রে ঘটে গেলো এক অবাক কাণ্ড। লোকেরা তাদের চোখের সামনে দেখতে পেলো লাঠির আঘাতে সমুদ্রের পানি ফেটে গেছে। পানিগুলো তরঙ্গের মতো দুই পাশে উঁচু হয়ে পাহাড়ের মতো স্থির হয়ে গেল। আর সাগরের মাঝখান দিয়ে তৈরি হয়ে গেছে ঠনঠন শুকনো রাস্তা। আল্লাহর নির্দেশে মূসা ও তার সাথীরা এই রাস্তা দিয়ে নিরাপদে সমুদ্র পার হয়ে গেল। এভাবে আল্লাহ তায়ালা তার রাসূল ও মুমিন বান্দাদের সাহায্য করলেন। অপরদিকে ফেরাউন ও তার বাহিনী যখন সমুদ্র পার হওয়ার জন্য শুকনো সমুদ্রের মাঝপথে গেল। তখন আল্লাহর নির্দেশে সমুদ্রের পানি হঠাৎ করে তার স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে এলো। আর ফেরাউন ও তার দলবল পানিতে হাবুডুবু খেতে লাগল।
এভাবে আল্লাহ তায়ালা মূসা (আ.) এর ধৈর্য, দৃঢ়তা এবং আল্লাহর ওপর পরিপূর্ণ আস্থার ফলে তাঁকে সকল বিপদ থেকে মুক্ত করলেন এবং অত্যাচারী জালেম ফেরাউন থেকে তাদের রক্ষা করলেন। আর ফেরাউন ও তার দলবলকে উচিত শিক্ষা দিলেন।
📄 হযরত ঈসা (আ.) এর সবর
হযরত ঈসা (আ.) ছিলেন বনু ইসরাঈল বংশের সর্বশেষ নবী ও কিতাবধারী রাসূল। তিনি 'ইনজীল' প্রাপ্ত হয়েছিলেন। তাঁরপর থেকে শেষনবী মুহাম্মাদ (সা.)-এর আবির্ভাব পর্যন্ত আর কোনো নবী আগমন করেননি। এই সময়টাকে فترة الرسل বা 'রাসূল আগমনের বিরতিকাল' বলা হয়। ক্বিয়ামত সংঘটিত হওয়ার নিকটতম কাল পূর্বে হযরত ঈসা (আ.) আল্লাহ্র হুকুমে পুনরায় পৃথিবীতে অবতরণ করবেন এবং মুহাম্মাদী শরী'আত অনুসরণে ইমাম মাহদীর নেতৃত্বে সারা পৃথিবীতে শান্তির রাজ্য কায়েম করবেন। তিনি উম্মতে মুহাম্মাদীর সাথে বিশ্ব সংস্কারে ব্রতী হবেন। তাই তাঁর সম্পর্কে সঠিক ও বিস্তৃত ধারণা দেওয়া অত্যন্ত জরুরি বিবেচনা করে আল্লাহ পাক শেষনবী মুহাম্মাদ (সা.)-এর মাধ্যমে বিশ্ববাসীকে জানিয়ে দিয়েছেন। উল্লেখ্য যে, মূসা (আ.)- এর অনুসারী হওয়ার দাবিদার ইহুদিরা তাঁকে নবী বলেই স্বীকার করেনি। অত্যন্ত লজ্জাকরভাবে তারা তাঁকে জনৈক ইউসুফ মিস্ত্রীর জারজ সন্তান বলে আখ্যায়িত করেছে (নাউযুবিল্লাহ)। অন্যদিকে ঈসা (আ.)-এর ভক্ত ও অনুসারী হওয়ার দাবিদার খ্রিস্টানরা বাড়াবাড়ি করে তাঁকে وَقَالَتِ النَّصَارَى الْمَسِيحُ ابْنُ الله 'আল্লাহ্ পুত্র' (তওবাহ: ৩০) বানিয়েছে। ত্রিত্ববাদী খ্রিস্টানরা তাঁকে সরাসরি 'আল্লাহ' সাব্যস্ত করেছে এবং বলেছে যে, إِنَّ اللَّهَ ثَالِثُ ثَلَاثَةٍ তিনি হ'লেন তিন আল্লাহ্র একজন ) ثالث / ثلثة - মায়েদাহ: ৭৩)। অর্থাৎ, ঈসা, মারিয়াম ও আল্লাহ প্রত্যেকেই আল্লাহ এবং তারা এটাকে 'বুদ্ধিবহির্ভূত সত্য' বলে ক্ষান্ত হয়। অথচ এরূপ ধারণা পোষণকারীদের আল্লাহ দ্ব্যর্থহীনভাবে 'কাফির' বলে ঘোষণা করেছেন।
لَقَدْ كَفَرَ الَّذِينَ قَالُوا إِنَّ اللَّهَ هُوَ الْمَسِيحُ ابْنُ مَرْيَمَ وَقَالَ الْمَسِيحُ يَا بَنِي إِسْرَائِيلَ اعْبُدُوا اللَّهَ رَبِّي وَرَبَّكُمْ إِنَّهُ مَن يُشْرِكْ بِاللَّهِ فَقَدْ حَرَّمَ اللَّهُ عَلَيْهِ الْجَنَّةَ وَمَأْوَاهُ النَّارُ وَمَا لِلظَّالِمِينَ مِنْ أَنصَارِهِ لَقَدْ كَفَرَ الَّذِينَ قَالُوا إِنَّ اللَّهَ ثَالِثُ ثَلَاثَةٍ وَمَا مِنْ إِلَهِ إِلَّا إِلَهُ وَاحِدٌ وَإِن لَّمْ يَنتَهُوا عَمَّا يَقُولُونَ لَيَمَسَّنَّ الَّذِينَ كَفَرُوا مِنْهُمْ عَذَابٌ أَلِيمٌ .
অর্থাৎ, অবশ্যই তারা কুফরী করেছে, যারা বলেছে, 'নিশ্চয় আল্লাহ হচ্ছেন মারইয়াম পুত্র মাসীহ'। আর মাসীহ বলেছে, 'হে বনী ইসরাঈল, তোমরা আমার রব ও তোমাদের রব আল্লাহর ইবাদাত কর'। নিশ্চয় যে আল্লাহর সাথে শরীক করে, তার উপর অবশ্যই আল্লাহ জান্নাত হারাম করে দিয়েছেন এবং তার ঠিকানা আগুন। আর যালিমদের কোন সাহায্যকারী নেই। অবশ্যই তারা কুফরী করেছে, যারা বলে, 'নিশ্চয় আল্লাহ তিন জনের তৃতীয়জন'। যদিও এক ইলাহ ছাড়া কোন (সত্য) ইলাহ নেই। আর যদি তারা যা বলছে, তা থেকে বিরত না হয়, তবে অবশ্যই তাদের মধ্য থেকে কাফিরদেরকে যন্ত্রণাদায়ক আযাব স্পর্শ করবে। (সূরা মায়েদাহ: ৭২-৭৩)
যাহোক, সাধারণত সকল নবীই ৪০ বছর বয়সে নবুয়ত লাভ করেছেন। তবে ঈসা (আ.) সম্ভবত তার কিছু পূর্বেই নবুয়ত ও কিতাব প্রাপ্ত হন। কেননা বিভিন্ন রেওয়ায়াত দ্বারা প্রমাণিত হয়েছে যে, আকাশে তুলে নেয়ার সময় তাঁর বয়স ৩০ থেকে ৩৫-এর মধ্যে ছিল। তিনি যৌবনে আকাশে উত্তোলিত হয়েছিলেন এবং পৌঢ় বয়সে পুনরায় দুনিয়ায় ফিরে এসে মানুষকে তাওহীদের দাওয়াত দিবেন।
ঈসা (আ.) নবুয়ত লাভ করার পর স্বীয় কওমকে প্রধানত নিম্নোক্ত ৭টি বিষয়ে দাওয়াত দিয়ে বলেন-
وَإِذْ قَالَ عِيسَى ابْنُ مَرْيَمَ يَا بَنِي إِسْرَائِيلَ إِنِّي رَسُولُ اللَّهِ إِلَيْكُم مُّصَدِّقًا لِّمَا بَيْنَ يَدَيَّ مِنَ التَّوْرَاةِ وَمُبَشِّرًا بِرَسُولِ يَأْتِي مِن بَعْدِي اسْمُهُ أَحْمَدُ فَلَمَّا جَاءَهُم بِالْبَيِّنَاتِ قَالُوا هَذَا سِحْرٌ مُّبِينٌ .
অর্থাৎ, হে বনু ইসরাঈলগণ! আমি তোমাদের নিকটে আগমন করেছি (১) আল্লাহ্র রাসূল হিসেবে (২) আমার পূর্ববর্তী তওরাত কিতাবের সত্যায়নকারী হিসেবে এবং (৩) আমার পরে আগমনকারী রাসূলের সুসংবাদ দানকারী হিসেবে, যার নাম হবে আহমাদ'... (সূরা সফ: ৬)
তিনি বললেন, وَإِنَّ اللَّهَ رَبِّي وَرَبُّكُمْ فَاعْبُدُوهُ هَذَا صِرَاطٍ مُّسْتَقِيمٌ .
(৪) নিশ্চয়ই আল্লাহ আমার পালনকর্তা এবং তোমাদের পালনকর্তা। অতএব তোমরা তাঁর ইবাদত কর। এটাই সরল পথ'। (সূরা মারিয়াম: ৩৬)
وَمُصَدِّقًا لِّمَا بَيْنَ يَدَيَّ مِنَ التَّوْرَاةِ وَلِأُحِلَّ لَكُم بَعْضَ الَّذِي حُرِّمَ عَلَيْكُمْ وَجِئْتُكُم بِآيَةٍ مِّن رَّبِّكُمْ فَاتَّقُوا اللَّهَ وَأَطِيعُونِ .
'আমার আনীত এ কিতাব (ইনজীল) পূর্ববর্তী কিতাব তাওরাতকে সত্যায়ন করে এবং এজন্য যে, (৫) আমি তোমাদের জন্য হালাল করে দেব কোনো কোনো বস্তু, যা তোমাদের জন্য হারাম ছিল। আর (৬) আমি তোমাদের নিকটে এসেছি তোমাদের পালনকর্তার নিদর্শনসহ। অতএব (৭) তোমরা আল্লাহকে ভয় কর এবং আমার আনুগত্য কর'। (সূরা আলে ইমরান: ৫০)
ঈসা (আ.)-এর মু'জিযাসমূহ দেখে এবং তাঁর মুখনিঃসৃত তাওহীদের বাণী শুনে গরিব শ্রেণির কিছু লোক তাঁর প্রতি আকৃষ্ট হলেও দুনিয়াদার সমাজ নেতারা তাঁর প্রতি বিরূপ হয়ে ওঠে। কারণ তাওহীদের সাম্য বাণী সমাজের কায়েমী স্বার্থবাদী নেতাদের স্বার্থেই প্রথম আঘাত হেনে থাকে। শয়তান তাদেরকে কুমন্ত্রণা দেয়। ফলে তারা ঈসা (আ.)-এর বিরোধিতায় লিপ্ত হয়।
বিগত নবীগণের ন্যায় বনু ইসরাঈলগণ তাদের বংশের শেষ নবী ঈসা (আ.)-এর বিরুদ্ধে নানাবিধ চক্রান্ত শুরু করে। তারা প্রথমেই ঈসা (আ.)-কে 'জাদুকর' বলে আখ্যায়িত করে। যেমন আল্লাহ বলেন:
إِذْ قَالَ اللَّهُ يَا عِيسَى ابْنَ مَرْيَمَ اذْكُرْ نِعْمَتِي عَلَيْكَ وَعَلَى وَالِدَتِكَ إِذْ أَيَّدتُكَ بِرُوحِ الْقُدُسِ تُكَلِّمُ النَّاسَ فِي الْمَهْدِ وَكَهْلًا ۖ وَإِذْ عَلَّمْتُكَ الْكِتَابَ وَالْحِكْمَةَ وَالتَّوْرَاةَ وَالْإِنجِيلَ وَإِذْ تَخْلُقُ مِنَ الطِّينِ كَهَيْئَةِ الطَّيْرِ بِإِذْنِي فَتَنفُخُ فِيهَا فَتَكُونُ طَيْرًا بِإِذْنِي وَتُبْرِئُ الْأَكْمَهَ وَالْأَبْرَصَ بِإِذْنِي وَإِذْ تُخْرِجُ الْمَوْتَى بِإِذْنِي وَإِذْ كَفَفْتُ بَنِي إِسْرَائِيلَ عَنكَ إِذْ جِئْتَهُم بِالْبَيِّنَاتِ فَقَالَ الَّذِينَ كَفَرُوا مِنْهُمْ إِنْ هَذَا إِلَّا سِحْرٌ مُّبِينٌ . (سورة المائدة : ١١٠)
অর্থাৎ, (হে ঈসা!) 'যখন তুমি তাদের কাছে প্রমাণাদি নিয়ে এসেছিলে। অতঃপর তাদের মধ্যে যারা কাফির তারা বলল, এটা প্রকাশ্য জাদু ব্যতীত কিছুই নয়'। (সূরা মায়েদা: ১১০)
উক্ত অপবাদে ঈসা (আ.) ক্ষান্ত না হয়ে বরং আরও দ্বিগুণ বেগে দ্বীনের দাওয়াত দিয়ে যেতে থাকেন। তখন বিরোধীরা বেছে নেয় নোংরা পথ। তারা তাঁর মায়ের নামে অপবাদ রটাতে শুরু করে। যাতে ঈসা (আ.) অত্যন্ত ব্যথা পেলেও নবুয়তের গুরুদায়িত্ব পালন করতে গিয়ে সবকিছু নীরবে সহ্য করতে থাকেন। ফলে ঈসা (আ.)-এর সমর্থক সংখ্যা যতই বাড়তে থাকে, অবিশ্বাসী সমাজ নেতাদের চক্রান্ত ততই বৃদ্ধি পেতে থাকে। এবার তারা তাঁকে হত্যার ষড়যন্ত্র করল এবং সেজন্য দেশের বাদশাহকে তাঁর বিরুদ্ধে ক্ষেপিয়ে দেয়ার ষড়যন্ত্র করল। তারা অনবরত বাদশাহ্ কান ভারি করতে থাকে এই মর্মে যে, লোকটি আল্লাহদ্রোহী। সে তাওরাত পরিবর্তন করে সবাইকে বিধর্মী করতে সচেষ্ট। এসব অভিযোগ শুনে অবশেষে বাদশাহ তাঁর বিরুদ্ধে গ্রেফতারী পরোয়ানা জারি করেন। তখন ইহুদিদের এসব ষড়যন্ত্র নস্যাৎ করার জন্য আল্লাহ স্বীয় কৌশল প্রেরণ করেন এবং ঈসা (আ.)-কে সশরীরে আসমানে উঠিয়ে নেন।
ঈসা (আ.)-কে হত্যার ষড়যন্ত্র ও তাঁর ঊর্ধ্বারোহণ
তৎকালীন রোম সম্রাট সাতিয়ূনুস-এর নির্দেশে (মাযহারী) ঈসা (আ.)-কে গ্রেফতারের জন্য সরকারি বাহিনী ও ইহুদি চক্রান্তকারীরা তাঁর বাড়ি ঘেরাও করে। তারা জনৈক নরাধমকে ঈসা (আ.)-কে হত্যা করার জন্য পাঠায়। কিন্তু ইতঃপূর্বে আল্লাহ ঈসা (আ.)-কে উঠিয়ে নেওয়ায় সে বিফল মনোরথ হয়ে ফিরে যায়। কিন্তু এরই মধ্যে আল্লাহ্র হুকুমে তার চেহারা ঈসা (আ.)- এর সদৃশ হয়ে যায়। ফলে ইহুদিরা তাকেই ঈসা ভেবে শূলে বিদ্ধ করে হত্যা করে। ইহুদিরা কেবল সন্দেহের বশবর্তী হয়েই নানা কথা বলে এবং ঈসাকে হত্যা করার মিথ্যা দাবি করে। আল্লাহ তায়ালা বলেন-
وَإِنَّ الَّذِينَ اخْتَلَفُوا فِيهِ لَفِي شَكٍّ مِّنْهُ مَا لَهُم بِهِ مِنْ عِلْمٍ إِلَّا اتَّبَاعَ الظَّنِّ وَمَا قَتَلُوهُ يَقِينًا • (سورة النساء : ١٥٧)
অর্থাৎ, 'এ বিষয়ে তাদের কোনোই জ্ঞান নেই। তারা কেবলই সন্দেহের মধ্যে পড়ে আছে। এটা নিশ্চিত যে, তারা তাকে হত্যা করতে পারেনি'। (সূরা নিসা: ১৫৭)
বরং তার মতো কাউকে তারা হত্যা করেছিল। উল্লেখ্য যে, ঈসা (আ.) তাঁর ওপরে বিশ্বাসী সে যুগের ও পরবর্তী যুগের সকল খ্রিস্টানের পাপের বোঝা নিজে কাঁধে নিয়ে প্রায়শ্চিত্ত স্বরূপ শূলে বিদ্ধ হয়ে মৃত্যুবরণ করেছেন বলে খ্রিস্টানদের দাবি স্রেফ প্রতারণা ও অপপ্রচার বৈ কিছুই নয়।
এভাবে আল্লাহর নবী হযরত ঈসা (আ.) সকল প্রতিকূলতার মাঝে একমাত্র আল্লাহর ওপরই ভরসা করেছিলেন এবং বিপদে পিছু না হটে ধৈর্যধারণ করেছিলেন।১৫, ১৬
টিকাঃ
১৫. গালিব, ড. আসাদুল্লাহ, নবী কাহিনী, পৃঃ ১৮৬, ২০২।
১৬. নাসিম, আবদুস শহীদ, নবীদের সংগ্রামী জীবন, পৃঃ ১০৩-১০৯।
📄 ধৈর্যের অনন্য উদাহরণ হযরত মুহাম্মদ (সা.)
রাসূল (সা.)-এর জীবন বিশ্লেষণ করলে দেখা যায় যে, তিনি আল্লাহর আনুগত্য ও মানুষের মাঝে আল্লাহর দ্বীন প্রচার কে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিয়েছেন। আর এই দাওয়াতি ময়দানে এমন অসংখ্য ঘটনা আছে, যেগুলোর মধ্যে রাসূল (সা.)-এর সর্বোচ্চ ত্যাগ এবং ধৈর্যের পরিচয় পাওয়া যায়। তিনি আল্লাহর নৈকট্য এবং তার থেকে বিনিময় লাভকে সর্বাধিক গুরুত্ব দিতেন। এ কথা আমরা সবাই জানি, রাসূল (সা.) গোপনীয় দাওয়াতের ক্ষেত্রে সর্বাধিক ধৈর্যধারণ করেন। এমনকি মৃত্যুর পূর্ব মুহূর্ত পর্যন্ত ধৈর্যের সর্বোচ্চ দৃষ্টান্ত স্থাপন করেন। দাওয়াতি ময়দানে রাসূল (সা.)-এর ধৈর্যের দৃষ্টান্ত স্থাপনের অসংখ্য ঘটনা বিদ্যমান।
সাফা পাহাড়ে সত্যের দাওয়াত এবং আবু জাহেলের অত্যাচার সত্ত্বেও ধৈর্যধারণ
আল্লাহ তায়ালা রাসূল (সা.) কে নিকট আত্মীয়দের ইসলামের দাওয়াত দেয়ার জন্য নির্দেশ দেন। যেমন আল্লাহ তায়ালা বলেন-
وَأَنْذِرْ عَشِيرَتَكَ الْأَقْرَبِينَ . وَاخْفِضْ جَنَاحَكَ لِمَنِ اتَّبَعَكَ مِنَ الْمُؤْمِنِينَ . فَإِنْ عَصَوْكَ فَقُلْ إِنِّي بَرِيءٌ مِمَّا تَعْمَلُونَ . وَتَوَكَّلْ عَلَى الْعَزِيزِ الرَّحِيمِ .
অর্থাৎ, "আর তুমি তোমার নিকট আত্মীয়দের সতর্ক কর। আর যে সব ঈমানদার, যারা তোমার অনুকরণ করে, তাদের প্রতি বিনয়ী হও। আর যদি তারা তোমার অবাধ্য হয়, তুমি তাদের বলে দাও, তোমরা যা করো তার দায় হতে আমি মুক্ত।” (সূরা শোয়ারা: ২১৪-২১৬)
মূলত এ আয়াত নাযিলের মাধ্যমেই প্রকাশ্যে ইসলামের দাওয়াত প্রদানের নির্দেশ আসে। প্রকাশ্যে দাওয়াতের নির্দেশ আসার পর রাসূল (সা.) মোটেই বিচলিত হননি, বরং তার বুদ্ধিমত্তা, তার সাহসিকতা, সহনশীলতা, সুন্দর ব্যবহার এবং ইখলাস, আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের ঐকান্তিক আগ্রহ ইত্যাদি অনেক কিছুই তার জীবনীতে ফুটে ওঠে। তার উজ্জ্বল দৃষ্টান্ত হচ্ছে সাফা পাহাড়ে রাসূল (সা.) প্রকাশ্যে সত্যের আহ্বান-
ইবনে আব্বাস (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন- যখন আল্লাহর বাণী "আর তুমি তোমার নিকট আত্মীয়দের সতর্ক কর।" যখন অবতীর্ণ হলো, তখন রাসূল (সা.) সাফা পাহাড়ের ওপর আরোহণ করে প্রতিটি গোত্রের নাম ধরে ধরে ডাক দিলেন- হে বনী ফাহর! হে বনী আদি! এ রকমভাবে কুরাইশের সম্ভ্রান্ত বংশকে- ডাকতে আরম্ভ করেন। তার ডাক শুনে সমস্ত মানুষ একত্রিত হলো। এমনকি যদি কোনো ব্যক্তি না আসতে পারতো, সে একজন প্রতিনিধিকে পাঠাতো, কি বলে তা শুনার জন্য। আবু জাহেল নিজে এবং কুরাইশরা সবাই উপস্থিত হলো। তারপর তিনি সবাইকে সম্বোধন করে বললেন, 'আমি যদি বলি, এ পাহাড়ের পাদদেশে অস্ত্র সজ্জিত এক বাহিনী তোমাদের ওপর আক্রমণের অপেক্ষায় আছে, তোমরা কি আমাকে বিশ্বাস করবে?' সকলে এক বাক্যে বলল, 'অবশ্যই বিশ্বাস করব।' কারণ, আমরা কখনো তোমাকে মিথ্যা বলতে দেখিনি। তিনি বললেন, আমি তোমাদের সতর্ক করছি ভয়াবহ শাস্তি- আল্লাহর আজাব সম্পর্কে। এ কথা শুনে আবু লাহাব বলল, 'তোমার জন্য ধ্বংস! পুরো দিনটাই তুমি আমাদের নষ্ট করলে। এ জন্যই কি আমাদের একত্রিত করেছ?' (সহীহ বুখারী: ৪৭৭০)
আবু লাহাবের এমন আচরণে আল্লাহর রাসূল (সা.) তাকে গালি দিলেন না এবং তার বিরুদ্ধে কোনো অভিযোগ করলেন না। বরং ধৈর্যসহকারে তিনি সবকিছু সহ্য করে গেলেন। আল্লাহ তায়ালা তার রাসূলের আত্মবিশ্বাস বৃদ্ধির জন্য আয়াত নাযিল করলেন-
تَبَّتْ يَدَا أَبِي لَهَبٍ وَتَبَّ • مَا أَغْنَى عَنْهُ مَالُهُ وَمَا كَسَبَ .
অর্থাৎ, “ধ্বংস হোক আবু লাহাবের দুই হাত এবং সে নিজেও ধ্বংস হোক। তার ধন সম্পদ এবং তার কোনো উপার্জন কাজে আসে নাই।" (সূরা লাহাব: ১-২)
অন্য এক বর্ণনায় বলা হয়েছে-
হযরত আবু হুরায়রা (রা.) বর্ণনায় বর্ণিত, রাসূল (সা.) এক এক গোত্রকে আলাদা করে ডাকেন এবং প্রতিটি গোত্রকে বলেন, 'তোমরা নিজেদেরকে জাহান্নামের আগুণ হতে রক্ষা কর।' এবং কলিজার টুকরা ফাতেমা (রা.) কে ডেকে বলেন, 'হে ফাতেমা! তুমি তোমাকে জাহান্নামের আগুণ হতে রক্ষা কর। কারণ, আল্লাহর পাকড়াও হতে তোমাদের রক্ষা করার মত কোনো ক্ষমতা আমি রাখি না। হ্যাঁ, তবে আমার সাথে তোমার রক্তের সম্পর্ক থাকায় আমি তোমাকে আদর-যত্নে সিক্ত করতে পারার আশা রাখি।' (সহীহ বুখারী: ৪৭৭১)
উল্লেখিত হাদীসে দেখতে পাই, রাসূল (সা.)-এর দাওয়াত ছিল সর্বোচ্চ তাবলীগ ও ভীতি প্রদর্শন। এখানে রাসূল (সা.) একটি বিষয় স্পষ্ট করেন যে, কোনো ব্যক্তির নাজাতের উপায় কখনো বংশ মর্যাদা, পিতা-মাতার পরিচয়, আত্মীয়তা কিংবা জাতীয়তা ইত্যাদির মানদন্ডে হতে পারে না বরং এর মানদণ্ড হলো তাওহীদ ও রিসালাতের ওপর বিশ্বাস। এ ঘোষণার পর আরবদের মাঝে বংশ মর্যাদা এবং আত্মীয়তা ইত্যাদির গৌরব আর অহংকারের যে প্রবণতা ছিল, তা আর অবশিষ্ট রইল না। এবং আল্লাহ ও রাসূলের প্রতি আনুগত্য ভিন্ন অন্য যে কোনো উপকরণ-আত্মীয়তা, বংশবর্ণ ইত্যাদির ভিত্তিতে যে সব জাতীয়তা গড়ে উঠে তা একে বারে মূল্যহীন। গুরুত্বপূর্ণ অবস্থান এবং প্রতিকুল প্রেক্ষাপটে ও তার বংশের লোকদের সর্বোচ্চ সতর্ক করলেন তিনি। তাদের ইসলামের সুশীতল ছায়াতলে আশ্রয় নেয়ার আহ্বান জানালেন। আল্লাহর কঠিন আজাব হতে ভয় দেখালেন এবং তাদের মূর্তি পূজা হতে বিরত থাকতে আহ্বান করলেন।১৭
যাইহোক, রাসূল (সা.) তার দাওয়াতি জীবনীতে ধৈর্য ও সহনশীলতার যে দৃষ্টান্ত স্থাপন করে গেছেন, পৃথিবীর ইতিহাসে তা বিরল। আল্লাহর আদেশের আনুগত্য এবং তার প্রতি যে প্রগাঢ় ভালোবাসা তিনি দেখিয়েছেন, তা পৃথিবীর ইতিহাসে চিরদিন স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
কুরাইশের নেতৃস্থানীয় ব্যক্তি বর্গের সাথে রাসূল (সা.)-এর আচরণ
কুরাইশরা যখন দেখতে পেল শুধু নির্যাতন এবং দমননীতি অবলম্বন করে মুসলমানদের থামানো সম্ভব নয় তখন তারা ভিন্ন কৌশল হিসেবে একটি আপোশ প্রস্তাব নিয়ে রাসূল (সা.)-এর দরবারে আসে। তারা মুহাম্মাদ (সা.) কে দুনিয়াবী যে কোনো প্রস্তাবে সম্মত করাতে প্রচেষ্টা চালায়। এদিকে রাসূলের চাচা আবু তালেব, যিনি তাকে দেখাশুনা করেন, বিভিন্ন ক্ষেত্রে তাকে সাহায্য সহযোগিতা এবং আশ্রয় দিয়ে থাকতেন, তাকেও একটি প্রস্তাব দেয়। দাবি জানায়, তিনি যেন মুহাম্মাদকে বিরত রাখেন এবং দ্বীনের দাওয়াত বন্ধ করে দেন।
কুরাইশ সর্দার এবং নেতারা আবু তালেবের নিকট এসে বলল, 'তুমি আমাদের মধ্যে সম্ভ্রান্ত, বয়স্ক, মর্যাদাবান এবং সম্মানী ব্যক্তি। আমরা অনুরোধ জানিয়ে ছিলাম তুমি তোমার ভাতিজাকে নিষেধ করবে। কিন্তু বাস্তবতা হলো তুমি নিষেধ করোনি। আমরা জানিয়ে দিচ্ছি, আমাদের ধৈর্যের বাঁধ ভেঙে গেছে। সে আমাদের বাপ-দাদা সম্পর্কে মন্তব্য করে। আমাদের প্রতি অশুভ আচরণ করে। আমাদের উপাস্যগুলোর প্রতি কটূক্তি করে। আমরা আর বিলম্ব করতে পারব না। হয় তুমি তাকে বিরত রাখ অন্যথায় তুমি যুদ্ধের প্রস্তুতি নাও। এতে হয় তোমরা ধ্বংস হবে অথবা আমরা ধ্বংস হব।' আবু তালেব তাদের হুমকি এবং সময় বেঁধে দেয়াকে বিশেষ গুরুত্ব সহকারে বিবেচনা করেন এবং তা আমলে নেয়ার জন্য চেষ্টা করেন। তিনি তার স্বজাতি হতে বিচ্ছিন্ন হওয়ার আশঙ্কা করলেন। আর এই মুহূর্তে স্বজাতি হতে বিচ্ছিন্ন হওয়া এবং তাদের সাথে বিরোধে জড়িয়ে পড়ার মতো অনুকূল পরিবেশ তার ছিল না। তাই তিনি একটি অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতির সম্মুখীন হন এবং উভয় সংকটে জড়িয়ে পড়েন। একদিকে ইসলাম গ্রহণকে সহজে মেনে নিতে পারছেন না, অন্য দিকে তার ভাতিজার অপমান এবং তার ওপর কোনো প্রকার অন্যায় অবিচারকে সহ্য করতে পারছিলেন না।
নিরুপায় হয়ে মুহাম্মাদ (সা.) কে ডেকে পাঠালেন এবং বললেন, 'হে ভাতিজা! নিজ বংশের লোকেরা আমার নিকট এসে এ ধরনের কথা বার্তা বলেছে। এ বলে তিনি তাদের কথার বিবরণ শোনালেন রাসূল (সা.) কে। তারপর আবু তালেব রাসূল (সা.) কে বললেন, 'তোমার সাধ্যের বাইরে কোনো কাজ করা দরকর নাই। এমন কোনো কাজের দায়িত্ব নিতে যাবে না, আমি যার সমাধান করতে পারব না। সুতরাং আমার পরামর্শ হলো, তোমার স্বজাতি যে সব কাজ অপছন্দ করে তুমি সে সব কাজ হতে বিরত থাক।'
রাসূল (সা.) তার চাচার কথায় একটুও কর্ণপাত করলেন না। তিনি আল্লাহর দিকে দাওয়াত এবং তাওহীদের দাওয়াত অব্যাহত রাখলেন। আল্লাহর দিকে আহ্বান করতে গিয়ে কারো কোনো কথায় গুরুত্ব দিতে তিনি সম্পূর্ণ নারাজ। কারণ, তিনি জানেন তিনি হকের ওপর প্রতিষ্ঠিত। তিনি বিশ্বাস করেন, তার এ দ্বীনকে আল্লাহই সাহায্য করবেন। তার এ দাওয়াত আল্লাহ তায়ালা একটি পর্যায়ে অবশ্যই পৌঁছাবেন। কিছু দিন যেতে না যেতে আবু তালেব দেখতে পেল মুহাম্মাদ (সা.) তার নীতি আদর্শের ওপর অটল, অবিচল এবং কুরাইশদের দাবি অনুসারে তাওহীদের দাওয়াত তিনি কখনো ছাড়বেন না। তখন আবু তালেব রাসূল (সা.) কে বললেন, 'আমি কসম করে বলছি, তারা তোমার নিকট একত্রিত হয়ে আসতে পারবে না, যতদিন না আমি মাটিতে প্রোথিত হবো এবং মাটিকে বালিশ বানাবো। তুমি নির্ভয়ে তোমার কাজ চালিয়ে যাও আর সুসংবাদ গ্রহণ কর। আর এ সুসংবাদ দ্বারা তোমার চোখকে শীতল কর।'১৮
উপরিউক্ত আলোচনা থেকে স্পষ্টভাবে প্রতিয়মাণ হচ্ছে যে, রাসূল (সা.) আল্লাহর দ্বীনকে দুনিয়াতে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য শুধুমাত্র বুদ্ধিমত্তা, প্রজ্ঞা ও মেধারই পরিচয় দেননি বরং তার অবিচল নীতি কাফিরদের সকল ষড়যন্ত্রকে ধূলিসাৎ করে দিয়েছিল। যা চিরদিন আমাদের জন্য অনুকরণীয় আদর্শ হয়ে থাকবে।
উতবা বিন রবিয়ার ঘটনা:
হামজা বিন আব্দুল মুত্তালিব (রা.) এবং উমার বিন খাত্তাব (রা.) এ দুজনের ইসলাম গ্রহণের পর মুশরিকদের আনন্দঘন আকাশে ফাটল ধরলো। তাদের দুশ্চিন্তার আর অন্ত রইলো না। এ ছাড়াও মুসলমানদের সংখ্যা দিন দিন বৃদ্ধি পাওয়া, প্রকাশ্যে ইসলামের ঘোষণা, ইসলামের বড় বড় দুশমনদের বিরোধিতা এবং তাদের জুলুম নির্যাতনের কোনো পরোয়া না করা ইত্যাদি বিষয় তাদের ঘুমকে হারাম করে দিল। তাদের মনের আশঙ্কা, ভয়ভীতি এবং দুশ্চিন্তা আরো বৃদ্ধি পেল। তারপর তারা উতবা বিন রাবিয়াকে কয়েকটি প্রস্তাব দিয়ে মুহাম্মাদ (সা.)-এর নিকট পাঠালো। তাদের ধারণা এর কোনো একটি প্রস্তাবে তাকে রাজি করানো যেতে পারে।
তাদের প্রস্তাব নিয়ে উতবা রাসূল (সা.)-এর নিকট এসে বলল, 'হে আমার ভাতিজা! তুমি জান, তুমি আমাদের নিকট একজন উচ্চ মর্যাদা সম্পন্ন ব্যক্তিত্বের অধিকারী। তোমার বংশ মর্যাদা আরবের সমগ্র মানুষের চাইতে বেশি। কিন্তু তুমি তোমার স্বজাতির নিকট এমন একটি বিষয় নিয়ে উপস্থিত হয়েছো, যা আমরা কোনোভাবেই মেনে নিতে পারছি গঠন। কারণ, তুমি আমাদের ঐক্য বিনষ্ট করছো। আমাদের স্বপ্নকে ধূলিসাৎ করে দিচ্ছো এবং আমাদের উপাস্যগুলোকে কটাক্ষ করছো। আর আমাদের বাপ-দাদাদের হাজার বছরের লালিত ঐতিহ্যে আঘাত হানছো। সুতরাং তোমাকে কয়েকটি প্রস্তাব দিচ্ছি। মনোযোগ দিয়ে শুন। আশা করি যে কোনো একটি প্রস্তাবে তুমি সম্মতি জ্ঞাপন করবে। রাসূল (সা.) বিনীতভাবে বললেন, 'হে আবুল ওয়ালিদ! আপনার প্রস্তাবগুলো তুলে ধরুন!
তারপর সে বলল, 'যদি তোমার এ মিশনের উদ্দেশ্য টাকা-পয়সা, অর্থ-প্রাচুর্য হয়ে থাকে, তাহলে তোমাকে আমরা এত পরিমাণ ধন-সম্পদের মালিক বানাব, তাতে তুমি মক্কার মধ্যে সবার চেয়ে বেশি সম্পদশালী হবে। আর যদি তুমি নেতৃত্ব চাও, তোমাকে যাবতীয় সব কিছুর নেতা বানিয়ে দেব, তোমাকে ছাড়া একটি পাতাও তার জায়গা হতে সরবে না। আর যদি রাজত্ব চাও, তাহলে তোমাকে পুরো রাজত্ব দিয়ে দেব। আর যদি এমন হয় যে, তুমি যে সব কথা বলছ, তা কোনো মানসিক ভারসাম্য হারিয়ে যাওয়ার কারণে হয়েছে; কারণ, অনেক সময় এমন হয়, তোমার মাথা হতে বিষয়টি কোনো ভাবে নামানো যাচ্ছে না। তাহলে আমরা তোমাকে উচ্চ চিকিৎসার জন্য যত অর্থের প্রয়োজন, তার সবই জোগান দেব। হতে পারে অনেক সময় মানুষের জ্ঞান বুদ্ধি কোনো খেয়াল বা কল্পনার কারণে লোপ পায়। রাসূল (সা.) খুব মনোযোগ দিয়ে উতবার কথা শুনতে লাগলেন। তারপর যখন কথা শেষ হলো।
রাসূল (সা.) বললেন, 'তোমার কথা শেষ হয়েছে হে আবুল ওয়ালিদ?' বলল, 'হ্যাঁ।' তাহলে এবার আমার থেকে শোনো! তারপর সে বলল, 'আচ্ছা বল।' রাসূল (সা.) তাকে এ আয়াতগুলো তিলাওয়াত করে শোনালেন-
حم • تَنزِيلٌ مِّنَ الرَّحْمَنِ الرَّحِيمِ . كِتَابٌ فُصِّلَتْ آيَاتُهُ قُرْآنًا عَرَبِيًّا لِّقَوْمٍ يَعْلَمُونَ . بَشِيرًا وَنَذِيرًا فَأَعْرَضَ أَكْثَرُهُمْ فَهُمْ لَا يَسْمَعُونَ . وَقَالُوا قُلُوبُنَا فِي أَكِنَّةٍ مِّمَّا تَدْعُونَا إِلَيْهِ وَفِي آذَانِنَا وَقْرٌ وَمِن بَيْنِنَا وَبَيْنِكَ حِجَابٌ فَاعْمَلْ إِنَّنَا عَامِلُونَ .
অর্থাৎ, "হা-মীম। রাহমান রাহিমের পক্ষ হতে অবতীর্ণ। এটা এমন একটি কিতাব, যাতে তাঁর নিদর্শনসমূহের ব্যাখ্যা দেয়া হয়ে থাকে। কুরআন এমন জাতির জন্য যারা জানে। যা সুসংবাদদাতা এবং সতর্ককারী। কিন্তু অধিকাংশ লোক মুখ ফিরিয়ে নিয়েছে। সুতরাং তারা শুনবে না। আর তারা বলে, তুমি যে দিকে আহ্বান করো সে বিষয়ে আমাদের অন্তর আচ্ছাদিত আর আমাদের কানে ছিপি লাগানো এবং তোমার মাঝে আর আমার মাঝে রয়েছে পর্দা। সুতরাং তুমি তোমার কাজ কর আর আমরা আমাদের কাজ করি। (সূরা আস্-সাজদাহ: ১-৪)
"রাসূল (সা.) আয়াতগুলো পড়তে থাকেন। উতবা যখন কুরআনের আয়াত শুনতে পেলো তখন সে কান খাড়া করে দিলো। এবং তার দু হাত ঘাড়ের ওপর রেখে হেলান দিয়ে কুরআন শুনতে আরম্ভ করলো। রাসূল (সা.) যখন সাজদার আয়াত পর্যন্ত পৌঁছলেন তিনি সাজদা করলেন উতবাও তার সাথে সাজদা করল। তারপর তিনি বললেন, 'হে আবুল ওয়ালিদ! 'তুমি আমার কথা শুনেছো, তুমি এখন ফিরে যেতে পার।' অপর এক বর্ণনায় এসেছে, রাসূল (সা.) কুরআন পড়তে পড়তে যখন এ আয়াত পর্যন্ত পৌঁছলেন فَإِنْ أَعْرَضُوا فَقُلْ أَنذَرْتُكُمْ صَاعِقَة مِّثْلَ صَاعِقَةِ عَادٍ وَثَمُودَ অর্থাৎ, "যদি তারা বিমুখ হয়, তুমি তাদের বল আমি তোমাদের ভয়ংকর শাস্তির ভয় দেখাচ্ছি যে ভয়ংকর শাস্তি সামুদ এবং আদ জাতির অনুরূপ।” তখন উতবা বিচলিত হয়ে দাঁড়িয়ে পড়ল এবং সে তার হাতকে রাসূল (সা.)-এর মুখে রেখে বলল, 'আমি আল্লাহর কসম দিচ্ছি এবং আত্মীয়তার কসম দিচ্ছি, তুমি এ দাওয়াত হতে বিরত থাক।' এ কথা বলে সে দৌঁড়ে তার নিজ গোত্রের নিকট চলে গেল। এমনভাবে দৌঁড় দিল, যেন বিদ্যুৎ তার মাথার ওপর পড়ছিলো। গিয়ে কুরাইশদের পরামর্শ দিল, তারা যেন রাসূল (সা.)-এর বিষয় নিয়ে মাথা না ঘামায় এবং তাকে তার আপন অবস্থায় কাজ করতে ছেড়ে দেয়। সে বার বার তাদের বুঝানোর জন্য চেষ্টা চালায়।১৯
রাসূল (সা.) তাকে শুনানোর জন্য এ আয়াতকে নির্বাচন করেন। কারণ, তিনি যাতে উতবাকে বুঝাতে সক্ষম হন, রিসালাত এবং রাসূল (সা.)-এর হাকীকত কী হতে পারে। আর মুহাম্মাদ (সা.) মানুষের জন্য এমন এক কিতাব নিয়ে এসেছেন, যা দ্বারা তিনি তাদের পথভ্রষ্টতা হতে বের করে সৎপথে পরিচালনা করেন। তাদের তিনি অন্ধকার হতে বের করে আলোর পথ দেখান। তাদের তিনি জাহান্নাম হতে বাঁচান এবং জান্নাতের সন্ধান দেন। আর তিনি নিজেই সকলের পূর্বে এর ধারক বাহক। তাই এ দ্বীনের পরিপূর্ণ বিশ্বাস সর্বপ্রথম তাকেই করতে হবে এবং সর্বপ্রথম তাকেই তার বিধান সম্পর্কে জানতে হবে।
আল্লাহ যখন সমগ্র মানুষকে কোনো নির্দেশ দেন, তা মানার বিষয়ে সর্বপ্রথম মুহাম্মাদ (সা.) নিজেই সর্বাধিক বিবেচ্য ব্যক্তি। তিনি কোনো রাজত্ব চান না এবং কোনো টাকা-পয়সা চান না এবং কোনো ইজ্জত-সম্মান চান না। আল্লাহ তায়ালা তাকে সব কিছুর সুযোগ দেন এবং তিনি তা হতে নিজেকে বিরত রাখেন। ক্ষণস্থায়ী জীবনের মালামালের প্রতি লোভ-লালসা বলতে কিছুই তার ছিল না। কারণ, তিনি তার দাওয়াতে সত্যবাদী আর আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভে ঐকান্তিক।
তার এ অবস্থান, তাকে আল্লাহর পক্ষ হতে যে প্রজ্ঞা ও পরম ধৈর্য দেয়া হয়েছে, তার উৎকৃষ্ট দৃষ্টান্ত। তিনি তার দাওয়াত এবং মিশনকে সামনে এগিয়ে নিতে বদ্ধপরিকর ছিলেন। কোনো ধন-সম্পদ, অর্থ-প্রাচুর্য, নারি, বাড়ি, গাড়ী এবং রাজত্ব কোনো কিছুকেই তার বিনিময় প্রাধান্য দেননি এবং স্থান কাল পাত্র ভেদে এমন কথা পেশ করলেন, যা তখনকার সময়ের জন্য খুবই প্রয়োজন ছিল। মনে রাখতে হবে একেই বলে হিকমত এবং সর্বোত্তম আদর্শ।
আবু জাহেলের সাথে রাসূল (সা.)-এর আচরণ
কাফিররা সকলে মিলে সিদ্ধান্ত নিল তারা রাসূল (সা.) কে কষ্ট দেয়াসহ ইসলামে প্রবেশকারী মুসলমানদের ওপর নির্যাতনের সাথে সাথে ইসলামের জাগরণকে ঠেকাতে সব ধরনের কলাকৌশল এবং অপপ্রচার চালিয়ে যাবে। তারা নবী (সা.) কে বিভিন্নভাবে অপবাদ দিতে লাগল, তারা তাকে পাগল, যাদুকর, গণক, মিথ্যুক ইত্যাদি বলে গালি গালাজ করতে আরম্ভ করে। কিন্তু রাসূল (সা.) ছিলেন অটল অবিচল। তাদের কথায় কোনো প্রকার কর্ণপাত করেননি। আল্লাহর রহমত এবং আল্লাহর দ্বীনকে বিজয়ী করার আশায় সর্বাত্মক চেষ্টা অব্যাহত রাখেন। রাসূল (সা.) মুশরিকদের পক্ষ হতে এমন কষ্টের সম্মুখীন হন যে, কোনো ঈমানদার এত কষ্টের সম্মুখীন হননি। আবু জাহেল তার মাথাকে ধুলায় মিশিয়ে দিতে এবং তাকে দুনিয়া থেকে চির বিদায় দিতে চেয়েছিল। কিন্তু আল্লাহ তাকে হিফাযত করেন এবং আবু জাহেলের ষড়যন্ত্রকে তারই বিপক্ষে প্রয়োগ করেন।
আবু হুরাইরা (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আবু জাহেল তার সাথীদের জিজ্ঞাসা করল, 'মুহাম্মাদ কি তোমাদের সম্মুখে চেহারা মাটিতে মেশায়?' বলা হল, 'অবশ্যই, 'সে আমাদের সম্মুখে মাথা মাটিতে ঝুঁকায়।' এ কথা শোনে সে বলল, 'লাত এবং উযযার কসম করে বলছি, আমি যদি তাকে মাটিতে মাথা ঝোঁকানো অবস্থায় দেখতে পাই, তার গর্দানকে পদপিষ্ট করব অথবা তার চেহারাকে ধুলা-বালিতে মিশিয়ে দেব।' তারপর একবার রাসূল (সা.) সালাত আদায় করতে ছিলেন। দেখতে পেয়ে আবু জাহেল তার গর্দান পদপিষ্ট করার জন্য তার দিকে অগ্রসর হলো। যখন রাসূল (সা.)-এর নিকটে এলো, হঠাৎ সে পিছু হটতে আরম্ভ করল এবং দু-হাত দিয়ে নিজেকে আত্মরক্ষা করতে আরম্ভ করল। তাকে জিজ্ঞাসা করা হলো, 'তোমার কি হয়েছে, তুমি এমন করছো কেন?' তখন সে উত্তর দিল, 'আমি আমার এবং তার মাঝে আগুনের একটি পরিখা দেখতে পাই এবং তাতে অসংখ্য ডানা দেখতে পাই।' রাসূল (সা.) বলেন, 'যদি সে আমার কাছে আসতো, তাহলে ফেরেশতারা তাকে টুকরা টুকরা করে ফেলতো। তারপর এ ঘটনার ইঙ্গিত দিয়ে আল্লাহ তায়ালা আয়াত নাযিল করেন- كلا إن الإنسان ليطغى থেকে সূরা আলাকের শেষ পর্যন্ত। (সহীহ মুসলিম: ২৭৯৭)
আল্লাহ তায়ালা রাসূল (সা.) কে ঐ দুর্বৃত্ত এবং অন্যান্য দুর্বৃত্তের হাত হতে রক্ষা করেন। রাসূলুল্লাহ (সা.) সকল প্রকার কষ্ট, জুলুম নির্যাতন আল্লাহর সন্তুষ্টি লাভের উদ্দেশ্যে নীরবে সয়ে যান এবং তার জান, মাল ও সময় আল্লাহর রাস্তায় উৎসর্গ করেন।২০
রাসূলের পিঠে উটের ভুঁড়ি রাখা
এ প্রসঙ্গে আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ (রা.) বর্ণনা করেন, একদিন রাসূল (সা.) বাইতুল্লাহর পাশে নামাজ আদায় করতে ছিলেন। আবু জাহেল এবং তার সঙ্গীরা একসাথে বসা ছিল। বিগত দিন একটি উট জবেহ করা হয়েছিল। আবু জাহেল বলল, 'কে উটের ভুঁড়িটি নিয়ে আসবে এবং মুহাম্মাদ যখন সাজদা করবে তার পিঠের ওপর রেখে দেবে।' তারপর তার দলের মধ্যে সবচেয়ে নিকৃষ্ট যে ব্যক্তি, সে উষ্ট্রের ভুঁড়িটি নিয়ে আসল এবং রাসূল (সা.) সাজদা করলে তার দুই কাঁধের ওপর রেখে তারা হাসাহাসি করতে আরম্ভ করে। তারা হাসতে হাসতে একে অপরের গায়ে ঢলে পড়লো। আমি পুরো বিষয়টি দেখতে পেলাম, যদি কোনো ক্ষমতা থাকতো তা হলে আমি রাসূল (সা.)-এর পৃষ্ঠ হতে তা সরিয়ে নিতাম! রাসূল (সা.) সাজদায় পড়ে রইলেন। কোনো ভাবে মাথা উঠাতে পারছিলেন না। এক লোক রাস্তা দিয়ে যাওয়ার সময় এ দৃশ্য দেখে ফাতেমা (রা.) কে সংবাদ দেন। তিনি এই খবর শোনামাত্র দৌঁড়ে আসলেন এবং রাসূল (সা.)-এর মাথা থেকে উটের ভুঁড়ি নামালেন। তারপর তাদের গালি গালাজ করতে লাগলেন। নামাজ শেষে রাসূল (সা.) উচ্চ আওয়াজে তাদের জন্য বদ দোয়া করতে আরম্ভ করেন। আর তার অভ্যাস ছিল, যখন দোয়া করতেন, তিন বার দোয়া করতেন। আবার যদি কোনো কিছু চাইতেন, তিন বার চাইতেন। রাসূল বললেন, 'হে আল্লাহ! তুমি কুরাইশদের শাস্তি দাও।' তিনবার বলেন। যখন তারা রাসূল এর বদদোয়া আওয়াজ শুনতে পেল, তাদের হাসি বন্ধ হয়ে গেল। এবং তারা তার বদদোয়াকে ভয় করতে আরম্ভ করে। তারপর রাসূল (সা.) তাদের নাম ধরে ধরে বদদোয়া করে বললেন, 'হে আল্লাহ তুমি আবু জাহল ইবনে হিশামকে ধ্বংস কর, উতবা বিন রাবিয়াকে ধ্বংস কর, শাইবা বিন রাবিয়া, ওয়ালিদ বিন উতবা, উমাইয়া বিন খালফ, উকবা বিন আবি মুয়িতকে ধ্বংস কর।' এভাবে তিনি সাত জন ব্যক্তির নাম উল্লেখ করেন আমি সপ্তম ব্যক্তির নাম ভুলে যাই। আল্লাহর কসম করে বলছি, যিনি রাসূল (সা.) কে সত্যের পয়গাম নিয়ে দুনিয়াতে প্রেরণ করেন, তিনি যাদের নাম নেন, তাদের সবাইকে বদর যুদ্ধের দিন অধঃমুখে হয়ে পড়ে থাকতে দেখি। তারপর তাদের বদর গর্তে নিক্ষেপ করা হলো। (সহীহ মুসলিম: ১৭৯৪)
উকবা বিন আবি মুয়াইতের ঘটনা
মুশরিকরা রাসূল (সা.) এর সাথে সবচেয়ে কঠিন যে আচরণ করে তার বর্ণনা এসেছে, সহীহ আল-বুখারীতে, উরওয়াহ বিন যুবায়ের হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, আমি আবদুল্লাহ বিন আমর ইবনুল আসকে বলি, মুশরিকরা রাসূল (সা.) এর সাথে সবচেয়ে খারাপ যে আচরণ করেছে আপনি আমাকে তার বিবরণ দিন। তিনি বলেন, 'একদিন রাসূল (সা.) বাইতুল্লাহর পাশে নামাজ আদায় করতে ছিলেন এ অবস্থায় উকবা বিন আবি মুয়াইত এসে রাসূলের গলা চেপে ধরে এবং তার শরীরের কাপড়কে তার গলায় পেঁছিয়ে দেয়, তারপর সে খুব জোরে গলা চাপা দিলো, আবু বকর (রা.) এসে তার গলাও চেপে ধরলেন এবং রাসূল (সা.) থেকে তাকে দূরে সরিয়ে দিলেন এবং বললেন, 'তোমরা এমন এক ব্যক্তিকে হত্যা করবে যে বলে, আমার প্রতিপালক আল্লাহ! এবং তিনি তোমাদের নিকট তোমাদের প্রতিপালকের পক্ষ হতে প্রমাণসমূহ নিয়ে এসেছেন?' (সহীহ বুখারী: ৪৮১৫)
রাসূল (সা.) এবং তার সাহাবীদের ওপর মুশরিকদের নির্যাতনের আর কোনো অন্ত রইল না। তাদের নির্যাতনে অতিষ্ঠ হয়ে রাসূল (সা.) এর নিকট এসে অনেকেই সাহায্য চাইলেন এবং আল্লাহর কাছে দোয়া প্রার্থনা করতে এবং তাঁর সাহায্য কামনা করতে বলেন। তবে রাসূল (সা.) আল্লাহর সাহায্য লাভে প্রত্যয়ী ছিলেন এবং আল্লাহর মদদ তার পক্ষেই হবে এ বিশ্বাস তার পুরোপুরি ছিল। কারণ, তিনি জানতেন শেষ শুভপরিণতি একমাত্র মুত্তাকীদের পক্ষেই হয়ে থাকে এবং তারাই পরিশেষে সফলকাম হয়।
"খাব্বাব ইবনুল আরত (রা.) হতে বর্ণিত তিনি বলেন, 'রাসূল (সা.) একটি চাদরকে বালিশ বানিয়ে কাবা শরীফের ছায়ায় শুয়ে আছেন এ অবস্থায় তার নিকট গিয়ে অভিযোগের স্বরে আমরা বললাম, 'মুশরিকদের নির্যাতনে আমরা অসহায় হয়ে পড়ছি, আপনি কি আমাদের জন্য বিজয় প্রার্থনা করবেন না? আমাদের জন্য দোয়া করবেন না?' উত্তরে তিনি বলেন, 'তোমাদের পূর্বের লোকদের নির্যাতনের অবস্থা ছিল: তাদের কোনো এক লোককে ধরে আনা হতো এবং মাটিতে তার জন্য কূপ খনন করে তাকে এ কূপে নিক্ষেপ করে হত্যা করা হতো। অথবা একটি কাঠ কাটার করাত দিয়ে মাথার ওপর হতে নিচ পর্যন্ত কেটে দুই টুকরা করা হতো এবং তাদের শরীরকে লোহার চিরুনি দ্বারা চিরানো করা হতো। শরীরের হাড় ও রগ হতে গোশতকে আলাদা করে ফেলতো, তারপরও তাদের আল্লাহর ধর্ম থেকে বিন্দু পরিমাণও দূরে সরানো যেত না। আল্লাহর কসম করে বলছি, আল্লাহ তার দ্বীনকে পরিপূর্ণতা দান করবেন। ফলে এমন একটি সময় আসবে যখন একজন লোক 'সানাআ' হতে 'হাদ্রামাউত' পর্যন্ত এমন নিরাপদে ভ্রমণ করবে যে, সে একমাত্র আল্লাহ ছাড়া আর কাউকে ভয় করবে না। ছাগলের জন্য বাঘকে হুমকি মনে করবে না। কিন্তু তোমরা অতি তাড়াতাড়ি চাচ্ছো।” (সহীহ বুখারী: ৩৬১৬)
মোট কথা, মুসলমানদের এবং বিশেষ করে রাসূল (সা.)-এর ওপর তারা বিরামহীন নির্যাতন চালাতো এবং তাদের সর্ব প্রকার কষ্ট, যন্ত্রণা, মুসলমানদের সহ্য করতে হতো। কারণ, তাদের একমাত্র অপরাধ, তারা আল্লাহর দ্বীনকে মনে প্রাণে গ্রহণ করে নিয়েছে। আল্লাহর একত্ববাদে বিশ্বাস স্থাপন করেছে। হক ওই সত্যের ওপর অটল ও অবিচল থেকেছে। জাহেলিয়্যাতকে প্রত্যাখ্যান করেছে। তাদের কুসংস্কার এবং প্রতিমা পূজাকে বর্জন করেছে। এ ছাড়া তাদের আর কী অপরাধ ছিল?
আবু লাহাবের স্ত্রীর ঘটনা
রাসূল (সা.) মুশরিকদের পক্ষ হতে কঠিন নির্যাতনের সম্মুখীন হন। এমনকি তাকে এবং তার আনীত দ্বীনকে অপমান করার উদ্দেশ্যে তার নামের মধ্যে পর্যন্ত বিকৃতি আনতে কোনো প্রকার কুণ্ঠা বোধ করেনি। তাদের শত্রুতা এবং বিরোধিতা ধর্মীয় পর্যায়ে সীমাবদ্ধ না রেখে তা তার ব্যক্তি পর্যায়েও নিয়ে আসে। কুরাইশরা রাসূলের প্রতি তাদের অযৌক্তিক দুশমনী ও বাড়াবাড়িতে সীমা ছড়িয়ে যায়। যে নাম দ্বারা তার প্রশংসা বুঝায় তা পরিবর্তন করে, তার জন্য একটি বিপরীত নাম রাখে। যার অর্থ প্রকৃত নামের সম্পূর্ণ বিপরীত। তারা 'মুজাম্মাম' বলে তার নামকরণ করে। আর যখন তার নাম আলোচনা করত, বলত: 'মুজাম্মাম এ কাজ করেছে এবং মুজাম্মাম এখানে এসেছে।' অথচ রাসূল (সা.) এর প্রসিদ্ধ নাম হলো মুহাম্মাদ। মুজাম্মাম বলে কোনো নাম তার নেই। কিন্তু তার পরিণতিতে দেখা গেল, যে উদ্দেশ্যে এসব অপকর্মের আশ্রয় নিল, তা তাদের জন্য হিতে বিপরীত আকার ধারণ করল।
রাসূল (সা.) বলেন, 'এতে তোমরা আশ্চর্যবোধ কর না যে, আল্লাহ কীভাবে আমার থেকে কুরাইশদের গালি ফিরিয়ে নেন এবং তাদের অভিশাপ দেন। তারা মুজাম্মামকে গালি দিত এবং মুজাম্মামকে অভিশাপ করতো আর আমি তো মুজাম্মাম নই, আমি মুহাম্মাদ।' রাসূল (সা.)-এর পাঁচটি নাম ছিল তার একটি নামও মুজাম্মাম ছিল না। আবু লাহাবের স্ত্রী উম্মে জামিল তার সম্পর্কে এবং তার স্বামী সম্পর্কে কুরআনে অবতীর্ণ চিরন্তন বাণীর কথা শুনে, রাসূল (সা.) এর নিকট আসল, রাসূল তখন কাবা গৃহের পাশে বসা ছিলেন। তার সাথে ছিল আবু বকর (রা.)। আর আবু লাহাবের স্ত্রীর হাতে এক মুষ্টি পাথর ছিল। সে যখন তাদের নিকটে এসে পৌঁছলো আল্লাহ তার দৃষ্টি শক্তি কেড়ে নিলেন। সে রাসূল (সা.) কে আর দেখতে পেল না। শুধুমাত্র আবু বকরকে দেখতে পেল। তার ওপর চড়াও হয়ে বলল, 'হে আবু বকর তোমার সাথী কোথায়? শুনতে পেলাম সে আমার দুর্নাম করে, শপথ করে বলছি, যদি তাকে পেতাম, আমি তার মুখে এ পাথরগুলো ছুড়ে মারতাম।' মনে রেখো, আমি একজন কবি এবং তার বদনাম করতে আমিও কার্পণ্য করব না।২১
তারপর সে এ কাব্যাংশ আবৃতি করে 'আমি মুজাম্মামের নাফরমানি করি, তার নির্দেশের অমান্য করি এবং তার দ্বীনকে ঘৃণা করি।'
মুশরিকরা রাসূল এবং তার অনুসারীদের কষ্ট দেয়া অব্যাহত রাখল এবং মুসলমানদের সংখ্যা যত বৃদ্ধি পেতে লাগল তাদের নির্যাতনের মাত্রা এবং মুসলমানদের প্রতি তাদের হিংসা বিদ্বেষ তত প্রকট আকার ধারণ করল। তারা তাদের প্রতি বিভিন্ন ধরনের কটূক্তি এবং বদনাম রটাতে অপচেষ্টা চালাত। তারপর রাসূল (সা.) যখন মুসলমানদের দুরবস্থা দেখতে পান এবং তিনি নিজেই একমাত্র আল্লাহর হিফাজতে বেঁচে আছেন এবং চাচা আবু তালেব তাকে সহযোগিতা করলেও সে মুসলমানদের কোনো উপকার করতে পারছে না তাদের ওপর যে ধরনের নির্যাতন চলছে তা সে কোনোভাবেই ঠেকাতে পারে না। এভাবে মুসলমানদের দিনকাল অতিবাহিত হচ্ছিল, এরই মধ্যে অনেকে মারা যেত আবার কেউ কেউ অন্ধ হয়ে যেত আবার কেউ অর্ধাঙ্গ আবার কেউ বিকলাঙ্গ হয়ে যেত। বাধ্য হয়ে রাসূল (সা.) তার সাথীদের আবিসিনিয়ায় (ইথিওপিয়া) হিজরত করার অনুমতি দেন। ফলে উসমান বিন আফ্ফানের নেতৃত্বে বার জন পুরুষ এবং চার জন মহিলা আবিসিনিয়ায় হিজরত করেন। তারা সাগর তীরে পৌঁছলে আল্লাহ তাদের জন্য দুটি নৌকার ব্যবস্থা করেন। তার দ্বারা তারা তাদের গন্তব্য আবিসিনিয়ায় পৌঁছতে সক্ষম হন।
তখন নবুয়তের পঞ্চম বছরের রজব মাস। এদিকে কুরাইশরা তাদের সন্ধানে ঘর থেকে বের হলো এবং সাগরের তীর পর্যন্ত গিয়ে উপস্থিত হলো। কিন্তু তাদেরই দুর্ভাগ্য সেখানে গিয়ে তারা কাউকে পায়নি। তারপর তারা সেখান থেকে ক্রুদ্ধ হয়ে মক্কায় ফিরে আসে। পরবর্তীতে আবিসিনিয়ায় একটি মিথ্যা সংবাদ পৌঁছলো যে, কুরাইশরা রাসূল (সা.) কে কষ্ট দেয়া বন্ধ করে দিয়েছে এবং তাদের অনেকেই মুসলমান হয়ে গেছে। তাই তারা পুনরায় মক্কায় ফিরে আসেন। কিন্তু তারা মক্কায় ফিরে এসে যখন জানতে পারেন এ খবরটা ছিল মিথ্যা অপপ্রচার এবং এও জানতে পারেন, মুশরিকরা পূর্বের যে কোনো সময়ের তুলনায় এখন মুসলমানদের আরো বেশি কষ্ট দেয়। তাই তাদের কেউ কেউ অন্যের আশ্রয় নিয়ে মক্কায় প্রবেশ করেন আবার কেউ গোপনে মক্কায় প্রবেশ করেন। আব্দুল্লাহ বিন মাসউদ (রা.) আশ্রয় প্রার্থনা করে মক্কায় প্রবেশ করেন। এ ঘটনার পর হতে মুসলমানদের ওপর নির্যাতন আরো বেড়ে যায় এবং আরো কঠিন অত্যাচারের সম্মুখীন হন।
তাদের জুলুম নির্যাতনে অতিষ্ঠ হয়ে রাসূল (সা.) দ্বিতীয়বার তাদের আবিসিনিয়ায় হিজরত করার অনুমতি দেন। দ্বিতীয়বার যারা হিজরত করেন তাদের সংখ্যা হলো আশি জন। তাদের মধ্যে ছিলেন আম্মার বিন ইয়াসার এবং নয়জন মহিলা। তারা সে দেশে নাজ্জাশী বাদশার আশীর্বাদে নিরাপদে বসবাস করতে থাকলেন। কিন্তু কিছু দিন যেতে না যেতে কুরাইশরা যখন জানতে পারল তখন তারা বিভিন্ন প্রকার উপঢৌকন নিয়ে নাজ্জাশী বাদশার নিকট দূত প্রেরণ করে। যেন সে আশ্রিত মুসলমানদের তার দেশ থেকে বের করে দেয় ও আবার মুশরিকদের নিকট ফেরত পাঠায়।
উপত্যকায় রাসূলের বন্দিজীবন
যখন কুরাইশরা ইসলামের প্রচার প্রসার, ব্যাপকভাবে মানুষের ইসলাম গ্রহণ, ইথিওপিয়ায় মুহাজিরদের সম্মান ও নিরাপদ আশ্রয় ও কুরাইশ প্রতিনিধিদল নিরাশ হয়ে ফিরে আসার ব্যাপারগুলো অবলোকন করল, তখন ইসলামের অনুসারীদের প্রতি তাদের ক্রোধ বেড়ে গেল এবং তারা বনী হাশেম, বনী আব্দুল মুত্তালিব ও বনী আবদে মানাফের বিরুদ্ধে পরস্পর চুক্তি সম্পাদন করতে একত্র হলো। তারা তাদের সাথে লেনদেন করবে না। পরস্পর বিবাহ-শাদী করবে না। কথা-বার্তা বলবে না ও উঠা-বসা করবে না। যাকে বলা যায় অবরোধ বা বয়কট। এ অবরোধ চলতে থাকবে যতক্ষণ না তারা রাসূল (সা.) কে তাদের হাতে সমর্পণ করবে। অতঃপর একটি চুক্তিনামা লিখে কাবার ছাদে ঝুলিয়ে দিল। ফলে আবু লাহাব ব্যতীত বনী হাশেম ও বনী আব্দুল মুত্তালিবের কাফির মুসলিম সকলে এক পক্ষ অবলম্বন করল। তারা মুসলিমদের সাথে অবরুদ্ধ হয়ে পড়ল। আবু লাহাব এদের গোত্রভুক্ত হওয়া সত্ত্বেও সে রাসূলুল্লাহ (সা.), বনী হাশেম ও বনী আব্দুল মুত্তালিবের বিরুদ্ধে কুরাইশদের সমর্থক থেকে গেল।
নবুয়তের সপ্তম বছরে মুহাররম মাসের শুরুর দিকের কোনো এক রাত্রিতে আবু তালেব ঘাঁটিতে রাসূল (সা.) কে অবরুদ্ধ করা হলো। তারা সেখানে আবদ্ধ সংকীর্ণতা ও খাদ্যসমাগ্রীর অভাব এবং বিচ্ছিন্নাবস্থায় তিন বছর যাবৎ অবরোধের দিনগুলো অতিবাহিত করলেন। এমনি হয়েছিল যে, ঘাঁটির আড়াল থেকে ক্ষুধার্ত বাচ্চাদের কান্নাকাটির আওয়াজ শোনো যাচ্ছিল। অতঃপর আল্লাহ তায়ালা তাঁর রাসূল (সা.) কে চুক্তিপত্রের সম্পর্কে অবহিত করলেন যে, একটি উইঁপোকা পাঠিয়ে জোর, জুলুম, আত্মীয়তা ছিন্নের চুক্তির সব লেখা খাইয়ে দিয়েছেন। শুধুমাত্র আল্লাহ তায়ালার নামটি অবশিষ্ট আছে। রাসূল (সা.) এ ব্যাপারে সকলকে সংবাদ দিলেন। ফলে একজন কুরাইশদের কাছে গেল এবং সংবাদ দিল যে, মুহাম্মাদ চুক্তিপত্র ধ্বংস হয়ে যাওয়ার কথা বলছে। যদি সে এতে মিথ্যাবাদী হয়, তাহলে আমরা তাকে তোমাদের হাতে দিয়ে দেব। আর যদি সত্যবাদী হয় তাহলে তোমাদের এই অবরোধ ও বয়কট থেকে ফিরে আসতে হবে। তারা বলল, 'তুমি ঠিকই বলেছ।' অতঃপর তারা কাগজের টুকরাটি নামিয়ে আনল। যখন তারা এই বিষয়টি রাসূলের কথামত দেখতে পেল তখন তাদের কুফরী আরো বেড়ে গেল।
নবুয়তের দশম বছরে নবী করিম (সা.) ও তার সাথীরা অবরুদ্ধ অবস্থা থেকে থেকে বের হয়ে আসলেন। এর ছয় মাস পর আবু তালেব মৃত্যুবরণ করল। তার মৃত্যুর তিনদিন পর খাদিজা (রা.) ইন্তেকাল করেন। কেউ কেউ অন্য মতও প্রকাশ করেছেন। বয়কট ও অবরোধ অবসানের পর অল্প দিনের ব্যবধানে আবু তালেব ও খাদিজার ইন্তেকাল হয়ে গেল। ফলে রাসূলের ওপর তার সম্প্রদায়ের নির্বোধরা দুঃসাহসিকতার সাথে, প্রকাশ্যে, আরো বেশি উৎপীড়ন-নিপীড়ন করতে থাকল। যার কারণে তার দুঃচিন্তা বেড়ে গেল এবং তাদের থেকে নিরাশ হয়ে গেলেন এবং তিনি তায়েফে চলে গেলেন এ আশায় যে, তায়েফবাসীরা তার ডাকে সাড়া দেবে। তাকে আশ্রয় দেবে। তাকে তার সম্প্রদায়ের বিরুদ্ধে সাহায্য করবে। সেখানেও কেউ তাকে আশ্রয় দেয়নি, কেউ সাহায্য করেনি। এবং তারা তাকে আরো বেশি কষ্ট দিয়েছে এবং তার সম্প্রদায়ের চেয়ে বেশি অত্যাচার করেছে।
তায়েফবাসীর সাথে নবী করীম (সা.)
নবুয়তের দশম বছরে শাওয়াল মাসে নবী করীম (সা.) তায়েফবাসীর উদ্দেশ্যে বের হলেন। তার ধারণা ছিল যে, তিনি সকীফ গোত্রে তার দাওয়াতের প্রতি সাড়া ও সাহায্য পাবেন। তার সাথে ছিল আজাদকৃত গোলাম যায়েদ বিন হারেসা। রাসূল (সা.) পথিমধ্যে যে গোত্রের পাশ দিয়ে অতিক্রম করতেন তাদের ইসলামের দাওয়াত দেন। তবে তাদের কেউ তার ডাকে সাড়া দেয়নি। যখন তিনি তায়েফে পৌঁছলেন তখন সেখানকার নেতাদের নিয়ে বসলেন এবং ইসলামের দাওয়াত দিলেন। তার দাওয়াতে তারা কোনো ভালো উত্তর দেয়নি।
রাসূল (সা.) এখানে দশদিন অবস্থান করেন এবং দেশের শীর্ষস্থানীয় লোকদের কাছে গিয়ে ইসলামের কথা বলেন। তাতেও ভালো কোনো সাড়া পাননি বরং তারা বলল, 'তুমি আমাদের দেশ থেকে বের হও! আমরা তোমার দাওয়াত গ্রহণ করতে পারলাম না।' তারা তাদের নির্বোধ ও বাচ্চাদেরকে তার প্রতি ক্ষেপিয়ে তার পিছনে লেলিয়ে দিল। অতঃপর যখন তিনি বের হতে ইচ্ছা করলেন তখন নির্বোধরা তার পিছু ধরল। তারা দু'সারি হয়ে তাকে পাথর নিক্ষেপ করল। অকথ্য ভাষায় গালাগালি করল এবং তার অঙ্গ-প্রত্যঙ্গে পাথর নিক্ষেপ করে তার জুতাদ্বয় রক্তে রঞ্জিত করে দিল। আর যায়েদ বিন হারেসা নিজেই রাসূল (সা.) কে রক্ষা করতে ছিলেন। যার কারণে তার মাথা ক্ষতবিক্ষত হয়ে গিয়েছিল। অতঃপর রাসূল (সা.) তায়েফ থেকে দুশ্চিন্তা ও ভগ্নহৃদয় নিয়ে মক্কায় ফিরে আসেন।
মক্কায় আসার পথে আল্লাহ তায়ালা পাহাড়-পর্বতের দায়িত্বপ্রাপ্ত ফেরেশতাসহ জিবরীলকে পাঠান। সে তার কাছে অনুমতি চাচ্ছিল যে, দুটি পাহাড় যা তায়েফ ও মক্কার মধ্যবর্তী স্থানে অবস্থিত তা মক্কাবাসীর ওপর নিক্ষেপ করতে।
আয়েশা (রা.) থেকে বর্ণিত, তিনি রাসূল (সা.) কে বললেন, 'হে আল্লাহর রাসূল! আপনার কাছে কি উহুদ যুদ্ধের দিন অপেক্ষা আরো কোনো ভয়ানক দিন এসেছে?' তিনি বললেন যে, আমি তোমার সম্প্রদায় থেকে যে কষ্ট পাওয়ার তাতো পেয়েছি। তবে তার চেয়ে বেশি কষ্ট পেয়েছি আকাবার দিন। যখন আমি ইবনে আবদে ইয়ালীল বিন আবদে কিলালের কাছে দাওয়াত পেশ করলাম তারা আমার আহ্বানে সাড়া না দেয়ায় আমি চিন্তিত বেহুশ অবস্থায় চলে এলাম।
'কারনুস শায়ালব' নামক স্থানে এসে সংজ্ঞা ফিরে পেয়ে মাথা উত্তোলন করি তখন আমি একটি মেঘখণ্ড দেখতে পাই, যা আমাকে ছায়া দিচ্ছে। মেঘের দিকে তাকালে জিবরীলকে দেখি। অতঃপর সে আমাকে ডেকে বলল, 'আল্লাহ তায়ালা আপনার সম্প্রদায়ের কথা ও তাদের উত্তর শুনেছেন।' তিনি আপনার নিকট পর্বতমালার দায়িত্বে নিয়োজিত ফেরেশতাকে পাঠিয়েছেন। আপনি তাদের ব্যাপারে যে শাস্তি চান তাকে নির্দেশ করতে পারেন। রাসূল (সা.) বলেন, 'পর্বতমালার দায়িত্বে নিয়োজিত ফেরেশতা আমাকে আওয়াজ দিল এবং আমাকে সালাম দিল। অতঃপর বলল, 'হে মুহাম্মাদ! আপনার জাতি আপনাকে যা বলেছে আল্লাহ তায়ালা তা শুনেছেন। আর আমিতো পর্বতমালার দায়িত্বে নিয়োজিত ফেরেস্তা। আমার প্রভু আমাকে আপনার নিকট পাঠিয়েছেন। তাদের ব্যাপারে আপনার ইচ্ছা পূরণ করার জন্য। যদি আপনি চান তাহলে দু'পর্বতের মাঝে তাদেরকে মিশিয়ে দেব।' রাসূল (সা.) তাকে বললেন, 'বরং আমি চাই যে, আল্লাহ তায়ালা তাদের পরবর্তী বংশধর থেকে এমন প্রজন্ম বের করবেন যারা এক আল্লাহর ইবাদত করবে যার কোনো শরীক নাই। এবং তার সাথে কোনো কিছুকে শরীক করবে না।' রাসূল (সা.)-এর এ উত্তরের মধ্যে তার অনন্য ব্যক্তিত্ব ফুটে উঠেছে। এবং তার যে মহান চরিত্র ছিল, যার মাধ্যমে আল্লাহ তায়ালা তাকে সাহায্য করেছিলেন, তাও প্রকাশ পেয়েছে। এর মাধ্যমে তার জাতির প্রতি তার দয়া, ধৈর্য ও সহনশীলতার পরিচয় পাওয়া যায়। আর এটাই আল্লাহ তায়ালার এ বাণীর সাথে মিলে যায় :
فَبِمَا رَحْمَةٍ مِنَ اللَّهِ لِنْتَ لَهُمْ
অর্থাৎ, 'অতএব আল্লাহর অনুগ্রহ এই যে, তুমি তাদের প্রতি কোমল চিত্ত হয়ে গেছ। আর তুমি যদি কর্কশভাষী, কঠোর হৃদয় হতে, তবে নিশ্চয়ই তারা তোমার সংসর্গ হতে ফিরে যেত।' (সূরা আলে ইমরান: ১৫৯)
অন্য আয়াতে বলা হচ্ছে- وَمَا أَرْسَلْنَاكَ إِلَّا رَحْمَةً لِلْعَالَمِينَ অর্থাৎ, 'আমি তো তোমাকে সৃষ্টিকূলের প্রতি শুধু রহমতরূপেই প্রেরণ করেছি।' (সূরা আম্বিয়া: ১০৭) আল্লাহ তায়ালার অগণিত সালাত ও সালাম তার ওপর বর্ষিত হউক।
রাসূল (সা.) 'নাখলা' নামক স্থানে বেশ কয়েকদিন অবস্থান করলেন এবং মক্কায় ফিরে আসতে সংকল্প করলেন। ইসলাম ও আল্লাহর শাশ্বত রিসালাত পেশ করার ব্যাপারে তার প্রথম পরিকল্পনা নতুন করে আরম্ভ করার ইচ্ছা করলেন নতুন উদ্যমে। তখনই যায়েদ বিন হারেসা (রা.) রাসূল (সা.) কে বললেন, 'তাদের কাছে নতুন করে কিভাবে যাবেন? তারা তো আপনাকে বের করে দিয়েছে।'
যায়েদ (রা.) থেকে বর্ণিত, রাসূল (সা.) বললেন, 'হে যায়েদ! তুমি যা দেখতে পাচ্ছো, আল্লাহ তায়ালা এর থেকে বের হওয়ার কোনো রাস্তা দেখিয়ে দেবেন। আল্লাহ তার দ্বীনের সাহায্য করবেন ও তার নবীকে বিজয় দান করবেন। এরপর চলতে চলতে মক্কায় পৌঁছলেন। একজনকে 'খুজাআ' গোত্রের মুতয়েম বিন আদীর নিকট তার আশ্রয় প্রার্থনা করে পাঠালেন। মুতয়েম সাড়া দিলেন। তার সন্তান ও গোত্রের লোকদেরকে ডেকে বললেন, তোমরা যুদ্ধাস্ত্র ধর এবং কাবা ঘরের কোণায় অবস্থান গ্রহণ কর। কেননা, আমি মুহাম্মদ (সা.) কে আশ্রয় দিয়েছি। রাসূল (সা.) যায়েদ বিন হারেসা (রা.) কে সাথে নিয়ে প্রবেশ করে কাবা ঘরে গিয়ে যাত্রা শেষ করলেন। মুতয়েম বিন আদী তার সওয়ারীর ওপর দাঁড়িয়ে ডাক দিয়ে বললেন, 'হে কুরাইশ গোত্র! আমি মুহাম্মাদকে আশ্রয় দিয়েছি। তোমাদের মধ্য থেকে কেউ তার সাথে বিদ্রূপ করবে না।' রাসূল (সা.) রূকনে ইয়ামানির কাছে গেলেন তা স্পর্শ করলেন এবং দু'রাকআত নামায আদায় করলেন। এরপর নিজের বাড়িতে ফিরে গেলেন। মুতয়েম বিন আদী ও তার সন্তানেরা তার বাড়িতে প্রবেশ করা পর্যন্ত তাকে অস্ত্র দ্বারা পরিবেষ্টন করে রেখেছিলো।
রাসূল (সা.) যে এই কঠিন পরিস্থিতির সম্মুখীন হয়েছেন তায়েফ সফরে, এটা তার দাওয়াতের কাজ চালিয়ে যাওয়ার ব্যাপারে অদম্য ইচ্ছার স্পষ্ট প্রমাণ এবং মানুষেরা তার দাওয়াতে সাড়া না দেয়ায় তিনি আশাহত হননি। যখন প্রথম প্রান্তরে কোনো বাধা এসে উপস্থিত হয়েছে, তখন দাওয়াতের নতুন প্রান্তর খুঁজেছেন। এর মধ্যে এ কথারই প্রমাণ বহন করে যে, নবী (সা.) প্রজ্ঞার শিক্ষক ছিলেন। আর এটা এ কারণে যে, তিনি যখন তায়েফ আসলেন তখন সমস্ত দলপতি ও তায়েফের সাকীফ গোত্রের প্রধান কে দাওয়াতের জন্য বাছাই করলেন। আর এটা তো জানা কথাই, তারা দাওয়াত গ্রহণ করলে সমস্ত তায়েফবাসীর দাওয়াত গ্রহণ করবে।
নবী (সা.)-এর দুই পা থেকে রক্ত প্রবাহিত হওয়ার মধ্যে একথার সবচেয়ে বড় প্রমাণ যে, আল্লাহর রাস্তায় দাওয়াতের কাজে কত বড় কষ্ট ও নির্যাতন সহ্য করেছেন তিনি। নিজের জাতি ও তায়েফবাসীর ওপর তার বদদোয়া না করা, আর পর্বতসমূহের দায়িত্বে নিয়োজিত ফেরেস্তার পক্ষ থেকে তাদেরকে দুই পাহাড়ের মধ্যে ধ্বংস করার প্রস্তাবে সম্মতি না দেয়ার মধ্যে আরো বড় উদাহরণ যে, দায়ীর দাওয়াত গ্রহণ না করলে, তাকে কত পরিমাণ ধৈযধারণ করতে হয় এবং তাদের হিদায়েত না পাওয়ার কারণে নিরাশ হওয়া যাবে না। হতে পারে আল্লাহ পরবর্তীতে তাদের বংশধরদের মধ্য থেকে এমন কাউকে বের করবেন, যে এক আল্লাহর ইবাদত করবে এবং তার সাথে কাউকে শরিক করবে না। রাসূল (সা.)-এর কৌশলের মধ্য থেকে ছিল, মুতয়েম বিন আদির আশ্রয় গ্রহণ করার পূর্বে তিনি মক্কায় প্রবেশ করেননি। আর এভাবেই দায়ীর উচিত এমন কাউকে তালাশ করা যে তাকে শত্রুর ষড়যন্ত্র থেকে রক্ষা করবে, যাতে সে চাহিদা অনুযায়ী দাওয়াতের দায়িত্ব পালন করতে পারে।
রাসূল (সা.)-এর মুখমণ্ডল ক্ষতবিক্ষত ও দান্দান মুবারক শহীদ
এ প্রসঙ্গে বলা হচ্ছে-
"সাহল বিন সাআদ (রা.) থেকে বর্ণিত, তাকে প্রশ্ন করা হলো, উহুদ দিবসে নবী (সা.) এর আহত হওয়া সম্পর্কে। তিনি বললেন, 'তার মুখমণ্ডল আহত হলো, এবং তার দাঁতগুলো ভেঙে গেল। বর্মের ভাঙ্গা অংশ তার মাথায় প্রবেশ করল। ফাতেমা (রা.) রক্ত পরিষ্কার করছিলেন, এবং আলী (রা.) রক্ত বন্ধ করার চেষ্টা করছিলেন। যখন দেখলেন রক্ত বন্ধ না হয়ে আরো বেশি পরিমাণে বের হচ্ছে তখন ফাতেমা চাটাইতে আগুণ ধরিয়ে দিলেন, পুড়ে ছাই হয়ে গেল। অতঃপর তা ক্ষতস্থানে লাগিয়ে দিলেন, তখনই রক্ত বন্ধ হয়ে গেল। আর রাসূল (সা.) এ কঠিন কষ্ট বরদাশত করছিলেন।" (সহীহ বুখারি: ২৯১১)
যার মহত্ত্বের কাছে পাহাড়ও কেঁপে উঠে। তিনি এমন এক নবী, যিনি এ অবস্থায়ও তার জাতির বিরুদ্ধে বদ-দোয়া করেননি। বরং তাদের জন্য ক্ষমার দু'আ করেছেন। কেননা তারা বুঝে না। আব্দুল্লহ বিন মাসউদ (রা.) হতে বর্ণিত, তিনি বলেন, এখনো মনে হয় আমি রাসূলের দিকে চেয়ে আছি আর রাসূল (সা.) অন্য কোনো নবীর ঘটনা বর্ণনা করছেন, যাকে তার জাতি মেরেছে। এ অবস্থায় তিনি চোখ থেকে পানি মুছছিলেন এবং বলছিলেন, 'হে আল্লাহ! আমার জাতিকে মাফ করে দিন তারা বুঝে না।'২২
সমস্ত নবীগণ এবং তাদের মধ্যে সবার উপরে মুহাম্মাদ (সা.) ধৈর্য ও সহনশীলতা, ক্ষমা ও দয়ার মূর্তপ্রতীক ছিলেন। তিনি তার জাতির জন্য ক্ষমা ও করুণার সকল দ্বার খুলে দিয়েছিলেন। রাসূল (সা.) বলেন, 'আল্লাহর অভিশাপ ঐ জাতির ওপর অধিক হারে পতিত হয়, যে জাতি তাদের রাসূলের সাথে এ আচরণ করে। এ কথা বলার সময় তিনি তার দাঁতের দিকে ইঙ্গিত করছিলেন।
আল্লাহ তায়ালার ক্রোধ কঠোরতর হলো এমন ব্যক্তির ওপর, যে আল্লাহর রাসূল এর বিরুদ্ধে যুদ্ধ করছিল। উহুদ দিবসে নবী (সা.) এর আহত হওয়ার মধ্যে দাওয়াত-কর্মীদের জন্য সান্ত্বনা রয়েছে; তারা আল্লাহর রাস্তায় তাদের শরীরে যে কষ্ট বরদাশত করবে, অথবা তাদের স্বাধীনতা হরণ করা হবে অথবা তাদেরকে যে নির্যাতন করা হবে, সে সকল বিষয়ে তারা আল্লাহর পক্ষ থেকে পুরস্কারপ্রাপ্ত হবে।
নবী (সা.) ছিলেন ধৈর্যের উত্তম আদর্শ। তাকে যখনই কষ্ট দেওয়া হয়েছে তখনই তিনি তাতে ধৈর্যধারণ করেছেন। কাফিরেরা তাকে শুধু শারীরিক কষ্টই দেয়নি বরং সামাজিকভাবে হেয়-প্রতিপন্ন করা, অর্থনৈতিক ক্ষতি এমনকি মক্কার মর্যাদাবান ব্যক্তি হয়েও তাকে ও পরিবারকে বন্দী জীবন-যাপন করতে হয়েছে।
কিন্তু কোনভাবেই তারা রাসূল (সা.) কে আল্লাহর দ্বীনের দাওয়াত থেকে পিছু-হটাতে পারেনি বরং তিনি অবিচলতা, দৃঢ়তা এবং ধৈর্যশীলতার যে অন্যন্য দৃষ্টান্ত স্থাপন করেছেন, পৃথিবীর ইতিহাসে তা আজীবন স্মরণীয় হয়ে থাকবে।
টিকাঃ
১৭. আল্লামা ছফিউর রহমান মোবারকপুরী, আর রাহীকুল মাখতুম, পৃ: ৯৩-৯৫।
১৮. ইবনে হিশাম, সীরাতে ইবনে হিশাম, ১ম খণ্ড, পৃঃ ২৭৮।
১৯. কাসীর, হাফেজ ইমামুদ্দিন ইবনে, তাফসীরে ইবনে কাসীর, ৪র্থ খণ্ড, পৃঃ ৬১।
২০. গাযালী, মুহাম্মদ, ফিকহুস সীরাহ, পৃঃ ১০৬।
২১. হিসাম, ইবনে, সীরাতে ইবনে হিশাম, ১ম খণ্ড, পৃঃ ৩৭৮।
২২. কাহতানী, ড. সাঈদ বিন আলী বিন ওহাব, আনওয়া উস্ সবর ওয়া মাজাল্লাতহু, পৃঃ ৪৮-৫৭।