📘 সবরের পুরস্কার 📄 উলুল আযমি বা দৃঢ়প্রতিজ্ঞ রাসূলদের সংজ্ঞা

📄 উলুল আযমি বা দৃঢ়প্রতিজ্ঞ রাসূলদের সংজ্ঞা


উলুল আযমি অর্থ দৃঢ়প্রতিজ্ঞ, সুদৃঢ় ধৈর্যধারী, নির্ভীক, স্থির প্রতিজ্ঞ। এই উলুল আযমি পয়গম্বর কারা সে বিষয়ে মতভেদ রয়েছে-

১. ইবনে যায়েদ (রহ.) বলেছেন- প্রত্যেক পয়গম্বরই দৃঢ়প্রতিজ্ঞ ছিলেন। ছিলেন জ্ঞান-বুদ্ধি ও সাহসে পূর্ণ ও পরিণত।
২. কোনো কোনো মুফাস্সির বলেন- একমাত্র হযরত ইউনুস (আ.) ছাড়া অন্য সকল নবীই ছিলেন দৃঢ়প্রতিজ্ঞ। কেননা ইউনুস (আ.) আল্লাহর তরফ থেকে প্রত্যাদেশের আদেশ না করেই সিদ্ধান্ত গ্রহণে তাড়াহুড়া করেছিলেন। তাই প্রিয়নবীকে সম্বোধন করে আল্লাহ ইরশাদ করেন-

وَلَا تَكُن كَصَاحِبِ الْحُوتِ .
অর্থাৎ, অতএব তুমি তোমার রবের হুকুমের জন্য ধৈর্যধারণ কর। আর তুমি মাছওয়ালার মতো হয়ো না, যখন সে দুঃখে কাতর হয়ে ডেকেছিল। (সূরা কালাম: ৪৮)

৩. মুকাতিল বলেন- উলুল আযম নবী ছিলেন ৬ জন। ১. হযরত নূহ (আ.) ২. হযরত ইব্রাহিম (আ.) ৩. হযরত ইসহাক (আ.) কারো মতে হযরত ইসমাঈল (আ.) ৪. হযরত ইয়াকুব (আ.) ৫. হযরত ইউসুফ (আ.) ৬. হযরত আইয়ুব (আ.)।
৪. ইবনে আব্বাস ও কাতাদা (রহ.) এর মতে উলুল আযম বাণী বাহকের সংখ্যা ৫ জন। ১. হযরত নূহ (আ.) ২. হযরত ইব্রাহিম (আ.) ৩. হযরত মূসা (আ.) ৪. হযরত ঈসা (আ.) ৫. হযরত মুহাম্মাদ (সা.)। এ মতটিকে অনেকে গ্রহণযোগ্য হিসেবে বিবেচনা করেছেন এবং তাফসীর ইবনে কাসীরে এদের সম্পর্কেই বলা হয়েছে।১৪

টিকাঃ
১৪. আস সুয়ূতী (র.), আল্লামা জালালুদ্দীন আব্দুর রহমান ইবনে আবু বকর, তাফসীরে জালালাইন, ৬ষ্ঠ খণ্ড, পৃঃ ৩৭-৩৮।

📘 সবরের পুরস্কার 📄 হযরত নূহ (আ.) এর ধৈর্যধারণ

📄 হযরত নূহ (আ.) এর ধৈর্যধারণ


হযরত নূহ (আ.) ছিলেন আল্লাহর প্রিয় বান্দাদের মধ্যে অন্যতম এবং দৃঢ়প্রতিজ্ঞ রাসূলদের মধ্যে একজন। তিনি ছিলেন ধৈর্যের অনুপম দৃষ্টান্ত। হযরত নূহ (আ.) নয়শত পঞ্চাশ বছর হায়াত লাভ করেছিলেন। পুরো জীবন অর্থাৎ ৯৫০ বৎসর তিনি তার সম্প্রদায়ের মধ্যে অবস্থান করেছেন। জীবনের প্রতিটি সময় তিনি তার জাতিকে দাওয়াত দিয়েছেন। কুরআন মাজীদে তার দাওয়াতের বর্ণনা করা হয়েছে এভাবে-

قَالَ رَبِّ إِنِّي دَعَوْتُ قَوْمِي لَيْلًا وَنَهَارًا . فَلَمْ يَزِدْهُمْ دُعَائِي إِلَّا فِرَارًا . وَإِنِّي كُلَّمَا دَعَوْتُهُمْ لِتَغْفِرَ لَهُمْ جَعَلُوا أَصَابِعَهُمْ فِي آذَانِهِمْ وَاسْتَغْشَوْا ثِيَابَهُمْ وَأَصَرُّوا وَاسْتَكْبَرُوا اسْتِكْبَارًا .
অর্থাৎ, সে বলল, 'হে আমার রব! আমি তো আমার কওমকে রাত-দিন আহ্বান করেছি। 'অতঃপর আমার আহ্বান কেবল তাদের পলায়নই বাড়িয়ে দিয়েছে'। 'আর যখনই আমি তাদেরকে আহ্বান করেছি 'যেন আপনি তাদেরকে ক্ষমা করেন', তারা নিজদের কানে আঙুল ঢুকিয়ে দিয়েছে, নিজদেরকে পোশাকে আবৃত করেছে, (অবাধ্যতায়) অনড় থেকেছে এবং দম্ভভরে ঔদ্ধত্য প্রকাশ করেছে'। (সূরা নূহ: ৫-৭)

কিন্তু দুঃখের বিষয় হাতেগোনা কিছু লোক ছাড়া কেউই তার কথা শুনলো না। বরং তারা নিজেদের গোড়ামি আর অহংকারে অটল রইল। তারা নূহ (আ.) কে বললো-
قَالَ الْمَلَأُ مِن قَوْمِهِ إِنَّا لَنَرَاكَ فِي ضَلَالٍ مُّبِينٍ .
অর্থাৎ, তার কওম থেকে নেতৃবর্গ বলল, 'নিশ্চয় আমরা তোমাকে স্পষ্ট ভ্রান্তিতে দেখতে পাচ্ছি'। (সূরা আরাফ: ৬০)

وَمَكَرُوا مَكْرًا كُبَّارًا .
অর্থাৎ, 'আর তারা ভয়ানক ষড়যন্ত্র করেছে'। (সূরা নূহ: ২২)

এভাবে আল্লাহর ধৈর্যশীল বান্দা হযরত নূহ (আ.) পঞ্চাশ কম হাজার বছর ধরে তাদের আল্লাহর পথে ডাকেন। তাদের সত্য পথে আনার অবিরাম চেষ্টা করেন। ধ্বংস ও শান্তির হাত থেকে তাদের বাঁচাবার চেষ্টা করেন। কিন্তু তারা তার এই মহৎ কাজের জবাব দেয় তিরস্কার, বিরোধিতা আর ষড়যন্ত্রের মাধ্যমে। শেষ পর্যন্ত নূহ (আ.) আল্লাহর কাছে ফরিয়াদ করলেন এই বলে যে-
وَقَالَ نُوحٌ رَّبِّ لَا تَذَرْ عَلَى الْأَرْضِ مِنَ الْكَافِرِينَ دَيَّارًا .
অর্থাৎ, আর নূহ বলল, 'হে আমার রব! যমীনের ওপর কোনো কাফিরকে অবশিষ্ট রাখবেন না'। (সূরা নূহ: ২৬)

إِنَّكَ إِن تَذَرْهُمْ يُضِلُّوا عِبَادَكَ وَلَا يَلِدُوا إِلَّا فَاجِرًا كَفَّارًا .
অর্থাৎ, 'আপনি যদি তাদেরকে অবশিষ্ট রাখেন তবে তারা আপনার বান্দাদেকে পথভ্রষ্ট করবে এবং দুরাচারী ও কাফির ছাড়া অন্য কারো জন্ম দেবে না'। (সূরা নূহ: ২৭)

এরপর আল্লাহর পক্ষ থেকে ফয়সালা এসে গেল। আল্লাহ নূহের জাতির এই দুষ্ট লোকগুলোকে ধ্বংস করে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিলেন।
فَأَوْحَيْنَا إِلَيْهِ أَنِ اصْنَعِ الْفُلْكَ بِأَعْيُنِنَا وَوَحْيِنَا فَإِذَا جَاءَ أَمْرُنَا وَفَارَ التَّنُّورُ فَاسْلُكْ فِيهَا مِن كُلِّ زَوْجَيْنِ اثْنَيْنِ وَأَهْلَكَ إِلَّا مَن سَبَقَ عَلَيْهِ الْقَوْلُ مِنْهُمْ وَلَا تُخَاطِبْنِي فِي الَّذِينَ ظَلَمُوا إِنَّهُم مُّغْرَقُونَ .
অর্থাৎ, তারপর আমি তার কাছে ওহী প্রেরণ করলাম যে, তুমি আমার চোখের সামনে ও আমার ওহী অনুযায়ী নৌকা তৈরি কর। তারপর যখন আমার আদেশ আসবে এবং চুলা (পানিতে) উথলে উঠবে তখন প্রত্যেক জীবের এক জোড়া ও তোমার পরিবারবর্গকে নৌযানে তুলে নিও; তবে তাদের মধ্যে যাদের ব্যাপারে পূর্বে সিদ্ধান্ত হয়ে আছে তারা ছাড়া। আর যারা যুলম করেছে তাদের ব্যাপারে তুমি আমাকে সম্বোধন করো না। নিশ্চয় তারা নিমজ্জিত হবে। (সূরা মুমিনুন: ২৭)

এভাবে নূহ (আ.) তার নবুয়তি জীবনে তার কাওমের হাজার অত্যাচার, তিরস্কার, সত্ত্বেও ধৈর্যহারা হননি। বরং সবরের মাধ্যমে তিনি তাদের মোকাবেলা করেছিলেন। আর আল্লাহ তার প্রিয় নবীকে তার কাওমের দুষ্ট লোকদের থেকে মুক্তি দান করেন।

📘 সবরের পুরস্কার 📄 ধৈর্যের পাহাড় হযরত ইব্রাহিম (আ.)

📄 ধৈর্যের পাহাড় হযরত ইব্রাহিম (আ.)


ধৈর্যের এক অনন্য দৃষ্টান্ত হযরত ইব্রাহিম (আ.)। জীবনের প্রতিটি স্তরে তাকে পরীক্ষার সম্মুখীন হতে হয়েছে। এমনকি নিক্ষিপ্ত হতে হয়েছে অগ্নিকুণ্ডে। তারপরও তিনি সত্যের দাওয়াত থেকে বিন্দুমাত্র পিছু হটেননি বরং ধৈর্যের সাথে প্রতিটি বিপদ মোকাবেলা করেছেন।

দাওয়াতের ক্ষেত্রে ইব্রাহিম (আ.)-এর ধৈর্যধারণ শুরু হয় তার পিতাকে দাওয়াত দানের মাধ্যমে। যিনি ছিলেন অগ্নি-পূজারক। যিনি ইব্রাহিম (আ.) কে প্রাণ নাশের হুমকি দিয়েছিলেন।

يَا أَبَتِ إِنِّي أَخَافُ أَن يَمَسَّكَ عَذَابٌ مِّنَ الرَّحْمَنِ فَتَكُونَ لِلشَّيْطَانِ وَلِيًّا • قَالَ أَرَاغِبٌ أَنتَ عَنْ آلِهَتِي يَا إِبْرَاهِيمُ لَئِن لَّمْ تَنتَهِ لَأَرْجُمَنَّكَ وَاهْجُرْنِي مَلِيًّا .
অর্থাৎ, 'হে আমার পিতা, আমি আশঙ্কা করছি যে, পরম করুণাময়ের (পক্ষ থেকে) তোমাকে আযাব স্পর্শ করবে, ফলে তুমি শয়তানের সঙ্গী হয়ে যাবে।' সে বলল, 'হে ইবরাহীম, তুমি কি আমার উপাস্যদের থেকে বিমুখ? যদি তুমি বিরত না হও, তবে অবশ্যই আমি তোমাকে পাথর মেরে হত্যা করব। আর তুমি চিরতরে আমাকে ছেড়ে যাও।' (সূরা মারইয়াম: ৪২-৪৬)

তার পিতার প্রাণনাশের হুমকিতে ইব্রাহিম (আ.) মনঃক্ষুণ্ণ হলেন না এবং তার প্রতি কোনো ক্ষোভ ও দেখালেন না। বরং ধৈর্যের সাথে বললেন-

قَالَ سَلَامٌ عَلَيْكَ سَأَسْتَغْفِرُ لَكَ رَبِّي إِنَّهُ كَانَ بِي حَفِيًّا وَأَعْتَزِلُكُمْ وَمَا تَدْعُونَ مِن دُونِ اللَّهِ وَأَدْعُو رَبِّي عَسَى أَلَّا أَكُونَ بِدُعَاءِ رَبِّي شَقِيًّا .
অর্থাৎ, ইবরাহীম বলল, 'তোমার প্রতি সালাম। আমি আমার রবের কাছে তোমার জন্য ক্ষমা চাইব। নিশ্চয় তিনি আমার প্রতি বড়ই অনুগ্রহশীল'। 'আর আমি তোমাদের ও আল্লাহ ছাড়া যাদের ইবাদত তোমরা কর তাদের পরিত্যাগ করছি এবং আমি আমার রবের ইবাদত করছি। আশা করি আমার রবের ইবাদত করে আমি ব্যর্থ হব না'। (সূরা মারইয়াম : ৪৭-৪৮)

অগ্নিকুণ্ডে নিক্ষিপ্ত হওয়ার সময় ধৈর্যধারণ
ইব্রাহিম (আ.) তার জাতির লোকদের আল্লাহর পথে দাওয়াত দিতে থাকলেন। কিন্তু কিছুতেই তার জাতির লোকেরা সত্য গ্রহণে প্রস্তুত হলো না। তখন ইব্রাহিম (আ.) তাদের অনুপস্থিতিতে তাদের ঠাকুর ঘরে প্রবেশ করলেন এবং সমস্ত দেবতাদের ভেঙে দিলেন শুধু বড় মূর্তিটি ছাড়া। যখন লোকেরা এসে দেখলো যে, তাদের দেবতাদের অবস্থা লণ্ড-ভণ্ড তখন তারা ইব্রাহিম (আ.) কে অপরাধী হিসেবে সাব্যস্ত করলো এবং তাকে জিজ্ঞেস করলো : ইব্রাহিম তুমি কি আমাদের দেবতাদের সাথে এই ব্যবহার করেছ? তখন ইব্রাহিম (আ.) বললেন: ওদের কেই জিজ্ঞেস করুন কে মেরেছে ওদের? ঐ বড় মূর্তিটাকেই জিজ্ঞেস করুন সেই ভেঙেছে কি না? তারা বললো: ইব্রাহিম! তুমি ভালো করেই জান দেবতাগুলো কথা বলতে পারে না। তখন ইব্রাহিম (আ.) বললেন : তোমরা আল্লাহকে বাদ দিয়ে কেন এমন সব জিনিসের পূজা-উপাসনা করো যেগুলো তোমাদের ভালোও করতে পারে না, মন্দও করতে পারে না?

কিন্তু বিষয়টি এখানেই শেষ হলো না, তারা ইব্রাহিমের ব্যাপারে রাজার কাছে বিচার দিলেন। তখন ইব্রাহিমকে রাজার (নমরূদ) দরবারে আনা হলো। এবং আল্লাহর পয়গাম্বর ইব্রাহিমের সাথে বাকযুদ্ধ হলো। শেষ পর্যন্ত রাজা ও তার লোকেরা সিদ্ধান্ত নিলো ইব্রাহিমকে অগ্নিকুণ্ডে পুড়িয়ে হত্যা করার। এ সম্পর্কে কুরআন বলছে-

قَالُوا حَرِّقُوهُ وَانصُرُوا آلِهَتَكُمْ إِن كُنتُمْ فَاعِلِينَ .
অর্থাৎ, তারা বলল, 'তাকে আগুনে পুড়িয়ে দাও এবং তোমাদের দেবদেবীদেরকে সাহায্য কর, যদি তোমরা কিছু করতে চাও'। (সূরা আম্বিয়া : ৬৮)

তারা একটি বিশাল অগ্নিকুণ্ডলি বানালো এবং সেখানে এক জাতীয় ভারী কাঠ একত্রিত করলো। তারা একমাস ধরে সেখানে বিভিন্ন স্থান থেকে কাঠ এনে বিশাল এক স্তূপ বানালো। এরপর এতে আগুণ ধরিয়ে দেওয়া হলো। সাতদিন পর্যন্ত এ আগুণ দাউদাউ করে জ্বললো। এরপর নমরূদ সেখানে ইব্রাহিম (আ.) নিক্ষেপের জন্য উপযুক্ত মনে করলো। আসলে এটা ছিল ইব্রাহিম (আ.) এর জন্য এক বড় পরীক্ষা। আল্লাহ তায়ালাও ইব্রাহিমকে পরীক্ষা করতে চাইলেন। তিনি দেখতে চাইলেন ইব্রাহিম কি জীবন বাঁচাবার জন্য ঈমান ত্যাগ করে, নাকি ঈমান বাঁচাবার জন্য জীবন কুরবানি করে। কিন্তু ইব্রাহিমতো অগ্নিপরীক্ষার বিজয়ী বীর। তিনি তো কিছুতেই জীবন বাঁচাবার জন্য আল্লাহকে এবং আল্লাহর দ্বীনকে ত্যাগ করতে পারেন না। তিনি তো আল্লাহ এবং আল্লাহর দ্বীনকে নিজের জীবনের চাইতে অনেক ভালোবাসেন। কাফেরেরা তাকে অগ্নিকুণ্ডে নিক্ষেপ করার জন্য নিয়ে গেল। তিনি তাদের কাছে নত হননি। জীবন ভিক্ষা চাননি। জীবন বাঁচাবার জন্য নিজের দ্বীন এবং ঈমান ত্যাগ করেননি। নিশ্চিত মনে আল্লাহর ওপর ভরসা করে তিনি অগ্নিকুণ্ডের দিকে এগিয়ে গেলেন। ওরা তাকে নিষ্ঠুরভাবে নিক্ষেপ করলো নিজেদের তৈরি করা নরকে। আল্লাহ ইব্রাহিমের প্রতি পরম খুশি হয়ে আগুনকে বলে দিলেন-

قُلْنَا يَا نَارُ كُونِي بَرْدًا وَسَلَامًا عَلَى إِبْرَاهِيمَ .
অর্থাৎ, আমি বললাম, 'হে আগুন, তুমি শীতল ও নিরাপদ হয়ে যাও ইবরাহীমের জন্য।' (সূরা আম্বিয়া: ৬৯)

এভাবে আল্লাহর নির্দেশে আগুন ঠাণ্ডা ও শীতল হয়ে গেল। আর ইব্রাহিম (আ.) তার ধৈর্যের পরীক্ষায় উত্তীর্ণ হলেন।

স্ত্রী-পুত্রের মাধ্যমে পরীক্ষা
ইব্রাহিম (আ.) বৃদ্ধ বয়সে উপনীত হয়েছেন, কিন্তু তার কোনো সন্তানাদি নেই। স্ত্রী সারাহ ছিলেন একজন বন্ধ্যা মহিলা। তার কোনো সন্তানাদি হতো না। ইব্রাহিম আল্লাহর কাছে দোয়া করেন:

رَبِّ هَبْ لِي مِنَ الصَّالِحِينَ
অর্থাৎ, 'হে আমার রব, আমাকে সৎকর্মশীল সন্তান দান করুন'। (সূরা আস-সফফাত: ১০০)

পরম দয়াময় আল্লাহ তায়ালা তার দোয়া কবুল করেন। স্ত্রী হাজেরার ঘরে তার এক সুন্দর ফুটফুটে ছেলের জন্ম হয়। তিনি পুত্রের নাম রাখেন ইসমাঈল। বৃদ্ধ বয়সে শিশুপুত্রের হাসিতে তার মন ভরে ওঠে। কিন্তু এই পুত্রের ভালোবাসা নিয়েও আল্লাহ তাকে পরীক্ষায় ফেলেন। আল্লাহ তাকে পরীক্ষা করে চান, তিনি পুত্রের ভালোবাসার চাইতে আল্লাহর হুকুম পালন করাকে বড় জানেন কি না?

আল্লাহ তায়ালা ইব্রাহিম (আ.) কে নির্দেশ দিলেন তার পুত্র ইসমাঈল ও তার মা হাজেরাকে মক্কার জনমানব ও ফল পানি শস্যহীন মরুভূমিতে রেখে আসার জন্য। কিন্তু ইব্রাহিম যে আল্লাহকে সবার চেয়ে বেশি ভালোবাসেন। তিনি যে জানেন আল্লাহর হুকুম অমান্য করা যায়না। তাই তো তিনি হাজেরা আর শিশুপুত্র ইসমাঈলকে নিয়ে শত শত মাইল পথ পাড়ি দিয়ে মক্কায় এসে উপস্থিত হন। আল্লাহর নির্দেশে তিনি তাদের একটি নির্দিষ্ট স্থানে রেখে যান। হাজেরাকে বলে যান, আমি আল্লাহর হুকুমে তোমাদের এখানে রেখে গেলাম। হাজেরাকে কিছু খাদ্য ও এক মশক পানি দিয়ে আসেন। এভাবে প্রশান্ত সমুদ্রের মতো প্রশস্ত হৃদয় আর হিমালয়ের মতো অটল ধৈর্যশীল ইব্রাহিম আল্লাহ প্রদত্ত পরীক্ষায় বিজয়ী হলেন।

📘 সবরের পুরস্কার 📄 হযরত মূসা (আ.) ধৈর্যধারণ

📄 হযরত মূসা (আ.) ধৈর্যধারণ


হযরত মূসা (আ.) ছিলেন যেমন আল্লাহর একজন সম্মানিত নবী তেমনি তিনি ছিলেন একজন ধৈর্যশীল বান্দা। অন্যান্য নবীদের পরীক্ষা হয়েছে সাধারণত নবুয়াত লাভের পরে। কিন্তু মূসা (আ.) এর পরীক্ষা শুরু হয়েছে তার জন্মলাভের পর থেকেই। বস্তুত নবুয়াত প্রাপ্তির পূর্বে ও পরে তার জীবনে বহু পরীক্ষার সম্মুখীন হয়েছেন। যেমন কুরআনে আল্লাহ তায়ালা মূসা (আ.) সম্পর্কে বলছেন- إِذْ تَمْشِي أُخْتُكَ فَتَقُولُ هَلْ أَدُلُّكُمْ عَلَى مَنْ يَكْفُلُهُ فَرَجَعْنَاكَ إِلَى أُمِّكَ كَيْ تَقَرَّ عَيْنُهَا وَلَا تَحْزَنَ وَقَتَلْتَ نَفْسًا فَنَجَّيْنَاكَ مِنَ الْغَمِّ وَفَتَنَّاكَ فُتُونًا فَلَبِثْتَ سِنِينَ فِي أَهْلِ مَدْيَنَ ثُمَّ جِئْتَ عَلَى قَدَرٍ يَا مُوسَى .
অর্থাৎ, যখন তোমার বোন (সিন্দুকের সাথে সাথে) চলছিল। অতঃপর সে গিয়ে বলল, 'আমি কি তোমাদেরকে এমন একজনের সন্ধান দেব, যে এর দায়িত্বভার নিতে পারবে'? অতঃপর আমি তোমাকে তোমার মায়ের নিকট ফিরিয়ে দিলাম; যাতে তার চোখ জুড়ায় এবং সে দুঃখ না পায়। আর তুমি এক ব্যক্তিকে হত্যা করেছিলে। তখন আমি তোমাকে মনোবেদনা থেকে মুক্তি দিলাম এবং তোমাকে আমি বিভিন্নভাবে পরীক্ষা করেছি। অতঃপর তুমি কয়েক বছর মাদইয়ানবাসীর মধ্যে অবস্থান করেছ। হে মূসা, তারপর নির্ধারিত সময়ে তুমি এসে উপস্থিত হলে'। (সূরা ত্বহা: ৪০)

এত পরীক্ষা এত কষ্ট সত্ত্বেও তিনি কখনো আল্লাহর ওপর থেকে আস্থা হারিয়ে ফেলেননি বরং ধৈর্যের সাথে সকল পরীক্ষা ও কষ্ট অতিক্রম করে আল্লাহর খাটি বান্দাতে পরিণত হয়েছেন।

মাদায়েনে হিজরতের সময় ধৈর্যধারণ
ফেরআউনের ঘরে মূসা (আ.) ক্রমেই বেড়ে উঠতে লাগলেন। শৈশব থেকে কৈশোরে, কৈশোর থেকে তারুণ্যে, তারুণ্য থেকে যৌবনে পদার্পণ করলেন। যৌবন প্রাপ্তির পর থেকে মূসা (আ.) একা একা শহরে ঘুরে বেড়াতেন জনগণের অবস্থা দেখার জন্য।

একদিন তিনি দেখলেন জনমানবশূন্য রাস্তায় দুটি লোক মারামারি করছে। তাদের একজন ছিল বনি ইসরাঈল আর অন্যজন কিবতি। মূসা (আ.) কে দেখেই ইসরাঈলি লোকটি মূসার নিকট সাহায্য চাইলো। কিবতি লোকটি খুব বাড়াবাড়ি করছে দেখে মূসা (আ.) তাকে থামাতে গিয়ে একটা চড় মারলেন। মূসা (আ.) ছিলেন খুব শক্তিশালী। চড় খেয়ে কিবতি লোকটি মৃত্যুমুখে পতিত হলো। আসলে মূসা (আ.) লোকটিকে হত্যা করতে চাননি বরং তিনি তাদের মারামারি থামাতে চেয়েছিলেন। এ ঘটনায় মূসা (আ.) খুব লজ্জিত ও ব্যথিত হলেন। তিনি সাথে সাথে আল্লাহর নিকট প্রার্থনা করলেন এই বলে-
قَالَ رَبِّ بِمَا أَنْعَمْتَ عَلَيَّ فَلَنْ أَكُونَ ظَهِيرًا لِّلْمُجْرِمِينَ .
অর্থাৎ, মূসা বলল, 'হে আমার রব, আপনি যেহেতু আমার প্রতি নিয়ামত দান করেন, তাই আমি কখনো আর অপরাধীদের সাহায্যকারী হব না। (সূরা কাসাস: ১৭)

আল্লাহ তায়ালা মূসা (আ.) এর দোয়া কবুল করলেন এবং তাকে ক্ষমা করে দিলেন। পরদিন সকালে ভয় ও শঙ্কা নিয়ে মূসা (আ.) ঘর থেকে বের হলেন। কারণ সরকারি লোকেরা চারদিকে কালকের হত্যাকারী কে খুঁজে বেড়াচ্ছে। মূসা (আ.) ভোর বিহানে চিন্তাগ্রস্ত মনে পথ চলছেন। কিন্তু যেখানে বাঘের ভয় সেখানেই রাত পোহায়। আবার সেই বনি ইসরাঈলি লোকটির সাথে দেখা। তখনও সেই লোকটি অন্য একটি কিবতি লোকের সাথে ঝগড়ায় লিপ্ত। গতদিনের মতো আজও মূসা কে দেখে লোকটি মূসার সাহায্য চাইলো। তখন মূসা (আ.) বললো, তুমি তো দেখছি বড় বিভ্রান্ত লোক এ বলে তিনি তাকে ধমক দিলেন। ধমক খেয়ে ইসরাঈল লোকটি মনে করলো মূসা বুঝি তাকেই মারতে আসছে। ফলে সে চিৎকার দিয়ে বলে উঠলো : মূসা তুমি কি আজ আমাকেও সেভাবে হত্যা করতে চাও, যেভাবে কাল একজনকে হত্যা করেছিলে? তুমি তো দেখছি বড় স্বৈরাচারী সংশোধনকামী নও।

একথা শুনার সাথে সাথে কিবতি লোকটি দে ছুট। এক দৌড়ে সে ছুটে এলো ফেরাউনের কাছে। সে বলে দিল কালকের লোকটিকে মূসা হত্যা করেছে এবং সে বনি ইসরাঈলের লোক। আর যায় কোথায়? ফেরাউন তার রক্ষী বাহিনীকে নির্দেশ দিল যেখানে পাও মূসাকে ধর এবং তাকে হত্যা কর। রাজার এ নির্দেশ শুনার সাথে সাথে মূসা (আ.) এর এক ভক্ত প্রাসাদের কর্মকর্তা মূসা (আ.) নিকট আসলো এবং বললো: মূসা দেশের কর্তারা তোমাকে হত্যা করার পরামর্শ করছে। তুমি এখনি ফেরাউনের রাজ্য ছেড়ে চলে যাও। খবরটা শুনেই মূসা (আ.) পাশ্ববর্তী রাজ্য মাদইয়ানের উদ্দেশ্যে যাত্রা করলেন। ইতিপূর্বে যেহেতু তিনি রাজপুত্রের ন্যায় জীবন যাপন করেছেন, তাই এই সফর তার নিকট খুবই কঠিন ছিল। এজন্য তিনি আল্লাহর নিকট আশ্রয় চাইলেন এই বলে-
وَلَمَّا تَوَجَّهَ تِلْقَاءَ مَدِّينَ قَالَ عَسَى رَبِّي أَن يَهْدِيَنِي سَوَاءَ السَّبِيلِ
অর্থাৎ, আর যখন মূসা মাদইয়ান অভিমুখে রওনা করল, তখন বলল, 'আশা করি আমার রব আমাকে সঠিক পথ প্রদর্শন করবেন'। (সূরা কাসাস: ২২)

সীমান্ত প্রহরীদের হাতে যেন ধরা না পড়েন, সে জন্যে খুব সতর্কভাবে সীমান্ত পার হলেন। একাধারে আট দিন হাঁটার পর মাদইয়ানের নিরাপদ এলাকায় এসে পৌঁছলেন। তখন তিনি খুবই ক্লান্ত-শ্রান্ত এবং ক্ষুধার্ত অবস্থায় একটি গাছের ছায়ার নিচে বসে পড়েন। মিসর থেকে মাদইয়ান পর্যন্ত তিনি দৌঁড়িয়ে পালিয়ে এসেছিলেন। তাই তার পায়ে ফোসকা উঠে গিয়েছিল। খাওয়ার কোনো দ্রব্য তার সাথে ছিল না। গাছের পাতা, ঘাস ইত্যাদি তিনি ভক্ষণ করেছিলেন। পেট তার পিঠের সাথে লেগে গিয়েছিল। ঐ সময় তিনি আধখানা খেজুরেরও মুখাপেক্ষী ছিলেন। এ সময় মূসা (আ.) ধৈর্যধারণ করেছিলেন এবং নিজেকে সম্পূর্ণরূপে স্বীয় পালনকর্তা আল্লাহর ওপরে সমর্পণ করেছিলেন ও প্রত্যাশা করেছিলেন নিশ্চয়ই আমার পালনকর্তা আমাকে সরল পথ দেখাবেন।
قَالَ ذَلِكَ بَيْنِي وَبَيْنَكَ أَيُّمَا الْأَجَلَيْنِ قَضَيْتُ فَلَا عُدْوَانَ عَلَيَّ وَاللَّهُ عَلَى مَا نَقُولُ وَكِيلٌ .
অর্থাৎ, মূসা বলল, 'এ চুক্তি আমার ও আপনার মধ্যে রইল। দু'টি মেয়াদের যেটিই আমি পূরণ করি না কেন, তাতে আমার বিরুদ্ধে অভিযোগ থাকবে না। আর আমরা যে বিষয়ে কথা বলছি, আল্লাহ তার সাক্ষী'। (সূরা কাসাস : ২৮)

অতএব আল্লাহ তায়ালা তার দোয়া কবুল করলেন। এবং মাদাইয়ানের মতো অপরিচিত রাজ্যে সসম্মানের সাথে সেখানে বসবাসের ব্যবস্থা করে দিলেন।

মু'জেযা যাদুর লড়াই ও ঈমানদারদের ধৈর্যধারণ
মূসা (আ.) তার স্ত্রী ও পরিবার নিয়ে মিসরে ফিরে আসলেন। তিনি আল্লাহর পক্ষ থেকে নবুয়াত লাভ করলেন ও দুটি নিদর্শন লাভ করলেন। এরপর তিনি আল্লাহর নির্দেশে ফেরআউনকে আল্লাহর একত্ববাদের দাওয়াত পেশ করলেন। কিন্তু অত্যাচারী ফেরআউন কিছুতেই তার দাওয়াত গ্রহণ করলো না বরং সে মূসা (আ.) কে কারাগারে নিক্ষেপের হুমকি দিল। তখন মূসা (আ.) আল্লাহর নিকট থেকে প্রেরিত দুটি নিদর্শন দেখালেন। তাদের মধ্যে একটি হচ্ছে মূসা (আ.) তার হাতের লাঠি মাটিতে নিক্ষেপ করলেন। সাথে সাথে লাঠি বিরাট অজগরে পরিণত হলো। তারপর সেটাকে ধরে ফেললেন এবং তা পুনরায় লাঠি হয়ে গেলো। অন্যটি হচ্ছে বগলের ভিতর থেকে হাত টেনে বের করলেন, সাথে সাথে তা জ্যোতির্ময় হয়ে উঠলো। এই অলৌকিক ঘটনা দেখে ফেরাউন হতভম্ব হয়ে গেলো। উপস্থিত লোকদের বলে উঠলো এতো জাদু! মূসা নিশ্চয়ই একজন দক্ষ জাদুকর হয়ে এসেছে। জাদু দিয়ে সে তোমাদেরকে নিজেদের মাতৃভূমি থেকে তাড়িয়ে দিতে চাইছে। এ সম্পর্কে কুরআন বলছে-
মূসা বলল, 'হে ফিরআউন, আমি তো সকল সৃষ্টির রবের পক্ষ থেকে রাসূল।' সমীচীন যে, আমি আল্লাহ সম্পর্কে সত্য ছাড়া বলব না। আমি তোমাদের রবের নিকট থেকে স্পষ্ট প্রমাণ নিয়ে তোমাদের কাছে এসেছি। সুতরাং তুমি বনী ইসরাঈলকে আমার সাথে পাঠিয়ে দাও।' সে বলল, 'তুমি যদি কোনো আয়াত নিয়ে আস, তবে তা পেশ কর, যদি তুমি সত্যবাদীদের অন্তর্ভুক্ত হও। তখন সে ছেড়ে দিল তার লাঠি। তৎক্ষণাৎ তা এক স্পষ্ট অজগর হয়ে গেল। আর সে বের করল তার হাত, তৎক্ষণাৎ তা দর্শকদের কাছে ধবধবে সাদা (দেখাচ্ছিল)। ফিরআউনের সম্প্রদায়ের সভাসদরা বলল, 'নিশ্চয় এ হলো বিজ্ঞ জাদুকর 'সে তোমাদেরকে তোমাদের দেশ থেকে বের করতে চায়। সুতরাং তোমরা কী নির্দেশ দেবে?'। (সূরা আরাফ: ১০৪-১১০)

ফেরাউন তার সঙ্গী-সাথীদের সাথে পরামর্শ করলো যে, যাদু দিয়েই মূসাকে পরাজিত করতে হবে। মিসরে যেসব বিখ্যাত যাদুকর ছিল, যারা বিশ্ববিখ্যাত, তাদের সকলকে একত্রিত করা হলো এবং মু'জেযা আর যাদুর প্রতিযোগিতার আয়োজন করা হলো। (এখানে সংক্ষেপে বলে রাখি মু'জিযা অর্থ হচ্ছে মানুষের বুদ্ধিকে অক্ষমকারী। অর্থাৎ এমন কর্ম সংঘঠিত হওয়া যা মানুষের জ্ঞান ও ক্ষমতাবহির্ভূত। মু'জিযা কেবল নবীদের জন্য খাছ। যা নবীদের মাধ্যমে আল্লাহর পক্ষ থেকে হয়। পক্ষান্তরে যাদু কেবল দুষ্ট জিন ও মানুষের মাধ্যমেই হয়ে থাকে এবং তা হয় অদৃশ্য প্রাকৃতিক কারণের প্রভাবে। যাদু কেবল পৃথিবীতেই ক্রিয়াশীল হয়, আসমানে নয়। যাদু স্রেফ ভেল্কিবাজি ও প্রতারণা মাত্র। যাদুতে মানুষের বুদ্ধি বিভ্রাট ঘটে। যা মানুষকে প্রতারিত করে। এজন্য ইসলাম একে নিষিদ্ধ করেছে।) অবশেষে প্রতিযোগিতার দিন চলে এলো। দলে দলে মানুষ উপস্থিত হতে লাগলো প্রতিযোগিতা দেখার জন্য। মঞ্চে একদিকে উপস্থিত হযরত মূসা (আ.) ও তার ভাই হারুন (আ.) আর অন্যদিকে মিসরের শ্রেষ্ঠ যাদুকর দল।

প্রতিযোগিতা শুরু হলো। যাদুকরেরা উৎসাহিত হয়ে মূসাকে বলল: হে মূসা তুমি নিক্ষেপ কর, না হয় আমরা প্রথমে নিক্ষেপ করি। মূসা (আ.) বললেন তোমরাই নিক্ষেপ কর। অতঃপর তারা তাদের রশি ও লাঠি নিক্ষেপ করলো। তখন লোকদের চোখগুলোকে ধাঁধিয়ে দিল এবং তাদের ভীত-সন্ত্রস্ত করে তুলল ও এক মহাযাদু প্রদর্শন করল। তাদের যাদুর প্রভাবে মূসার মনে হলো যেন তাদের রশিগুলো ও লাঠিগুলো সাপের ন্যায় ছুটাছুটি করছে। তাতে মূসার মনে কিছুটা ভীতির সঞ্চার হলো। এমতাবস্থায় আল্লাহ অহি নাযিল করে মূসা (আ.) কে অভয় দিয়ে বললেন-
قُلْنَا لَا تَخَفْ إِنَّكَ أَنتَ الْأَعْلَىٰ ، وَأَلْقِ مَا فِي يَمِينِكَ تَلْقَفْ مَا صَنَعُوا ۖ إِنَّمَا صَنَعُوا كَيْدُ سَاحِرٍ ۖ وَلَا يُفْلِحُ السَّاحِرُ حَيْثُ أَتَىٰ
অর্থাৎ, আমি বললাম, 'তুমি ভয় পেয়ো না, নিশ্চয় তুমিই বিজয়ী হবে'। 'আর তোমার ডান হাতে যা আছে, তা ফেলে দাও। তারা যা করেছে, এটা সেগুলো গ্রাস করে ফেলবে। তারা যা করেছে, তা তো কেবল যাদুকরের কৌশল। আর যাদুকর যেখানেই আসুক না কেন, সে সফল হবে না'। (সূরা ত্বহা: ৬৮-৬৯)

তারপর মূসা (আ.) আল্লাহর নামে তার লাঠি নিক্ষেপ করলেন। দেখা গেল তা বিরাট অজগর সাপের ন্যায় রূপ ধারণ করল এবং যাদুকরদের সমস্ত অলীক কীর্তিগুলোকে গ্রাস করতে লাগল। এদৃশ্য দেখে যুগশ্রেষ্ঠ যাদুকরগণ বুঝে নিল যে মূসার এ যাদু আসলে যাদু নয়। কেননা যাদুর সর্বোচ্চ বিদ্যা তাদের কাছেই রয়েছে। এটা যাদু হতে পারে না। নিশ্চয়ই এর মধ্যে অলৌকিক কোনো সত্তার নিদর্শন রয়েছে, যা আয়ত্ত করা মানুষের ক্ষমতার বাইরে। এ সময় মূসা (আ.)-এর দেয়া তাওহীদের দাওয়াত ও আল্লাহর গযবের ভীতি তাদের অন্তরে প্রভাব বিস্তার করল। অতঃপর সত্য প্রতিষ্ঠিত হলো এবং বাতিল হয়ে গেল তাদের সমস্ত যাদুকর্ম। এভাবে তারা সেখানে পরাজিত হলো এবং লজ্জিত হয়ে ফিরে গেল। তারপর যাদুকররা সাজদায় পড়ে গেল এবং বলে উঠলো আমরা বিশ্বচরাচরের পালনকর্তার ওপরে বিশ্বাস স্থাপন করলাম যিনি মূসা ও হারূনের রব। কুরআন এ সম্পর্কে বলছে-
وَأُلْقِيَ السَّحَرَةُ سَاجِدِينَ * قَالُوا آمَنَّا بِرَبِّ الْعَالَمِينَ .
অর্থাৎ, আর যাদুকররা সাজদায় পড়ে গেল। তারা বলল, 'আমরা সকল সৃষ্টির রবের প্রতি ঈমান আনলাম। (সূরা আরাফ: ১২০-১২১)

فَأُلْقِيَ السَّحَرَةُ سَاجِدِينَ . قَالُوا آمَنَّا بِرَبِّ الْعَالَمِينَ * رَبِّ مُوسَى وَهَارُونَ .
অর্থাৎ, ফলে যাদুকররা সাজদাবনত হয়ে পড়ল। তারা বলল, 'আমরা ঈমান আনলাম সকল সৃষ্টির রবের প্রতি'। 'মূসা ও হারুনের রব। (সূরা শোয়ারা: ৪৬-৪৮)

فَأُلْقِيَ السَّحَرَةُ سُجَّدًا قَالُوا آمَنَّا بِرَبِّ هَارُونَ وَمُوسَى .
অর্থাৎ, অতঃপর যাদুকরেরা সাজদায় লুটিয়ে পড়ল। তারা বলল, 'আমরা হারূন ও মূসার রবের প্রতি ঈমান আনলাম'। (সূরা ত্বহা: ৭০)

পরাজয়ের এ দৃশ্য দেখে ভীত-বিহ্বল ফেরাউন নিজেকে সামলে নিয়ে উপস্থিত লাখো জনতার মনোবল চাঙ্গা রাখার জন্য যাদুকরদের উদ্দেশ্যে বলে উঠলো-
قَالَ فِرْعَوْنُ آمَنتُم بِهِ قَبْلَ أَنْ آذَنَ لَكُمْ إِنَّ هَذَا لَمَكْرٌ مَّكَرْتُمُوهُ فِي الْمَدِينَةِ لِتُخْرِجُوا مِنْهَا أَهْلَهَا فَسَوْفَ تَعْلَمُونَ .
অর্থাৎ, ফিরআউন বলল, 'আমি তোমাদেরকে অনুমতি দেয়ার আগে তোমরা তার প্রতি ঈমান আনলে! নিশ্চয় এটা এমন এক চক্রান্ত যা তোমরা শহরে করেছ, সেখান থেকে তার অধিবাসীকে বের করার জন্য। সুতরাং তোমরা অচিরেই জানতে পারবে।' (সূরা আরাফ: ১২৩)

ফিরআউন বলল, 'কী, আমি তোমাদেরকে অনুমতি দেয়ার আগেই তোমরা তার প্রতি ঈমান আনলে? নিশ্চয় সেই তোমাদের প্রধান, যে তোমাদেরকে যাদু শিখিয়েছে। সুতরাং আমি অবশ্যই তোমাদের হাত ও পা বিপরীত দিক থেকে কেটে ফেলব এবং আমি তোমাদেরকে খেজুর গাছের কাণ্ডে শূলিবিদ্ধ করবই। আর তোমরা অবশ্যই জানতে পারবে, আমাদের মধ্যে কার আযাব বেশি কঠোর এবং বেশি স্থায়ী। (সূরা ত্বহা: ৭১)

অতঃপর সম্রাটসুলভ হুমকি দিয়ে বলল,
قَالَ آمَنتُمْ لَهُ قَبْلَ أَنْ آذَنَ لَكُمْ إِنَّهُ لَكَبِيرُكُمُ الَّذِي عَلْمَكُمُ السِّحْرَ فَلَسَوْفَ تَعْلَمُونَ لَأَقَطِّعَنَّ أَيْدِيَكُمْ وَأَرْجُلَكُم مِّنْ خِلَافٍ وَلَأُصَلِّبَنَّكُمْ أَجْمَعِينَ .
অর্থাৎ, ফিরআউন বলল, 'আমি তোমাদেরকে অনুমতি দেয়ার পূর্বেই তোমরা তার প্রতি ঈমান আনলে? নিশ্চয় সে তোমাদের গুরু যে তোমাদের যাদু শিক্ষা দিয়েছে। অতএব অচিরেই তোমরা জানতে পারবে। আমি অবশ্যই তোমাদের হাতসমূহ ও তোমাদের পা-সমূহ বিপরীত দিক থেকে কেটে ফেলব এবং অবশ্যই তোমাদের সকলকে শূলিবিদ্ধ করব'। (সূরা শোয়ারা: ৪৯)

জবাবে যাদুকররা বলল,
قَالُوا لَا ضَيْرَ إِنَّا إِلَى رَبِّنَا مُنقَلِبُونَ • إِنَّا نَطْمَعُ أَن يَغْفِرَ لَنَا رَبُّنَا خَطَايَانَا أَن كُنَّا أَوَّلَ الْمُؤْمِنِينَ .
অর্থাৎ, তারা বলল, 'কোনো ক্ষতি নেই তাতে। অবশ্যই আমরা তো আমাদের রবের দিকেই ফিরে যাব।' আমরা আশা করি যে, আমাদের রব আমাদের অপরাধসমূহ ক্ষমা করে দেবেন, কারণ আমরা মুমিনদের মধ্যে প্রথম।' (সূরা শোয়ারা: ৫০-৫১)

যাদুকরদের দীপ্ত ঈমানের বলিষ্ঠতা দেখে বেশ কিছু যুবকের অন্তরে ঈমানের আলো প্রজ্জ্বলিত হলো। তারা ঈমানের ঘোষণা দিয়ে মূসার সাথী হয়ে গেল। তাদের ওপর শুরু হলো নির্যাতন। মূসার বংশের লোক হবার কারণে গোটা বনি ইসরাঈলের ওপরও নির্যাতন নেমে আসে। শত অত্যাচার সত্ত্বেও মূসা (আ.) কে তারা তার দাওয়াত থেকে নিবৃত্ত করতে পারলো না। তাদের অব্যাহত তৎপরতা দেখে ফেরাউনের পরিষদবর্গ তাকে বললো:
وَقَالَ الْمَلَأُ مِن قَوْمِ فِرْعَوْنَ أَتَذَرُ مُوسَىٰ وَقَوْمَهُ لِيُفْسِدُوا فِي الْأَرْضِ وَيَذَرَكَ وَالِهَتَكَ ۖ قَالَ سَنُقَتِّلُ أَبْنَاءَهُمْ وَنَسْتَحْيِي نِسَاءَهُمْ ۚ وَإِنَّا فَوْقَهُمْ قَاهِرُونَ .
অর্থাৎ, আর ফিরআউনের কওমের সভাসদগণ বলল, 'আপনি কি মূসা ও তার কওমকে ছেড়ে দেবেন, যাতে তারা যমীনে ফাসাদ করে এবং আপনাকেও আপনার উপাস্যগুলোকে বর্জন করে?' সে বলল, 'আমরা অতিসত্বর তাদের ছেলেদেরকে হত্যা করব আর মেয়েদেরকে জীবিত রাখব। আর নিশ্চয় আমরা তাদের ওপর ক্ষমতাবান।' (সূরা আরাফ: ১২৭)

ফেরাউন ঘোষণা করে দিলো : ওদের পুত্রদের হত্যা কর আর কন্যাদের জীবত রাখ। তারা দেখে নিক, আমি কতটা শক্তিশালী।

নির্যাতনে নিষ্পিষ্ট হতে হতে মূসা (আ.) এর অনুসারীরা বিচলিত হয়ে উঠলো। ফেরাউন বনু ইসরাঈলের ওপর যে যুলুম করেছিল তা হচ্ছে- ১. তাদের নবজাতক পুত্র সন্তানদের হত্যার নির্দেশ জারি। ২. ইবাদত গৃহসমূহ ধ্বংস করা। ৩. ফেরাউন তাদেরকে হিজরতে বাধা প্রদান করতো। ৪. জেল-জুলুম হত্যার পাশাপাশি ফেরাউন তাদেরকে ধর্মবিরোধী ও সমাজবিরোধী হিসেবে আখ্যায়িত করতো।

মূসা (আ.) ফেরাউনের এই জুলুম নির্যাতন থেকে বাঁচার জন্য তার স্বীয় ভীত- সন্ত্রস্ত কওমকে মূলত দুটি বিষয়ে উপদেশ প্রদান করেন। ১. শত্রুর মোকাবেলায় আল্লাহর সাহায্য প্রার্থনা করা এবং ২. আল্লাহর সাহায্য না আসা পর্যন্ত সাহসের সাথে ধৈর্য ধারণ করা। যেমন কুরআন বলছে-
قَالَ مُوسَىٰ لِقَوْمِهِ اسْتَعِينُوا بِاللَّهِ وَاصْبِرُوا ۖ إِنَّ الْأَرْضَ لِلَّهِ يُورِثُهَا مَن يَشَاءُ مِنْ عِبَادِهِ ۖ وَالْعَاقِبَةُ لِلْمُتَّقِينَ .
অর্থাৎ, মূসা তার কওমকে বলল, 'আল্লাহর কাছে সাহায্য চাও এবং ধৈর্যধারণ কর। নিশ্চয় যমীন আল্লাহর। তাঁর বান্দাদের মধ্যে যাকে তিনি চান তাকে তার উত্তরাধিকারী বানিয়ে দেন। আর পরিণাম মুত্তাকীদের জন্য।' (সূরা আরাফ: ১২৮)

এরপর মূসা ও হারূন (আ.) আল্লাহর নিকট ফেরাউনের বিরুদ্ধে বদদোয়া করলেন এভাবে-
وَقَالَ مُوسَىٰ رَبَّنَا إِنَّكَ آتَيْتَ فِرْعَوْنَ وَمَلَأَهُ زِينَةً وَأَمْوَالًا فِي الْحَيَاةِ الدُّنْيَا رَبَّنَا لِيُضِلُّوا عَن سَبِيلِكَ ۖ رَبَّنَا اطْمِسْ عَلَىٰ أَمْوَالِهِمْ وَاشْدُدْ عَلَىٰ قُلُوبِهِمْ فَلَا يُؤْمِنُوا حَتَّىٰ يَرَوُا الْعَذَابَ الْأَلِيمَ ۖ قَالَ قَدْ أُجِيبَت دَعْوَتُكُمَا فَاسْتَقِيمَا وَلَا تَتَّبِعَانِّ سَبِيلَ الَّذِينَ لَا يَعْلَمُونَ .
অর্থাৎ, আর মূসা বলল, 'হে আমাদের রব, আপনি ফিরআউন ও তার পরিষদবর্গকে দুনিয়াবী জীবনে সৌন্দর্য ও ধন-সম্পদ দান করেছেন। হে আমাদের রব, যাতে তারা আপনার পথ থেকে গোমরাহ করতে পারে। হে আমাদের রব, তাদের ধন-সম্পদ নিশ্চিহ্ন করে দিন, তাদের অন্তরসমূহকে কঠোর করে দিন। ফলে তারা ঈমান আনবে না, যতক্ষণ না যন্ত্রণাদায়ক আযাব দেখে'। তিনি বললেন, 'তোমাদের দোয়া কবুল করা হয়েছে। সুতরাং তোমরা দৃঢ় থাক এবং যারা জানে না তাদের পথ অনুসরণ করো না'। (সূরা ইউনুস: ৮৮-৮৯)

মূসা ও হারূনের উপরিউক্ত দোয়া আল্লাহ কবুল করলেন। কিন্তু তার বাস্তবায়ন সঙ্গে সঙ্গে করলেন না। বরং সময় নিলেন নূন্যতম বিশ বছর। এরূপ প্রলম্বিত কর্মপদ্ধতির মাধ্যমে আল্লাহ মাযলূমের ধৈর্য পরীক্ষার সাথে সাথে যালেমেরও পরীক্ষা নিয়ে থাকেন এবং তাদের তাওবা করার ও হেদায়াত প্রাপ্তির সুযোগ দেন। যাতে পরে তাদের জন্য ওযর পেশ করার কোনো সুযোগ না থাকে। যেমন আল্লাহ বলেন-
فَإِذَا لَقِيتُمُ الَّذِينَ كَفَرُوا فَضَرْبَ الرِّقَابِ حَتَّى إِذَا أَثْخَنَتُمُوهُمْ فَشُدُّوا الْوَثَاقَ فَإِمَّا مَنَّا بَعْدُ وَإِمَّا فِدَاءً حَتَّى تَضَعَ الْحَرْبُ أَوْزَارَهَا ذَلِكَ وَلَوْ يَشَاءُ اللَّهُ لَانتَصَرَ مِنْهُمْ وَلَكِن لَّيَبْلُوَ بَعْضَكُم بِبَعْضٍ وَالَّذِينَ قُتِلُوا فِي سَبِيلِ اللَّهِ فَلَن يُضِلَّ أَعْمَالَهُمْ .
অর্থাৎ, অতএব তোমরা যখন কাফিরদের সাথে যুদ্ধে অবতীর্ণ হও, তখন তাদের ঘাড়ে আঘাত কর। পরিশেষে তোমরা যখন তাদেরকে সম্পূর্ণভাবে পর্যুদস্ত করবে তখন তাদেরকে শক্তভাবে বেঁধে নাও। তারপর হয় অনুগ্রহ না হয় মুক্তিপণ আদায়, যতক্ষণ না যুদ্ধ তার বোঝা রেখে দেয়। এটাই বিধান। আর আল্লাহ ইচ্ছা করলে তাদের কাছ থেকে প্রতিশোধ গ্রহণ করতে পারতেন, কিন্তু তিনি তোমাদের একজনকে অন্যের দ্বারা পরীক্ষা করতে চান। আর যারা আল্লাহর পথে নিহত হয়, তিনি কখনো তাদের আমলসমূহ বিনষ্ট করবেন না। (সূরা মুহাম্মদ: ৪)

সর্বশেষ কঠিন পরীক্ষা ও মূসা (আ.) এর দৃঢ়তা
ফেরাউন যখন মূসা (আ.) ও তার অনুসারীদের আর কিছুতেই সহ্য করতে পারলো না, এমনকি সে মূসা (আ.) কে হত্যা করার জন্য মরিয়া হয়ে উঠলো। এখানে আল্লাহর পক্ষ থেকে নির্দেশ এলো -
فَأَسْرِ بِعِبَادِي لَيْلًا إِنَّكُم مُتَّبَعُونَ •
অর্থাৎ, (আল্লাহ বললেন) 'তাহলে আমার বান্দাদের নিয়ে রাতে বেরিয়ে পড়; নিশ্চয় তোমাদের পশ্চাদ্ধাবন করা হবে'। (সূরা দুখান: ২৩)
وَأَوْحَيْنَا إِلَى مُوسَى أَنْ أَسْرِ بِعِبَادِي إِنَّكُم مُّتَّبَعُونَ .
অর্থাৎ, আর আমি মূসার প্রতি এ মর্মে ওহী পাঠিয়েছিলাম যে, 'আমার বান্দাদের নিয়ে রাত্রিকালে যাত্রা শুরু কর, নিশ্চয়ই তোমাদের পিছু নেয়া হবে।' (সূরা শোয়ারা: ৫২)
وَلَقَدْ أَوْحَيْنَا إِلَى مُوسَى أَنْ أَسْرِ بِعِبَادِي فَاضْرِبْ لَهُمْ طَرِيقًا فِي الْبَحْرِ يَبَسًا لَّا تَخَافُ دَرَكًا وَلَا تَخْشَى .
অর্থাৎ, আর আমি অবশ্যই মূসার কাছে ওহী প্রেরণ করেছিলাম যে, 'আমার বান্দাদেরকে নিয়ে রাতের বেলায় রওনা হও। অতঃপর সজোরে আঘাত করে তাদের জন্য শুকনো রাস্তা বানাও। পেছন থেকে ধরে ফেলার আশঙ্কা করো না এবং ভয়ও করো না'। (সূরা ত্বহা: ৭৭)

আল্লাহর আদেশ শিরোধার্য। হযরত মূসা (আ.) মুসলমানদের ঘরে ঘরে সংগোপনে খবর পাঠিয়ে দিলেন হিজরত করার প্রস্তুতি নিতে। নির্দিষ্ট রাতের নির্দিষ্ট সময় মূসা (আ.) ও তার সাথীরা একত্রিত হলো। তারপর আল্লাহর নবী মূসার নেতৃত্বে দলেবলে তারা এগিয়ে চললেন ফিলিস্তিনের সিনাই ভূ-খণ্ড অভিমুখে। কিন্তু সামনেই লোহিত সাগর। এ সাগর পাড়ি দিয়েই ওপারে যেতে হবে তাদের। এদিকে ফেরাউনও বসে নেই সে তার সৈন্যসামন্ত নিয়ে মূসা ও তার সাথীদের আক্রমণ করার জন্য বেরিয়ে পড়ল।

মূসা (আ.) এর নবুয়তি জীবনে এটি ছিল একটি চূড়ান্ত পরীক্ষা। ইব্রাহিম (আ.) এর অগ্নি পরীক্ষার ন্যায় এটিও ছিল জীবন মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে এক মহাপরীক্ষা। পিছনে ফেরাউনের হিংস্র বাহিনী, সম্মুখে অথৈ সাগর। এই কঠিন সময়ে বনু ইসরাঈলের আতঙ্ক ও হাহাকারের মধ্যে ও মূসা ছিলেন স্থির ও নিষ্কম্প। দৃঢ় হিমাদ্রির ন্যায় তিনি আল্লাহর ওপর বিশ্বাসে অটল থাকেন এবং সাথীদের সান্ত্বনা দিয়ে আল্লাহর রহমত কামনা করেন। এ সম্পর্কে আল্লাহ তায়ালা বলেন- "তারপর তারা সূর্যোদয়ের প্রাক্কালে তাদের পিছু নিল। অতঃপর যখন উভয় দল পরস্পরকে দেখল, তখন মূসার সাথীরা বলল, অবশ্যই 'আমরা ধরা পড়ে গেলাম!' মূসা বলল, 'কক্ষনো নয়; আমার সাথে আমার রব রয়েছেন। নিশ্চয় অচিরেই তিনি আমাকে পথনির্দেশ দেবেন'। অতঃপর আমি মূসার প্রতি ওহী পাঠালাম, 'তোমার লাঠি দ্বারা সমুদ্রে আঘাত কর।' ফলে তা বিভক্ত হয়ে গেল। তারপর প্রত্যেক ভাগ বিশাল পাহাড় সদৃশ হয়ে গেল। আর আমি অপর দলটিকে সেই জায়গায় নিকটবর্তী করলাম, আর আমি মূসা ও তার সাথে যারা ছিল সকলকে উদ্ধার করলাম, তারপর অপর দলটিকে ডুবিয়ে দিলাম।" (সূরা শোয়ারা: ৬০-৬৬)

আল্লাহর নির্দেশের সাথে সাথে মূসা (আ.) সাগরে লাঠি নিক্ষেপ করলেন। আঘাত লাগতেই সমুদ্রে ঘটে গেলো এক অবাক কাণ্ড। লোকেরা তাদের চোখের সামনে দেখতে পেলো লাঠির আঘাতে সমুদ্রের পানি ফেটে গেছে। পানিগুলো তরঙ্গের মতো দুই পাশে উঁচু হয়ে পাহাড়ের মতো স্থির হয়ে গেল। আর সাগরের মাঝখান দিয়ে তৈরি হয়ে গেছে ঠনঠন শুকনো রাস্তা। আল্লাহর নির্দেশে মূসা ও তার সাথীরা এই রাস্তা দিয়ে নিরাপদে সমুদ্র পার হয়ে গেল। এভাবে আল্লাহ তায়ালা তার রাসূল ও মুমিন বান্দাদের সাহায্য করলেন। অপরদিকে ফেরাউন ও তার বাহিনী যখন সমুদ্র পার হওয়ার জন্য শুকনো সমুদ্রের মাঝপথে গেল। তখন আল্লাহর নির্দেশে সমুদ্রের পানি হঠাৎ করে তার স্বাভাবিক অবস্থায় ফিরে এলো। আর ফেরাউন ও তার দলবল পানিতে হাবুডুবু খেতে লাগল।

এভাবে আল্লাহ তায়ালা মূসা (আ.) এর ধৈর্য, দৃঢ়তা এবং আল্লাহর ওপর পরিপূর্ণ আস্থার ফলে তাঁকে সকল বিপদ থেকে মুক্ত করলেন এবং অত্যাচারী জালেম ফেরাউন থেকে তাদের রক্ষা করলেন। আর ফেরাউন ও তার দলবলকে উচিত শিক্ষা দিলেন।

ফন্ট সাইজ
15px
17px